বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (প্রথম পর্ব)


(ছবি: তরুণ ডারউইন, বিগলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র যাত্রা শেষে তিনি রুপান্তরিত হন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ বিজ্ঞানী হিসাবে; এই প্রতিকৃতির শিল্পী জর্জ রিচমন্ড)

২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী চার্লস ডারউইনের জন্মদিনে (দিনটি আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবসও) লেখাটি লিখেছিলাম নিজস্ব ব্লগের জন্য। এই লেখাটি তারই সম্পাদিত রুপ। ১৮০৯ সালে ইংল্যান্ডে এই দিনে তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন; দিনটি আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবসও; বিজ্ঞান এবং যুক্তির আলোয় কুসংস্কারমুক্ত জীবন উদযাপনের দিন হিসাবে চার্লস ডারউইনের জন্মদিন, ১২ ফেব্রুয়ারীকে বেছে নেয়া হয়েছিল নব্বই দশকের শুরুতে,আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবস হিসাবে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী আর বৈপ্লবিক ধারণাটির জন্ম দিয়েছিলেন প্রতিভাবান বৃটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন: প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। জীববিজ্ঞান তো বটেই বিজ্ঞানের নানা শাখায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার মাষ্টারপিস On the Origin of Species বইটি, পৃথিবী এবং তার মধ্যে আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্বন্ধে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটিকে চিরকালের মত বদলে দিয়েছে; খুব সরল এই ধারণার মাধ্যমে, ডারউইন পেরেছিলেন জীবের সকল জটিলতা আর বৈচিত্রের সাধারণ একটি ব্যাখ্যা দিতে। গত দেড় শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা তার এই ধারণাটির স্বপক্ষে প্রমাণ জুগিয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে। বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীতার কারণ কখনোই এর প্রমাণের স্বল্পতা নয়, বরং এর সম্বন্ধে অজ্ঞতা। ডারউইনকে নিয়ে ধারাবাহিক এই লেখাটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত আকারে ডারউইনের জীবনে সেই গুরুত্বপুর্ণ সময়ে কাহিনী; লেখাটির মূল সূত্র: Carl Zimmer এর Evolution, the triumph of an idea র প্রথম দুটি অধ্যায়; এছাড়াও বেশ কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে – কাজী মাহবুব হাসান)

ডারউইন এবং দ্য বিগল

১৮৩১ সাল, অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ।

ইংল্যান্ডের প্লীমথ (Plymouth) বন্দরে দাড়িয়ে আছে প্রায় নব্বই ফুট দীর্ঘ একটি কোষ্টার এইচ এম এস বীগল (HMS Beagle); উই ঢিবির উইপোকার মত এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে ব্যস্ত খালাসী আর নাবিকরা, যতটুকু করা সম্ভব,ততটুকুই বোঝাই করা হচ্ছে জাহাজটিকে; কারণ বীগল প্রস্তুত হচ্ছে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার সমুদ্রযাত্রায়, স্থায়ী হতে পারে প্রায় পাঁচ বছর। জাহাজের হোল্ড বা খোলের মধ্যে তারা ঠেসে রাখছে আটা আর রাম এ ভরা পিপাগুলো, আর জাহাজের ডেক জুড়ে নানা আকারের কাঠের বাক্স, যাদের ভিতরে করাতের কাঠের গুড়ার উপর বসানো পরীক্ষামুলক বেশ কিছু ঘড়ি; বীগলের এই সমুদ্র যাত্রার মূল কারণ ছিল বৈজ্ঞানিক, বৃটিশ নৌবাহিনীর জন্য এই ঘড়িগুলো বিশেষভাবে পরীক্ষা করবে সার্ভেয়াররা, যাদের সমূদ্রযাত্রার জন্য সূক্ষ্ম সময়ের পরিমাপ বিশেষভাবে গুরুত্বপুর্ণ; এছাড়াও বীগলের আরেকটি কাজ হচ্ছে বিস্তারিতভাবে মানচিত্র তৈরী করা; নানা ধরনের নেভিগেশন চার্টগুলোর রাখার জন্য কেবিনগুলোয় বিশেষ মেহগনি কাঠের সিন্দুকও তৈরী করা হয়েছে; জাহাজের ১০টি লোহার কামান সরিয়ে তামার কামান বসানো হয়েছে, যেন তারা বিগলের কম্পাসের সাথে সামান্যতম কোনো সমস্যা না করে।


(ছবি: এইচ এম এস বিগল,HMS Beagle in the Straits of Magellan at Monte Sarmiento, reproduction of R. T. Pritchett’s frontispiece from the 1890 illustrated edition of The Voyage of the Beagle.)

