রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তির অসঙ্গতিঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ক্ষতি

বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে স্বীকৃত ধারা আছে তার বাইরে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বলা হয় “উন্নয়নের গোলক ধাঁধা!” উন্নয়নের জন্য প্রধানত যে উপাদান গুলো দরকার তা হচ্ছে সম্পদ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, উপযুক্ত নীতি, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু বাংলাদেশে এসবের ধারাবাহিক অনুপস্থিতিতেও আর্থ-সামাজিক অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে, যাচ্ছে। উন্নয়ন অর্থনীতির যে স্বীকৃত ও পঠিত তত্ত্ব ও শিক্ষা আছে- তার যথার্থ ব্যতিরেকে এই অভাবনীয় সাফল্যের কারনেই আমাদের গলায় এই মর্যাদার মেডেল জুটেছে! উন্নয়নের এই গতির ধারাবাহিকতায় রক্ষা, ভোক্তা ও লিল্পের চাহিদা পুরনে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়োজন। আর সেই প্রশ্ন ও চাহিদাই আরেকটি বিস্তৃত গণবিতর্কের সূত্রপাত করেছে।

ভূমিকা

বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে স্বীকৃত ধারা আছে তার বাইরে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বলা হয় “উন্নয়নের গোলক ধাঁধা!” উন্নয়নের জন্য প্রধানত যে উপাদান গুলো দরকার তা হচ্ছে সম্পদ, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, উপযুক্ত নীতি, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ। কিন্তু বাংলাদেশে এসবের ধারাবাহিক অনুপস্থিতিতেও আর্থ-সামাজিক অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে, যাচ্ছে। উন্নয়ন অর্থনীতির যে স্বীকৃত ও পঠিত তত্ত্ব ও শিক্ষা আছে- তার যথার্থ ব্যতিরেকে এই অভাবনীয় সাফল্যের কারনেই আমাদের গলায় এই মর্যাদার মেডেল জুটেছে! উন্নয়নের এই গতির ধারাবাহিকতায় রক্ষা, ভোক্তা ও লিল্পের চাহিদা পুরনে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রয়োজন। আর সেই প্রশ্ন ও চাহিদাই আরেকটি বিস্তৃত গণবিতর্কের সূত্রপাত করেছে।

আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সাথে নানামাত্রিক অস্থিরতাও আমাদের দেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ! ধর্মীয় জঙ্গীবাদ, হত্যা, ধর্ষণ, দূর্যোগ, দূর্ঘটনা, বিশৃংখলা, ঘুষ-দুর্ণীতি, লুটপাট, অরাজকতা অব্যাহত। বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনি একটি পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের কাছে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরকারী সিন্ধান্ত চুড়ান্ত হয়। ভারতের সাথে যে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল অনেক আগে। বর্তমানে তা প্রায় চুড়ান্ত পর্যায়ে, সরকার প্রধানও সাংবাদিক সম্মেলন করে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন এখান পিছিয়ে আসার কোন সুযোগ নেই! প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুনে অনেকে হতাশ বোধ করছেন, এবং মনে করছেন যেহেতু এই প্রকল্প ঠেকানো যাচ্ছে না, তাহলে এই অর্থহীন সংগ্রামে লাভ কি?

পৃথিবীতে অনেক সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম জয়যুক্ত হতে না পারার অর্থ এই নয় যে সত্য-ন্যায় পরাজিত হয়েছে। আবার সত্য ও ন্যায় সবসময় গণতান্ত্রিক নয়। ক্ষমতা মানেই ন্যায় ও সঠিকতার পরাকাষ্ঠা নয়। আমাদের জ্ঞান, বিবেক, ন্যায় ও যুক্তিরোধ সর্বদা দায়বদ্ধ সত্য ও নীতিবোধের কাছে। তার জয়-পরাজয় চুড়ান্ত নির্ধারন করবে সময় ও ইতিহাস। পলাশির যুদ্ধে বাংলার ও সিরাজদৌলার পরাজয়ের অর্থ এই নয় সেই পরাজয়ই শেষ কথা ছিল। ইতিহাসে তা আজ প্রমানিত। পশ্চিমবঙ্গে টাটার বিরুদ্ধে সিঙ্গুরের জনতার আন্দোলন পরাজিত হয়নি- ৩০ বছর টিকে থাকা বাম সরকার পরাজিত হয়েছে এবং সরকার পরিবর্তন হয়েছে। এমন অনেক উদাহরন পাওয়া যাবে।

