জর্দানও? | তসলিমা নাসরিন

জর্দান ছিল একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এই দেশটিও বদলে যাচ্ছে। এই তো কদিন আগে নাহেদ হাত্তার নামের এক লেখক খুন হলেন। কী তাঁর অপরাধ, না তিনি ফেসবুকে একটি কার্টুন শেয়ার করেছিলেন। কার্টুনটি এঁকেছেন কে, ফেসবুকে পোস্টই বা করেছেন কে, এসবের কিছুই জানা যায়নি। নাহেদ কিন্তু কার্টুনটি শেয়ার করার পরপরই ডিলিট করে দিয়েছিলেন, ক্ষমাও চেয়েছিলেন, বলেছিলেন তিনি ওটি শেয়ার করে ভুল করেছেন, কা্রও মনে আঘাত দেওয়ার ইচ্ছে মোটেও তাঁর নেই। নিজের ফেসবুক আইডিও তিনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এত কিছুর পরও হুমকি এসেছিল। সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। না, সরকার নিরাপত্তা দেননি। বরং বলে দিয়েছেন, নিজ দায়িত্বে কার্টুন শেয়ার করেছিলে, নিজের নিরাপত্তার দায়িত্বও তোমার নিজের।

কার্টুনটিতে স্বর্গের একটি কাল্পনিক দৃশ্য দেখানো হয়েছে। আবু সালেহ নামের এক লোক দুই অপ্সরার সঙ্গে শুয়ে আছে, কাছেই আপেল, আঙুর, মাংস আর সুরা। ঈশ্বর এসে জিজ্ঞেস করলেন আরও কিছু চাই কি না। আবু সালেহ বললেন কাজু বাদাম আর সুরা চাই। তাঁবুর একখানা দরজাও বানিয়ে দিতে বললেন ঈশ্বরকে, যেন এরপর থেকে তাঁবুতে ঢোকার আগে তিনি কড়া নেড়ে ঢুকতে পারেন। স্বর্গের বর্ণনায় বড় কোনও ত্রুটি না থাকলেও ঈশ্বরকে মানুষের আকৃতিতে দেখানোটা সম্ভবত অনেককে অসন্তুষ্ট করেছে। তারপরও সরকার যদি আগ বাড়িয়ে নাহেদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মামলা না করতেন, যদি গ্রেফতার না করতেন নাহেদকে, যদি তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতেন, তবে হয়তো আজ নাহেদকে মরতে হতো না। আমরা জানি ‘রঙিলা রসুল’ নামের একটি বই ভারতবর্ষে নিষিদ্ধ হয়েছিল। বইটিতে পয়গম্বরের যৌন জীবনের কাহিনী ছিল। ১৯২৯ সালে রঙিলা রসুল মামলার শুনানির সময় বইয়ের প্রকাশক ‘মহাশয় রাজপাল’কে লাহোর কোর্টেই গুলি করে মেরে ফেলে ইলমুদ্দিন নামের এক কট্টর মুসলিম।

কার্টুন মানুষ আঁকে হাস্যরসের জন্য। আর এই কার্টুনই কি না মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডেনমার্কের কার্টুনিস্ট লুকিয়ে আছেন, ফান্সের শার্লি হেবদো কার্টুন ম্যাগাজিনের ১২ জনকে খুন করেছে সন্ত্রাসীরা , আর এখন জর্দানে সামান্য এক কার্টুন শেয়ার করার জন্য এক লেখককে হত্যা করা হলো। এসব দেখছে সবাই, তারপরও চুপ করে আছে। যেন যারা মরার তারা মরেছে, আমাদের গায়ে আঁচড় না পড়লেই হলো।

নাহেদ হাত্তার ক্যাথলিক ছিলেন। কিন্তু নিজেকে জর্দানের ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের লোক বলে বিশ্বাস করতেন। সেদিন আদালত প্রাঙ্গনে নাহেদ হাত্তারের সঙ্গে তাঁর দুই ছেলে ছিলেন, ভাই ছিলেন। স্বজনদের সামনেই তাঁকে গুলি করা হয়েছে। ভাই বলেছেন দৌড়ে গিয়ে খুনীকে দাড়ি ধরে থামিয়েছিলেন কিন্তু পুলিশ নাকি ছাড়িয়ে দিয়েছেন। পুলিশ চাননি খুনী ধরা পড়ুক? পুলিশেরও হয়তো ধর্মীয় অনুভূতি প্রখর। এই অনুভূতি বড় সাংঘাতিক ব্যাপার। মনে আছে ১৯৯৪ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের সরকার যখন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছি এই অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মামলা করলেন, এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেন, তখন আমার শুভাকাংক্ষীরা এমনকী আমার আইনজীবীরাও আমাকে পালাতে বললেন। ধরা পড়লে নাকি পুলিশ আমাকে মেরে ফেলতে পারে, এমনকী জেলে গেলে কয়েদিরাও পারে মেরে ফেলতে।

