বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (সপ্তম পর্ব)

?oh=aa252f4278b5b45a6ac1ac45ffc5afa5&oe=58ABB352″ width=”500″ />
(ছবি: চার্লস ডারউইন এর ১৮৩৭ সালের নোট বুকে আকা প্রথম জীবন বৃক্ষের রেখাচিত্র, যা প্রতিটি জীব সম্পর্কযুক্ত এবং ট্রান্সমিউটেশনের এই বিষয়টি নিয়ে তার ভাবনাকে ইঙ্গিত করেছিল)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম | ষষ্ঠ )


সংশয় আর ভিন্নমত যেন ধর্মদ্রোহিতা

বিগল ফিরে আসার পার চার মাস পর, ডারউইন তার সংগ্রহ করে আনা জীবাশ্ম ও প্রাণীদের নমুনাগুলোর বিষয়ে নানা বিশেষজ্ঞদের মতামত পেতে শুরু করেন; শুরুতেই তাদের বক্তব্যগুলো মূলত তাকে সংশয়াচ্ছন্ন করেছিল; ওয়েন তার জীবাশ্ম স্তন্যপায়ীর নমুনাগুলো পরীক্ষা করে প্রস্তাব করেন এগুলো দক্ষিন আমেরিকায় বসবাসকারী কিছু প্রাণীরই দানবীয় সংস্করণ; ইদুর জাতীয় প্রাণীর আকার প্রায় জলহস্তির মত আর পিপাড়া খেকো অ্যান্ট ইটার আকারে প্রায় ঘোড়ার সমতুল্য; কেন, ডারউইন ভাবতে শুরু করেন, একই ভৌগলিক এলাকায় বসবাসকারী জীবিত প্রাণীদের সাথে এইসব বিলুপ্ত প্রানীদের মধ্যে কেন এই যোগসূত্র বা একটি সম্পর্ক বিদ্যমান; তাহলে কি হতে পারে সব জীবিত প্রানীরা বিলুপ্ত প্রানীদের থেকে আকারে পরিবর্তিত হয়ে উদ্ভব হয়েছে?

ডারউইন তার গালাপাগোস থেকে আনা পাখিগুলো দিয়েছিলেন জন গ্যুল্ডকে, যিনি ছিলেন বৃটেনের একজন প্রথম সারির পক্ষীবিশারদ, ডারউইন যখন তাদের সংগ্রহ করেছিলেন, তখন তাদের বিষয়ে আলাদা করে তিনি কিছু ভাবেননি; কিন্তু যখন গ্যুল্ডকে জুওলজিক্যাল সোসাইটির একটি সভায় কথা বলতে শোনেন তিনি, সঠিকভাবে নোট না নেয়ার বিষয়টি নিয়ে অনুশোচনায় ভুগেছিলেন তিনি; তাদের ঠোট দেখে ডারউইন এই পাখিদের শনাক্ত করেছিলেন ফিন্চ, রেন আর ব্ল্যাক বার্ড হিসাবে, কিন্তু গ্যুল্ড তার পরীক্ষার পর ঘোষনা দেন এগুলো সবই আসলে ফিন্চ; শুধু তাদের ঠোটগুলো কারো রেন দের মত , কারো ব্ল্যাক বার্ড দের মত দেখতে, যা তাদের কোন নির্দিষ্ট ধরনের খাওয়া খেতে সহায়তা করে।

এবং পরে ডারউইন গ্যুল্ড এর সাথে দেখা করতে যান, গ্যুল্ড তাকে দেখান যে তিনি আরো বড় কিছু ভুল করেছিলেন, ডারউইন ঠিক মতো উল্লেখ করেননি কোন দ্বীপ থেকে তাদের বেশীর ভাগ সংগ্রহ করেছিলেন, কারণ তখন তার কাছে এটা গুরুত্বপুর্ণ মনে হয়নি; ঘটনাক্রমে তিনি শুধু নোট করেছিলেন, তিনটি মকিং বার্ড এসেছে তিনটি ভিন্ন দ্বীপ থেকে; এবং গ্যুল্ড তাকে দেখালেন, যে এই মকিংবার্ডগুলো আসলে তিনটি নতুন এবং ভিন্ন প্রজাতির সদস্য; ডারউইন অনুধাবন করতে পারলেন, নিশ্চয়ই কোনো একটি ব্যাপার আছে; তার ভাবনায় তখন প্রশ্ন, এত কাছাকাছি একটি জায়গায় কেন তিনটি ভিন্ন প্রজাতির মকিং বার্ড থাকবে?

?oh=6f8abc61633b814b5203e520d4d55826&oe=58ACBC36″ width=”500″ />
(ছবি:John Gould, ডারউইন গালাপাগোস থেকে আনা পাখিগুলো দিয়েছিলেন জন গ্যুল্ডকে, যিনি ছিলেন বৃটেনের একজন প্রথম সারির পক্ষীবিশারদ, ডারউইন যখন তাদের সংগ্রহ করেছিলেন, তখন তাদের বিষয়ে তিনি আলাদা করে কিছু ভাবেননি; কিন্তু যখন গ্যুল্ডকে জুওলজিক্যাল সোসাইটির একটি সভায় কথা বলতে শোনেন তিনি, সঠিকভাবে নোট না নেয়ার বিষয়টি নিয়ে অনুশোচনায় ভুগেছিলেন তিনি; তাদের ঠোট দেখে ডারউইন এই পাখিদের শনাক্ত করেছিলেন ফিন্চ, রেন আর ব্ল্যাক বার্ড হিসাবে, কিন্তু গ্যুল্ড তার পরীক্ষার পর ঘোষনা দেন এগুলো সবই আসলে ফিন্চ; শুধু তাদের ঠোটগুলো কারো রেন দের মত , কারো ব্ল্যাক বার্ড দের মত দেখতে, যা তাদের কোন নির্দিষ্ট ধরনের খাওয়া খেতে সহায়তা করে।)