এই ব্যস্ত প্রস্তুতির মধ্যে দিয়ে পথ খুঁজে খুঁজে হাটতে দেখা যায় বাইশ বছরের একজন তরুণকে; বেশ বিব্রত, ইতস্তত হয়েই তাকে জাহাজের এদিক সেদিক হাটতে দেখা যায়, অপরিসর কেবিন, সরু করিডোর বা জাহাজের বিভিন্ন জায়গায়; তার ছয় ফুট কাঠামোই শুধুই একমাত্র কারণ নয় বরং সেখানে নিজেকেই যেন তার মনে হচ্ছিল বেমানান; জাহাজে তার কোনো আনুষ্ঠানিক পদবী নেই, শুধু মাত্র জাহাজের ক্যাপ্টেনকে এই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় সঙ্গ এবং অনানুষ্ঠনিকভাবে একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে তাকে বিগলে আমন্ত্রন জানানো হয়েছিল; সাধারণত জাহাজের সার্জন এই প্রকৃতি বিজ্ঞানীর দায়িত্বটি পালন করে থাকেন, কিন্তু এই অপ্রতিভ আনাড়ী তরুণটির তেমন কেন ব্যবহারিক দক্ষতাও নেই। মেডিকেল স্কুলের পড়া শেষ না করা, এই তরুণটি, এই অভিযান শেষে অন্য কোনো সন্মান জনক পেশা খুজতে গিয়ে অবশেষে গ্রামের যাজক হবার কথা ভাবছেন; তার নিজের সঙ্গে আনা নানা ধরনের কাচের জার, মাইক্রোস্কোপ এবং তার বাকী যন্ত্রপাতিগুলো গুছিয়ে রাখার পর, তার আসলে আর কিছুই করার ছিল না; সে চেষ্টা করলো সহকারী সার্ভেয়ার কে কয়েকটি ঘড়ি ক্যালিব্রেট করার জন্য, কিন্তু সাধারন কিছু মৌলিক গণনা করার মত অংকও তার জানা ছিল না।


(ছবি: Young Darwin Statue by Anthony Smith, Christ’s College, University of Cambridge)

এই অপ্রতিভ, তার কি কাজ করা উচিৎ সেটি নিয়ে বিব্রত তরুণটির নাম চার্লস ডারউইন; পাঁচ বছর পরে যখন বিগল তার সমুদ্র যাত্রা শেষ করে ফিরে আসবে, বৃটেনের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ বিজ্ঞানী হিসাবে এই মানুষটি সুপরিচিত হয়ে উঠবে, আর এই পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা সমুদ্রযাত্রায় সংগৃহীত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি উদঘাটন করবেন, চিরকালের জন্য যা প্রকৃতিতে আমাদের অবস্থান সম্বন্ধে প্রতিষ্ঠিত সব ধারণাকে আমূল বদলে দেবে। বীগলের সমুদ্রযাত্রায় তার সংগ্রহ করা নমুনাগুলো দিয়ে এই তরুণ ডারউইন একদিন প্রমাণ করবেন, আমরা আজ প্রকৃতিকে যে রুপে দেখছি, সৃষ্টির সময় এটি এরকম ছিল না, জীবন বিবর্তিত হয়েছে: ধীরে ধীরে এবং নিরন্তর একটি প্রক্রিয়ায় জীবন পরিবর্তিত হয়েছে অকল্পনীয় বিশাল সময় জুড়ে বংশগতির সুত্রের কল্যাণেই, কোনো স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই; আর আমরা মানুষরা…. ঈশ্বরের সকল সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ চুড়ান্ত রুপ হওয়া তো দুরের কথা, অনেক প্রজাতির মধ্যে সে কেবলই একটি প্রজাতি, বিবর্তনেরই আরেকটি সৃষ্টি মাত্র।