নাহেদ হাত্তারের শরীরে তিনটে গুলি লেগেছে। তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু কে এই ধর্মান্ধ খুনী। কার্টুনের হাসিঠাট্টাও যার একেবারে সইলো না। ধারণা করা হচ্ছে সেই লোকটিই খুনী, যে লোকটি সবে মক্কা থেকে হজ্জ করে ফিরেছে। লোকটি জর্দানেরই জিহাদি। এমনিতে জর্দানের ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের মধ্যে বেশ কিছু জিহাদি আছে। তার ওপর এখন ঢুকেছে সাড়ে ছ’ লক্ষ সিরিয়ার লোক, এদের মধ্যে একজনও জিহাদি নেই – এ কেউ হলফ করে বলতে পারে না।

সিরিয়ার ব্যাপারে জর্দান সরকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ। জর্দান না সিরিয়ার সরকারের পক্ষে, না সন্ত্রাসী দল আইসিসের পক্ষে। কিন্তু অনেকের ভয়, আইসিস দলবলসহ একদিন ঢুকে যাবে জর্দানে। সিরিয়ার গায়ে গা জর্দানের। ঢুকতে চাইলেই ঢুকতে পারে, এ সবাই বোঝে। আইসিস সশরীরে এখনও না ঢুকলেও আইসিসের আদর্শ যে ইতিমধ্যে জর্দানে ঢুকে গেছে, নাহেদ হাত্তারের খুন হওয়াই তা প্রমাণ করে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সমর্থক ছিলেন নাহেদ, আইসিসের চক্ষুশূল।

১০০টিরও বেশি মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন নাহেদ হাত্তার। যদিও তিনি বলেছেন কারও মনে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশে তিনি কার্টুন শেয়ার করেননি, যদিও ক্ষমা চেয়েছেন, যদিও আইডিও ডিলিট করেছেন, যদিও বলেছেন কার্টুনটিতে যে স্বর্গের কথা বলা হয়েছি সে স্বর্গ ইসলামের স্বর্গ নয়, আইসিসদের কল্পনার স্বর্গ– তিনি ক্ষমা পাননি। নাহেদ হাত্তারের স্ত্রী তাঁকে বলেছিলেন দেশ থেকে পালিয়ে যেতে। কিন্তু পালাননি নাহেদ। জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী, মানববাদী, সেক্যুলার লেখক তিনি, পালাবার লোক নন।

জর্দান আমেরিকার বন্ধু দেশ। প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার পাচ্ছে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের দমন করার জন্য। কিন্তু কতটা দমন শেষ অবধি করতে পারছে! ইসলামী মৌলবাদী দল ’মুসলিম ব্রাদারহুড ‘মিশরে নিষিদ্ধ, আর এই দলই রীতিমত জর্দানের নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে এবার, বেশ কিছু আসনও পেয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের এই উত্থানও প্রমাণ করে জর্দান বদলে যাচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষ জর্দান হয়ে উঠছে মৌলবাদী জর্দান! ঠিক বাংলাদেশের মতো!

বাংলাদেশেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে জঙ্গীরা খুন করেছে বেশ কয়েকজন ব্লগারকে। বাংলাদেশের সরকার খুনীদের শাস্তি দেবেন এই প্রতিজ্ঞা আজও করেননি , জর্দানের সরকার কিন্তু জানিয়ে দিয়েছেন জঙ্গী জিহাদিদের কঠোর শাস্তি দেবেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরা কতটা কথা রাখতে পারবেন, জানিনা। মুসলিম দেশগুলো যখন মৌলবাদের দিকে হেলে পড়তে থাকে, তখন একে টেনে তোলা বোধহয় অসম্ভব হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সব সরকারই হেলে পড়ায় সাহায্য করেছে। এবং দুঃসময়ে হাল না ধরে নীরব ভূমিকা পালন করতে তাঁদের জুড়ি নেই।

নাহেদ হাত্তার আমাদের অভিজিৎ রায়, আমাদের ওয়াশিকুর রহমান, আমাদের অনন্ত বিজয় দাশ। নাহেদ হাত্তার আমাদের নিলয় নীল, আমাদের ফায়সাল আরেফিন দীপন। জর্দান যদি কঠোর হাতে দমন না করে জঙ্গিদের, তাহলে আরও প্রগতিশীল মানুষের খুনের ঘটনা ঘটবে দেশটায়। সময় থাকতে সচেতন না হলে কী হয়, তা বাংলাদেশের মানুষ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৯ thoughts on “জর্দানও? | তসলিমা নাসরিন