ইতিহাসের এই পাঠে আমরা আমাদের উত্তারাধিকারের কাছে যেন আরও একটি ন্যায় সংগ্রামের বীরত্বগাঁথা রেখে যেতে পারি। চে’র ভাষায়, আমার পরাজয়ের অর্থ এই নয় যে, আমরা বিজয় অর্জন করতে পারব না। ইতিহাস লেখা হয় সত্য-ন্যায়ের কর্মে ও সংগ্রামে, জয়-পরাজয়ের শর্তে নয়। সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র রক্ষায় অবিচল- মুক্তিসংগ্রামের যোদ্ধাদের তাই দ্বিধান্বিত হবার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি
বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে অল্প কয়েকটি দেশ দ্রুত উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। উন্নয়নের এই ধারার কারনে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর প্রায় ১০ ভাগ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১০০টি বিদ্যুকেন্দ্র আছে এবং এর উৎপাদন ক্ষমতা ১৪ হাজার ৭৭ মেগাওয়াট। নয় হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৮ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১০’ অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩০ সালে তা দাঁড়াবে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা ৩২০ থেকে ৩৩০ কোটি ঘনফুট। পেট্রোবাংলা সরবরাহ করে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি থাকে ৫০ থেকে ৬০ কোটি ঘনফুট। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ খাত ৪০ শতাংশ। শিল্প খাতে ১৭ শতাংশের মতো গ্যাস ব্যবহৃত হয়। গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় নি। নতুন গ্যাসফিল্ড আবিষ্কার হয় নি। গ্যাস সংকটের কারনে বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

বিদ্যুৎ সংকট ও বিপর্যয় সামাল দিতে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিসহ বিদুৎ আমদানীর আরো নানা ব্যবস্থা নেয়া হয়। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের দাম বৃদ্ধি পায়। আর এগুলো সামলাতে গিয়ে সরকার বাধ্য হয় বিরাট অংকের জ্বালানি ভূর্তকি দিতে। তাৎক্ষনিক বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে সরকারের অপরিকল্পিত পদক্ষেপগুলো হয় প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত।

সরকারের বিদ্যুৎ উন্নয়ন নীতি
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের জন্য ২০০৮ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উপর নিবেদিত নীতি গ্রহন করা হয়েছে। এই নীতি বিবেচনা করছে যে, ২০১৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে মোট উৎপাদনের ৫% এবং ২০২০ সালে তা হবে ১০% অর্থাৎ ২০১৫ সালে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদিত হবে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এবং ২০২০ সালে তা হবে ২০০০ মেগাওয়াট।

বাস্তবে সরকারের নীতির সাথে কাজের কোন মিল নেই! তাই বিনিয়োগের প্রশ্নে অগ্রাধিকার পায় কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্র! তাও যার অবস্থান সুন্দরবনের সন্নিকটে! বিভিন্ন সময় সরকার পরিবেশবান্ধব জ্বালানীর কথা বললেও বাস্তবে তার সামান্যই প্রতিফলিত হয়।

রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তি
২০১০’র জানুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় এক সফরে ভারতে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেখানে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালনের একটি প্রস্তাবনা ছিল। ওই প্রস্তাবনার ভিত্তিতেই ২০১২ সালে বাংলাদেশের অধীন সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপালের দুটি ৬৬০ ইউনিট মিলে মোট ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি)-এর সঙ্গে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি)-র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০ এপ্রিল ২০১৩ ঢাকায় ভারতের সঙ্গে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।

রামপাল চুক্তির অসঙ্গতি ও লাভ-ক্ষতি
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) বা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (এক্সিম) ব্যাংক থেকে ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নিতে হচ্ছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫০ শতাংশ করে মালিকানা দুই দেশের হলেও ঋণের পুরোটা দায়ভার থাকবে বাংলাদেশের ওপর। বাংলাদেশ সরকার হবে এ ঋণের গ্যারান্টি হবে। কোন কারণে প্রকল্প বন্ধ/লোকসান, কিংবা কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে ঋণ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। যৌথ মালিকানার কোম্পানি হলেও এক্সিম ব্যাংক ঋণের দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়েছে। এ প্রকল্প থেকে শুধু মুনাফার অর্ধেকই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পাবে না, ঠিকাদারি কাজ, কয়লা সরবরাহের কাজ সবই পাবে। সেখানেও ভারত লাভবান হবে।

