বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (দ্বিতীয় পর্ব)


(ছবি: ১৮৬০ সালে ডারউইন, তখন তার বয়স ৫১, এর আগের বছর নভেম্বরে তার On the Origin of Species through Natural Selection বইটি প্রকাশিত হয়েছে। ১৫ শিলিং দামের এই বইটি প্রকাশের প্রথম দুই দিনেই ১২৫০ কপির প্রত্যেকটি বিক্রি হয়ে যায়। পরের মাসে দ্বিতীয় সংস্করণ এর পুরো ৩০০০ কপিও বিক্রি হয় দ্রুত। পরবর্তীতে বইটির আরো অনেক সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছিল।)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (প্রথম পর্ব)

নিঃসঙ্গ এক ক্যাপ্টেন:

আসলে প্রস্তাবটা এসেছিল এইচএমএস বিগলের ক্যাপ্টেন রবার্ট ফিটজরয়ের কাছ থেকে; ফিটজরয় উপর এই মিশনে দুটি দ্বায়িত্ব ছিল: নতুন প্রজন্মের সূক্ষ্মভাবে তৈরী করা একট ঘড়ি তাকে ব্যবহার করতে হবে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার সময় এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকুল অঞ্চলের একটি সঠিক ম্যাপ তৈরী করতে হবে; আর্জেন্টিনা এবং কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ তখন কেবলই স্বাধীন হয়েছে স্পেন এর নিয়ন্ত্রণ থেকে, এবং ব্রিটেনের নতুন বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করার জন্য এই এলাকার একটি সঠিক মানচিত্র প্রয়োজন।

বিগলের ক্যাপ্টেন হিসাবে, যদিও ফিটজরয়ের জন্য এটি দ্বিতীয় মিশন, তবে তার বয়স ছিল তখন মাত্র ২৭ বছর , ইংল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ডে বিশাল ভুসম্পত্তির মালিক এমন একটি অভিজাত পরিবারে তার জন্ম; রয়্যাল নেভাল কলেজে তিনি অংক আর বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্রও ছিলেন, তিনি ভুমধ্যসাগর এবং বুয়েনোস আয়ার্স এ কিছু সময় দ্বায়িত্ব পালন করার পর, মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিগলের ক্যাপ্টেন হিসাবে দ্বায়িত্ব পান; বিগলের এর আগে ক্যাপ্টেন এর কাহিনীটা একটু ট্রাজিক, টিয়েরা দেল ফুয়েগোর ভীষণ অশান্ত সমুদ্রের ম্যাপ তৈরী করতে গিয়ে মূলত তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন.. তার কাছে থাকা ভুল ম্যাপ তাকে বার বার ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল, জাহাজের নাবিকদের স্কার্ভির প্রাদুর্ভাবে বিপর্যস্ত ক্যাপ্টেন তার লগ বুকে লিখেছিলেন, তার ‘আত্মা মরে গেছে’, তারপর তিনি নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

?oh=f0bf6baf40c55185bed4e07c75ea7847&oe=58A934E7″ width=”400″ />
(ছবি: রবার্ট ফিটজরয়, এইচ এম এস বিগলের ক্যাপ্টেন, যার আমন্ত্রনে ডারউইন বিগলের সমুদ্র যাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন; এছাড়াও তিনি প্রথম দিক কার আবহাওয়াবিদ ছিলেন, কিভাবে আবহাওয়া আগে থেকেই অনুমান করা যেতে পারে এব্যাপারে তিনি অগ্রণী ভুমিকা রেখেছিলেন; ডারউইনের সাথে পরবর্তীতে তার সম্পর্ক অবনতি ঘটেছিল, বিশেষ করে অরিজিন অব স্পিসিস প্রকাশনার পর; গোড়া ধার্মিক ছিলেন তিনি; পরর্ব্তীতে পরবর্তীতে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, ডিপ্রেশন জনিত কারণে। ডারউইন বিপদগ্রস্থ ফিটজরয় পরিবারকে বাচাতে ফিটজরয় এর বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন।)

