বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (ষষ্ঠ পর্ব)

?m=1340270623″ width=”500″ />
(ছবি: চার্লস ডারউইনের স্মারক ভাস্কর্য তার স্কুলের প্রাঙ্গণে – Shrewsbury, Shropshire)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম)

Origin of Species এর উদ্ভব

লন্ডনে, ডারউইন আবিষ্কার করলেন তার ভাই ইরাসমাস যথেষ্ঠ পরিমানে নিবেদিত কোনো প্রকৃতি বিজ্ঞানী ছিলেন না; গবেষণার ল্যাবরেটরীর বাইরে ইরাসমাস বরং সাবলীল ছিলেন লন্ডনের নানা ডিনারের পার্টিতে, ভদ্রলোকদের ক্লাবে; তবে তিনি ডারউইনকে তার সামাজিক বলয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, আর ডারউইনও তাদের সাথে ভালোভাবে মিশে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু ইরাসমাসের ব্যতিক্রম, ডারউইন অনেক বেশী পরিশ্রমী ছিলেন তার কাজে, তিনি ভূতত্ত্ববিদ্যা নিয়ে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লিখেছিলেন, এছাড়া তার বিগল ভ্রমন নিয়ে একটি বইও তৈরী করে ফেলেন খুব দ্রুত; তার সংগ্রহ করে আনা নানা নমুনা বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করানোর যাবতীয় ব্যবস্থা করেন -যেমন জীবাশ্ম, উদ্ভিদ, পাখি এবং ফ্ল্যাট ওয়ার্ম ইত্যাদি।

কয়েক মাসের মধ্যেই ডারউইন তার কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেতে শুরু করেন, বৃটেনের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ ভূতত্ত্ববিদ হিসাবে তার সুনাম ছড়াতে থাকে; কিন্তু একই সাথে তিনি একটি গোপন বিষয় তার নিজের মধ্যে লালন করাও শুরু করেছিলেন তখন, তার ব্যক্তিগত ছোট নোটবুকগুলোতে তিনি লিখতে শুরু করেন, না তার প্রিয় বিষয় ভূতত্ত্ব নিয়ে না, বরং জীববিজ্ঞান নিয়ে। তিনি চমকে দেবার মত মনোযোগ বিঘ্নকারী একটি সম্ভাবনা নিয়ে ভীষণ আচ্ছন্ন ছিলেন খুবই ব্যক্তিগত ভাবে: হয়তো তার পিতামহ সঠিকই বলেছিলেন।

বৃটেনে তার অনুপস্থিতির পাঁচ বছরে জীববিজ্ঞানও বহু দূর অগ্রসর হয়েছিল। নতুন প্রজাতির আবিষ্কার হয়েছে ধারাবাহিকভাবে এবং শ্রেণীবিন্যাসের ‍প্রাচীন রীতিকে যা চ্যালেঞ্জ করেছে এবং মাইক্রোস্কোপের নীচে বিজ্ঞানীরা উদঘাটন করেছেন কিভাবে ডিম্বাণু থেকে প্রাণীর সৃষ্টি হয়; বৃটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা আর প্যালির প্রতিটি আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে ঈশ্বরের ডিজাইনকে প্রশস্তি করে যাওয়া যুক্তিতে আর সন্তুষ্ট ছিলেন না; কারণ তাদেরকে এটি জীবন সংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ ছিল; যদি ঈশ্বর স্বর্গীয়ভাবে জীবনের পরিকল্পনা করে থাকেন, ঠিক কিভাবে তিনি কাজটি করেছিলেন, কিছু প্রজাতির মধ্যে সদৃশ্য আর অন্যদের সাথে তাদের বৈসাদৃশ্যের কারণটাই বা কি? সব প্রজাতি কি একই সাথে পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই অস্তিত্বশীল ছিল? নাকি সময় অতিক্রান্ত হলে ধীরে ধীরে তাদের ঈশ্বর সৃষ্টি করেছিলেন?

বৃটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের জন্য ঈশ্বর আর কোনো মাইক্রোম্যানেজার ছিলেন না, বরং তার দ্বায়িত্ব ছিল প্রকৃতির নিয়ম সৃষ্টি করা এবং সেগুলোর সূচনা করে দেয়া, এমন কোনো ঈশ্বর যাকে তার সৃষ্টিতে প্রতিটি মুহুর্তে নাক গলাতে হয়, তাকে যে ঈশ্বর যিনি একেবারে শুরুতে সবকিছু নিখুঁতভাবে এবং নির্ভূলভাবে সূচনা করে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে মনে হয়েছে যথেষ্ট অযোগ্য; অনেক বৃটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানী মেনে নিয়েছিলেন যে এই গ্রহের ইতিহাসে জীবন পরিবর্তিত হয়েছে; অপেক্ষাকৃত সরল গ্রুপের প্রাণী এবং উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়েছে এবং তাদের জায়গা নিয়েছে জটিলতর গ্রুপগুলো; কিন্তু তারা বিষয়টি দেখতেন একটি সুশৃঙ্খল, স্বর্গীয় নির্দেশনায় পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া হিসাবে; কোন পার্থিব বিবর্তন না, যা লামার্ক প্রস্তাব করেছিলেন ১৮০০ সালে, ১৮৩০ এর দশকে আবারো প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের আরো একবার বড় ধাক্কা দিয়ে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের আরেক প্রাণিবিজ্ঞানী এতিয়েন জিওফ্রে সঁতিলিয়ার (Etienne Geof roy Saint-Hilaire), একটি নতুন বিবর্তনের তত্ত্ব প্রস্তাব করার মাধ্যমে।


(ছবি: এতিয়েন জিওফরয় সন্তয়িলেয়ার ( Étienne Geoffroy Saint-Hilaire: 1772 – 1844); লামার্কের বিবর্তন ধারণা প্রস্তাবের পরে ফরাসী এই প্রকৃতিবিদ তার নিজের গবেষনার উপর ভিত্তি করেই প্রস্তাব করেন তার নিজের বিবর্তন তত্ত্ব, তুলনামুলক অ্যানাটোমি এবং জার্মান ভ্রুণতাত্ত্বিকদের ভিত্তি করে তিনি দাবী করেন, সকল প্রানীদের শারীরিক গঠনে সদৃশ্যতা, যা সুযোগ করে দেয় এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির রুপান্তর প্রক্রিয়ায়।)

লামার্ক এবং জিওফরয় প্যারিসে ন্যাশনাল মিউজিয়ামে সহকর্মী এবং বন্ধু ছিলেন কয়েক দশক ধরে; কিন্তু জিওফরয় বিবর্তনের ধারণাটিকে গ্রহন করেছিলেন মূলত তার নিজের বিভিন্ন প্রাণীর অ্যানাটমি বা শারীরিক গঠনগত বৈশিষ্টগুলো নিয়ে তুলনামূলক গবেষণর উপর ভিত্তি করেই; সেই সময়কার প্রচলিত ধারণা ছিল, যে প্রাণীরা সদৃশ্য হয় তখনই যখন তারা একই রকমভাবে কাজ করে; কিন্তু জিওফরয় এর নজরে পড়েছিল এই প্রচলিত ধারণার ব্যতিক্রম কিছু উদহারণ; যেমন অস্ট্রিচদের উড়তে সক্ষম এমন পাখিদের মতই হাড় আছে অথচ তারা উড়তে পারেনা; এবং জিওফরয় আরো দেখান যে কোনো প্রজাতির বিশেষ একগুচ্ছ মূল বৈশিষ্ট্য যা তাদের জন্য অনন্য একটি বিশেষ চিহ্ন হিসাবে শনাক্ত করা হয়, তারা আসলে একক ভাগে অনন্য কোনো মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয় শুধু মাত্র সেই প্রজাতির জন্য; যেমন গন্ডারে শিঙ তাকে বিশেষ অনন্যতা প্রদান করছে বলে মনে হয় ঠিকই, কিন্তু আসলে এটি ঘণ চুলের একটি গোছা মাত্র;