শর্তে যা আছে:
– এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, ১৬০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরে। সাত বছর পর থেকে ঋণের নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।
– ২৭টি অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে এক্সিম ব্যাংককে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণের সুদের হার হবে লন্ডন আন্তব্যাংক হারের (লাইবর) সঙ্গে ১ শতাংশ সুদ যোগ করে। গত জুন মাসের হিসাবে লাইবর দশমিক ৯৩ শতাংশ।
– এ ছাড়া ঋণের অব্যবহৃত বা ছাড় না করা অর্থের ওপর বার্ষিক দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
– ঋণ প্রক্রিয়াকরণের জন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক মাশুল ২ লাখ ডলারও দিতে হবে বিআইএফপিসিএলকে।
– প্রকল্পটি বাংলাদেশের স্বার্থে তৈরী হয়েছে প্রকল্পটি এর উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশই কিনবে বাজার মূল্যের সাথে মুনাফা যোগ করে।
– এক্ষেত্রে কোন ভূর্তকি দেয়া হবে না।
– মূল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি তৈরি করতে খরচ হবে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। কেবল- টাউনশিপ (ছোট শহর) নির্মাণে খরচ হবে ১০ কোটি ডলার।

২০১৯ সালের মধ্যে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। গত ১২ জুলাই ঢাকায় মূল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যাল লিমিটেডের (ভেল) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বিআইএফপিসিএল।

চুক্তির অসঙ্গতি-
১. ৫০ শতাংশ করে মালিকানা হলে এই ঋণের গ্যারান্টিও দুই দেশের সমান আনুপাতিক হওয়া উচিত ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যেরই এটাই স্বীকৃত ধারা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর পুরো ঋণের দায়ভার দেয়ায় চুক্তিটি ভারসাম্যহীন হয়েছে!

২. মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় ৫২২ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, খুলনার লবণচরা ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ২৮৩ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। ২০১১’র ডিসেম্বরে দেশীয় কোম্পানি ওরিয়ন গ্রুপের সাথে পিডিবির ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী মাওয়া’র প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৪ টাকা, লবনচরা ও আনোয়ারার কেন্দ্র থেকে কিনবে ৩ টাকা ৮০ পয়সা করে। কিন্তু রামপাল থেকে কিনতে হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দরে! এনটিপিসি ও পিডিবি’র চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে কয়লার বাজার দরের ওপর! প্রতি টন কয়লার মূল্য যদি ১৪৫ ডলার হয় তাহলে বিদ্যুতের দাম হবে দ্বিগুন।

৩. প্রকল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির যন্ত্রপাতি আনতে পশুর নদী ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

৪. ভারতে কয়লা উৎপাদনকারী সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড (সিআইএল) কয়লা রপ্তানি করতে বাংলাদেশের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতে কয়লার চাহিদা কমে যাওয়ায় খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮ কোটি টনেরও বেশি কয়লা মজুত রয়েছে। ভারত সরকার চলতি অর্থবছরে ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টন কয়লা এবং ২০২০ সাল নাগাদ ১০০ কোটি টন কয়লা উৎপাদন করতে চায় ভারত। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে ভারতের বাণিজ্য ও মুনাফার প্রকল্প।
এই প্রকল্পের লাভ
১. সরকার যদি ক্ষমতার জোড়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে তাহলে ২০১৯ সাল থেকে দেশের মানুষ ১৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে। যা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২ শতাংশ মেটাবে।
২. মূল প্রকল্পে ৬ শত এবং একে ঘিরে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে সেখানে আরও কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে।
৩. কিছু অবকাঠামেগত উন্নয়ন হবে।

আমাদের কি ক্ষতি
১. প্রতিদিন বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যদি ২০ ঘন্টা করে ৩০ বছর চালু থাকে এবং ইউনিট প্রতি ৪.৮৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি ধরা হয় কেবল তাহলেই অঙ্কটা দাড়াবে এক লাখ চল্লিশ হাজার কোটি টাকা!
২. ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ বাবদ সরকার বঞ্চিত হবে ৯৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার থেকে। পাশাপাশি নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বার্ষিক ব্যয় হবে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার!
৩. পরিবেশগত ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি অর্থের চেয়েও অনেক বেশী ভয়াবহ!!

জমি অধিগ্রহনের নিয়ম-নীতি ও অসঙ্গতি
নিয়মানুযায়ী ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ), রিপোর্ট পাওয়ার পরেই কোনো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা যায়। কিন্তু পিডিবি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ইআইএ রিপোর্ট পাওয়ার আগেই রামপালে প্রায় ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে (এর বেশির ভাগই কৃষি জমি)।

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের জন্য জমি প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৭০০ একর। রামপালে প্রতিদিন কয়লা পুড়বে ১৩ হাজার টনেরও বেশি। গবেষণার তথ্যানুসারে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক মেগাওয়াটের জন্য প্রয়োজন দশমিক ৪২ একর জমি। এ হিসাবে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের জন্য প্রয়োজন ৫৫৫ একর জমি। এর সঙ্গে এমজিআর ও কুলিং টাওয়ারের জায়গা হিসাব করলে জমি প্রয়োজন সর্বোচ্চ ৭০০ একর। অথচ প্রয়োজনের দ্বিগুণেরও বেশি ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে!