ফিটজরয় মানুষ হিসাবে বলা যায় অভিজাত শ্রেণীর ঐতিহ্য আর আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতা, মিশনারীদের মত উদ্যম আর একাকীত্বের হতাশার একটি অসম মিশ্রন; বিগলে তার প্রথম মিশনে টিয়েরা দেল ফুয়েগো জরিপ করার সময় স্থানীয় অধিবাসীরা তার একটি নৌকা চুরি করেছিল; ফিটজরয় এর বদলা হিসাবে কিছু স্থানীয় অধিবাসীদের বন্দী করেছিলেন, যাদের বেশীর ভাগই অবশ্য পালিয়ে যায় কেবল তিন জন ছাড়া, যারা রয়ে গিয়েছিল, দুজন পুরুষ এবং একজন নারী, এই তিনজন জাহাজে থাকতেই যেন বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল, ফেরার পথে আরো একজন আদিবাসী সহ মোট চারজনকে ফিটজরয় তার সাথে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন, তার পরিকল্পনা ছিল তিনি তাদের লেখাপড়া শেখাবেন এবং আবার পরে ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন একজন মিশনারীসহ, যেন তারা বাকীদের খ্রিস্ট ধর্মে রুপান্তরিত ও শিক্ষিত করে তুলতে পারে।

ফিটজরয়ের মনে হয়েছিল এই আসন্ন সমুদ্রযাত্রায় তার আসলে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন; যেহেতু ক্যাপ্টেনরা জাহাজের নাবিকদের সাথে সামাজিক ভাবে মেলামেশা করেন না, এই চাপিয়ে দেয়া নির্জনতা যে কাউকে পাগল করে দেবার জন্য যথেষ্ঠ; আর এছাড়া এর আগে আত্মহত্যা করা বিগল ক্যাপ্টেন এর অশরীরি আত্মার ভয়টাতো আছেই, উপরন্তু ফিটজরয়ের আরো একটি বাড়তি চিন্তা ছিল, তার নিজের চাচাও, একজন রাজনীতিবিদ, সমস্ত ক্যারিয়ার ভেস্তে যাবার পর নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন।’

হয়তো ফিটজরয়েরও সেই ভয়ঙ্কর হতাশায় আক্রান্ত হবার আশঙ্কা ছিল ( তার আশঙ্কা অমুলক ছিল না, কারন এর তিন দশক পর নিজের ব্যর্থ হতে থাকা নৌবাহিনীর ক্যারিয়ারে ভীষন হতাশ হয়ে ফিটজরয় নিজেও তার গলা কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন), তাই ফিটজরয় এই অভিযানের সংগঠক ফ্রান্সিস বোফোর্টকে অনুরোধ করেছিলেন, তাকে সঙ্গ দেবার মত কাউকে খুজে দিতে; তারা রাজী হয়েছিলেন যে, তার এই সঙ্গীটি অভিযানে প্রকৃতি বিজ্ঞানীর দ্বায়িত্বটাও পালন করবেন, যিনি নানা ধরনের প্রাণি আর উদ্ভিদের নমুনা, যা বীগলের এই সমুদ্রযাত্রা চোখে পড়বে তার একটি তথ্য সংগ্রহ করবেন; ফিটজরয় শুধু চাইছিলেন, সে যেন একজন অভিজাত পরিবারের শিক্ষিত ভদ্রলোক হয়, যেন তার সাথে তিনি কথা বলতে পারবেন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার একাকীত্বকে ঠেকাতে।

