দর্শনের সহজ পাঠ – ৬ : এপিকিউরাস – বাগানের পথ (প্রথম পর্ব)


দর্শনের সহজ পাঠ – ৬ :
এপিকিউরাস – বাগানের পথ (প্রথম পর্ব)

আগের পর্বগুলো:

দর্শনের সহজ পাঠ – ১: এক | দুই | তিন
দর্শনের সহজ পাঠ – ২: এক | দুই
দর্শনের সহজ পাঠ – ৩: এক | দুই | তিন
দর্শনের সহজ পাঠ – ৪: এক | দুই
দর্শনের সহজ পাঠ – ৫: এক

আপনার নিজের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটির কথা ভাবুন। কেমন হবে সেটা? কে কে থাকবে সেখানে? কি বলবে তারা? আপনি যা কল্পনা করছেন তা অবশ্যই আপনার নিজের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। যেন আপনি এখনও সেখানে উপস্থিত, কোনো একটি বিশেষ জায়গা থেকে সব কিছু দেখছেন, হয়তো উপর থেকে অথবা শোকাহতদের মধ্যে কোথাও বসে। অবশ্যই কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে একটি সত্যিকারের সম্ভাবনা আছে, আমরা মরে যাবার পরও আমাদের শরীরের বাইরে আমরা টিকে থাকতে পারি খানিক অশরীরি কোনো আত্মার মত যা কিনা এখনও দেখার ক্ষমতা রাখে এই পৃথিবীতে কি ঘটছে। কিন্তু বাকী অন্যরা, যারা কিনা বিশ্বাস করেন মৃত্যুই চুড়ান্ত, তাদের জন্য একটি সত্যিকারের সমস্যা আছে। যখনই আমরা চেষ্টা করি কল্পনা করতে আমরা সেখানে নেই, আমরা বাধ্য হই সেখানে আমরা আছি, এভাবেই কল্পনা করার মাধ্যমে, দেখছি কি ঘটছে । আপনার নিজের মৃত্যু আপনি কল্পনা করতে পারেন কিংবা না পারেন, তবে বিষয়টি মনে হতেই পারে খুব স্বাভাবিক কিছুটা শঙ্কিত হবার জন্যে – বিশেষ করে নিজের অস্তিত্ব নেই এমন কিছু ভাবা। আর নিজের মৃত্যুকে ভয় পায় না এমন কেই বা আছে? কোনো কিছু নিয়ে আমাদের যদি সত্যি চিন্তিত হবার প্রয়োজনীয়তা থাকে, তবে মৃত্যু চিন্তা অবশ্যই সেই তালিকার শীর্ষে।

খুবই যুক্তিসঙ্গত নিজের অস্তিত্বহীনতা নিয়ে ভাবনা এমনকি যখন সেটি ঘটবে আজ থেকে বহু বছর পরে। এটি আমাদের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। জীবিত খুব কম মানুষই আছেন, যারা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবেননি। কিন্তু প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এপিকিউরাস ( ৩৪১-২৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) যুক্তি দিয়েছিলেন, মৃত্যুর ভয় করা আসলেই সময়ের অপচয় এবং এর ভিত্তি খুবই বাজে যুক্তি। মনের এই অবস্থাকে আমাদের অবশ্যই জয় করতে হবে। আপনি যদি খুব স্পষ্টভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবেন, দেখবেন মৃত্যু নিয়ে আমাদের আসলেই শঙ্কিত হওয়া উচিৎ না। একবার যখন বিষয়টি নিয়ে আপনার চিন্তাগুলোকে গুছিয়ে নিতে পারবেন, এই মূহুর্তে এখানে আমরা বেঁচে থাকার এই সময়টিকে আপনি অনেক বেশী উপভোগ করতে পারবেন – যা এপিকিউরাস মনে করতেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দর্শনের মূল বিষয়টি হচ্ছে, তিনি বিশ্বাস করতেন, আপনার জীবনকে আরো বেশী উন্নত করে তোলা, দর্শন আপনাকে সাহায্য করবে কিভাবে সুখী হওয়া যায়। কিছু মানুষ যেমন বিশ্বাস করেন, আসলেই নিজের মৃত্যু নিয়ে বেশী ভাবনা অবশ্যই একটি অসুস্থতা, কিন্তু এপিকিউরাস ভাবতেন এটাই আসলে আরো তীব্রভাবে বেঁচে থাকার উপায়। ইজিয়ান সাগরে সামোস নামের একটি গ্রীক দ্বীপে এপিকিউরাসের জন্ম হয়েছিল। তবে তিনি তার জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছিলেন এথেন্সে, যেখানে তিনি রুপান্তরিত হয়েছিলেন প্রায় একজন ধর্মগুরু পর্যায়ের এক ব্যক্তিত্বে, যার অনুসারী হবার জন্য আকৃষ্ট হয়েছিল এক দল ছাত্র, যারা সবাই কমিউন হিসাবে একসাথে বসবাস করতেন। এই গ্রুপে এমনকি নারী কিংবা ক্রিতদাসরাও ছিলেন, প্রাচীন এথেন্সের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি ছিল বেশ অস্বাভাবিক ।

