প্রসঙ্গ ক্রিকেট, আক্রান্ত মানচিত্র

আনোয়ার স্যার আমার কাছে পিতৃতুল্য একজন মানুষ ছিলেন। আমি জীবনে কখনও ওরকম মিষ্টভাষী মানুষ দেখিনি। আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। মুলত উনি ছিলেন আমার দাদু জীবানন্দ চক্রবর্তীর ছাত্র। দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে উনি আমাকে স্যার বলে ডাকতেন। আমি যখন আদর্শ স্কুলে ভর্তি হই তখন উনি রিটায়ার্ড করেছেন। কিন্তু আমাদের বাসায় ওনার জাতায়াত্ ছিলো এবং সেটা শুধুমাত্র আমার টানেই। স্যার আসতেন আমার সাথে গল্প করতেন, দেখিয়ে দিতেন।

যাই হোক আসল প্রসঙ্গে আসি। ঘটনাটা ২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের। আমি তখন ইন্টার ফাস্ট ইয়ার। প্রথম ম্যাচটি হয়েছিলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর পাকিস্তানের মধ্যকার। ওই বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ আমার স্পষ্ট মনে আছে কারণ সেবার আমি প্রতিটি বলের প্রতিটি ঘটনা খাতায় লিখে রাখতাম। যাই হোক খেলা দেখছি বসে এমন সময় স্যার আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন
কি স্যার খাতায় কি লিখছেন?
বললাম স্কোর বল বাই বল।

তিনি জানতে চাইলেন আমি কোন দলকে সমর্থন করছি এই ম্যাচে।
উত্তরে ওয়েস্টইন্ডিজের নাম বলায় উনি বেশ হতাশ হয়েই বললেন স্যার, ওয়েস্টইন্ডিজকে সমর্থন করার কি বিশেষ কোন কারণ আছে?
বললাম ব্রায়ান লারা আমার প্রিয় ব্যাটসম্যান এজন্য।
একজনের জন্যে একটা দলকে সমর্থন দেওয়া কিন্তু বোকামি, যখন বিপরীত দল আপনার প্রতিবেশি। পাকিস্তান সার্ক ভুক্ত দেশ এটা মাথায় রাখতে হবে কিন্তু।

সত্যিই তো পাকিস্তান তো সার্কভুক্ত দেশ। তাহলে পাকিস্তানকে রেখে আমি কেন ওয়েস্টইন্ডিজকে সমর্থন দিচ্ছি! বললাম স্যার এভাবে তো ভাবিনি কখনও।

স্যার বললেন, এখানেই আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভুলটা করে।
হ্যাঁ আমিও সেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশ ছিলাম ভেবে লজ্জা পেয়েছিলাম। এবং তারপর থেকে টীম পাকিস্তানের সমর্থন শুরু করলাম। আমার প্রিয় দল নিউজিল্যান্ডের সাথে খেলা হলেও আমি পাকিস্তানকে সমর্থন দিতাম। কারণ স্যার বলেছিলেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সার্ক ভুক্ত দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন না দিয়ে ভুল করে!
স্যার বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে ওনাকে আজ জিজ্ঞেস করতাম স্যার আপনার দর্শনটা বলবেন প্লিজ? কারণ এখন আমি সেটা জেনেছি যেটা আপনারা আমাকে জানতে দেননি। আমি জেনেছি পাকিস্তানীদের বীভৎসতার ইতিহাস, মায়ের-বোনের ধর্ষিতা হওয়ার ইতিহাস,বাবার-ভাইয়ের রক্তে একটি দেশ ভেসে যাওয়ার ইতিহাস।
এবারে একটু আগের ঘটনায় ঢুকি। ডাক্তার হাবিব খন্দকার আমার এলাকায় একজন মাটির মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, কারো সাথে কখনও বিবাদে জড়াতে দেখিনি কখনও। এখন তিনি নিজের খরচে আমাদের জাহানাবাদ স্কুলের গলির ভেতরে একটা মসজিদ করেছেন, করেছেন একটি মাদ্রাসাও। তবে যেখানে উনি মাদ্রাসা করেছেন সেটা ছিলো আমাদের খেলার মাঠ। সে যাই হোক ওনার নিজের জমিতে উনি মাদ্রাসা বানাবেন না বৌদ্ধ বিহার বানাবেন সেটা ওনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু যেটা ব্যক্তিগত না সেটা হলো ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেট। পাকিস্তান-বাংলাদেশের ম্যাচ। ওই ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়েছিলো বাংলাদেশ। ক্লাশ ফাইভে পড়ুয়া আমিও পাড়ার বড়দের সাথে বিজয় মিছিলে নেমেছিলাম। পরদিন আমরা বিকেলে খেলছি। আমরা দেশের নাম দিয়ে দিয়ে খেলতাম। যেহেতু বাংলাদেশ গতকাল জিতেছে তাই আমি আর মিতুল দুজনেই বাংলাদেশ নিতে চাইলাম, কিন্তু একদিন আগেও কে অস্ট্রেলিয়া নেবে তা নিয়ে তর্ক চলত। আমাদের বাংলাদেশ তর্কের ভেতরে এলেন ডাক্তার মামা। তর্কের বিষয়বস্তু শুনে খুব হাসলেন তিনি। বললেন, পাকিস্তান একটা শক্তিশালী দেশ, বাংলাদেশ কাল ভাগ্যক্রমে জিতে গেছে, দেখো আর কখনও জিততে পারবেনা পাকিস্তানের সাথে। আমরা সবাই লজ্জা পেয়েছিলাম তখন। সত্যিই তো বাংলাদেশ দুর্বল দল, ভাগ্যক্রমেই জিতেছে! কিন্তু সেদিন যে লজ্জা পায়নি সে হল আমার বন্ধু উজ্জ্বল। সে ডাক্তার মামার সামনেই তাকে রাজাকার বলে সম্বোধন করেছিলো। বিনিময়ে ওর ওই মাঠে ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন ভালোমানুষ হিসেবে পরিচিত ডাক্তার হাবিব খন্দকার। আমাদেরকেও শাসানো হয়েছিল এই বলে, আমরা যদি ওকে খেলতে নেই তাহলে আমাদের খেলাও বন্ধ। আমরা তখন বিকল্প মাঠের অভাবে উজ্জ্বলকে বাদেই খেলতাম।

