নিকোলা টেসলা: ভুল সময়ে জন্মানো কিংবদন্তী বিজ্ঞানী

১৮৭০ সাল। ক্রোয়েশিয়ার এক স্কুলে ম্যাথ ক্লাস চলছে-
আজকের টপিক ইন্টিগ্রেশন। বেশ কটা ক্লাসের পর আজকে কঠিন কঠিন ইন্টিগ্রেশন শুরু।
বোর্ডে কতগুলো অঙ্ক লিখে টিচার ফিরলেন সবাই অঙ্ক করছে কিনা দেখতে। সবাই মনোযোগ দিয়ে করছে। কিন্তু একজন বসেই আছে। স্যার তার দিকে এগিয়ে গেলেন। “তুমি কেন করছ না?” ১৪ বছরের সেই ছেলেটা বোর্ডের সবগুলো অংকের উত্তর বলে গেল।
স্যার ভাবলেন ছেলেটা উত্তর হয়ত মুখস্ত করে এসেছে। তিনি বানিয়ে কয়েকটা দিলেন। ছেলেটা এবারও সবগুলোর নির্ভুল উত্তর বলে দিল! একবারও খাতা কলম হাতে নিল না। টিচার বুঝতে পারলেন, এইছেলে ভয়ঙ্কর মেধাবী। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর মেধাবীকে আমরা ছোটবেলা থেকে চিনে আসি না। যতটা না চিনি নিউটন আইন্সটাইন কিংবা টমাস আলভা এডিসনকে।

ছেলেটির নাম ছিল নিকোলা টেসলা।
এটাও আমরা জানি না, আজকের IEEE এর এক সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্টও ছিলেন তিনি। ইতিহাসের পাতায় অবহেলিত এক EEE Engineer টেসলা। এ লিখাটা তার প্রতি একটা ট্রিবিউট।

১৮৫৬ সালের ১০ জুলাই টেসলার জন্ম। ক্রোয়েশিয়ার এক গ্রামে। বাবা ছিলেন একজন ধর্মযাজক। নানাও ছিলেন তাই। ৫ ভাই বোনের মধ্যে ছিলেন চতুর্থ। বড় ভাই মারা গিয়েছিলেন ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে। তার বাবার ইচ্ছে ছিল নিকোলা-ও বড় হয়ে প্রিস্ট হবে তার মত। ছোট থেকেই তাকে সেটা নিয়ে চাপ দিতেন। কিন্তু নিকোলা সেটা চাইতেন না, একদমই না।

১৮৬১-তে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন নিকোলা, শেখেন জার্মান ভাষা, গণিত আর ধর্মতত্ত্ব। ১৮৭০ সালে হাই স্কুলে পড়ছিলেন তিনি, যখন সেই ইন্টিগ্রেশনের ঘটনাটা ঘটে। তখনই তার আসল মেধাটা ধরা পড়ে। চার বছরের পড়া তিন বছরেই শেষ করে গ্র্যাজুয়েট করে ফেললেন তিনি ১৮৭৩ এ। সে বছরই ফিরে গেলেন নিজের গ্রামে। এসে কলেরার প্রকোপে পড়লেন। খুব ভয়ংকর অবস্থা। নয় মাস ছিলেন শয্যাশায়ী।কয়েকবার মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
নিকোলার বাবা অসহায় হয়ে তাকে কথা দিলেন, সুস্থ হলে তাকে সবচেয়ে ভাল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে পড়তে পাঠাবেন। আর বলবেন না যাজক হতে। টেসলা সুস্থ হয়ে উঠলেন এক সময়।

১৮৭৪ সালে নিকোলা আর্মিতে ভর্তি হওয়া থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেলেন। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরলেন। টেসলা পরে বলেছিলেন,প্রকৃতির সাথে এই নৈকট্যটা অনেক দরকার ছিল তার। বসে বসে মার্ক টোয়েন পড়তেন তিনি। ১৮৭৫ এ টেসলা ভর্তি হলেন অস্ট্রিয়ান পলিটেকনিকে। তাঁর স্বপ্ন। ফার্স্ট ইয়ারে তিনি একটা লেকচারও মিস করেন নি। সবগুলোতে ছিল হায়েস্ট গ্রেড। ডিনের থেকে লেটার পেয়েছিলেন তার বাবা, “আপনার ছেলে প্রথম শ্রেণির স্টার।”

