গুনীন সমজদার ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী

যে দেশে গুনীর কদর হয় না, সে দেশে গুনীর জন্ম হয় না। শুনতে কানে খুব একটা না বাজলেও সত্যিকার অর্থেই কদরহীন দেশে গুনীদের জন্ম নেয়াটা অসম্ভব। এই গুনীর জন্ম মানে মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া বা আভির্ভাব নয়, এই জন্ম হলো তৈরী হওয়া। গুনের কদর যদি নাই বা থাকে, তাহলে কিভাবে আমরা বুঝতে পারব যে গুনী ব্যক্তির তৈরী হয়েছে, আর পরিবেশ না থাকলে কিভাবেই বা একটা মানুষ তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটাবে, বিকশিত হবে তার গুন!

এই গুনীর কদর কারা করবে? নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষেরা। তো, সাধারণ মানুষেরা যে গুনীর কদর করছে তা কিভাবে আমরা বুঝতে পারব? বলা হয়, একটা দেশের জনগণ কেমন তা বুঝা যায় তাদের রাজনীতিবিদদের দেখে। জনতা সচেতন হলে, রাজনীতিবিদগণও সচেতন হতে বাধ্য, জনগণ দুর্নীতিপরায়ন হলে, নেতারাও তাই হবে, জনগণ মূর্খ হলে নেতারাও তাদের মাথায় কাঠাল ভেঙে খাবে। এটাই স্বাভাবিক। তাহলে, দেশে গুণীর কদর হচ্ছে কী না তা সহজেই বুঝতে পারব যদি জাতীয় পর্যায়ে গুণীদের সম্মান করা হয়, জাতীয় পর্যায়ের নেতাগণ গুনীদের নিয়ে মেতে থাকেন, তাদের পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করেন, নিদেনপক্ষে তাদের তিরোধান-অন্তর্ধান দিবস পালনের মাধ্যমে স্মরণ করেন, তাহলে আমরা ধরে নিতে পারব যে দেশে গুনীদের কদর হচ্ছে। সদ্য প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হক এর প্রয়ানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উনার জন্মদিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত সকল কর্মসূচী স্থগিত করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রমান করে দেশে গুনীর কদর হচ্ছে, দেশে গুণীজনেরা সম্মান পাচ্ছেন, ভবিষ্যতেও পাবেন।

সন্দেহ নেই সৈয়দ হক সাহেব আমাদের বাঙলা সাহিত্যের আকাশে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতই ছিলেন। তার অমর সৃষ্টিগুলো বাঙলা ভাষাভাষী বাঙালীদের পরাণের গহীনে অনেককাল ধরেই আওয়াজ দিয়ে যাবে। সৈয়দ হক সাহেবের প্রতি এমন সম্মান দেখানোর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নিঃসন্দেহে নিজেকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। নিন্দুকেরা বলাবলি করে, প্রধানমন্ত্রীর এই সম্মান দেখানোর পেছনে নাকি সৈয়দ সাহেবের হাত ছিল। মানে, তারা বলতে চান সৈয়দ সাহেবের সাহিত্য কর্মের জন্য নয়, বরং তাঁর হাত কচলানো স্বভাবের জন্যই শেখ হাসিনা তাকে সম্মান দেখিয়েছেন। সৈয়দ সাহেবকে তাঁরা বুদ্ধিজীবী না বলে বুদ্ধিবেশ্যা বলেই আখ্যায়িত করতে চান। আসলেই কী! হ্যাঁ, কবি-সাহিত্যিকরা সাধারণত কারও কাছে মাথা নত করেন না। তাঁরা বরাবরই সকল কিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পছন্দ করেন। পছন্দ করেন ঘিয়ের মধ্যে কিভাবে কাঁটা খুজে বের করা যায় তাঁর অন্বেষণ করতে। কবি সাহিত্যকগণের ধর্মই নাকি এই যে, তাঁরা প্রচলিত প্রথার মধ্যে খুঁত বের করে তাতে কুঠারাঘাত করেন। কুঠারাঘাতে সৈয়দ সাহেব অবশ্যই নিষ্ঠাবান এবং মুন্সিয়ানার দাবীদার। তবে, তাঁর সেই কুঠার যখন ভোঁতা হয়ে গিয়েছিল তিনি তা সযতনে তুলে রাখতে পারতেন। কিন্তু আমরা দেখেছি সৈয়দ সাহেব কুঠারকে তুলে না রেখে, শান না দিয়ে বরং চকচকে করার জন্য শুধুই মরচে পরিষ্কার করে গলায় ঝুলিয়ে ক্ষমতাশীনদের কাছে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে গিয়েছেন উনার শেষ জীবনে। তবে কী নিন্দুকের কথাই সত্যি?

