অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০১

৩০১৬ সনের এক চমকপ্রদ বিস্ময়কর পৃথিবীতে ক্লোনে পুনর্জম্ম লাভের তৃতীয় দিনে নেয়া হলো আমায় ‘হিউমান প্রডাকশন ল্যাবে’। ঐ ল্যাবের দুজন পরিচালক আমায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, কিভাবে এখানে নতুন মানুষ উৎপাদন করা হয় কিংবা পুরণো কোন ‘অকেজো’ বা ‘অনাগ্রহি’ মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে ‘ফ্রিজ’ করে রেখে দেয়া যায় সাময়িক সময়ের জন্যে। ২০১৬-পূর্ববর্তী বিশ্বকে আরো নিবিড়তায় জানার জন্যে ৪-সদস্যের এক ‘বিশেষজ্ঞ টিম’ আমার কাছে জানতে চাইলো, ঐ সময়ের আরো কজন মানুষের ‘ক্লোন’ করার ব্যাপারে, যাদের মাধ্যমে তারা ২০১৬ পূর্ববর্তী পৃথিবীর সমাজ সংস্কৃতি সাহিত্য ইত্যাদি সম্পর্কে সুন্দর একটা ধারণা লাভ করতে পারে।

আমার জানা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্গবন্ধু, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখের নাম ছাড়িয়ে কেন যেন তাদের আগেই আমার মনে নাড়া দিলো ১৯৩৩-সনে রুমানিয়ান, ১৯৫০-এ ফ্রেঞ্চ ও শেষে ১৯৮৮ সনে বাংলাতে ‘লা নুই বেঙ্গলী’ এবং তার প্রতি জবাবে ১৯৭৪- সনে প্রকাশিত মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র কথা। দুটো আত্মজৈবনিক উপন্যাসই পড়া ছিল আমার ছাত্রাবস্থায়। এমনই পড়া ছিলো যে, আজ এক হাজার বছর পরও এই ৩০১৬-সনে হুবহু ঐ ঘটনার অনুপুঙ্খ মনে আছে এক অমীয় প্রেমের গল্পকথনের মত। ‘অমৃতা’ আর ‘মির্চা’র ক্লোন করার পুস্তাবনা শুনে ও ‘লা নুই বেঙ্গলী’ ও ‘ন হন্যতে’ নামক ‘আন-কমন’ এমন নামে ‘বিশেষজ্ঞ টিম’ জানতে চাইলো, “কি এমন চমৎকারিত্ব ছিল ঐ কাহিনির, যাতে অন্য অনেক ঘটনার আগেও আপনার মনে পড়লো মির্চা আর অমৃতার এ গল্প”? বিশেষজ্ঞ টিম প্রস্তাব দিলো, তারা কি তাদের সাহিত্য আর্কাইভে রক্ষিত ‘মাইক্রো-ফ্লিম’ ঘেটে ঐ বই দুটো বের করবে? ঘটনাটা আমার কাছে তখনো জলের মতই উজ্জ্বলতর ছিলো বলে আমি তাৎক্ষণিক বললাম –
“দরকার হবেনা খোঁজার। আশা করি আমি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবো আমার পুরোণ স্মৃতি থেকেই। ‘হিউমান প্রডাকশন ল্যাবে’র নিয়মানুসারে বিশেষজ্ঞ টিমের কাছে বর্ণনা দিতে শুরু করলাম আমি উনিশ শতকের কোলকাতার মেয়ে ‘অমৃতা’ আর ‘রুমানিয়ার’ ছেলে মির্চার ভালবাসার ঘটনা এক নিটোল প্রেমের সপ্তপদি দুখদের বহ্নিমান মৃত্যুর মত।

