বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (চতুর্থ পর্ব)


(ছবি: গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের সান ক্রিস্টোবাল দ্বীপে ( ইকুয়েডর) তিহেরেতা কোভ এর উপর চার্লস ডারউইনের স্মারক ভাস্কর্য, এখানে প্রথম নেমেছিলেন তিনি ১৮৩৫ সালে)


বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (তৃতীয় পর্ব)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (দ্বিতীয় পর্ব)
বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (প্রথম পর্ব)

একজন ভূতাত্ত্বিকের আত্মপ্রকাশ

বিগলের সমুদ্রযাত্রার শুরুটা ভালোভাবে হয়নি। ১৮৩১ এর অক্টোবরে প্লীমথ বন্দরে এসেছিলেন ডারউইন জাহাজে চড়তে, কিন্তু বেশ কিছু সংস্কার, মেরামত, কয়েকবার যাত্রা শুরুর প্রচেষ্টার পর অবশেষে ডিসেম্বর মাসের সাত তারিখের আগে বিগলের তার পাল খুলে দেয় তার ঐতিহাসিক সমুদ্র যাত্রায়। বন্দর ছাড়ার পর পরই ডারউইন সি সিকনেসে কাবু হয়ে পড়েন, যা কিছু খাচ্ছিলেন , সবই তাকেই জাহাজের রেলিং এর উপর থেকে সমূদ্রে উগরে দিতে হয়েছে; যদিও ডারউইন পাঁচ বছর এই জাহাজেই ছিলেন, তারপরও সমুদ্রযাত্রায় পুরোপুরি ভাবে অভ্যস্ত হতে পারেননি কখনোই।

খুব তাড়াতাড়ি ডারউইন আবিষ্কার করলেন, ফিটজরয়কে সঙ্গ দেবার ব্যাপারটা খুব সহজ কাজ না, বিষয়টি বেশ কৌশলেরই মনে হয়েছে তার; ক্যাপ্টেন এর মেজাজ খুব রগচটা, এবং আগে থেকে তা আচ করার কোনো উপায় নেই এবং তার অতিমাত্রায় শৃঙ্ক্ষলা আর কঠোরতা ডারউইনকে হতবাক করেছিল; যেমন, ক্রিসমাসের দিন কয়েকজন নাবিক মাতাল হয়েছিল, ফিটজরয় তাদের পরেরদিন সকালে চাবুক দিয়ে তাদের পেটানোর নির্দেশ দেন; প্রতিদিন ফিটজরয় এর সাথে সকালের খাবার খেয়ে বের হলে, জুনিয়র অফিসাররা তার কাছে জানতে চাইতো, ‘আজ কি বেশী কফি কাপ থেকে ছিটকে পড়েছে?’ এটি ছিল ক্যাপ্টেন এর মেজাজের অবস্থা বোঝার জন্য তাদের সাংকেতিক বার্তা; কিন্তু ডারউইন ফিটজয়ের শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, তার কর্মস্পৃহা, বিজ্ঞানের প্রতি তার আন্তরিকতা, এবং খ্রিস্টধর্মের প্রতি নিষ্ঠাকেও শ্রদ্ধা করতেন; প্রতি রবিবার ক্যাপ্টেনের বক্তৃতার সময় তিনি উপস্থিত থাকতেন।

ডারউইন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন, কখন জাহাজের কোনো বন্দরে ভিড়বে, তিনি শুকনো মাটিতে পা রাখবেন; কিন্তু বহু সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাকে সেটি করার জন্য। ম্যাদেইরাতে স্রোতের তীব্রতা এত বেশী ছিল যে ফিটজরয় সেখানে জাহাজ নোঙ্গর না করার সিদ্ধান্ত নেন, এবং এর পরের বন্দর, ক্যানারী দ্বীপে, কলেরা মহামারীর জন্য জাহাজ ভিড়িয়ে কোয়রানটাইনে আটকে থাকার জন্য আদৌ রাজী হলেন না ফিটজরয়।