স্পষ্টতই এই সব কারণে নিজের অনুসারী ছাড়া তিনি খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না বাকী এথেন্সে। তবে তার অনুসারী তাকে প্রায় উপাসনাই করতো। তিনি তার দর্শনের এই স্কুলটি পরিচালনা করতেন একটি বাগান সহ বাড়ী থেকে, যা থেকেই এটি পরিচিত ছিল বাগান ( দ্য গার্ডেন) নামে। অন্য অনেক প্রাচীন দার্শনিকদের মত ( এবং কিছু আধুনিক দার্শনিক যেমন পিটার সিঙ্গার) এপিকিউরাস বিশ্বাস করতে দর্শনকে হতে হবে ব্যবহারিক, যা প্রয়োগ করা যাবে জীবনে। এটি আপনি কিভাবে বাঁচবেন সেটি পরিবর্তন করার ক্ষমতা থাকা উচিৎ। সুতরাং শুধুমাত্র শেখা না বরং তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল – যারা তাকে তার বাগানে অনুসরণ করেছিলেন -এই দর্শনকে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করার বিষয়টি।

এপিকিউরাসের মতে জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয়টি হচ্ছে, আমরা যে সবাই আনন্দ আর সুখ খুঁজি, সেই বিষয়টিকে শনাক্ত করা, আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে সেই বিষয়টি – আমরা যখনই পারি যন্ত্রণা আর কষ্টকে এড়িয়ে চলি। আর এই বিষয়টি আমাদের জীবনের মূল চালিকা শক্তি – অন্যভাবে যদি বলা হয়, জীবন থেকে যন্ত্রণাকে বাদ দেয়া এবং সুখের পরিমান বৃদ্ধি করলেই এই জীবনটি আরো উত্তমভাবে কাটানো সম্ভব হবে। তাহলে বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠতম উপায় হচ্ছে এটি: খুবই সাধারণ একটি জীবনযাত্রাকে বেছে নেয়া, আপনার চারপাশে সবার প্রতি দয়াশীল হওয়া, নিজেকে পরিবেষ্টিত করে রাখুন সত্যিকারের বন্ধুদের দিয়ে। এভাবেই আপনি আপনার প্রায় সব কামনাগুলো পূর্ণ করতে পারবেন। আপনার আর আর এমন কোনো চাহিদা থাকবে না যা আপনি পূর্ণ করতে পারবেন না। আপনার জন্য ভালো হবে না কোনো প্রাসাদের মালিক হবার জন্য মরিয়া কোনো বাসনা নিজের অন্তরে পোষণ করা, যখন কিনা আপনার প্রাসাদ কেনার মত সামর্থ আপনার কখনোই হবেনা।এমনিতেই আপনার নাগালের বাইরে কোনো কিছু পাবার জন্য আপনার সারা জীবন পরিশ্রম করে ব্যয় না করাই ভালো। একারণে অনেক উত্তম উপায় হচ্ছে খুব সাদামাটা ভাবেই জীবন কাটানো। আমরা কামনাগুলো যখন সাধারণ তখন সেই কামনাগুলো সন্তুষ্ট করাও সহজ, আর আপনার সেই সময় ও শক্তি অবশিষ্ট থাকবে সেগুলো উপভোগ করার জন্য, যেগুলো আসলেই আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সুখের জন্য এটাই ছিলিএপিকিউরাসের প্রস্তাবিত পথ এবং এটি যথেষ্ট বাস্তবসম্মতও বটে।

