উনিশ না বিশের বাঁশি (শেষ পর্ব)

কোরানের উনিশ ভিত্তিক রহস্যগুলোর কথা বলেছিলাম গত দুই পর্বে (১) (২) সাথে সাথে দেখিয়েছিলাম এসব রসহ্যময় দাবীগুলোর আসলে কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। ইসলামিক স্কলারগণ যেসব দাবী করেছেন তা নিতান্তই অর্বাচীন এবং সঠিক অনুসন্ধানে তা একদম বাতিল।
_gen/derivatives/landscape_910_607/image.jpg” width=”500″ />

মজার বিষয় হলো, অন্যান্য ইসলামিক দাবীগুলোর মত কোরানের উনিশভিত্তিক রহস্যের দাবীগুলোও কোরান হাদিসের দ্বারাই ভুল প্রমান করা যায়। কিন্তু বোকা মুসলমানরা নিজে এসবের অনুসন্ধান না করে চিলে কান নিয়েছে শুনেই চিৎকার চেচামেচি করতে থাকে। যার ফলে ইসলাম দিন দিন একটা অন্ধকারে নিমজ্জিত ধর্মে পরিণত হচ্ছে এবং এর অনুসারী মুসলমানরা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ জাতীতে পরিণত হচ্ছে। যাই হোক, এই পর্বে কোরানের উনিশ ভিত্তিক রহস্যের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এই রহস্যের পেছনের রহস্য নিয়ে আলোচনা করার প্রয়াস চালানো হবে।

কোরানের উনিশ ভিত্তিক এই রহস্যের মূল ভিত্তি হলো, ৭৪ নং সূরা আল-মুদাচ্ছির-এর ৩০ নং আয়াত। এই আয়াতের অর্থ হলো, “ইহার উপর উনিশ”। রহস্যময়তার দাবীদারগন এই আয়াতের “ইহার” সর্বনামটিকে কোরান বলে দাবী করছেন। আদতে তা কোরান নয়। এই “ইহার” জিনিসটি কি তা জানতে হলে হাজার হাজার তাফসীর পাঠ করার কোন প্রয়োজনও পড়ে না। এর আগের পরের আয়াতগুলো পাঠ করলেই তা পানির মত পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই, এখানে ২৭ থেকে ৩১ নং পর্যন্ত আয়াত পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো,

“আপনি জানেন কি দোজখ কী বস্তু(২৭)? উহা (কাহাকেও প্রবেশ করার পর অদগ্ধ) থাকিতে দেবে না। এবং (অনাগত কোন কাফিরকে) ছাড়বে না(২৮)। উহা দেহের সৌষ্ঠব বিকৃত করিয়া দিবে(২৯)। ইহার উপর উনিশ(৩০)। আর আমি দোজখের কর্মচারী কেবল ফেরেশতাদিগকেই নিযুক্ত করিয়াছি। আর আমি তাহাদের সংখ্যা এইরূপে রাখিয়াছি যাহা কাফিরদের বিভ্রান্তির উপকরণ হয়, যেন বিশ্বাস করে- কিতাবীগণ এবং ঈমানদারদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়(৩১)।

এই অংশটুকু পাঠের পর ৩০ নং আয়াতে “ইহার” বলতে কী বুঝানো হয়েছে তা বুঝতে হলে না হওয়া লাগবে মহাজ্ঞানী, না হওয়া লাগবে শায়খে কোরান। পাঠকের কী মনে হয়, “ইহার” মানে কোরান? নাকি দোজখ? মূলত; এই আয়াতের “ইহার” হলো দোজখ। এরপরও আসুন দেখি এই আয়াতগুল নাজিলের প্রেক্ষাপট অর্থাৎ শানে-নুযুল খুজে দেখি। আসলেই “ইহার” অর্থে কোরানকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল কি না।

