৭১ এর—সাত দফা চুক্তি তাজউদ্দীন আহমদ ও বঙ্গবন্ধু ( এক)

১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের বাংলাদেশ, একদিকে তিরানব্বই হাজার সৈন্যসহ পরাজিত লে. জেনারেল নিয়াজীর রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে পাঁচ থেকে সাত ডিভিশন ভারতীয় সেনা এবং উনত্রিশটি বিএসএফ ব্যাটালিয়ানের বাংলাদেশে অবস্থান। আমরা জানলাম, আমরা দেখলাম এবং আমাদেরকে বলা হলো আমরা স্বাধীন হয়েছি। সমগ্র জাতি বিজয়-উল্লাসে মেতে উঠলো। শুধু জানতে পারছি না ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে প্রবেশের আগে আমাদের প্রবাসী সরকারের সাথে মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর কী কথা হয়েছে। যে আদলেই হোক আমাদের প্রবাসী

সরকার এবং ইন্দিরা সরকারের মধ্যে শক্ত একটা বোঝাপড়া থাকতেই হবে। কিন্তু কী সেই শক্ত বোঝাপড়া দেশবাসী তা জানেন না, মুক্তিযোদ্ধারা জানেন না, সেক্টর কমান্ডারগণ জানেন না, আওয়ামী লীগের নেতারা জানেন না। অথচ সমগ্র দেশবাসীসহ সবারই এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি জানার অধিকার আছে। এখানে ওখানে কানায়ুষা চললেও, পত্রপত্রিকায় আভাস-ইঙ্গিত দিলেও ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের পরও কখনোই সরকারীভাবে জাতিকে অবহিত করা হয়নি— ঐ সময় প্রবাসী সরকার এবং ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের মধ্যে কী সমঝোতা হয়েছিল। অবশ্য পরবর্তী ঘটনাবলীতে প্ৰমাণিত হয়েছে সরকারীভাবে এ ব্যাপারে কোন ঘোষণা না আসায় জাতির জন্য বরং মঙ্গলই হয়েছে। ঘোষণা দিলে সাত-দফার অস্তিত্বকে এক অর্থে স্বীকার করে নেয়া হয়। শেখ মুজিব এখানে এক বিশাল রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।

অবশেষে দীর্ঘ আঠার বছর পর ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস ‘দিল্লী মিশন প্রধান’ মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে জানা যায়, আমরা যখন পাকিস্তানকে পরাজিত করে নিজেদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করে বিজয়-উল্লাসে মেতে উঠেছিলাম। তখন আমাদের প্রবাসী সরকারের প্রধান নির্বাহী মরহুম তাজউদ্দীন আহমদ (পর্দার আড়ালে প্রবাসী সরকারের আসল কর্তা-ব্যক্তি ভারত সরকারের তৎকালীন প্লানিং কমিশনের চেয়ারম্যান ডি.পি. ধর) এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর হাতে ছিল “মহামূল্যবান’ একটি চুক্তিপত্ৰ। চুক্তিপত্রটিতে স্বাক্ষর করেছেন মরহুম তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে (কার্যতঃ ডি.পি ধরের নেতৃত্বে) প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ঐ চুক্তিপত্রে যা যা লেখা ছিল, তার সারসংক্ষেপ হচ্ছে, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর—

১. যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, শুধু তারাই বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন। বাকীদের চাকুরিচ্যুত করা হবে এবং সেই শূন্য জায়গা পূরণ করবেন। ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।
২. বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে। কতদিন ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে তা পুনঃনিরীক্ষণের জন্য ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস থেকে আরম্ভ করে প্রতিবছর দুই দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
৩. দেশ ও সংবিধান রক্ষার জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না। দেশের সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য কোন বাহিনী থাকবে কি না তার উল্লেখ না থাকায়
ধরে নেয়া যায়। তাও থাকবে না ।
৪. অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে।
৫. সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অধিনায়কত্ব দেবেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান এবং যুদ্ধকালে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে।
৬. খোলা বাজার ভিত্তিতে চলবে দু’দেশের বাণিজ্য, তবে বাণিজ্যের পরিমাণের হিসাব নিকাশ হবে বছরওয়ারী এবং যার যা প্রাপ্য, সেটা বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে ।
৭. পররাষ্ট্র নীতি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে এবং যতদুর সম্ভব ভারত এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে। (দ্রষ্টব্য: হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার)

এই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের কলঙ্ক বহুল আলোচিত তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার এবং মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সরকারের মধ্যকার স্বাক্ষরিত সাত-দফা চুক্তি। এই সাত-দফা চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করার পর-পরই প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। চুক্তিটি হয়েছিল ১৯৭১এর অক্টোবর মাসে।