তাহলে কি ভিন্ন প্রজাতির ফিন্চরাও ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপের অধিবাসী ছিল? ডারউইন ফিটজরয়ের সাথে যোগাযোগ করে অনুরোধ করেন, জাহাজের অন্যান্য নাবিকরা যে পাখিগুলো সংগ্রহ করেছিলেন তাদের কিছু নমুনা যেন গ্যুল্ডের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়; সৌভাগ্যক্রমে জাহাজের অন্যান্যরা ডারউইনের চেয়ে সতর্ক ছিলেন নমুনার বিবরণ নোট করার ব্যাপারে, তারা লিখে রেখেছিলেন কোন দ্বীপ থেকে তাদের সংগ্রহ করা হয়েছে; এবং ঠিক মকিং বার্ডের মতই বিভিন্ন দ্বীপের ফিন্চগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সদস্য।

?oh=026f3e90896fcef8f4bbe7b11531ea39&oe=58A2F457″ width=”500″ />
(ছবি: গালাপাগোসের ফিন্চরা..তারা ভিন্ন তাদের ঠোটে বা বীকের আকার, নীড় বানাবার জায়গা, খাদ্যাভাস দ্বারা।)

বিষয়টি ডারউইন অনুধাবন করতে পারলেন – একটি খটকার বিষয়, কেন এতগুলো স্বতন্ত্র প্রজাতির অস্তিত্ব থাকবে একই ধরনের দ্বীপগুলোতে; তিনি তার নোটবুক খুললেন এবং গালাপাগোসদের ফিন্চ সম্বন্ধে একটি ব্যাখ্যা খোজার চেষ্টা করতে শুরু করেন; তার চারপাশের মানুষগুলোর কাছে, ভূতত্ত্ব বিষয়ে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ডারউইনের কোন পরিবর্তন কারো নজরে পড়ে নি; তিনি একনিষ্ঠ মনে প্রবাল প্রাচীর, উত্থিত সমতল আর আগ্নেয়গিরির কোণাকৃতি শৃঙ্গ নিয়েই লিখছিলেন, কিন্তু তার গোপন ব্যক্তিগত জীবনে তিনি আচ্ছন্ন হয়েছিলেন একটি অসাধারণ ধারণায়; হয়তো ফিন্চগুলো বর্তমান এই রুপে সৃষ্টি হয়নি, হয়তো তারা বিবর্তিত হয়েছে।

/440px-Darwin’s_finches_by_Gould.jpg” width=”500″ />
(ছবি: ফিন্চ (চার্লস ডারউইনের 1839 Journal of Researches Into the Natural History and Geology of the Countries Visited During the Voyage of HMS Beagle Round the World, Under the Command of Captn. FitzRoy, R.N. থেকে)

যে ভূমিতে প্রজাতিদের বসবাস, সেই ভূখণ্ডে অবশ্যই চিরন্তনভাবে অপরিবর্তনীয় নয়; ডারউইনের ফিন্চরা এখন এমন কোনো দ্বীপে বাস করে যা কোনো একসময় সমুদ্রের মধ্যে জেগে উঠেছিল প্রাকৃতিক শক্তিতে, যখনই গালাপাগোস সাগর পৃষ্ঠের উপরে উঠে এসেছে, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে সাধারণ ফিন্চরা হয়তো এই দ্বীপে বসতি গেড়েছিল তারপর কোনো এক সময় এবং সময়ের পরিক্রমায় এদের বংশধররাই বিবর্তিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতিতে, তাদের বৈশিষ্ট্যসূচক শরীর সহ, যা এখন খাপ খাইয়ে নিয়েছে তাদের বৈশিষ্ট্যমূলক জীবনাচরণের সাথে; আদি নিবাসীদের বংশধররাই পৃথক পৃথক বংশধারায় শাখা প্রশাখার সূচনা করেছে; এই একই ভিন্ন ভিন্ন বংশধারায় শাখা প্রশাখা সৃষ্টি হবার ঘটনাও হয়তো ঘটেছে পাতাগোনিয়াতেও, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে? ডারউইন যে দানবাকৃতির স্তন্যপায়ীদের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছিলেন, তারাই সেখানকার বর্তমান ক্ষুদ্রকায় শরীরের স্তন্যপায়ীদের উদ্ভবের কারণ।


(ছবি: ডারউইনের B নোটবুকের ৩৬ তম পাতায় আকা জীবন বৃক্ষ, উপরে এক কোনে লেখা সতর্ক ডারউইনের মন্তব্য I think….)