ভিক্টোরীয় যুগের ইংল্যাণ্ডকে ডারউইন তার তত্ত্ব দিয়ে বিশাল একটি সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি জীবন, যা নিজেই এই অসাধারণ বৈচিত্রময়তার সৃষ্টি করেছে, তার একটি বিকল্প ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন; আজ স্পষ্ট যে বিবর্তন আমাদেরকে যুক্ত করেছে পৃথিবীর উষালগ্নের সাথে, উল্কাপাত আর নক্ষত্রদের মরণ বিস্ফোরণের সাথে; বিবর্তনই ফসল উৎপাদন করে যা আমরা খাদ্য হিসাবে গ্রহন করছি আবার বিবর্তনই পোকামাকড়দের সাহায্য করেছে তা ধ্বংস করার জন্য; এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা রহস্যকে উন্মোচিত করেছে, যেমন কেমন করে একটি বুদ্ধিমত্তাহীন কোনো ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানের সেরা গবেষকদের বোকা বানাতে পারে; এটি তাদের জন্য সেই সতর্কবানীও প্রদান করেছে যারা সীমাহীন ভোগে পৃথিবী থেকে শুধুই নেয়, এটি উন্মোচন করেছে, কেমন করে আমাদের মন গড়ে উঠেছিল নরবানর বা এইপদের নির্জন একাকী দলগুলোতে; মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান নিয়ে বিবর্তন আমাদের কি বলছে, তা গ্রহন করা নিয়ে আমাদের এখনও সমস্যা থাকতে পারে, কিন্তু সেকারণেই মহাবিশ্ব আরো বেশী অনন্য অসাধারণ।

বৃটিশ নৌবাহিনীর এইচ এম এস বিগলকে আজ পৃথিবী মনে রেখেছে তার কারণ শুধুমাত্র সেই জাহাজে এই তরুণ ডারউইনেরই অভিজ্ঞতা; কিন্ত সেই মুহুর্তে জাহাজের মাল বোঝাই করছে এমন কোনো ব্যস্ত খালাসী আর নাবিকেদের তা বলার চেষ্টা করেন, তারা এই বেমানান, নিজের কি কাজ সেটা বুঝতে পারার ভান করা তরুণের দিকে হয়তো না তাকিয়েই হেসে উড়িয়ে দেবে।

প্লীমথ থেকে নিজের পরিবারের কাছে চিঠিতে ডারউইন লিখেছিলেন: “আমার প্রধান কাজ হচ্ছে বিগলে আরোহন করা, এবং আমার পক্ষে যতদুর সম্ভব নাবিকের মত আচরণ করা, আমাকে পুরুষ, নারী কিংবা শিশু হিসাবে কিছু মনে করা হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে আমার কাছে কোনো প্রমাণ নেই।”

/421px-Charles_Darwin_1816.jpg” width=”500″ />
(ছবি: সাত বছর বয়সী ডারউইন ১৮১৬ সালে, এর পরের বছরই হঠাৎ করে মা‘কে হারান ডারউইন।)

গুবরে পোকা আর সন্মানের সন্ধানে

?oh=d8b481a60572abfca17d08a09f582858&oe=58ACFDE2″ width=”400″ />
(ছবি:ডারউইন জন্মগ্রহন করেছিলেন এখানে; দ্য মাউন্ট ( Shrewsbury, Shropshire, England);

ডারউইনের স্বাচ্ছন্দময় আর সুখের শৈশব কেটেছিল ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের সেভেয়ার্ন নদীর পাড়ে পাখি আর নুড়ী পাথর সংগ্রহ করে; তার মা সুজানা এসেছিলেন বিত্তশালী ওয়েজউড পরিবার থেকে, যারা এই নামে চীনা মাটির বাসন পত্র আর পটারী তৈরী করার ব্যবসায়ী হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন ইংল্যাণ্ডে। যদিও তার বাবা রবার্ট (Robert Darwin) ওয়েজউডদের মত এতটা বিত্তশালী পরিবার থেকে আসেননি ঠিকই, তবে তিনি তার সম্পদ গড়েছিলেন ডাক্তার হিসাবে কাজ করে এবং গোপনে তার রোগীদের টাকা ধার দেবার মাধ্যমে, এবং ধীরে ধীরে তিনি যথেষ্ট পরিমান বিত্তেরও মালিক হয়েছিলেন যে, তার পরিবারের জন্য একটি বিশাল বাড়ি তৈরী করেন, দ্য মাউন্ট, সেভেয়ার্ন নদীর পারে একটি ছোট পাহাড়ের উপর।


