বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (তৃতীয় পর্ব)


(ছবি: ১৮৪৯ এ তার চল্লিশ বছর বয়সে চার্লস ডারউইন, প্রতিকৃতি: Thomas Herbert Maguire)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (প্রথম পর্ব)
বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (দ্বিতীয় পর্ব)

ঐশ্বরিক পরিকল্পনা বা ডিজাইনের প্রকাশ

বৃটিশ গবেষকরা যেমন, অ্যাডাম সেজউইক, ভাবতেন ঈশ্বরের মহত্ব দৃশ্যমান শুধু কিভাবে তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আমরা সেটি দেখতে পাই কিভাবে তিনি জীবন সৃষ্টি করেছেন, প্রতিটি প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে পৃথক প্রথক ভাবে, এবং সৃষ্টির পর থেকেই তারা অপরিবর্তিত আছে, তারপরও সব প্রজাতিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিন্যস্ত করা সম্ভব –যেমন প্রাণি এবং উদ্ভিদ এবং তার মধ্যেই আরো অনেক ক্ষুদ্র উপশ্রেণীতে যেমন, কোনো ওক গাছ এবং স্তন্যপায়ী; এই বিন্যাস বৃটিশ প্রকৃতবিদরা বিশ্বাস করতেন পৃথিবীতে এটি ঈশ্বরের কল্যাণময় পরিকল্পনারই একটি রুপ; এটি বিন্যস্ত একটি ক্রমাণুসারে, যা শুরুর নির্জীব বস্তু এবং জীবনের আঠালো বা স্লাইমী নানা রুপ থেকে বিস্তৃত আরো জটিল এবং উচ্চমানের সংগঠনের জীবদের দিকে। তাদের ধারণায় সেই ‘উচ্চমানে’র অর্থ অবশ্যই বোঝাচ্ছে মানুষের সদৃশ হয়ে ওঠাকে। আর এই জীবনের মহাশৃঙ্খলের একটি সংযোগও সৃষ্টির আদি থেকে পরিবর্তিত হতে পারেনা কখনোও; কারণ তেমন কোনো পরিবর্তনের অর্থই হবে ঈশ্বরের সৃষ্টি নিঁখুত ছিল না। আলেক্সান্ডার পোপ যেমন লিখেছিলেন,” প্রকৃতির শৃঙ্খলে যে সংযোগেই আঘাত করুন না কেন/ দশ বা হাজার টুকরোই হোক না কেন সেটি, সবই একই হবে”; এই জীবনের মহা-শৃঙ্খল শুধু ঈশ্বরের কল্যাণময় সৃজনশীলতাকেই প্রকাশ করেনা, প্রতিটি প্রজাতির অতুলনীয় নিঁখুত সূক্ষ্ম ডিজাইনও প্রকাশ করে; মানুষের চোখ বলুন কিংবা পাখির ডানা; উইলিয়াম প্যালি, একজন ইংরেজ যাজক, এই যুক্তিটাই তার বইয়ে প্রকাশ করেছিলেন, যা ডারউইন বা প্রকৃতিবিদ বা ধর্মতাত্ত্বিক হবার ইচ্ছা পোষণনকারী যে কারোর জনই বাধ্যতামূলক একটি পাঠ্য ছিল।


(ছবি: অ্যাডাম সেজউইক, Adam Sedgwick (785 – 1873); আধুনিক ভুতত্ত্ববিদ্যার অন্যতম অগ্রদুত; ‍যিনি দুটো গুরুত্বপূর্ণ ভূতাত্ত্বিক সময়পর্ব ডেভোনিয়ান ও ক্যামব্রিয়ান পর্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন; ডারউইনের শিক্ষক ছিলেন ভূতত্ত্ব বিষয়ে। ওয়েলস এ তার অধীনে হাতে কলমে ভূতত্ত্ববিদ্যার কাজ শিখেছিলেন ডারউইন; ঐশ্বরিক ভাবে প্রজাতি সৃষ্টি হচ্ছে ধাপে ধাপে এমন ধারণায় তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়।পরবর্তী তার ছাত্র ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটির তীব্র বিরোধীতা করেছিলেন। অরিজিন অব স্পিসিস প্রকাশ করার সময় তার মতামত নিয়ে আগে থেকেই চিন্তিত ছিলেন ডারউইন।)