তার নোটবুকে, ডারউইন একটি গাছের রেখাচিত্র আকেন, যেখানে পুরোনো প্রজাতি শাখা বিভক্ত হয়ে নতুন প্রজাতির সৃষ্টির করছে; তার নিজের ধারণাই তাকে রীতিমত শঙ্কিত করে তোলে, তার এই একাগ্র চিন্তা তার দ্রুত হৃদস্পন্দন আর পেটের ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়ায়, অজানা আশঙ্কায় তিনি ভুগতে থাকেন; মাঝে মাঝে অদ্ভুত স্বপ্নে তার ঘুম ভেঙ্গে যেত মাঝরাতে; তিনি জানতেন যে প্রাকৃতিক আইন ফিন্চ এবং স্তন্যপায়ীদের উপর কাজ করছে, সেই প্রাকৃতিক আইন অবশ্যই মানুষের উপরেরও কাজ করছে একইভাবে; তিনি মানুষকে জীবজগতে শুধু আরো একটি প্রজাতি সদস্য হিসাবে ভাবতে শুরু করেন, যদিও তাদের বাড়তি কিছু মানসিক দক্ষতা আছে।


(ছবি: গালাপাগোস এর ফিন্চরা, মুল দক্ষিন আমেরিকার ফিন্চ থেকেই বিবর্তিত হয়েছে গালাপাগোসের ফিন্চরা)

তার নোটবইতে তিনি লিখেছিলেন, ‘কোন একটি প্রাণীকে অন্য প্রাণী থেকে বিশেষ কোন উচ্চ অবস্থানে ভাবা বা এমনভাবে কিছু বলা আসলেই অর্থহীন, মানুষ প্রায়ই বুদ্ধিমান মানুষের আবির্ভাব হবার অসাধারণ চমকপ্রদ ঘটনার কথা বলে থাকেন – কিন্তু পতঙ্গদের আবির্ভাব অন্যার্থে আরো বেশী বিস্ময়কর, সারা পৃথিবীর ভরা অপুর্ব সুন্দর সাভানা আর জঙ্গল দেখে কে বলতে সাহস পায় বুদ্ধিমত্তাই হচ্ছে এই পৃথিবীর একমাত্র লক্ষ্য ? হয়তো মানুষও, ঠিক ফিন্চদের মতই বিবর্তন প্রক্রিয়ারই ফসল’।

জেনী নামে সদ্য সংগ্রহ করাএকটি ওরাং উটানকে দেখতে ডারউইন লন্ডন চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে তার মুখে ঠিক সেই অভিব্যক্তিগুলো লক্ষ্য করেছিলেন যা তিনি শিশুদের মধ্যেও দেখেছিলেন;

তার নোট বইয়ে তিনি লেখেন, এইপ থেকে মানুষ?

যদিও তার সমস্ত ধারণা তখনও ভ্রুণ পর্যায়ে, ডারউইন জানতেন তারা যথেষ্ট বিপদজ্জনক; মানুষ বিবর্তিত হয়েছে এমন কোন একটি ঘোষণা তাকে হয়তো চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে লাইয়েল এবং অন্যান্য প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের কাছ থেকে, যাদের তিনি শ্রদ্ধা করেন এবং যাদের উপর তার পেশাগত ভবিষ্যত নির্ভর করছে; তাসত্ত্বেও ডারউইন তার নোটবুকে লিখে যেতে থাকেন তার ভাবনাগুলো, ধীরে ধীরে বুনতে থাকেন তার তত্ত্বটিকে, এর স্বপক্ষে জমা করতে থাকেন প্রয়োজনীয় স্বাক্ষ্য প্রমাণগুলো।

ডারউইন সেই চিহ্নগুলো খুজতে থাকেন, কিভাবে বৈশিষ্ট্যগুলো এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয় এবং কিভাবে তারা পরিবর্তিত বা বিবর্তিত হয়; যারা বাগান করেন, চিড়িয়াখানার পশুপাখি সংরক্ষক, কবুতরের নানা জাত তৈরী করেন আর পালেন, তিনি এমন সবার সাথেই কথা বলেন; এমনকি তার চুল কাটতেন যিনি, তার কাছে কুকুরের নানা জাতের প্রজনন নিয়ে তিনি কথা বলেছেন । যদিও তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন প্রজাতি অপরিবর্তনশীল কোনো একটি অবস্থা না; তবে তার তখনও পর্যন্ত জানা ছিল না কি উপায়ে একটি প্রজাতি নতুন একটি রুপ নিতে পারে বিবর্তনের মাধ্যমে; লামার্ক দাবী করেছিলেন যে কোনো প্রানী তার জীবনকালে বদলে যেতে পারে, এবং তার অর্জিত নানা বৈশিষ্ট্যাবলী তার পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে পারে, কিন্তু তেমন কোনো স্বাক্ষ্য প্রমাণ ছিল না এটা আসলেই ঘটছে কিনা?

১৭৯৮ সালে থমাস মালথাস, গ্রামের একজন পাদ্রী, জনসংখ্যার মূলনীতি নিয়ে একটি রচনা লিখেছিলেন, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, কোন একটি দেশের জনসংখ্যা, যদি তা কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা না পায়, যেমন অনাহার বা ব্যাধি,কয়েক বছরের মধ্যেই তা বহু গুণে বেড়ে যাবে; যদি প্রতিটি দম্পতি চারটি করে সন্তান লালন করেন, তাহলে জনসংখ্যা খুবই সহজে দ্বিগুণ হবে ২৫ বছরে এবং এর পর থেকে এটি তার দ্বিগুণ হতে থাকবে, এটি ৩,৪,৫ এবং এভাবে গাণিতিক হারে বাড়বে না বরং বাড়বে, ৪,৮,১৬ এভাবে দ্বিগুন হারে।