প্রতিদিন রাত ৩টা থেকে রাত ১১টা (২০ ঘণ্টা) পর্যন্ত টানা খাটতেন তিনি। কোন ছুটির দিনও বিশ্রাম নিতেন না। ১৮৭৯ তে বাবা মারা যাবার পর বাবার পুরনো চিঠি ঘাটতে গিয়ে দেখলেন সেখানে তার প্রফেসরদের কাছ থেকে চিঠি আছে, “আপনার ছেলেকে এখুনি স্কুল থেকে সরিয়ে নিন। নাহলে খাটতে খাটতে মারাই যাবে।”

সেকেন্ড ইয়ারে “কমুটেটর দরকার কি দরকার না” সেটা নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়েন প্রফেসরের সাথে। সে বছরই জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন নিকোলা আর স্কলারশিপ বাতিল হয়ে যায় তার। থার্ড ইয়ারে তিনি তার সব সম্পদ জুয়ায় উড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। কিন্তু জুয়া খেলেই সব আবার earn back করেন। পরে তার বিলিয়ার্ড খেলার নেশা ধরল।

এক্সাম টাইম আসার পর, টেসলা আবিষ্কার করলেন তিনি কিছুই পড়েন নি। তিনি পিএল বাড়াতে চাইলেন। কিন্তু তার দাবি অগ্রাহ্য করা হল। তিনি গ্র্যাজুয়েট করতেই পারলেন না। লাস্ট সেমিস্টারের কোন গ্রেডই তার ভাগ্যে জুটল না। হয়ে গেলেন একজন ড্রপ-আউট।
১৮৭৮ এর ডিসেম্বরে টেসলা চলে গেলেন। নিজের পরিবারের সাথে সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন করলেন, তারা যেন টের না পায় যে টেসলা এখন একজন ড্রপ আউট।

স্লোভেনিয়াতে চলে গেলেন তিনি, সেখানে মাসে ৬০ ফ্লোরিন এর বিনিময়ে ড্রাফটসম্যান এর কাজ করতেন, আর বাকি সময়টা কার্ড খেলে কাটাতেন রাস্তায় রাস্তায় মানুষের সাথে। ৭৯ সালের মার্চে তার বাবা তাকে সেখানে খুঁজে পেলেন, হাত জোড় করলেন বাড়ি ফিরতে, কিন্তু নিকোলা ফিরলেন না। এ সময়টা তিনি নার্ভাস ব্রেকডাউনে পড়েন।

৭৯ সালেই তিনি ফিরে আসেন আর বাবাও মারা যায় স্ট্রোক করে। সেখানে তার পুরনো স্কুলে পড়াতে লাগলেন টেসলা। ১৮৮০ সালে চাচাদের টাকায় প্রাগ-এ পড়তে যান টেসলা। কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। ভার্সিটিতে রেজিস্ট্রেশন টাইম শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া, ভার্সিটির requirements ছিল যে গ্রিক আর চেক ভাষা জানতে হবে, তিনি এ দুটো তখনও পারতেন না।

৮১ সালে বুডাপেস্টে যান তিনি। সেখানে এক টেলিগ্রাফ কোম্পানিতে কাজ করতে লাগলেন। এখানেই টেসলা তার প্রথম সায়েন্টিফিক কাজ করেন, তিনি টেলিফোনের অ্যামপ্লিফায়ার পারফেক্ট করে তুলেন। কিন্তু কোনদিন সেটার পেটেন্ট নেন নি। ৮৪ সালে থমাস আল্ভা এডিসনের কোম্পানিতে কাজ করতে যান, স্বয়ং এডিসন তাকে হায়ার করেন। নিউ ইয়র্কে। প্রথম প্রথম তার কাজ ছিল সিম্পল ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং আর এরপর ধীরে ধীরে কঠিন সব প্রব্লেম আসতে থাকে। তার কাজ দেয়া হল ডিসি জেনারেটর রিডিজাইন করা। ১৮৮৫ সালে টেসলা বললেন, “আমি এটা আরো ভাল করে বানাতে পারব।”
এডিসন বললেন, “পারলে তোমাকে ৫০ হাজার ডলার দেব।”

