মানসুখ

ঝোপ জঙ্গলের দিকে এগোনো লোকটাকে দেখেই সুখিয়া চেঁচিয়ে ওঠে, “ইধার নেহি, ইধার নেহি, ইয়ে কবরস্তান হ্যায়।” লোকটা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার জন্যই একটা জায়গা খুঁজছিল। হাসপাতালের পেছনের এ পাশটায় নির্জনতা আর ঝোপ-জংলা দেখেই এগোচ্ছিলো। কিন্তু বাধ সাধলো সুখিয়া। সুখিয়ার কাঁচাপাকা চুল আর দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া চেহারা দেখে যে কেউই ভাববে ভবঘুরে পাগল। তাছাড়া পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে এটা কোন গোরস্থান নয়। লোকটা তাই হয়তো দাঁড়িয়ে পড়লেও চলে যায়না। সুখিয়াও বোঝে লোকটা তাকে মাপতে চাইছে তাই আবার হেঁকে ওঠে, “ইহাঁপার নেহি, ম্যায় কাহা না, ইয়ে কবরস্তান হ্যায়।” তার কণ্ঠে কর্তৃত্ত্বের স্বরে লোকটা পিছু হটে এবার। সুখিয়া কোদালটা নিয়ে জঞ্জালের স্তুপটায় ব্যস্ত হয়ে যায়।

হাসপাতালের ব্যবহৃত গজ-ব্যাণ্ডেজ আর আবর্জনা গুলো এখানেই এনে ফেলা হয়। একটা দীর্ঘ চিমনীওয়ালা চুল্লি আছে এখানে। একটু দূর থেকে দেখলে চিমনী সহ চুল্লিটা একটা বিদঘুটে স্মৃতিসৌধের মত দেখতে লাগে। সুখিয়ার কাজ আবর্জনা গুলো এই চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা। সুখিয়ার পরনে ট্রাউজার আর ছেঁড়া সোয়েটার। দুটোর ওপর দিয়েই সময়, জঞ্জাল আর জীবনের ক্লেদাক্ত নাম না জানা স্রোত বয়ে গেছে। পাগল তো বটেই। নইলে এই আবর্জনা জঞ্জাল নিয়ে লোকটা বছরের পর বছর আছে কি করে। হাসপাতাল কর্মচারীদের বাঁধা ধরা পোষাক আছে কিন্তু সুখিয়াকে কেউই ওসব পরতে দেখেনি। অন্য সব নিয়মও মেনে চলার ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ নেই। চাকরীটা আছে কেননা যে কাজ সে করে তাতে তার ফাঁকি নেই এক বিন্দুও। চুল্লির আগুন নিভে গেলে ছাই-ভস্ম গুলো চুল্লি থেকে বের করে একপাশে রেখে দেয়। সিটি কর্পোরেশনের গাড়িটা এলে ওরাই এই ছাইগুলো নিয়ে যায়।

সুখিয়ার কাছে শহীদ কাম্পুটারবাবু। কম্পিউটার কি জিনিস সুখিয়া কি বোঝে? শহীদের মনে হয় হয়তো বোঝে খানিকটা। শহীদ ডাক্তার নয় আবার কারণে অকারণে ধমক-ধামক দেবার মত হাসপাতালের কর্মকর্তা বা সর্দার গোছেরও কেউ নয়। একটা নিরিহ কর্মচারী বলেই হয়তো সুখিয়ার রাজ্যে শহীদ একটা বিশেষ ছাড় পেয়ে আসছে। হাসপাতালের পেছনেই গাছ গাছালি আর জংলায় ভর্তি জায়গাটা। এর মধ্যে দিয়েই একটা ইঁটের সরু পথ চুল্লিটা পর্যন্ত গেছে। দু’পাশের ঘাস জঙ্গল ক্রমে আরো এগিয়ে এসে সেই সরু পথটাও আরো সংকীর্ণ করে ফেলেছে। নিয়মিত আবর্জনার সরু ট্রলিটা না চললে হয়তো ইঁটের রাস্তাটাকে কেউ আর খুঁজেও পেতোনা। শহীদের বেশ লাগে এই গাছপালা ঘেরা নির্জন জয়গাটা । কম্পিউটার অপারেটরের চাকরী। একটু ফাঁক পেলেই তাই এখানে এসে একটা সিগারেট ধরায়। হাসপাতালে ধুমপান নিষেধ, কঠোর আইন। এই জায়গাটা সেই অর্থে শহীদের জন্য মুক্তাঞ্চল। সিগারেটটা শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রকৃতির মধ্যে ডুবে থাকে তারপর দ্রুত পায়ে কাজের জায়গায় ফেরে।