ছহীহ রহয়ানী বঙ্গানুবাদ কোরান শরীফ(বয়ানুল কোরানের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ)-এ এই আয়াতগুলোর শানে নুযূল হচ্ছে, “৩০ আয়াতটি শ্রবণ করিয়া আবুল আসাদ নামক জনৈক শক্তিশালী কাফের বলিয়া উঠিল, হে কোরাইশ জাতি! তোমরা ইহাতে ভীত হইও না। আমি দশজন ফেরেশতাকে ডান বাহু দ্বারা এবং নয়জনকে বাম বাহু দ্বারা পরাজিত করিয়া দিব। অন্য রেওয়াতে আছে, এই আয়াতটি শুনিয়া আবু জাহেল বলিল, ভয় কিসের? ফেরেশতা মাত্র উনিশজন। তোমরা সংখ্যায় অনেক রহিয়াছ। প্রতি দশজন মানুষও কি একজন ফেরেশতাকে হঠাইয়া দিতে পারিবে না? এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়াতটি নাজিল হয়। ছহীহ রহয়ানী বঙ্গানুবাদ কোরান শরীফ(বয়ানুল কোরানের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ, পৃষ্ঠা-৯৪২)।

মওদুদীর তাফহীমূল কোরানে শানে নুযূল অংশে বলা হয়েছে, “লোকেরা রাসুলে করীম (স) এর মুখে শিনিতে পাইয়াছিল যে, দোজখের কর্মচারী সংখ্যা হইবে মাত্র উনিশজন। এই কথা শোনামাত্রই তাহারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করিতে শুরু করিয়া দিয়াছিল। এমনকি, এই কথা শুনিয়া তাহারা বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গিয়াছিল। তাহাদের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছিল যে, একদিকে আমাদিকগকে বলা হইতেছে যে, আদম(আ) হইতে কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ার যত মানুষ কফরী ও নাফরমানী করিয়াছে তাহারা সকলেই দোযখে নিক্ষিপ্ত হইবে, আবার সেই সংগেই আমাদিগকে বলা হইতেছে যে এতবড় একটা বিশাল-বিরাট দোযখে এত অসংখ্য মানুষকে আযাব দেওয়ার কাজে মাত্র ১৯জন কর্মচারী নিযুক্ত করা হইবে! এই কথায় কুরাইশ সরদাররা প্রচন্ড অট্টহাস্যে ভাঙিয়া পড়িল। আবু জেহেল বলিল, ‘ভাইসব! তোমরা কি এতই দূর্বল ও অথর্ব হইয়াছ যে, তোমরা দশ-দশ জন লোক মিলিয়াও দোযখের এক একজন কর্মচারী ও সিপাহীর মুকাবিলা করিতে পারিবে না?’ বনু জুমাহ গোত্রের একজন পাহলোয়ান বলিয়াই ফেলিলঃ ’১৭ জনের সহিত তো আমি একাকীই মুকাবিলা করিব, অবশিষ্ট দুই জনকে তোমরা কাবু করিয়া লইবে’। এই ধরনের অত্যন্ত হাস্যকর কথাবার্তার জওয়াবে এই বাক্যটি একটি মধ্যবর্তী কথা হিসাবে বলিয়া দেওয়া হইয়াছে”। (তাফহীমূল কোরান, ১৮শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৮।)

শানু নুযূল পাঠান্তে কি কোন পাঠকের ঘুনাক্ষরেও মনে হচ্ছে এই উনিশ সংখ্যাটি কোরানের রহস্যকে ইঙ্গিত করে বর্নিত হয়েছে? না কি দোযখের ফেরেস্তাদের কথা বলা হয়েছে? কিভাবে এই আয়াতের উনিশ সংখ্যাটি বিসমিল্লাহর বর্নসংখ্যা এবং কোরানে উনিশের আবর্তনের সাথে রহস্যযুক্ত হয়ে গেল, তা আমার মত আবালের কাছে বোধগম্য নয়।

