একটি মহাজাগতিক রহস্য গল্প: সূচনা ( প্রথম পর্ব)

/800px-Andromeda_Galaxy_%28with_h-alpha%29.jpg” width=”400″ />
(ছবি:অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী (M31); আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সীর কাছাকাছি অবস্থিত সবচেয়ে মেজর গ্যালাক্সী।)

(*লেখাটি তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী ও কসমোলজিষ্ট লরেন্স ক্রাউস (Lawrence Krauss) এর A Universe from Nothing: Why There is Something Rather Than Nothing এর প্রথম অধ্যায় A Cosmic Mystery Story: Beginnings এর অনুবাদ প্রচেষ্টা। বর্তমানে তিনি অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এবং Origins Project এর পরিচালক। লেখাটি ২০১২ সালে মার্চে লেখাটি নিজস্ব ব্লগের জন্য লিখেছিলাম, এটি তার পুনসম্পাদিত রুপ।)

যে কোনো যাত্রা শুরুর সাথে প্রথম যে রহস্যটি যুক্ত থাকে, সেটি হচ্ছে: যাত্রা শুরুর সেই বিন্দুতে ভ্রমনকারী প্রথমে কেমন করে পৌছেছিলেন। (লুই বোগান, জার্নি অ্যারাউণ্ড মাই রুম)

সেই রাত ছিল অন্ধকার আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ।

১৯১৬ সালের শুরুর দিকে, আলবার্ট আইনস্টাইন তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম কাজটি কেবল শেষ করেছেন, মাধ্যকর্ষণের নতুন একটি তত্ত্বে পৌছানোর জন্য প্রায় এক দশক ব্যপী সুতীব্র বৌদ্ধিক একটি সংগ্রাম, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন জেনারেল থিওরি অব রিলিটিভিটি। তবে অবশ্য এটি শুধুমাত্র মাধ্যাকর্ষণের একটি নতুন তত্ত্বই ছিল না, এছাড়া এটি ছিল মহাশূন্য এবং সময়ের বা টাইম এবং স্পেসেরওে একটি নতুন তত্ত্ব। এবং এটাই ছিল প্রথম কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা, মহাবিশ্বে একটি বস্তু কেমন করে তার অবস্থান পরিবর্তন করছে, সেটাকেই শুধুমাত্র ব্যাখ্যা করেনি, এই মহাবিশ্বটি নিজেই কেমন করে বিবর্তিত হতে পারে, তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিল।

তবে, একটি সমস্যা ছিল। যখন প্রথম আইনস্টাইন পুরো মহাবিশ্বকে সামগ্রিকভাবে ব্যাখ্যা করতে তার তত্ত্বটিকে প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলেন, তখন একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তত্ত্বটি যে মহাবিশ্বে স্পষ্টত আমরা বাস করছি, সেটি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।

এখন, প্রায় একশ বছর পর, সম্পূর্নভাবে মূল্যায়ন করা খুবই কষ্টসাধ্য, একটি মানব জীবনকালের সংক্ষিপ্ত ব্যপ্তিতে এই মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের ধারণা কি সুবিশাল পরিমানে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯১৭ সালের বৈজ্ঞানিক সমাজে বিদ্যমান যে ধারণাটি ছিল, এই মহাবিশ্ব স্থির এবং চিরন্তন অপরিবর্তনশীল, যা তৈরী করেছে শুধুমাত্র একটি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সী, আমাদের মিল্কি ওয়ে, যাকে ঘিরে আছে সুবিশাল, অসীম, অন্ধকার এবং সম্পুর্ণ মহাশূন্যতা। কারণ,এটুকুই কেবল, আপনি অনুমান করতে পারবেন খালি চোখে , কিংবা কোনো ছোট টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আকাশের দিকে তাকিয়ে, আর সেই সময় এছাড়া অন্য কিছু সন্দেহ করার অবকাশও ছিল কম।

?w=660″ width=”400″ />
(ছবি: আলবার্ট আইনস্টাইন, Life ম্যাগাজিনের জন্য ১৯২১ সালে E O Hoppe এর তোলা একটি প্রতিকৃতি। বিজ্ঞানের সবচেয়ে পরিচিত মুখ এই জার্মান বিজ্ঞানী মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন।)

আইনস্টাইনের তত্ত্বে, এর আগে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বে যেমন ছিল, গ্র্যাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ হচ্ছে বিশুদ্ধভাবে সব কিছুর মধ্যবর্তী পারস্পরিক আকর্ষণ শক্তি। যার অর্থ হচ্ছে, মহাবিশ্বে ভর আছে এমন কোনো এক গুচ্ছ বস্তুর অনন্ত্কাল ধরে কোনো নির্দিষ্ট একটি অবস্থানে স্থির হয়ে থাকা অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাদের পারস্পরিক মাধ্যাকর্ষণজনিত আকর্ষণ শেষ পর্যন্ত কোনো একসময় তাদের ভিতরের দিকে কলাপস বা ধ্বসে পড়ার কারন হবে, যা স্পষ্টতই একটি স্থির মহাবিশ্বের ধারণার সাথে সুস্পষ্টভাবে অসামঞ্জষ্যপূর্ণ।

আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি যে তৎকালীন মহাবিশ্বের ধারণার সাথে স্পষ্টতই সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে না, এই সত্যটি, আপনি যতটা হয়ত কল্পনা করতে পারবেন, তার চেয়ে কিন্তু অনেক বেশী ধাক্কা দিয়েছিল স্বয়ং আইনস্টাইনকেই। আর তার কারনগুলো আপনাদেরকে ব্যাখ্যা করার এই প্রক্রিয়া, আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে আইনস্টাইন আর তার সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সংক্রান্ত কিছু কিংবদন্তী, যা আমাকে সবসময়ই অস্বস্তি দিয়ে এসেছি, সেটিকেও মিথ্যা প্রমানিত করে বাতিল করার একটি ব্যবস্থা নেবার জন্য। সাধারণত মনে করা হয়ে থাকে যে, আইনস্টাইন একাকী নির্জনে বন্ধ কোনো ঘরে বসেই, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে (হয়তো আধুনিক যুগের কোনো স্ট্রিং থিওরীর তাত্ত্বিকদের মত), বহু বছর ধরে, শুধু মাত্র বিশুদ্ধ চিন্তার আর যুক্তি মাধ্যমে তার এই সুন্দর তত্ত্বটিতে পৌছাতে পেরেছিলেন, তবে এই ধারণাটি আসল সত্য থেকে বহু দুরে।

আইনস্টাইন সবসময়ই গভীরভাবে পরিচালিত হয়েছেন পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ দ্বারা। যখন তিনি তার মনে বহু থট এক্সপেরিমেন্ট বা চিন্তার পরীক্ষা এবং এক দশকেরও বেশী সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে পরিশ্রম করছিলেন, তিনি কিন্তু নতুন ধারার কিছু গণিতও শিখেছিলেন এবং এই পক্রিয়ায় বেশ কিছু ভ্রান্ত তাত্ত্বিক ধারণারও অনুসরণ করেছিলেন তিনি, তার এই বিখ্যাত তত্ত্বটি আবিষ্কার করতে, যা আসলেই গাণিতিকভাবে সুন্দর। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সাথে তার এই ভালোবাসার সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি একক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত কিন্তু আসলে জড়িত ছিল কিছু পর্যবেক্ষণের সাথে। তার তত্ত্বটিকে পুরোপুরিভাবে গুছিয়ে আনার ব্যস্ততম শেষ সপ্তাহগুলোতে, জার্মান গনিতজ্ঞ ডেভিড হিলবার্ট এর সাথে প্রতিদ্বন্দীতা করে, তিনি তার প্রস্তাবিত সমীকরণ দিয়ে সফল একটি প্রেডিক্টশন বা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন একটি বিষয়ে, যা হয়তো মনে হতে পারে খুব একটা গুরুত্বপুর্ণ নয় জ্যোতিপদার্থবিদ্যার এমন কোনো অচেনা একটি ফলাফল সংক্রান্ত বিষয়ে: সেটি ছিল সুর্যের চারপাশে মার্কারীর (বুধ গ্রহ) ‘পেরিহেলিওন (Perihelion বা সুর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান )’ সামান্য একটু প্রিসেশন ঘটা নিয়ে* (*সৌরজগতের একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা ছিল বুধের কক্ষপথ নিউটনের সমীকরণ যেভাবে বলছে সেভাবে আচরণ করছে না। মার্কারী যখন সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে গ্রহটি একটি প্রায় উপবৃত্ত বা এলিপস অনুসরণ করে। দেখা গেছে সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে সবসময় একই জায়গায় ঘটছে না, বরং এটি ধীরে ধীরে সূর্যের চারপাথে ঘুরতে থাকে, কক্ষপথের এই ঘুর্ণনকেই বলে precession; আর এটি শুধুমাত্র মার্কারী ক্ষেত্রেই ঘটে তা নয়, বস গ্রহের কক্ষপথেই precession ঘটে। বাস্তবিকভাবেই নিউটনের তত্ত্ব সেই সম্বন্ধে পূর্বধারণা করেছিল, গ্রহগুলো পারস্পরিক মহাকর্ষীয় টানে এটি ঘটার কারণে। কিন্তু প্রশ্নটি ছিল, নিউটনের ভবিষ্যদ্বাণী কি ঠিক আছে ঠিক কতটা কোনো গ্রহের কক্ষপথে precession হচ্ছে সেটি পরিমাপ করার জন্য? সব গ্রহের ক্ষেত্রে নিউটনের সমীকরণ সেটি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, শুধুমাত্র মার্কারী ছাড়া, মনে করা হতো এটি ব্যতিক্রম। পৃথিবী থেকে দেখলে মার্কারীর কক্ষপথের precession পরিমাপ করা হয়েছে প্রতি শতাব্দীতে এক আর্কের ৫৬০০ সেকেণ্ড ( আর্কের এক সেকেণ্ড = ১/৩৬০০ ডিগ্রী)। নিউটনের সমীকরণ, অন্য সব গ্রহের প্রভাব ( এছাড়া সূর্য সহ), পৃথিবীও স্থির নয় এমন সব কিছু বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যদ্বাণী করে প্রতি শতাব্দীতে এক আর্কের ৫৫৫৭ সেকেণ্ড, অর্থাৎ শতাব্দীতে এক আর্কে ৪৩ সেকেণ্ড পার্থক্য। এটি নিউটনের সমীকরণ সমাধান করতে পারেনি। তবে আইনস্টাইন সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পেরেছিলেন, কোনো ধরনের বাড়তি কিছুর সাথে সমন্বয় ছাড়াই যে মার্কারীর কক্ষপথের প্রতি শতাব্দীতে আর্কের ৪৩ সেকেণ্ড বাড়তি precession ঘটা উচিৎ যদি জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি সঠিক হয়ে থাকে।)