প্রাক্তন ভারতের কলকাতা শহরের ভবানিপুরে মৈত্রেয়ী দেবী নামে ১৬-বছরের এ তরুণি বাস করতো তার মা, বাবা, বোনের সাথে। যদিও এ পরিবারটির বসবাস ছিল মূলত প্রাক্তন বাংলাদেশের বরিশাল জেলার মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের গ্রাম ফুল্লশ্রীতে। ষোড়শী এ মেয়েটিকে তার বিজ্ঞানী ও দার্শনিক বাবা ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন ও মা হিমানী মাধুরী রায় (ইন্দিরা) ‘রু’ নামেই ডাকতো। মির্চা এলিয়াদের জন্ম ১৯০৭-সনে প্রাক্তন রুমানিয়ার বুখারেস্টে। ১৯২৮-৩২ সালে ভারতে ‘নোয়েল এন্ড নোয়েল’ কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে ২৫০-টাকা বেতনে সে ভারতে আসে চাকুরি করতে। উদ্দেশ্য চাকুরির সাথে ভারতীয় সংস্কৃতি আর জ্ঞান সাধনা। এবং ঘটনাক্রমে ড. সেনের বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হয় তখনকার খৃস্টধর্মী ইউরোপিয়ান শেতাঙ্গ মির্চা। এ দার্শনিক বিজ্ঞানীর মেয়ে তৎকালীন ভারতীয় কফিরঙা অমৃতা কলেজছাত্রী, ভাবুক ও কবি। তার কথাবার্তায়, চালচলনে রয়েছে কিছুটা দার্শনিকতার ছাপ। অল্প বয়সী মেয়ের এমন আচরণ মির্চার মধ্যে যার পর নাই বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। একদিন সেই মেয়েটিকেই তখনকার ফ্রেন্স ভাষা শেখানোর দায়িত্ব পড়ল মির্চার ওপর। আর মেয়েটিকে দেয়া হলো মির্চাকে ঐ সময়ের কলকাতার বাংলা শেখানোর কাজ। অমৃতা প্রথম ভালোবেসেছিল একটি গাছকে, যে বৃক্ষ ছাড়া সে থাকতে পারতো না একটুও! অমৃতার দার্শনিকসুলভ ধীরস্থির আচরণ সহজেই মন কাড়ে মির্চার। অর্থাৎ নারী চরিত্র হিসেবে অমৃতা ঐ যুগে ছিল আধুনিক ও অনন্য।

১৯৩০-সালে কালচে বাদামি রঙের ভারতীয় এ বালিকার সাথে রোমানিয়ার এ তরুণের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনা। এ সম্পর্ক তারা গোপন রাখতেও পারেনি বেশিদিন। অল্পদিনেরই অভিভাবকেরা বিষয়টি জেনে যায়। কিন্তু বিস্ময়কর ছিল সেই ১৯৩০-এর পৃথিবীর ধর্মনির্ভর সমাজ। জাতপাত তথা ধর্মীয় কারণে তরুণটিকে শিক্ষকের বাড়ি থেকে চলে যেতে রূঢ়ভাবে এবং আর কখনোই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ না করতেও বলা হয় কঠোরতর নির্দেশে। সন্যাসজীবন শেষে পরবর্তীতে সেই তরুণ পরিচিতি পান বিশ্বখ্যাত দার্শনিক হিসেবে। লেখেন একটি আধা-আত্মজৈবনিক উপন্যাস, যা ১৯৩৩-সালে রোমানিয়ায় প্রথম প্রকাশিত হয়। বইটি লেখা হয়েছিল বিশেষ করে একটি সাহিত্য পুরস্কারের জন্যেই। পরে তা “হট সেলার বুক” হিসেবে দেদার বিক্রি হয় এবং লেখকের জন্য বিপুল অর্থ ও খ্যাতি বয়ে আনে। উপন্যাসটি তখন ইতালিয়ান, জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয় অল্পদিনেই। রোমানিয়ার সেই লেখকের নাম মির্চা এলিয়াদ, আর ভারতীয় মেয়েটির নাম মৈত্রেয়ী দেবী। রোমানিয়ার উপন্যাসটির ইংরেজি নাম ‘বেঙ্গল নাইটস’। মির্চা এলিয়াদও এরপর সংসারি হন। তার দু’স্ত্রীর নাম ছিল যথাক্রমে Christinel Cotescu ও Nina Mareş কিন্তু দুজনেই ঘটনাক্রমে জ্ঞানতাপস মির্চার আগেই মৃত্যুবরণ করে তাকে একাকি রেখে।

