একটি মহাজাগতিক রহস্য গল্প: সূচনা (শেষ পর্ব)

?3″ width=”400″ />
(ছবি: হাবল টেলিস্কোপের তোলা একটি মহাশূন্যের একটি ছবি, প্রায় ১০,০০০ গ্যালাক্সী আছে ছবিটায়)


একটি মহাজাগতিক রহস্য গল্প: সূচনা ( প্রথম পর্ব)

নাটকীয় এই আবিষ্কারের পর হাবল কিন্তু তার এই বিজয়ের মূকুট মাথায় নিয়ে বিশ্রাম নিতে পারতেন, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল আরো বড় একটা অর্জন, এই ক্ষেত্রে আরো বড় কোনো গ্যালাক্সী। আরো অনেক দুরের গ্যালাক্সীদের আরো অনেক অনুজ্জ্বল সেফিড নক্ষত্রদের পরিমাপ করে তিনি এই মহাবিশ্বকে আরো সুবিশাল মাত্রায় ম্যাপ করতে সফল হয়েছিলেন। আর যখন এই কাজটি তিনি করছিলেন, তিনি আরো ভিন্ন একটি অসাধারণ সত্য আবিষ্কার করেছিলেন, যা আরো বেশী চমক লাগানো: এই মহাবিশ্ব ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে !

হাবল তার ফলাফল অর্জন করতে সফল হতে পেরেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেস্টো স্লাইফার এর পরিমাপ করা সম্পুর্ন ভিন্ন এক সেট পরিমাপ, স্লাইফারের করা গ্যালাক্সীদের দূরত্বের পরিমাপের একটি তুলনামূলক গবেষণা করে। ভেস্টো স্লাইফার, পরিমাপ করেছিলেন বিভিন্ন গ্যালাক্সী থেকে আসা আলোক বর্ণালীর। এই ধরনের স্পেকট্রা বা বর্ণালীর অস্তিত্ব এবং তাদের প্রকৃতি বোঝাতে হলে আপনাদেরকে আমার নিয়ে যেতে হবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেই শুরুর দিনগুলোতে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারের একটি হচ্ছে ‘স্টার স্টাফ’ বা নক্ষত্ররা যে উপাদানগুলো দিয়ে তৈরী এবং ‘আর্থ স্টাফ’ বা পৃথিবী যে উপাদান দিয়ে তৈরী, সেই উপাদানগুলো মূলত একই। এই সব কিছুর শুরু আসলে হয়েছিল, আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক কিছুই যেমনটি হয়েছিল, আইজাক নিউটনের সাথে। ১৬৬৫ সালে,নিউটন, তখন একজন তরুন বিজ্ঞানী,পুরো ঘর অন্ধকার করে, জানালার পর্দার মধ্যে করা একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে সূর্যের আলোক রশ্মিকে একটি প্রিজমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন এবং লক্ষ্য করেন সুর্য রশ্মি রঙধণুর পরিচিত নানা রঙে বিচ্ছুরিত হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, সূর্যে সাদা আলো আসলে এই সব রঙই ধারণ করে বা এদের মিশ্রনে তৈরী হয় এবং তার ধারণা সঠিক ছিল।

এর প্রায় দেড়শ বছর পর,আরেকজন বিজ্ঞানী (জোসেফ ফন ফ্রাউনহফার) এই বিচ্ছুরিত বর্ণালীর আলো নিয়ে আরো সতর্কভাবে বেশ কিছু বিস্তারিত গবেষণা করেছিলেন এবং এই নানা রঙের বিস্তার বা স্পেক্ট্রাম এর মধ্যে গাঢ় কিছু অন্ধকার কালচে ব্যাণ্ড বা দাগ আবিষ্কার করেন, এবং তিনি এর ব্যাখ্যা হিসাবে যুক্তি দেন এই লাইনগুলো আসলে সূর্যের বহিমন্ডলের থাকার কিছু পদার্থের কারনে ঘটছে, যারা একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ বা নির্দিষ্ট রঙের আলোকে এরা শোষণ (Absorption) করে নিচ্ছে। এই ব্যাণ্ডগুলো যা অ্যাবসর্পশন লাইন (Absorption line বা ফ্রাউনহফার লাইন) নামে যা পরে পরিচিতি পায়। পৃথিবীতে পাওয়া যায় এমন পরিচিত নানা পদার্থ যে তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলো শোষণ করে,যেমন, হাইড্রোজেন,অক্সিজেন,আয়রন, সোডিয়াম এবং ক্যালশিয়াম, তাদের অ্যাবসর্পশন লাইনের সাথে এই লাইনগুলোর তুলনামূলক গবেষণার মাধ্যমে আমরা সেই অজানা মৌলগুলোকে শনাক্ত করতে পারি।


ছবি: জোসেফ ফ্রাউনহফার ( (6 March 1787 – 7 June 1826) তার স্পেকট্রোস্কোপ দেখাচ্ছেন।

১৮৬৮ সালে, আরেকজন বিজ্ঞানী (নরমান লকইয়ের) লক্ষ্য করেন সূর্যের বিচ্ছুরণ প্যাটার্ণে বা স্প্রেকট্রামের হলুদ অংশে দুটি অ্যাবসর্পশন লাইন দেখা যায়, যার এই শোষণ করার প্যাটার্ণের সাথে পৃথিবীতে পাওয়া যায়ে এমন কোন মৌলের মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে না, তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিশ্চয়ই এটি নতুন কোনো মৌল,এবং এর নাম দেন তিনি হিলিয়াম (গ্রীক সুর্যের দেবতা হেলিওস এর নামের সাথে মিল রেখে); এর প্রায় এক প্রজন্ম পর পৃথিবীতে হিলিয়াম আবিষ্কৃত হয়।(১৮৯৫ সালে উইলিয়াম রামসে ক্লীভাইট নামে একটি খনিজ পদার্থের গ্যাসীয় নির্গমনের মধ্যে এটি খুঁজে পান)।