(ছবি: ছবি: ডারউইনের বাবা রবার্ট ডারউইন, পেশায় চিকিৎসক রবার্ট ডারউইন চেয়েছিলেন ডারউইনও চিকিৎসা পেশা বেছে নিক; যদিও ছেলেকে একসময় বলেছিলেন বংশের কলঙ্ক হবে, রবার্ট বেঁচে থাকতেই ডারউইনকে নিয়ে গর্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন; এবং ছেলেকে স্বাধীন একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে গবেষণা করার সব সুযোগ এবং তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে কোনো কার্পণ্য করেননি।)


(ছবি: সুজানা ডারউইন, চার্লস ডারউইনের মা, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জশুয়া ওয়েজউডের মেয়ে; জশুয়া ওয়েজউড ছিলেন রবার্ট ডারউইনের বাবা ইরাসমাস ডারউইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু; খুব ছোটবেলা থেকেই রবার্ট আর সুজানার সখ্যতা ছিল; বাগান করতে ভীষণ ভালোবাসতেন সুজানা, উদ্ভিদ বিজ্ঞানের প্রথম হাতে খড়ি হয় ডারউইনের তার মায়ের কাছে, মায়ের বাগান করার নেশাটা তারও ছিল; সুজানা আর রবার্ট তাদের বাড়ি মাউন্টে একটা হাটার পথ তৈরী করেছিলেন, থিংকিং পাথ, সেই পথে ডারউইন আর তার ভাইকে রোজ সকালে হাটতে বলতেন, পরে ডারউইন তার ডাউন হাউসেও একই রকম একটি থিংকিং পাথ তৈরী করেছিলেন, যা পরিচিত বিখ্যাত স্যান্ড ওয়াক নামে; ডারউইন শৈশবেই তার মাকে হারিয়েছিলেন।)

চার্লস এবং তার বড় ভাই ইরাসমাস ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ, বলা যায় যেন আসলেই টেলিপ্যাথিক সংযোগ ছিল দুই ভাইয়ের মধ্যে; কৈশোরেই দুই ভাই মাউন্টে তাদের জন্য একটি ল্যাবরেটরী বানিয়েছিলেন, যেখানে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আর কাচের পাত্র ভেঙ্গে নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষাও করতেন তারা দুজন; চার্লস এর বয়স যখন ১৬, বাবা ইচ্ছায় বড় ভাই ইরাসমাসকে স্কটল্যাণ্ডের এডিনবরায় পাঠানো হয় চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়তে; তাদের বাবা অবশ্য ইরাসমাসকে সঙ্গ দেবার জন্য চার্লসকেও সঙ্গে পাঠান, উদ্দেশ্য ভাইয়ের মত সেও ডাক্তারী পড়বে ভবিষ্যতে।


ছবি: ইরাসমাস অ্যালভে ডারউইন, চার্লস ডারউইনের বড় ভাই; পাঁচ বছরের বড় ছিলেন তিনি;

ভাইয়ের সাথে যেতে চার্লস এর অবশ্যই কোনো আপত্তি ছিলনা, বরং খুশী হয়েছিল ভাইকে সাথে নিয়ে নতুন কোনো অভিযানের সুযোগ পাওয়ায়।

?oh=2923d51eb908137b5228900ec710f252&oe=58AD15CE” width=”400″ />
(ছবি:মাউন্টের সামনে দিয়ে বয়ে চলা সেভয়ার্ণ নদী; ভাই ইরাসমাসকে নিয়ে এখানে অনেক অভিযান করেছেন ডারউইন।)

?oh=11be089afe50764dac23e2afe4c3c64f&oe=58A9D675″ width=”400″ />
(ছবি: বাড়ীর কাছে গীর্জার মুখোমখি ডিংগল বলে পরিচিত এই বাগান আর ছোট পুকুরের এই পার্কটিতে নানা ধরনের পোকামাকড় সংগ্রহ করতেন ডারউইন তার শৈশবে।)


(ছবি: রেভারেন্ড কেস এর গ্রামার স্কুল, ডারউইনের প্রথম স্কুল , ১৮১৭ খেকে ১৮১৮ পর্যন্ত ডারউইন এখানে পড়েছিলেন।)

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি:Shrewsbury School: এখানে ডারউইন পড়েছিলেন ১৮১৮ থেকে ১৮২৫ সালে পর্যন্ত; স্কুলের কোর্ট ইয়ার্ডে ডারউইনের একটি ভাস্কর্য।)