এর পরে বিশ বছর বয়সে অমৃতার বিয়ে হয়ে যায় কলকাতার ভারতীয় মনমোহন সেনের সাথে। তাদের সন্তানও হয় দুটো। এরপর সে লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন, প্রকাশ করতে থাকেন কবিতা ও গদ্যের বিবিধ বইপত্র। ১৯৩৯-সালে তার পিতা ড. সেনের ইউরোপ ভ্রমণের পরেই কেবল ‘রু’ রোমানিয়ায় প্রকাশিত মির্চার লেখা ‘লা নুই বেঙ্গলি’ উপন্যাসটি সম্পর্কে জানতে পারেন। এও জানতে পারেন, সেটি তাকেই উৎসর্গ করে লেখা হয়েছিল। ১৯৭২-সালের দিকে লেখকের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোলকাতায় এলে অমৃতা বুঝতে পারেন যে, বইটিতে তাদের দুজনের ‘যৌন’ সম্পর্কের বর্ণনা করা হয়েছে। ঐ বইতে মির্চা সহজাতভাবে লেখেন, তাদের প্রেমের এক পর্যায়ে প্রায়শ রাতে তার প্রেমিকা তার ঘরে চলে আসতো তথা তাদের মধ্যে স্থাপিত হতো শারীরিক সম্পর্ক। যদিও মির্চার বইর উৎসর্গপত্রে অমৃতাকে লেখা ছিল “….. Tomar Ki moné acché ? …. Yadi thaké, taholé Ki, Kshama Karté Paro ? ….” ‘মির্চার এ বর্ণনা পরিপূর্ণ মিথ্যে’ – এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতেই পাল্টা আরেকটি বই লেখেন ভারতীয় নারী মৈত্রেয়ী দেবী বা অমৃতা। সে বইটিই হলো ‘ন হন্যতে’। বাংলা করলে ‘ন হন্যতে’-এর অর্থ দাঁড়ায়, “হত্যা করা যায় না” বা “নিহত হয় না” এমন কিছু। মানবাত্মার আঁধার যে মানব-শরীর, তাকে হত্যা করা যায় কিন্তু আত্মাকে যায় না। উপন্যাসটিতে আসলে লেখিকা আত্মার অমরত্বের পাশাপাশি প্রেমের অমরত্বের কথা বলেছেন। এতোটুকু শোনার পর কিছুটা ‘অধৈর্য’ হন বিশেষজ্ঞ কমিটি। তারা জানতে চান – “যেহেতু প্রেমের পর দুজনেই আবার দুজনকে ভুলে যায় এবং আলাদা ‘স্পাউসে’র সাথে ঘর-সংসার করতে থাকে, তাহলে আর বিশেষত্ব কি রইলো এ কাহিনিতে”?

আমি আবার বলা শুরু করি। অমৃতা মির্চাকে নিয়ে এতোদিন কিছুই লেখেনি কিন্তু মির্চার উপন্যাসের “জৈবিকতার পাঠ” তার কাছে অতিকথন তথা ‘মিথ্যে বর্ণনা’ মনে হয় ও সে এর প্রতিবাদে প্রায় ষাট বছর বয়সে মূল সত্যটি সামনে আনতে এক নতুন উপন্যাস রচনা করেন, যার নামই মূলত ‘ন হন্যতে’। এ উপন্যাসে লেখিকার জীবনবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি, মির্চার তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক গভীর ও হৃদয়গ্রাহী, যেখানে দৈহিক চাওয়াকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, পারিবারিক-সামাজিক ধমীয় রীতিকে প্রাধান্য দিয়ে। দুজনের বর্ণনাতেই যদিও অনেক ঘটনার বেশ সাদৃশ্য বিদ্যমান কিন্তু ১৯৩০-সনে অমৃতার বাড়ি থেকে মির্চাকে তাড়িয়ে দেয়ার পরের বর্ণনায় অমৃতা নিটোল সত্যকে ধরে রেখেছিল অত্যন্ত নিপুণতার সাথে। বই এর শেষভাগে এসে দীর্ঘদিন পর মৈত্রেয়ী আর এলিয়াদের সাক্ষাতের বর্ণনা আছে; ঐ সময়ের জীবনের অপূর্ণতা আরেক জীবনে মিটিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি আছে, আর আছে পার্থিব ভালবাসার অব্যক্ত হাহাকারের দহন।