আরও মজার বিষয় হলো, মিরাকল উনিশ নিয়ে বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম-এর বর্নসংখ্যার যে দাবী করা হয়, তাও অনেক প্রশ্ন স্বাপেক্ষ। কারণ, বর্তমানে আমরা যে কোরান পাঠ করি, শুরুতে তা এমন ছিল না। প্রথমে তো মুখে মুখে কোরান নাযিল হয়েছিল, পরে তা লিপিবদ্ধ করা হতো। প্রথম দিককার কোরানের লিখিত রূপের সাথে বর্তমান লিখিত রূপের রয়েছে বিস্তর ফারাক। বর্তমানে কোরানে যুক্ত জের-জবর-পেশ-তাশদীদ-মদ ইত্যাদি মোহাম্মদের সময়ের কোরানে ছিল না। ওসমান কর্তৃক সংকলিত-সম্পাদিত কোরানেও এগুলির অস্তিত্ব ছিল না, ছিল না স্বরবর্নের ব্যবহার। ফলে, তা পাঠ করার জন্য পূর্বের মৌখিক রূপেরই দ্বারস্থ হতে হতো। এ সমস্যা দুরীকরনের জন্য উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালেকের (মৃত ৭০৫) সময় গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ প্রথম ইরাকের বসরা নগরীর সুফি পণ্ডিত হাসানকে অনুরোধ করেন। হাসান জনৈক বসরাবাসী ইয়াহিয়া ইবনে ইয়ামারকে নিয়োগ করেন। ইয়াহিয়াই প্রথমে সিরিয়ান ভাষার স্বরচিহ্ন এবং নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রচলিত ডট পদ্ধতির ব্যবহার আরবি বর্নমালায় ব্যবহার করেন। যদিও তখনকার কট্টরপন্থীরা কোরান বিকৃতির অভিযোগে এ সংস্কারকে মেনে নেয়নি প্রথমে। বিখ্যাত সুন্নি নেতা মেইল ইবনে আনাস (মৃত ৭৯৫) মসজিদে এই সংশোধিত কোরানকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন। সংস্কারের ফলে কোরানের আয়াতের বর্ন সংখ্যাও কম বেশি হয়ে গিয়েছিল স্বাভাবিকভাবে। তাহলে, বিসমিল্লাহর বর্নসংখ্যা কি বর্তমানের কোরান অনুযায়ী গুনবেন, নাকি পুরাতন কোরান অনুযায়ী? প্রশ্নটা এসেই যায়।

এবার আসি মূল কথায়, রহস্যের পেছনের রহস্যে। এই উনিশ ভিত্তিক রহস্য যিনি আবিষ্কার করেন, তাকে নিয়ে আলোচনা করা যাক। তাহলে, একদম ক্লিয়ার হয়ে যাবে। এই রহস্যটি আদৌ কতটুকু গ্রহনযোগ্য। হ্যাঁ, আর দশটা ইসলামী বিষয়াদির মতই ইসলামিক স্কলাররা এই রহস্য নিয়ে নানা ভাগে বিভাজিত। এই রহস্যটি আবিষ্কৃত হয় রাশেদ খলিফা নামক একজন কোরানের অনুসারীর মাধ্যমে। তিনি নিজেকে এবং তার অনুসারীদেরকে মুসলমান না বলে পরিচয় দিতেন Submitter হিসেবে। তাই তাকে আমিও শুধুই কোরান অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলাম। তো এই রাশেদ খলিফা ব্যক্তি জীবনে একজন জৈব-রসায়নবিদ ছিলেন। এই জৈব-রসায়নবিদ ১৯৬৯ সালের দিকে কোরানের শব্দমালা, অক্ষর-বর্ন ইত্যাদি বিশ্লেষনের জন্য একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরীর প্রচেষ্টা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি কোরানের সুরা মুদাচ্ছিরের ৩০ নং আয়াতে উল্লেখিত সংখ্যা “১৯” নিয়ে রহস্যগুলো আবিষ্কারের ঘোষনা দেন। উল্লেখ্য, এই রাশেদ খলিফা নিজেও কোরানের কিছু সংস্কারের দাবী করেন। পাকিস্তানের আহমদ কাদিয়ানির মত তিনি নিজেকেও রসুল হিসেবে দাবী করেন। তার দাবী অনুযায়ী, নবী মোহাম্মদ শেষ নবী হলেও শেষ রাসুল নন। অবশ্য এ দাবীর পেছনে কোরান থেকেই বেশ কিছু আয়াতের (৩৩:৪০, ২২:৭৫, আলে ইমরানঃ৮১,) ইঙ্গিত উপস্থাপন করেন। অবশ্য তার দাবীগুলোও উপেক্ষা করার মত নয়। অবশ্য তার সংকলিত কোরানে সূরা তওবার শেষের দুটি আয়াত বাদ দেয়া হয়েছে। ইসলামী কট্টরপন্থিরা আমেরিকার আরিজোয়ানা রাজ্যের টুকসন মসজিদের ভেতর রাশেদ খলিফাকে ১৯৯০ সালের ৩১ জানুয়ারী কুপিয়ে হত্যা করে। তার শরীরে ২৯টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। হত্যাকারী হিসেবে ‘জামাতুল ফুরকা’ নামক আমেরিকান একটি সংগঠনকে অভিযুক্ত করা হয়। কোরানের উনিশভিত্তিক রহস্য রাশেদ খলিফা সংকলিত কোরান ব্যতিত অন্যান্য কোরানে সর্বাংশে মিলে না।

