বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (পঞ্চম পর্ব)


(ছবি: গালাপাগোসে পুয়ের্তো আয়োরাতে চার্লস ডারউইন রিসার্চ সেন্টারে ডারউইনের একটি ভাস্কর্য ( ক্লোস আপ), এর শিল্পী ইকুয়েডরের প্যাট্রিসিও রুয়ালেস)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (চতুর্থ পর্ব)
বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (তৃতীয় পর্ব)
বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (দ্বিতীয় পর্ব)
বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (প্রথম পর্ব)

উপকূলীয় অঞ্চলে প্রয়োজনীয় জরিপ শেষ করার পর বিগল উত্তরে প্রথমে লিমায় (পেরু) এবং এরপর পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে, দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশকে পেছনে ফেলে; টিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রবল বাতাস আর আন্দিজের তীব্র ঠাণ্ডার পর, ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণতার জন্য ডারউইন অধীর আ্গ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন; সেখানে যাবার পথে তার প্রথম যাত্রা বিরতি হয়েছিল একটি অদ্ভুত দ্বীপপুন্জে : যার নাম গালাপাগোস।

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের সূতিকাগার হিসাবে গালাপোগোস দ্বীপপুন্জের খ্যাতি আছে, কিন্তু এর গুরুত্বটা ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন ইংল্যাণ্ডে ফেরার প্রায় দুই বছর পর; তিনি যখন গালাপোগোসে প্রথম পা রাখেন, তার চিন্তায় ছিল মূলত জীববিজ্ঞান নয়, বরং প্রাধান্য ছিল ভূতত্ত্ব বিষয়ক তার কৌতুহলগুলো, কারণ তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, এখানেই হয়তো এমন কোনো জায়গা তিনি খুজে পাবেন, যেখানে লাইয়েল যেভাবে প্রস্তাব করেছেন, নতুন ভূমি সৃষ্টির সেই প্রক্রিয়াটি তিনি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন।

প্রথম যে দ্বীপে ডারউইন পা রাখেন, সেটি চ্যাটহাম দ্বীপ ( এখন পরিচিত সান ক্রিস্টোবাল নামে), একটি সদ্য সৃষ্ট আগ্নেয়শিলার স্তুপ যেখানে তখনও মাটি বা কোনো উদ্ভিদ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারেনি; কুৎসিত দর্শন ইগুয়ানা আর অসংখ্যা কাকড়া ‍তাকে সেখানে অভ্যর্থনা জানায়; ডারউইন পরে লিখেছিলেন, ‘এই দ্বীপপুন্জের প্রাকৃতিক ইতিহাস খুবই চোখে পড়ার মত, মনে হয় যেন এর নিজের মধ্যেই একটি ছোট জগত’। জগত বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, আমাদের বড় পৃথিবীটা থেকে ব্যতিক্রম।


(ছবি: এইচ এম এস বিগল এর ১৮৩৫ সালে গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ সার্ভে করার রুট; ইংল্যান্ডে ফিরে আসার বেশ কিছুদিন পর ডারউইন এখান থেকে সংগ্রহ করা কিছু নমুনায় তার তত্ত্বের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা খুজে পান; গালাপাগোস সম্বন্ধে তিনি তার ডায়রীতে লিখেছিলেন: “The natural history of this archipelago is very remarkable: it seems to be a little world within itself; the greater number of its inhabitants, both vegetable and animal, being found nowhere else.”)