প্যালির যুক্তি একটি আকর্ষণীয়, সহজে প্ররোচিত করতে পারে এমন একটি তুলনার উপর মূলত ভিত্তি করে দাড়িয়ে ছিল। তিনি লিখেছিলেন ‘কোনো জঙ্গলের পথে হাটার সময়, ধরুন একটি পাথরের টুকরোর সাথে আমার পা হোচট খেলো আর প্রশ্ন করা হয় কেমন করে পাথরটা সেখানে এলো?’, প্যালি যতটুকু জানেন, হয়তো সেই পাথরের টুকরোটি সেখানে চিরকািই পড়েছিল, ‘কিন্তু ধরুন আমি মাটিতে পড়ে থাকা একটি ঘড়ি খুঁজে পেলাম, এবং তখন জিজ্ঞাসা করা উচিৎ কেমন করে সেটা সেখানে আসলো?, সেক্ষেত্রে প্যালি যুক্তি দেন তিনি খুবই ভিন্ন একটি উপসংহারে উপনীত হবেন, পাথরের ব্যতিক্রম, কোনো একটি ঘড়ি তৈরী হয় বেশ কয়েকটি যন্ত্রাংশের সন্মিলনে, যারা সম্মিলিতভাবে কাজ করে একটি উদ্দেশ্যে : তা হলো সময় নির্ণয়। এবং এই সব অংশগুলো কেবল কাজ করতে পারে যদি তারা সবাই একসাথে কাজ করে, অর্ধেক ঘড়ি তো আর কোনো সময় নির্ণয় করতে পারে না। প্যালি যুক্তি দেন, সেকারণে এই ঘড়িটি অবশ্যই কোনো পরিকল্পনাকারী বা ডিজাইনারের সৃষ্টি। প্যালি এমনকি যদি নাও জানেন কেমন করে একটি ঘড়ি বানাতে হয়, আর এমনকি যে ঘড়িটি তিনি পেয়েছেন সেটি যদি কাজ নাও করে, তারপরও তিনি একই কথা বলবেন। তার মতে এটাকে অসংখ্য ধাতব টুকরার নানা সম্ভাব্য বিন্যাস সন্নিবেশের শুধুমাত্র একটি সৃষ্টি বলা অর্থহীন হবে ।

?oh=6141e4d71cdc900ae93528e2bb22bd2e&oe=58A92DDE” width=”400″ />
(ছবি:উইলিয়াম প্যালি; William Paley (1743 –1805); প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বের এই প্রণেতা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসাবে টেলিওলজিক বা ডিজাইন আর্গুমেন্টটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার ঘড়ি নির্মাতার রুপক ব্যবহার করার মাধ্যমে।)

প্যালি যুক্তি দিয়েছিলেন, আমরা যখন প্রকৃতির দিকে তাকাই, আমরা এই ঘড়ির তুলনায় অগনিত আরো জটিল ও সূক্ষ্মভাবে তৈরী নানা সৃষ্টি দেখতে পাই; দূর বীক্ষণ যন্ত্র আর চোখ একই মূলনীতি অনুযায়ী বানানো হয়েছে, যেখানে লেন্সটি আলোক রশ্মিদের বাঁকা করে একটি ইমেজ বা দৃশ্য তৈরী করে; পানিতে আলোকে বাঁকা করতে আরো বেশী উত্তলাকার লেন্সের প্রয়োজন, বাতাসের তুলনায়; একারণে দেখুন, সামুদ্রিক প্রাণিদের চোখের লেন্স আরো গোলাকার থাকে স্থলবাসী প্রাণিদের তুলনায়; প্যালী তাই জিজ্ঞাসা করেন. ‘এই পার্থক্যের তুলনার চেয়ে আর কি কোনো সহজতর উদহারন আছে যা কিনা প্রমাণ করে স্বর্গীয় একজন ডিজাইনারের উপস্থিতির’?