  1. দিদি খুব ভালো লিখেছ ।
    দিদি খুব ভালো লিখেছ ।
    কিন্তু কথা হল কে শাস্তি দেবে ?
    সরকারি প্রশাসন নাকি সেকুলার কেউ ?
    সবার আগে ভাবতে হবে যে শাস্তি দেবে সে ধার্মিক কি না । যদি ধার্মিক হয়ে থাকে তাহলে সেগুরে বালি ।
    যেমন ধরো কল্যাণ পুর থেকে যে জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছিল তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল ।
    কিন্তু যে রিমান্ডের দায়িত্তে ছিলেন সে সেখানেই কুপকাত । কারন সে নিজে ধার্মিক। আর জঙ্গি তার মূল হাতিয়ার সেখানে ব্যাবহার করেছে। কিছু বলতে গেলেই কুরান এর আয়াত দেখায় ।
    আমি মনে করি জর্ডানেও এমনটাই হবে ।

  2. আপনাকে ইস্টিশনে দেখে ভাল লাগল
    আপনাকে ইস্টিশনে দেখে ভাল লাগল। ইস্টিশনের এমন দুর্দিনে আপনার লেখা পাবলিশ করে পাশে থাকা অনেক বড় প্রতিবাদ। আশাকরি ভবিষ্যতে ইস্টিশনে আপনাকে পাব।

  3. ইস্টিশনে স্বাগতম।
    ইস্টিশনে স্বাগতম।

    মুসলিম দেশগুলো একবার ছারখার না হয়ে গেলে পরিবর্তন হবেনা। ইসলাম ধর্মটাই জঙ্গিবাদের পৃষ্টপোষক। ধর্ম মানতে গেলে জঙ্গিবাদের পৃষ্টপোষকতা করতেই হবে। সেটা যতবড় সেক্যুলার রাষ্ট্রই হোক।

  4. ইস্টিশনের প্লাটফর্মে আপনাকে
    ইস্টিশনের প্লাটফর্মে আপনাকে স্বাগতম। পৃথিবীর প্রায় সব মুসলিম দেশের সরকারই আকারে ইঙ্গিতে মৌলবাদীদের পক্ষের লোক। ওদের বিরুদ্ধে খুব বেশি এ্যাকশন কোন দেশের সরকারই নেয়নি। এক প্রকার সমর্থনই দিয়ে যাচ্ছে বলতে গেলে। জর্ডান আর বাংলাদেশ নাই . . .ইরান আর সিরিয়া নাই।

  5. শেষপর্যন্ত তসলিমা নাসরিন
    শেষপর্যন্ত তসলিমা নাসরিন ইস্টিশনে মিরর তৈরি করলো তার লেখার। কিন্তু সামু ছাড়া অন্যকোথাও সর্ববৃহৎ জনদর্শন (public viewing) পাওয়া যাবেনা।

  6. ত**মা আপি,
    ত**মা আপি,
    যেদিন অভি’দা আর বন্যা’পার উপর হামলা হয়েছিল সেদিন নিজেকে সামলাতে পারিনি কিন্তু আজ কেমন যেন অনুভুতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। একের পর এক ব্লগার মুক্তমনা হত্যা দেখতে দেখতে কেমন যেন মাঝে মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় কিন্তু পারিনা তোমাদের জন্য সমাজ থেকে কুসংস্কার আর প্রথা দূর করতে কি কস্টই তোমরা করে যাচ্ছ। জানো আপি আমিও এখন মৃত্যুকে ভয় পাইনা। হুমায়ুন আজাদ স্যারের উপর হামলা তোমার উপর মামলা যখন হল তখন কিন্তু আমি মুক্তমনা ছিলাম না আমার সেক্যুলার, নারীবাদী হওয়ার পিছনে তোমার অবদান সবচেয়ে বেশি। একটা সেক্যুলার রাষ্ট্র থেকে মৌলবাদিদের আখড়ায় পরিনত হওয়া রাস্ট্রের (জর্ডান)কাছ থেকে আমরা এর থেকে কিই বা আশা করতে পারি। নাহেদ হাত্তার হত্যা নতুন কোন ইস্যু না। ইসলামী টেরোরিস্টরা হট লিস্ট বানায় এঁদের মারার জন্য। যেখানে সর্বোচ্চ সম্মাননা পাওয়ার সংস্কারক হিসাবে কথা সেখানে তাঁদের মগজ পড়ে থাকে রাস্তায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 59 = 68