কৃষ্ণকলি ইতিকথা

আজও আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় কালো মেয়েদের সুন্দর করে শৈল্পিক কায়দায় হাসতে হয়। জানতে হয় কথা বলা চোখের ভাষা। অনেক বেশি পারদর্শী হতে হয় লেখায়, ছবি তোলায়-আঁকায় বা অন্যান্য কর্মে। সবসময় হাসিমুখ নিয়ে বিরক্তহীন তেলতেলে মুখে যেন সবকিছুকে প্রায় হ্যাঁ বলার অনুশীলন। এভাবেই তারা টিকে আছে প্রতিযোগিতায় অশৈল্পিক সাদারঙের সাথে। একটু শিল্পকলা না জানলেই যে ছিঁটকে পড়বে তারা। মায়ের সময় থেকে দেখে আসছি এই সত্যকে, তিনিও তো ছিলেন এমনি এক কৃষ্ণকলি। আর এটাই কৃষ্ণকলিদের গল্প

এই সাদাপ্রীতি কিন্তু আমাদের দেশে একসময় ছিল না, সাদা হবে কোত্থেকে? সব যে বাদামী চামড়ার দ্রাবিড়, অস্টিক, কোল, মুন্ডা আর রাজবংশী।
এজন্যই বোধকরি প্রবাদ আছে,

“নদীর পানি ঘোলা ভাল
জাতের মেয়ে শ্যামলা ভাল”

শ্যাম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা কেষ্ট ঠাকুরের অন্য নাম। কালো বলে অসম্মান না দেখিয়ে বরং উল্টো সম্মানার্থে তার নামে চালু হয় বর্ণের (রঙের) নাম। বিয়ের জন্য প্রথম পছন্দ ছিল এই শ্যাম বর্ণ, লক্ষীপা আর দীঘল চুলের মেয়েদের। একটু সাদা দেখলেই বলে বসত,‘আরে মেয়ের শ্বেতি ব্যামো আছে নাকি’
এভাবেই চলছিল বেশ তারপর একসময় আসল গৌড় বর্ণের আর্যরা, তারপর গ্রীক; তারা ছিল যোদ্ধা বা ঔপনিবেশিক। তাদের দেখে গুটি কয়েক সমাজের উচ্চ স্তরের মানুষ অভিভূত হলেও আমজনতা ছিল আগেরই মত।
তারপর আসল তুর্কি, আফগান, মোঘল। এদের বর্ণ উজ্জ্বল হলেও ধর্মীয় কারণে এদের স্ত্রী কন্যারা ছিল শুধুমাত্র হারেমের সৌন্দর্য। অবশেষে দেশে আসল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাইনবোর্ড নিয়ে ইংরেজরা। এরা এসেই দিল মাথা নষ্ট করে বাঙালি সমাজের। কারণ সাহেবদের জেনানারা হারেমের সম্পদ হয়ে শুধু থাকেনি। ঘুরে বেরিয়েছে সারা বাংলায়। এই মেমসাহেব’দের দেখেই হা করে চেয়েছিল বাদামি চামড়ার বাঙালি। গোপনে ছোট করে ঢোক গিলে মনে মনে ভাবত ইশ যদি অমন একটা বউ থাকত। আর এভাবেই মেমসাহেব বর্ণের ভূত চাপল বাঙালি ছেলেদের মাথায়। তারপর ছেলের মুখের দিকে চেয়ে ছেলের মায়েরও শখ জাগল, মেমসাহেব বউয়ের শাশুড়ি হবার।
ব্যস আর কি চাই? সেই যে ভূত চাপল আর নামল না। এখনও তাই দেখি সাদা বউয়ের দোষ চাপা বর্ণের বউয়ের চেয়ে ঢের কম। আর শ্যামবধুদের পান থেকে চুন খসলেই লংকাকান্ড।
এক ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র সুবাদে বাংলা পেয়েছিল মেমসাহেবদের দেখা,
আর এখন ‘ফেয়ার এন্ড লাভলি কোম্পানি’র সুবাদে পেয়েছে জোর করে মেম বানানোর ফর্মুলা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 1 =