সেখানে ছিল বিশাল আকারের কচ্ছপ, যা উপরের খোলস বা কারাপেইস এর ব্যাস প্রায় ৭ ফুট, এবং তাদের খাদ্য ছিল প্রিকলী পিয়ার (ক্যাকটাসের ফল), এবং ডারউইন যদি এদের পিঠেও চড়ে বসতেন তাহলেও এরা কিছু মনে করতো না, মানুষকে নিয়ে তার কোনো ভয়ই ছিলনা। এছাড়াও সেখানে খুবই কুৎসিৎ দুটি প্রজাতির ইগুয়ানারও বসবাস করে, একটি দ্বীপের মধ্যে স্থলেই তাদের খাওয়া খুঁজতো আর অন্যটি সাগরে ডুব দিয়ে সমুদ্র শৈবাল খেতো; গালাপাগোস এর পাখিরা এত শান্ত প্রকৃতির যে, ডারউইন তাদের খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারতেন, তারা ভয়ে উড়ে যেতনা।

?oh=0e2d57cc54e88b9a56b65f1afed84eca&oe=58AD23D6″ width=”400″ />
(ছবি: ডারউইনের ফিঞ্চ.. ঠোটের প্রকরণ)

ডারউইন নিয়মমাফিক তাদের সম্বন্ধে সামান্য কিছু নোট নেয়া সহ এই পাখিদের নানা প্রজাতিগুলোকে তার জন্য সংগ্রহ করতে থাকেন; কারো কারো লম্বা ঠোট, বড় বীজ ভেঙ্গে খাবার উপযোগী; কারো কারো আবার ঠোট দেখতে সরু বাঁকানো নিডল নোজ প্লায়ারস এর মত, যারা ছোট এবং সহজে নাগাল পাওয়া যায় না এমন বীজ খেতে পারদর্শী; তাদের ঠোট দেখে ডারউইন ধারণা করেন, তাদের কোনোটি হয়তো রেন, কোনোটি ফিন্চ বা ওয়ার্বলার এবং ব্ল্যাক বার্ড; তবে তিনি কোন পাখিটি কোন দ্বীপ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, সেটি নোট করে রাখার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি তখন; কারণ তিনি ধারণা করেই নিয়েছিলেন এই পাখিগুলো দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশেরই কোনো প্রজাতি, যারা কোনো একসময় এই দ্বীপপুন্জে তাদের বসতি স্থাপন করে।


(ছবি: গালাপাগোসের মেরিন ইগুয়ানা)


ছবি: গালাপাগোসের জায়ান্ট টরটয়েস)

প্রাণিদের নমুনা সংগ্রহ শেষ হবার পর, গালাপাগোস দ্বীপ ছেড়ে বিগলের যাত্রা শুরু করার অল্প কিছু দিন আগে ডারউইনের মনে হয়েছিল, তার প্রজাতিদের নমুনা সংগ্রহ আর নোট নেবার ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল; এ সময়ে তার পরিচয় হয়েছিল নিকোলাস লসনের সাথে, যিরি চার্লস দ্বীপ ( এখন যেটি সান্টা মারিয়া) একটি পেনাল কলোনীর পরিচালক ছিলেন; লসন কচ্ছপের খোলস তার ফুলের বাগানে টব হিসাবে ব্যবহার করতেন; তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, প্রতিটি দ্বীপের কচ্ছপ একে অপরের থেকে এত ভিন্ন বৈশিষ্ট সম্পন্ন যে তিনি খোলসের দাগ আর গড়ন দেখেই বলে দিতে পারবেন সেটির উৎপত্তি কোন দ্বীপে; অন্য ভাবে বললে বলা যায়, প্রতিটি দ্বীপের কচ্ছপগুলো অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন অথবা তারা হয়তোবা এমনকি স্বতন্ত্র কোনো প্রজাতির সদস্য; আর বিভিন্ন দ্বীপের উদ্ভিদগুলো, ডারউইন পরে বুঝতে পেরেছিলেন, একইভাবে স্বতন্ত্র।


(ছবি: গালাপাগোস থেকে ডারউইনের সংগ্রহ করা ফিঞ্চ)