বহুদিন পর প্রথম বারের মত বিগল এসে থামলো কেপ ভারদে দীপপুঞ্জে। সেইন্ট ইয়াগোতে (এখন যার নাম সান্টিয়াগো) ডারইউইন জাহাজ থেকে নামলেন, নারিকেল গাছের নীচে ইতস্তত ঘোরাফেরা, পাথর, গাছ আর প্রাণিদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলেন; এখানে তিনি একটি অক্টোপাস খুজে পেয়েছিলেন যে তার রঙ বদলাতে পারে, বেগুনী থেকে ফরাসী ধুসর রঙ; এবং যখন তিনি এটি একটি কাচের জারে ভরে জাহাজের হোল্ডে রাখেন, তখন এটি অন্ধকারে আলোর আভা ছড়াচ্ছিল। কিন্তু দ্বীপের ভূতাত্ত্বিক গঠন, সেটাই ডারউইন বেশী করে দেখতে চাইছিলেন।

ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু হবার পর থেকেই ডারউইন পুরোপুরি মজে ছিলেন চার্লস লাইয়েল নামের একজন ইংলিশ আইনজীবির লেখা একটি নতুন বইয়ে, বইটির নাম Principles of Geology; এই বইটি ডারউইনের এই গ্রহ সম্বন্ধে এতদিনের ভাবনাটি চিরতরে বদলে দেয়, এবং একসময় যা চুড়ান্ত পরিণতি লাভ করে তার বিবর্তন তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করার মধ্যে। লাইয়েল মহাদুর্যোগ বা ক্যাটাস্ট্রোফি কেন্দ্রিক ভূতত্ত্ববিদ্যাকে আক্রমন করেন, যা সেই সময় জনপ্রিয় ছিল, তিনি নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করেছিল হাটনের ৫০ বছর পুরোনো সমানভাবে পরিবর্তিত পৃথিবীর তত্ত্বটিকে।


(ছবি: চার্লস লাইয়েল (Charles Lyell: 1797 – 1875) পেশায় আইনজীবি লাইয়েল তার সময়ে একজন সেরা ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন; জীববিজ্ঞানে গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারটির আগে ডারউইন তার সুখ্যাতি পান ভূতত্ত্ববিদ হিসাবে; চার্লস লাইলের Principles of Geology বেশ প্রভাব ফেলেছিল ডারউইনের উপর, চার্লস লাইয়েল পরবর্তীতে ডারউইনের একজন বিশ্বস্ত এবং প্রভাবশালী সুহৃদ ছিলেন আমৃত্যু।)

Principles of Geology শুধু হাটনের সেই ধারণাটির নতুন করে জাগিয়ে তোলায় মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, লাইয়েল আরো বৈজ্ঞানিকভাবে বিস্তারিত, সমৃদ্ধ একটি দৃশ্য রচনা করেন, কেমন করে যে পরিবর্তনগুলোর স্বাক্ষী হতে পারে মানুষ, সেগুলো ধীরে ধীরে এই গ্রহের আকৃতি দিয়েছে; তিনি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে দ্বীপ সৃষ্টি বা কিভাবে ভুমিকম্প কোনো একটি ভূত্বকের অংশ উপরে ঠেলে উঠিয়ে দেয় ইত্যাদি বাস্তব উদহারণ দিয়েছিলেন; এর পর তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ক্ষয়ীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রকাশ্যে উন্মোচিত এই ভূপৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যগুলো আবারো মিশে যায়; ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে ধীরে, আমাদের বোধের আড়ালে, লাইয়েল যুক্তি দেন, এমন কি আমাদের মানব ইতিহাসের সময় জুড়েও।

?oh=e12a17d927a4a097857a58b70f06dd0b&oe=58A716A8″ width=”500″ />
ছবি: চার খণ্ডের PRINCIPLES OF GEOLOGY, প্রথম সংস্করণ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই বইটি ডারউইনকে প্রভাবিত করেছিল)

