অমিতাভ রেজা চৌধুরীর আয়নাবাজিঃ বিদীর্ণ দর্পনে মুখ

বৃষ্টির ভেতরে বসে একটি ছেলে অঝোরে কাঁদছে। ছেলের নাম আয়না। সে তার মায়ের জীবন বাঁচাতে পারে নি।

তার মায়ের ‘অপরাধ’ ছিলো যাত্রাদলের অভিনেত্রী হওয়া। এই অপরাধে মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হন তিনি। চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকা দরকার, কিন্তু এতো টাকা যোগাড় করার সামর্থ্য তার নেই, এবং তার ছেলেরও নেই। আয়না শহরে আসে, মায়ের চিকিৎসার প্রাথমিক অর্থ যোগাড় করে এক দালালের কাছ থেকে, এর বিনিময়ে তাকে এক ক্রিমিনালের ডবল হিসেবে জেলে যেতে হয়। কথা ছিলো তিন মাসের মধ্যে বেরিয়ে আসার, কিন্তু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার শিকার হয়ে, সে জেল থেকে বেরোতে পারে বছরখানেক পর। এসে জানতে পারে তার মা মারা গেছে। তাই এই কান্না।

আয়না ঠিক করে, সেও তার মায়ের মতন অভিনয় করবে, তবে আরো বড়ো মঞ্চে। তাঁর কাজ হয়, পূর্বোল্লিখিত দালাল মারফত বিভিন্ন ক্রিমিনালের ডবল হিসেবে জেলে যাওয়া, এবং এর বিনিময়ে অন্যসংস্থান করা। এটা তাঁর গোপন জীবন, প্রকাশ্যে পরিচয় দেয় সে জাহাজের রাঁধুনি বলে, থাকে পুরান ঢাকার একটা গলিতে এবং পড়ায় একটি বাচ্চাদের স্কুলে।

এক সাংবাদিক আয়নার অভিনয়ের সামান্য আভাস পায়। সে আয়নার পিছু লাগে, কিন্তু আয়না অসামান্য কূটনীতির মাধ্যমে, সাংবাদিককে এড়াতে সক্ষম হয়। তবে সাংবাদিক সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলো ঝামেলা আছে, আয়না যে আসলে কোনো জাহাজের রাঁধুনি নয়, সে যে রহস্যজনক।

এভাবেই চলছিলো, হঠাৎ, তার জীবনে হৃদি এলো। হৃদি আয়নার বাহ্যিক সারল্য দেখে মুগ্ধ হয়, এবং এক সময়, তাকে ভালোবেসে ফেলে। তাঁরা একসাথে সিলেট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ইতোমধ্যে আয়নাও হৃদিকে ভালোবেসে ফেলে, এবং ঠিক করে হৃদির সাথে শুরু করবে এক নতুন জীবন।

যেদিন ভোরবেলা আয়নার কমলাপুর রেলস্টেশনে যাওয়ার কথা, সেদিন অই দালাল দলবল নিয়ে আসে, আয়নাকে তুলে নিয়ে যায়। হৃদি কাতর হয়ে আয়নার অপেক্ষায় থাকে রেলস্টেশনে। আয়না আসে না।

আয়নাকে ধরে নিয়ে যায় রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরী, যে দেখতে অনেকটা আয়নার মতো। সে একটা পলিটিকাল কেইস খেয়েছে, ডবল দরকার তার পরিবর্তে জেল খাটার জন্য, তাই আয়নাকে ধরে নিয়ে এসেছে। আয়না বলে যে সে কাজ ছেড়ে দিয়েছে। কাজ হয় না। নিজাম সাঈদ চৌধুরি তাকে টাকার লোভ দ্যাখায়, বলে যেই মুহূর্তে আয়না জেলে ঢুকবে ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আয়নার একাউন্টে টাকা ঢুকবে, বেরিয়ে আসতে আসতে আয়না এতো টাকার মালিক হয়ে যাবে যে সারা জীবন ঠ্যাংএর উপরে ঠ্যাং তুলে খেতে পারবে। শেষ পর্যন্ত প্রলোভনে রাজি হয়ে যায় আয়না। সে রাজনীতিবিদ নিজাম সাঈদ চৌধুরীকে ট্রাস্ট করে এবং তার ডবল সেজে জেলে যায়।