/800px-Picture_of_Norman_Lockyer.jpg” width=”400″ />
(ছবি: নরমান লকইয়ের (Joseph Norman Lockyer, FRS (17 May 1836 – 16 August 1920))

নক্ষত্র থেকে আসা বিকিরিত আলোর বর্ণালীর বিন্যাস বিশ্লেষণ, এইসব নক্ষত্রদের গঠন,তাপমাত্রা এবং বিবর্তন সম্বন্ধে জানার জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক টুল। ১৯১২ থেকে শুরু করে স্লাইফার বিভিন্ন স্পাইরাল নেবুলাদের থেকে আসা আলো বর্ণালী বিশ্লেষণ করে দেখেন এই সব দুরবর্তী নক্ষত্রদের বর্ণালী নিকটবর্তী নক্ষত্রদের বর্ণালীর মতই – শুধুমাত্র সবগুলো অ্যাবসর্পশন লাইন সরে গেছে সমপরিমান তরঙ্গ দৈর্ঘ পরিমানে।

সেই সময়ে এই ধরনের ঘটনার কারণ হিসাবে মনে করা হত পরিচিত ‘’ডপলার ইফেক্ট’ (Doppler Effect) কে। ডপলার ইফেক্ট এর নামটি এসেছে অষ্ট্রীয় পদার্থবিদ ক্রিস্টিয়ান ডপলার এর নাম থেকে: যিনি ১৮৪২ সালে প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোনো একটি চলমান উৎস থেকে আসা তরঙ্গ (শব্দ কিংবা আলো) প্রলম্বিত বা দীর্ঘ হবে যদি উৎসটি আপনার কাছ থেকে দুরে সরে যেতে থাকে এবং তরঙ্গ কমপ্রেসড বা খাটো চাপা হয়ে আসবে যদি উৎসটি আপনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই ধরনের অভিজ্ঞতার সাথে আমরা সবাই পরিচিত এবং এটি আমাকে সিডনী হ্যারিস এর একটা কার্টুনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে দুজন কাউবয় তাদের ঘোড়ার উপর বসে আছে একটা খোলা জায়গায় এবং দুরে একটি ট্রেনের যাওয়া দেখছে এবং একজন আরেকজনকে বলছে, ’আমার এই ট্রেনের বাশীর নির্জন বিলাপ শুনতে খুব ভালো যখন এর তীব্রতার মাত্রার পরিবর্তন হয় ডপলার ইফেক্ট এর জন্য’; আসলেই কোনো ট্রেনের বাশী বা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেশী জোরে আর তীব্রভাবে শোনা যায় যদি ট্রেন বা অ্যাম্বুলেন্সটি আপনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং যখন আপনার থেকে দুরে সরে যাবে তখন আওয়াজটার তীব্রতাও কমে আসবে।

দেখা গেল শব্দ তরঙ্গের সাথে যেমন ঘটে ঠিক তেমনটাই ঘটছে আলোক তরঙ্গের সাথে, যদিও খানিকটা ভিন্ন কারণে। কোনো একটি উৎস থেকে আসা আলোক তরঙ্গ যা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, হয় মহাশূন্যে তার নিজস্ব স্থানীয় গতির জন্য কিংবা মধ্যবর্তী সুবিশাল মহাশূন্যের বিস্তৃতির জন্য, প্রলম্বিত বা দীর্ঘাকৃতির বা স্ট্রেচড হবে, এবং সেকারণে দেখতে এটি আরো অধিকতর লাল হবে (রেড শিফট), স্বাভাবিকভাবে এর যতটা লাল হবার কথা ছিল তার চেয়ে বেশী; কারণ লাল হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিক্ষমতার স্পেক্ট্রামে সবচেয়ে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলোর প্রান্ত; এবং আলোর কোন উৎস যেটি আপনার দিকে আসছে সেখান থেকে আলোক তরঙ্গ খাটো এবং কমপ্রেসড হবে অতএব আরো বেশী নীল মনে হবে (আমাদের ভিজুয়াল স্পেকট্রাম এর খাটো তরঙ্গ দৈর্ঘ প্রান্ত হচ্ছে নীল)।

১৯১২ সালে স্লাইফার লক্ষ্য করেছিলেন সব স্পাইরাল নেবুলাগুলো থেকে আসা আলোর অ্যাবসর্পশন লাইন প্রায় সবগুলোই পদ্ধতিগতভাবে সরে গেছে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘের দিকে (যদিও কয়েকটি যেমন অ্যান্ড্রোমিডা, সরে গেছে খাটো তরঙ্গ দৈর্ঘের দিকে); তিনি সঠিকভাবেই এর উপসংহার টানতে পেরেছিলেন যে,সুতরাং এই সব মহাজাগতিক বস্তুগলো আমাদের কাছ থেকে আসলে দূরে সরে যাচ্ছে যথেষ্ট পরিমান দ্রুতগতিতে।


ছবি: ভেসটো স্লাইফার (Vesto Melvin Slipher- November 11, 1875 to November 8, 1969), যদিও কৃতিত্বটি হাবলকে দেয়া হয়, তবে দুরে সরে যাওয়া গ্যালাক্সীদের রেড শিফট তিনি আবিষ্কার করেন। পরে যা হাবল তার পর্যবেক্ষণের সাথে যুক্ত করে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের একটি পরীক্ষামূলক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