এবং পরিণতিতে ১৯৫২-সনে পিতা ড. নরেন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর, ১৯৫৭ শিকাগোতে যখন ইতিহাসের ধর্মীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন মির্চা এলিয়াদ, ক্রমে সেও স্ত্রী হারিয়ে নি:সঙ্গ একাকি জীবন কাটাতে থাকেন পুস্তক আর জ্ঞানের রাজ্যে। ১৯৮৬-সনে মির্চার মৃত্যুর আগে অমৃতা একাকী ভারতবর্ষ থেকে শিকাগোতে গমন করেন, কেবল তার ১৬-বছর বয়েসি প্রেমিক মির্চার সাথে দেখা করতে। কিন্তু শেষ জীবনে অমৃতা যখন পৌঁছলো তার বিশ্ববিদ্যালয়ে, মির্চা ততদিনে অন্ধ হয়ে গেছে চিরদিনের জন্যে। তাদের সেই সাক্ষাতের দৃশ্য আমাদের চিত্তকে এতো আলোড়িত করে যে, সারা জীবন তা ভোলার নয়। সাক্ষাতের প্রথমেই মির্চার টেবিলে অমৃতা তার নিজের লেখা ৪০-বছর আগের যে চিরকুটটি দেখতে পায়, তাতে লেখা ছিল – “অজস্র মণিমুক্তা সজ্জিত সুবর্ণ দেবতার মত, অপার অসীস সুষমায় আমি তোমার সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণতা হই, আর তুমি আমাকে বুকে তুলে নাও”। ঐ চিরকুটির কোনে মির্চারও শেষ কথাটি ছিল – “আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে করতে লাগলো, অমৃতাকে অন্তত একবার চোখের সামনে দেখি”।

এবং ৪২-বছর পর অশীতিপর বৃদ্ধা অমৃতা যখন পৌছলো বৃদ্ধ অধ্যাপকের কক্ষে মেঝেতে ছড়ানো হাজারো পুস্তকের পাহাড় ডিঙিয়ে, তখন তার কাঙ্খিত ২০-বছরের মির্চা চুলহীন টাক মাথায় থুড়থুড়ে বুড়ো তার দিকে না তাকিয়েই বললো – “তুমি অমৃতা”। এবং প্রলাপের মত যখন মির্চা স্বগতোক্তিতে বলতে লাগলো – “চল্লিশ বছর! হায়! চল্লিশ বছর”। তখন ঐ কথার রেশ টেনে অমৃতা বললো-
– “জান লোকে আমায় জিজ্ঞাসা করে, কতোদিন তুমি আমাদের বাড়িতে ছিলে, আমার মনে পড়ে না, কতো দিন ছিলে বল তো?’
‘হাজার বছর-‘ তবে?… আমি তো সেই তোমাকেই দেখতে এসেছি, যাকে Weapon cannot pierce, fire cannot burn… সংস্কৃতিতে বললে, ‘ন হন্যতে হন্য মানে শরীরে-‘ ।
ফিরে যাচ্ছিল অমৃতা -অবশেষে কথা কইতে কইতে মুখ তুললে অমৃতা দেখলো স্থির দৃষ্টির পাথুরে চোখ মির্চার। চোখের আলো নিভে গেছে তার। এবং অমৃতার কণ্ঠ রুদ্ধ অনুভব করে মির্চা বললো –
……’একটু দাঁড়াও অমৃতা-… এতো দিন এতো সাহস দেখিয়ে, এখন তুমি ভেঙে পড়লে কেন? আমি বলছি, আমি যাব তোমার কাছে, এখানে নয়, সেখানে গঙ্গার তীরে, আমার সত্যরূপ তোমাকে দেখাব I will show you my real self on the shores of the Ganges..।’
এবং অমৃতারূপী মৈত্রেয়ী দেবী তার উপন্যাসটির শেষ বাক্য পর্যন্ত পাঠকদের ধরে রাখেন তার সৎ ভাষণে স্নাত করে যে, “ফিনিক্স পাখি হলেও মির্চার চোখে আলো জ্বালাবেই সে একদিন”। এবং শেষ বাক্যটি মির্চাই বলে – ‘যেদিন ছায়াপথে তোমাদের দেখা হবে, তার তো আর বেশি দেরি নেই।’