?mw=900&mh=600″ width=”400″ />
ছবি: মার্কারীর কক্ষপথের precession

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহুদিন আগে থেকেই লক্ষ্য করেছিলেন নিউটন যে কক্ষপথ পূর্বধারণা করেছিলেন, মার্কারী সেখান থেকে খানিকটা সরে যায়; একটি নিঁখুত উপবৃত্তকার পথ যা কিনা আবার নিজের দিকে ফিরে আসে, সেটি হবার পরিবর্তে, , মার্কারীর কক্ষপথের সামান্য পরিবর্তন বা প্রিসেশন ঘটে ( যার মানে গ্রহটি সুর্যের চারপাশে কক্ষপথে ঘুরে আসার পর ঠিক একই জায়গায় ফিরে আসেনা, প্রতিটি প্রদক্ষিনের সময় বুধের উপবৃত্তাকার কক্ষপথটির সামান্য একটু পরিবর্তন হয়, শেষ পর্যন্ত খানিকটা স্পাইরাল বা সর্পিকালাকার প্যাটার্নের একটি কক্ষপথ অনুসরণ করে), অবিশ্বাস্যরকম সামান্য পরিমানে: প্রতি শতাব্দীতে বা ১০০বছরে ৪৩ আর্ক সেকেণ্ড ( এক ডিগ্রীর ১/১০০ ভাগ)।
যখন আইনস্টাইন এই কক্ষপথ সংক্রান্ত গণনাটি করেছিলেন তার সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব ব্যবহার করে, এর ফলাফল হিসাবে সঠিক সংখ্যাটাই বেরিয়ে এসেছিল। আইনস্টাইনের অন্যতম জীবনীকার আব্রাহাম পাইস এর বর্ণনায়: ‘এই আবিষ্কারটি ছিল, আমি বিশ্বাস করি, আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী একটি আবেগময় অভিজ্ঞতা, হয়ত তার সারা জীবনেরও’; আইনস্টাইন দাবী করেছিলে, এসময় তার অত্যন্ত দ্রুত হৃদস্পন্দন হচ্ছিল, যেন, ‘তার ভিতরের কিছু ভেঙ্গে গেছে’; এর এক মাস পর যখন একজন বন্ধুর কাছে তার তত্ত্বটি তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন ’অতুলনীয় সুন্দর’ বলে, তত্ত্বটির গাণিতিক গঠন নিয়ে তখন তার আত্মতৃপ্তির প্রকাশ আসলেই ছিল স্পষ্ট, তবে দ্রুত কোনো হৃদস্পন্দনের ঘটনা ঘটেনি।

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ এবং একটি স্ট্যাটিক বা স্থির মহাবিশ্ব সম্ভাবনা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষনের মধ্যে স্পষ্ট অসামন্জষ্যতা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি যদিও। ( তাস্বত্ত্বেও এই কারণে আইনস্টাইন তার প্রস্তাবিত তত্ত্বে খানিকটা পরিবর্তনও যোগ করেছিলেন, যে পরিবর্তন সম্বন্ধে পরবর্তীতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন তার করা সবচেয়ে বড় একটি ভুল হিসাবে); এখন সবাই ( যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্কুল বোর্ডের ব্যতিক্রম ছাড়া) জানেন যে, মহাবিশ্ব স্ট্যাটিক বা স্থির না, বরং সম্প্রসারনশীল আর এই সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল অবিশ্বাস্য রকমের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব সম্পন্ন একটি বিগ ব্যাঙ্গ এর মাধ্যমে, প্রায় ১৩.৭২ বিলিয়ন বছর আগে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, আরো একটি বিষয় যা আমরা এখন জানি, আমাদের গ্যালাক্সীটা শুধু পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব এমন মহাবিশ্বে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সীর একটি মাত্র। আমরা অনেকটাই পৃথিবী আদি মানচিত্র আঁকিয়েদের মত, এই মহাবিশ্বকে তার সবচেয়ে বড় স্কেলে ম্যাপ করার কাজটি কেবল আমরা শুরু করেছি । অবাক হবার তাই বেশী কারণ নেই যে, আমাদের মহাবিশ্বের সার্বিক চিত্রের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বাক্ষী হলো সাম্প্রতিক দশকগুলো।