জিওফরয় যখন বিভিন্ন প্রাণিদের মধ্যে গোপন সংযোগটি উদঘাটন করার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি জার্মান জীববিজ্ঞানীদের কাজ দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, তারা বিজ্ঞানকে দেখেছিলেন জীবনের গোপন ঐক্যতার খোজার একটি অতীন্দ্রিয় প্রচেষ্টা হিসাবে। কবি ( এবং বিজ্ঞানী) গ্যেটে প্রস্তাব করেছিলেন কোনো উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ – এর পাপড়ি থেকে কাটা, সবই একটি মৌলিক ফর্ম বা গঠনেরই নানা রুপ: পাতা; এই সব জার্মান জীববিজ্ঞানীদের জন্য, জীবনের সকল জটিলতা লুকিয়ে আছে কিছু নির্দিষ্ট চিরন্তন ফর্ম বা মডেল এ, যাদের তারা নাম দিয়েছিলেন আর্কিটাইপ বা আদিরুপ; জিওফরয় সকল মেরুদন্ডী প্রাণিদের সেই আদিরুপটি সন্ধান করার প্রচেষ্ঠা করেছিলেন।

?oh=af1778554b364b1cacb1fe9f1cf519df&oe=58A760F0″ width=”500″ />
(ছবি:জিওফরয় এর প্রস্তাবিত বিবর্তনের ধারণায় ইউনিফর্মিটি অব ডিজাইন একটি উদহারণ; তিনি প্রস্তাব করেছিলেন প্রতিটি প্রানীরই গঠনগত মৌলিক সাদৃশ্য আছে, সেটাই বিবর্তনের কারন হবার সম্ভাবনা আছে।)

জিওফরয় প্রস্তাব করেছিলেন, প্রতিটি মেরুদণ্ডী প্রাণির কংকাল কাঠামোর প্রতিটি অস্থি হচ্ছে একটি আদিরুপের মেরুদণ্ডী প্রাণির একটি ভিন্ন ভিন্ন রুপ বা প্রকরণ; তিনি এরপর তার ধারণাটি আরো খানিকটা সামনে এগিয়ে নেন, দাবী করেন যে অমেরুদণ্ডী প্রাণিরা এই সুবিশাল পরিকল্পনারই অংশ; একটি লবস্টার এবং একটি হাস, তার যুক্তি অনুযায়ী একটি মুল পরিকল্পনা বা থিমেরই ভ্যারিয়েশন বা ভিন্নরুপ মাত্র; লবস্টাররা হচ্ছে সন্ধীপদী প্রানী, যে গ্রুপে আছে কীট পতঙ্গ, চিংড়ী এবং হর্স সু ক্র্যাব বা কাকড়া ইত্যাদি প্রাণিরা; সন্ধীপদীরা মেরুদন্ডীদের সাথে খুব হালকা একটি সদৃশ্য বহন করে: তাদের শরীর এর দীর্ঘতম অক্ষ বরাবর প্রতিসম, তাদের চোখ আর মুখ সহ একটি মাথা আছে; কিন্তু পার্থক্য বরং আরো অনেক বেশী, সন্ধীপদীরা তাদের শরীরের বাইরে একটি শক্ত খোলস বা শেল তৈরী করে, আর মেরুদন্ডীরা করে তাদের শরীরের অভ্যন্তরে; মেরুদন্ডীদের একটি স্নায়ুরজ্জু আছে যা তাদের শরীরের ঠিক পেছন বা পিঠ বরাবর থাকে, এবং পরিপাকতন্ত্র যা তাদের শরীরের সামনে থেকে পেছনে বিস্তৃত; লবস্টার কিংবা যেকোন সন্ধীপদী প্রাণিদের ক্ষেত্রে এই প্যাটার্ণটি ঠিক উল্টো হয়ে যায়; পেছন বা পিঠ বরাবর তাদের পরিপাক তন্ত্র থাকে, এবং তাদের স্নায়ুতন্ত্র থাকে পরিপাকতন্ত্রের সামনে পেট বরাবর; যা দেখে মনে হতে পারে সন্ধীপদীদের সাথে মেরুদন্ডীদের তুলনা করা সম্ভব না, কিন্তু জিওফরয় কিন্তু তেমন করে ভাবলেন না; তিনি দাবী করেন যে সন্ধীপদীরা একটি একক মেরুদন্ডের মধ্যে বাস করে, এবং খুব সাধারণ ব্যপার এদের পেটকে পিঠের পরিবর্তন করা আর এভাবে একটি লবস্টারকে হাসের প্যাট্যার্নে নেয়া যায়; সন্ধীপদীদের মেরুদন্ডীদের মতই একই ডিজাইন আছে শুধু উল্টো, ‘দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বললে, শুধুমাত্র একটি মাত্র প্রাণি আছে’ জিওফরয় দাবী করেছিলেন।

