সূর্য দীঘল বাড়ি, উপন্যাস এবং দৃশ্যায়নের এক অনবদ্য পরিস্ফুটন!

‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ এই উপন্যাসটি আমি প্রথম দেখেছিলাম ছোটবেলায় আমার এক জ্যাঠার বাসার বুক শেলফ-এ। অন্য অনেক বইয়ের সাথে সাজানো অবস্থায় এই বইটিও রাখা ছিল একসাথে। কোন এক অজানা কারণে বইটির নাম দেখেই আমার মনে হয়েছিলো অনেক কঠিন কঠিন শব্দ আর কঠিন কঠিন অনেক লাইন থাকবে বইটিতে যার অনেক কিছুই আমি বুঝব না। কিন্তু বইটি পড়ার পর জানলাম আমার চিন্তা ভুল ছিলো। খুব সহজ বোধ্য ভাষায় আবু ইসহাক রচনা করে গেছেন আমাদের জন্য অসাধারণ এই উপন্যাসটি। এই উপন্যাসটি নিয়ে একটা চলচ্চিত্রও বানানো হয়েছিলো আমাদের দেশে। কিন্তু আমার দেখার সৌভাগ্য হলো মাত্র কিছুদিন আগে। আমার অজানা ছিল এই উপন্যাসটি নিয়ে এত অসাধারণ মানের একটা মুভিও বানানো হয়েছে।

এই ধরণের সিনেমাগুলো কেন যেন দেখানো হয় না খুব একটা আমাদের দেশে।পীর-ফকির, তাবিজ-কবজের ভুংভাং, পানিপরা, মেয়েদেরকে পর্দার আড়ালে আবদ্ধ করে রাখার জন্য ধর্মের ব্যবহার, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন, সমাজের প্রতিটি স্তরে ক্ষমতার অপব্যবহার কখনও ধর্মকে আশ্রয় করে কখনও বা আইনের পোশাক পড়ে, কখনও বা শুধুমাত্র পুরুষ হয়ে জন্ম নেওয়ার মিথ্যা অহংকারে; সবকিছুই অনেক সুন্দরভাবে লেখক সাজিয়েছেন থরে থরে এই ‘সুর্য দীঘল বাড়ি’ উপন্যাসে।

আবার সবকিছুই কীভাবে গৌণ হয়ে যায়, পরাস্থ হয়ে যায় ক্ষুধা, দারিদ্র্যতার কাছে তা-ও তুলে ধরেছেন উনার লেখনী দিয়ে। একজন স্বামী পরিত্যক্তা জয়গুনের কাছে সবকিছুর উপর মুখ্য হয়ে দাঁডায় নিজের এবং ছেলেমেয়েদের জন্য একটা মাথা গোজার ঠাঁই, দু’বেলা কোনোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম। জয়গুন অবিচলিত থাকে নিজের বিশ্বাসে, নিজের কর্মে; যাকে সমাজের মোড়লেরা চেয়েছিল কখনও ভয় দেখিয়ে, কখনও লোভ দেখিয়ে আটকে রাখতে আবদ্ধ সমাজের বদ্ধ ঘরে। কখনও পর্দাপ্রথাকে পুঁজি করে একঘরে করে রাখতে চেয়েছিলো, কখনও রাতের আবডালে তাকে সঙ্গিনী হিসেবে পাওয়ার নেশায় প্রলোভনের সুযোগ খুঁজে বেড়িয়েছিল পীর নামক ভন্ড মানুষগুলো থেকে শুরু করে সমাজের ভদ্র চেহেরার মানুষগুলোও। কিন্তু জীবনের শুরু থেকে পোড় খাওয়া জয়গুন ততদিনে শিখে গেছে কীভাবে টিকে থাকতে হয় এই সমাজে, কীভাবে লড়াই করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে হয়। কীভাবে সমাজের ভ্রুকুটিকে অবজ্ঞা করে এগিয়ে যেতে হয়।

জয়গুনের কাছে পরাজিত পুরুষতান্ত্রিক ধর্মমোড়লদের সমাজের মানুষেরা নিজেদের এই পরাজয়ের লজ্জা ঢাকতে গিয়ে একসময় আশ্রয় নেয় অন্ধকারের। পিছন থেকে আঘাত করে পালিয়ে গিয়ে জয়ের স্বাদ পেয়েছে ভেবে পুলক অনুভব করে। যে শিকড়ের টানে জয়গুন ফিরেছিল ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’-তে, মুভির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় সে শিকড় ছিঁড়ে চলে যেতে হয় আবারও জয়গুন এবং তার পরিবারকে। ফিরে যেতে হয় ইট-পাথরের সেই ব্যস্ত শহরে। লোকমুখে প্রচলিত জিন ভুতের ভয়ে নয়; সমাজে দু’পায়ে ভর করে চলা কিছু মানুষের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে।

আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে এখনও রয়েছে এমন অনেক ভন্ড পীর, ভদ্র চেহেরার আড়ালে কুৎসিত মনের অসংখ্য পুরুষ যাদের আসল কুৎসিত দিকগুলো তারা লুকিয়ে রাখে ধর্মের বিধি বিধানকে পুঁজি করে।
তবে জয়গুনেরা ঠিকে থাকার প্রত্যয়ে লড়ে যেতে চায় এইসব কিছুকে উপেক্ষা করে। যদিও জয়গুনদের সংখ্যা থাকে হাতেগোণা কয়েকজন কেবল। আবার খেয়াল করে দেখা যাবে এই সংখ্যা সমাজের ওই তথাকথিত উঁচুতলার চেয়ে নিচুতলায় কেন জানি বেশি খুঁজে পাওয়া যায়। তাই বলে নিচুতলার মেয়েদের নিয়ে আহ্লাদিত হওয়ার কিছুই নেই এই ভেবে যে তারা শিক্ষিত মেয়েদের চেয়ে নিজের অধিকার অনেক ভালো বুঝে। আদতে তারা দারিদ্রতার চাপে পড়েই খাওয়া-পরা, জীবনের মুক্তি খুঁজতে হয়তো সাময়িকভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ে নেমে পড়ে। কিন্তু একজন কর্মক্ষম পুরুষের ছত্রছায়া পেলেই ভুলে যেতে পারে নিজের আলাদা জগতটিকে। মেনে নিতে পারে সমাজের সব ধরনের অসঙ্গতিকে। এইখানেই হয়তো একজন জয়গুনের সাথে তফাত খুঁজে পাওয়া যায় অন্য অনেক সাধারণ মেয়েদের চিন্তা-চেতনায়। জয়গুনকে হারাতে পারে নি গ্রামের জদু প্রধান, জোবেদ ফকিরদের কেউই। খাওয়া-পরা, সোনা-গহনার লোভে নিজের স্বাতন্ত্র্য ত্যাগ করে নি জয়গুন। নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়ে জিতে গেছে জয়গুন।

হয়তো এমন জয়গুনদের ‘জয়ের গান’ গাইতে তেমন কেউ পছন্দ করে না আমাদের পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে; কিন্তু এমন জয়গুনদের নিয়েই নির্দ্বিধায় দেখা যায় এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার স্বপ্ন।

‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ উপন্যাসটি লিখা হয়েছিলো ১৯৫৫ সালে আর এই উপন্যাসটিকে ঘিরে চলচ্চিত্র বানানো হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। যাঁদের বইটি পড়া আছে কিন্তু এই মুভিটি দেখার সুযোগ হয় নি এখনো, তাঁরা দেখে নিতে পারেন অনন্য, অসাধারণ ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ মুভিটি। প্রতিটি চরিত্রে, প্রতিটি মানুষের অভিনয় ক্ষমতা ছিল এক কথায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করার মতো। সাবলীলতা, পরিমিতিবোধ, আবেগের অনাকাঙ্ক্ষিত বাড়াবাড়ি মুক্ত ছিল প্রতিটা দৃশ্য। ‘হাসু’ চরিত্রের সেই ১৫/১৬ বছরের ছেলেটির নৌকাতে ধাক্কা দিয়ে লাফ দিয়ে উঠার দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হয়েছে পরিচালক উপন্যাসের হাসুকে জীবন্ত উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন এই চলচ্চিত্রে। জয়গুণের পানের পিক ফেলার দৃশ্য, ছেলেকে কাছে পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার আনন্দ প্রতিটি দর্শককেও ছুঁয়ে যাবে নির্দ্বিধায়। শুধু জয়গুন আর হাসু নয়, কাসু থেকে শুরু করে মায়মুন, করিম বখশ, গদু, লেদু প্রতিটি চরিত্র ছিল নিজের মতো অনন্য, অনবদ্য। আর এই আবু ইসহাকের লেখা ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ উপন্যাসের সফল চিত্রায়ণ ঘটিয়েছেন অসাধারণ দুইজন নির্মাতা মসিহউদ্দিন শাকের এবং শেখ নিয়ামত আলী।

সিনেমাটি ইউটিউবে দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সূর্য দীঘল বাড়ি, উপন্যাস এবং দৃশ্যায়নের এক অনবদ্য পরিস্ফুটন!

  1. রিভিউটা সুন্দর হয়েছে। নতুন
    রিভিউটা সুন্দর হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের সেরা সাহিত্য আর চলচিত্র গুলোকে তুলে ধরার সত্যিই দরকার আছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1