হাবল তার নিজের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া এই সব স্পাইরাল গ্যালাক্সীদের ( ততদিনে জানা হয়ে গেছে এরা আসলে দূরবর্তী ছায়াপথ) দূরত্বের সাথে স্লাইফারের পরিমাপ করা গতি, যে গতিতে নক্ষত্রগুলো আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে পেরেছিলেন। ১৯২৯ সালে মাউন্ট উইলসন এর একজন স্টাফ মেম্বার মিল্টন হিউমাসন এর (যার কারিগরী প্রতিভা এত বেশী ছিল যে, তিনি মাউন্ট উইলসনে একটি স্থায়ী চাকরী জোগাড় করতে পেরেছিলেন কোনো হাইস্কুল ডিপ্লোমা ছাড়াই; হিউমাসন মাউন্ট উইলসন তৈরী করার সময় আসলে মালপত্রবাহী মিউল পরিবহনের চালক ছিলেন, পরে তিনি সেখানকার জ্যানিটর হন এবং ধীরে ধীরে একজন স্টাফ জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে তার জায়গা করে নেন। ১৪ বছরের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আর লেখাপড়া করেননি) সাথে তিনি ঘোষণা করেন একটি অসাধারণ পর্যবেক্ষণ নির্ভর একটি সম্পর্ক: যাকে এখন বলা হয় হাবল এর সুত্র (Hubble’s law): রিসেশনাল ভেলোসিটি বা বেগ (রিসেশনাল ভেলোসিটি বা বেগ বলতে সেই বেগকে বোঝায়, যে বেগে কোন একটি বস্তু একজন পর্যবেক্ষনকারীর কাছ থেকে দুরে সরে যায়, এই ক্ষেত্রে যেমন গ্যালাক্সী)এবং গ্যালাক্সীর দূরত্বের মধ্যে একটি লিনিয়ার বা সরলরৈখিক সম্পর্ক আছে; বা বলা যেতে পারে, কোনো গ্যালাক্সী যত দূরে আছে নক্ষত্রগুলো তত বেশী দ্রুত বেগে আমাদের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ দূরবর্তী ছায়াপথগুলোর এই রিসেশনাল বেগ পৃথিবী থেকে এর দূরত্বের সমানুপাতিক, অর্থাৎ রিসেশনাল বেগ যত বেশী হবে সেই বস্তুটির দুরত্ব তত বেশী।


(ছবি: হাবল ও হিউমাসন)

যখন প্রথমবারের মত কারো কাছে এই বিশেষ বাস্তব সত্যটি উপস্থাপন করা হয় – প্রায় সব গ্যালাক্সী আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে , এবং যারা দ্বিগুন পরিমান দূরে আছে, তারা দ্বিগুন বেগে দুরে সরে যাচ্ছে, যারা তিনগুণ দুরে আছে তারা তিনগুণ বেগে দুরে সরে যাচ্ছে ইত্যাদি – মনে হয় বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে,আমরা তাহলে কি মহাবিশ্বের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত !

কিছু বন্ধু প্রস্তাব করেছে, আমাকে নিয়মিতভাবেই তাদের মনে করিয়ে দেবার প্রয়োজন হয়েছে, বিষয়টা আসলে তা না, বরং, এটি লোমেইত ঠিক যে সম্পর্ক সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন এটি তার সঙ্গতিপুর্ণ। আমাদের মহাবিশ্ব আসলেই সম্প্রসারণশীল।

আমি বিভিন্ন ভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি, আর আসলেই আমি মনে করি, এটি ভালোভাবে বোঝানোর কোনো উপায় নেই যদিনা আপনি প্রচলিত ধারনার বাইরে বা আউটসাইড দ্য বক্স চিন্তা না করেন- এক্ষেত্রে মহাবিশ্বের বা ইউনিভার্সাল বক্সের বাইরে। হাবলের সূত্র যা ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটি সেটি বোঝার জন্য, আপনার নিজেকে প্রথমে আমাদের গ্যালাক্সীর সেই মায়োপিক বা হ্রস্বদৃষ্টির দেখার অবস্থান বা ভ্যানটেজ পয়েন্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে হবে এবং আমাদের মহাবিশ্বকে দেখতে হবে মহাবিশ্বের বাইরের কোনো অবস্থান থেকে। যদিও ত্রিমাত্রিক একটি মহাবিশ্বের বাইরে দাড়ানো কঠিন কাজ, তবে দ্বিমাত্রিক কোনো মহাবিশ্বের বাইরে দাড়ানো অপেক্ষাকৃত সহজ। নীচে আমি এরকম একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ড্রইং একেছি দুটি ভিন্ন সময়ে (ধরা যাক t1 এবং t2); আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, দ্বিতীয় ড্রইং এ গ্যালাক্সীগুলো আরো দূরে সরে গেছে পরস্পর থেকে দ্বিতীয় সময় বিন্দুতে।

?w=660″ width=”400″ /> 

এখন কল্পনা করুন আপনি দ্বিতীয় সময় বিন্দু, t2 তে, এদের মধ্যে কোনো একটা গ্যালাক্সীতে বাস করেন, আমি সেই গ্যালাক্সীটাকে সাদা রঙ দিয়ে চিহ্নিত করবো t2 সময়ে।

?w=660″ width=”400″ />

গ্যালাক্সীর এই দেখার অবস্থান বা ভ্যানটেজ পয়েন্ট থেকে মহাবিশ্বর বিবর্তন কেমন দেখতে লাগতে পারে সেটা বোঝাতে আমি শুধু ডানদিকের ছবিটা এবার বা দিকের ছবির উপর সুপারইমপোজ বা উপরিস্থাপিত করেছি।

?w=660″ width=”400″ />

এবার দেখুন সাদা গ্যালাক্সীটাকে (যেখানে আপনি বসবাস করছেন) পাশের ছবির সেই ঠিক একই গ্যালাক্সীটার উপর স্থাপন করে। দেখুন এবার এই গ্যালাক্সীটার ভ্যানটাজ পয়েন্ট থেকে অন্য প্রত্যকটি গ্যালাক্সী দুরে সরে যাচ্ছে, যারা দ্বিগুন দুরত্বে আছে তারা একই সময় এই দ্বিগুণ দূরত্বে সরে যাচ্ছে, যারা তিনগুণ দূরে আছে, তারা এই দুরত্বের তিনগুণ দূরত্ব অতিক্রম করছে ইত্যাদি। যতক্ষণ না পর্যন্ত মহাবিশ্বের কোনো প্রান্ত বা সীমানা থাকবে না যারা এই সাদা রঙ এর গ্যালাক্সীতে থাকবে তাদের কাছে মনে হবে তারা মহাবিশ্বের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত।
আপনি কোন গ্যালাক্সী বেছে নিয়েছেন তাতে কিছু আসবে যাবে না, অন্য একটা গ্যালাক্সী পছন্দ করুন,আর প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করে দেখুন।