১৮৩০ সালে জিওফরয় তার তত্ত্বটিকে আরো একধাপ সামনে এগিয়ে নিয়ে যান; এই রুপান্তরগুলো শুধু মাত্র জ্যামিতিক আর বিমূর্ত ধারণা না, তিনি দা্বী করেন, সময়ের সাথে সাথে প্রাণিরাও তাদের আকারও পরিবর্তন করে থাকে; জিওফরয় তার বিবর্তন তত্ত্বে কিন্তু লামার্ককে পুনরুজ্জীবিত করেননি, তিনি লামার্কের ধারণা যে, কোনো একটি বৈশিষ্ট্য যা কোনো প্রাণি তার জীবদ্দশায় অর্জন করে, সেটি ‍তার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও বিস্তার লাভ করতে পারে, এমন হাইপোথিসিসটি গ্রহন করেননি, তার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো প্রাণির পরিবেশের কোনো পরিবর্তনই একটি ডিম থেকে কিভাবে এটি বেড়ে উঠছে সেটিকে পরিবর্তন করতে পারে এবং এভাবে ভিন্ন কোনো রুপের বিচিত্র প্রাণির জন্ম হতে পারে, এবং তারাই নতুন প্রজাতি হয়।

জিওফরয় দাবী করেন, আপনারা এই বিবর্তনের ইতিহাস দেখতে পারবেন, যদি লক্ষ্য করেন কিভাবে খুব সরল একটি আকার বা ফর্মের ভ্রুণ থেকে ধীরে ধীরে জটিলতর প্রাণির উদ্ভব হয়। জার্মান বিজ্ঞানীরা তখন আবিষ্কার করছিলেন কিভাবে ভ্রুণগুলো মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই একটি বিচিত্র ফর্ম থেকে অন্য একটি বিচিত্র ফর্মে রুপান্তরিত হতে পারে; কখনও যে রুপটি এই ভ্রুণ থেকে সৃষ্ট হওয়া পুর্ণ বয়স্ক কোনো প্রাণীর সাথে কোন সাদৃশ্যই বহন করেনা; গবেষকরা যত্নের সাথে তাদের বিভিন্ন ‍অংশ এবং আকৃতির রুপান্তর লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, এবং যতই তারা লক্ষ্য করেন ততই তারা একটি সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করেন এই সংশয়ের মধ্যে; বিশেষ করে তারা মুগ্ধ হন দেখে যে কিভাবে একটি ভ্রুণ খুব সাধারণ রুপ ও সরল একটি গঠন থেকে তার যাত্রা শুরু করার পরে ধীরে ধীরে আরো জটিলতর হয়ে উঠে।