মাসের পর মাস কাজ করার পর টেসলা আসলেই কাজটা পারলেন। এডিসনকে তখন তিনি পেমেন্ট দিতে বললেন। হাসিমুখে এডিসনের উত্তর ছিল, “আরে টেসলা, তুমি দেখি আমেরিকান হিউমর বোঝোই না।” টেসলার বেতন কেবল ১৮ডলার/উইক থেকে ২৮ ডলার করে দিলেন এডিসন, এই ছিল তার পুরস্কার। কিন্তু টেসলা সেটানিতে অস্বীকার করলেন। তিনি কোম্পানি থেকে রিজাইন করলেন।

১৮৮৬তে তিনি নিজের “টেসলা ইলেক্ট্রিক লাইট অ্যান্ড ম্যানুফেকচারিং” কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করলেন। সেখানে তিনি ডায়নামো ইলেকট্রিক মেশিন কমুটেটর বানালেন, যেটা ছিল তার প্রথম পেটেন্ট। কিন্তু টেসলার নতুন নতুন জিনিসে ইনভেস্টররা আগ্রহ পেতেন না। টেসলা হয়ে পড়লেন কপর্দকহীন। এক পর্যায়ে তার পেটেন্টগুলোও হাতছাড়া হয়ে যায়। টাকার জন্য তিনি রিপেয়ার জব করে বেড়ালেন, এমনকিদিনে দুই ডলারের বিনিময়ে গর্ত খোঁড়ার কাজও করলেন। ১৮৮৬/৮৭ সালের সেই শীতকালে তিনি ভাবছিলেন, “কী লাভ হল আমার এত পড়াশুনা করে!?”

১৮৮৭ সালে টেসলা দুজন ব্যবসায়ীর সাথে মিলে একটা কোম্পানি করলেন। প্রথমবারের মত সেই ল্যাবে টেসলা এসি কারেন্ট দিয়ে চলা ইন্ডাকশন মোটর চালান, আজকের ইলেকট্রিক দুনিয়ার শুরু সেই ল্যাবেই, টেসলার হাতে। রোটেটিং ম্যাগনেটিকফিল্ডের ধারণাও টেসলা দেন প্রথম, ১৮৮২ সালে।
১৮৮৮ সালে এসি কারেন্ট প্রদর্শন করেন টেসলা। IEEE তে দেখালেন তিনি। সবাই ব্যাপারটা দেখে অবাক হল, ভালভাবেই নিল এই প্রথম। এমনকি ৬০০০০ ডলারের অফার পেলেন পর্যন্ত।

কিন্তু এতে এডিসনের মাথা গরম হয়ে গেল, টেসলার এসি কারেন্ট বাজার পেয়ে গেলে এডিসনের ডিসি কারেন্ট যে মার খেয়ে যাবে। এডিসন এসি কারেন্টকে নামদিয়েছিলন “ডেথ কারেন্ট”; এডিসন লোকাল ছেলেদের পার হেড ২৫ সেন্ট করে দিলেন জীবিত কুকুর আর বিড়াল এনে দেবার জন্য। সেই কুকুর বিড়াল আর একটা হাতি পর্যন্ত পাব্লিকলি এডিসন “টেসলার” এসি কারেন্ট দিয়ে ইলেক্ট্রোকিউট করে মারেন।সবাইকে বোঝানোর জন্য যে, এসি কারেন্ট বিপজ্জনক।

কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও পারলেন না। ১৮৯২ এর মধ্যে নিজের কোম্পানির হেড পদটাও হারিয়ে ফেললেন এডিসন। ১৮৯৪ সালে টেসলা কাজ শুরুকরলেন অদৃশ্য তরঙ্গ নিয়ে। কিন্তু সেটার পেটেন্ট বা কিছুই নেন নি। ১৮৯৫ সালে উইলিয়াম রঞ্জেন সে অদৃশ্য তরঙ্গের নাম দেন এক্স-রে। তখন টেসলা বলেন, তিনি এটা নিয়ে কাজ করছিলেন।