চার্লস আর ইরাসমাস এডিনবরায় এসে বেশ বড় একটা ধাক্কা খেলেন, অপরিচ্ছন্ন ঘনবসতি আর ব্যস্ত শহুরে জীবন দেখে; গ্রামীন শান্ত পরিবেশে, সাধারণত যে পরিবেশে জেন অস্টেন তার উপন্যাসের পটভূমি রচনা করেছিলেন, সেখানে বড় হওয়া এই দুই ভাই প্রথমবারের মত শহরে এসে বস্তি দেখেছিলেন, এছাড়া এডিনবরায় তখন স্কটিশদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মাতাল সময়, সেই সাথে জ্যাকোবাইট আর ক্যালভিনিস্টরা চার্চ আর রাষ্ট্র নিয়ে সংঘর্ষের লিপ্ত।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ই তাদের মুখোমুখি হতে হতো উগ্র কিছু ছাত্রদের সাথে, যারা লেকচারের মধ্যে চিৎকার বা পিস্তল উচিয়ে গুলি করতে দ্বিধা করতো না; এ ধরনের অপরিচিত আর ভিন্ন একটি পরিবেশ চার্লস আর ইরাসমাস দুজনকে দুজনের সান্নিধ্যে নিয়ে এসেছিল আরো গভীরভাবে, যেমন সাগর পাড়ে হেটে বেড়িয়ে সময় কাটানো, একসাথে নাটক দেখতে যাওয়া, খবরের কাগজ পড়া ইত্যাদি নানা কাজে ;

চার্লস বেশ তাড়াতাড়ি বুঝতে পেরেছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের লেখাপড়া তিনি ঘৃণা করেন, রস কষহীন লেকচার, শব ব্যবচ্ছেদ তার জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের মত, আর অপারেশন যেখানে প্রায়শই রোগীকে অজ্ঞান না করেই করতে হতো, সেগুলো ডারউইনের জন্য ছিল আরো ভীতিকর ; তিনি নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন তার প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নানা পছন্দের বিষয়গুলো নিয়েই। কিন্তু যদিও চার্লস ডারউইন জানতেন তিনি ডাক্তার হতে পারবেন না কখনোই, কিন্তু তার বাবার সামনে দাড়িয়ে সেটা নিয়ে আলোচনা করার সাহস আর ইচ্ছা তার দুটোই তখন ছিলনা; যখনই ছুটিতে তার বাড়ি মাউন্টে বেড়াতে এসেছে, তখনই তার পুরোনো পাখি সংগ্রহ করার কাজ নিয়ে মেতে থেকেছেন তিনি, বাবার সামনে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন বারবার; সরাসরি কোনো তর্ক বা দ্বন্দ এড়িয়ে যাবার এই অভ্যাসটি তার আমৃত্যু ছিল।

১৮২৬ এর গ্রীষ্মে খানিকটা পরিবর্তন আসে যখন রবার্ট ডারউইন ঠিক করেন তার বড় ছেলে ইরাসমাসকে এবার লন্ডনে পাঠাবেন তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের পড়াশুনো শেষ করার জন্য; অতএব সে বছর অক্টোবরে বিষন্ন ডারউইনকে অবশেষে একাই ফিরতে হয় এডিনবরায়; ভাই ইরাসমাসের সঙ্গ ছাড়া কষ্টকর ডাক্তারী পড়ার তার অপছন্দের জীবনে তার স্বান্তনা ছিল কেবল প্রিয় প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নানা বিষয়গুলো ; সেই সূত্রে এডিনবরায় সমমনা প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্যে চলে আসেন চার্লস, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রানীবিজ্ঞানী রবার্ট গ্রান্ট; যিনি ডারউইনকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানা ব্যবহারিক দিকগুলো শেখানোর জন্য তার শিষ্য করে নিয়েছিলেন।


(ছবি: রবার্ট ই গ্রান্ট; পেশায় চিকিৎসক গ্রান্ট তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন জীববিজ্ঞানে, ফরাসী বিজ্ঞানী জিওফরয় এর বিবর্তনের ধারনা Unity of Plan এর একনিষ্ট সমর্থক ছিলেন; প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানা ব্যবহারিক কৌশল তিনি শিখিয়েছিলেন ডারউইনকে, যখন ডারউইন এডিনবরায় প্লিনিয়ান সোসাইটির সদস্য হয়েছিলেন; যদিও ডারউইনের বিবর্তনের ধারনায় তেমন ভরসা ছিলনা তখন, তাস্বত্ত্বেও গ্রান্টকে তার সামুদ্রিক প্রানীদের নমুনা খুজতে সাহায্য করার সময়, গ্রান্ট তাকে আধুনিক চিন্তাধারাগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন; এছাড়া ডারউইনের পিতামহ ইরাসমাস ডারউইনের একজন ভক্ত ছিলেন তিনি।)