একটি ঝিনুক, স্পুনবিল বা একটি কিডনী, যা কিছু প্যালি পরীক্ষা করে দেখেছেন তাই তাকে বিশ্বাস যুগিয়েছে প্রকৃতির সবকিছুরই একটি ডিজাইনার বা পরিকল্পক আছে; পদার্থবিদ্যার নানা সূত্র, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন ১৭০০ এর শেষ দিকে, গ্রহের কক্ষপথকে ব্যাখ্যা করতে, তা হয়তো ঈশ্বরের মহিমা খানিকটা হ্রাস করেছিল (‘জ্যোতির্বিজ্ঞান’, প্যালি স্বীকার করেছিলেন, ‘খুব ভালো কোন মাধ্যম নয়, যা দিয়ে বুদ্ধিমান কোনো সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি প্রমান করা যায়’); কিন্তু ধর্মতত্ত্ব এই ক্ষেত্রে এখনও খুবই উর্বর ক্ষেত্র।

প্রকৃতি থেকে, প্যালি তার সিদ্ধান্তে আসেন যে, কোনো স্রষ্টা ডিজাইনারের অস্তিত্ব আছে তাই শুধু না, তিনি কল্যাণময়; তিনি যুক্তি দেন, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের সৃষ্ট সব কিছুই উপকারী; পৃথিবীতে যা খারাপ কিছু আছে তা দূর্ভাগ্যজনক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। একজন মানুষ তার দাঁত ব্যবহার করতেই পারেন কাউকে কামড়ানোর জন্য, কিন্তু দাঁত পরিকল্পনা করা হয়েছে মূলত খাদ্য খাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য। যদি ঈশ্বর চাইতেন আমরা একে অপরের ক্ষতি করি, তাহলে তিনি এর চেয়ে আরো ভালো অস্ত্র ডিজাইন করে আমাদের মুখের মধ্যে দিতেন। এধরনের কোনো কালো ছায়া জীবনের সূর্যালোক থেকে প্যালীর মনোযোগ নষ্ট করতে পারেনি, ‘সর্বোপরি অবশ্যই আনন্দের পৃথিবী এটি, বাতাস, মাটি এবং পানি পরিপূর্ণ হয়ে আছে তৃপ্ত জীবনের অস্তিত্বে’।

কেমন করে জিরাফ তার লম্বা ঘাড় পেল

ডারউইনও মুগ্ধ হয়েছিলেন প্যালীর যুক্তির বাঙময়তায়, কিন্তু একই সাথে জীবনের বর্তমান রুপ কিভাবে পেল, সে সম্বন্ধে বিদ্যমান অপেক্ষাকৃত কম সম্মানজনক কিছু ধারণা সম্বন্ধেও তিনি কিছুটা জানতেন। এর কয়েকটি এসেছিল তার নিজের পরিবার থেকেই, তার দাদা ইরাসমাস ডারউইন, চার্লস জন্ম নেবার সাত বছর আগেই যিনি মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু এমনকি তার মৃত্যুতে তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। পেশায় চিকিৎসক ইরাসমাস একজন প্রকৃতিবিদও ছিলেন, এছাড়া ছিলেন একজন আবিষ্কারক, উদ্ভিদবিদ এবং বেশ জনপ্রিয় একজন কবি; তারই একটি কবিতায়, দ্য টেম্পল অব নেচার, এ তিনি প্রস্তাব করেছিলেন বর্তমানে জীবিত সব প্রাণি এবং উদ্ভিদ বিবর্তিত হয়েছে আণুবীক্ষণীক রুপ থেকে:

Organic Life beneath the shoreless waves
Was born and nurs’d in Ocean’s pearly caves;
First forms minute, unseen by spheric glass,
Move on the mud, or pierce the watery mass;
Then as successive generations bloom,
New powers acquire and larger limbs assume.