Principles of Geology বইটির একটি মূল ছবি ছিল ইতালীতে অবস্থিত প্রাচীন সেরাপিসের রোমান মন্দিরের একটি রেখাচিত্র; যেখানে এর পিলারগুলোর উপরের প্রান্ত দাগাঙ্কিত ছিল গাঢ় নীল মোটা একটি ব্যান্ডের মত দাগ দিয়ে, যার কারণ হচ্ছে মোলাস্ক জাতীয় প্রাণিরা, যারা কোনো একসময় এখানে ছিদ্র করেছিল; এই মন্দিরটি এর জীবদ্দশায় পুরোপুরিভাবে নিমজ্জিত হয়েছিল পানির নীচে এবং পরে আবার সমুদ্র থেকে এটি উপরে উঠে এসেছিল; হাটনের ব্যতিক্রম, লাইয়েল পৃথিবী সৃষ্টি আর ধ্বংসের একটি নিরন্তর বিশ্বব্যাপী কোনো চক্রের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে এমনটি ভাবেননি; বরং গ্রহটি পরিবর্তিত হয়েছে স্থানীয়ভাবে, কোথাও ক্ষয়, কোথাও আবার উদগীরনের মাধ্যমে জেগে উঠেছে, একটি নিরন্তর, নির্দেশনাহীন প্রবাহে, অকল্পনীয় দীর্ঘ একটি সময়ের পরিক্রমায়।


ছবি: ইতালীর সেরাপিস এর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ; এর কলামগুলোর উপরের অংশে নীলচে দাগগুলো করেছে সামুদ্রিক মোলাস্করা, চার্লস লাইয়েল তার বইতে এই বিষয়টি উল্লেখ করে দাবী করেন, পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে, কোনো একসময় এটি পানিতে নিমজ্জিত ছিল, পরে এটি আবারো পানির উপরে উঠে আসে ভূত্বকের পরিবর্তনের কারণে)

প্রিন্সিপল অব জিওলজী বইটি ডারউইনকে ভীষণ মুগ্ধ করেছিল, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই বইটি পৃথিবী ইতিহাসের শুধু একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাই দেয়নি, উপরন্তু একটি সুযোগ করে দিয়েছে এটিকে বাস্তব পৃথিবীতে পরীক্ষা করে দেখার জন্য; যখন তিনি সেন্ট ইয়াগো তে এসে নামেন, ঠিক সেটাই করার জন্য তার সুযোগটি এসেছিল; দ্বীপের আগ্নেয় শিলার স্তর ঘেটে ঘুটে, তিনি প্রমান পেয়েছিলেন লাভা আসলে পানির নীচ থেকে বেরিয়ে এসেছে, প্রবাল এবং মোলাস্কদের শেল বা খোলশ পুড়িয়ে এটি অগ্রসর হয়েছে, বের হয়েছে পৃষ্ঠে; পৃথিবীর ভিতরে কোনো শক্তি নিশ্চয়ই এই পাথরগুলোকে সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে ঠেলে উঠিয়ে দিয়েছে; কিন্তু তারা অবশ্যই আবার পানিতে নিমজ্জিতও হয়েছে এবং আবার এটিকে উপরে তুলে দিয়েছে; আর ডারউইন বুঝতে পারলেন, কিছু এই ওঠা নামার ঘটনাও ঘটেছে সাম্প্রতিক কোনো সময়েই; কারণ পাহাড়ের ঢালে একটি ব্যান্ডে তিনি কিছু সামুদ্রিক প্রাণির খোলশ বা শেল এর জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছিলেন, যা সেই দ্বীপে এখন বসবাস করছে এমন প্রজাতিদের সদৃশ; তাহলে পৃথিবী এমনকি পরিবর্তিত হচ্ছে ১৮৩২ সালে, যেমনটা হয়েছে বহু বহু যুগ ধরে..

ডারউইন তার আত্মজীবনীতে পরে লিখেছিলেন, ‘মূলত সেন্ট ইয়াগো, কেপ ভার্দে দ্বীপপুন্জের প্রথম যে জায়গাটাকেই আমি পরীক্ষা করেছিলাম, সেটি স্পষ্ট এবং চমৎকারভাবে আমাকে প্রমাণ করে দিয়েছে অন্য যে কোনো লেখকের তুলনায় লাইয়েল এর ভূতত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনা এবং তার প্রস্তাবগুলোর তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্বকে, যাদের অনেকের কাজ আমার কাছে ছিল, বা এমন কি পরে আমি যা পড়েছিলাম’। তিনি লাইয়েল পদ্ধতি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, এবং সেটি চমৎকারভাবে কাজ করেছিল; আর সেই মুহূর্তে ডারউইনই রুপান্তরিত হয়েছিলেন একজন লাইয়েলিয়ান হিসাবে।