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পরিবেশগত সমীক্ষা বা ইআইএ রিপোর্ট পিডিবির ওয়েবসাইটে ঝুলানো হয় জনগনের মতামতের জন্য! অথচ নিয়মানুযায়ী,কোনো প্রকল্প শুরুর আগেই ইআইএ রিপোর্ট তৈরি করে মতামতের ভিত্তিতে হয় প্রকল্প এগুবে, না হয় বাতিল হবে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের ক্ষেত্রে দেখা গেল, সম্পুর্ন উল্টো! ২০১৩ সালের ১২ এপ্রিল পিডিবির বিদ্যুৎ ভবনে কথিত গনশুনানিতে উপস্থিত প্রত্যেকে বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই সমীক্ষার অসঙ্গতি, ভ্রান্তি, জালিয়তি তুলে ধরে তা প্রত্যাখ্যান করে। একই সাথে পুনরায় ইআইএ করার দাবি জানায় এবং সকল কাজ বন্ধ রাখার দাবি জানায়। উল্লেখ্য, বন অধিদপ্তর ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি দেন সেই চিঠিতে তারা এই প্রকল্পতে আপত্তি জানান। তাছাড়া এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের একাধিক রুল আছে। কোন কিছুকে তোয়াক্কা না করে সরকার তার নীতিতে অটল আছে।

শিল্প প্রকল্প, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ
সরকার বলছে যে এই প্রকল্পের ফলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অথচ এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়েছে ৮ হাজার মানুষকে, যারা এখন ভূমি ও কর্মহীন। এই জনপদের মানুষের প্রধান জীবিকা মাছ আহরণ, সুন্দরবন থেকে গাছগাছালি মধু ইত্যাদি আহরণ ও কৃষিকাজ; বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট দূষণে দীর্ঘমেয়াদে যখন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে সুন্দরবন বিনষ্ট হবে তখন আরও অধিক মানুষ ভূমি ও জীবিকাহীন হয়ে যাবে। ৬ শত মানুষের কর্মসংস্থানের বিনিময়ে নষ্ট হচ্ছে ৭ হাজার ৪ শত মানুষের জীবন- জীবিকা।
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে ঝুঁকিতে ফেলে এর চারপাশ ঘিরে ভারী শিল্প স্থাপনের জন্য জমি কেনার হিড়িক পড়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৩০০ শিল্পগোষ্ঠী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি আশপাশের গ্রামগুলোতে প্রায় ১০ হাজার একর জমি কিনেছেন। জমি কেনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের মধ্যে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন।

সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তর এই এলাকাতেই ১৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পকে অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে। ইসিএ ঘোষণার পর ছাড়পত্র বাতিল করার বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত তা করা হয়নি।

ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২১টি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে উল্লেখ্যযোগ্য প্রতিষ্ঠান গুলো হচ্ছে ইনডেক্স পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি লি., ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোডেক এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স, বসুন্ধরা এলপিজি গ্যাস লি., এসকেএস এলপিজি লি., রূপসা ট্যাংক টার্মিনাল অ্যান্ড রিফাইনারি।
আরও ৫০টি চালকল, ১৯টি করাতকল, সিমেন্ট কারখানা ৯টি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন প্রতিষ্ঠান ১৩টি, ৬টি অটো মিল, ৪টি লবণ-পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প, দুইটি জাহাজ নির্মান প্রকল্প ও অন্যান্য ৩৮ টি প্রকল্প রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ছাড়াও ইটভাটা আইন এবং করাতকল বিধিমালা অনুযায়ী বনভূমির পাশে করালতল ও ইটভাটা স্থাপন নিষেধ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের অবশ্যই ক্ষতি হবে। তবে তার চেয়েও বড় ক্ষতি হবে যদি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেনা জমিগুলোতে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে। সরকার যেভাবে সুন্দরবন-সংলগ্ন ওই এলাকায় রেললাইন সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর নির্মাণ ও সড়ক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে তাতে জমি কেনা ও দখলপ্রক্রিয়া সুন্দরবনের ভেতর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে। যা হবে আরও ভয়ংকর।

বাংলাদেশে একেকটি প্রকল্প মানে দুর্নীতির উৎসব
খটকা লাগে সরকার-পিডিবি বিভিন্ন জনমত, গবেষণা, সমীক্ষা ইত্যাদি উপেক্ষা করে কার স্বার্থে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে এতো মরিয়া? কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নীতিতে যদি সরকার অটলই থাকে তাহলে এই প্রকল্প হতে পারতো অন্য কোন অঞ্চল ও নদীসংলগ্ন অববাহিকায়। কিন্তু কেন সুন্দরবন?