নিন্দুকের কথা সত্যি কী না, তা আমরা অবশ্য যাচাই করার প্রয়াস পেতে পারি সমসাময়িক কালে দেশের আর কোন কোন গুনীন প্রধানমন্ত্রী দ্বারা সমাদৃত হয়েছেন তাঁর অনুসন্ধান করে। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব আমাদের প্রধানমন্ত্রী আসলে গুণীর কদরে করেন, নাকি যারা উনার পায়ের কাছে বসে থেকে নিজেকে গর্বিত মনে করে তাদেরকেই সম্মানের আসনে আসীন করেন। নিকট অতীতে অর্থাৎ বছরখানেক সময়ের ভেতরে দেশের বেশ কিছু ব্লগার তাদের লিখালিখির জন্য মৌলবাদীদের দ্বারা খুন হয়েছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর তখনকার ভূমিকা যে কী ছিল, তা নতুন করে আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। আমি বলছি না খুন হয়ে যাওয়া সকল ব্লগার সৈয়দ হক সাহেবের মত গুনী ছিলেন। কিন্তু এটা তো বলা যায়, যারা খুন হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্তত কিছু একটা বলে ফেলার, লিখে ফেলার, প্রশ্ন করার মানসিকতা ছিল, ছিল সমসাময়িক প্রথাকে কুঠারাঘাত করার ইচ্ছে এবং চেষ্টা। হয়ত, একটা সময় তাদের মধ্য থেকে সৈয়দ সাহেবের মত কেউ সৃষ্টি হতে পারত! জাগো বাহে, কোন্ঠে সবাই বলে হাঁক দিতে না পারলেও, হয়ত জাগতে হবে, জাগতে হবে বলে রব তুলতে পারতো! হ্যাঁ, যারা খুন হয়ে গেছেন তাঁরা নাস্তিক ছিলেন, ধর্মবিদ্বেষের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। তাদের পক্ষে ওকালতি করলে, সম্মান দেয়ার চেষ্টা করলে মোল্লাদের ক্ষেপে যাবার সম্ভাবনা ছিল। সৈয়দ সাহেবের বিরুদ্ধেও কী ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করাটা খুব কঠিন? তাহলে, ধর্ম বিরুদ্ধতার কারণে অভিজিৎ অনন্তরা রাষ্ট্রের সম্মান এবং সহমর্মিতা পায়নি, তা বলাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে? তারচেয়ে বরং তেলবাজ বুদ্ধিবেশ্যাকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্মান প্রদর্শন করেছেন বলে নিন্দুকেরা যে দাবীটা করছে সেটাই তো বেশি যুক্তিযুক্ত।

অতীতের কথা বাদ দিলেও, রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্র নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পাই একজন সৈরাচারের ভূমিকায়। ইউনেস্কো, জাতিসংঘ থেকে শুরু করে দেশের হেন কোন বুদ্ধিজীবী নেই, যারা রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দের বিরুধীতা করছেন না। এত এত গবেষকের গবেষনাকে, তাদের ভবিষ্যৎ আশংকাকে যিনি উনার একার মতের জন্য বাতিল করে দিতে পারেন, মনগড়া কিছু তত্ব দাঁড় করাতে পারেন, তাকে কি সত্যিকার অর্থেই গুনিন সমজদার বলা যায়? প্রশ্নটা পাঠকের কাছেও রেখে গেলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “গুনীন সমজদার ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী

  1. আমাদের মত ঘুনে ধরা রাষ্ট্রে
    আমাদের মত ঘুনে ধরা রাষ্ট্রে তেলবাজ বুদ্ধিজীবি শাসকদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য দরকার আছে। কিন্তু সৈয়দ হক ছিলেন সীমাহীন তেলবাজ। তার লেখা তাকে যতটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তার তেলবাজী চরিত্র তাকে তার দ্বিগুন নিম্নগামী করেছে।

    ব্যক্তিগতভাবে সৈয়দ হকের সাহিত্য আমার পছন্দের। কিন্তু জীবনের শেষ সময়গুলোয় ব্যক্তি সৈয়দ হক পরিত্যাজ্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 3 =