তার এই শিক্ষাটি ছিল এক ধরণের থেরাপির মত। এপিকিউরাসের লক্ষ্য ছিল তাঁর শিক্ষার্থীদের মানসিক কষ্ট তিনি লাঘব করবেন, এবং তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, শারীরিক কোনো যন্ত্রণাকে আমরা লাঘব করতে পারি অতীতে আনন্দগুলো স্মরণ করার মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন, সুখানুভূতিগুলো অবশ্যই ‍উপভোগ্য যখন সেটি ঘটছে, কিন্তু তারা আরো বেশী উপভোগ্য যখন আমরা পরে তাদের মনে করি। সুতরাং আমাদের কল্যাণে তাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা আছে। যখন তিনি মৃত্যুশয্যায় এবং যন্ত্রণায়, তিনি তার এক বন্ধুকে চিঠি লিখেছিলেন, কিভাবে তিনি তার মনোযোগকে বিক্ষিপ্ত করেছিলেন তার অসুস্থতা থাকে, তাদের পুরোনো একটি কথোপকথনের উপভোগ্য সেই স্মৃতি স্মরণ করার মাধ্যমে। এইসব কিছুই কিন্তু খুব আলাদা তার নামের সাথে সংশ্লিষ্ট ইংরেজী শব্দ ‘এপিকিউরিয়ান’ বলতে আজ যা বোঝায়। একেবারেই বীপরিত বলাই শ্রেয়। শব্দটি বলছে যে একজন এপিকিউর হচ্ছে এমন কেউ, যিনি সুস্বাদু ভালো খাওয়া খেতে পছন্দ করেন, এমন কেউ যিনি ইন্দ্রিয়াভূতির আনন্দের বিলাসিতায় নিমগ্ন।

কিন্তু এপিকিউরাসের খুব সাদামাটা রুচিবোধ ছিল, বতর্মানে তার নাম থেকে আসা শব্দটি যা বোঝাতে চাইছে তার চেয়ে সম্পুর্ণ ভিন্ন। তিনি শিখিয়েছেন কিভাবে পরিমিত হতে হয় – লোভাতুর ক্ষুধার কাছে আত্মসমর্পন করা মানে আরো বেশী বাসনা সৃষ্টি করা, যা পরিণতি সৃষ্টি করে অপূর্ণ চাহিদার মানসিক চাপ। এই ধরণের জীবন যেখানে চাহিদার ক্রমশ বাড়তে থাকে, তা এড়িয়ে চলা উচিৎ সবার। ‍তিনি ও তার অনুসারীরা বিলাসী জীবন যাপন করেননি বরং সাধারণ রুটি আর পানি খেয়ে জীবন যাপন করতেন। আপনি যদি দামী মদ পান করতে শুরু করেন, তাহলে অচিরেই আপনি আরো বেশী ‍মূল্যবান মদ পান করতে চাইবেন এবং সেই চাহিদার ফাঁদে আটকে যাবেন, যেখানে আপনি যা পাবেন না সেই জিনিসই আপনি কামনা করবেন। তাসত্ত্বে এপিকিউরাস এর শত্রুরা দাবী করেছিলো যে, তার সেই গার্ডেন কমিউনে এপিকিউরাসের অনুসারীরা সারাদিন খাওয়া,পান করা ও নানা ধরণের আমোদ ফূর্তি যেমন নিরন্তর সম্মিলিত যৌন সঙ্গমের আসর বসাতেন। আর এপিকিউরাসে শত্রুদের এই কুৎসা থেকেই এই এপিকিউরিয়ান শব্দটির আধুনিক অর্থ এসেছে। সত্যিকারার্থে এপিকিউরাস এবং অনুসারীরা এধরনের কোন জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কারণ এ ধরনের আচরণ এপিকিউরাসের দর্শনের বিরোধী।