মহাবিশ্ব যে স্থির নয় বরং সম্প্রসারনশীল, দার্শনিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে এই আবিষ্কারটির গুরুত্ব বেশ গভীর, কারণ এটি প্রস্তাব করে যে, আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে। আর কোনো শুরুর ইঙ্গিত বা প্রস্তাব করে একটি সৃষ্টির, আর সৃষ্টি আন্দোলিত করে আবেগ। যদিও, ১৯২৯ সালে সম্প্রসারণশীল এই মহাবিশ্ব আবিষ্কারের পর বেশ কয়েক দশক কেটেছে বিগ ব্যাঙ্গের ধারণাটির স্বতন্ত্র পরীক্ষা নির্ভর নিশ্চিৎ প্রমাণ অর্জন করার জন্য, তবে ১৯৫১ সালে পোপ দ্বাদশ পায়াস, এটিকে দাবী করেন বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিসের প্রমাণ হিসাবে, তার নিজের ভাষায়:

‘‘মনে হচ্ছে যে, বর্তমান যুগের বিজ্ঞান, অতীতের বহু শতাব্দীর ধারণাকে এক ধাক্কায় মুছে ফেলে, সফল হয়েছে সেই আদিমতম ’ফিয়াট লাক্স’ (Fiat Lux) [ বা লেট দেয়ার বি লাইট] এর সেই অত্যন্ত পবিত্রতম উপাস্য মুহূর্তটির স্বাক্ষী হতে, যখন শূন্যতা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল সব পদার্থ সহ, আলো আর বিকরণের একটি সাগর এবং মৌলগুলো বিভাজিত এবং ক্রমশ মন্থিত হয়েছিল, গঠন করেছিল মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালাক্সী। এভাবে এই প্রমাণের দৃঢ়তায়, যা ভৌতিক প্রমানের সব বৈশিষ্ট্য বহন করে, (বিজ্ঞান) নিশ্চিৎ করেছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আকস্মিকতাকে এবং এরই সাথে সেই সময়কালটি সম্বন্ধে সুপ্রমাণিত ধারণাটিকে আরো মজবুত ভিত্তির উপর স্থাপন করেছে যে, যখন বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টিকর্তার হাতের ইশারায় । সুতরাং, সৃষ্টি অবশ্যই হয়েছে। আমরা বলি: ‘সুতরাং, যেহেতু সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই একজন আছেন, অতএব, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে।’’

কিন্তু পুরো গল্পটা আরো আসলেই খানিকটা বেশী কৌতুহলোদ্দীপক। বাস্তবিকভাবে, প্রথম যে ব্যক্তিট একটি বিগ ব্যাঙ্গ বা মহা বিস্ফোরণের ধারনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন একজন বেলজিয়ান ধর্মযাজক ও পদার্থবিজ্ঞানী, জর্জ লোমেইত (Georges Henri Joseph Édouard Lemaître)। জর্জ লোমেইত ছিলেন বহুমুখী দক্ষতার একটি অসাধারণ মিশ্রন। তিনি তার শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন একজন প্রকৌশলী হিসাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশেষ বীরত্বের খেতাবপ্রাপ্ত একজন গোলন্দাজ সেনা ছিলেন তিনি; ১৯২০ এর দশকে যখন তিনি ধর্মযাজক হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখনই তিনি নজর দেন গণিতের প্রতি। এরপর বিষয় হিসাবে বেছে নেন, কসমোলজী, প্রথমে তিনি কসমোলজী পড়েন বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী স্যার আর্থার স্ট্যানলী এডিংটন এর সাথে, এরপর আসেন যুক্তরাষ্ট্রে, প্রথমে হার্ভার্ড এবং পরে তার দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রীটি গ্রহন করেন এমআইটি থেকে পদার্থবিদ্যায়।

/410px-Lemaitre.jpg” width=”400″ />
ছবি: জর্জ লোমেইত;এই বেলজিয়ান ধর্মযাজক পদার্থবিজ্ঞানী প্রথম অস্থিতিশীল মহাবিশ্ব এবং বিগ ব্যাঙ্গের প্রস্তাব করেছিলেন। Katholieke Universiteit Leuven এ লেকচার দেবার সময় তোলা এই ছবিটির সময়কাল ১৯৩৩ এর কাছাকাছি।