কয়েকটি প্রকল্পের লুটপাট ও দূর্নীতির নমুনা-
১. দোহাজারি-কক্সবাজার-গুনধুম রেলপথ নির্মাণের এক কিলোমিটার রেলপথ ব্যয় ধরা হয়েছে ১০১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আর ভারতে এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় হয় মাত্র ১২ থেকে ১৭ কোটি টাকা। চীনে ২০০ কিলোমিটার গতিতে চলা হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয় ৭৩ থেকে ৭৫ কোটি টাকা। ভারতে যেখানে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি টাকা আর বাংলাদেশে সেখানে ব্যয় প্রায় ১০২ কোটি টাকা!!

২. ঢাকা- মাওয়া-যশোর রেলপথ নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০৫ কোটি টাকা। অবাক হচ্ছেন, ভুল লিখছি কিনা..? মোটেই না!

৩. ইউরোপে এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ২৮ কোটি, ভারতে ১০ কোটি, চীনে ১৩ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয়! ঢাকা-মাওয়া-ভাঙা সড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা!

৪. ৩৫০ কোটি টাকার ফ্লাইওভার নির্মান ব্যয় হয়ে যায় ১২৫০ কোটি টাকা! ২০ হাজার কোটি টাকার সেতু হয়ে যায় ২৮ হাজার কোটি টাকা?

৫. দেশীয় কম্পানীর প্রকল্প মাওয়া, লবনচরা, আনোয়ার’র প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে দাম পরবে প্রায় ৪ টাকা, সেখানে ভারতীয় কম্পানী থেকে কিনতে হবে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা করে দ্বিগুনের বেশী দাম দিয়ে!

৬. একই ভাবে রামপাল প্রকল্পে জমি অধিগ্রহনে এই তুঘলকি করা হয়েছে। যে প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন ৭০০ একর জমির সেখানে নেয়া হয়েছে দ্বিগুনেরও বেশী ১৮৩৪ একর জমি! এভাবেই বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে লুটপাট-দূর্ণীতির ব্যবস্থা করা হয়!

বিদ্যুৎ উন্নয়নে প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা
নদীর গতিপথ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তন ভারতের বাঁধ নদীগুলোর পানি প্রবাহের অস্বাভাবিকতা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও যথেষ্ট না। বিদ্যুৎ ক্রয় না করলে অথবা নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করলে দেশ জ্বালানি-বিপর্যয়ে পড়বে। বিদ্যুৎ ক্রয় দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়, সঙ্গতই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনই দেশের জন্য লাভজনক ও নিরাপদ।

১. সে ক্ষেত্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করে সরকারকে নজর দিতে হবে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ সৌরশক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উত্তম জায়গা। এখানে বছরের পাঁচ থেকে সাত মাস মাঝারি থেকে প্রখর রোদ থাকে, ফলে বছর দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাঁধা নেই। সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য অন্যান্য শক্তি (যেমন, বায়ু, জল ইত্যাদি) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি বড় অসুবিধা হচ্ছে এর সঞ্চয় ও পরিবহনে। কিন্তু আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তিতে যে অগ্রগতি হচ্ছে (যেমন, টেসলার পাওয়ারওয়াল ব্যাটারির প্রযুক্তি) তাতে এটি এখন বড় সমস্যা নয় এবং আগামী পাঁচ বছর নাগাদ প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য ও সস্তা হয়ে ঊঠবে।

২. নেদারল্যান্ডস অনেকদিন ধরে সমুদ্রে টার্বাইন স্থাপন করে সমুদ্রের ঢেউ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ স্থাপন করছে অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি, পারমাণবিক-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র বিপর্যয়ের পরে জাপানও মনোযোগ দিচ্ছে এই প্রযুক্তিতে এবং তারা তাদের সমুদ্রপৃষ্ঠ কয়েক কিলোমিটার জায়গা জুড়ে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ সামুদ্রিক সীমানা। এখানে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মতো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, যা হবে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী।

৩. পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কথাও কেউ কেউ বলছেন। যদিও ভূমিকম্প ও দূর্ঘটনা প্রবল অঞ্চল হিসেবে তা ঝুঁকিপূর্ন মনে করি। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কাঠামোগত স্থাপনার জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও চিন্তাধারা।