হ্যা, এবং বেশি দেরী ছিলনা। শেষ সাক্ষাতের কদিন পরই প্রথমে মির্চা ১৯৮৬-তে এবং অমৃতা মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯-তে এক পরিপূর্ণ বিচ্ছেদের যন্ত্রণাকাতর হাহাকার নিয়ে। কেবল প্রাক্তন ভারতীয় সামাজিক আর ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে মির্চা আর অমৃতার মিলন হয়নি। তাই উনিশ শতকের এ দুই মানব-মানবী মুলত এক ট্রাজিক জীবন নিয়েই পৃথিবী ছাড়ে। আর ‘ন হন্য’তে বই লিখে অমৃতা অনেক আপনজনকে বিব্রত করেছিল ঐ সময়ের সামাজিকতায়। কেউ-কেউ ওঁর সঙ্গ চিরদিনের জন্যে সম্পর্ক ত্যাগও করেছিল, কেবল একজন অভারতীয় অধার্মিকের সাথে প্রেম করার ‘অপরাধ’ প্রকাশ করার কারণে। আর এ ট্রাজিকতার কারণে আমার ইচ্ছে ১৯৩০-সনের অমৃতা আর মির্চাকে ‘ক্লোন’ করা হয় যেন এবং তাদের বেছে নেয়ার অধিকার দেয়া হোক আজকের ৩০১৬ সনের ধর্ম, জাতপাতহীন এ মুক্ত সুন্দর পৃথিবীতে।

৩০১৬’র পৃথিবীর মানুষেরা তাদের চিন্তন, বিজ্ঞান, যোগাযোগ ইত্যাদিতে প্রভুত উন্নতি করলেও, তার আবেগ রয়ে গেছে সেই ২০১৬’র মতই। তাই ন হন্যতের অমৃতা-মির্চা কাহিনি শুনে সুখ জীবনের স্মৃতিদীর্ণ পোড়ো বাড়ির কষ্টের মত বিশেষজ্ঞ টিম আবেগাপ্লুত হয় ঝড়োজলের মতই। ঐকমত্যে পৌঁছে তারা ১৯৩০-র শেষ বিচ্ছেদের দিনের অবয়বে অমৃতা আর মির্চার ক্লোন করতে।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ ভবানিপুরের বাড়ি থেকে বিদায়লগ্নে অমৃতা শেষবারের মত বারান্দায় দাঁড়িয়ে মির্চাকে লক্ষ্য করে বলেছিল –
“অজ: নিত্য শাশ্বতোহয়ং পুরানো ন হন্যতে হন্য মানে শরীর’ আজ সে শরীর নেই কিন্তু সে আছে, সে অম্যতা”। তাই ঐ সময়ের অমৃতা – মির্চাকে বানাতে অনুরোধ করলাম আমি পুনর্বার। বিশেষজ্ঞ টিমের সদস্য ‘ট’ বললো – “এমন করলে কেমন হয়? ক্লোনের পর অমৃতাকে তার ভবানিপুরের বাড়িতে স্থাপন করা হবে। আর মির্চা স্থাপিত হবে কাশির কাছে শালবনের ছায়াঢাকা পাথুরে পথের পাশে পার্বত্য নদীর ওপারে ব্র্রহ্মপুরী অরণ্যে, ঋষিকেশের পাশেই ‘স্বর্গাশ্রম’ যার নাম ছিল। কালীকম্বলিওয়োলার ধর্মশালার ভোজনালয় ঠিক নৈকট্যে। ওখানে এক গুহায় ছাইমাখা জটাধারী কমণ্ডলুক সন্যাসিরূপী ‘মির্চা’। ‘ট’র এমন নিখুঁত বর্ণনায় হেসে উঠলো সবাই সমস্বরে। এবং তাই সিদ্ধান্ত হলো। কেবল ক্লোন নয়, ১৯৩০’র আবহ ও পরিবেশ সৃষ্টি করে স্থাপন করা হবে তাদের দুজনকে ঐ সময়ের ভারতে!

অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০২

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০১

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + = 11