নিরাপত্তাহীনতার একটি অদ্ভুত অনুভূতি

১৮৩২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে বিগল দক্ষিণ আমেরিকায় পৌছায়; ফিটজরয় তিন মাসের জন্য জাহাজটি রিও ডি জেনেরিও তে নোঙর করে রাখেন, এরপর যাত্রা শুরু করেন দক্ষিন আমেরিকার উপকুল ধরে যা স্থায়ী হয়েছিল পরবর্তী তিন বছর; এই সময়টার বেশীর ভাগ অংশই ডারউইন কাটিয়েছিলেন মূলত স্থলে, ব্রাজিলে থাকার সময়, জঙ্গলের মধ্যে একটি কটেজে থাকতেন ডারউইন, চারপাশে বিস্তৃত বিশাল জৈববৈজ্ঞানিক ইডেন তাকে অভিভুত করে রেখেছিল, পাতাগোনিয়ায় তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে মাঝে মাঝে কয়েক সপ্তাহের জন্য আরো গভীরে চলে যেতেন মহাদেশের, এবং বিগলের পরের পর্যায়ে যাত্রা শুরু হবার আগে সবসময়ই ফিরে এসেছেন সময় মতন; যা কিছু তিনি দেখেছিলেন, সব কিছুই তার নোটবুকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, নদী, পর্বতমালা, ক্রীতদাস, খামারীদের; তার খালি কাচের নমুনা রাখার পাত্রগুলো ক্রমেই পুর্ণ হতে থাকে বিচিত্র সব নমুনায়।

আর্জেন্টিনার উপকুলে পুন্টা আল্টায় এরকম একটা অভিযানে, ডারউইন একটি ছোট টিলা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তার একপাশে কিছু জীবাশ্ম হাড় খুজে পান; বালি আর পাথর থেকে তাদের আলাদা করার , ডারউইন দেখেন সেগুলো আসলে বিশাল দাঁত আর উরুর হাড়, যা বিলুপ্ত বিশালাকৃতির কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণির শরীরে ছিল; পরপর কয়েকদিন তিনি আবার সেখানে ফিরে জায়গাটা ভালোভাবে খণন করেন, সেই সময় পর্যন্ত, পুরো ইংল্যান্ডে সংগ্রহে মাত্র একটি বিলুপ্ত স্তন্যপায়ীর প্রাণীর জীবাশ্মের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু পুন্টা আল্টাতে তিনি বেশ কয়েক টন জীবাশ্ম অস্থি খুজে পান; তখনও তিনি জানতেন না এগুলোর কি অর্থ হতে পারে, তবে তার অনুমান ছিল সেগুলো খুব সম্ভবত বিশালাকৃতির গন্ডার বা স্লথদের; কিন্তু তখনও পর্যন্ত ডারউইন কিন্তু শুধু একজন সংগ্রাহক; তিনি শুধু জীবাশ্মগুলো সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।

এই জীবাশ্মগুলোর মধ্যে একটা ধাঁধাঁ ছিল, এই সমুদ্রযাত্রায় ডারউইনের মনে জন্ম দেয়া অনেকগুলো ধাঁধাঁর প্রথমটি; কুভিয়ের এর একনিষ্ঠ ছাত্র হিসাবে, ডারউইন ধরে নিয়ে ছিলেন এগুলো অ্যান্টেডিল্যুভিয়ান পর্বের ( বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিস বা সৃষ্টি এবং মহাপ্লাবনের পূর্ববর্তী সময়কাল, শব্দটি ভিক্টোরিয়ার যুগের বিজ্ঞান এবং আদি ভূতত্ত্ববিদ্যায় প্রবেশ করেছিল) কোনো দানবাকৃতির প্রজাতির চিহ্ন; কিন্তু তাদের হাড়গুলোর সাথে মিশে ছিল সামুদ্রিক প্রাণিদের জীবাশ্ম খোলশদের সাথে, যারা প্রায় হুবুহু আর্জেন্টিনার উপকুলে তখনও জীবিত প্রজাতিদের মত; এই পাথরগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এই দানবাকৃতির প্রাণিগুলো যতটা প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে, ততটা প্রাচীন নয় অবশ্যই;