এখানে আসতে আসতেই সুখিয়ার সাথে জানা শোনা হয়ে গেছে। সুখিয়া কারো সাথেই বিশেষ কথা টথা বলেনা।কিন্তু তার কাছেও কাম্পুটার বাবুটা ভালো, এখানে যখন তখন এলেও চুপচাপ বিড়ি ফুঁকে চলে যায়। কারো সাতে পাঁচে নেই। কিন্তু অন্য কারো এখানে ঘোরাঘুরির অধিকার নেই। হাসপাতালের রোগীর লোকদের কেউ এদিকটায় ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লেই চেঁচিয়ে উঠবে সুখিয়া। হাতের বেলচাটা ধরে রেখেই অপেক্ষা করবে লোকটার চলে যাওয়া পর্যন্ত। প্রথম যখন শহীদ সুখিয়াকে বলতে শোনে “ইয়ে কবরস্তান হ্যায়” তখন একটু শিউরেই উঠেছিল। জায়গাটা কোন মতেই গোরস্থানের মত নয়। ফলক টলকতো নেইই তাছাড়া কোন জায়গা বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা পর্যন্ত নেই। সুখিয়াকেও পাগলই ভেবেছিল। পরে জেনেছে মিথ্যে বলেনি সুখিয়া। অপারেশন থিয়েটারের পেছন থেকেই শুরু হয়ে গেছে এই জঙ্গল। প্রায় সময়ই ম্যাটার্নিটির ওটি থেকে মৃত শিশুদের এখানে এনে পুঁতে ফেলা হয়েছে এক সময়। এটাও অবাক লাগে শহীদের। জন্মের সময়ই শিশু মারা যাবার ব্যাপারটা স্বাভাবিক কিন্তু ওর মনে হয় ঠিক এইখানেই শিশুর লাশটা ফেলে যাবার মানে কি। বাবা-মা তো চাইবেই শিশুটিকে নিজের গ্রামে নিজের এলাকায় নিয়ে কবরস্থ করতে। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও পারেনা। হয়তো কোন পরিবার বাচ্চা হওয়ার ব্যাপারটাই গোপন রাখতে চায়। বিপদে পড়ে হয়তো প্রসুতিকে হাসপাতালে আনতেই হয়েছে কিন্তু মৃত শিশুটিকে নিয়ে আর কোন ঝামেলা পোহাতে চায়না। কতরকম মানুষ আছে পৃথিবীতে। একেক জনের পরিস্থিতি একেক রকম।

মাঝে মাঝে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি স্বাস্থ্য সচিব বা উপরওয়ালা কেউ হাসপাতাল পরিদর্শনে এলে হাসপাতাল জুড়ে জোর পরিচ্ছন্নতা অভিযানের শুরু হয়ে যায়। ওয়ার্ডের ভেতরে বাইরে সাফসুতরো করার হিড়িক পড়ে যায়। বারান্দা-করিডোর জুড়ে ফিনাইলের স্রোত বইতে থাকে। সেই সঙ্গেই কারো খেয়াল পড়ে যায় হাসপাতালের পেছনের এই আগাছার জঙ্গলটার কথাও। ব্যাস দা-কাস্তে নিয়ে হাসপাতালের ডে-লেবারদের এক অংশ নেমে পড়বে এই ঝোপ-জঙ্গল কাটতে। এরকমই একটা সময় শহীদ প্রথমবারের মত সদ্যোজাত মৃত শিশুদের কবর গুলো দেখে। আহামরি কিছু নয়। দায়সারা মত গোল করে গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। এক সময় হয়তো ছোট ছোট মাটির ঢিবি ছিল কিন্তু এখন প্রায়ই মাটি বসে গিয়ে বেশির ভাগ গর্তই বেরিয়ে পড়েছে। এগুলো বুঁজিয়ে দেবার কেউ নেই। তার দরকারও বোধ করেনা কেউ। কেননা সারা বছর আগাছার ঝোপের নিচেই এসব কবর আড়াল হয়ে থাকে। আর গর্ত গুলোতেও দেহাবশেষ বিশেষ কিছু আর নেই। অন্তত চোখে পড়েনা। হয়তো কুকুর-শেয়ালে হাড়গোড় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। কিংবা হতে পারে বাচ্চাদের হাড়গোড় মাটির সাথে এমন ভাবে মিশে আছে যে একটু খুঁটিয়ে না দেখলে ওগুলোকে আলাদা করে চেনা যায়না। শহীদ অবশ্য সেসব খুঁটিয়ে দেখতে ইচ্ছুক নয়। কখনও সখনও অপারেশনে কেটে ফেলা হাত, পা, আঙ্গুল বা অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও এখানে মাটি খুঁড়ে পুঁতে ফেলা হয়। বিচিত্র গোরস্থান। কবর গুলোর এই উন্মুক্ত অবস্থাটা শহীদের তেমন ভালো লাগেনা। অবশ্য কিছু দিনের মধ্যেই আবার আগাছা জন্মে জায়গাটা আগের মতই সবুজ হয়ে ওঠে। আগাছার তলায় তলায় ছোট ছোট গর্ত গুলোকে আর চোখে পড়েনা।