রবার্ট গ্রান্টও ডাক্তারী পড়েছিলেন, কিন্তু সেই পেশা ছেড়ে দিয়ে তিনি দেশের সেরা একজন প্রানী বিজ্ঞানী হিসাবে সুপরিচিত হয়েছিলেন, তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল সি পেনস (Sea pens), স্পন্জ (Sponge); তিনি এছাড়াও আরো অনেক সামুদ্রিক প্রাণিদের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যাদের সম্বন্ধে তৎকালীন বিজ্ঞানীদের কোনো কিছু জানা ছিল না; গ্রান্ট খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন কোনো সন্দেহ নেই, ’আপাতদৃষ্টিতে রসকষহীন, আচরনে কেতাবী হলেও তার বাইরের আবরনের নীচে উৎসাহের কোনো অভাব নেই’, ডারউইন পরে লিখেছিলেন তার সম্বন্ধে; প্রাণি বিজ্ঞানের নানা কৌশল তিনি ডারউইনকে শিখিয়েছিলেন, যেমন কিভাবে সামুদ্রিক প্রাণিদের মাইক্রোস্কোপের নীচের সমুদ্রের লবনাক্ত পানিতে ব্যবচ্ছেদ করতে হয়, এবং স্পষ্টতই ডারউইনও বুদ্ধিমান ছাত্র ছিল গ্রান্টের; ডারউইনই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি সমুদ্র শৈবালের স্ত্রী এবং পুরুষ জনন কোষ একই সাথে দেখেছিলেন মাইক্রোস্কোপের নীচে।

১৮২৮ সালে, এডিনবরায় তার দ্বিতীয় বর্ষের শেষে, বাড়ী ফেরার পর তার বাবাকে এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল ডারউইনের জন্য, অবশেষে বাধ্য হয়েই বাবার কাছে স্বীকার করতে হয়, সে কিছুতেই ডাক্তার হতে পারবে না; রবার্ট ডারউইন যথারীতি খুবই রাগ করেছিলেন। চার্লসকে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি পাখি মারা, ককুর আর ইদুর ধরা ছাড়া আর কিছুই করো না, আর তোমার নিজের জন্যতো বটেই, এই পরিবার জন্য তুমি একটা কলঙ্ক।’

রবার্ট ডারউইন একেবারে দয়ামায়াহীন বাবা ছিলেন না, উত্তরাধিকার সূত্রেই তার ছেলে বেশ বিত্তশালী হবে সেটা তিনি জানতেন, তবে সে কোনো অলস ধনী হোক সেটা তার কাম্য ছিলনা, যদি চার্লস ডাক্তারী না হতে পারে, তার এই ছোট ছেলের জন্য রবার্টের পক্ষে সম্মানজনক পেশা হিসাবে যাজকের পেশা ছাড়া আর কিছু কল্পনা করা কঠিন ছিল; ডারউইনরা পুরো পরিবারই বিশেষভাবে ধার্মিক ছিলেন না, রবার্ট ডারউইন ব্যাক্তিগত পর্যায়ে নিজেও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান ছিলেন; কিন্তু ব্রিটেনের সমাজে ধর্ম সামাজিক নিরাপত্তা আর সম্মানের একটি বাহন ছিল সেসময়; যদিও ডারউইনের চার্চ সম্বন্ধে কোনো বিশেষ আগ্রহ ছিল না, তবে তিনি সম্মত হয়েছিলেন, তাই পরের বছর তার গন্তব্য হয় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্বের উপর পড়াশুনা করার জন্য।


(ছবি:Christ College, কেমব্রিজ, এখানে ডারউইন পাদ্রী হবার জন্য পড়তে এসেছিলেন)