((জৈব জীবন সীমাহীন ঢেউ এর নীচে জন্ম নিয়েছিল,
যা সাগরের মুক্তোখচিত গুহায় প্রতিপালিত হয়েছে;
খুবই ক্ষুদ্র প্রথম সেই রুপগুলো, আতশ কাচের নীচেও যারা অদৃশ্য;
কাদায় পাড়ি জমিয়েছিল বা ছিদ্র করেছিল পানির আবরণ;
এর পর এসেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর,
নতুন শক্তি অর্জন আর দীর্ঘাকার হাতপা ধারন করে))

তার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর মতই ইরাসমাস ডারউইনের ব্যাক্তিগত জীবনও বেশ আলোচিত ছিল; তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, বিবাহ বহির্ভুত দুটি সন্তানের পিতা হন; তার ছেলে রবার্টের কাছে তার বাবা খানিকটা বিব্রতকর একটি চরিত্র ছিলেন এবং দৌহিত্র চার্লস, শান্ত ভদ্র মাউন্টে বেড়ে ওঠার সময় তার সম্বন্ধে তেমন কিছু জানতে পারেননি। কিন্তু চার্লস ডারউইন যখন এডিনবরায় গিয়েছিলেন, যে শহরে সব ধরনের বৈপ্লবিক ধারণাগুলো তাদের অনুকুল পরিবেশ পেয়েছিল, সেখানে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন তারা পিতামহের অনেক ভক্ত আছে।


((ছবি: চার্লস ডারউইনের দাদা ইরাসমাস ডারউইন (Erasmus Darwin) (১৭৩১-১৮০২).. চার্লস ডারউইনের পিতামহ, তার জন্মের সাত বছর আগে তিনি মারা যান; ভীষন বর্ণিল চরিত্রের এই মানুষটিকে নিয়ে ডারউইনের বাবা রবার্ট ডারউইন বেশ বিব্রত ছিলেন সবসময়, আর ডারউইনও তার সম্বন্ধে তেমন কোনো স্পষ্ট ধারণাও পাননি শৈশবে; কিন্তু এডিনবরাতে ডাক্তারী পড়ার সময় ডারউইন যখন পালাবার উপায় খুজছিলেন এই অপছন্দের বিষয় থেকে, তখন প্রকৃতি বিজ্ঞানে তাকে মেন্টরিং এর দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রাণী বিজ্ঞানী রবার্ট গ্রান্ট; গ্রান্ট ইরাসমাস ডারউইনকে শ্রদ্ধা করতেন, তার নানা লেখার সাথে পরিচিত ছিলেন; তার কাছ থেকেই দাদার কথা শুনেছিলেন ডারউইন; ইরাসমাস ডারউইন পেশায় চিকিৎসক ছিলেন, কিন্তু তার আগ্রহের ক্ষেত্র ছিল ব্যপক, তিনি ছিলেন দার্শনিক, কবি, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, অনুবাদক, সমাজ সংস্কারক; তার কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ট্রান্সমিউটেশন বা এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির উদ্ভবের তার নিজস্ব ধারনাগুলো, যা ল্যামার্ক এবং পরবর্তীতে ডারউইনের বিবর্তনের ধারনারই পুর্বসূরি; তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজটি ছিল Zoomania (১৭৯৪-১৭৯৬), চার্লস ডারউইন পরবর্তীতে বইটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন আরেকটু বড় পরিসরে; এই বইটিতে ইরাসমাস বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং সারভাইভাল অব দ্য ফিটেষ্ট সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন; বইটিতে স্পষ্টভাবে তিনি এর আগের বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণার উৎস হিসাবে স্কটিশ দার্শনিক James Burnett এর লেখার কথাও উল্লেখ করেছিলেন; এছাড়া ক্যারোলাস লিনিয়াস এর লেখা তিনি ল্যাটিন থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলেন প্রায় সাত বছর ধরে; ইরাসমাস ডারউইনের কবিতার মূল বিষয় ছিল প্রকৃতি বিজ্ঞান ; তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত একটি দীর্ঘ কবিতা দ্য টেম্পল অব নেচার প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি অণুজীব থেকে সভ্য সমাজের উদ্ভবের ব্যাপারে তার নিজস্ব ধারণাটি উল্লেখ করেছিলেন; এছাড়াও বিবর্তনের ধারণা নিয়ে তার আরো একটি দীর্ঘ কবিতা যেমন : The Loves of the Plants (১৭৮৯) ; ১৭৯১ সালে তার The Botanic Garden, A Poem in Two Parts: Part 1, The Economy of Vegetation এ বিগ ব্যাঙ সম্বন্ধে একটি কল্পনার কথা আছে, যে ধারনাটি মূলত দানা বেধেছিল উনবিংশ আর বিংশ শতাব্দীতে; নারী শিক্ষার সমর্থনকারী, দাস বাণিজ্য বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে আন্দোলনকারী ইরাসমাস ডারউইন বেশ কিছু আবিষ্কারও করেছিলেন, তার ১৭৭৯ সালের নোটবুকে প্রথম হাইড্রোজেন অক্সিজেন মিশ্রনের গ্যাস চেম্বার সহ একটি সম্ভাব্য রকেট ইন্জিনের ধারনার কথা লিখেছিলেন; স্ট্যাফোর্ডশায়ারের লিচফিল্ডের বীকন স্ট্রীটে বিবর্তন তত্ত্ব এবং ডারউইনের পিতামহ হিসাবে পরিচিত ইরাসমাস ডারউইনের বাসাটি এখন তার সন্মানে একটি মিউজিয়াম।)