কাজের ফাঁকে সিগারেট টানার অবসরে যেটুকু আসা তা থেকেই সুখিয়ার সাথে বেশ একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেছে শহীদের। কথা বার্তা ওর সাথেও খুব একটা বলেনা সুখিয়া, তবে দেখা হলেই মাথা ঝাঁকায়, দাড়ি-গোঁফের জঙ্গলে হালকা একটা ঢেউ উঠেই মিলিয়ে যায়। হয়তো এটাই তার হাঁসি অথবা হতে পারে এই হাঁসির পুরোটাই শহীদের কল্পনা। শহীদ এখানে এলে লোকটা যে চেঁচিয়ে ওঠেনা, বিচলিত হয়না এতেই সে সন্তুষ্ট। হাসপাতালের অন্য কর্মচারীরা আবর্জনা ফেলতে বা অন্য কাজে এলেও সুখিয়া কাজ থামিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য রাখতে থাকে। বোঝাই যায় এই সব লোকের উপস্থিতি সে সহজ ভাবে নিচ্ছেনা। লোক গুলোও বেশিক্ষণ থাকেনা। তাদের কাজ সেরে দ্রুতই এখান থেকে চলে যায়। এই সব গাছগাছালির প্রতি আগ্রহটা যেন শহীদের একারই। অন্যদের কাছে জায়গাটা ভিষন রকম নোংরা। হাসপাতাল অফিসের জব্বার সাহেব মাঝে মাঝেই বলেন “আপনি কি যে পান ঐ জায়গাটায়, বলি এই বেলা সিগারেট ছাড়েন। পান-জর্দা ধরেন। অন্তত এইটা খাওয়ার জন্য ঐ নোংরা জায়গায় গিয়ে মুখ লুকাতে হবেনা।” হাতের পানের বোঁটার ডগায় সাদা চুন মাখানো, সেটা নাচিয়েই কথা গুলো বলেন। মুখের হাঁসিটা শতভাগ আন্তরিক। মন্দ নয় লোকটা।

সুখিয়ার ভালো নাম মানসুখ। শুধুই মানসুখ, পদবী কারো জানা নেই। কোথা থেকে এসেছে কেউ জানেনা। পুরনো লোক। যারা চাকরী দিয়েছে তাদের কেউ বদলী হয়ে গেছে, কেউ হয়তো অবসরও নিয়ে ফেলেছে। তার সম্পর্কে কারোরই তাই বিশেষ কিছু জানা নেই। মানসুখকে কে প্রথম সুখিয়া ডেকেছিল সেই ইতিহাসটাও কারো স্মৃতিতে নেই। লোকটার ব্যাপারে আসলে কারোরই বিশেষ আগ্রহ নেই। বাংলা ভাষাভাষিদের মধ্যে বাস করতে থাকলে অবাঙ্গালীদের জীভেও বাংলা চলে আসে, কিন্তু মানসুখের বেলা তা হয়নি। বোঝাই যায় কারো সাথেই আলাপচারিতার ইচ্ছে কখনওই এই মানুষটার হয়নি। চিমনী খাড়া করা মর্চে পড়া কালচে রঙের চুল্লিটারই একটা অংশ সুখিয়া। জঞ্জালের স্তুপের মধ্যে নড়াচড়া করা জীবন্ত অবর্জনার মতই লোকটার অস্তিত্বটাই শুধু সবাই মেনে নিয়েছে , তাকে সামাজিক আর দশটা মানুষের কাতারে ফেলে দেখবে সে সময় কারো নেই। শহীদও কি ভাবে? আট দশটা বাবলা, মেহগনি, নাম না জানা আরো কয়েকটা গাছ আর কোমর পর্যন্ত উঠে আসা আগাছার জঙ্গলের এই টুকরোটার সাথেই মানসুখের নীরব উপস্থিতি শহীদের কাছে লোকটাতো এই পর্যন্তই।