(ছবি: থমাস রবার্ট মালথাস , Reverend Thomas Robert Malthus,1766 – 1834); জনসংখ্যা বৃদ্ধির উপর একটি লেখা An Essay on the Principle of Population ডারউইনকে অনুপ্রাণিত করেছিল প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটিতে পৌছাতে… পরে একই প্রবন্ধ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকেও অনুপ্রাণিত করেছিল একই উপসংহারে পৌছাতে।)

যদি কোনো দেশের জনসংখ্যা এভাবে বিস্ফোরিত হয়, মালথাস সতর্ক করেন, কোনো আশা করার উপায় নেই যে সেখানে খাদ্য সরবরাহ একই হারে বাড়বে, নতুন জায়গা পরিষ্কার করে হয়তো চাষাবাদও করা যেতে পারে, বা ফসলের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে, তবে এই বৃদ্ধি গাণিতিক, জ্যামিতিক না; আর অনিয়ন্ত্রিত কোনো বাধাহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি অবশ্যই দুর্ভিক্ষ আর দুর্ভোগের কারণ হবে; মানবতা যে এখনও বিরামহীন দুর্ভিক্ষাবস্থায় নেই এক একটিমাত্র কারণ হচ্ছে এর বৃদ্ধি সবসময় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে বেশ কিছু শক্তি যেমন, নানা অসুখ, শিশ মৃত্যু এবং এমনকি শুধুমাত্র মাঝ বয়স অবধি বিবাহ ঠেকিয়ে রেখে।

মালথাস বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন, যে শক্তি বা প্রজনন উর্বরতা এবং অনাহার কিংবা খাদ্য ঘাটতির যে নিয়ামকগুলো মানব জাতিকে প্রভাবিত করে, তারা প্রাণী এবং উদ্ভিদের উপর একই ভাবে প্রভাব ফেলে; যদি মাছিদের লার্ভা বা ম্যাগট উৎপাদন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়া অব্যাহত থাকে, কিছুদিনের মধ্যে সারা পৃথিবী আমাদের হাটু অবধি মাছির ম্যাগটে ভরে যাবে; বেশীর ভাগ মাছি ( এবং প্রতিটি প্রজাতির বেশীর ভাগ সদস্য) অবশ্যই কোন উত্তরসূরি না রেখেই মারা যায়।

ম্যালথাসেই এই উৎকন্ঠা উদ্রেককারী রচনাটিতে, ডারউইন তার বিবর্তন প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে পরিচালনাকারী শক্তি বা ইন্জিনটিকে খুজে পেলেন; সৌভাগ্যবান অল্প কিছু সদস্য যারা প্রজননে সফল হয়, তারা শুধুমাত্র ভাগ্য দ্বারা চিহ্নিত হয়নি; কোনো কোনো সদস্যদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা ট্রেইট থাকে যা তাদের বিশেষ কোনো অবস্থায় ভালোভাবে টিকে থাকতে ( বাঁচা এবং প্রজনন) সহায়তা করে; হতে পারে এরা প্রাণী বিশেষে আকারে বড় হতে পারে, কিংবা কোনো পাখির ক্ষেত্রে তাদের হয়তো বিশেষভাবে সরু ঠোট থাকে, বা অন্য কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রে যার গায়ে বাড়তি মোটা লোমের স্তর আছে; এবং এই সব ক্ষেত্র গুলোতে প্রজাতির যে সদস্যরা এই বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে জন্ম নেবে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা বংশধর রেখে যাবার সম্ভাবনা প্রজাতির অন্যান্য দুর্বল সদস্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশী, এবং যেহেতু বংশধররা তাদের পিতামাতার মত হয়, তারাও তাদের টিকে থাকার বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের পরবর্তী প্রজন্মেও হস্তান্তর করবে।

এই ভারসাম্যহীনতা সম্ভবত খুব সামান্য হতে পারে, যা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সহজে চোখে পড়েনা; কিন্তু সহজে বোঝা যায় না এধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন যা পর্বত তৈরী করতে পারে, তা ডারউইন ইতিমধ্যেই স্বাচ্ছন্দের সাথে বুঝতে পেরেছিলেন; এখানে সেই সুবিশাল পর্বতই তৈরী হচ্ছে তবে তার প্রকৃতি হচ্ছে জৈববৈজ্ঞানিক; যদি পাখিদের কোনো একটি জনগোষ্ঠী গালাপাগোস দ্বীপে এসে বসতি গড়ে, সেই গোষ্ঠীর যে সদস্যরা সেই বিশেষ দ্বীপের পরিবেশের জীবনের সাথে সবচে বেশী মানানসই তারাই টিকে থাকবে এবং পরবর্তী বংশধর প্রজননে সক্ষম হবে; এবং যথেষ্ট পরিমান সময়ের পরিক্রমায় এই পরিবর্তনগুলোই সৃষ্টি করতে পারে নতুন কোন প্রজাতি।