যাদের একজন ছিলেন রবার্ট গ্রান্ট, চিকিৎসক এবং প্রাণিবিজ্ঞানী যিনি ডারউইনের শিক্ষক ছিলেন; গ্রান্ট স্পন্জ কিংবা সি পেন নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন কোনো অলস কৌতুহল থেকে না, বরং তিনি ভাবতেন তারা জীবজগতের একেবারে শিকড়ের দিকে অবস্থান করছে, তাদের মত প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে উদ্ভব হয়েছে পৃথিবীর সকল প্রানী; যখন গ্রান্ট এবং ডারউইন সমুদ্র পারের ‘টাইড পুল’ থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে যেতেন, গ্রান্ট তার তরুন শিষ্য ডারউইনকে ব্যাখ্যা করতেন কেন তিনি ইরাসমাস ডারউইন ও তার ট্রান্সমিউটেশন বা প্রজাতির বিবর্তনের বা যে প্রক্রিয়ায় এক প্রজাতির প্রানী অন্য প্রজাতির প্রানীতে রুপান্তরিত হয় এমন ধারণার ভক্ত ছিলেন। এছাড়া গ্রান্ট ইরাসমাসের দৌহিত্রকে ফরাসী প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের কথা বলতেন, যারা ভাববার সাহস পেয়েছিল, যে জীবন অপরিবর্তনশীল না হবার সম্ভাবনা আছে, জীবন বিবর্তিত হয়েছে।