সবাই যে যার জীবন নিয়েই ব্যস্ত। ইদানীং শহীদের কাজের চাপও বেড়েছে। সরকারী দফতর গুলোয় ডিজটাল ঢেউ লেগেছে। রোগীদের তথ্য-উপাত্ত এখন আর কাগজে লিখে রেকর্ড রুমে ফেলে রাখার উপায় নেই। ডাটাবেজ চাই। যে কোন সময় দেখা চাই এমাসে, এ বছরে কত রোগী কি সমস্য নিয়ে হাসপাতালে এলো, কি চিকিৎসা পেলো আর কয়জনই বা সব রকম চিকিৎসার ওপারে চলে গেলো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও এই সেদিন বিশেষ নির্দেশ নামা এসেছে। সরকারী তথ্য ভাণ্ডারে সব রকম নথি পত্র, হিসাব নিকাশ সময় মত সরবরাহ করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে রেকর্ড রুমের কাগজ গুলো ঠিকমত নেই। অনেক তথ্যেরই হদিস নেই। কম্পিউটার অপোরেটরের বিপদ হলো সবাই অপারেটরকেও আরেকটা যন্ত্রই মনে করে। তাই হাসপাতালে যেখানে শিফট্ ধরে কাজ চলে সেখানে কম্পিউটার অপারেটরকে মাঝে মাঝেই শিফট্ ডিঙিয়ে সন্ধ্যা, রাত পর্যন্তও কি-বোর্ড ঠুকে যেতে হয়।

জব্বার সাহেব সাধ্য মত সাহায্য করছেন। আমুদে লোকটা রেকর্ড রুমের কাগজপত্র সাজিয়ে দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অসুস্থ শরীরে প্রায়ই সন্ধ্যার পরও থেকে যাচ্ছেন শহীদের জন্য। শহীদ অবশ্য একরকম ঠেলেই তাকে বাড়ি পাঠাতে চেষ্টা করে। এমনিতেই ডায়াবেটিসের রোগী তার উপর প্রেসারও আছে। বয়সও কম হয়নি, দু’চার বছরের মধ্যেই এলপিআরে যাবেন। শহীদের আজ বাড়ি ফেরার উপায় নেই। জব্বার সাহেব কাল সকাল সকাল এসেও সাহায্য করতে পারবেন কিন্তু উনি অসুস্থ হয়ে পড়লে শহীদের সমূহ বিপদ। সুতরাং জব্বার সাহেবকে অন্তত আরো দুটো দিন সুস্থ রাখতেই হবে। এক রকম জোর করেই লোকটাকে বাড়ি পাঠায় শহীদ। আজ রাতটা এখানে থেকে সে কাজটা এগিয়ে রাখতে পারলে কাল রাতের মধ্যেই আশা করছে সব গুছিয়ে ফেলতে পারবে। কিন্তু জব্বার সাহেব কাল অসুস্থতার জন্য অফিসেই না আসতে পারলে সর্বনাশের চুড়ান্ত হবে।

রাত হয়েছে। এ সময়টায় অফিসে কেউ থাকেনা। অন্যদিন হলে শহীদও থাকতোনা কিন্তু ক’দিন থেকেই সন্ধ্যার পরও তাকে থাকতে হচ্ছে। আজ সারাটা রাতই থাকতে হবে। কম্পিউটার রুমটা ছাড়াও রেকর্ড রুমটা তাই খোলা রাখা হয়েছে। পরিচালকের রুমটার চাবিও ওর কাছেই; ও ঘরে কিছু জরুরী ফাইল এনে রাখা হয় ওগুলোও কাজে লাগবে। অফিস ফাঁকা হলেও হাসপাতাল গমগম করছে। লোক আসছে যাচ্ছে। এমারজেন্সি থেকে মাঝে মাঝেই লোকজনের চিৎকার, শোরগোলের সঙ্গেই ট্রলির গড় গড় শব্দে বোঝা যাচ্ছে নতুন রোগী এলো। যারা নাইট ডিউটিতে আছে তাদের কয়েকজনকে বলা আছে শহীদের প্রয়োজনে যেন কাজ টাজ করে দেয়।