১৮৯৫ সালে, তার ল্যাবের সব কিছু (প্রায় ৫০ হাজার ডলারের জিনিস) আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে যায়। তাই তার এক্স-রের কোন কাজ তিনি দেখাতে পারেন নি। আবার নতুন করে শুরু করেন। রঞ্জেন যখন এক্সরে নিয়ে কাজ করলেন, তখন মানুষ ভেবেছিল এক্সরে-র বুঝি হিলিং ক্ষমতা আছে। কিন্তু টেসলা বললেন, এই তরঙ্গ ডেঞ্জারাস। এটা যেন মেডিকালে ব্যবহার করা না হয় এখনও।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। টেসলার এক্সরে নিয়ে ইন্টারেস্ট শুনে এডিসন লেগে গেলেন এক্সরে নিয়ে। একদম মেডিকাল কাজে। তার এক এমপ্লোয়ি ক্ল্যারেন্স ডালি এত বেশি এক্সরে-তে এক্সপোজড হন যে, তারহাত কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। তাতেও লাভ হয়নি। ক্যান্সারে মারা যান তিনি। তাছাড়া নিজেও নিজের উপর এক্সরে নিয়ে কাজ করলেন, চোখে বারবার এক্সরে মারতে লাগলেন। প্রায় অন্ধই হয়ে গিয়েছিলেন।১৯০৩ সালে এক্সরে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, “খবরদার আমার সাথে এক্সরে নিয়ে আলাপ করবে না। আমি ভয় পাই এক্সরে।”

আমরা জানি যে ইতালির মারকোনি রেডিও আবিষ্কার করেন। কিন্তু জানি না যে তার কাজগুলো ছিল টেসলার কাজের উপরভিত্তি করে!! মারকোনি প্রথম রেডিও মেসেজ পাঠানোর সংবাদ পাবার পর টেসলা বলেছিলেন,“মারকোনি লোকটা ভাল আছে। ওকে কাজ করতে দাও। ও আমার ১৭টা পেটেন্ট ব্যবহার করছে।”

আমরা জানি, ১৯৩৫ সালে রবার্ট ওয়াটসন ওয়াট আবিষ্কার করেন ‘রাডার’। অথচ, ১৯১৭ সালেই সেটার থিওরি দিয়ে যান টেসলা। প্রশ্ন জাগতেই পারে কেবল থিওরি দিয়েই শেষ কেন? করে দেখালেন না কেন? জি না। তিনি করতে গিয়েছিলেন। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ চলছিল। ইউ এস নেভির জন্য এই টেকনোলোজি প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু… কিন্তু, ইউনেভির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এর প্রধান ছিলেন কে জানেন? এডিসন। তিনি টেসলা নাম দেখেই অফার রিজেক্ট করে দেন। মারা গেল এই টেকনোলোজি।

আপনি কি জানেন, হাইড্রো-ইলেক্ট্রিসিটির প্রথম ধারণা দেন টেসলা? তিনিই নায়াগ্রা ফলস থেকে প্র্যাক্টিকাল এনার্জি সোর্স বানানোর কথা বলেন। ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনিয়ারিং উদ্ভাবনের অর্ধ শতক আগেই সেটা নিয়ে কাজ করছিলেন নিকোলা টেসলা! ট্রানজিস্টর বানানোর উপকরণগুলোর পেটেন্ট কিন্তু টেসলারই ছিল। আজকের কম্পিউটার আসতই না এটা ছাড়া। বহির্বিশ্ব থেকে প্রথম রেডিও ওয়েভ ধরেন কে জানেন? টেসলা। কে পৃথিবীর রেজোন্যান্ট ফ্রিকুয়েন্সি আবিষ্কার করেন? টেসলা। [৫০ বছর পর বিজ্ঞানীরা সেটা বিশ্বাস করেন,আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে টেস্ট করে]

টেসলা একটা ভূমিকম্পযন্ত্র উদ্ভাবন করেন। সেটা চালু করার পর নিউ ইয়র্কের একটা নেইবরহুড প্রায় ধ্বংসই হয়ে যায়! বল লাইটনিং বলে একটা জিনিস আছে। মাটির কয়েক ফিট উপরে ভেসে থাকে। এটাও সেই ১৮৯০ এর দশকে টেসলা করে দেখিয়েছিলেন। রিমোট কনট্রোল কে আবিষ্কার করেন? টেসলা।
নিওন লাইট কে উদ্ভাবন করেন? টেসলা। আজকের ইলেকট্রিক মোটর? টেসলা। এমনকি আজকের তারহীন প্রযুক্তিও কিন্তু টেসলারই আবিষ্কার।
এটা নিয়ে একটা মজার ঘটনা মনে পড়েছে। ১৮৯৮ সালে wireless tech দিয়ে তিনি একটা নৌকা চালিয়ে দেখিয়েছিলেন দূর থেকে। ম্যাডিসন স্কয়ারের পাবলিক প্রদর্শনী। লোকজন তো সেটা দেখে আকাশ থেকে পড়ল। এমনকি “জাদু”,“টেলিপ্যাথি”, “ভিতরে কোন বানর চালাচ্ছে”- এগুলো বলতেও থামেনি। টেসলা রেডিও কনট্রোল টর্পেডো দিতে চেয়েছিলন ইউএস নেভিকে। তারা ইন্টারেস্ট দেখায়নি তখন।