বোফোর্ট কেমব্রিজে তার বন্ধু হেনসলোর সাথে যোগাযোগ করেন; যদিও এই পদটি লোভনীয়, তাসত্ত্বেও হেনসলো ঠিক করেন এতদিনের জন্য তিনি তার পরিবার ফেলে যেতে পারবেন না, তাই তিনি সম্প্রতি কেমব্রিজ থেকে পাশ করা লিওনার্ড জেনইনসকে প্রস্তাবটা দিয়েছিলেন প্রথমে, আর লিওনার্ডও তার কাপড় গুছিয়ে প্রায় প্রস্তুতও হয়েছিলেন, তবে শেষ মুহুর্তে তিনি তার মত পরিবর্তন করেন যখন একটি গ্রামের প্যারিশে যাজকের নিয়োগ পান তিনি, হঠাৎ করে গীর্জা ছেড়ে দেওয়াটা তার সমীচিন মনে হয়নি। সুতরাং হেনসলো অবশেষে প্রস্তাবটি দিলেন ডারউইনকে, ক্যানারী দ্বীপপুন্জে ভেস্তে যাওয়া অভিযানের বদলে এমন সুযোগ ডারউইন কল্পনাও করেননি, কোনো পরিবার বা চাকরীর পিছুটান ছাড়া ডারউইন এমন একটি দূর্লভ সুযোগ পেয়ে রীতিমত উত্তেজিত।

ডারউইনের বাবার উৎসাহ অবশ্য তার মত এত তীব্র ছিল না, তিনি সমুদ্র গামী জাহাজের কষ্টকর এবং নোংরা পরিবেশে তার ছেলে কিভাবে থাকতে পারবেন সে ব্যাপারে প্রথমত চিন্তিত ছিলেন, এছাড়া ছেলের পানিতে ডুবে মারা যাবার কল্পনাও তাকে শঙ্কিত করে তুলেছিল; রবার্ট ডারউইন মনে করতেন নৌবাহিনীর চাকরীতে ভদ্রলোকের জায়গা নেই, আর ভবিষ্যতের যে পাদ্রী হবে তার জন্য এধরনের জাহাজে করে অচেনা বনে বাদাড়ে অভিযানের বিষয়টি ভবিষ্যতে সন্মানজনক হিসাবে না দেখারও সম্ভবনা আছে। এবং যদি চার্লস এই অভিযানে যায়, তাহলে তার ভালো কোন সম্মানজনক (তার বাবার মতে) জীবনে থিতু হবার সুযোগ আর নাও আসতে পারে।

অত্এব বিষন্ন চার্লস তার শিক্ষক হেনসলোকে চিঠি জানালেন, তার বাবা তাকে অনুমতি দেননি; কিন্তু বাস্তব হলো রবার্ট ডারউইন আসলে তার মনস্থির করতে পারেননি তখনও; যখন মনক্ষুন্ন চার্লস নানা বাড়ি বেড়াতে গেলেন এসব ভুলে থাকার জন্য, রবার্ট তার শ্যালক জোসেফ ওয়েজউডকে একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি পাঠান তার পরামর্শ চেয়ে; চিঠিতে তিনি এই অভিযানের বিরুদ্ধে তার মতামতগুলো ব্যাখ্যা করে জোসেফকে লেখেন, ‘যদি তুমি আমার চেয়ে ভিন্নভাবে ব্যাপারটা ভাবো, আমি চাই সে যেন তোমার উপদেশ মেনে কাজটা করে’।

?oh=7760bf2e7d25d7675b9f461926b3d315&oe=58AC97CA” width=”400″ />
(ছবি:জশিয়া ওয়েজউড দ্বিতীয়, যার মতামত ডারউনের বাবাকে রাজি করিয়েছিল তার ছেলে সমুদ্রযাত্রার পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য। ডারউইন তার মেয়ে এমাকে বিয়ে করেছিলেন পরে। বাবার ওয়েজউড পটারী কারখানা দেখা ছাড়াও তিনি একজন সংসদ সদস্য ছিলেন, দাস প্রথা বিলোপে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন।)

ডারউইনও ওয়েজউডকে পুরো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেন এবং জোসিয়া ওয়েজউড ( জোসিয়া ওয়েজউড দ্বিতীয় ) তার ভাগ্নেকে বেশ উৎসাহ দেন, তারপর রবার্টকে চিঠিতে লেখেন, ‘একজন পাদ্রীর জন্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষণা করা খুবই সন্মানজনক কাজ, এবং এটি একটি দুর্লভ সুযোগ, এভাবে অনেক কিছু দেখার সুযোগ খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জোটে।’ ভোরবেলা চিঠিটি পাঠিয়ে জোসেফ তার ভাগ্নেকে নিয়ে পাখি শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু সকাল দশটায় দুজনকেই দেখা যায় মাউন্টের উদ্দেশ্যে ঘোড়া গাড়িতে, কারণ রবার্ট ডারউইনের সাথে মুখোমুখি ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। মাউন্টে পৌছে দেখেন, রবার্ট ইতিমধ্যেই তার পাঠানো চিঠিটি পেয়েছেন এবং আগের মত তেমন দৃঢ় নন আর তার পূর্ব সিদ্ধান্তে।