ক্লান্তি আর অবসাদ কাটাতে শহীদ কামরা ছেড়ে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো। ধুমপান নিয়ে হম্বি তম্বি করার মত লোক এখন কেউ নেই। এইখানেই সে নিশ্চিন্তে একটা সিগারেট ধরিয়ে টানতে পারে। পরিচালক স্যার বা অন্য স্যাররা কেউই নেই। তাছাড়া এসময় সিনিয়র ডাক্তার, প্রফেসররাও তেমন থাকেননা। কিন্তু অনেক দিনের অভ্যেস বলেই সে পারেনা। কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়ার জন্য শরীরটা আকুপাকু করে। কাছেই সিকিউরিটি গার্ডদের একজনকে কামরাটা খেয়াল রাখতে বলে হাসপাতালের পেছনে যাবার জন্য হাঁটা শুরু করে। অপারেশন থিয়েটারের সামনে দু’জন ডাক্তারকে দৌড়ে ওটিতে ঢুকতে দেখে। সম্ভবত সড়ক দুর্ঘটনার রোগী এসেছে, এমারজেন্সি কল। রোড এ্যক্সিডেন্ট জিনিসটা যে কখনওই থেমে থাকেনা তা হাসপাতালে থাকলেই বোঝা যায়।

দিনের বেলা জায়গাটা যেমন সবুজ হয়ে থাকে সন্ধ্যার অন্ধকারে সে সৌন্দর্য্যটা আর সেভাবে মন ভোলায়না। তবু পরিচিত জায়গাটার একটা স্বস্তিকর অনুভূতি আছেই। এখানে আসা মাত্র মাথাটা আশ্চর্য ভাবেই হালকা লাগে। এদিকটায় আলো নেই তবে হাসপাতালের আলোর একটা আভা এসে পড়ায় একেবারে ঘোর অন্ধকার অবস্থা নেই। সুখিয়া চুল্লি কিংবা তার ঘরটার কাছাকাছি কোথাও বোধহয় আছে। হয়তো একা একা বসে গাঁজার কল্কে নিয়ে বুঁদ হয়ে আছে। আগাছার জঙ্গল আর গাছপালায় এই অন্ধকারে সুখিয়াকে দেখা যাবার কথা নয়। শহীদ তাকে খুঁজতেও চায়না। থাকুক লোকটা শান্তি নিয়ে তার নিজের মত। ট্রাউজারের পকেট থেকে প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট বের করে।

দিনের বেলায় যে জায়গাটা ঘন সবুজ রঙে মন মাতিয়ে রাখে অন্ধকারে তার চেহারাটা চেনা যায়না। এর আগেও সন্ধ্যার দিকে শহীদ এখানে এসেছে। এতরাতে আসা এই প্রথম। সিগারেটের তৃপ্তিটা পেলেও জায়গাটা এখন কেমন যেন ভালো লাগেনা। হঠাৎ সর সর শব্দে চমকে ওঠে। একটু দূরে আগাছার জঙ্গলের নড়াচড়ায় টের পায় ঝোপ জংলার নিচে কোন ছোট খাটো প্রাণী ছুটে গেল। আগাছা আর লতাগুল্মে জায়গাটা এমন ভাবে ঢেকে আছে যে বোঝা যায়না কি প্রাণী। কুকুর বিড়াল হবে কি? এই জায়গাটায় কুকুর কখনও দেখেনি শহীদ। আর বিড়াল হাসপাতালে প্রচুর থাকলেও তারা ওয়ার্ডের আশেপাশে ফেলে দেওয়া খাবারের কাছাকাছিই থাকে সব সময়। এই জঙ্গলে তাদের আসার কোন কারণই নেই। সম্ভবত মেঠো ইঁদুর হবে কিংবা বেজি। আরো বেশ কয়েকবার ঝোপের নড়াচড়া চোখে পড়লো। ইঁদুর গুলোকে দেখা না গেলেও আগাছা গুলোর নড়া চড়া দেখে বেশ বোঝা যায় কোন দিক থেকে ওরা কোন দিকে ছুটছে।অনেকক্ষণ ধরে কাজ করার ক্লান্তি আর অবসাদ তার উপর কত ভারি হয়ে চেপেছে তা বেশ বুঝছে সে। এই ঝোপ ঝাড়ের একটু সর সর শব্দেই কেমন চমকে চমকে উঠছে সে।

সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছে প্রায় ঠিক এমন সময় আবছা আলোয় সর সর শব্দ তুলে আগাছা গুলোকে আবার নড়ে উঠতে দেখে শহীদ। গাছপাতার আন্দোলন দেখে বেশ বোঝে ও যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে সেদিকেই নড়াচড়াটা ছুটে আসছে। কুকুর নয়তো। এরকম নিঃশব্দেই বা কুকুর ছুটে আসবে কেন? “বাবু?” শব্দটায় সে ভয়ানক ভাবেই চমকে ওঠে। পেছনে সুখিয়া এসে দাঁড়িয়েছে। ওকে দেখে আস্বস্ত হয় কিন্তু বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা তখনও হাতুড় পিটছে। সারা শরীর তখনও একটু একটু কাঁপছে। সুখিয়ার শরীর থেকে গাঁজার গন্ধ আসছে কিন্তু সে গন্ধটা যেন তাকে অদ্ভুত স্বস্তি দিচ্ছে। “ইতনি রাত গেল বাবু, ঘর নেহি গ্যায়ে?” সুখিয়ার কথায় আরো খানিকটা সহজ বোধ করে সে। তার মনে হয় সে খুব উঁচু একটা খাদের ধারে পা ফসকে পড়ে যেতে বসেছিল সুখিয়া এসে খপ্ করে ওকে ধরে ফেলেছে। কেন এমন মনে হলো বলতে পারবেনা। “কাজ করছি সুখিয়া, সারা রাতই কাজ করবো আজ আর বাড়ি যাওয়া নেই।” সিগারেটটা ফেলে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায় শহীদ। ঝোপের মধ্যে আর কিছু নড়ছেনা এখন। ওর দৃষ্টি অনুসরন করে সেদিকে তাকিয়ে সুখিয়া বলে “ই জায়গাটা ভালো না বাবু, রাতমে ইহাঁপার আনা হো তো মুঝে জরুর আওয়াজ দিজিয়েগা। একেলা ইস জাগা পার রেহনা আচ্ছা নেহি।”

“কেন সুখিয়া, এ জায়গাটাতো ভালোই লাগে।” বলতে বলতে শহীদ ইঁটের সরু রাস্তাটার ওপরই বসে পড়ে আরেকটা সিগারেট ধরায়। হাঁটুর কাপুনিটা আর নেই কিন্তু কোত্থেকে যেন একরাশ ক্লান্তি এসে ওর উপর ভর করে। এক্ষুনি কাজে ফিরতে মন চায়না, সুখিয়ার সাথে খানিকক্ষণ কথা বললে হয়তো ভালো লাগবে। আজ সুখিয়াও বেশ কথা বলছে, তাও নিজে থেকেই, এও কম কি। সুখিয়াও বসে পড়ে ওর সামনেই। “কাম্পুটার বাবু ইয়ে জাগা দিনমে এক অউর রাতমে এক। ইহাঁপার আজিবসি কুছ চিজ দাফনায়ে গ্যায়ে হ্যায়। লোগ সামাঝতে জমিনপে গাড় দেনেসে সব কুছ খতম হো যাতা।” আজব কথা বলছে সুখিয়া। মাটিতে পুঁতে ফেলার পর আর কি থাকে? “কিসিকো হাত, কিসিকো পা, কিসিকো উঙ্গলি, কিসিকো অউর কুছ্ । ভগওয়ান জানে অউর কৌন কৌন চিজ ইহাঁপার ফেক গয়া সবনে।
জিন্দা জিসম্ সে জুদা হোনেকে বাদ ভি কুছ সাঁস্ আভি ভি ইয়েসব টুকড়েপে আটাক হ্যায়। ইয়ে সাঁস আচ্ছে চিজ নেহি বাবু। শো রাহা বাচ্চেলোগ ভি নিদসে জাগ যাতে। উনলোগোঁকো জাগনা নেহি চাহিয়ে। মাগার ইয়ে সব বাত মালুম হোতা কিসিকো সামাঝ্ হি নেহি আতা।” একটা লম্বা করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সুখিয়া। ঝিরঝির করে সুখময় একটা বাতাস বইতে শুরু করে। ভালো লাগছে এখন। এইখানে বসে বাতাসে গা এলিয়ে তাই উপভোগ করে শহীদ। হাসপাতালের দিক থেকে টুকরো টাকরা মানুষের গলার আওয়াজ, ট্রলির চাকার ঘড় ঘড় শব্দ কিছুটা স্তিমিত হয়ে ভেসে আসছে। শহীদের মনে হয় সুখিয়া নিজের কথা কিছু বলুক। থাক এইসব মাটির নিচে পুঁতে রাখা হড়গোড়ের কথা। কিন্তু সুখিয়াও চুপ করে গেছে।