১৯২৭ সালে, তার দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রীটি পাবার আগে, লোমেইত আসলেই আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটির সমীকরণগুলো প্রমান করেছিলেন এবং তিনি দেখান যে, আইনস্টাইনের তত্ত্বটি একটি স্থির নয় এমন মহাবিশ্বকে পূর্বধারণা করছে এবং বাস্তবিকভাবেই তিনি প্রস্তাব করেন, যে মহাবিশ্বে আমরা বাস করছি তা সম্প্রসারিত হচ্ছে। লোমেইত এর এই প্রস্তাবটি এতই দুঃসাহসী এবং প্রচলিত ধারণা বিরোধী ছিল, যে আইনস্টাইন নিজেই বেশ নাটকীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন এই বাক্য ব্যবহার করে: ‘আপনার অংক নির্ভুল কিন্তু আপনার পদার্থবিদ্যা জঘন্য’।


ছবি: আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে ফাদার জর্জ লোমেইত (সাথে রবার্ট মিলিকান) ; ১৯৩৩ সালে জানুয়ারী ১০ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজী, প্যাসাডেনাতে।

যাই হোক না কেন, লোমেইত আরো দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান তার ধারনাটিকে এবং ১৯৩০ সালে তিনি আরো প্রস্তাব করেন, আমাদের এই সম্প্রসারনশীল বিশ্ব আসলে শুরু হয়েছিল একটি ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে, যিনি এর নাম দিয়েছিলেন প্রাইমিভাল (বা আদিমতম) অ্যাটম বা পরমাণু, এবং এই শুরুটাই প্রতিনিধিত্ব করে-এখানে তিনি জেনেসিস এর প্রতি হয়তো পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এমন একটি দিনের, যার আগের দিন নেই ( Day with no yesterday)।

এভাবেই ‘বিগ ব্যাঙ্গ’ এর ধারণাটি – যা একসময় পোপ পায়াস বেশ উৎসাহের সাথে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন ঘোষনা দিয়ে – আসলে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন একজন ধর্মযাজক, যিনি পদার্থবিজ্ঞানীও বটে। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, একজন ধর্মযাজক হিসাবে লোমেইত পোপের স্বীকৃতি পেয়ে নিশ্চয়ই খুব আনন্দিত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি মানসিকভাবে আসলে এই বিষয়টি নিয়ে আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন, কারণ তিনি আগেই ধারণা করছিলেন যে, এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি ধর্মতত্ত্বের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলবে এবং অবশেষে, ১৯৩১ সালে বিগ ব্যাঙ্গ সংক্রান্ত তার প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষনা পত্রটির মূল খসড়া থেকে তিনি এ বিষয়ে করা তার মন্তব্য সম্বলিত একটি অনুচ্ছেদও বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন।

বাস্তবিকভাবেই, লোমেইত কিন্তু ১৯৫১ সালে পোপের বিগ ব্যাঙ্গের মাধ্যমে জেনেসিসের স্বপক্ষে প্রমাণ সংক্রান্ত দাবীর বিষয়ে পরবর্তীতে তার আপত্তির কথা উল্লেখ করছিলেন,( কারণ তিনি অনুধাবন করেছিলেন, যদি ভবিষ্যতে তার প্রস্তাবিত তত্ত্বটি ভূল প্রমাণিত হয়,তখন রোমান ক্যাথলিকদের এই জেনেসিসের দাবীটি হয়তো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।); ততদিনে তিনি ভ্যাটিক্যানের পন্টিফিক্যাল অ্যাকাডেমীতে নির্বাচিত হয়েছেন, পরবর্তীতে যার সভাপতিও হয়েছিলেন। তিনি যেভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছিলেন,সেটা হলো: ‘আমি যতটুকু দেখতে পাচ্ছি, এ ধরনের তত্ত্ব পুরোপুরিভাবেই মেটাফিজিক্যাল বা অধিবিদ্যক বা ধর্মীয় প্রশ্নের আওতার বাইরে’; পোপ এরপর বিষয়টি আর প্রকাশ্যে কখনো নিয়ে আসেননি।