কৃষকরা যেভাবে তাদের ফসলের রক্ষণা বেক্ষণ করেন সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে ডারউইন একটি ভালো অ্যানালোজী বা তুলনা খুজে পেলেন; কৃষকরা তাদের ফসল ব্রীড বা চাষ করেন প্রতিটি শস্যবাহী গাছ কেমন হয় তাদের পরস্পরের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে, তারপর তারা সবচেয়ে ভালো গাছগুলো থেকেই বীজ সংগ্রহ করেন পরবর্তী প্রজন্মের চাষের সময়; এবং এই ভাবে কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে যথেষ্ট পরিমান ধারাবাহিক ব্রীডিং করার প্রক্রিয়ায় একটি সময় অন্যান্য প্রকারের ফসলের চেয়ে এটি একটি স্বতন্ত্র ফসলে পরিণত হয়; কিন্তু প্রকৃতিতে কোন খামারী বা চাষী নেই; সেখানে শুধু প্রানী আর উদ্ভিদের প্রজাতির নানা সদস্যরা আছে, যারা একে অপরের সাথে দ্বন্দ্বরত টিকে থাকার জন্য, আলো বা পানি বা খাদ্যের জন্য; এই পক্রিয়ায় তারা একটি নির্বাচনের মধ্যে দিয়েও অতিক্রম করে; যে নির্বাচন হয় কোনো একক নির্বাচক ছাড়াই; ফলাফলে, ডারউইন শনাক্ত করেছিলেন, জীবিত সব জীবের মধ্য দৃশ্যমান সব ডিজাইন সৃষ্টি হতে পারে প্রাকৃতিকভাবেই, যেখানে কোন একক সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির জন্য কলকাঠি নাড়ার কোন প্রয়োজন নেই;

এ যেন হত্যার অপরাধ স্বীকার করার মত:

নোট বইয়ে নিজের বৈপ্লবিক আর হেরেসি বা বৈধর্মের মত ধারণাগুলো লিখে রাখার ফাকে ফাকে ডারউইন কিছুটা সময় নিয়েছিলেন তার জীবনসঙ্গীনি খোঁজার জন্য; তার বিগল যাত্রার বেশ আগে ডারউইন তার কৈশোরে একজনের প্রেমে পড়েছিলেন, তার নাম ছিল ফ্যানি ওয়েন (ফ্যানি ওয়েন ডারউইনের স্কুলের সহপাঠী উইলিয়াম ওয়েন এর বোন); কিন্তু ডারউইনের সমুদ্রযাত্রার অল্প কিছুদিনের মধ্যে ফ্যানী অন্য একজনের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহন করেছিলেন; ইংল্যাণ্ডে ফিরে ডারউইন ভাবতে শুরু করেন, তার কি আদৌ বিয়ে করা উচিৎ হবে কিনা; নিয়ম মানা বিজ্ঞানীদের মত তিনি একটি কাগজে বিয়ে করার পক্ষে বিপক্ষে একটি তালিকা তৈরী করেন, উপরে বা দিকে বিয়ে করার সুবিধা ( বা টু ম্যারী), ডান দিকে অসুবিধা ( নট টু ম্যারী) এবং মাঝখানে লেখেন, দিস ইস দ্য কোয়েশ্চেন, তালিকা সহ একটি ব্যালান্স শীট তৈরী করেন ডারউইন; এই তালিকায় দেখায় যায় ডারউইন বিয়ের বিপক্ষে যুক্তি হিসাবে লিখেছেন, একা থাকলে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার বেশী সময় পাবেন, ক্লাবে পুরুষ সহকর্মীদের সাথে বেশী সময় আলোচনা করে কাটাতে পারবেন, এছাড়া সন্তান প্রতিপালন করার মত অর্থ সামর্থ্য তার নেই; অন্যদিকে বিয়ের স্বপক্ষে যুক্তি হলো, একজন স্ত্রী তার বৃদ্ধ বয়সে সারাক্ষণ সঙ্গী হবে; এধরনের তালিকার নীচে সব যোগ বিয়োগ করে তিনি তার উপসংহারে পৌছান: বিয়ে –বিয়ে –বিয়ে অতঃসিদ্ধ।

?oh=5122731198d40e64bdd862172681bf6e&oe=58A4BECB” width=”500″ />
(ছবি: ফ্যানি ওয়েন, ডারউইনের প্রথম ভালোবাসা, স্কুলের এক সহপাঠীর বোন, উচ্ছল, চঞ্চল ফ্যানি ডারউইনকে তার মা হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন; ডারউইনের দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার সময় তিনি অন্য আরেকজনের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহন করেন, সেকথা অবশ্য ডারউইনকে প্রথম জানিয়েছিলেন তিনি একটি চিঠিতে : “Believe me Charles that no change of name or condition can ever alter or diminish the feelings of sincere regard and affection I have for years had for you… ; ডারউইন পরবর্তীতে তারা মামাতো বোন এমাকে বিয়ে করেছিলেন ১৮৩৯ সালে।)

জীবন সঙ্গীনি হিসাবে ডারউইন নির্বাচন করেন তার মামাতো বোন এমা ওয়েজউডকে; তার কোনই ইচ্ছা ছিল লণ্ডনে পরিচিত হওয়া অভিজাত হাল ফ্যাশনের কোনো নারীকে তার জীবনে আনার, বরং তিনি তার মায়ের ভাইঝির দিকেই নজর দিয়েছিলেন, যে তার মত গ্রাম্য পরিবেশেই বড় হয়েছে; এমা ইতিমধ্যেই ডারউইনকে পছন্দ করতে শুরু করেছিলেন, যখন ওয়েজউড হাউসে প্রায়ই ডারউইন বেড়াতে যেতেন; তার প্রতি ডারউইনের এই বিশেষ মনোযোগে এমাও খুশী হতেন, যদি ডারউইন পরোক্ষভাবে উচ্চারিত নানা অস্পষ্ট শব্দমালা বা বিব্রত ইতস্তত কিছু আচরণ ছাড়া তেমন কিছু করতে সক্ষম হননি এমার মন জয় করার প্রক্রিয়ায়; সে কারনেই এমা পুরোপুরি অপ্রস্তুত ছিলেন, যখন নার্ভাস ডারউইন একদিন কোনো মতে সাহস করে বলে ফেলেন যে তিনি তাকে বিয়ে করতে চান, এমা হ্যা বলেছিলেন কিন্তু তিনি এতই অবাক হয়েছিলেন, এর পর কোন কথা না বলেই তিনি তার রোববারের স্কুলে ক্লাস নিতে উঠে যান।

কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি এমা ডারউইনের মত পুরোপুরি ‘ভদ্র আর মিষ্টি স্বভাব’ এর একটি মানুষকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন সেই আনন্দটা অনুভব করতে শুরু করেন; অন্যদিকে ডারউইন চিন্তিত ছিলেন বিগলে তার সেই সময়টা তাকে কতটা অসামাজিক করে দিয়েছে বিয়ের মতো কোন সামাজিক আচারণের জন্য, কিন্তু এমাকে বিয়ে করছেন এই বোধটি তাকে বেশ আশাবাদী করে তুলেছিল; তিনি এমাকে লিখেছিলেন, ’আমি মনে করি তুমি আমাকে মানুষে রুপান্তরিত করতে পারবে এবং শীঘ্রই আমাকে শেখাবে পারবে নীরবে এবং একাকীত্বে কোনো তত্ত্ব নির্মাণ ও তার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ একত্রিত করার চেয়ে বড় অন্য কোনো সুখও আছে।’


(ছবি: এমা ওয়েজউড, ডারউইনের জীবন সঙ্গীনি (Emma Darwin (née Wedgwood) (2 May 1808 – 7 October 1896); ১৮৩৯ সালে ২৯ জানুয়ারী তাদের বিয়ে হয়েছিল; ডারউইন এবং এমা মোট দশটি সন্তানের জনক জননী ছিলেন, যাদের তিন জন শৈশবে মারা গিয়েছিলেন।)

এমার চিন্তা শুধু একটাই যখন ডারউইন প্রকৃতি নিয়ে এবং এটিকে নিয়ন্ত্রন করা সম্ভাব্য নিয়মাবলী বা সূত্র নিয়ে কথা বলেন; এমা একজন নিবেদিত প্রাণ ধার্মিক অ্যাঙলিকান, সহজেই বুঝতে পারেন যে বাইবেল নিয়ে চার্লস এর সন্দেহ আছে; তিনি ডারউইনকে লিখেছিলেন, ‘আমার জন্য একটি কাজ করবে?’ তিনি তাকে জনের গসপেল থেকে খানিকটা অংশ পড়তে বলেন: ‘আমি একটি নতুন আদেশ তোমাদের উপর ন্যস্ত করছি, তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে; যেমন আমি তোমাদের ভালোবেসেছি, তেমন তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে,’ যদি ভালোবাসা দিয়ে শুরু করে, ডারউইন হয়তো সত্যিকারের খ্রিস্টান হতে পারবেন।

তিনি এমাকে প্রতিজ্ঞা করেন এবং বলেন যে আসলেই বিষয়টিকে তিনি বেশ আন্তরিকভাবেই অনুভব করেছন; কিন্তু সেই সময়ে তার নোটবুকে চোখ রাখলেই বলা সম্ভব তিনি বিষয়টি নিয়ে ঠিক পুরোপুরি সততার সাথে তার সত্যিকারের মনোভাব ব্যক্ত করেননি এমার কাছে; তিনি ভাবছিলেন, সত্যিকার কোনো ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা চেয়ে বরং ধর্ম কি আসলেই প্রবৃত্তিগত কোনো ব্যাপার যাকে আমরা বলি ইন্সটিংক্ট ? এমার জন্য তার ভালোবাসাই তাকে বাধা দিয়েছিল তার সব চিন্তার কথা এমাকে বিস্তারিত জানানোর ক্ষেত্রে।

বিয়ের পর চার্লস এমাকে নিয়ে লন্ডনে চলে আসেন, এবং একটি স্বাচ্ছন্দময় একঘেয়েমীর দাম্পত্য জীবনে তারা অবশেষে স্থির হয়েছিলেন; তার স্বামীর আত্মা নিয়ে এমার চিন্তা অবশ্য অব্যাহত থাকে; এবং এসময় তিনি আরো চিঠি লিখেছিলেন; ১৮৩৯ সালে একটি চিঠিতে তিনি তার উৎকন্ঠা প্রকাশ করেন যে, ‘চার্লস প্রকৃতির সেই অন্তর্গত সত্যটাকে খোজার জন্য এত বেশী মোহাবিষ্ট ও আচ্ছন্ন হয়ে আছেন যে তিনি অন্য কোন সত্যকে দেখতে পাচ্ছেন না, যে সত্য শুধুমাত্র ধর্মই পারে উন্মোচন করতে’; আর শুধু যা কিছু প্রমাণ করা যায় শুধু সেগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবার কারনে তিনি, ‘সেই সব বিষয়গুলো মেনে নিতে পারছেন যেগুলো কিনা একইভাবে প্রমাণ করা সম্ভব না কিংবা যদি তা সত্য হয়, সেগুলো আসলেই আমাদের বোঝার ক্ষমতারও বাইরে।’তিনি চার্লসের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন, তিনি যেন ভুলে না যান, যীশু খিস্ট্র তার জন্য এবং পৃথিবীর বাকী সবার জন্য কি করেছিলেন; কোনো উ্ত্তর ছাড়াই ডারউইন এমার এই সেই চিঠিটাকে সরিয়ে রাখেন, যদিও চিঠিটির কথা তিনি তার সারা জীবন মনে রেখেছিলেন।