গ্রান্ট প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে কুভিয়ের এর একজন সহকর্মীর কথা বলেছিলেন, যার নাম জাঁ ব্যাপ্টিস্ট পিয়ের আন্তোয়ান দ্য মনেট, শেভালিয়ার দ্য লামার্ক; ১৮০০ সালে লামার্ক, কুভিয়ের এবং পুরো ইউরোপকে চমকে দিয়েছিলেন প্রস্তাব করেন যে, প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতার ধারণাটি একটি বিভ্রম মাত্র, সময়ের সুচনায় প্রজাতিরা আদৌ তাদের বর্তমান রুপে সৃষ্ট হয়নি; পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস জুড়ে, স্বতঃস্ফুর্ত সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রজাতির জন্ম হয়েছে ‘নার্ভাস ফ্লুইড’ সহ যা তাদের ধীরে ধীরে রুপান্তরিত করেছে, প্রজন্মান্তরে নতুন রুপে, অন্য প্রজাতিতে। প্রজাতি যখন রুপান্তরিত হয়, তারা ধীরে ধীরে আরো বেশী জটিল হতে থাকে; এই নিরন্তর প্রজাতির আবির্ভাব এবং তাদের ক্রমশ চলমান রুপান্তর প্রক্রিয়া জীবনের মহান সেই চেইন বা শৃঙ্খলটি সৃষ্টি করে: এই শৃঙ্খলের নীম্ন স্তরের সদস্যরা শুধুমাত্র তাদের উচু স্তরের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল উচ্চশ্রেণীর সদস্যদের থেকে বিলম্বে।


(ছবি: পরিচিত ছিলেন লামার্ক নামে, Jean-Baptiste Pierre Antoine de Monet, Chevalier de Lamarck (1744 – 1829); ফরাসী এই প্রকৃতি বিজ্ঞানী প্রাকৃতিক নিয়মে বিবর্তন হয়েছে এমন ধারণার প্রথম দিককার একজন প্রস্তাবক ছিলেন।)

জীবন পরিবর্তিত হতে পারে অন্য আরেকটি উপায়ে, লামার্ক দাবী করেন: একটি প্রজাতি তার নিজের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, জিরাফ, যেমন, এমন একটি জায়গায় বাস করে সেখানে তাদের খাদ্য, গাছের পাতার অবস্থান মাটি থেকে বেশ উপরে; বর্তমান জীরাফদের আদি পুর্বসূরীদের হয়তো খাটো ঘাড় ছিল, যারা তাদের ঘাড় উচু করে পাতা খাবার চেষ্টা করতো; আর যত বেশী একটি জিরাফ এমন ঘাড় টান টান করেছে পাতা খাবার জন্য, তার সেই ‘নার্ভাস ফ্লুইড’ ঘাড়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে, এবং ফলাফলে তার ঘাড়টিও লম্বা হতে থাকে, এবং যখন এটি বাচ্চা জিরাফের জন্ম দেয়, এটিও তার লম্বা ঘাড়ের বৈশিষ্ট্যও তার মধ্যে হস্তান্তর করে। ল্যামার্ক প্রস্তাব করেন মানুষও হয়তো কোন নরবানর বা এইপদের থেকে বিবর্তিত হয়েছিল, যারা সোজা হয়ে দাড়িয়ে সমতলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল গাছ থেকে নেমে, দুই পায়ে হাটার সেই প্রচেষ্টাটি ধীরে ধীরে তাদের শরীরের কাঠামোটাকে বদলে দিয়েছিল আমাদের মত করে।

?oh=511953b550114cf0b3eb15eb860e1dae&oe=58AAD1D6″ width=”400″ />
ছবি: লামার্ক প্রস্তাব করেছিলেন সদস্যরা তাদের জীবনে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়, যে বৈশিষ্ট্যগুলো তারা অর্জন করে সেটি তাদের উত্তরসূরিদের হস্তান্তরিত করে।)