তিনি এই সমুদ্রযাত্রার জন্য ডারউইনকে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করে দেন, ডারউইনের বোনরা ভাইকে উপহার দেয় বেশ কিছু নতুন কাপড়; ফ্রান্সিস বোফোর্টকে ডারউইন চিঠি পাঠান দ্রুত, যেন তিনি হেনসলোকে লেখা তার আগের চিঠি থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, কারণ বিগলের সমুদ্র যাত্রায় যোগ দিচ্ছেন তিনি। যদিও তখনও তার ফিটজরয়ের সাথে দেখা হয়নি এবং শীঘ্রই ডারউইন শুনতে পেলেন ক্যাপ্টেন বিষয়টি নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবছেন।ফিটজরয়ের স্বভাবসূচক বীপরিত দিকে ঘুরে দাড়ানোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাকে বিভিন্ন জায়গায় বলতে শোনা গেল, বিগলের সেই পদটা ইতিমধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে তার এক বন্ধুর দ্বারা এবং ডারউইনের কাছেও সেই সংবাদটি এসে পৌছায়; ভীষন মুষড়ে পড়লেন ডারউইন, কিন্তু গুজব সত্ত্বেও তিনি লন্ডনে ফিটজরয়ের সাথে তার দেখা করার বিষয়টি অপরিবর্তিত রেখেছিলেন।

মাউন্ট থেকে তার যাত্রা শুরুর সময় তিনি চিন্তিত ছিলেন তার সমুদ্রযাত্রার এই স্বপ্নটা না আবার যেন খুব দ্রুত উড়ে যায়; যখন ডারউইন এবং ফিটজরয়ের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল, শুরুতেই ফিটজরয় এমন একটি সমুদ্রযাত্রায় ভয়ঙ্কর কি কি সব হতে পারে সেটা দিয়েই শুরু করেছিলেন, কষ্টকর, ব্যয়সাধ্য এবং হয়তো পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণও না হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু ডারউইনকে তা কিছুই দমাতে পারেনি, বরং উল্টো তিনি তার আন্তরিক যাজকের মতে ব্যবহার, তার যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ, তার সযত্নে গড়ে তোলা কেমব্রিজ সূলভ আচরণ আর কৌশলগত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ফিটজরয়ের মন জয় করে নিলেন অনায়াসে।

ঠিক হলো ডারউইনই হবেন তার যাত্রার সঙ্গী; আর ডারউইন মনে মনে বললেন… ’দক্ষিন আমেরিকার গুবরে পোকারা সাবধান আমি আসছি’।

পৃথিবীর গড়ে ওঠা…

অক্টোবর ১৮৩১ সালে যখন ডারউইন প্লীমথ পৌছেছিলেন তার ট্রাঙ্ক ভর্তি বই আর বৈজ্ঞানিক সরন্জাম নিয়ে, তিনি পৃথিবী এবং জীব জগত সম্বন্ধে তৎকালীন ধারণাকে তার সাথে নিয়ে এসেছিলেন; কেমব্রিজে তার শিক্ষকরা শিখিয়েছিলেন, পৃথিবী সম্বন্ধে জানার মাধ্যমেই আমরা ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা জানতে পারি; কিন্তু তাসত্ত্বেও বৃটিশ বিজ্ঞানীরা যতই আবিষ্কার করতে লাগলেন, ততই বাইবেলকে নির্ভুল একটি গাইড হিসাবে তাদের বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। বৃটিশ ভূতত্ত্ববিদরা যেমন, আর মেনে নিতে রাজী ছিলেন না যে, পৃথিবী মাত্র কয়েক হাজার বছর প্রাচীন; কোনো এক সময় হয়তো যথেষ্ট ছিল বাইবেল এর কথা আক্ষরিক অর্থে মেনে নেয়া, যেমন মানবজাতির সৃষ্টি হয়েছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম সপ্তাহে; ১৬৫৮ সালে জেমস আশার, আরমাঘের আর্চ বিশপ বাইবেল এবং কিছু ঐতিহাসিক রেকর্ড ঘেটে গ্রহের বয়স নির্দিষ্ট করেন। তিনি দাবী করেছিলেন, ঈশ্বর নাকি ৪০০৪ খৃষ্টপুর্বাব্দে অক্টোবর মাসের ২২ তারিখে পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন।