৪. বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এগুলো চালু থাকলে যত লোকসান হয়, বন্ধ থাকলে তার চেয়ে কম লোকসান হয়। এ অবস্থায় গ্যাসে পরিচালিত বড় বড় তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্রের বদলে অনেক ছোট ছোট গ্যাস জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস দিয়েই দেশের চাহিদা মেটানোর মতো বিদ্যুৎ আরো কম খরচে ও বিনা লোকসানে দেয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া এই ছোট ছোট (মাত্র ৪ মেগাওয়াট) জেনারেটরগুলোর একটি ইউনিট নষ্ট হলেও তার রক্ষণাবেক্ষণ যেমন সহজ, তেমনি এর ফলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রভাব হয় খুবই নগণ্য।

৫. বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরেকটি সহজ পথ হতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলে জোয়ার-ভাটা স্রোত ব্যবহার করে টাইডাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। মাত্র ২ নটিক্যাল মাইল বেগের জোয়ার-ভাটা স্রোত থেকে অস্ট্রেলিয়ায় টাইডাল বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। সেই তুলনায় আমাদের বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের সব স্থানেই জোয়ার-ভাটা সমুদ্র স্রোতের বেগ ২ নটিক্যাল মাইলের চেয়ে বেশি। এমনকি আন্তর্জাতিক সমুদ্র চার্ট অনুযায়ী সন্দ্বীপ চ্যানেলে জোয়ার-ভাটার বেগ ৫ দশমিক ৫ নটিক্যাল মাইল। শুধু এই চ্যানেলে ধারাবাহিক ভাসমান বা সাবমার্জিবল টারবাইন বসিয়ে ২০০-৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

৬. এছাড়াও চট্টগ্রাম উপকূলের অন্যান্য স্থান, মেঘনা নদীর মোহনা ও সমগ্র দক্ষিণ উপকূলজুড়ে আরো প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, যা দিয়ে পুরো উপকূলীয় উপজেলাগুলোর বিদ্যুৎ চাহিদা মিটিয়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব। এছাড়া উপকুলীয় অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পও হাতে নেয়া যায়।

বিদ্যুতের বিকল্প আছে সুন্দরবনের বিকল্প নেই
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে গ্রিনল্যান্ডের বরফ অস্বাভাবিক হারে গলছে। বরফ গলা পানি সমুদ্রে যোগ হয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ‘ন্যাচার ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিনল্যান্ডের পানি বরফের স্তর উপচে সমুদ্রের দিকে গড়াচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্রিনল্যান্ডের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, ওপরের বরফের স্তরের নিচে এর আগে পানি জমা থাকতে দেখা গেলেও এখন আর সেটা নেই। এসব পানি সমুদ্রে মিশে গেছে।

নাসার এক রিপোর্টে বলছে একই কথা! ১৯৯২ সাল থেকে এ পর্যন্ত সমুদ্রের উচ্চতা তিন ইঞ্চি বেড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমুদ্র উপকূলের ৬০ মাইলের মধ্যে বসবাস করে। বাংলাদেশ সেই ঝুকির তালিকার শীর্ষ একটি দেশ।

সেই আমরাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর একটি আত্মঘ্যতি সিন্ধান্ত কার্যকরে অগ্রসর হচ্ছি। বিদ্যুৎ আমাদের দরকার একই সাথে পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল পানির নীচে তলিয়ে যাবার আশংকা আছে। বিশ্ব উন্নয়ন ক্ষতির স্বীকার হবে। আমাদের সরকার প্রধান বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে এ জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপুরন দাবী করেছে। আর সেই আমরাই যদি সামান্য বিদ্যুতের জন্য নিজেদের জীববৈচিত্র ও পরিবেশ ক্ষতি করি’ সেটা কি কোনভাবে সমর্থন যোগ্য? যদি আমাদের শক্তির কোন বিকল্প না থাকতো তাহলে হয়তো অন্য কথা ছিল। কেবল কপোরেট ও সিন্ডিকেটের স্বার্থের কারনে এই কাজ করা কোন ভাবেই সমর্থিত হতে পারে না। বিদ্যুতের বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। তাই সুন্দরবনকে রক্ষা করে উন্নয়নের কথা ভাবতে হবে।

গণদাবী মেনে নিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করুন
সরকার কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে উন্নত দেশেগুলোর উদাহরন দেয়। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর সরকার, পরিবেশবাদী ও স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্বেগ ও সিন্ধান্ত গুলো সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয় না। কানাডা ২০২৬ সালের মধ্যে তাদের সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেবে। ইউরোপের প্রায় সব দেশ এই পথে অগ্রসর হচ্ছে। ইংল্যান্ড ২০২৫ সালের মধ্যে, অস্ট্রিয়া ২০২০, চীনও পর্যায়ক্রমে এই সিন্ধান্ত কার্যকর করতে যাচ্ছে।

