হাড়মুড়মুড়ি রোগ

সে অনেক কাল আগের কথা। এক দেশে ছিল এক রাজা, নাম তার হরিদাস ঈশ্বরাংশ। পাহাড়ী উপত্যকায় ছবির মত সাজানো দেশটায় সুখের শেষ নাই, প্রজারাও মদ্য, রুটি, নারীতে সুখে শান্তিতে আছে। সোনাফলা জমিনে ফসলের মাঠে দোলা দিয়ে যায় বাতাস। সুখ নাই শুধু সূর্যদেবের একনিষ্ঠ উপাসক রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ আর রাণী ইসাবেলার মনে। কারণ তাদের কোন সন্তান নেই। কি হবে রাজপাট দিয়ে যদি না থাকে উত্তরাধিকার? কে করবে পুজো সূর্যকে, কে দেবে প্রণাম? চিন্তায় হরিদাস ঈশ্বরাংশের কাঁচা চুল পেকে যেতে থাকে। রাজকার্যে মন নাই রাজার।

এমন সময়ে রাণী ইসাবেলা পরামর্শ দিলো, সমাধান আছে প্রিয়ে,
কি সেই সমাধান? রাণী?

আমাদের দাসী অহল্যাকে দেখেছো? যেন জ্বলন্ত ইটের ভাটা। শাস্ত্রে ক্ষেত্রজ সন্তানের কথা উল্লেখ আছে, প্রিয় স্বামী আমার।

হরিদাস ঈশ্বরাংশ একটু যেন চিন্তা করে দেখল বিদুষী রাণী ইসাবেলা যেন ঐশী বানী দিলো যেমন ঐশী বানী সে নিজে মাঝে মাঝে মূর্ছা গেলে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে যেগুলো লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। সূর্যদেবের সাথে ড্রামাটিক মনোলগ পর্বে ইসাবেলার কথাও উল্লেখ থাকবে।
সেই রাতে, সেই সুখের বানী পতনের রাতে হরিদাস ঈশ্বরাংশের সাথে রাণী ইসাবেলার শেষ রাত্রি যাপন। আগামীকাল রাজা চলে যাবে অহল্যার ঘরে, আজকেই ইসাবেলার বিদায় রজনী। অবশ সুখে মাখামাখি রানীকে দেখেই মনে হলো যেন সে সেদিন রাত্রেই প্রথমবার যৌনতৃপ্ত হয়েছে, যেন চোখে মুখে ফুটে উঠছে যৌবনের চপলতা। সুস্বাদু খাদ্য, মদ্য আর ইসাবেলাময় রাতে রাজা হারিয়ে গেছিল ইসাবেলার শরীরে। তিনদিন পরে ইউরিন টেস্টে বুঝা যায় ইসাবেলা বংশগতিকে স্বাগত জানাচ্ছে।
দাসী অহল্যাকে হরিদাস ঈশ্বরাংশ পুত্র প্রত্যাশায় দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন। একদিনের ব্যবধানে দাসী থেকে অহল্যা রাণী হয়ে গেল। দাসী হলেও সে দুনিয়ার বিষয় জ্ঞানে খুব টনটনে, এবং রূপ সচেতন অহল্যা কামকলা নিপুণা। হরিদাস ঈশ্বরাংশ বাসরঘরে একান্ত মিলন মুহূর্তে অহল্যা তিন সত্যি করে নিল যে তার সন্তান যেন খানদানের পরবর্তী মালিক হয়। প্রেম, যুদ্ধে, বিছানায় কোন কিছুতেই না নাই। না কথা বলা এখানে ক্রাইম। সূর্যদেবের অশেষ কৃপায়, অহল্যার ইউরিন টেস্টেও নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল যে অহল্যা মা হতে চলেছে। রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংসের জীবনে আশীর্বাদে যেন অভিশাপ নেমে এলো। নিয়মানুসারে বড় রাণী ইসাবেলার সন্তান হবে ভবিষ্যৎ রাজা কিন্তু হরিদাস ঈশ্বরাংশ ছোট রাণী অহল্যার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। একি সুখের যন্ত্রণায় ফাটা বাঁশে বিচি পড়ার মত অবস্থা।

যথা সময়ে দুই রাণী ইসাবেলা এবং অহল্যার কোল আলো করে জন্ম নিল দুই শিশু। দুই জনই পুত্র সন্তান। বড় রাণী ইসাবেলার ছেলের নাম রাখা হলো রোহিতাস্য আর ছোট রানী অহল্যার ছেলের নাম একিলিস। হরিদাস ঈশ্বরাংশের দুই ছেলেই দারুন পিতৃভক্ত। পৈত্রিক দেবতা সূর্যদেবের প্রতি তাদের ভক্তি সর্বজন বিদিত। তারা বেড়ে উঠতে লাগল পিতার মতই শৌর্য বীর্যে অতুলনীয়।

পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম বউ হয়ে যায় বহুল ব্যবহৃত জ্বরা জীর্ণ। পুরুষ যেন আরও বেশি রোমান্টিক হয়ে যায়। সব প্রেম উথলে ওঠে আনকোরা নতুন বউয়ের জন্য। স্বাভাবিকভাবেই বড় রাণী ইসাবেলা দৃশ্যপট থেকে সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ছোট রানীর ঘরেই হরিদাস ঈশ্বরাংশ রাত্রিবাস করে। আর এদিকে ছোট রাণী অহল্যার সব সময়ের চিন্তা কিভাবে একিলিসকে রাজ্যে অভিষেক করবে। সে হবে রাজমাতা। তার স্বপ্নের পথে একমাত্র কাঁটা বড় রানীর ছেলে রোহিতাস্য। কিভাবে দূর করবে এই জলজ্যান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী? অহল্যা দাসী থাকাকালীন সব সময়ের সঙ্গী কুঁজো বুড়ি পরামর্শ দিল কিভাবে পরিস্কার করা যায় একিলিসের রাজ্য অভিষেকের পথ।

রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ মৃগয়াতে গিয়েছেন। সঙ্গে আছে তার কিশোর পুত্র রোহিতাস্য আর একিলিস। শিকারে দুজনেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিল রাজাকে। সবাই বুঝতে পারল যোগ্য উত্তরাধিকার এসে গেছে। রাজা খুশি মনে ফিরে এলো রাজধানীতে।

কুঁজো বুড়ি আর হেকিম শুক্রাচার্যের গোপন পরামর্শে রানীর বিছানার নিচে বিছিয়ে দিল পাটকাঠি। পাশ ফিরলেই কটমট শব্দ হয়। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিল। চুল এলোমেলো। রাণী যেন দুঃখের হাড়ি মাথায় ভেঙে বসে আছে। বিষাদ ছুঁয়েছে তাকে। রানীর সেই ইটের ভাটার মত আগুন যেন অনেকটা নিভন্ত চুলা। রাজা ফিরে দেখে ছোট রানীর ভীষণ অসুখ। বিছানায় এপাশ ওপাশ করলেই রানীর হাড় কটমট করে ওঠে। যন্ত্রণায় রানীর মুখ কুঁকড়ে যাচ্ছে। অহল্যার এই কষ্ট হরিদাস ঈশ্বরাংশের আর সহ্য হয় না। রাজার হেকিম শুক্রাচার্য দ্রুত ছুটে এলো, দেখি রাণী মা’র কি হয়েছে। রোগের লক্ষণ দেখে শুক্রাচার্য ভ্রু কুঁচকে বললেন রোগ খুব গুরুতর। এই রোগের নাম হাড়মুড়মুড়ি। এই রোগে রোগীর বাঁচার আশা খুবই ক্ষীণ। রাজা নিরুপায়, অসহায় হয়ে শুক্রাচার্যকে বললেন, যে কোন মূল্যে রানীকে বাঁচাতে হবে।

শুক্রাচার্য রাজাকে বললেন, জাঁহাপনা, আমাকে দুইদিন সময় দেন, দেখি আমি কোন নিদান দিতে পারি কিনা। রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ বললেন, তুমি যে ইনাম চাও তাই পাবে, রানীকে ভালো করে দাও। ছোট রাণী অহল্যার বিছানার পাশে এসে ভিড় করেছে সবাই, রানীর এখন অন্তিম দশা। এসেছেন বড় রাণী ইসাবেলা, দুই পুত্র রোহিতাস্য আর একিলিস।

দুইদিন পরে রাজ হেকিম শুক্রাচার্য ফিরে এলেন অতি বিমর্ষভাবে। তার মুখে যেন কেউ লেপে দিয়েছে কবরের নিস্তব্ধতা। সে কি করে রাজাকে জানাবে এমন নিদানের কথা। রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ জিজ্ঞেস করলেন, কি দাওয়া এনেছ, হে ভুবনজয়ী হেকিম। একমাত্র সূর্য ছাড়া যার কাছে থেকে কেউ জীবন কেড়ে নিতে পারে না। রাজাকে একটু আড়ালে নিয়ে মাথা নিচু করে, শুক্রাচার্য ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ভুবনেশ্বর প্রভু, যদি নির্ভয় দেন, তবেই নিদান বলতে পারি। রাজা বললেন, নির্ভয়ে তুমি বলতে পারো কি হয়েছে, কিসে রানীর রোগ মুক্তি। দৈববাণীর মত শুক্রাচার্য উচ্চারণ করলেন, রানীর হাড়মুড়মুড়ি রোগ ভালো হওয়ার একটা মাত্র পথ আছে। বড় রাণী ইসাবেলাকে পুত্রসহ নির্জন পাহাড়ে নির্বাসন দিতে হবে।

রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। হায় সূর্যদেব, তুমি একি পরীক্ষায় ফেললে আমাকে? রোহিতাস্য যে আমার প্রিয় পুত্র। কিন্তু ছোট রানীকে বাঁচাতে হলে যে এছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। চোখের জলে ভাসিয়ে বড় রাণী ইসাবেলা আর প্রিয় পুত্র রোহিতাস্যকে কৈলাস পাহাড়ের উপত্যকায় নির্বাসন দিয়ে এলো নিজ হাতে। আর রানীকে বুঝিয়ে এলো সে নিয়মিত দেখতে আসবে। নির্জন পাহাড়, কোন অন্নের সংস্থান নেই, নেই পানীয় জলের সুব্যবস্থা।

রাজা ভগ্ন মনোরথে হরিদাস ঈশ্বরাংশ রাজ প্রাসাদে ফিরে এলেন। মনে আশা তবু যদি অহল্যা সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু কোথায় কি? রানীর রোগ সেই তথৈবচ। বিছানায় পাশ ফিরলেই কটমট করে ওঠে, আর যন্ত্রণায় রানীর শরীর বেঁকে যাচ্ছে। রাজ হেকিম শুক্রাচার্যকে আবার ডাকা হলো, কি ব্যাপার রানীর রোগের তো উপশম নেই।

এবার শুক্রাচার্য যা বললেন তার জন্য রাজা প্রস্তুত ছিলেন না। শুক্রাচার্য ধ্যানস্থ হয়ে বললেন, রাজা মনকে শান্ত করুন, রানীর রোগ ভালো হতে পারে যদি রোহিতাস্যেকে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে সেই রক্তে রানীকে স্নান করালে। রাণী অহল্যা করুন মুখে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার বুঝি আর বাঁচার আশা নেই।

হরিদাস ঈশ্বরাংশ সিদ্ধান্ত নিলেন, রানীকে বাঁচাতে দরকার হলে তিনি সূর্যের উদ্দেশ্যে প্রিয় পুত্রকে উৎসর্গ করে দেবেন। তবু রাণী ভালো হোক।

সামনের সূর্য পুজোর তিথিতে হরিদাস ঈশ্বরাংশ কৈলাস পাহাড়ে গেল নির্বাসিত বড় রাণী ইসাবেলা আর পুত্র রোহিতাস্যকে দেখতে গেল। এমন পাণ্ডব বর্জিত অঞ্চলে রোহিতাস্য চাষাবাদ করে ফেলেছে, পাহাড়ের শরীর খুঁচে বানিয়ে ফেলেছে জলের ধারা।

রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ পুত্র রোহিতাস্যকে কাছে ডেকে বললেন, পুত্র, গতকাল রাত্রে সূর্যদেব আমাকে স্বপ্ন দেখা দিয়েছেন। তিনি আমার প্রিয় জিনিসের উৎসর্গ চান। পুত্র রোহিতাস্য বলল পিতা, সূর্যদেব, আপনাকে স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন, আপনার কাছে উৎসর্গ চেয়েছেন এটা তো খুবই খুশির কথা।
পুত্র রোহিতাস্য তুমি তো জানো, তুমিই আমার প্রানোধিক প্রিয়। রোহিতাস্য বলল, পিতা আমি জানি, আমিই আপনার প্রাণের প্রিয়। আপনি আমাকে সূর্যদেবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে দিন। সূর্যের কাছে আমার আত্মবলিদান, এর থেকে সৌভাগ্যের আর কি হতে পারে? আপনি অপেক্ষা করুন, আমি মা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি।

মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রোহিতাস্য বাবার কাছে চলে এলো। রাজা হরিদাস ঈশ্বরাংশ রোহিতাস্যকে নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে চলে গেলেন। রোহিতাস্যের চোখ বেঁধে দিলেন। পাথরের উপরে রেখে সুরযদেবকে প্রনাম করে পুত্রের গলায় চালিয়ে দিলেন আড়াই পোঁচে ছুরি। কিন্তু একি! সূর্যদেবের আশীর্বাদে কিশোর রোহিতাস্যের বদলে সেখানে দেখা দিল এক মৃগশিশু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

18 − 16 =