১৮৩৯ সালে ডারউইন ”জার্নাল অব রিসার্চেস ইনটু ন্যাচারাল হিস্টোরী অ্যান্ড জিওলজি অব দ্য কান্ট্রিস ভিসিটেড ডিউরিং দ্য ভয়েজ অব এইচএমএস বিগল অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্লড,আন্ডার দ্য কমান্ড অব ক্যাপ্টেন ফিটজরয়, আর এন (Journal of Researches into the Natural History and Geology of the Countries Visited During the Voyage of HMS Beagle Round the World, Under the Command of Captn. FitzRoy, R.N) প্রকাশ করেন;

ডারউইনের এই বইটি খুবই আলোচিত ও সফল হয়েছিল প্রকাশের সাথে সাথেই, এবং এটি ব্রিটেনে অন্যতম সেরা একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে ডারউইনের সুনামকে করেছিল নিশ্চিৎ; ততদিনে চার্লস এবং এমা বিবাহিত জীবন কেটেছে প্রায় তিন বছর এবং তাদের দুটি সন্তানও আছে, এবং এসময়টাতেই তারা সিদ্ধান্ত নেন, এবার লন্ডন ছেড়ে শহরের বাইরে কোথাও চলে যাবেন; লন্ডনের শহুরে ব্যস্ততা, হ্ট্টগোল, অপরাধ, কয়লার ধুলা যা তাদের কাপড়কে কালো করে দিত, বা ঘোড়ার গোবর যা তাদের জুতার সাথে লেগে যেত, কোনটাই তাদের আর সহ্য হচ্ছিল না, নিজেরা যেমন গ্রামের অকলুষিত পরিবেশে মানুষ হয়েছিলেন, তাদের সন্তানদেরও সেই পরিবেশে মানুষ করার সিদ্ধান্ত নেন ডারউইন দম্পতি; লন্ডন থেকে ১৬ মাইল দুরে কেন্টে ১৮ একরের একটি ফার্ম, ডাউন হাউসকে বেছে নেন তারা; এখানে এসেই ডারউইন পুরোদস্তুর খামারী হয়ে যান, ফসলের চাষ করেন, গরু এবং ঘোড়া কেনেন; বৈজ্ঞানিক সমাজে মেলামেশা পুরোপুরি তিনি বন্ধ করে দেন।

?oh=a10498c927dc9993ee6b45e7c11f3242&oe=58A89507″ width=”500″ />
(ছবি:ডাউন হাউস, কেন্ট, এখানে ডারউইন তার জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছিলেন, বর্তমানে এটি একটি মিউজিয়াম।)


(ছবি: ডাউন হাউসে ডারউইনের স্টাডি)

খুব সাবধানে বাছাই করা সপ্তাহ অন্তের কয়েকজন অতিথি ছিল তার লন্ডনে ফেলে আসা বৈজ্ঞানিক সমাজের সাথে একমাত্র যোগসূত্র, এধরনের ঘনিষ্ট কিছু মানুষের মাধ্যমেই তিনি বিজ্ঞানের নতুন বিষয়গুলোর খবরাখবর পেতেন; কাছের মানুষ প্রিয় বড় ভাই ইরাসমাস লন্ডন ছেড়ে তার ছোট ভাই এর সাথে দেখা করাটা কাজটি একেবারেই পছন্দ করতো না, তিনি ডারউইনের প্রিয় ডাউন হাউসকে বাসাটিকে ঠাট্টা করে বলতেন Down at the Mouth; এই পুরো সময় জুড়ে বিবর্তনের তত্ত্বটি নিয়ে তার ভাবনাগুলো গোপনে অব্যহত ছিল কিন্তু নিরবিচ্ছিন্নভাবে; প্রাকৃতিক নির্বাচনের স্বপক্ষে একটি যুক্তি তর্ক সম্বলিত একটি প্রস্তাবনাও তিনি লেখা শুরু করেন, ১৮৪৪ সালে সেটি শেষ হবার পর, তিনি বুঝতে পারছিলেন না এর পর কি করবেন তিনি; বিষয়টি নিয়ে তিনি কারো সাথেই আলাপও করতে চাইছিলেন না কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে কিভাবে কথা বলবেন ; তার তত্ত্বটির সমর্থনে তিনি বহু মানুষর কাছ থেকে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাদের কাউকে জানাননি কেন এসব তথ্য তার আসলে দরকার;

?interpolation=lanczos-none&downsize=660:*” width=”500″ />
(ছবি: ডাউন হাউসের পাশেই ডারউইনের বানানো হাটা ও চিন্তা করার পথ, স্যান্ড ওয়াক, এখানে হাটতে বের হয়ে তিনি ভাবতেন। এই রাস্তাটি তৈরী করা অনুপ্রেরণা ছিল তার মা, যাকে খুব শৈশবেই তিনি হারিয়েছিলেন।)


(ছবি: ডাউন হাউসে জোসেফ হুকার, চার্লস লাইয়েল এবং চার্লস ডারউইন, ডারউইনের খুব ঘনিষ্ঠ দুজন বৈজ্ঞানিক সহযাত্রী;)

যে বালকটি এক সময় তার বাবাকে ভীষণ ভয় পেত বলতে যে, সে কখনো ডাক্তার হতে পারবে না, সেই ছেলেটি তখন রুপান্তরিত হয়েছিল প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষে, যিনি তার বিপদজ্জনক ধারণাটিকে কাউকে জানাতে শঙ্কা বোধ করতে শুরু করেছিলেন।

কিন্তু অবশেষে কাউকে না কাউকে তো তাকে বলতেই হবে, আর সেটা করতে গেলে তাকে এমন বৈজ্ঞানিক মনস্ক কাউকে খুজে বের করতে হবে যারা তার কাজ সম্বন্ধে যোগ্য মন্তব্য করতে পারবেন, আর যদি তিনি কোন বড় ভুল থাকেন যা অবশ্য তাদের চোখ এড়াবে না; তিনি জোসেফ হুকার নামের একজন তরুন উদ্ভিদবিদকে প্রথমে নির্বাচন করলেন, যিনি এর আগে বিগল অভিযানের সময় তার নিয়ে আসা উদ্ভিদের নমুনা গুলো পরীক্ষা করেছিলেন, এবং যাকে ডারউইনের যথেষ্ট খোলা মনের একজনই মনে হয়েছিল, যে তাকে অন্তত ব্লাসফেমার বা ধর্ম নিন্দাকারী মনে করবেন না; তিনি হুকারকে চিঠি লেখেন:

‘ফিরে আসার পর থেকেই আজ অবধি আমি খুব বড় একটি সাহসী বা বলা যায় ধৃষ্ঠতাপুর্ণ কাজের সূচনা করেছিলাম এবং আমার আসলেই এমন আর কাউকে জানা নেই, সব শুনবার পর যিনি বলবেন না, কাজটি খুব বেশী নির্বোধতুল্য হয়ে গেছে; গালাপাগোসে জীবজন্তুদের বিস্তারের বিষয়টিতে আমার দৃষ্টি এতবেশী আকর্ষণ করেছিল যে, আমি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলাম একনিষ্ঠভাবে দৃঢ়চিত্তে আমি যাবতীয় সব তথ্য সংগ্রহ করবো যা প্রজাতি আসলে কি সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে আমাদের; আমি অসংখ্য কৃষিবিদ্যা এবং উদ্যানবিদ্যার বই পড়েছি এবং কখনোই প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা স্তগিত করিনি; অবশেষে আমি কিছুটা আলোর দেখা পেয়েছি এবং প্রায় স্থির একটি সিদ্ধ‍ান্তে পৌছাতে পেরেছি ( যা শুরুর সময়কালীন আমার ধারণার সম্পুর্ণ বীপরিত প্রমাণিত হয়েছে) যে, প্রজাতিরা ( এটি অনেকটা কোন হত্যার দায় স্বীকার করার মত) অপরিবর্তনীয় নয়, আমি মনে করি আমি একটি সহজ উপায় ( আর এখানেই মনে হতে পারে আমার প্রধৃষ্ঠতা!) খুজে পেয়েছি কিভাবে প্রজাতিগুলো এত অসাধারণ সুচারুভাবে নানা পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হয়; আপনি হয়তো হতাশায় আর্তনাদ করে উঠবেন এবং নিজের মনে ভাববেন, ’হায় কি এক মানুষের জন্য আমি সময় আর লেখা অপচয় করছি;’ পাঁচ বছর আগে এমনকি আমি যেমনটা ভাবতাম; ডারউইন যেমন আশা করেছিলেন, হুকারও ঠিক তেমনই একজন খোলা মনের মানুষই ছিলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত হবো কিভাবে পরিবর্তন ঘটেছে প্রজাতিতে সে বিষয়ে আপনি কি ভাবছেন তা যদি আমি শুনতে পারি’ তিনি প্রত্যুত্তরে লিখেছিলেন,‘যেহেতু বর্তমান প্রস্তাবিত কোন ধারণাই এ বিষয়ে আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।’


(ছবি: চার্লস ডারউইন এবং এমা ওয়েজউড.. বার্ধক্যে; ডাউন হাউসে ডারউইন দম্পতির এই প্রতিকৃতিটি একেছেন অজানা একজন শিল্পী; ছবিটি আরো কিছু প্রতিকৃতির সাথে সংরক্ষিত আছে Bridgeman Art Library তে)

ডারউইনের জন্য হুকার এর এই উত্তরটি যথেষ্ট ছিল এর কয়েক মাস পরে এমাকে তার প্রবন্ধটি প্রথম দেখানোর জন্য সকল ইতস্ততা কাটিয়ে উঠতে; তিনি জানতেন এটি পড়ে এমা বেশ অস্থির হয়ে পড়তে পারেন, কিন্তু তিনি চাইছিলেন যদি তার মৃত্যু হঠাৎ করে কিংবা তাড়াতাড়ি ঘটে যায়, তাহলে যেন এমা তার মৃত্যুর পর যেন এই প্রবন্ধটি প্রকাশ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করেন। এমা প্রবন্ধটি পড়েছিলেন, এবং পড়ে তিনি আবেগ তাড়িতও হননি, শুধু যে জায়গাগুলোতে ডারউইনের লেখা খানিকটা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সে জায়গাগুলো তাকে চিহ্নিত করে দেন; পান্ডুলিপির যেখানে ডারউইন লিখেছিলেন, তিনি কল্পনা করতে পারেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এমনকি চোখের মত জটিল কিছু তৈরী করতে পারে, সেখানে এমা লিখেছিলেন, ‘বেশ বড় একটি অনুমান’।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

34 + = 36