এখানে একটি গুরুত্বপুর্ণ শিক্ষা আছে। যেমন লোমেইত শনাক্ত করেছিলেন, বিগ ব্যাঙ্গ আসলে ঘটেছিল কিংবা ঘটেনি, এই্ বিষয়টা আসলে বৈজ্ঞানিক একটি প্রশ্ন, ধর্মতত্ত্বীয় না। এছাড়া যদিও বিগ ব্যাঙ্গ ঘটেই থাকে (বর্তমানে প্রাপ্ত অসংখ্য প্রমাণ যার স্বপক্ষে কথা বলছে), যে কেউ এটির মধ্যে ভিন্নভাবে অর্থ খুজে নিতে পারে তার ব্যাক্তিগত ধর্মীয় বা মেটাফিজিক্যাল বা অধিবিদ্যক প্রবণতার মাধ্যমে। যদি আপনি প্রয়োজন বোধ করেন, আপনি হয়তো বেছে নিতে পারেন ‘বিগ ব্যাঙ্গ’কে একজন সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসাবে দেখতে বা এর বদলে যুক্তি দেখাতে পারেন যে, কোনো ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সাধারণ আপেক্ষিকতার গণিত মহাবিশ্বের বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে পারে এর ঠিক সুচনা লগ্ন পর্যন্ত ; কিন্তু যে কোন ধরনের মেটাফিজিক্যাল ধারনা কিন্তু বিগ ব্যাঙ্গের নিজস্ব ভৌতিক বা ফিজিক্যাল পর্যবেক্ষণ নির্ভর প্রমাণ থেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র এবং আমাদের জন্য এই প্রক্রিয়াটি বোঝার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকাই নেই। অবশ্যই, আমরা যখন বোঝার জন্য শুধুমাত্র একটি সম্প্রসারণশীল বিশ্বের অস্তিত্ত্ব সংক্রান্তু বিষয়কে অতিক্রম করে পদার্থবিজ্ঞানের ও ভৌতিক সেই মূলনীতিগুলোকে বোঝার চেষ্টা করবো, যা এর উৎপত্তিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, শুধমাত্র বিজ্ঞানই পারে এই বিষয়ে শুধু অনুমান নির্ভর প্রস্তাবনাগুলোর উপর আরো বেশী আলোকপাত করতে,এবং আমি যুক্তি দেবো, বিজ্ঞান সে কাজটি করছে।

যাই হোক না কেন, না লোমেইত, না পোপ, কেউই কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজকে বিশ্বাস করাতে পারেননি, যে মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বরং,ভালো বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে যা সাধারণত ঘটে থাকে, এর স্বপক্ষে জোরালো প্রমানগুলো এসেছে দীর্ঘদিনের সতর্ক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে; এই ক্ষেত্রে প্রথমে সেটি করেছিলেন, এডউইন হাবল (Edwin Hubble); যিনি মানবতার উপর আমার অগাধ বিশ্বাস পোষণ করার সাহস যুগিয়ে চলেছেন বিরামহীনভাবে, কারণ হাবল তার জীবন শুরু করেছিলেন একজন আইনজীবি হিসাবে এবং পরে তিনি পরিণত হন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীতে ।


(ছবি: এডউইন হাবল। আণ্ডারগ্রাজুয়েটে অংক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়লেও রোডস স্কলার হাবল অক্সফোর্ডে আইন পড়েছিলেন। আইনের পেশায় মন টেকেনি তার, ফিরে যার তার প্রিয় ক্ষেত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানে, যেখানে বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার তিনি করেছিলেন। তিনি প্রথম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিৎভাবে প্রমাণ করেন মিল্কি ওয়ের বাইরেও আরো গ্যালাক্সী আছে, এছাড়া সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের মূল প্রমাণগত ভিত্তিটাও এসেছে তার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।)

এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে অবদান রাখার আগেই, ১৯২৫ এ হাবল একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন নতুন স্থাপিত মাউন্ট উইলসনের ১০০ ইঞ্চি হুকার টেলিস্কোপ দিয়ে, তখন পৃথিবীতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ (এর সাথে তুলনা করার জন্য উল্লেখ করছি বর্তমানে আমরা এমন টেলিস্কোপ বানাচ্ছি, যা এর চেয়ে দশগুণ বড় এবং আরো ১০০ গুণ বড় জায়গা সহ।)। সেই সময় পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যে ধরনের টেলিস্কোপ পাওয়া যেত, তা ব্যবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সক্ষম হয়েছিলেন মহাকাশে কিছু জিনিসের অস্পষ্ট ছবি শনাক্ত করার জন্য, যা আমাদের গ্যালাক্সীর সাধারণ নক্ষত্র না। তারা এর নাম দিয়েছিলেন নেবুলী (Nebulae), যা মূলত ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ ’ঝাপসা, অস্পষ্ট কোনো কিছু’ (আসলে, ‘মেঘ’)। তারা বিতর্ক করেছিলেন এই জিনিসগুলো কি আমাদের গ্যালাক্সীরই অংশ, নাকি নাকি এদের অবস্থান এর বাইরে।