?w=660″ width=”400″ />

আপনার পারসপেকটিভ বা দর্শানুপাতের উপর নির্ভর করে, তাহলে, হয় ‘প্রতিটি জায়গা’ মহাবিশ্বের কেন্দ্র অথবা ’কোন জায়গা’ না, কিছু আসে যায়না এই বিষয়টিতে; হাবলের সূত্র সম্প্রসারণশীল একটি মহাবিশ্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

তবে, হাবল এবং হিউমাসন যখন প্রথম তাদের বিশ্লেষণটি প্রকাশ করেছিলেন ১৯২৯ সালে, তারা শুধু রিসেশন বেগ এবং দুরত্বের সরলরৈখিক সম্পর্কটাই রিপোর্ট করেননি, তারা এই সম্প্রসারনের হারের একটি সংখ্যাবাচক পরিমাপও গণনা করেছিলেন। নীচে এখানে আসল উপাত্ত উপাস্থাপন করা হয়েছে, সেই সময় যেভাবে দেখানো হয়েছিল:

?w=660″ width=”400″ />

এখানে যেমন আপনারা দেখতে পারছেন, তার পাওয়া ডাটা সেটের মধ্যে একটি সরলরৈখিক সম্পর্ক থাকার হাবলের অনুমানটা মনে হতেই পারে অপেক্ষাকৃতভাবে ভাগ্যের ব্যাপার ( এখানে অবশ্যই একটা সম্পর্ক আছে কিন্তু একটি সরল রেখা এই উপাত্তগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হবে তা কিন্তু প্রাপ্ত ডাটা দেখে তা বোঝা সম্ভব না); সম্প্রসারণ হারের যে সংখ্যাটি তারা পেয়েছিলেন, তা তাদের করা প্লট থেকেই এসেছে, যা প্রস্তাব করছে, কোনো একটি গ্যালাক্সী যেটি এক মিলিয়ন পারসেক (parsecs)(বা ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ ) দূরে আছে – গ্যালাক্সীদের মধ্যবর্তী যা গড় দূরত্ব মনে করা হয়- আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে প্রতি সেকেণ্ডে ৫০০ কিলোমিটার বেগে। যদিও এই পরিমাপটির ভাগ্য তেমন সুপ্রসন্ন ছিলনা।

এর কারণটা কিন্তু অপেক্ষাকৃত সহজ বোঝার জন্য। যদি সব কিছু আজ পরস্পর থেকে দূরে সরে যেতে থাকে , তাহলে অতীতের কোনো এক সময়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি ছিল; যদি মাধ্যাকর্ষণ বা গ্র্যাভিটি দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল হয়ে থাকে, তাহলে এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারনকে মন্হর করে দেয়ার কথা, এর অর্থ এখন যে কোনো একটি গ্যালাক্সীকে আমাদের থেকে যে বেগে দুরে সরে যেতে দেখছি ( প্রতি সেকেণ্ডে ৫০০ কিলোমিটার), অতীতে নিশ্চয়ই তা আরো দ্রুতবেগে দূরে সরে গিয়েছিল।

যদি একমুহূর্তের জন্যে হলেও, যদি, আমরা ধরে নেই গ্যালাক্সীরা ঐ বেগেই চিরকাল দূরে সরে গিয়েছে, আমরা তাহলে বীপরিত দিকে গণনা করে পরিমাপ করতে পারি কতদিন আগে সেই গ্যালাক্সীটি আমাদের গ্যালাক্সী এখন যেখানে আছে সেই একই অবস্থানে ছিল। যেহেতু দ্বিগুন দুরত্বের গ্যাল্যাক্সীরা দ্বিগুন বেগে দূরে সরে যায়, আমরা যদি পেছন দিকে অতিক্রান্ত সময়ের হিসাব করি, তাহলে দেখবো যে তারা আমাদের গ্যালাক্সীর একই অবস্থানের উপর সুপারইমপোজ বা উপরিস্থাপিত ছিল ঠিক একই সময়ে। সম্পুর্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে, এমন সমগ্র মহাবিশ্ব আসলে উপরিস্থাপিত ছিল একটি বিন্দুতে, বিগ ব্যাঙ্গ,এমন একটি সময়, যা আমরা পরিমাপ করতে পারি এভাবে।

এধরনের কোন সময়ের পরিমাপ স্পষ্টতই মহাবিশ্বর প্রকৃত বয়সের উপরের সীমাকেই নির্দেশ করে, কারণ যদি গ্যালাক্সীরা কোনো একসময় আরো দ্রুত বেগে দূরে সরে যেয়ে থাকে, তাহলে তারা এখন যে অবস্থানে আছে সেখানে পৌছাতে আনুমানিকভাবে যে সময়ের পরিমাপ প্রস্তাব করা হয়েছে, তার চেয়ে কম সময় লেগেছে।
হাবলের বিশ্লেষণের এই পরিমাপ অনুযায়ী বিগ ব্যাঙ্গ হয়েছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন বছর আগে। কিন্তু এমনকি ১৯২৯ সালে, যদিও সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল (টেনেসী, ওহাইও এবং আর কয়েকটি রাজ্যর আক্ষরিক অর্থে ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক বিশ্বাসীরা ছাড়া) পৃথিবী ৩ বিলিয়ন বছরের চেয়ে প্রাচীন।