অনেকক্ষণ হলো আর বসা যায়না, কাজ পড়ে আছে প্রচুর। শহীদ উঠবে ভাবছে ঠিক তখনই বিচিত্র একটা শব্দ করে লাফিয়ে ওঠে সুখিয়া। দু’ধাপ এগিয়েই পাথরের মত দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কিছু একটা ওর চোখে পড়েছে নিশ্চয়। অন্ধকারের মধ্যে আবছা যে টুকু আলোর আভা তাতে তার থেকে কয়েক গজ দূরে সুখিয়ার পেছন দিকটা শুধু দেখতে পাচ্ছে শহীদ। ঝোপের মধ্যের ইঁদুর গুলো অথবা বেজি গুলো চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কিছুটা জায়গা জুড়ে ঝোপ-জঙ্গল গুলো ভিষন নড়ছে। বিচিত্র কিচমিচ শব্দ আসছে ওখান থেকে। চাপা গলায় কাউকে ধমকাতে থাকে সুখিয়া, “যাহ্ , যাহ্ ইধারসে”। কিন্তু তার গলায় সেই দিনের বেলার জোরটা নেই। যে কর্তৃত্তের সুরে সে এখানে আসা লোক গুলোকে এখান থেকে সরিয়ে দেয় সেই সুরটা আসেনা। শহীদের মনে হয় সুখিয়া ভয় পাচ্ছে খানিকটা। কিছু দূরে বিড়ালের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। ঠিক যে রকম আওয়াজ রাত্রে শুনলে মনে হবে একটা বাচ্চা কোথাও কাঁদছে বুঝি।

শহীদের ভালো লাগেনা। এই একটু আগের ঝির ঝিরে বাতাসটাও হুট করে বন্ধ হয়ে গেছে। “বাবু, ইহাঁসে যাইয়ে বাবু, ইধার আপকা জিয়াদা দের রুখনা আচ্ছা নেহি হোগা”, সুখিয়া শহীদকে তাড়া দেয় কিন্তু সে শহীদের দিকে না তাকিয়ে এখনও অন্ধকার ঝোপ-জঙ্গলের দিকে চেয়ে আছে। আবার সে চাপা গলায় ধমকায় কাউকে “যাহ্, যাহ্ ইধারসে”। একা থাকা মানুষ গুলো অপ্রকৃতস্থই হয় অনেকটা। সুখিয়াকে বদ্ধ পাগল না ভাবলেও ঠিক আর দশটা মানুষের মত সুস্থ-স্বাভাবিক শহীদও ভাবেনা। কিন্তু এই এখনকার অপ্রকৃতস্থ আচরন শহীদকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। সুখিয়া কি সত্যি কিছু দেখতে পাচ্ছে? পেছনে হাসপাতালের আলোকোজ্জ্বল জগৎ আর সামনে অন্ধকারের ভেতর সুখিয়া কোন এক অদৃশ্য অস্তিত্বকে ভাগাতে চাইছে। শহীদকে যে আন্তরিকতা নিয়ে এখান থেকে দ্রুত চলে যেতে বলছে সেই আন্তরিকতাই শহীদের বুকের ভেতর একটা কাঁপুনি তুলে দেয়। সত্যিই কি কিছু আছে ওখানে? কি?