এই চুক্তির কথা অনেক পরে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীকে জানানো হলে তীব্ৰ ক্ষোভে তিনি ফেটে পড়েন। এর প্রতিবাদে রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকেন না।
***ভারত কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের বিজয় দিবস হিসাবে পালন করে এবং দাবি করে বাংলাদেশ তাদের এই যুদ্ধবিজয়েরই ফসল (an outcome of India-Pakistan war), অর্থাত ভারতই বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দিয়েছে। ভারতের জনগণও তা-ই জানেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস প্রসঙ্গে ‘ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ’ শব্দটি উচ্চারিত হলে আমরা ধর-ধর, সব গেল, সব গেল বলে শোরগোল তুলি। অথচ জনাব তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধের কলঙ্ক সাত-দফাইয় এক দফায় মুক্তিযুদ্ধকে ভারত পাকিস্থানে যুদ্ধ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন।

এই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জাতির গর্ব মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভারতীয় কমান্ডের অধীনে নির্দেশ পালন করার জন্য ঠেলে দেয়া হয়েছে। মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল ওসমানী। তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী ও গোটা মুক্তিবাহিনীকে ভারতের তাবেদার বাহিনীতে’ পরিণত করেন। অপমান এবং ক্ষোভে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী রেসকোর্স ময়দানে লে. জেনারেল নিয়াজীর আত্মসমৰ্পণ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা, সেক্টর কমান্ডাররা ঢাকায় প্রবেশ করেন। ভারতীয় কমান্ডের অধীনে। এমনকি রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমৰ্পণ অনুষ্ঠানে সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকারকে সিভিল পোশাকে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের পেছনে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমৰ্পণ অনুষ্ঠানে পরাজিত পাকিস্তানের লে. জেনারেল নিয়াজী হন দাতা, বিজয়ী ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা হন গ্ৰহীতা এবং মুক্তিবাহিনীর উপসর্বাধিনায়ক সেক্টার কমান্ডার এ কে খন্দকার এবং কাদের সিদ্দিকী হন সাক্ষী- না সাক্ষীও নন, তারা ছিলেন আর সবার মতো দর্শক মাত্র।

এর ফলে ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবস প্রকৃতপক্ষে জনগণের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবস না হয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধে ভারতের বিজয় দিবসে পরিণত হয়। এটা প্রকাশিত হয় আরও যে কারণে সেটি হ’ল জেনেভা কনভেনশনে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের বিজয়ী দেশ কর্তৃক বিজিত দেশের বা তার কোন দখলকৃত এলাকায় যে আচরণ অনুমদোনযোগ্য হয়, সেই অনুযায়ী বিজয়ী ভারতীয় বাহিনী বিপুল পরিমাণে অস্ত্ৰ-গোলাবারুদসহ বাংলাদেশের শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র, এমনকি কোন কোন শিল্পাঞ্চল হতে পুরো শিল্পকারখানা খুলে নেওয়া এবং তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর ভারতে স্থানান্তর, তাদেরকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো— অর্থাৎ এই সবকিছু হয়েছে শত্রুপক্ষের নিকট হতে দখলকৃত এলাকার জন্য অনুমোদিত জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী। এখানে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের চিত্রটাকেই মুছে ফেলা হয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদ মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অধীন বানিয়ে ফেলেন।

১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরের পরপরই কিছুটা ধোয়াটে আবরণ নিয়ে এই মুখ সেই মুখ করে সৈয়দ নজরুল ইসলামের মূৰ্ছা যাওয়ার ঘটনাটিসহ দফাওয়ারী মুক্তিযুদ্ধের কলঙ্ক সাত-দফার খবর রাজনৈতিক অঙ্গণে খানিকটা জানাজানি হয়ে যায়। আর এটি ভাল ভাবে জানা যায় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর( ৭১ এ প্রবাসি সরকারের দিল্লি মিশন প্রধান, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের দিল্লি হাইকমিশনার, পররাষ্ট্র মন্ত্রী, জাতীয়সংসদের স্পিকার) সাক্ষাৎকারে। এই সাক্ষাৎকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনার দালিলিক প্রমাণের ঘাটতি পুরণ করেছে— মুক্তিযুদ্ধের তথা বাংলাদেশের অভু্যদয়ের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং তাঁর জীবন-বৃত্তান্ত সম্পূর্ণ করার জন্য যার প্ৰয়োজন আছে।

———-ক্রমশ———-
সুত্রঃ অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি ও বাংলাদেশ—রইসউদ্দিন আরিফ।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার—-

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “৭১ এর—সাত দফা চুক্তি তাজউদ্দীন আহমদ ও বঙ্গবন্ধু ( এক)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 49 = 56