বেশ, এই পরিমাপ বিজ্ঞানীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়, মহাবিশ্বর তুলনায় দেখা যাচ্ছে পৃথিবীরই বয়স বেশী; কিন্তু তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটা হলো, এই ফলাফলটি প্রস্তাব করেছিল, নিশ্চয়ই এই বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কিছু ভুল আছে।

এই সংশয়ের উৎস ছিল শুধুমাত্র হাবলের গ্যালাক্সীদের দূরত্ব পরিমাপ প্রক্রিয়ায়: আমাদের গ্যালাক্সীর সাথে সেফিড নক্ষত্রদের সম্পর্ক ব্যবহার করে এই দূরত্ব পরিমাপে তার প্রক্রিয়ায় কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল। দূরত্ব পরিমাপের প্রক্রিয়ার ধাপগুলো ছিল: প্রথমে কাছের সেফিডদের ব্যবহার করে আরো দুরবর্তী সেফিডদের দূরত্ব পরিমাপ করা এবং তারপর আরো দূরে অবস্থিত কোনো গ্যালাক্সীর দূরত্ব পরিমাপ করা যেখানে আরো দূরবর্তী সেফিড পর্যবেক্ষণ করার পর,তা আসলে ত্রুটিপূর্ণ ছিল।

এই পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো কিভাবে অতিক্রম করা হয়েছে তার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ এবং জটিল এখানে বর্ণনা করার জন্য। এবং এছাড়া, এটি এখন আর কোনো সমস্যা না কারণ দূরত্ব পরিমাপ করার এখন অনেক ভালো কৌশল আমাদের জানা আছে।

হাবল টেলিস্কোপে তোলা আমার প্রিয় একটি ফটোগ্রাফ নীচে দেখানো হয়েছে:

ছবিটিতে আমরা দেখতে পাই পৃথিবী থেকে বহু দূরের একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সী এবং অনেক অনেক দিন আগে, (অনেক অনেক দিন আগে কারণ গ্যালাক্সীটি থেকে আলো আমাদের কাছে এসে পৌছাতে বেশ কিছু সময় – ৫০ মিলিয়ন বছরের বেশী- নিয়েছে আমাদের কাছে পৌছানোর জন্য); এরকম কোনো একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সীর মধ্যে, যার সাথে আমাদের গ্যালাক্সীর মিল আছে, প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র আছে। খুব উজ্জল এর কেন্দ্রীয় অংশটিতেই আছে প্রায় ১০ বিলিয়ন নক্ষত্র। লক্ষ্য করুন ফটোগ্রাফটির নীচের বা দিকের কোনায় একটি তারা যে উজ্জ্বলতায় জ্বল জ্বল করছে তা প্রায় এইসব ১০ বিলিয়ন নক্ষত্রর উজ্জ্বলতার সমান। প্রথম দেখাতে আপনি সঙ্গত কারণে মনে করতে পারেন এটা আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সীর কাছাকাছি থাকা কোনো একটি উজ্জ্বল তারা যা এই গ্যালাক্সীর ছবিটি তোলার সময় সামনে চলে এসেছে। কিন্তু আসলে এটি সেই একই দুরের গ্যালাক্সীরই একটি তারা, ৫০ মিলিয়ন আলোক বর্ষেরও বেশী দূরে।

স্পষ্টতই এটা কোনো সাধারণ নক্ষত্র না, এটি এমন একটি নক্ষত্র যা কেবল বিস্ফোরিত হয়েছে, একটি সুপারনোভা মহাবিশ্বে অন্যতম উজ্জ্বলতম একটি ফায়ার ওয়ার্কস। যখন কোনো নক্ষত্র বিস্ফোরিত হয়, সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ( প্রায় এক মাস বা তার কাছাকাছি ) এটি দৃশ্যমান আলোসহ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ১০ বিলিয়ন নক্ষত্রের উজ্জলতা নিয়ে।
আমাদের জন্য আনন্দের একটি ব্যাপার , সাধারণত নক্ষত্ররা তেমন প্রায়শই বিস্ফোরিত হয়না, সাধারণত প্রতি একশ বছরে গ্যালাক্সী প্রতি একটি। কিন্তু আমরা ভাগ্যবান যে নক্ষত্ররা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, কারণ তারা যদি বিস্ফোরিত না হতো, আমরাও এখানে থাকতাম না, কোনো অস্তিত্বই থাকতো না। মহাবিশ্ব সম্বন্ধে সবচেয়ে কাব্যিক যে সত্যটি আমি জানি তা হলো, নিঃসন্দেহে আপনার শরীরের প্রতিটি পরমাণু কোনো এক সময় বিস্ফোরিত হয়েছে এমন কোনো নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ছিল; উপরন্তু আপনার বাম হাতের পরমাণুরা এসেছে, আপনার ডান হাতের পরমাণুদের উৎস থেকে ভিন্ন কোনো নক্ষত্র থেকে। আমরা সবাই,আক্ষরিক অর্থেই, নক্ষত্র সন্তান, আর আমাদের শরীর গঠন করেছে নক্ষত্রকণা।

কেমন করে আমরা এসব জেনেছি? বেশ, আমরা আমাদের বিগ ব্যাঙ্গ এর সেই পরিস্থিতি সম্বন্ধে যতটুকু জানি, সেটাকে মহাবিশ্বের শুরুর সেই সময়ের, যখন মহাবিশ্বের বয়স মাত্র ১ সেকেন্ড ছিল, সেটার সাথে এক্সট্রাপোলেট করতে পারি (এক্সট্রাপোলেশন হচ্ছে জানা কিছু উপাত্তর উপর ভিত্তি করে নতুন উপাত্ত তৈরী করার একটি প্রক্রিয়া) এবং এভাবে আমরা গণনা করি যে,মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ একসাথে কমপ্রেসড ছিল অত্যন্ত ঘন প্লাজমা আকারে, যার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডিগ্রী (কেলভিন স্কেলে); এবং এই তাপমাত্রায় নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশন বা পারমানবিক বিক্রিয়া ঘটে খুব সহজেই, প্রোটন এবং নিউট্রণ একসাথে যুক্ত হয় আবার সংঘর্ষের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার পরবর্তীতে মহাবিশ্ব ক্রমশ শীতল হতে শুরু করে; আমরা কিন্তু পূর্বধারণা করতে পারি, কি হারে এইসব আদিম নিউক্লিয়াস তৈরীর উপাদানগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে হাইড্রোজেন এর চেয়ে ভারী কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াস তেরী করে ( যেমন, হিলিয়াম, লিথিয়াম এবং এভাবে বাকীরা ভারী মৌলরা)।