ক্ষতিকর মানসিকতা নিয়েই এই কূৎসাগুলো আসলে প্রচার করা হয়েছিল। এপিকিউরিয়ান শব্দটি এখনও সেই দূর্নাম বহন করে চলছে। তবে একটি কাজ করতে এপিকিউরাস নিশ্চিৎভাবে বহু সময় ব্যয় করেছিলেন, সেটি হলো লেখালেখি। প্রচুর লিখেছিলেন তিনি। তথ্য জানাচ্ছে প্রায় ৩০০ র বেশী বই তিনি লিখেছিলেন, সবই প্যাপিরাসের রোলে, যদি তার কোনোরটারই এখন আর অস্তিত্ব নেই। তার সম্বন্ধে আমরা যেটুকু জেনেছি সেটি মূলত এসেছে তার অনুসারীদের নানা লেখা থেকে। যারা তার সব বই মূলত মুখস্ত করেছিলেন। এবং লিখিতভাবে তারা গুরুর শিক্ষা তাদের লেখায় প্রচার করেছিলেন। তাদের লেখার কিছু অংশ বিশেষ এখনও টিকে আছে, যা আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নীচে সুরক্ষিত হয়ে ছিল হারকিউলেনিয়ামে, পম্পেইর কাছাকাছি যে শহরটাও ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাতে ধ্বংস হয়েছিল একদিন। এপিকিউরাস শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র একটি দীর্ঘ কবিতা, On the Nature of Things যার রচয়িতা ছিলেন রোমের দার্শনিক কবি লুক্রেশিয়াস। এপিকিউরাসের মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পর এটি লেখা হয়েছিল। এই কবিতাটাই তার স্কুলে যা শেখানো হতো, সেটাই সারসংক্ষেপ করেছিল।

তাহলে আবার আমরা ফিরে যাই সেই প্রশ্নটিতে – এপিকিউরাস যে প্রশ্নটি আমাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন মৃত্যুকে ভয় পাওয়া উচিৎ না? একটি কারণ আপনি মৃত্যু সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করবেন না। আপনার মৃত্যু এমন কিছু না যা আপনার সাথে ঘটবে, কারণ যখন সেটি ঘটবে তখন আপনি সেখানে থাকবেন না। বিংশ শতাব্দীর দার্শনিক লুদভিগ ভিটগেনস্টাইনও তার এই দৃষ্টিভঙ্গীর পুনরাবৃত্তি করেছিলেন যখন তিনি তার Tractatus Logico-Philosophicus লিখেছিলেন। Death is not an event in life বা মৃত্যু জীবনের কোনো ঘটনা নয় ।

এখানে মূল ধারণাটি হচ্ছে কোনো ঘটনা বা ইভেন্ট হচ্ছে এমন কিছু যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমরা অনুভূত হই। কিন্তু আমাদের নিজের মৃত্যু হচ্ছে সেই অভিজ্ঞতা অনুভব করার সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয়া, এমন কোনো কিছু না যে বিষয়ে ঘটনাটি ঘটার পরও আমরা সচেতন থাকবো বা মৃত্যুর মধ্য দিয়েও আমরা বেঁচে থাকবো। যখন আমরা আমাদের নিজের মৃত্যুকে কল্পনা করি, এপিকিউরাস যেমন লক্ষ্য করেছিলেন, আমরা বেশীর ভাগ মানুষই মনে করি মৃত্যুর পর অামাদের কিছু অংশ তারপরও অবশিষ্ট রয়ে যাবে, যার মাধ্যমে আমরা অনুভব করবো আমাদের মৃত শরীরের সাথে যা কিছু ঘটুক না কেন। কিন্তু এটি আমরা আসলে কি সেই বিষয়ে একটি ভুল বোঝাপড়া ।