টেসলা কথা বলতে পারতেন আটটা ভাষায়। সারবিয়ান, ইংলিশ্ জার্মান, চেক, ফ্রেঞ্চ, হাঙ্গেরিয়ান, ইতালিয়ান আর লাতিন। টেসলা কৃত্রিম বজ্রপাত produce করেছিলেন। সেটারশব্দ এত জোরে হয়েছিল যে ১৫ মাইল দূরে কলোরাডো থেকেও শোনা গিয়েছিল। ১৩৫ ফিট লম্বা মিলিওন ভোল্টের বজ্র। রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ দেখল তাদের পায়ের আশপাশে স্ফুলিঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। পানির লাইন থেকে লাইনে স্ফুলিঙ্গ খেলা করছে। ঘোড়া ছোটাছুটি করছে। প্রজাপতিরা ইলেক্ট্রিফাইড হয়ে যায়, তারা উড়ছে আর তাদের চারপাশে নীলাভ আলোজ্বলছে।
টেসলা দাবি করেছিলেন তিনি চাইলে পৃথিবীতে এমন ভূকম্পন সৃষ্টি করতে পারবেন যে পুরো মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। এমনকি পুরো পৃথিবীকে দুইভাগে স্লাইস করে ফেলতে পারবেন। মারকোনি নোবেল প্রাইজ পেলেও টেসলা কোনদিন নোবেল পাননি। খুশির কথা, এডিসনও পাননি।
১৯২৮ সালে তিনি প্লেন বানান যেটা vertically উড্ডয়ন করতে পারত! এটাই ছিল তার লাস্ট পেটেন্ট।
নিকোলা টেসলার শেষ বয়সের শখ ছিল কবুতরকে খাওয়ানো। ১৯৩৭ সালের শরতে, মধ্যরাতে তিনি নিউ ইয়রকার হোটেল থেকে ক্যাথিড্রাল আর লাইব্রেরির আশপাশের কবুতরদের খাওয়ানোর জন্য বের হন। এমন সময় রাস্তায় এক ট্যাক্সিক্যাব তাকে ধাক্কা দেয়। তিনি পড়ে যান। তার মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড আঘাত পড়ে। তিনটা পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে যায়। টেসলা সারাজীবন ডাক্তার দেখান নি, এটা তার একটা জেদ ছিল। এবারও তিনি ডাক্তার দেখাবেন না বলে জেদ করলেন। তাই তার আসলে কী কী ক্ষতি হয়েছিল আমরা জানি না। টেসলা জানতেও চাইলেন না কে তাকে ধাক্কা দিল, কেবল একটা ক্যাব ডেকে তাকে হোটেলে নিয়ে যেতে বললেন। কয়েক মাস শয্যাশায়ী। তার দুঃখ ছিল যে, তিনি কবুতর খাওয়াতে পারছেন না। ১৯৩৮ সালের বসন্তে টেসলা দাঁড়াতে পারলেন। আবার শুরু করলেন কবুতরদের খাওয়ানো।

এই হোটেলেরই ৩৩২৭ নাম্বার রুমে ১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি মারা যান এই “পাগল বিজ্ঞানী”।
দুই দিন আগে “DO NOT DISTURB” সাইন টানিয়ে দিয়েছিলেন দরজায়। সেই সাইন উপেক্ষা করে হোটেলের মেইড অ্যালিস ভিতরে ঢুকে পড়েন।ঢুকে লাশ আবিষ্কার করেন। করনারি থ্রম্বসিস ছিল তার মৃত্যুর কারণ।