যেহেতু সেই সময়ে বিদ্যমান ধারণা ছিল, আমাদের গ্যালাক্সীর বাইরে আর কিছুই নেই, বেশীর ভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই এগুলো আমাদের গ্যালাক্সীর অংশ এই প্রস্তাবের পক্ষেই ছিলেন, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হার্ভার্ডের হারলো শাপলী (Harlow Shapley)। শাপলী পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ার সময় স্কুল ছেড়ে দেন, এরপর নিজেই নিজেই পড়াশুনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি প্রিন্সটনে আসেন,এবং তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার সিদ্ধান্ত নেন সিলেবাসের নানা পাঠ্য বিষয়ের তালিকায় বর্ণক্রমানুসারে প্রথমে থাকা বিষয় অ্যাষ্ট্রোনোমিকে বেছে নিয়ে ।তার নিজের বিখ্যাত গবেষণা কর্মের মাধ্যমে তিনি প্রমান করেছিলেন, আগে যেমনটা ভাবা হতো, তার তুলনায় মিল্কী ওয়ে গ্যালাক্সী আরো অনেক বিশাল এবং সুর্য এর কেন্দ্রে অবস্থান করেনা বরং কেন্দ্র থেকে বহু দূরে এর অবস্থান, আদৌ তেমন উল্লেখযোগ্য নয় এমন একটি সাদামাটা জায়গায়। যেহেতু তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে ক্ষেত্রে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, সুতরাং নেবুলিদের প্রকৃতি সম্বন্ধে তার মতামতও যথেষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করেছিল সেই সময়ে।


ছবি: হারলো শাপলী, তার সময়ের অত্যান্ত প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানী শাপলী প্রমান করেছিলেনৈ সুর্য আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে না বরং কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫০০০ আলোকবর্ষ দুরে অবস্থিত।

১৯২৫ সাল, নতুন বছরের প্রথম দিনে, হাবল তার স্পাইরাল নেবুলি সম্বন্ধে দীর্ঘ দুই বছরের গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন একটি বিশেষ ধরনের ভ্যারিয়েবল (যাদের উজ্জ্বতা পরিবর্তনশীল) নক্ষত্র, যাদের বলা হয় সেফিড ভ্যারিয়েবল (Cepheid variable) নক্ষত্র এইসব নেবুলাগুলোর মধ্যে শনাক্ত করতে, যার মধ্যে সেই নেবুলিটিও অন্তর্ভুক্ত, যা বর্তমানে অ্যান্ড্রোমিডা নামে পরিচিত।

১৭৮৪ সালে প্রথমবারের মত পর্যবেক্ষন করা সেফিড ভ্যারিয়েবল নক্ষত্ররা হচ্ছে বিশেষ ধরনের নক্ষত্র, যাদের উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট বিরতির পর পরিবর্তিত হয় (১৭৮৪ সালে জন গুডরিক প্রথম এদের বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেফেউস কনস্টেলেশনের ডেলটা সেফেই থেকে এদের নামকরণ করার হয়েছিল)। ১৯০৮ সালে হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট (Henrietta Swan Leavitt) নামের অপরিচিত এবং যাকে আদৌ কখনোও যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি, এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবার প্রত্যাশী, হার্ভার্ড কলেজ অবসারভেটরীতে তখন ’কম্পিউটার’ হিসাবে কর্মরত ছিলেন (কম্পিউটার বলা হলো সেই সব মহিলাদের যাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অবসারভেটরীতে নিয়োগ করা হতো অবসারভেটরীর ফটোগ্রাফিক প্লেটে নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতাকে ক্যাটালগ করার জন্য; নারীদের সেই সময় অবসারভেটরীর টেলিস্কোপ ব্যবহারের অনুমতি ছিল না); প্রোটেষ্টান্ট কংগ্রেশনাল চার্চের একজন ধর্মযাজক বাবা এবং পিলগ্রিমদের* বংশধর মায়ের (*যারা ১৬২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাসাচুসেটস এর প্লিমাউথ রকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ইংরেজ কলোনী গড়ে তুলেছিলেন।) উত্তরসূরি কন্যা লিভিট একটি অসাধারণ আবিষ্কার করেছিলেন ‘কম্পিউটার’ হিসাবে কাজ করার সময়, তিনি যার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ১৯১২ সালে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন,সেফিড নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতা বা লুমিনোসিটি এবং তাদের এই উজ্জ্বলতার বিভিন্নতার বা পরিবর্তনের সময়কালের (বা পালসেশন পিরিয়ড) এর মধ্যে একটি নিয়মিত সম্পর্ক আছে; সুতরাং কেউ যদি জানা আছে এমন সময়কালের (পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে সেটি আবিষ্কার করা হয়েছিল) একটি একক সেফিড নক্ষত্রদের দুরত্ব বের করতে পারেন, তবে সেই একই সময়কালের বা পিরিওডের অন্য সেফিড নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতা পরিমাপ করে এইসব অন্যান্য নক্ষত্রদের দুরত্বও পরিমাপ করা সম্ভব!