(ছবি:জেমস আশার (James Ussher: 1581 –1656); আয়ারল্যান্ডের এই আর্চ বিশপ পৃথিবীর বয়স মেপেছিলেন, তার মতে ৪০০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ২২ অক্টোবর ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন; বিস্ময়কর হলে সত্য এখনও অনেকে ইয়ং আর্থ ক্রিয়েশনিষ্ট আছেন, যারা জেনেসিসে বর্ণিত সময়কাল অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স মনে করেন মাত্র কয়েক হাজার বছর।)

কিন্তু খুব শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে যায় সৃষ্টির শুরুর সেই সময় থেকে পৃথিবী বদলে গেছে অনেকটাই, ভুতত্ত্ববিদরা সামুদ্রিক মোলাস্কদের শেলস বা খোলস এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রানীদের জীবাশ্ম খুজে পান খাড়া পাহাড়ের উন্মুক্ত মুখের পাথরের স্তরে স্তরে; নিশ্চয়ই ঈশ্বর তাদের সেখানে রেখে দেননি পৃথিবী সৃষ্টির সময়, আগের ভুতত্ত্ববিদরা এধরনের জীবাশ্মকে ব্যাখ্যা করতেন বাইবেলে বর্ণিত নোয়ার (নুহ নবী) সময়কালে ঘটা পৃথিবী ব্যাপী প্লাবণে মৃত প্রাণিদের অবশিষ্টাংশ হিসাবে, যখন সমুদ্র পুরো পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছিল, তারা কাদার নীচে ডুবে গিয়েছিল সমুদ্র তলে, এই কাদার স্তরই সমুদ্রের তলদেশে পাথরের স্তর তৈরী করেছিল এবং যখন বন্যার পানি সরে গিয়েছিল, বেশ কিছু স্তর ভেঙ্গে পরে, যে প্রক্রিয়ায় জীবাশ্ম পূর্ণ খাড়া পাহাড় আর নানা পর্বতমালা সৃষ্টি করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষেও, যদিও বেশীর ভাগ ভূতত্ত্ববিদই পৃথিবীর ইতিহাসকে কয়েক হাজার বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে, এমন পৃথিবীর পরির্বতন হবার একমাত্র সুযোগ হিসাবে একটি সর্বব্যাপী বিশাল বন্যার ধারণায় সব কিছুকে ব্যাখা করার প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করেন; কেউ কেউ প্রস্তাব করেন যখন এই গ্রহটি সৃষ্টি হয়েছিল পুরোটাই নিমজ্জিত ছিল বিশ্বব্যাপী সমুদ্রে, যা ধীরে ধীরে গ্রানাইট এবং তার উপর স্তরে স্তরে অন্য পাথরেরও স্তর সৃষ্টি করেছিল, পরে যখন সমুদ্র সরে যেতে থাকে, এটি সেই পাথরের কিছু অংশ উম্মোচিত করে, যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে আরো স্তরের সৃষ্টি করে;
অন্য ভুতত্ববিদরা দাবী করেন, পৃথিবীর ভুত্বককে পরিবর্তন করার মূল শক্তি এসছে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকেই, জেমস হাটন, স্কটল্যাণ্ডেে একজন কৃষিবিদ ও ভূতত্ত্ববিদ প্রস্তাব করেন পৃথিবীর কেন্দ্রের গলিত লাভাই নীচ থেকে গ্রানাইটদের উপরে ঠেলে দেয়, কোনো জায়গায় তা আগ্নেয় গিরির সৃষ্টি করে, কোথাও তা পৃথিবী পৃষ্ঠের বিশাল অংশকে অনেক উপরে ঠেলে উঠিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করে পর্বতমালা; বৃষ্টি এবং বাতাস পর্বত আর অন্যান্য উচু জায়গাগুলোকে ক্ষয় করে, এবং এই তলানীগুলোই সমুদ্রে বয়ে নিয়ে যায় পানি, যেখানে আবার সে পাথর তৈরী করে এবং পরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে আসে সৃষ্টি আর ধ্বংশর বিশ্বব্যাপী একটি চক্রে; হাটন পৃথিবীকে দেখেছিল চমৎকার ভাবে তৈরী করা ক্রমশ চলতে থাকা গতিময় একটি যন্ত্র হিসাবে, যা সবসময় মানুষের জন্য একে বাসযোগ্য রাখে।