মারা যাবার দুদিন পর এফবিআই তার সব সম্পদ জব্দ করে। এক এমআইটি প্রফেসরকে দিয়ে তার গবেষণার জিনিসপত্র চেক করিয়ে নেয়। প্রফেসর রিপোর্ট করেন যে, ডেঞ্জারাস কিছুই নেই।

টেসলার শেষ কাজটা ছিল কীজানেন? একটা টাওয়ার বানানো যেটা থেকে মানুষ ফ্রি ওয়্যারলেস এনার্জি পাবে। তার স্বপ্ন ছিল একদিন সারা বিশ্ব এভাবে ফ্রি এনার্জি পাবে। কিন্তু সেই টাওয়ার বানানো শেষ করার পর যখন নির্মাতা জানতে পারলেন এটাতে তার আর্থিক লাভ নাই, তখন তিনি টাওয়ার শাট ডাওন করে দিলেন। পুরো বাজেট লস।

টেসলা মারা যান দরিদ্র আর ঋণী অবস্থায়। দুধ আর নাবিস্কো বিস্কুট খেয়েই শেষ দিনগুলো পার করছিলেন সেই হোটেলে। শেষ বয়সে এক ইন্টার্ভিউতে তিনি বলেছিলেন, এক আহত কবুতর প্রতিদিন তার কাছে আসত। তিনি ২০০০ ডলার খরচ করে সেইকবুতরের জন্য একটা ডিভাইস বানিয়েছিলেন তাকে heal করার জন্য। ধীরে ধীরে সেই কবুতরের পাখা আর হাড় ঠিক হয়ে আসে।
সারা জীবন অবিবাহিত ছিলেন টেসলা। কোন নারীর সাথে ঘনিষ্টতাও দেখা যায় নি কোনদিন। তার ধারণা ছিল এটা তার কাজের ক্ষতি করবে। অথচ অনেক নারী তার জন্য পাগল ছিল, কী না করেছে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। কিন্তু টেসলার পাত্তা পায়নি। তিনি বলেছিলেন, “I do not think you can name many great inventions that have been made by married men.”

পৃথিবীতে খুব কম মানুষের ফটোগ্রাফিক মেমোরি আছে। টেসলা তার একজন। পুরো বই তিনি মুখস্ত বলতে পারতেন! হাজার হাজার ডিজাইন তিনি সম্পূর্ণ মনের মধ্যে করে ফেলতে পারতেন। কোনদিন হাতে লিখতেন না। আঁকতেন না। মেমোরি থেকেই সব করে ফেলতেন। কোন ডাইমেনশন কত হবে সব হিসেব নিকাশ মাথাতে করে ফেলতে পারতেন।

১৮৯২ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত নিকোলা টেসলা IEEE (তখন ছিল AIEEE) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মধ্য বয়সে তিনি লেখক মার্ক টোয়েনের বন্ধু হয়ে যান। অনেকটা সময় তারা একসাথে কাটিয়েছেন। মার্ক তার ইন্ডাকশন মোটর দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৩১ সালে এডিসন মারা যাবার পর, নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় শত শত স্তুতিবাক্যের ভীড়ে এডিসনের নামে একমাত্র নিন্দাটা ছিল টেসলার। সারা জীবনের ক্ষোভ তিনি সেখানে মিটিয়ে নেন বটে।

টেসলা কোনদিন দু ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন না। তবে মাঝেমধ্যে “ঝিমাতেন”, তার মতে এটা নাকি তার “ব্যাটারি রিচারজ করে”; স্কুলে থাকতে ৪৮ ঘণ্টা টানা বিলিয়ার্ড খেলেছিলেন। একবার ল্যাবে ৮৪ ঘণ্টা একটানা কাজ করে বের হয়েছিলেন। কিছুই হয়নি তার।
তার সম্মানে ম্যাগনেটিক ফ্লাক্স ইন্টেন্সিটির এসআই একক রাখা হয় “টেসলা”।

জুলাই এর ১০ তারিখ নিকোলা টেসলা দিবস। এডিসন, আইনস্টাইনকে সকলে মনে রাখলেও টেসলাকে কজন স্মরণ করে? ভুল সময়ে জন্মানো এক কিংবদন্তী তিনি।

তথ্যসুত্র: Bangladesh Study forum

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “নিকোলা টেসলা: ভুল সময়ে জন্মানো কিংবদন্তী বিজ্ঞানী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 + = 46