ফ্রান্স এবং প্রবাসে বেশীর ভাগ প্রকৃতিবিদরা ল্যামার্কের ধারণায় আৎকে উঠেছিলেন বিতৃষ্ণায়। আক্রমনের নেতৃত্বে ছিলেন কুভিয়ের, যিনি ল্যামার্ককে তার ধারণার স্বপক্ষে প্রমাণ দেবার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন; যে ‘নার্ভাস ফ্লুইড’ যা কিনা বিবর্তনকে সম্ভব করছে, হচ্ছে সম্পুর্ণ কাল্পনিক একটি ধারণা, এবং কোনো জীবাশ্ম রেকর্ড তাকে এ বিষয়ে সহায়তা করবে না; যদি ল্যামার্ক সঠিক হন.. তাহলে সবচেয়ে প্রাচীনতম জীবাশ্মকে অবশ্যই অপেক্ষাকৃত অনেক কম জটিলতর হতে হবে বর্তমানে জীবিত প্রজাতির তুলনায়; কারণ আর যাই হোক তারা তো অনেক কম সময় পেয়েছে তাদর সাংগঠনিক জটিলতা বাড়ানোর এই ধারাবাহিকতায়; কিন্তু তাসত্ত্বে ১৮০০ র সেই সময়ে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্মও বর্তমানে জীবিত প্রানীদের মতই জটিলতা প্রদর্শন করেছিল; কুভিয়ের আরো একটা সুযোগ পেলেন ল্যামার্ককে আক্রমন করার জন্য, যখন নেপোলিয়নের সৈন্যরা মিসরে প্রবেশ করে এবং ফারাওদের কবরে সমাহিত করা মমিকৃত নানা প্রানীদের আবিষ্কার করা হয়; সেখানে পাওয়া পবিত্র আইবিস এর কংকাল, যা বহু হাজার বছর পুরোনো, সেটি মিসরে বর্তমানে পাওয়া আইবিসের মতই দেখতে।

গ্রেট বৃটেনের বেশীর ভাগ প্রকৃতিবিদ, মজে ছিলেন প্যালির প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বে, এবং তারা কুভিয়ের এর চেয়ে আরো বেশী বিতৃষ্ণা প্রকাশ করছিলেন লামার্কের প্রস্তাবের প্রতি। কারণ লামার্ক মানুষকে একবারে প্রকৃতির বাকী সদস্যদের স্তরে নামিয়ে দিয়েছিলেন, অনিয়ন্ত্রিত কোনো নির্দেশনাহীন জাগতিক শক্তির সৃষ্ট একটি সৃষ্টি হিসাবে; অল্প কিছু মূলধারার বীপরিত বিজ্ঞানী, যেমন গ্রান্ট, ল্যামার্ক এবং তার বিবর্তনের ধারণাকে বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন, এবং এই বিরুদ্ধাচারণের কারনেই তারা বৃটেনের বিজ্ঞানীদের মূল বলয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।

লামার্কের প্রতি গ্রান্টের বিশেষ প্রশংসা বেশ অবাক করেছিলে তরুণ ডারউইনকে, ‘তিনি একদিন, আমরা যখন একসাথে হাটছিলাম, হঠাৎ করেই লামার্ক ও বিবর্তন সংক্রান্ত তার ধারণার প্রতি উচ্ছসিত প্রশংসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন’। পরে ডারউইন তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন; ‘আমি নীরব বিস্ময়ে তার কথা শুনেছিলাম, যতদুর আমি মনে করতে পারি, আমার মনে সে বিষয়ে কোনো রেখাপাত করা ছাড়াই’।

?oh=c5d448c12adbfec737c5bf72b6fae2e8&oe=58ADA1B5″ width=”400″ />
ছবি: শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের Biological Sciences Learning Center (BSLC) ভবনের লবিতে ডারউইনের এই ভাষ্কর্যটি দান করেছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তারকা ছাত্র, জেমস ওয়াটসন, ফ্রান্সিক ক্রিকের সাথে যিনি ডিএনএ কাঠামোটি আবিষ্কার করেছিলেন।)

এর চার বছর পর যখন ডারউইন বিগল জাহাজে ওঠার করার জন্য প্লীমথ বন্দরে আসেন, তার সমুদ্র যাত্রা শুরু করতে, বিবর্তনবিষয়টির উপস্থিতি তার চিন্তায় আদৌ ছিল না। শুধুমাত্র সমুদ্র যাত্রা থেকে তার ফিরে আসার পর, বিষয়টি তার চিন্তার স্তরে উঠে এসেছিল সম্পুর্ণ ভিন্ন আর বৈপ্লবিক একটি রুপ নিয়ে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

24 − 19 =