(ছবি:জেমস হাটন James Hutton (1726-1797); যার গবেষণা আধুনিক ভুতত্ত্ববিদ্যার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল; জিওলজিকাল টাইম বা ডিপ টাইমের ধারণাটিও তার)

হাটন তার তত্ত্বের স্বপক্ষে প্রমাণও খুজে পেয়েছিলেন স্কটল্যান্ডের শিলাস্তরের গঠনেই; তিনি দেখেছিলেন গ্রানাইট পাথরের ভেইন বা শিরা কিভাবে বিস্তৃত হয়ে আছে উপরের পাললিক শিলার স্তরের ভিতরে; তিনি ভুপৃষ্ঠের কিছু খোলা জায়গায় দেখতে পান উপরের পাললিক শিলার স্তর সঠিক আনুভুমিকভাবে একের পর এক সাজানো রয়েছে কিন্তু ঠিক এর নীচেই অন্য স্তরগুলো সাজানো আসলেই উল্লম্ব ভাবে, সবচেয়ে নীচের স্তরটি ,হাটন যুক্তি দেন, হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল প্রাচীন কোনো জলাশয়ে, এবং এরপর এটি একপাশে হেলে বা কাৎ হয়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে একে ঠেলে উঠিয়ে দিয়েছিল পৃথিবীর ভিতরের কিছু শক্তি, এবং পরে তা ধীরে ধীরে বৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষয় হতে থাকে; পরে এই হেলানো স্তরগুলো আবার পানির নীচে ঢাকা পড়ে, এবং এর উপর নতুন এক সেট আণুভূমিক পাললিক শিলার স্তর সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে আবারো পুরো স্তরটি পানির উপরে উঠে আসে এমন একটি ভুতাত্ত্বিক কাঠামোর সৃষ্টি করেছিল।


(ছবি:স্কটল্যান্ডে হাটনের বর্ণিত শিলাস্তরের Unconformity)

‘একটা প্রশ্ন এখানে স্বাভাবিকভাবেই আসে, সেটি এরকম কিছু হবার জন্য প্রয়োজনীয় সময়কাল নিয়ে’.. হাটন মন্তব্য করেছিলেন যখন তিনি তার এই তত্ত্বটি সর্বসাধারণের জন্য প্রস্তাব করেন, কতটুকু সময়কালের প্রয়োজন ছিল এই বিশাল কাজটি করার জন্য? তার উত্তর ছিল, অনেক..অনেক দীর্ঘ সময়; বাস্তবিকভাবে তিনি কল্পনা করেছিলে, অসীম সময়ের।