তারা এমনকি দাবী করেন যে এই প্রতিটি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকা জটিল রুপ তার এই ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে একটি নুতন ধাপ সংযুক্ত করছে; লরেন্জ ওকেন, একজন জার্মান বিজ্ঞানী এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে; ‘ ভ্রূণ ক্রমবিকাশের সময় কোন একটি প্রাণি, প্রাণি জগতের সব পর্বগুলোই অতিক্রম করে, এবং নতুন অঙ্গ ধারণ করার মাধ্যমে এটি ভিন্ন ভিন্ন রুপে নতুন ধাপে বের হয়ে আসে; গর্ভের ভ্রুণ হচ্ছে সময়ের প্ররিক্রমায় সকল প্রাণি শ্রেণীরই প্রতিনিধি।’ প্রথমে এটি দেখতে নলের মত, যেন কোনো কেঁচো বা ওয়ার্ম; এরপর এটি একটি যকৃত, রক্ত পরিসঞ্চালন তন্ত্র গঠন করে এবং একটি মোলাস্ক জাতীয় প্রানীতে পরিণত হয়, এরপর হৃৎপিন্ড এবং একটি জননাঙ্গ সহ এটি রুপান্তরিত হয় একটি শামুকে; এরপর যখন এর হাত পা বা লিম্ব বের হয়ে আসে, এটি পরিণত হয় একটি পতঙ্গে, এরপর যখন তার অস্থি তৈরী হয়, এটি রুপান্তরিত হয় মাছে; মাংসের সাথে সরীসৃপে এবং এভাবে মানব জাতি অবধি; ওকেন ঘোষণা করেন, ‘মানুষ হচ্ছে সেই চুড়ান্ত শিখর, প্রকৃতির ক্রমবিকাশের রাজ মুকূট।’


(ছবি: লরেন্জ ওকেন, জার্মান জীববিজ্ঞানী)

জিওফরয় প্রস্তাব করেন, ভ্রুণরা শুধুমাত্র প্রকৃতির এই ধারাবাহিক ক্রমোন্নতির ধাপ বেয়ে উপরেই উঠে আসে না; তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিও বা এর বিবর্তনের নানা ধাপের পুনরাবৃত্তিও প্রদর্শন করে; মানুষের পূর্বসূরি প্রাণি আসলে মাছ, যার প্রমাণ ভ্রুণ ক্রমবিকাশের একটি আদি পর্বে আমাদের ফুলকা সদৃশ উপাঙ্গ থাকে।

যখন জিওফরয় এভাবে বিবর্তনের পক্ষে তার যুক্তিগুলো উপস্থাপন করেন, ইউরোপীয় অভিযানকারীরা নানা নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করে চলেছেন যা তিনি দাবী করেন তার প্রস্তাবিত তত্ত্বের সাথে মানানসই; অষ্ট্রেলিয়ার প্লাটিপ্যাস যেমন, একটি স্তন্যপায়ী, এর ঠোঁট হাসের মতো এবং এটি ডিম পাড়ে, যা জিওফরয়কে অনুপ্রাণিত করেছিল এটিকে স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপের মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তিকালীর অবস্থা হিসাবে চিহ্নিত করতে; এছাড়া ব্রাজিলে অভিযানকারীরা খুজে পেয়েছিলেন লাঙ ফিশ, যারা ফুলকার বদলে ফুসফুসের মাধ্যমে শ্বাস নিতে পারে, তারা হয়তো বা পানিতে বসবাসকারী মেরুদন্ডী প্রাণিদের সাথে স্থলে বসবাসকারী মেরুদণ্ডী সংযোগকে প্রতিনিধিত্ব করে।

তবে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত সব বিজ্ঞানীরা লামার্কে মতবাদের মতই জিওফরয় এর প্রস্তাবকে আদৌ গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচনা করেননি; অ্যাডাম সেজউইক, কেমব্রিজের ধর্ম নিবেদিত প্রাণ ভূতাত্বিক, দুই ফরাসীর কাজকে উল্লেখ করেছিলেন, ‘উদ্ভট রকম জঘন্য (আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি নোংরা) শারীরবৃত্তীয় বা ফিজিওলজির দৃষ্টিভঙ্গি’। কিন্তু যদিও বৃটিশ বিজ্ঞানীরা গড়পড়তা সবাই বিবর্তনের ধারণাটিকে প্রকাশ্যেই অপছন্দ করতেন, তবে এটিকে সরাসরি আক্রমন করার দ্বায়িত্ব পড়েছিল একজন মানুষের উপরে: তিনি ছিলেন দুর্দান্ত মেধাবী একজন তরুণ অ্যানাটোমিষ্ট রিচার্ড ওয়েন।