ঠিক সেই সময় ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ওগুলো। কুকুর ছানার মত লাগলো। সুখিয়ার পয়ের কাছে এগিয়ে এলো ওগুলো। কিন্তু কেমন যেন অনেকখানি ধীর গতিতে। কুকুরছানা যেভাবে দৌড়ে আসে তেমন ভাবে নয়। বিচিত্র একটা শব্দ করে সুখিয়া। পেছনে ঘুরে শহীদকে দেখে ধমকে ওঠে, “আপ আভি ভি ইহাঁপার, ভাগিয়ে বাবু, ভাগিয়ে।” ওর কণ্ঠে কি যেন ছিল। শহীদ আর দেরী করেনা, ঘুরেই প্রায় ছুটতে শুরু করে। দ্রুত পা চালাতে থাকে শহীদ। কুকুর ছানা নয় আবছা আলো-আঁধারিতেও হামাগুড়ি দিয়ে ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসা ওদের দেখা যাচ্ছিল। আর তখনই সারা শরীর পাথরের মত জমে যায় শহীদের। জীবনে এতখানি ভয় সে কখনওই পায়নি। সুখিয়ার ধমকে যন্ত্রের মতই তার দেহ হাসপাতালের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল। সদ্যোজাত শিশুদের সে এর আগে কখনওই এভাবে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঝোপ থেকে বেরোতে দেখেনি। নিশ্চিত আর দেখবেওনা কখনও। হাসপাতালের আলোর মধ্যে পৌঁছে একবার পেছনে ঘুরে দেখতে চেষ্টা করে। অন্ধকারে সুখিয়াকে দেখা যায়না।

জঞ্জাল পোড়ানো চুল্লিটার পাশেই সুখিয়ার লাশ পাওয়া গিয়েছিল পরদিন। দায়সারা পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে বলেছে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ায় মৃত্যু। বাহুতে, পায়ের গোড়ালি আর গলার কাছে কিছু অগভীর ক্ষতও অবশ্য ছিল। কোন ছোট খাটো জন্তু জানোয়ারের কামড়, সম্ভবত মেঠো ইঁদুর। তবে এই কামড়ের দাগ গুলো নিয়ে কেউই বিশেষ ভাবেনি।বেঁচে থাকতে এই মানুষটাকে নিয়েই বা কয়জন ভেবেছিল। কয়েকদিন পরই শহীদের বদলির অর্ডার আসে। মানসুখের লাশটা মর্গের হিমাগারে রাখাছিল বেশ কিছু দিন। শহীদ মর্গে নির্দিষ্ট ড্রয়ারটার সামনে গিয়েও মত পাল্টায়। সে দেখতে চায়না। দ্রুত পায়ে মর্গ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তার কানে বাজছিলো, “ইধার নেহি, ইধার নেহি, ইয়ে কবরস্তান হ্যায়”।

শেষের কথা :
শোনা যায় কম্পিউটার অপারেটর শহীদুল ইসলামকে অসুস্থতার জন্যই চাকরী থেকে অবসর নিতে হয়। কাজের অত্যাধিক চাপেই সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অবিবাহিত ছিল এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা যায় কিছুটা একাকী থাকতেই ভালোবাসতো সে। অবসর নেবার বছরেই সেপ্টেম্বর মাসের দিকে কোন এক রাতে হাসপাতালে কাজ করবার সময় তাকে কোথাও থেকে দৌড়ে কম্পিউটার কক্ষে প্রবেশ করতে দেখে সিকিউরিটি গার্ডদের দু’একজন। তারা ঐ কামরায় প্রবেশ করলে তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে এবং ডাক্তারদের খবর দেয়। অপ্রকৃতস্থ অবস্থায় সে বার বার সুখিয়া ও মানসুখ নামের কাউকে খুঁজছিলো বলেও শোনা যায়। হাসপাতাল কর্মচারী বা তার সহকর্মীরা মনে করেন এই সুখিয়া তার পূর্বপরিচিত অথবা পারিবারিক সম্পর্কের কেউ হতেই পারেন, হাসপাতালে যারা কাজ করে তাদের তালিকায় এই নামের কেউ কখনওই ছিলনা। শেষ পর্যন্ত যা জানা যায় সে অনুসারে শহীদুল ইসলাম একটা সাইকিয়াট্রিক ক্লিনিকে অনেক দিন যাবত চিকিৎসাধীন ছিলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “মানসুখ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 19 = 20