”জাদু” অলৌকিক বিশ্বাসের জননী।

বাংলাদেশেই বা বলি কেন আমাদের সমগ্র উপমহাদেশেই জাদু বিশ্বাস অলৌকিক বিশ্বাসের একটা বিরাট কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যি কথা বলতে কি শুধু এই অঞ্চলেই নয়, সাধারণত পৃথিবীর অনুন্নত এলাকার মানুষেরা, এমনকি এসব অঞ্চলের সাধারণ শিক্ষিত মানুষেরা পর্যন্ত এই জাদুর রহস্য ভেদ করতে না পেরে এটাকে অলৌকিক হিসেবে বিশ্বাস করে থাকে।

আমার মনেহয় অলৌকিক বিশ্বাসের মুল ভিত্তিটা এখানেই প্রথিত। জাদুর বিস্ময়কর কর্ম কান্ড মানুষকে দারুণ ভাবে প্রভাবিত করে। এখান থেকেই বিশ্বাসের সূচনা হয়। মানুষ মনে করে মন্ত্রবলে ভুত, জিন, পরী, দৈত্য, দানব বশীভূত করে অসাধ্য সাধন করা যায়। তাদের ধারনা জাদুকরের হাতের একখণ্ড কাঠি বা একটা হাড়ের টুকরার মধ্যে বিশাল অলৌকিক শক্তি লুকিয়ে আছে। এই হাড় বা কাঠির টুকরা দিয়ে জাদুকর অসম্ভব কে সম্ভব করে ফেলতে পারেন।

জাদু বিশ্বাসের ইতিহাস পৃথিবীতে নতুন নয়, সভ্যতার সূচনা লগ্নে মানুষ প্রকৃতিকে বশীভূত করার অদম্য চেষ্টা থেকেই এর জন্ম। সোজাভাবে বলতে গেলে বিরাট প্রকৃতিকে বশে রাখবার আদিম মানুষের একটা ভুল প্রচেষ্টা। বর্তমান পৃথিবীর ধর্ম গুলোই আদিম মানুষের জাদু বিশ্বাসেরই একটি পরিবর্তিত আধুনিক রুপ, যা বুদ্ধিমান প্রতারক মানুষের হাতে সংস্কার হতে হতে এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যা আর জাদু বিশ্বাসের অংশ বলে মনেই হয়না। আদিম মানুষ পাহাড়ের গুহায় নানান রকম ছবি এঁকে, হরেক রকম পুজা অর্চনা করে প্রকৃতির অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করত। আধুনিক মানুষও একই রকম করে কেউ উপবাস থেকে, প্রার্থনা করে প্রকৃতির অনুগ্রহ লাভের চেষ্টা করে; মুলে পার্থক্য খুব অল্পই।

যাইহোক আজকের দিনেও একটি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে জাদু টিকে আছে আপন মহিমায়। এখন সাধারণত জাদু দুই ধরনের, একটা ম্যাজিক যা ম্যাজিশিয়ান বা জাদুকর নানান বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ জন সাধারণকে দেখিয়ে থাকেন। অন্যটাকে বলাহয় ব্লাকম্যাজিক বা কালজাদু যা অলৌকিক সুবিধা আদায়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই গুলোর মধ্যে বশি করা, বাণ মারা, তন্ত্রমন্ত্র, তাবিজ কবজ, ভূত, জীন, পরী, দৈত্য দানব বশ করা আরো কত রকমের যে জাদুর শাখা প্রশাখা আছে আমি তার সব গুলো জানিনা।

সত্যি কথা বলতে কি আমি নিজেই ধর্ম বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার পরও জাদুর বিস্ময়কর কর্ম কান্ড আমার চোখে ঘোর লেগে ছিল, কোন সদুত্তর খুঁজে পেতাম না। যেমন মস্ত এক ছুরি দিয়ে পেট এফোঁড়ওফোঁড় করে দেওয়া, শুন্যে একটা আস্ত মানুষ ভাসিয়ে রাখা, খালি একটা কৌটা থেকে কচকচে টাকার নোট বের করা এমন অজস্র! জাদু না থাকলে কি করে সম্ভব এমন অবাক কাণ্ডকারখানা ঘটানো! লোকে বলে চোখে ভেল্কি লাগানো। ভেল্কিই বা কিভাবে লাগানো সম্ভব! আর ভেল্কি জিনিসটাই বা কি! কোন ভাবেই কোন সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

জীবনের অনেক জটিলতার উত্তর বইয়ে অনায়াসেই পাওয়া যায়, বইয়ের কাছে আমি অনেক ঋণী, সত্যি বই মানুষের আরো একটা দেখবার চোখ খুলে দেয়! জাদু রহস্যের সমাধানও আমি বইয়ের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলাম। বিস্ময়কর, ভয়ংকর, চোখ ধাঁধানো জাদুর রহস্য গুলো জানতে পারলে মনে হবে এগুলো কতই না তুচ্ছ, কতই না হাস্যকর!!