এবার আসি ২০১৬ সালে। এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলছে শ্রীলঙ্কা। খেলা দেখছি সুমনের বাসায়। সুমনের এক বন্ধুও এসেছে খেলা দেখতে। আমরা বেশ আয়োজন করে খেলা দেখতে বসেছি। এবার একপর্যায়ে দেখলাম রাসেল পাকিস্তানের সমর্থক। আমি অবাক না হয়েও অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আপনি সত্যি সত্যি পাকিস্তানের সমর্থক?
সে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলে আমি তাকে পাকিস্তানীদের অত্যাচারের কথা একঝলকে বর্ণনা করলাম।

সে বলে আপনি ৭১ দেখছেন? ৭১ এ ঠিক কি কি হইছে জানেন?
আমি বিশদে তাকে বর্ণনা দিলাম যতটুকু জানি। এবার সে সেই প্রাচীন মহান বানীটি উপস্থাপন করলো- “ভাই ৭১ একটা রাজনৈতিক ঘটনা, খেলাধুলার সাথে রাজনীতি মেশাবেন না’’
তাইতো খেলার সাথে কেন রাজনীতি মেশাবো? আচ্ছা মেশালাম না। মুড়ি খাচ্ছি, চানাচুর খাচ্ছি, সিগারেট খাচ্ছি, খেলা দেখছি কিন্তু বুকের ভেতরে সেই ১৯৯৯ সাল, ২০০৭ সাল আর ২০১৬ সাল খামচে ধরছিলো বারবার।

খেলা আর চার ওভারের মত শেষ হতে আমি রাসেলকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা ভাই আজকের ম্যাচে পাকিস্তানকে সমর্থন করার কোন যৌক্তিক ব্যাখ্যা কি আছে আপনার কাছে? থাকলে একটু বলবেন প্লিজ।

রাসেল মুখভঙ্গি একটু পরিবর্তন করে উত্তর দিলো, পাকিস্তানে সবাই মুসলমান, আর একজন মুসলমান হিসেবে আরেকজন মুসলমানকে সমর্থন দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব। রাসেলের ওই উত্তরের প্রতিউত্তর আমার কাছে ছিলোনা। কারণ সে বলেছে তার ধর্মীয় নৈতিকতার কথা। একাত্তরে তার দেশের ত্রিশ লক্ষ মানুষকে যারা নির্মম ভাবে হত্যা করেছিলো, ইজ্জত নিয়েছিলো দুই লক্ষ মা-বোনের তাদের সমর্থন দেওয়া রাসেলদের নৈতিক দায়িত্ব।

সেদিন আমি দীর্ঘশ্বাস ছেরেছিলাম একটা মানচিত্রের জন্য যে মানচিত্র কয়েক লক্ষ ব্যারেল রক্তের ছাপে আঁকা। সে দীর্ঘশ্বাস আমি আজও ছেড়ে যাই। যখন ভাইয়ের খুনী, বাবার খুনী, মায়ের- বোনের ধর্ষকদের রক্ত পরম আদরে বুকে লালন করি শুধু তাদের ধর্ম এক বলে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

81 − = 76