কেইসে নিজাম সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়।

জীবনে প্রথমবারের মতো বিপন্ন বোধ করে আয়না। ঠিক এই সময়ে সেই সাংবাদিক সক্রিয় হয়। সে তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে জানতে পারে আয়নার ইতিহাস। বুঝতে পারে আয়নার মতো ‘ক্রিমিনাল’ রাষ্ট্রেরই সৃষ্টি, যেই রাষ্ট্র বড়ো ক্রিমিনাল, বিচার ব্যবস্থারই গাফেলতিই আয়না তৈরি করে। এবার সে আয়নাকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু সহায়তা পায় না তার পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে, যিনি বিশ্বাস করে এই দেশে টাকা আর ক্ষমতা থাকলে কোনো ক্রিমিনালের বিচার হয় না, আর তাই আয়নারাই মরে। সাংবাদিক থেকে আয়নার ইতিহাস জানতে পারে হৃদি।

কিন্তু কাহিনী হচ্ছে, আয়না একজনই, এবং এই শহরে আয়নার মতো ‘ক্রিমিনাল’ আরেকটি নেই। আয়না তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয়টি করে জেলখানায়। প্রিজন গার্ডকে বশ করে তার অতুলনীয় অভিনয়দক্ষতা দিইয়ে, এবং অসাধারণ এক কৌশলের মাধ্যমে, জেল থেকে বেরিয়ে আসে।

আয়না আর হৃদির ভেতর ‘মিলন’ হয়ে যায়, সেটা বৈবাহিক কিনা, তা অবশ্য শেষ পর্যন্তও জানা যায় না। সাংবাদিকও নিজাম সাঈদ চৌধুরীর স্বরূপ ফাঁস করে দেয়, তাতে কি হয়, সেটাও শেষ পর্যন্ত জানা যায় না। আয়নাবাজি আসলে শেষ হয়েও শেষ হয় না।

এই হচ্ছে খুব সংক্ষেপে আয়নাবাজি সিনেমার স্টোরি। আমার ধারণা অমিতাভ কিছুটা প্রভাবিত হয়েছেন বিক্তর উগোর লে মিজারেবল দ্বারা আর কিছুটা জগৎবিখ্যাত শশাঙ্ক রিডাম্পশন দ্বারা। বাকিটুকু নিজস্ব বিনিয়োগ।

আয়না চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী অসাধারণ অভিনয় করেছেন, নিজাম সাঈদ চৌধুরী চরিত্রেও, মনপুরার সোনাইকে শিশু মনে হয়েছে তুলনায়। হৃদি চরিত্রে নাবিলাকে অতোটা ভালো লাগে নাই, মনে হয়েছে কিছুটা ওভার এক্টিং করেছেন। সাংবাদিক চরিত্রে পার্থ দারুণ সাবলীল অভিনয় করেছেন।

আরেফিন শুভর অতিথি চরিত্রটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। তাঁকে স্রেফ আনা হয়েছে চমক সৃষ্টির জন্য। প্রয়োজন ছিলো না।

এবার আলাপ করা যাক সিনেমাটির দর্শন নিয়ে।

আহমদ ছফার চিন্তাভাবনার ভালো প্রভাব আছে সিনেমাটিতে।

সেটা বিভিন্ন অর্থেই।

আপনার যদি বাঙালি মুসলমানের মন পড়া থাকে, পড়া থাকে সাম্প্রতিক বিবেচনাঃ বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা, তাহলে আয়নাবাজির বিভিন্ন ইনার মিনিং বুঝতে খুবই সুবিধা হবে।