কিভাবে পৃথিবীর পরিবর্তন হচ্ছে সে বিষয়ে হাটন একটি মৌলিক নীতি আবিষ্কার করেছিলেন: আমাদের বোধগম্যতার বাইরে ধীর সেই শক্তি আজো কাজ যা করে যাচ্ছে এই গ্রহকে এর পুরো ইতিহাস জুড়ে নতুন রুপ দিতে; সেকারণেই আজকের যুগে অনেক ভূতত্ত্ববিদের কাছে তিনি স্মরণীয়; কিন্তু তার সময়ে তাকে সরাসরি বিরোধিতার মুখোমুখি হয়ে হয়েছিল সবক্ষেত্রেই; তার কিছু সমালোচক অভিযোগ করেছিলেন, তার তত্ত্ব বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিস এর ব্যাখ্যা বিরোধী; কিন্তু বেশীর ভাগ ভূতত্ত্ববিদই তার সেই ধারাণটি, পৃথিবীর ইতিহাসের যে কোনো দিক নির্দেশনা নেই, এবং এটি স্বয়ংসম্পুর্ণ সৃষ্টি আর ধ্বংসের একটি চক্রের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যার কোন শুরু বা শেষ নেই… এই বিষয়টির বিরোধীতা করেছিলেন; কিন্তু তারা যত মনোযোগ দিয়ে ভুতাত্ত্বিক রেকর্ড দেখতে শুরু করেন, স্পষ্টতই তারা দেখতে পেলেন পৃথিবী সবসময় একই রকম ছিল না।


(ছবি:কুভিয়ের (Jean Léopold Nicolas Frédéric Cuvier (1769 – 1832) , যিনি পরিচিত ছিলেন জর্জ কুভিয়ের হিসাবে; ফরাসী কুভিয়ের উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অত্যন্ত বিখ্যাত একজন প্রাণিবিজ্ঞানী ছিলেন; তুলনামুলক অ্যানাটোমী ও জীবাশ্মবিদ্যা তার দেখানো পথে শুরু হয়েছিল; তিনি প্রথম জীবাশ্ম কংকালের সাথে জীবিত প্রাণির কংকালের তুলনামূলক আলোচনা করেছিলেন; তিনি প্রমাণ করেছিলেন প্রজাতির বিলুপ্তি একটি ফ্যাক্ট এবং পৃথিবী ব্যাপী মহাদূর্যোগ ঘটেছিল, যা বহু প্রজাতির বিলুপ্তির কারণ (Catastrophism); জীবাশ্মবিদ হলেও তিনি বিবর্তনের ধারণার বিরোধী ছিলেন; লামার্ক ও পরে জিওফরয় সন্ত ইলিয়ারের বিবর্তনের ধারণাকে বিরোধিতায় নের্তৃত্ব দিয়েছিলেন)

আর এর সবচেয়ে ভালো প্রমান এসেছিল পাথর থেকে না, পাথরের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকা জীবাশ্মদের কাছ থেকে; ফ্রান্সে যেমন একজন তরুন প্রত্নতত্ত্ববিদ জর্জ কুভিয়ের জীবিত হাতিদের মাথার খুলির সাথে সাইবেরিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা (যেখানে এখন আর কোনো হাতি দেখতে পাওয়া যায় না) থেকে উদ্ধার করা জীবাশ্ম হাতির খুলির সাথে একটি তুলনামুলক আলোচনা করেন; কুভিয়ের তাদের বিশাল চোয়ালের রেখাচিত্র আকেন, তাদের দাত একটার সাথে একটা মিশে আছে করুগেটেড স্ল্যাবের বা ঢেউ খেলানো পাথরের টুকরোর মত; তিনি প্রমান করে দেখান যে এই জীবাশ্ম হাতি ( যাদের ম্যামথ বলা হয়) বর্তমানে জীবিত হাতিদের দিয়ে থকে মৌলিকভাবে ভিন্ন;
”যেমনটা কুকুর ভিন্ন শিয়াল বা হায়েনা থেকে, বা তারো বেশী”; তিনি লিখেছিলেন; খুবই কঠিন হবে এমনটা দাবী করা যে এই সুস্পষ্ট সুবিশাল প্রানীটি ঘুরে বেড়িয়েছে অথচ কারো চোখে পড়েনি; প্রথম বারের মত একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা দেখালেন অতীতে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে।’ কুইভিয়ের পরে আরো প্রমান করে দেখিয়েছিলেন যে, অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণিও বিলুপ্ত হয়েছে; তার আবিষ্কার সম্বন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ”আমার মনে হয় তারা প্রমান করে আমাদের আগে অন্য এক পৃথিবীর অস্তিত্ত্ব ছিল, যা ধ্বংশ হয়েছে কোন ধরনের মহাদুর্যোগের কারনে; কিন্তু এই কি ছিল সেই প্রাচীন পৃথিবী? কি সেই প্রকৃতি যা মানুষের কর্তৃত্ত্বের বাইরে? এবং এটি বিলুপ্ত করার মত বৈপ্লবিক ঘটনাটাই বা কি, যা কিছু ক্ষয়ে যাওয়া হাড় ছাড়া আর কোন চিহ্ন অবশিষ্ট রাখেনি?”।