হয়তো পাখীরাও সেরকম, কিন্তু যেহেতু ঠিক কোথা থেকে তার বেশীর ভাগ সংগ্রহ করা পাখিগুলো এসেছে (তার সঠিক নোট না নেবার কারণে), ডারউইনেরও সেটা জানার উপায় ছিল না; এবং তিনি সেটা বোঝেননি, যখন ইংল্যান্ডে ফেরার বহু দিন পর তিনি তার সংগ্রহ করে আনা পাখীগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, কেবল তখনই তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন, কিভাবে জীবনের একটি রুপ অন্য একটি রুপে পরিবর্তিত হয়।

জীবন নিজেকে নিজেই তৈরী করে

?oh=7c46cc475a3f4de1498212ac8d6dc6fa&oe=58A4C109″ width=”400″ />
(ছবি:HMS Beagle Ship Bell Chime – artist: Anton Hasell, City of Darwin, Australia)

যখন বিগল গালাপাগোস এ তার কাজ শেষ করে, এটি যাত্রা শুরু করে শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরে; বেশ দ্রুত, মাত্র তিন সপ্তাহে বিগল পৌছে যায় তাহিতিতে; আরো চার সপ্তাহ পর নিউজিল্যান্ড এবং তার দুই সপ্তাহ পর অষ্ট্রেলিয়ায়; যখন বিগল ভারত মহাসাগর অতিক্রম করছে, তখন তার মিশন ছিল প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফগুলো জরিপ করা। প্রবাল প্রাচীর নিজেই একটি জীবন্ত ভূগোল, যার মানচিত্র প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, ক্ষুদ্রকায় প্রবাল পলিপের কলোনী দিয়ে তৈরী প্রাচীর গড়ে ওঠে যখন তারা তাদের শরীরের চারপাশে বহিঃকঙ্কাল বা এক্সোস্কেলিটন তৈরী করে। পলিপরা মুলত বাঁচতে পারে সমুদ্র পৃষ্ঠের কাছাকাছি, যা পরবর্তীতে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন, কারণ তারা একটি সালোকসংশ্লেষী শৈবালের উপর নির্ভর করে যারা তাদের শরীরে বসবাস করে; ভারত মহাসাগরে প্রবাল প্রাচীর অতিক্রম করার সময়, ডারউইন বিস্ময়ের সাথে ভাবছিলেন, কিভাবে তারা এরকম নিখুত গোলকার রীফ তৈরী করে; কখনো কোনো দ্বীপের চারপাশে, বা কখনো শুধু সমুদ্রে; এবং কেনই এই প্রবাল প্রাচীর পানির উপরের পৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা যায়, যেখানেই কিনা ঠিক তাদের থাকা প্রয়োজন তাদের সঠিকভাবে বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সুর্যালোক পেতে?

লাইয়েল এর প্রিন্সিপল অব জিওলজীতে ডারউইন প্রবাল প্রাচীর নিয়ে তিনি লাইয়েল এর হাইপোথিসিসটি পড়েছিলেন: তাদের শুধু পানিতে নিমজ্জিত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে জন্ম হয়; প্রথমবারের মত ডারউইনের মনে হলো, এখানে লাইয়েল ভুল বলেছেন; জ্বালামুখের অনুকল্পটি ঠিক খাপ খায় না, কারণ এর জন্য প্রতিটি প্রাচীরকে ঠিক এমন জ্বালামুখের উপর হতে হবে এবং সেই জ্বালামুখগুলো ঘটনাচক্রে ঠিক সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কাছেই, বেশ অগভীরে অবস্থান করবে; ফলে ডারউইন ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দিলেন:

যদি লাইয়েল এর ভূত্ত্ত্ব অনুযায়ী আন্দিজ পর্বতমালা এখনও উপরে ‌উঠতে থাকে, ডারউইনের যুক্তি দেন গ্রহের অন্য কোন অংশকে অবশ্যই নীচে নেমে যেতে হবে, ভারত মহাসাগরের মত এমন কোনো জায়গায় এটি অবশ্যই হতে পারে; প্রবাল হয়তো তৈরী হয় অগভীর পানিতে, নতুন সৃষ্ট দ্বীপের চারপাশে অথবা মূল ভূখণ্ডের উপকুলের কাছাকাছি কোথাও, তারপর এটি নিমজ্জিত হতে থাকে, ধীরে ধীরে যখন নীচের ভূমিটি আরো পানির নীচে ডুবে যেতে থাকে, প্রবালও তাদের সাথে নীচে নেমে যায় কিন্তু তারা হারিয়ে যায় না; ডারউইন যুক্তি দেন, যেহেতু নতুন প্রবাল প্রাচীরের উপরে পৃষ্ঠে ক্রমাগত সৃষ্টি হতে থাকে যখন এর নীচের মাটি অরো ডুবে যেতে থাকে; যখন প্রাচীন প্রবাল অন্ধকারে মারা যায়, প্রাচীর ঠিকই টিকে থাকে; এর কিছু কাল পরে যখন দ্বীপটি যখন নিজেই পুরোপুরি নীচ থেকে সরে যায় কিন্তু প্রাচীরটি পানির পৃষ্ঠের কাছাকাছি নিজেদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

প্রতিটি প্রবাল প্রাচীর যাদের বিগল সার্ভে করেছে, তারা এর কোন না একটি পর্যায়ে আছে; কিলিং দ্বীপপুন্জে ( এখন যেটি কোকোস দ্বীপপুন্জ) বিগলের সার্ভেয়ররা দেখলেন প্রবাল প্রাচীরের সমুদ্রমুখী প্রান্তে সাগর তল হঠাৎ করে খাড়া ভাবে গভীর হয়ে আছে; তারা যখন একেবারে নীচের থেকে প্রবাল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখেন, তারা দেখেন সেগুলো আসলে মৃত প্রবাল; ঠিক যেমনটা ডারউইন আগেই ধারণা করেছিলেন।

?oh=46fb63c9bf7c61d482eb3f9bd771d028&oe=58A10BF3″ width=”400″ />
(ছবি: প্রবাল প্রাচীর কিভাবে তৈরী হতে পারে সেই সংক্রান্ত ডারউইনের প্রস্তাবিত হাইপোথিসিস; দেশে ফেরার আগেই ডারউইনের সুখ্যাতি পৌছেছিল লন্ডনে, একজন প্রতিশ্রুতিশীল ভূতত্ত্ববিদ হিসাবে।)

ডারউইন আর লাইয়েল এর শুধু অনুসারী রইলেন না বরং তিনি এখন একজন স্বতন্ত্র, পূর্ণবিকশিত চিন্তাবিদ; তিনি লাইয়েল এর মুলনীতি ব্যবহার করেই লাইয়েল এর চেয়ে আরো ভালো একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন প্রবাল প্রাচীর সম্বন্ধে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনি সেই পন্থাটাও বের করেছিলেন কিভাবে তার এই ধারণাটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করা যেতে পারে; বৈজ্ঞানিকভাবে কিভাবে ইতিহাস পড়তে হয় ডারউইন সেটা শিখছিলেন, এই ক্ষেত্রে পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাস; তার পক্ষে হাজার বছর ধরে প্রবাল প্রাচীরে গড়ে ওঠা পুণরাবৃত্তি করে দেখানো সম্ভব ছিল না, কিন্তু যদি তার প্রস্তাব মতই ইতিহাস ঘটে থাকে, তিনি তার প্রাক ধারণাটি পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন; তিনি পরে লিখেছিলেন, ‘একবার তাকালেই এই প্রক্রিয়াটি সম্বন্ধে আমাদের অন্তর্দৃষ্টি সমৃদ্ধ হয়ে উঠে, যেভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠ ভেঙ্গে যায় এমন ভাবে যা কিছুটা সদৃশ্য তবে অবশ্যই নিখুত নয়, যেমনটি কোন ভূতত্ত্ববিদ হয়তো দেখতে পেতেন, যদি তিনি ১০,০০০ বছর বেঁচে থাকতেন এবং যিনি এই সময়ের পরিক্রমায় সকল পরিবর্তন লিপিবদ্ধ করে রাখতেন’।