প্রায়শই ওয়েন ই হতেন প্রথম বৃটিশ অ্যানাটোমিষ্ট যিনি নতুন প্রজাতি পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পেতেন, যেমন লাঙ ফিশ বা প্ল্যাটিপাস; এবং তিনি এই সুযোগগুলো কাজে লাগিয়েছিলেন জিওফরয় এর বিবর্তনের স্বপক্ষে দেয়া দাবীগুলো খন্ডানোর জন্য; ওয়েন দেখান যে প্লাটিপাসরা দুধ নিঃসরণ করে, যা স্তন্যপায়ী প্রানীদের একটি বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন; আর লাঙ ফিস, যদিও তাদের ফুসফুস আছে, কিন্তু তাদের নাকের কোন ছিদ্র নেই; যা সকল স্থলবাসী মেরুদন্ডীদের মধ্যে বিদ্যমান; এবং তাদেরকে সাধারণ মাছ হিসাবে বিবেচনা করার জন্য ওয়েন এর জন্য এটুকই যথেষ্ট।

.CROP.promo-mediumlarge.jpg” width=”500″ />
(ছবি: প্ল্যাটিপাস, (Ornithorhynchus anatinus), duck-billed platypus নামেও পরিচিত)


(ছবি: Spotted African lungfish (Protopterus dolloi) এর ফুসফুস)

তারপরও ওয়েন নিজে কিন্তু মোটেও সন্তুষ্ট ছিলেন না শুধুমাত্র এটুকু বলে যে ঈশ্বর জীবন সৃষ্টি করেছেন এবং এর ডিজাইন তার মহিমাকে প্রতিফলিত করে; ওয়েন এই সৃষ্টির প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিলেন; বিবর্তন সম্বন্ধে জিওফরয় এর এধরনের লাগাম ছাড়া কল্পনাকে ওয়েন এর জন্য সহ্য করা কঠিন ছিল, কিন্তু তিনি যথেষ্ট ভালো মাপের একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী ছিলেন, সুতরাং অস্বীকার করার উপায় ছিল না, তিনি কিছু কিছু বিষয়ে ঠিকই ধারনা করেছিলেন; বিভিন্ন প্রজাতিদের মধ্যে সদৃশ্যতা এবং যেভাবে তাদের পরিবর্তনের নানা ধাপের একটি ক্রমবিন্যাসে শ্রেণীভুক্ত করা যায় সেই বিষয়টা খুব স্পষ্ট যা অস্বীকার করা কঠিন।

?oh=ccf12b7b4fe70f6ee675172022b5b54f&oe=58A56C61″ width=”500″ />
(ছবি: অত্যন্ত প্রভাবশালী বৃটিশ বিজ্ঞানী রিচার্ড ওয়েন (Sir Richard Owen, 1804 – 1892); অন্তত দুটো কারনে তাকে কেউই ভুলতে পারবেন না, প্রথমত তিনি ডায়নোসরদের নামকরণ করেছিলেন এবং দ্বিতীয়ত তিনি তার স্বর্বস্ব দিয়ে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীতা করেছিলেন; বিবর্তন হচ্ছে একমত হলেও ডারউইনের প্রস্তাবিত মতে বিবর্তনের বিরোধী ছিলেন; সাম্প্রতিক কালে evolutionary developmental biology র গুরুত্বপুর্ণ কিছু আবিষ্কার রিচার্ড ওয়েন এর প্রস্তাবটিকে নতুন আলোকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে; ১৮৮১ সালে তিনি মুল চালিকা শক্তি ছিলেন লন্ডনের অসাধারণ British Museum of Natural History প্রতিষ্ঠা করার জন্য।)