সত্যি জাদুতে কোন অলৌকিকতা নেই, বিস্ময়কর বলে কিছু নেই যা আছে তা সবই বিজ্ঞান ভিত্তিক বাস্তব সত্য, প্রদর্শনের শৈল্পিক ক্ষমতা। রাহুচন্ডালের হাড়, জাদুর কাঠি বা তন্ত্র মন্ত্রতে কিছু হয়না। যা হয় তা সবই বিজ্ঞানের জ্ঞান আর কৌশলী মানুষের বুদ্ধিতে। সাধারণত মুর্খ, অশিক্ষিত মানুষের পক্ষে জাদু নিয়ে খুব একটা এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তিনটি উপায় অবল্মম্বন করা হয় ১- যন্ত্রের ব্যবহার, ২- রাসায়নিক পদার্থের ক্রিয়া বিক্রিয়া ৩- হাতের কৌশল, এ ছাড়াও আরো একটি কৌশল আছে তা হল সম্মোহন ক্ষমতা।

পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত জাদুকরেরা কেউই কখনো জাদুকে কোন অলৌকিক বলে দাবি করেনা। জাদুতে যেমন কোন অলৌকিকতা নেই, তেমনি কট্টর গোপনীয়তাও জাদুর জন্য মঙ্গলজনক নয়। উন্নত বিশ্বের মানুষেরা জাদুকে অলৌকিক কিছু বলে মনে করেনা, সেখানে ছোট বেলাতেই বাচ্চাদের কিছু কিছু জাদুর রহস্য ভেঙে দেওয়া হয়। জাদু সেখানে শুধুই মজার একটা খেলা।

সাধারণ ম্যাজিক বা জাদুর মত ব্লাকম্যাজিক, কালজাদু বা তন্ত্রমন্ত্রর ব্যাপারটা কিন্তু একই রকম নয়। প্রদীপের নীচেই অন্ধকারের মত পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই কম বেশি কিছু মানুষ এটাকে বিশ্বাস করে। ব্যপারটা সম্ভবত ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সম্পর্ক যুক্ত বলেই। তা ছাড়া নিম্ন বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ দুনিয়ার সব অঞ্চলেই থাকে, আর সেই সাথে থাকে অন্যের ঘাড়ে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার মত কিছু ধূর্ত প্রতারক মানুষ, তারায় নানান কৌশল, বুদ্ধি খাটিয়ে এসব বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখেন।
আদতে এসবে কোনই ক্রিয়া বিক্রিয়া নেই, ঢোঁড়া সাপের মতই নির্বিষ। বান মেরে কারো একটা পশমেরও কোন ক্ষতি করা যায়না। সত্যি যদি যেত প্রভাবশালী নেতা নেত্রীরা কেউ এতোদিন বেঁচে থাকতো না। উচাটন, বশিকরনে কারো মন ভোলেনা। মন্ত্র পড়লে। সাপের বিষ নামেনা। লাভের মধ্যে লাভ নির্বোধের মনের কিছু শান্তনা জোটে আর জাদুকরের পকেটে কিছু মাল পানি পড়ে।
দুনিয়াই কিছু বোকা মানুষ না থাকলে ধুর্ত প্রতারক মানুষ বাঁচবে কেমন করে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “”জাদু” অলৌকিক বিশ্বাসের জননী।

  1. লেখাটা আরো বড় করতে পারতেন
    লেখাটা আরো বড় করতে পারতেন।সুখপাঠ্য ছিল,কিন্ত শেষ হল যেন হঠাৎ।তবে যাদুর ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ তৈরিতে লেখাটা ছিল বেশ।এ বিষয়ে দুইটা বইয়ের সন্ধান দিতেন যদি…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + = 12