?oh=153c646adf150970816a42cdf83457e5&oe=58A228C7″ width=”400″ />
(ছবি: ডারউইনের নিজের হাতে রঙ করা কোকোস দ্বীপের প্রবাল প্রাচীরের প্রস্থচ্ছেদ দৃশ্য)

মনে হতে পারে এই গ্রহটি অপরিবর্তনীয় কিন্তু ডারউইন সময়কে মিলিয়ন বছরের মাত্রায় দেখতে শিখছিলেন এবং সেই দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহটি জীবন্ত কম্পমান গোলকের মত, কোথাও এটি ফুলে উঠছে, কোথাও ডেবে যাচ্ছে ভিতরে, এর উপরের পৃষ্ঠ ছিড়ে যাচ্ছে এই পরিবর্তনের চাপে; ডারউইন আরো শিখতে শুরু করেছিলেন, তাহলে জীবনও এই সময়ের মাত্রায় পরিবর্তিত হতে পারে; যথেষ্ট পরিমান সময়ে, প্রবাল প্রাচীর তাদের নীচে সমুদ্রের তলদেশের পুরো ডুবে যাওয়া থেকে নিজেদের ঠেকাতে পারে; তারা বিশাল দুর্গ তৈরী করতে পারে তাদের পুর্বসুরীদের শরীরের ধ্বংসা্বশেষ বা কঙ্কালের উপর।


(ছবি: ডারউইন তিন ধরনের প্রাবল প্রাচীর শনাক্ত করেছিলেন – atolls, barrier reefs আর fringing reefs)

উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে অ্যাজোরেস হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে বিগলের সময় লাগে আরো ছয় মাস; তবে ডারউইনের সুখ্যাতি তার আগেই ইংল্যান্ড পৌছে গিয়েছিল; কেমব্রিজে তার শিক্ষক হেনসলো, তার কাছে লেখা ডারউইনের বেশ কিছু চিঠি থেকে তথ্য বাছাই করে একটি বৈজ্ঞানিক পেপার ও একটি প্যাম্ফলেট প্রকাশ করেছিলেন; তার পাঠানো স্তন্যপায়ী প্রাণির জীবাশ্ম নিরাপদে ইংল্যান্ডে পৌছেছিল, এবং তাদের বেশ কিছু বৃটেন এর সেরা বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে ইতিমধ্যেই; এমনকি ডারউইনের আইডল, লাইয়েলও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন ডারউইনের ফিরে আসার।

?oh=b6b00124eb2a21fd48eb0e02ba20ae97&oe=58A361BE” width=”400″ />
(ছবি: 1849 John Stevens Henslow,উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে অ্যাজোরেস হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে বীগলের সময় লাগে আরো ছয় মাস; তবে ডারউইনের সুখ্যাতি তার আগেই ইংল্যান্ড পৌছে গিয়েছিল; কেমব্রিজে তার শিক্ষক হেনসলো, তার কাছে লেখা ডারউইনের বেশ কিছু চিঠি থেকে তথ্য বাছাই করে একটি বৈজ্ঞানিক পেপার ও একটি প্যাম্ফলেট প্রকাশ করেছিলেন।)

প্লীমাউথ বন্দর ছেড়ে যাবার পাঁচ বছর পর একদিন প্রবল বৃষ্টির দিনে ইংলিশ চ্যানেল এ প্রবেশ করে বিগল; ১৮৩৬ সালে অক্টোবর মাসের দুই তারিখে ফিটজরয় তার শেষ সার্ভিসটি পরিচালনা করলেন, সেদিন দিনের শেষে বিগল ছেড়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দেন ডারউইন; এরপরে আর কখনোই তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে বের হননি, এমনকি তার নিজের বাসা ছেড়েই বের হয়েছিলেন কদাচিৎ।

ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রেখেই ডারউইন বুঝেছিলেন, তিনি গভীরভাবে, হয়তো আমূল বদলে গিয়েছেন; গ্রামের পাদ্রী হিসাবে এমন কোনো জীবন তিনি যে আর সহ্য করতে পারবেন না সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তিনি একজন পেশাজীবি প্রকৃতি বিজ্ঞানী হয়েছিলেন এবং তার বাকী জীবনে তিনি শুধু তাই ছিলেন; এছাড়াও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা চেয়ে বরং শুধুমাত্র একজন স্বাধীন গবেষক হিসাবে, যেমন, লাইয়েল। কাজ না করতে পারলে তিনি কোনদিন সুখী হতেও পারবেন না; কিন্তু তাকে যদি লাইয়েল এর মত কোন জীবন কাটাতে হয়, তাহলে তার বাবাকে কিছু অর্থ সাহায্য দিতে হবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য; এবং চিরকালের মতই ডারউইন চিন্তিত ছিলেন, তার এই পরিকল্পনা তার বাবা কিভাবে নেবেন।

অক্টোবরের চার তারিখ তার বাবার বাড়ি শ্রিউসবারী র দ্য মাউন্টে এসে পৌছান; পরিবারের সবাইকে দেখার জন্য উদগ্রীব ডারউইন, যথেষ্ট ভদ্র ছিলেন মধ্যরাতে সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বিরক্ত না করার জন্য, সেই রাতটি তিনি স্থানীয় একটি সরাইখানায় কাটান, পরদিন সকালে যখন কেবল তার বাবা এবং বোনরা সকালের নাস্তার জন্য টেবিলে বসেছেন, তিনি কাউকে না জানিয়ে মাউন্টে প্রবেশ করেন; তাকে দেখে তারা বোনেরা আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলেন, আর তার বাবা শুধু বললেন, ‘বেশ, তার মাথার আকারতো পুরো বদলে গেছে’। তার কুকুরগুলো এমন আচরণ করলো যেন ডারউইন মাত্র একদিনের জন্য বাড়ি ছেড়েছিল, এবং এখন তারা প্রস্তুত তার সকালে হাটার সঙ্গী হতে।

পরে তার বাবার রেগে যাওয়ার ব্যপারে ডারউইনের শঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয়েছিল; যখন ডারউইন প্রবাসে, তার ভাই ইরাসমাসও চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে একজন স্বাধীন গবেষক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, বড়ভাই তার ছোট ভাই এর জন্য পথটা সুগম করে দিয়েছিলেন, ডারউইনের পরিকল্পনায় তারা বাবা কোন বাধা দিলেন না; যখন রবার্ট চার্লস এর প্যাম্ফলেটটি পড়েছিলেন, তিনি বেশ গর্বিত হয়েছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে শুধু খরগোস শিকার করে ডারউই্ন তার সময় নষ্ট করবেন না; তিনি তার ছেলের জন্য স্টক এবং বছরে ৪০০ পাউন্ড এর ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা ছিল যথেষ্ট।


(ছবি: ২০০৯ সালে জন্ম দ্বিশত বার্ষিকীতে ডারউইন স্মারক ডাকটিকিট)

এরপর চার্লস ডারউইন তার বাবাকে আর কোনদিনও ভয় পাননি, কিন্তু তার বাবার নিজের সন্মান রক্ষা করার ব্যাপারে বিশেষ নজর দেবার রুচিটি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, এবং যখনই সম্ভব হয়েছে তিনি যে কোন ধরণের সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছেন; কোনোদিনই তিনি বিদ্রোহী ছিলেন না, এবং কখনো তা হতে চাননি; কিন্ত তাসত্ত্বে বাড়ী ফেরার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নিজেকেই শঙ্কিত করেছিলেন একটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সুচনা করে।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =