আমাদের সন্তানেরাই হবে আগামীর স্বপ্ন সারথি

মানব জাতির আদি থেকে অপত্য স্নেহ মানব সভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ। পিতা-মাতার নিকট বাবা-মায়ের কাছে পৃথিবীতে মূল্যবান সম্পদের নাম সন্তান, সন্তানের কল্যাণের জন্য তারা নিজের জীবনকেও তুচ্ছজ্ঞান করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। সন্তানের কল্যাণে নিজেদের সর্বস্ব ব্যয় করা কিংবা জীবন দিয়ে সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অসংখ্য নজির রয়েছে পৃথিবীতে। সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের এই চিরন্তন টান থেকে উদ্ভূত তাদের উপর আশৈশব নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতার কারণেই সন্তান বিপথে গেলে তার প্রাথমিক দায় পিতা-মাতার উপরেই বর্তায়। তাদেরকে ঠিক মতো শাসন-বারণ করা না হলে, নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা না দিলে, সন্তান কি করে বেড়াচ্ছে তার কোন খোঁজখবর না রাখলেই এ বিষয় গুলো ঘটে। কারণ ফলের স্বাদ বা পরিচয় বোঝা যায় বৃক্ষের ধরন থেকে, বৃক্ষ ভালো হলে ফলও ভালো হয়। পিতা-মাতা যদি সন্তানকে যথাযথভাবে পরিচর্যা করেন, তবে সন্তানের বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা খুব কমই থাকে। প্রতিটি পরিবারেই পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব সম্পর্কিত অতি জরুরি নীতিকথাগুলোর চর্চা থাকা আবশ্যক। পারস্পরিক এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের বিষয়টি স্মরণে থাকলে সন্তানের হাতে পিতা-মাতা এবং পিতা-মাতার হাতে সন্তানের খুন হওয়ার মতো অকল্পনীয় ঘটনা ঘটতে পারে না। এটা কি ভাবা যায়, একটি মোটরসাইকেল কেনা নিয়ে সন্তান পিতা-মাতার গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করবে! ঐশীর মতো মেয়েকে পিতা-মাতাকে হত্যা করতে হবে? যে পিতা-মাতা সন্তানের এমন বীভৎস মানসিকতার শিকার হন, সে সন্তান কেন এমন হলো, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার বিষয় রয়েছে। এসব ঘটনা মনস্তাত্ত্বিক এবং পিতা-মাতা বা সন্তানের মানসিক বিকৃতির ফল। পারিবারিক নীতি-নৈতিকতার চরম অবক্ষয় না হলে এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। এই অবক্ষয় এতটাই ঘটেছে যে পিতা-মাতাকে সন্তানের এবং সন্তানকে পিতা-মাতার শত্রুতে পরিণত করছে। এর দায় পিতা-মাতাকেই নিতে হবে, কারণ সন্তান জন্মের পর তাকে সঠিকভাবে পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তোলা পিতা-মাতারই দায়িত্ব। এক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না বলেই সন্তান বিপথে যাচ্ছে। পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য এবং সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের উদাসীনতা, নীতি-নৈতিকতার চর্চার অভাব এবং অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্রয় সন্তানদের উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য করে তোলে। এ ছাড়া সামাজিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের শৈথিল্য এবং অভিভাবকের ভূমিকা পালনকারীদের নিষ্ক্রিয়তাও বাড়ন্ত শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। বলাবাহুল্য, বাড়ন্ত শিশু অনেকটা কাদা মাটির মতো, যে পরিবেশে এবং যে সংস্কৃতিতে তাদের গড়ে তোলা হবে সেভাবেই গড়ে উঠবে। প্রকৃতিগতভাবেই অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমেই শিশুদের মেধা ও মনন বিকশিত হয়। স্বচ্ছ পানির মতো যে পাত্রে রাখা হবে, সে পাত্রেরই আকার ধারণ করবে। এক্ষেত্রে পাত্রটি যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আছে কিনা, তা সংরক্ষণকারীর পর্যবেক্ষণের উপরই নির্ভর করে। সমাজে ভালো এবং মন্দ দুই রয়েছে এবং থাকবে। তবে সামাজিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় রীতিনীতির সুদৃঢ় ভিত্তির কারণে সমাজে ভালোর আধিপত্য আবহমানকাল থেকেই শক্তিশালী, মন্দ বিষয়টি বরাবরই কোণঠাসা হয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বর্তমানে ভালো দিকটি নিষ্ক্রিয় হয়ে মন্দ দিক প্রকট হয়ে উঠছে। সমাজের অভিভাক শ্রেণির উদাসীনতায় ক্রমবর্ধমান মন্দ প্রভাবের কাছে সমাজ তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। অনেক অভিভাবকই এখন তাদের সন্তানের আচার-আচরণ ও চলাফেরার বিষয়টি খেয়াল করেন না। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাসায় ফিরছে, এ ব্যাপারে কোন ধরনের খোঁজখবর না রাখাতেই সন্তান বিপথগামী হয়ে পড়ছে। ঐতিহ্যবাহী এ সকল রীতিনীতির চর্চার অভাবেই শিশু-কিশোররা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলায় পরিবারের অভিভাবকদের উদাসীনতা, সন্তানের প্রতি যথাযথ খেয়াল না রাখার প্রবণতার কারণেই তারা নিঃসঙ্গতা, হতাশ ও উগ্রতার কবলে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিক্ষুব্ধ সন্তানদের সংঘঠিত নানা ঘটনা ভিতরে ভিতরে পরিবার ও সমাজের চরম নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরই আলামত, যার কারণে সমাজের নেতিবাচক পরিবর্তন সকলের দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। তাই তরূণ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে অভিভাবকের সচেতন প্রয়াসে ফিরে যেতে হবে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। আরও দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সন্তানদের দিতে হবে নৈতিকতার সুশিক্ষা, সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাদের লালন করতে হবে একান্ত যতনে– তবে অপত্য স্নেহ যেন আমাদের অন্ধ না করে, বিবেচনায় রাখতে হবে সে পরিমিত বোধকেও। তবেই আমাদের সন্তানেরা গড়ে উঠবে আগামীর স্বপ্ন সারথি হিসেবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 66 = 69