?w=660″ width=”400″ />
(ছবি: হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট ; হার্ভার্ড অবসারভেটরীতে ‘কম্পিউটার’ হিসাবে কাজ করা লিভিট জীবদ্দশায় তার আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি। তিনি প্রথম সেফিড ভ্যারিয়েবল নক্ষত্রদের পিরিয়ড লুমিনোসিটি ব্যাখ্যা করেন, যা পরবর্তীতে মহাবিশ্বে গ্যালাক্সীদের দুরত্ব মাপার মাপকাঠিতে পরিণত হয়, এবং এর উপর ভিত্তি করে হাবল তার আবিষ্কার করেছিলেন।)

যেহেতু কোনো নক্ষত্রের পর্যবেক্ষিত উজ্জ্বলতা কমে যেতে থাকে, মধ্যবর্তী দুরত্বের বর্গফলের পরিমানের সাথে বীপরিত অনুপাতে ( আলো আরো বড় আকারে বৃত্তাকারে সমানভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকে, যার আয়তন বাড়তে থাকে দুরত্বের প্রতি এককের বর্গফল বাড়ার সাথে সাথে এবং যেহেতু আলো ছড়িয়ে থাকে আরো বড় বৃত্তাকার এলাকা জুড়ে, সেকারণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আলোর উজ্জ্বলতা বিপরীত অনুপাতে কমতে থাকে সেই বৃত্তাকার এলাকার আয়তন বৃদ্ধির সাথে); সে কারণে দুরবর্তী নক্ষত্রদের দুরত্ব পরিমাপ করাটা জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল সবসময়ই। লিভিটের এই আবিষ্কার এই ক্ষেত্রে এনেছিল বৈপ্লবিক একটি পরিবর্তন।(হাবল নিজে, যিনি নিজেও নোবেল পুরষ্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, প্রায়শই বলতেন, লিভিট তার এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্য; যদিও হাবল যথেষ্ট পরিমানে নিজের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখতেন বলে হয়তো তিনি এটা প্রস্তাব করতে পারেন, কারণ পরবর্তীতে এই ক্ষেত্রে তার নিজস্ব অবদানের জন্য লিভিটের সাথে এই পুরষ্কার ভাগাভাগি করে নেবার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারণেই তিনিই ছিলেন প্রধানতম প্রার্থী।) ১৯২৪ সালে আসলেই কিন্তু রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমী লিভিটকে পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে কাগজপত্র তৈরী করাও শুরু করেছিল, তখনই তারা জানতে পারেন, এর তিন বছর আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লেভিট মারা গেছেন। হাবল তার ব্যাক্তিত্বের জোরে,আত্মপ্রচারের সহজাত ক্ষমতার গুণ এবং পর্যবেক্ষক হিসাবে তার অসাধারণ দক্ষতার কারণেই এখন ঘরে ঘরে সুপরিচিত একট নামে পরিনত হয়েছেন, কিন্ত লিভিট, হায়! জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে যারা বেশী আগ্রহী,শুধু তাদের কাছেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ।

হাবল সেফিড নক্ষত্র সংক্রান্ত তার পরিমাপ এবং লিভিট এর ‘পিরিওড লুমিনোসিটির’ সম্পর্ক ব্যবহার করে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন অ্যান্ড্রোমিডার এবং আরো বেশ কয়েকটি নেবুলার সেফিড নক্ষত্ররা এত দুরে অবস্থান করছে যে, তারা কোনভাবেই আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যে অবস্থান করতে পারেনা। অ্যান্ড্রোমিডাও পরবর্তীতে প্রমানিত হলো আরো একটি স্বতন্ত্র দ্বীপ মহাবিশ্ব, আরো একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সি যা প্রায় হুবুহু আমাদের মিল্কি ওয়ের মত দেখতে এবং এখন আমরা এখন জানি, আমাদের পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব মহাবিশ্বে অস্তিত্ব আছে এমন প্রায় ১০০ বিলিয়নেরও বেশী গ্যালাক্সীর একটি। হাবলের গবেষণার ফলাফল যথেষ্ট পরিমানে অস্পষ্টতামুক্ত ছিল বলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী সমাজ,শাপলী সহ, ঘটনাক্রমে, তিনি তখন হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরীর পরিচালক, যেখানে লেভিট তার যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছিলেন-দ্রুত এই সত্যটি মেনে নেন যে,আমাদের চারপাশে শুধু মিল্কি ওয়ে ছাড়া আরো অনেক কিছুই আছে। হঠাৎ করেই, বহু শতাব্দী ধরে পরিচিত আমাদের মহাবিশ্বের আকারটি এক লাফে অনেক বিশালকায় হয়ে উঠেছিল! অন্য প্রায় সবকিছুর মত এর চরিত্র বা প্রকৃতির স্বরুপও বদলে যায়।

((চলবে))

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − = 6