যখন সেটি করা হয়, আমরা যা দেখতে পাই তা হলো, লিথিয়ামের চেয়ে ভারী- যা প্রকৃতিতে তৃতীয়তম হালকা নিউক্লিয়াস-আর কোন নিউক্লিয়াসই তৈরী হয়না এই আদিম অগ্নিগোলকে যাকে আমরা বিগ ব্যাঙ্গ বলছি। আমরা বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, আমাদের গণনা সম্পুর্ণ ঠিক আছে, কারণ সবচেয়ে হালকা মৌলের মহাজাগতিক প্রাচুর্য সম্বন্ধে আমাদের পূর্বধারণা নির্ভুল এবং এই সব পর্যবেক্ষণের সাথে যা অত্যন্ত সঙ্গতিপুর্ণ। মহাবিশ্বে এই সব হালকাতম মৌলগুলো –হাইড্রোজেন, ডিউটেরিয়াম ( ভারী হাইড্রোজেন এর নিউক্লিয়াস), হিলিয়াম এবং লিথিয়াম- এর প্রাচুর্যের পার্থক্য একে অপরের থেকে প্রায় ১০ গুণিতক ( মোটামুটি ২৫ শতাংশ ভর অনুযায়ী প্রোটন এবং নিউট্রন, তৈরী করে হিলিয়াম, এবং প্রতি ১০ বিলিয়নে একটি প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরী করে একটি লিথিয়াম নিউক্লিয়াস); এই অবিশ্বাস্য মাত্রার ব্যাপারে তাত্ত্বিক এবং পর্যবেক্ষণগত ভবিষ্যদ্বাণীও একমত।

এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সফল, গুরুত্বপূর্ণ এবং বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী, যা আমাদের বলছে বিগ ব্যাঙ্গ আসলেই ঘটেছিল। শুধুমাত্র একটি উত্তপ্ত বিগ ব্যাঙ্গই পারে মহাবিশ্বে পর্যবেক্ষণক্ষম হালকা মৌলগুলো এই অতিপ্রাচুর্য্যকে ব্যাখ্যা করতে এবং বর্তমানে পর্যবেক্ষিত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সাথে এটি সঙ্গতিও রক্ষা করছে। আমি আমার পেছনের পকেটে ছোট একটি ওয়ালেট কার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াই যা একটা তুলনামুলক চিত্র দেখাচ্ছে, হালকা মৌলগুলোর প্রাচুর্য সংক্রান্ত ধারণা এবং পর্যবেক্ষিত প্রাচুর্য; এটি আমার সাথে রাখি কারণ যখনই আমার এমন কারো সাথে দেখা হয়, যে বিশ্বাস করে না বিগ ব্যাঙ্গ ঘটেছিল, আমি এটা তাদের দেখাই। সাধারণত আলোচনার সময় এই পর্যায় পর্যন্ত পৌছানোর প্রয়োজন হয়নি, তবে অবশ্যই, খুব কম সময়ই আসলে ডাটা সেই সব মানুষদের মনে দাগ কাটে, যারা আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন যে, এই দৃশ্যপটে নিশ্চয়ই কিছু সমস্যা আছে। তারপরও আমি কার্ডটা সাথে রাখি, নীচে আপনাদের জন্য এটি কপি করে দিলাম:

?w=660″ width=”400″ />

যদিও লিথিয়াম কারো কারো জন্য জরুরী হলেও, বাকী সবার কাছে অনেক বেশী জরুরী হলো আরো ভারী নিউক্লিয়াসগুলো, যেমন, কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, আয়রন এবং অন্যগুলো। এই সব ভারী মৌলগুলো কিন্তু বিগ ব্যাঙ্গ এর সময় তৈরী হয়নি। শুধু মাত্র একটি জায়গায় এরা তৈরী হতে পারে তা হলো কোনো নক্ষত্রের উত্তপ্ত কেন্দ্রে। এবং আজ আপনার শরীরে এদের আসার একটিই মাত্র উপায় ছিল, সেটা হলো, এই নক্ষত্রগুলো যদি দয়া করে বিস্ফোরিত হয় এবং তাদের অভ্যন্তরে তৈরী করা এই সব মৌলগুলোকে তারা সজোরে মহাশূন্যে ছড়িয়ে দেয়, যেন এইসব ভারী মৌল গুলো, আমরা সুর্য নামে ডাকি এমন একটি নক্ষত্রর কাছাকাছি একটি ছোট নীল গ্রহের ভিতরে এবং এর চারপাশে জমাট বাধতে পারে। আমাদের এই গ্যালাক্সীর ইতিহাসে, প্রায় ২০০ মিলিয়ন নক্ষত্র এভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে। এই অসংখ্য নক্ষত্র, আপনি যদি বলতে চান বলতে পারেন, নিজেদের উৎসর্গ করেছে, যেন একদিন আপনি জন্ম নিতে পারেন। আমি মনে করি এই সত্যটি আর যে কোনো কিছুর মত এদের যোগ্য করেছে প্রকৃত ত্রানকর্তা হিসাবে মর্যাদা পাবার জন্য।