মজার বিষয় হলো, সাধারণ মুসলমানরা এসবের কিছুই জানে না, জানতে চায় না। তারা কাদিয়ানিদেরকে মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না, রাশেদ খলিফাকেও মুসলমান হিসেবে স্বীকার করা হয়নি(তিনি নিজেও নিজেকে মুসলমান বলতেন না), কিন্তু তার আবিষ্কৃত কোরানিক রহস্য নিয়ে আপনার সাথে বড় গলায় তর্ক করবে। যদিও এমনভাবে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে গ্রন্থ রচনা খুব বেশি কঠিন হলেও, অসম্ভব কিছু নয়। পেত্রার্ক প্রবর্তিত সনেট কবিতার কথা বললেও তা খুব স্বাভাবিক মনে হয়, কারণ, পেত্রার্ক নিজের এই ক্ষমতাকে ঈশ্বরের দেয়া গুন হিসেবে দাবী করেননি।

কোরানের উনিশ ভিত্তিক রহস্যের কিনারা তো হলো, এবার মানুষের সৃষ্ট একটা রহস্যাবৃত গ্রন্থের খবর দিয়ে শেষ করি। তাহলে সহজেই বুঝা যাবে রহস্য বলে যেসব বিষয়কে দাবী করা হয়, তা নিতান্তই বুজরকি আর গলাবাজি ছাড়া কিছুই না। Ernest Vincent Wright(1873-1939) নামক একজন মার্কিন লেখক ‘Gadsby: Champion of Youth(Wetzel Publishing Co., 1939) উপন্যাসটি পঞ্চাশ হাজার একশত দশটি শব্দ দিয়ে গঠিত হলেও, এতে একবারের জন্যও ইংরেজী ‘E’ বর্নটি ব্যবহার করা হয়নি। কল্পনা করতে পারেন! He, She, they, them, their, her, myself, love, hate ইত্যকার শব্দ ছাড়া একটি উপন্যাস রচনা করা যায়!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “উনিশ না বিশের বাঁশি (শেষ পর্ব)

  1. যে কোন কিছু আবিষ্কার বা
    যে কোন কিছু আবিষ্কার বা গবেষণা কে প্রথমেই বাতিল করে দিবে,আবিষ্কারক বা গবেষক কে মুরতাদ আখ্যা দিবে,দেশত্যাগী করবে,এমনকি হত্যাও করবে।

    পরবর্তী কোন এক সময় কোন এক আয়াতের সাথে মিল খুঁজে ইস্লামের গৌরব প্রচার করবে,আবিষ্কারক বা গবেষক মুস্লিম হয়ে থাকলে নিজেও মুস্লিম বলে গর্বিত হবে।

    মুস্লিমদের চিন্তাভাবনা এভাবেই বিবর্তিত হয়ে আসছে।

    1. পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানীকে
      পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানীকে ওরা মুসলমান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি প্রথমে। এখন বলে, মুসলিম পরমাণু বিজ্ঞানী। *dash1*

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 2