প্রবাসঃ পরের ধনে পোদ্দারী নয়, কঠিন ও কর্মময় জীবন


বাংলাদেশে যখন ছিলাম তখন শুনতাম বিদেশে এসে আমরা বাঙালিরা নাকি রাস্তা ঝাড়ু দেই, মেথরের কাজ করি। তাই বাইরে আসার আগে মানসিকভাবে নিজেকে সেভাবেই তৈরী করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম বাড়ির মালিকরা ফুটপাত আর রাস্তা ঝাড়ু দেয়।

প্রথমবার দেখে আশ্চর্য হয়ে কাজিনকে জিজ্ঞাস করলাম ব্যাপার কি? সে বললো এখানকার ব্যাপারটাই এমন। তোমার বাড়ির সামনে রাস্তা আর ফুটপাত পরিষ্কার না থাকলে সিটি তোমার নামে জরিমানা করে দেবে। কিছুটা আশ্চর্য হয়েই আমেরিকান জীবন শুরু করলাম। আস্তে আস্তে বুঝে গেলাম বাংলাদেশে যা শুনে এসেছি তার সব কিছু সত্য নয়।

ভাগ্য ভালো হওয়ায় একটা রেস্টুরেন্টে ওভার নাইটের কাজ পেয়ে গেলাম আঙ্কেলের বদৌলতে। কাজ শুরু করলাম আঠারোতম অর্থ্যাৎ সেখানকার সবচেয়ে জুনিয়র কর্মী হিসেবে। আস্তে আস্তে কাটতে থাকলো আমেরিকান জীবন। বুঝলাম, বাংলাদেশে শুনে আসা বেশিরভাগ কথাই ভুল, নিজেদের সম্মান বাড়ানোর জন্য প্রবাসীরা মূলত দেশে গিয়ে চাপা ঝাড়েন। খালি কলসী বাজে বেশি। আর প্রবাস ফেরত খালি কলসী তো ড্রামসের মতো বাজে।

কষ্ট আর পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে কর্মজীবনে উন্নতি করতে শুরু করলাম। একসময় সামনের কয়েকজনকে টপকিয়ে সহকারী ম্যানেজার হয়ে গেলাম। আরো কঠোর পরিশ্রম শুরু করে দিলাম। ফলস্বরূপ আঠেরো বছরের রেকর্ড ভেঙে ম্যানেজারের চেয়ারে বসে গেলাম।

রেকর্ডটি ছিল আমার আগের ম্যানেজার আঠেরো বছর যাবৎ নতুন কোন ম্যানেজার মেক করেনি নিজের পোস্ট চলে যাবার ভয়ে। তাকে আমার পারফর্মেন্সের জোরে সরিয়ে রেকর্ড ভেঙে ফেললাম। এর মাঝে অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে চলতে হয়েছে কর্মজীবনে। সেসব ব্যাপার কখনো প্রকাশ করা বা কসমস জীবন প্রদর্শন করার প্রয়োজন বোধ করিনি। কেন করবো? জীবনটা তো আমার, আমার তো কিছুটা প্রাইভেসি আছে। আমি তো নিজেকে খালি কলসী ভেবে বিষণ্ণতায় ভুগি না। অন্যের কাছে নিজের লাইফস্টাইল প্রদর্শন করে আলগা ফুটানি করার প্রয়োজন আমার নেই।