দেখা গেছে কিছু বিশেষ ধরনের বিস্ফোরিত হওয়া নক্ষত্র, যেমন টাইপ Ia সুপারনোভা, ১৯৯০ এর দশকের বেশ কিছু সতর্ক আর নিবিড় গবেষণায় দেখা গেছে এদের কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন খু্ব বেশী নির্ভুলতার সাথে টাইপ Ia সুপারনোভাগুলো অন্তর্গতভাবে বেশী উজ্জ্বল এবং এই উজ্জ্বলতা তারা ধরে রাখে দীর্ঘসময় ধরে। এই সম্পর্কটি বা কোরিলেশনটি যদিও তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি তবে পর্যবেক্ষণ নির্ভর পরীক্ষায় এর ভিত্তি মজবুত। এর মানে হচ্ছে এই সুপারনোভাগুলো খুবই ভালো ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডল’, এটা দিয়ে আমরা বোঝাতে চাইছি, এই সুপারনোভাগুলোকে ব্যবহার করা যেতে পারে দুরুত্ব ক্যালিব্রেট বা পরিমাপ করার জন্য, কারণ তার অন্তস্থ উজ্জ্বলতা সরাসরি পরিমাপ করার মাধ্যমে নিশ্চিৎ করা যেতে পারে, যা তাদের দুরত্ব থেকে স্বতন্ত্র, অর্থাৎ এদের উজ্জ্বলতা আমরা মাপতে পারবো দুরত্ব সংক্রান্ত কোনো উপাত্ত ছাড়া।, আমরা যদি দুরের কোনো গ্যালাক্সীতে একটি সুপারনোভা লক্ষ্য করে থাকি- এবং আমরা তা লক্ষ্য করতে পারছি কারন তারা খুবই উজ্জ্বল- এরপর এটি কত দীর্ঘ সময় ধরে উজ্জ্বল আছে সেটি লক্ষ্য করে আমরা এর ইনট্রিনসিক বা অন্তস্থ উজ্জ্বলতা সম্বন্ধে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারি। তারপর আমাদের টেলিস্কোপ দিয়ে এর আপাত উজ্জ্বলতাকে পরিমাপ করে সঠিকভাবে বলতে পারি এই সুপারনোভাটি এবং এটি যে গ্যালাক্সীতে অবস্থান করছে বা এর হোষ্ট গ্যালাক্সীটা কত দূরে অবস্থিত। তারপর এই গ্যালাক্সীর নক্ষত্রদের থেকে আসা আলোর ‘রেড শিফট’ পরিমাপ করে আমরা এর রিসেশন বা দুরে সরে যাবার গতিবেগ নির্নয় করতে পারি এবং এভাবে এই গতিবেগকে এর দুরত্বের সাথে তুলনা করে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার সম্বন্ধে একটি ধারণা পেতে পারি।

?w=490&h=350″ width=”400″ />
(ছবি: ক্যাসিওপিয়া এ ‘(Cassiopeia A) এর চমৎকার একটি ছবি। ছবির রংটা অবশ্য কাল্পনিক। ক্যাসিওপিয়া এ একটি সুপার নোভার অবশিষ্টাংশ। ছবিটির ঠিক কেন্দ্রে আছে মৃত নক্ষত্রটি, আর চারপাশে পদার্থের ক্রমবর্ধমান একটি খোলস, যা নক্ষত্র থেকে ছিটকে পড়েছে এর মৃত্যুর সময়। )

এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু যদি সুপারনোভা বিস্ফোরিত হয় গ্যালাক্সী প্রতি একশ বছরে একটা , তাহলে কেমন সম্ভাবনা আসলে আছে, আমরা তাদের কোনো একটা দেখতে পারবো? কারণ, মনে রাখা প্রয়োজন,আমাদের এই গ্যালাক্সীতে ঘটা শেষ সুপারনোভাটি দেখেছিলেন ইয়োহানেস কেপলার, ১৬০৪ খৃষ্টাব্দে। আসলেই একটা প্রচলিত কথা আছে, আমাদের গ্যালাক্সীর সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব শুধুমাত্র কোনো মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জীবদ্দশায়, আর অবশ্যই কেপলার অবশ্যই সেরকম একজন ছিলেন।

অস্ট্রিয়ায় একজন সাধারণ অংকের শিক্ষক হিসাবে জীবন শুরু করা কেপলার একসময় বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহের সহকারী হয়েছিলেন (টাইকো ব্রাহে নিজেও আমাদের গ্যালাক্সীতে একটি সুপারনোভা দেখেছিলেন এবং এর পুরষ্কার স্বরুপ ডেনমার্কের রাজা তাকে আস্ত একটি দ্বীপ উপহার দিয়েছিলেন) এবং সৌরজগতের গ্রহদের নানা অবস্থানের প্রায় এক দশকের বেশী সময় ধরে টাইকো ব্রাহের সংগ্রহ করা উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কেপলার তার বিখ্যাত প্ল্যানেটারী মোশন বা গ্রহের গতিপথের তিনটি সূত্র প্রস্তাব করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে:

১. গ্রহরা সুর্যের চারপাশে প্রদক্ষিন করছে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে (এলিপস)।
২. সূর্য এবং একে প্রদক্ষিণরত গ্রহকে সংযুক্ত করে আঁকা একটি ‘সরলরেখা’ সমপরিমান সময়ের ব্যবধানে সমপরিমান ‘এলাকা’য় বিভাজিত করে।
৩. কোন একটি গ্রহের সম্পুর্ণ প্রদক্ষিনকালের সময়কাল বা ‘অরবিটাল পিরিওড’ এর ‘বর্গফল’, এর কক্ষপথের ‘সেমি-মেজর অক্ষটির’ ঘণফল (৩য় শক্তি) এর সরাসরি সমানুপাতিক (উপবৃত্তের ‘সেমি-মেজর অ্যাক্সিস’,উপবৃত্তের সবচেয়ে প্রশস্ততম অংশের সরলরৈখিক দুরত্ব বা ব্যাসের অর্ধেক);