আমরা কোনো একটি নির্দিষ্ট শরীরের সাথে যুক্ত, আমাদের সুনির্দিষ্ট হাড় মাংশের শরীর। এপিকিউরাসের দৃষ্টিভঙ্গীতে আমরা আসলে পরমানু বা অ্যাটম দিয়ে তৈরী ( যদিও এই শব্দটি দিয়ে তিনি যা বোঝাতে চেয়েছেন, সেটি আধুনিক বিজ্ঞানীরা এই শব্দটি দিয়ে যা বোঝাতে চান তার থেকে কিছুটা ভিন্ন।) একবার যখন মৃত্যুর পর এই অ্যাটমগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, আমরা আর সচেতনভাবে অনুভব করার মত সত্তা থাকিনা। এমনকি যদি কেউ খুব সতর্কতার সাথে এই সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশগুলোকে আগের অবস্থায় বিন্যস্ত করেও এবং পুনর্গঠিত সেই শরীরের জীবনের নিঃশ্বাস যুক্ত করে, সেটা কোনভাবেই আর আমি থাকবো না। এই নতুন জীবন্ত শরীরটি আমি হবো না, যদিও সেটি আমার মত দেখতে। আমি তার কষ্ট অনুভব করবো না, কারণ যখনই কোনো শরীর তার কাজ থামিয়ে দেয়, কোনো কিছুই তাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারেনা। এই আত্মপরিচয়ের শৃঙ্খল তখনই ছিন্ন হয়ে যায়।
আরেকটি উপায়ে এপিকিউরাস ভেবেছিলেন তিনি তার অনুসারীদের মৃত্যুভয়কে নিরাময় করতে পারবেন, সেটি হচ্ছে আমরা ভবিষ্যত নিয়ে যা অনুভব করি আর আমরা অতীত নিয়ে যেভাবে অনুভব করি, তার মধ্যে পার্থক্যটি তাদের দেখতে সাহায্য করা। আমরা একটার বিষয়ে ভাবি অন্যটাকে নিয়ে না। আপনার জন্মের আগের সময়ের কথা চিন্তা করে দেখুন, তখন সুবিশাল প্রায় অনন্ত সময় ছিল ,যখন আপনার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। শুধুমাত্র সেই সপ্তাহগুলোই না যখন আপনি আপনার মায়ের জরায়ুতে ছিলেন, যখন কিনা আপনি হয়তো আরো আগেই জন্ম নিতে পারতেন। অথবা মায়ের জরায়ুতে আপনার যাত্রা শুরু হবার আগ পযন্ত আপনি আপনার বাবা মার জন্য ছিলেন শুধুমাত্র একটি সম্ভাবনা, আপনি আসার আগেই বহু হাজার কোটি বছর অতিক্রান্ত হছে, আমাদের জন্ম না হওয়া সেই অজস্র হাজার বছর নিয়ে আমরা সাধারণত চিন্তা করিনা। যদি সেটি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে কেন মৃত্যুর পর আমাদের অস্তিত্বহীন আরো হাজার কোটি বছর নিয়ে কেন এত ভাবা উচিৎ? আমাদের চিন্তাগুলোকে এপিকিউরাস মনে করতেন ভারসাম্যহীন এবং অপ্রতিসম। জন্মের আগের সময় নিয়ে ভাবনার চেয়েও মৃত্যুর পরবর্তী সময় নিয়ে চিন্তার করার দিকে অনেক বেশী ঝুকে থাকার আমাদের প্রবণতা আছে। কিন্তু এপিকিউরাস ভাবতেন এটি ভুল। একবার যখন আপনি বুঝতে পারবেন আপনার উচিৎ হবে না আপনার মৃত্যু পরবর্তী সময় নিয়ে চিন্তা শুরু করা ঠিক যেভাবে আপনার জন্মের আগের সময় নিয়ে যেভাবে চিন্তা করেন। তাহলে বিষয়টি আর খুব বড় কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না।কিছু মানুষ খুবই চিন্তিত যে তারা হয়তো মৃত্যু পরবর্তী জীবনের শাস্তি পাবেন। এপিকিউরাস সেই চিন্তাও বাতিল করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে দেবতারা আসলেই তাদের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তিত নন, তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে তার অনুসারীদের বলতেন- তাদের অস্তিত্ব আমাদের থেকে আলাদা, তারা এই পৃথিবীর সাথে নিজেদের জড়িত করে না। সুতরাং আপনার ভয় পাবার কোন কারণ নেই। এটাই তার প্রস্তাবিত নিরাময় ছিল, এই যুক্তিগুলোর রকমফের। যদি এটা কাজ করে তাহলে আপনি এখন ভবিষ্যতে আপনার অস্তিত্বহীনতা নিয়ে কোনো বড় সমস্যা হবার কথা না।