ডিসেম্বর, ১৮৩২ এ বিগল তিয়েরা দেল ফুয়েগোর চারপাশে তার প্রদক্ষিণ শেষ করে, ফিটজরয়ের জন্য এই মিশনে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা হবার কথা ছিল; কারণ তিনি এর আগে তার বন্দী করা নিয়ে যাওয়া তিন আদিবাসীদের তাদের গোত্রে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য সভ্যতার পরিবর্তন করার শক্তি প্রদর্শন করা; কিন্তু টিয়েরা ডেল ফুয়েগো তাকে আবার পরাজিত করে; ওলইয়া বে তে একটা মিশন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন ফিটজরয়, তিনি তিনটি উইগওয়াম (আমেরিকার আদীবাসীদের বানানো তাবুর মত ঘর) আর দুটি বাগান তৈরী করেন মিশনের জন্য; মিশনের জন্য লন্ডন থেকে নিয়ে আসা নানা দান করা জিনিস: পান করার পাত্র, চায়ের ট্রে, সুপ বানানোর টুরিন, সাদা কাপড় দিয়ে সেগুলো সাজান; কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পার যখন বিগল আবার সেখানে পরিদর্শন করতে আসে, মিশনারীদের প্রাণ ভয়ে দৌড়ে জাহাজের দিকে আসতে দেখেন তিনি; ফুয়েগাবাসীরা মিশনের সবকিছু চুরি করে ধ্বংস করে দিয়েছে জাহাজের ফিরে আসার সময় ফুয়েগাবাসীরা যাজকের দাড়ী ঝিনুকের খোলশ দিয়ে কেটে কেটে মজা করছিল তখন।

?oh=6089b33602c676896676efefaf558128&oe=58A9A110″ width=”500″ />
ছবি: তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে বিগল, কনরাড মার্টেনস এর আঁকা, যিনি বিগলে শিল্পী হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন ১৮৩৩ এ)

মনক্ষুন্ন বিষন্ন ফিটজরয় কেপ হর্ণ অতিক্রম করে দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকুল বরাবর যাত্রা শুরু করেন; ডারউইন এই সুযোগে আন্দিজ পর্বতমালায় আরোহন করেছিলেন, লাইয়েল এর কথা ভেবে, তিনি কল্পনা করার চেষ্টা করেন এর উচু শৃঙ্গগুলোর সমুদ্রের মধ্য থেকে উপরে উঠে আসার সেই দৃশ্যটি; ভালপারাইসোতে তিনি বিগলে উঠেন আবার এর উত্তর অভিমুখে যাত্রায়; পূর্বদিকে মাউন্ট ওসোরনোকে রেখে, এর নিখুঁত কোণের মতো চুড়া; নাবিকরা যখন বৃষ্টির মধ্যে ঘড়ি ঠিক করছিলে তারা মাঝে মাঝে দেখছিলেন দেখছিলেন এর চুড়া থেকে ধোয়ার কুন্ডলী বের হবার দৃশ্য; জানুয়ারী এক রাতে ওসোরনো বিস্ফোরিত হয়েছিল অগ্ন্যুৎপাতে; পাথরের বিশাল টুকরো আর আগুনের শিখা ছড়িয়ে, এমনকি লাইয়েল নিজেও কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কখনো দেখেননি।