আন্দোলনে নয় কেবল পরিবেশবাদীদের উদ্বেগের কারণে গতমাসে শ্রীলংকার সুপ্রিম কোর্টকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, ত্রিনকোমালির শামপুরে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে না। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের কথা ভাবছে সরকার। ভারতের বাইরে এটিই ছিল এনটিপিসির প্রথম আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগ। ২০০৬ সালে এ বিষয়ে চুক্তি করে শ্রীলংকা সরকার, সিইবি ও এনটিপিসি। এর পর ২০১১ সালে গঠন করা হয় ত্রিনকোমালি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। এ কোম্পানির মাধ্যমে ৫০০ মেগাওয়াটের দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। যদিও ত্রিনকোমালিতে সুন্দরবনের মত প্রকৃতি ও পরিবেশের কোন বিষয় নেই।

দেশে-বিদেশে সুন্দরবন-জীববৈচিত্র ও পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামকে যারা উন্নয়ন ও সরকার বিরোধী আন্দোলন বলে যুক্তি দিচ্ছেন ও মন্তব্য করছেন তারা আসলে সত্য-বিজ্ঞানকে অস্বীকার ও আড়াল করছেন। সরকার প্রধানকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন।

ইউনস্কোর সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতিমধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প না করে নবায়নযোগ্য, সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প পথের সন্ধান করছে। এরমধ্যে দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা ও নৈতিকতার স্বীকৃতি মিল্‌লো। কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে কয়লাপ্রকল্প না করার শর্ত-বিবেচনার কথা বলে রামপাল প্রকল্প বৈধকরণের কোন সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন তার হাত দিয়ে দেশের কোন ক্ষতি হয় এমন সিন্ধান্ত তিনি নিতে পারেন না। সেটাই যদি হয় তাহলে অনুরোধ করছি এই বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও বিতর্কের। যাতে করে জাতি একটি সঠিক সিন্ধান্ত পায়। এই আলোচনায় প্রকল্পের আর্থিক লাভ-ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেটাও যে কোন ভাবে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব! কিন্তু পরিবেশের যে ক্ষতি হবে সেটা কোন ভাবেই প্রতিস্থাপন করা সম্ভব না। একারনে আমাদের প্রধান উদ্বেগ সুন্দরবন ও পরিবেশ। বিদ্যুতের বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প নেই। এই গনদাবী ও আকাঙ্খার প্রতি সম্মান রেখে এই প্রকল্প অন্যত্র করুন। শ্রীলংকার সরকার যদি পুরো প্রকল্প বাতিল করতে পারে আপনি কেবল স্থানান্তর করতে পারবেন না?

তথ্যসূত্রঃ
১. দৈনিক প্রথম আলো, ইত্তেফাক, সমকাল, আমাদের সময়, কালের কণ্ঠ, বণিকবার্তা, বিডি নিউজ২৪, বাংলানিউজ২৪সহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ-প্রতিবেদন
২. গোলাম মোর্তজা’র সুন্দরবন ও পবিবেশ এবং দূর্ণীতির উপর লেখা বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ
৩. কল্লোল মুস্তাফা’র সুন্দরবন ও পরিবেশের উপর বিভিন্ন প্রতিবেদনের অংশ বিশেষ
৪. অধ্যাপক আনু মোহাম্মাদ ও জাতীয় কমিটির বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রতিবেদন
৬. রামপাল চুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন দলিল
৭. সুন্দরবন রক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্লগ-ওয়েবসাইট-ফেসবুক থেকে নেয়া তথ্য-উপাত্ত
৮. ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত সরকারের বিদ্যুৎ সম্পর্কিত নীতি ৫. পিডিবি – বিভিন্ন প্রতিবেদন
৯. এই আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের কর্মীদের লেখার অংশ বিশেষ আলোচনায় আছে
১১. মালিকানা দুই দেশের রৃনের দায় বাংলাদেশের, জাহাঙ্গীর শাহ, ২৪ আগস্ট ২০১৬
১২. রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র লাভ-ক্ষতির হিসার, আশরাফ মাহমুদ, ১৫ জুলাই ২০১৬
১৩. কেন আমরা রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প বিরোধী? ইকবাল হাছান
১০. ড. মঞ্জুরে খোদা’র বিভিন্ন লেখা ও মন্তব্যের অংশ বিশেষ এখানে যুক্ত।
(প্রবন্ধটি’ বাংলাদেশ সেন্টার, টরেন্টো, কানাডায়, ‘বাঁচাও সুন্দরবন’ বিষয়ক সেমিনারে অল্প সময়ের প্রস্ততিতে লেখা ও পঠিত। রেফারেন্স তালিকাটি স্বীকৃত ধারায় সাজানো হয়নি, তবে পুর্নাঙ্গ প্রবন্ধ আকারে প্রকাশের সময় তা করা হবে।)

ড. মঞ্জুরে খোদা, প্রাবন্ধিক-গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চুক্তির অসঙ্গতিঃ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ক্ষতি

  1. এতো বড় বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা
    এতো বড় বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করেন কিন্তু তথ্য উপাত্য যা দিলেন তা বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত, কিন্তু সেসবের একটা তালিকা বা স্বীকৃতি দিলেন না।
    তবে বিদ্যুতের উৎপাদনের যে হিসেব দিলেন তা ভুল আছে, একটু চেক করেন। না পারলে পিডিবির ওয়েব সাইটে গিয়ে ডেইলি জেনারেশন শিট দেখেন।
    আপনি মনে হয় বেইজড পাওয়ার স্ট্রেশন কি এটা বোঝেন না? এটা দিনের মধ্যে ২০ ঘন্টা চালানোর সুযোগ নেই, চালালে পুরো দিনই চালাতে হয়। হিুট করে বন্বধ করা যায় না, বন্ধ হলে তা আবার সুইচ টিপে সেকেন্ডে অন করা যায় না। ফলে ২০ ঘন্টা চালানোর এই ধারণা ভ্রান্তই শুধু ভ্রান্তি বিলাস। কেন সেটা বলতে গেলে পাল্টা একটা ব্লগ লিখতে হবে। এ সাইটে আগে এনার্জি নিয়ে দেশে যারা কাজ করেন তাদের কিছু বিহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা দেখেছে, তাদের লেখা দেখি না।

    ২. পৃথিবীর কোন বেইজড লোড পাওয়ার স্ট্রেশন সৌর বিদ্যুতের হবার সুযোগ নেই। কারণ এটি সর্বোচ্চ ৫ ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন গড়ে (গড়ে)। ফলে বাকিটা সময় নিশ্চয় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে উপদেশ দিবেন না।
    এ ছাড়া এক মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুতের জন্য ৩ একর জায়গা দরকার হবে। ১ হাজার মেগাওয়াটের জন্য ৩ হাজার একর জায়গা দরকার পড়বে। তাও আবার মাত্র ৫ ঘন্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
    এ ছাড়া প্যানেলের যে মাত্রার এফিসিয়েন্সি, এটা বর্তমানে গড়ে ২৫ আছে। সো, সৌর বিদ্যুতের কথা ভূলে যান। এটি হলো অফ গ্রিডে যারা আছে, পাহাড়, দ্বিপে তাদেরকে সরকার সাবসিডি রেটে দিতে পারে।
    বাংলাদে বায়ু বিদ্যুতের উপর গবেষণা করে দেখা হয়েছে ছোট টারবাইন ঘোরানোর মতও বায়ুও নেই এখানে। একটা করা হয়েছে কুতুবদিয়া তা চলে না।

    সাগরের পানি নিয়েও গবেষণা হয়েছে, তার ফলাফলও আশাবাদি নয়।

    তবে আপনার একটা পয়েন্টের সাথে একমত, তা হলো সুন্দরবনের পাশে কোন শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনভাবেই এলাউ করা যাবে না।
    কারণ সুন্দরবন দ্বিতীয়টা নেই। কিন্তু কয়লা বিদ্যুতের বিরোধীতা করা বাংলাদেশের জন্য আহম্মকিই মনে করি। কারণ এ দেশের স্ট্রেন্থ নেই এলএনজি বেশি করার, তেলে পুরো টা চালানো আর গ্যাসতো নেই। ফলে কমদামের কয়লা হওয়া দরকার। তবে সেটি কোথায়?
    অবশ্যই সুন্দরবনর ও লোকালয় বাদ দিয়ে।

    আর ওরিয়নের যে কেন্দ্রের কথা আপনি কইলেন কমদামে বিদ্যুৎ বানাবে-ওটার কথা চোখ বন্ধ করে ভুলে যান। বাংলাদেশে কোন বেসরকারি কয়লাবিদ্যুৎ হবে না। আর ওরিয়নতো একটা বাটপার, তারাতো করবেই না।
    যে দামে ওরিয়ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নিছে ও দামে বিদ্যুৎ দিতে হলে ওরিয়ন দুেই চার হাজার বাজার বেচলেও হবে না ব্রাদার।

    এখন ওরিয়ন কেন কমদামে নিছে? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আপনাকে েএসআলমের টাও বুঝতে হবে। কিভাবে এস আল ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গাপুরে মার্কেটে করেছে। দেশের টাকা সেখানে কিভাবে নিলো?
    ওরিয়ন কিভাবে ব্রিটেনে শত কোটি টাকার ফার্মেসি কিনেছে?েএসবের সাথে কথিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তাদের বিদেশী পার্টনার যুক্ত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

88 + = 90