ওয়েন এর ধারণা জিওফরয় এই প্রমাণগুলোর ব্যাখ্যায় একটু বেশী লাফ দিয়ে ফেলেছেন তার অনুসিদ্ধান্তে; যেমন ওয়েন জানতেন, একটি ভ্রুণ কিভাবে গড়ে ওঠে সে বিষয়ে জিওফরয় এর ধারণা নতুন কিছু গবেষণা লব্ধ তথ্য ইতিমধ্যে প্রতিস্থাপিত করেছে;একজন প্রুশিয়ান বিজ্ঞানী কার্ল ভন বায়ের যেমন তার গবেষণায় দেখিয়েছিলেন যে জীবন কোনো সাধারণ মই এর মত না, যেখানে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রাণিদের ভ্রুণ ক্রমবিকাশের সময় অপেক্ষাকৃত আদি প্রাণিদের ক্রমবিকাশের ধাপগুলোর রিক্যাপিচুলেট বা সংক্ষিপ্ত আকারে পুনরাবৃত্তি করে; ভ্রুণের সবচেয়ে পুরোনো স্তরে মেরুদন্ডীরা সাধারণত একে অপরের মত দেখতে হয়, এরকারন শুধুমাত্র তারা তখন একগুচ্ছ কোষ ছাড়া আর কিছু না, সময় যত অতিক্রান্ত হয়, এদের রুপও বৈশিষ্ট্যসূচক হতে থাকে।

মাছ,পাখি এবং স্তন্যপায়ীদের লিম্ব বা হাত পা গুলো সবকটি ভ্রূণে লিম্ব বাড হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু সময়ের সাথে সেই লিম্ব বাডগুলোই পরিণত হয় হাত, ক্ষুর, ডানা এবং অন্যান্য নানা ধরনের লিম্ব এ, যা সেই মেরুদন্ডী প্রাণিদের জন্য বৈশিষ্ট্যসূচক; কোন এক ধরনের কিছু অন্য কোন ধরনের কিছু তৈরী করেনা, ‘নিখুঁত কিংবা জটিলতম হবার ধারাবাহিকতায় একটি সরলরৈখিক বিন্যাস অসম্ভব’ ভন ব্যায়ের লিখেছিলেন; ওয়েন এর উচ্চাকাঙ্খা ছিল ভন বায়ের,জিওফরয় এবং তার সময়ের আরো বিখ্যাত জীববিজ্ঞানীদের গবেষণা লব্ধ তত্ত্বগুলোকে একটি সুতোয় বেধে জীবনের একটি মহান তত্ত্ব প্রস্তাব করার। তিনি বিবর্তনের ধারণার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা করার জন্য প্রাকৃতিক সূত্র বা নিয়ম খোজার চেষ্টা করেছিলেন যা জীবাশ্ম এবং ভ্রুণে প্রাপ্ত সব প্রমানের ব্যাখ্যা দিতে পারে;

বিগল ফিরে আসবার তিন সপ্তাহ পর ডারউইনের সাথে তার দেখা হয়, তারা দুজনেই লাইয়েলের বাসায় একটি নৈশভোজের নিমন্ত্রণে এসেছিলেন, যেখানে ডারউইন চিলিতে তার ভুমিকম্পের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে সবাইকে বিস্মিত করেছিলেন; নৈশভোজের পর লাইয়েল এই দুই তরুণকে ( ওয়েন ডারউইনের চেয়ে বয়সে পাঁচ বছরে বড় ছিলেন) পরিচয় করিয়ে দেন, দুজনে বেশ চমৎকার বোঝাপড়াও হয়, এবং ডারউইন বুঝতে পারেন ওয়েন যথেষ্ঠ পরিমান বিখ্যাত যিনি তার জীবাশ্মগুলোকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা নিয়ে আসতে পারবেন; তিনি ওয়েনকে সেই রাতে তার জীবাশ্মগুলো পরীক্ষা করে দেখার আহবান জানান, ওয়েনও আনন্দের সাথে রাজী হন, কারণ এটাই তার সুযোগ তার ধারাণাগুলো কেউ কোনোদিন দেখেনি এমন জীবাশ্মের উপর পরীক্ষা করে দেখার জন্য।

অবশ্য সেদিন তার জানা ছিল না ডারউইন একদিন তাকেও জীবাশ্মে পরিণত করবে।


(ছবি: Charles Darwin, ভাস্কর: Léon-Joseph Chavalliaud (c.1858-1921),The Palm House, Sefton Park, Liverpool)

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

30 + = 31