কুভিয়ের এমন কি আরো বলেছিলেন যে, কেবল মাত্র একটিই মহাদুর্যোগ হয়নি, যেখানে মামথ আর স্তন্যপায়ী বিলুপ্ত হয়েছে, বরং ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলো এমন ঘটনা ঘটেছে; বিভিন্ন যুগের জীবাশ্মগুলোও এত বেশী বৈশিষ্ট্যসূচক যে কুভিয়ের এমনকি তাদের ব্যবহার করতে পারতেন কোন পাথরের ফরমেশনে তারা পাওয়া গেছে তা চিহ্নিত করতে; মহাদুর্যোগের সঠিক কারনটি কি ছিল তা নিশ্চয়ই কুভিয়ের এর জানা ছিল না; তিনি ধারনা করেছিলেন, হঠাৎ করে বেড়ে ওঠা সমুদ্রপৃষ্ঠর উচ্চতা বা কোন হঠাৎ তুষার যুগ হয়তো বা এর কারণ হতে পারে; পরবর্তীতে নতুন প্রাণী আর উদ্ভিদ আবির্ভূত হয়েছিল গ্রহের অন্য কোন স্থান থেকে সেখানে অভিপ্রয়ানের মাধ্যমে বা কোন না কোন ভাবে সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল তাদেরনতুন করে; কিন্তু কুভিয়ের একটা ব্যপারে নিশ্চিত ছিলেন, এধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন পৃথিবীর ইতিহাসে খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা; যদি নোয়ার প্লাবন সত্যি হয়ে থাকে, সেটি ছিল এধরনের ধারাবাহিক ভাবে ঘটে আসা দুর্যোগের সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মাত্র ; প্রতিটি দুর্যোগই অসংখ্য প্রজাতির বিলুপ্তির কারন ছিল, এবং বেশীর ভাগ এধরনের ঘটনাগুলো ঘটেছে মানুষের আবির্ভাবের বহু আগেই।


(ছবি: ১৮৫৪ সালে ডারউইন -অরিজিন অব স্পিসিস তখনও লেখা হয়নি। ছবিটা নিয়ে বন্ধু জোসেফ হুকারকে লিখেছিলেন : if I really have as bad an expression, as my photograph gives me, how I can have one single friend is surprising.)

জীবনের ইতিহাসের সত্যিকারের গতিটা নির্ণয়ের জন্য, বৃটিশ ভূতত্ত্ববিদরা যেমন, অ্যাডাম সেজউইক সমস্ত গ্রহের ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড তৈরীর একটি কাজ হাতে নেন, স্তর বিন্যাস অনুযায়ী, তারা শিলা স্তরের ফরমেশনকে যে নাম দিয়ে গিয়েছিলেন, তার কিছু এখনও প্রচলিত আছে, যেমন ডেভোনিয়ান এবং ক্যামব্রিয়ান, যদিও বৃটিশ ভূতত্ত্ববিদরা ১৮০০ র শুরু দিকে আক্ষরিকভাবে বাইবেল থেকে বহু দূরে অবস্থান নিয়েছিলেন ঠিকই, তবে তারা তাদের কাজকে দেখতেন ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে;তারা বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানই ঈশ্বরের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করবে, এমনকি তার উদ্দেশ্যগুলোকে; সেজউইক নিজে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতেন, ঈশ্বরের শক্তি, জ্ঞান এবং মাহাত্মের প্রতিচ্ছবি হিসাবে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 1 = 2