/436px-Johannes_Kepler_1610.jpg” width=”400″ />
(ছবি: ইয়োহানেস কেপলার (December 27, 1571 – November 15, 1630) ; কেপলার প্রথম প্ল্যানেটারী মোশনের সুত্রগুলো প্রণয়ন করেছিলেন।)

এই সুত্রগুলো পরবর্তীতে, প্রায় একশ বছর পর নিউটনের ইউনিভার্সাল গ্র্যাভিটির সূত্রগুলো উদঘাটনের ভিত্তি রচনা করেছিল। এই অসাধারণ অবদান ছাড়াও কেপলার সফলভাবে তার মায়ের বিরুদ্ধে আনা ডাকিনী বিদ্যা চর্চ্চার অভিযোগে বিচারে লড়াই করেছিলেন; এবং এছাড়া চাঁদে যাবার একটি ভ্রমন কাহিনী লিখেছিলেন, যা সম্ভবত প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী।

ইদানীং অবশ্য সুপারনোভা দেখার একটি সহজ উপায় হচ্ছে বিভিন্ন গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের আকাশে একটি করে গ্যালাক্সীর দিকে সতর্ক লক্ষ্য রাখার জন্য ভাগ করে দেয়া। কারণ, আর যাই হোক, মহাজাগতিক অর্থে একশ বছর খুব একটা ভিন্ন না, পিএইচডি শেষ করার গড় সময়কাল থেকে এবং গ্রাজুয়েট ছাত্ররা যেমন সস্তা তেমনি সংখ্যায়ও কম না। আনন্দের কথা হলো, আমাদের এই চরম ব্যবস্থা গ্রহন করার কোনো প্রয়োজনই পড়েনি,এবং সেটা খুবই সহজ সরল একটি কারণে: এই মহাবিশ্ব আসলে অনেক অনেক বিশাল এবং প্রাচীন, আর সে কারণে দুর্লভ ঘটনাও প্রায় সবসময়ই ঘটছে।

যে কোন একটি রাতে বন কিংবা মরুভূমিতে যদি বেড়াতে যান, যেখানে আপনি বেশ স্পষ্টভাবেই আকাশ ভরা নক্ষত্রদের দেখতে পাবেন, এবার আপনার হাতটা আকাশের দিকে উপরে তুলে ধরুন, এরপর আপনার তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল এক করে খুব ছোটো একটি বৃত্ত তৈরী করুন, এবার আকাশের যে জায়গায় কোনো দৃশ্যমান নক্ষত্র দেখা যাচ্ছেনা, এমন অন্ধকার অংশের দিকে এই বৃত্তটি তুলে ধরুন। এই অন্ধকার অংশটিতে, বর্তমানে ব্যবহার করা হয় এমন কোনো যথেষ্ট বড় টেলিস্কোপ দিয়ে চোখ রাখলে, আপনি হয়ত ১০০,০০০ গ্যালাক্সী আলাদা করে খুঁজে বের করতে পারবেন, যাদের প্রত্যেকটিতে শত বিলিয়ন নক্ষত্র আছে। যেহেতু সুপারনোভা বিস্ফোরিত হচ্ছে প্রতি ১০০ বছরে ১ বার, তাহলে এই ১০০,০০০ গ্যালাক্সীতে, যা দেখা যাচ্ছে, আপনি হয়তো আশা করতে পারেন, গড়ে, যে কোনো রাতে প্রায় তিনটি নক্ষত্রকে বিস্ফোরিত হতে দেখা যেতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ঠিক সেই কাজটি করছেন, প্রথমে তারা টেলিস্কোপ ব্যবহার করার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেন এবং কোনো রাতে তারা হয়তো একটি নক্ষত্রকে বিস্ফোরিত হতে দেখেন, কোনো রাতে হয়ত দুটি, আর কোনো রাত হয়তো মেঘলা থাকতে পারে, তখন আর কিছু দেখা সম্ভব হয় না। এভাবে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্ষম হয়েছেন নির্ভুলভাবে হাবল কনস্ট্যান্ট (যে হারে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে) বা ধ্রুবর পরিমাপ করতে ১০ শতাংশ অনিশ্চয়তারও কমে। নতুন যে সংখ্যাটি আমরা পেয়েছি, গড়ে ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ পরস্পর দুরত্বে থাকা গ্যালাক্সীদের জন্য এটি হলো প্রতি সেকেন্ডে ৭০ কিলো মিটার । এটি হাবল এবং হিউমাসন যা পেয়েছিলেন তার প্রায় ১০ গুণ ছোট একটি সংখ্যা; ফলে আমরা এখন পরিমাপ করতে পারি যে, মহাবিশ্বের বয়স ১.৫ বিলিয়ন বছর না বরং প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি।

এই বইটিতে আমি পরে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করবো, এটিও স্বতন্ত্রভাবে পরিমাপ করা আমাদের গ্যালাক্সীতে সবচেয়ে প্রাচীনতম নক্ষত্রের বয়সের সাথেও সামন্জষ্যপুর্ণ। ব্রাহে থেকে কেপলার, লোমেইত থেকে আইনস্টাইন এবং হাবল এবং নক্ষত্রদের বর্ণালী থেকে হালকা মৌলের প্রাচু্র্য, চারশ বছরের আধুনিক বিজ্ঞান সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের এই অসাধারণ এবং বার বার একই পুর্বাপর সঙ্গতিপুর্ণ দৃশ্যপটটি আমাদের সামনে উন্মোচন করে চলছে। সবকিছুই এর স্বপক্ষে। বিগ ব্যাঙ্গের দৃশ্যপটটি তার উপযুক্ত অবস্থানটি আরো দৃঢ়তার সাথেই ধরে রেখেছে।

(সমাপ্ত)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − = 38