ম্যানেজার হওয়ার বয়সটা আমার খুব কম। নেটওয়ার্কে প্রায় ত্রিশটি রেস্টুরেন্টের ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশজন ম্যানেজারের মাঝে আমার বয়স সবচেয়ে কম। এজন্য অনেকে ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে।
কোন এক সকালের ব্যস্ত সময়ে আমি দেখলাম আমার কর্মীরা কাস্টমার সার্ভিস করতে গিয়ে ক্লিনিং করার সময় পাচ্ছে না। তাই ঝাড়ু, বেলচা আর পরিষ্কার করার কাপড় নিয়ে বাইরে চলে গেলাম। টেবিলগুলো পরিষ্কার করে রেস্টুরেন্টের সামনের রাস্তায় গিয়ে রাস্তা পরিষ্কার শুরু করলাম। হঠাৎ এক বাঙালিকে দেখে বুঝলাম তিনি দেশ থেকে নতুন এসেছেন। কাজ খুঁজছেন হয়তো। কিন্তু তার হাঁটার ধরণ দেখে মনে হলো তিনি বাংলাদেশের জমিদার! আমি আমার মতো কাজ করতে থাকলাম। সে লোক সামনে এসে খুব তাচ্ছিল্যভাবে জিজ্ঞাস করলেন আমি বাংলাদেশী কি না। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দেবার পর সে খুব তীর্যকভাবে বলতে শুরু করলেন, ‘দেইখ্য তো ভালো ঘরের পোলা মনে হয়, আরে আমেরিকায় আইসা রাস্তা ঝাড়ু দেও, খেরেস্তান গো বিড়ির গোয়া পরিষ্কার করো, ভালো ভালো।’ আমি কথা না বলে আমার কাজ শেষ করে ভেতরে চলে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর এক সহকর্মী এসে প্রশ্ন করলো ‘শুভ একজন কাজের জন্য এসেছে, তাকে কি বলবো? তুমি কি নতুন কাউকে চাকরী দেবে?’ সেই মুহূর্তে আমার তেমন একটা কর্মীর প্রয়োজন না থাকলেও কি মনে করে যেন অফিস থেকে উঠে সামনে গেলাম। গিয়ে দেখি সেই বাঙালি লোকটি দাঁড়িয়ে আছে। আমিও স্বাভাবিক ভাবে তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম কি প্রয়োজন? সে আবার সেই তাচ্ছিল্য ভাবে বলেন তিনি কাজের জন্য এসেছেন এবং ম্যানেজারের খোঁজ করছেন। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ আপনি কি মূর্খ? ইংরেজি পড়তে জানেন না? আমার বুকে নামের সাথে আর কি লেখা আছে দেখেননি?’

সে আমতা আমতা শুরু করার পর তাকে আবার বলাম, ‘ আমার ঠিক তেমন লোকের প্রয়োজন যিনি সব ধরনের কাজ করতে পিছপা হবেন না, কোন কাজকে ছোট চোখে দেখেন না এবং মানসিকভাবে একজন শিক্ষিত মানুষ হবেন, আমার রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তাটা ঐদিকে।’

লোকটি মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। এখন এই লোকটি আমার কাছে কাজের সন্ধানে না এসে দেশে ফিরে গিয়ে আমার বা আমেরিকায় থাকা প্রবাসী বাঙালিদের ব্যাপারে কি বলতেন? অথবা চরম অপমানিত হওয়ার পর কি বলবেন?
সে যাই বলুক – তাতে আমার কোন মাথা বাথা নাই। কারন এই ধরনের মানুষগুলো প্রবাসে দিন দুয়েক এসে আকাশে ছড়ে বসে থাকে। তাদের ব্যাপারে চিন্তা করা বৃথা।

যারা প্রবাসে এসে ফুটানি করেন, ফেসবুকে ভাব নেওয়াতে সর্বদা ব্যস্ত- তাদের বেশীরভাগ পরের ধনে পোদ্দারি করেন, পরের পঁয়সায় ফুটানি করেন। প্রবাস জীবন বেশ কঠিন, ব্যস্ত আর কর্মময় জীবন। এখানে আরেকজনের চেহারা দেখার সময় থাকে না অনেক সময়। যাদের কাছে মদ- অর্থ থাকে, তাদের অনেকেরই মদের বোতলের সাথে ছবি তোলার সময় থাকে না। আর যারা অন্যের অর্থে বা উপহার হিসেবে মদের বোতল প্রাপ্ত হন তাদের অনেক সময় থাকে, যা আপনারা আমরা প্রায়শঃ দেখে থাকি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − 89 =