পড়াশুনার জন্য বিশেষ পরিশ্রম করার মত ছাত্র ছিলেন না ডারউইন, বাইবেল পড়ার চেয়ে তাকে বেশী সময় দেখা যেত বীটল বা গুবরে পোকা সংগ্রহ করতে, তিনি বনে জঙ্গলে পোকামাকড়ের সন্ধান করতেন; একজন সহকারীকে নিয়োগ দিয়েছিলেন গাছের গায়ে মস বা শৈবাল ছেচে ছেচে বা নলখাগড়ায় ঢাকা জলাভূমির কাঁদা ঘেটে তোলার জন্য, যেন তিনি দুষ্প্রাপ্য বা দূর্লভ কোনো প্রজাতি খুজে পান; আর ভবিষ্যতের জন্য, নাহ ডারউইন কোনো গীর্জার দায়িত্ব নেবার কথা কল্পনা করছিলেন না, তার স্বপ্ন ছিল পুরো ইংল্যান্ড ছেড়েই পাড়ি দেবার।

?oh=9796247a9d045eacc85a006a7a970412&oe=58AC2DF0″ width=”400″ />
(ছবি:Christ College এর মাষ্টার গার্ডেন এ ডারউইনের একটি মেমোরিয়াল।)

ডারউইন হামবোল্ট (Alexander von Humboldt) এর কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন, ব্রাজিলের ক্রান্তীয় অঞ্চলের জঙ্গলে আর আন্দীজ পর্বত মালায় তার দু:সাহসিক বিচিত্র অভিযান কাহিনী, তাকেও উদ্বুদ্ধ করেছিল প্রকৃতি কিভাবে কাজ করে সেই রহস্যটা সরাসরি প্রকৃতিতে গিয়ে খুজে বের করার জন্য; ক্যানারী দ্বীপপুন্জের বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন হামবোল্ট, বিশেষ করে ঘন জঙ্গলে ঢাকা আগ্নেয়শিলার পাথুরে উচু নীচু জমি, ডারউইন এরকম একটি অভিযানের পরিকল্পনাই করছিলেন মনে মনে; কেমব্রিজের একজন শিক্ষক, মারমাডিউক রামসে (Marmaduke Ramsay) কে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন; মারমাডিউক রামসে, যিনি তার সাথে ক্যানারী যাওয়ার জন্য রাজীও হয়েছিলেন, ভূতত্ত্ব বিষয়ে তার নিজের জ্ঞানকে ঝালাই করে নেবার জন্য কেমব্রিজের ভুতত্ত্ববিদ অ্যাডাম সেজউইক এর সহকারী হিসাবে ওয়েলস এ কয়েক সপ্তাহ কাজও করেছিলেন; ফিল্ড ওয়ার্ক থেকে ফিরে বেশ ভালোভাবেই ক্যানারী দ্বীপপুন্জে তার অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু তখন তিনি একটা খবর পেয়েছিলেন..মারমাডিউক রামসে আর বেঁচে নেই।

?w=477&h=585″ width=”500″ />
(ছবি: আলেক্সজান্ডার ভন হামবোল্ট; অত্যন্ত বিখ্যাত এই প্রুশিয়ান ভূগোলবিদ, প্রকৃতিবিদ এবং অভিযাত্রী পরবর্তীতে তার মত অভিযানে যেতে বহু তরুণকে অনুপ্রাণিত করেছিলে, যাদের মধ্যে ডারউইন অন্যতম; দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশে তিনি ব্যপকভাবে অভিযান করেন এবং প্রথম বারের মত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তার অভিযানের বর্ণনা দিয়েছিলেন প্রায় ২১ বছর ধরে ধারাবাহিক খণ্ডে প্রকাশিত হওয়া একটি বিশাল ভ্রমন কাহিনীতে; ১৮৪৫ সালে তার প্রকাশিত Kosmos এ তিনি বিজ্ঞানের নানা শাখাকে একটি ‍সূত্রে বাধতে চেয়েছিলেন।)

ডারউইন ভীষন হতাশ হয়েছিলেন, মাউন্টে ফিরে যাবার যাত্রা শুরু করেন ডারউইন, কি করবেন সে সম্বন্ধে কোন ধারনাই তার ছিলনা, কিন্তু যখন তিনি বাসায় পৌছান, তার জন্য সেখানে তখন অপেক্ষা করছিলো কেমব্রিজের তার অন্য আরেক প্রফেসর জন স্টিভেন্স হেনসলো (Stevens Henslow) র জরুরী একটি চিঠি: হেনসলো জানতে চেয়েছেন, পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার একটি সমুদ্র যাত্রার অংশ নিতে চান কিনা ডারউইন?

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − 27 =