এই প্রচন্ড দুর্যোগে পৃথিবী শেষ হয়ে যায়নি, যদিও; ভালডিভিয়া শহরে বিগল নোঙ্গর করে কয়েক সপ্তাহ পর, এবং ২০ ফেব্রুয়ারী ১৮৩৫ এ, সমস্ত পৃথিবী কেপে উঠে ডারউইনের চোখের সামনে, তখন কাছাকাছি একটি জঙ্গলে তিনি হাটছিলেন, হঠাৎ করে ঠিক করেন একটু বিশ্রাম নেবেন, আর যখন তিনি মাটিতে শুয়ে পড়েছিলেন, মাটিকে অনঢ় আর শক্ত মনে হচ্ছিল, কিন্তু কিছুক্ষন পর এটি কেপে ওঠে: ‘খুবই হঠাৎ করেই ব্যাপারটা ঘটেছিল এবং মাত্র দুই মিনিট স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল যেন এর স্থায়ীত্ব ছিল আরো দীর্ঘ সময়’, পরে ডারউইন লিখেছিলেন। ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে শান্ত ইংল্যান্ডে অভ্যস্ত ডারউইন এর কখনই ভুমিকম্প দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি, ‘সোজা হয়ে দাড়ানোর জন্য কোন সমস্যা ছিল না, তবে এই কম্পন আমাকে খানিকটা ভারসাম্যহীন করে ফেলেছিল; এটা অনেকটা কোনো বীপরিত দিকে আসা ঢেউ এর সাথে জাহাজের নড়াচড়ার মত, বা আরো বলা যেতে পারে পাতলা বরফের উপর কেউ স্কেট করার সময় যেমন অনুভুতি হয়, যখন মনে হয় শরীরের ভারে তা ডেবে যাচ্ছে’। বাতাসে গাছে নড়ে উঠেছিল, ভূ কম্পন শেষ হয়ে যায়; এই অভিজ্ঞতা তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি. ‘একটি ভয়ঙ্কর ভুমিকম্প এক মুহূর্তে ধ্বংস করে দেয় পৃথিবী সব প্রাচীনতম সম্পর্ককে : এই পৃথিবী, যা কিছু দৃঢ় এমন সব কিছুর প্রতীক নড়ে উঠে আমাদের পায়ের নীচে, যেন তরলের উপর ভাসা কোনো স্তরের মত; সময়ের মাত্র একটা সেকেন্ডে তা আমাদের মনে জানান দিয়ে যায় নিরাপত্তাহীনতার একটি অদ্ভুত অনুভূতি, যা বহু ঘন্টার গভীর চিন্তা হয়তো কখনো সৃষ্টি করতে পারেনা’।


(ছবি: বিগলে লেখা ডারউইনের ১৪ টি অমূল্য নোটবুক)


(ছবি: ডারউইনের নোটবুক)

ভুমিকম্প শেষ হবার পর, ডারউইন দ্রুত শহরে ফিরে আসেন, যা মোটামুটি অক্ষতই ছিল, কিন্তু কিছুটা দূরে কনসেপসিয়ন শহরটি পুরোপুরি ইট, কাঠের স্তুপে পরিণত হয়; শুধু ভূমিকম্প না এর ফলে সৃষ্ট সুনামীও আঘাত হেনেছিল, শহরের মুখের ক্যাথিড্রালটি ভেঙ্গে যায়, যেন কেউ ছেনী দিয়ে দালানগুলো ভেঙ্গেছে, ‘খুব তিক্ত আর অপমানজনক একটি ব্যাপার, যখন দেখতে হয়, যা কিছু তৈরী করতে মানুষের এত কষ্ট আর সময় ব্যয় হয়েছে, তা এক মিনিটের মধ্যেই পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে’। মাটিতে দীর্ঘ ফাটল ধরেছে, পাথর দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, দুই মিনিটে, ভুমিকম্প অনেক বেশী ক্ষতি করেছে। ডারউইন অনুমান করতে পারলেন, এক শতাব্দীর সাধারণ ভাঙ্গাগড়া আর ক্ষয় যা করতে পারে।

ভুমিকম্প এর উপকুল রেখা বরাবর আরো ব্যপক কিছু পরিবর্তন করেছিল, ভেঙ্গে পড়া সব বাড়ী ঘর বা ডুবে যাওয়া গবাদী পশুর ধ্বংসাবশেষ দেখে আমরা যত অনায়াসে বুঝতে পারি তার চেয়ে এই পরিবর্তনগুলো বোঝা বেশ কষ্টসাধ্য; অনেক জায়গা আগে কিনা যা পানির নীচে ছিল, এখন সেটি পানির উপরে উঠে উঠেছে, যা উপরে আবরণ করে আছে মরে যেতে থাকা সামুদ্রিক শেলফিশ দিয়ে; ফিটজরয় তার সার্ভে করার যন্ত্র দিয়ে পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন, উপকুলের কিছু অংশ ভুমিকম্পের সময় প্রায় আট ফুট ‍উপরে উঠে গেছে; দুমাস পরে আবার যখন তিনি কনসেপসিওনে ফিরে আসেন, তখনও দেখেছিলেন মাটি উপরে উঠে আছে ।