এপিকিউরাস তার সমস্ত দর্শনের সার কথাটি একটি বাক্যে তার সমাধিফলকের উপর লিখেছিলেন .. ‘I was not; I have been; I am not; I do not mind অর্থাৎ আমি ছিলাম না, আমি ছিলাম, আমি আর নেই – এ বিষয়টা নিয়ে আমি ভাবি না। আপনি যদি বিশ্বাস করেন আমরা শুধুমাত্র শারিরীক কোনো সত্ত্বা যার সৃষ্টি হয় পদার্থকণা দ্বারা এবং মৃত্যুর পর সত্যিকারের কোনো ঝুকি নেই শাস্তি পাবার, তাহলে এপিকিউরাস হয়তো আপনাকে প্ররোচিত করতে পারে যে আপনার মৃত্যু নিয়ে কোনো ভয় পাওয়া উচিৎ নয়। আপনি হয়তো তারপরও চিন্তা করতে পারেন মারা যাবার প্রক্রিয়াটি নিয়ে কারণ প্রায়শই ব্যপারটা যন্ত্রণাময় এবং অবশ্যই অভিজ্ঞতায় আমাদের সেটি অনুভব করতে হবে, আর এটি সত্যি এমনকি যখন শুধু মৃত্যু ব্যপারটা নিয়ে চিন্তা করা অযৌক্তিক। তাসত্ত্বেও মনে রাখতে হবে, এপিকিউরাস বিশ্বাস করতেন ভালো স্মৃতি সব যন্ত্রণাকে লাঘব করতে পারে, সুতরাং এই বিষয়ে তার একটি উত্তরও প্রস্তুত। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন আপনি শরীরের খাঁচায় আটকে থাকা একটি আত্মা, এবং শারিরীক মৃত্যুর পরও আত্মা বেঁচে থাকে, এপিকিউরাসের চিকিৎসা আপনার জন্য কাজ করবে না: কারণ আপনার হৃদপিন্ড বন্ধ হবার পরও আপনি আপনার অস্তিত্ব টিকে থাকবে বলে কল্পনা করতে পারবেন। এপিকিউরাস ও তার অনুসারীরাই একমাত্র দার্শনিক নয় যারা ভাবতেন দর্শন এক ধরনের থেরাপী হতে পারে। বেশীর ভাগ গ্রীক ও রোমান দার্শনিকরাই তাই ভাবতেন। স্টয়িক বা বৈরাগ্যদর্শন মতবাদের অনুসারীরা, তারা সুপরিচিত, বিশেষ করে, জীবনের সব বিপর্যয়ে মানসিকভাবে কিভাবে দৃঢ় থাকা যায়, সেই বিষয়ে শিক্ষা দান করার জন্য।

(চলবে)

ব্যবহৃত ছবি:

(১) এপিকিউরাস, ল্যুভ এ সংরক্ষিত একটি আবক্ষ মূর্তি ( রেপ্লিকা)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 27 = 32