আয়না হিন্দুদের মতন কাঁসার থালায় ভাত খায়, তরকারি একসাথে নিয়ে, অথচ তার ভালো নাম হচ্ছে শারাফাত করিম। পানি পবিত্র করে শরীরকে এটা মুসলমান বিশ্বাস, তাই মুসলমানরা শরীর অপবিত্র হলে গোসল করে, রেপিস্ট বা মার্ডারারদের ডবল হিসেবে জেল খেটে বেরিয়ে আসার পর আয়নাও গোসল করে। অর্থাৎ সে শারাফাত করিম, আবার আয়নাও, একইসাথে।

টাকা, ক্ষমতা, আর সাংবাদিকতা জগতের বড়ো বড়ো কুতুবরা হাতের মুঠোয় থাকায় নিজাম সাঈদ চৌধুরীরা নয়াউপনিবেশের জমিদার আর মহাজন দুটোই, তাই, তারা মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করে না। আয়নার টাকা নেই, ক্ষমতা নেই, গণমাধ্যম নেই। তবে তাঁর ইন্দ্রজাল তৈরি করার সামর্থ্য আছে, সে অভিনয় করে, অভিনয়ের মাধ্যমেই সে এই সিস্টেমকে বোকা বানায়।

অমিতাভ রেজা চৌধুরীর সবচে বড়ো সাফল্য হল, তিনি আয়নাবাজিতে ব্যক্তিকে মূল্য দেয়ার চেষ্টা করেছেন, এইটা ভালো লক্ষণ। নয়াউপনিবেশে তো জমিদার আর মহাজনদের দাপট চলে, উনিশ শতকে যেমন চলতো এখনো তেমনি, এইখানে বিরাজমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে একটা বুর্জোয়া ক্লাস গড়ে উঠলে আমি সেটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখবো। সিস্টেম ব্যক্তির বিরুদ্ধে রংবাজি করে, ব্যক্তি তাই সিস্টেমের বিরুদ্ধে আয়নাবাজি করবে, আয়নাবাজির মূল ফিলোসফিটা মনে হয় এইটাই।

কিন্তু ব্যক্তি কি একা আয়নাবাজি করতে পারবে?

মনে হয় না।

শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিকে সমষ্টি হয়ে উঠতে হয়, আয়না তা জানে, তাই সে একটা অভিনয় শেখানোর স্কুল চালায়!

স্কুলের বাচ্চাদেরকে সে গল্পের ছলে অভিনয় শেখায়, সুন্দর বনের গল্প, আমার কাছে খুব কাকতালীয় লাগে নাই বিষয়টা। সুন্দরবন আর কি! সিনেমার শেষে আয়না যখন হৃদির পাশে দাঁড়ায়, বাচ্চারা তখন একটা মঞ্চের ওপরে, আমার চোখে যদি ধান্দা লেগে না যায় তাহলে মনে হয় সেটা একটা বনের ব্যাকগ্রাউণ্ডেই ছিলো।

আয়নাবাজি সরাসরি কোনো রাজনীতিক মেসেজ দেয় নাই। দেয়ার কথাও না, না দিয়ে ভালোই করেছে, দিলে আয়নাবাজি প্রোপাগাণ্ডা ফিল্ম হয়ে যেতো। কিন্তু আয়নাবাজি একটা নতুন বাংলাদেশের সম্ভাবনা দ্যাখে, আয়না যার সূচনাবিন্দু, আয়নার স্কুলের বাচ্চারা যেই বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

আয়নাবাজি আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধতার সিনেমা, সেই সীমাবদ্ধতার যন্ত্রণা আর তা পেরিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও আছে এই সিনেমায়, সিস্টেমকে বোকা বানিয়ে আয়নার জেল থেকে বেরিয়ে আসার শেষদৃশ্যটির যে সিম্বলিক মিনিং সমসাময়িক শিল্পসাহিত্যে তা অতুলনীয়ই সম্ভবত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − 84 =