?oh=cac4ab419d75c9260165098f818b7e93&oe=58A5C6A4″ width=”500″ />
(ছবি: ডারউইন যখন ভূতাত্ত্বিক)

ডারউইন বুঝতে পারলেন যে, তিনি যা চাক্ষুষ দেখছেন তার ব্যাখ্যা তাকে লাইয়েল ইতিমধ্যেই দিয়েছেন; গলিত পাথরের চাপ নিশ্চয়ই ওসারনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণ, যা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল একটি ভূমিকম্পের সূচনা করার মত। নতুন গলিত লাভার এই বের হয়ে আসাটা সমুদ্র থেকে নতুন ভূমির সৃষ্টি করেছে; এবং যথেষ্ট পরিমান সময়ের ব্যবধানে এটি পুরো একটি পর্বতমালাকে অনেক উপরের দিকে তুলে দিতে পারে। এর কিছুদিন পর ডারউইন তার সবচেয়ে শেষ বড় কোনো অভিযানে মহাদেশের ভিতরে যান, আন্দীজ পর্বতমালার ভিতরে আবারো; পর্বতের চুড়ায় যা উসপালাটা গিরিপথকে ঘিরে ছিল, ডারউইন সেখানে একই পাথরের স্তরকে শনাক্ত করেন যা তিনি কয়েকমাস আগে আরো পূর্বে সমতল এলাকায় দেখেছিলেন, যে পাথরগুলেো মূলত সৃষ্টি হয়েছে সাগরের সেডিমেন্ট বা পলি জমা হবার মাধ্যমে। তিনি একটি প্রস্তরীভুত হওয়া একটি বনাঞ্চল যা এখন দাড়িয়ে আছে ঋজু হয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন, পাতাগোনিয়ায় তার খুঁজে পাওয়া জীবাশ্মগুলোর মত. ‘এই গাছগুলো’, তিনি তার বোন সুসানকে লিখেছিলেন, ‘ঢেকে ছিল অন্য বালি, পাথর এবং গলিত লাভার স্তরের নীচে যার পুরুত্ব কয়েক হাজার ফুট; এই পাথরগুলো জমা হয়েছে পানির নীচে, অথচ স্পষ্ট যে জায়গাগুলোয় এই গাছগুলো বেড়ে উঠেছিল সেটি ছিল সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে , সুতরাং এটা নিশ্চিৎ এই ভুমি নিশ্চয়ই সেরকমই কয়েক হাজার ফুট পানির নীচে ছিল কোনো একসময়, যেকারণে এর উপর জমা পাথরের স্তর এত পুরু’।


(ছবি: Darwin in the Galapagos Islands, শিল্পী John Harrold এর আঁকা)

স্মৃতিতে সাম্প্রতিক ভুমিকম্প আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনার অভিজ্ঞতাসহ, ডারউইনের উপসংহার ছিল আন্দিজ পর্বতমালা অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কোনো সময়ের সৃষ্টি, কোনো এক সময় এই ১৪,০০০ ফুট উচু চুড়া পুর্ব দিকের পাম্পাস এর মতই সমতল ছিল, যেখানে দানবাকৃতির স্তন্যপায়ীদের তিনি খুজে পেয়েছিলেন, তারা একসময় এখানেও বাস করতো, এবং তারপর এই জায়গাটা পানির নীচে ডুবে যায় এবং আবার পানির উপরে উঠে আসে, এর এর নীচের প্রবল শক্তি এটিকে এত উপরে ঠেলে দেয়; ডারউইন বুঝতে পারেন এই পর্বতমালা হয়তো স্তন্যপায়ীদের চেয়েও কম প্রাচীন, হয়তো এখনও তার পায়ের নীচে এটি আরো উচু হচ্ছে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

45 + = 55