“ভাই একটু থামেন অনেক কোপাইছেন” ও আমাদের শিশুরা

অফিস থেকে ফিরে বাবুল ভাই বসেছেন খাবার টেবিলে। বাবুল ভাইর সাত বছরের ছেলে তুর্যর সাথে তার দেখা হয় রাতের ওটুকু সময়ই। বাবা যখন খেতে বসে তুর্যও বসে পাশের চেয়ারে। স্কুলে কি হয়েছে, স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে সে নতুন কি কি দেখেছে, বন্ধুর কোন খেলনাটা ওর ভীষণ পছন্দ হয়ে এগুলো নিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এক আলোচনা হয় বাবা ও ছেলের। আজকেও তার ব্যতিক্রম হল না। বাবুল ভাই খাচ্ছেন এমন সময় তুর্য এসে বলল- ‘ভাই অনেক কোপাইছেন এবার থামেন’। বাবুল ভাই এতটাই হতভম্ব ছেলের কথা শুনে যে প্রায় এক মিনিট কোন কথা বলতে পারলেন না। এরপর সে ক্ষেপে উঠলো মিলি ভাবির ওপর। ধমকের সুরে জানতে চাইলেন, ছেলে কাদের সাথে মেশে- কি শেখে এগুলোর খবর কেন ভাবী রাখেনা? ভাবিও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। সত্যিই তো কি শিখছে এসব! ভাবি তুর্যকে কোলের কাছে নিয়ে জানতে চাইলেন, বাবা তোমাকে কি শিখিয়েছে এটা? তুর্য জবাব দিলো টিভিতে দেখেছি আম্মু, কিছু খাওয়াকে কোপানো বলেছে। বাবুল ভাই আর ভাবি মিলে আবিস্কার করলেন ছেলের কথার সত্যতা। ওটা প্রান জিরা পানির বিজ্ঞাপন। ওখানে দেখা যাচ্ছে এক লোক খাচ্ছে হঠাৎ একটা কণ্ঠ বলে উঠলো ‘ভাই অনেক কোপাইছেন এবার একটু জিরান, নেন প্রান জিরাপানি খান। বাবুল ভাই মারাত্মক এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাচ্চাকে বোঝালেন বাবা ওটা পচা কথা, তুমি ওটা আর বলবেনা। তুর্য হয়ত বাবার সামনে ওটা আর বলবে না কিন্তু স্কুলে বন্ধুবান্ধবের সামনে ঠিকই বলবে। কারণ সে শিখে ফেলেছে খাওয়া মানে কোপানো।

এবার আমার গল্প শুনুন। আমার ভাগ্নী জয়ীর বয়স আড়াই বছর। আমি বাসায় ফিরে কলিংবেল বাজালে সে ব্যাল্কনিতে দৌড়ে আসে আর বলে মামা তকবিন অনিতো? এর শুদ্ধ উচ্চারণ হবে মামা, চকোবিন এনেছো? সেদিনও আমি কলিংবেল বাজালাম, জয়ী ব্যাল্কনিতে এসে বলছে তুই একতা ভাকামা। জানেন ভাকামা মানে কি? ভাকামা মানে হল ভাদাইম্যা। যে শব্দটা সে শিখেছে প্রান আর এফ এল চেয়ারের বিজ্ঞাপন থেকে। সেখানে মোশারেফ করিমের মা তাকে বলছে তুই একটা ভাদাইম্যা। জয়ী এ শব্দটা শিখেছে আমি মেনে নিতে পারিনি। ভেতরে ভেতরে খুব ফুঁসছিলাম, কিন্তু কিছুই করার ছিল না। কারণ যেহেতু বিজ্ঞাপনটা বানানো হয়েছে সেহেতু টিভি খুললে বিজ্ঞাপনটা চলবেই। আর টিভি চললে জয়ী শিখবেই, শিখবে হাজার হাজার জয়ীরা। এভাবে প্রান আমার ভাগ্নীকে, আপনার মেয়েকে বিজ্ঞাপনের নামে গালাগাল শেখাবে আর দিনের পর দিন নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে আমাকে, আপনাকে!

অধঃপতনের শুরুটা হতে দেখেছি মোবাইল ফোন কোম্পানি রবির হাত ধরে। তারা একটা বিজ্ঞাপন বানায় সেখানে দেখা যায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের পেসার রুবেল হোসেন বল করে স্ট্যাম্প ভেঙে দিয়ে বলছে “এবার ডাইরেক্ট ভাইঙ্গা দিমু”। বেশ জনপ্রিয় হল বিজ্ঞাপনটা। বাসের হেল্পার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সবার মুখে মুখে জায়গা পেল রবিনির্মিত ওই বিজ্ঞাপনের ভেঙে দেওয়ায় বানীটি। ক্রিকেট ক্রেজ যে বাঙালির কি পরিমানে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বড়রা ভেঙে দেওয়ার কি মানে বুঝেছে সেটা জানিনা কিন্তু বাচ্চারা শিখলো কোন কাজ শেষ বীরোচিত ভাবে শেষ করার মানেই মনে হয় ভেঙে দেওয়া। জানেন তো শিশুদের ভেতরে বীর হওয়ার প্রবনতা মারাত্মক। এ বিজ্ঞাপনটা বের হওয়ার মাস দুয়েক বাদে আমার প্রিয় প্রবীর স্যারের নাতীর জন্মদিনে গেলাম। পৌঁছাতে একটু দেরিই হল। গিয়ে দেখি কেক কাঁটা শেষ। নিষাদ আবার আমার বেশ ন্যাওটা। ক্লাশ ফাইভে পড়ে। আমি ওর জন্য উপহার হিসেবে নিয়েছিলাম একটা সিএ ব্রান্ডের ব্যাট আর পাঁচটা লন টেনিস। আমি জানতাম এটা পেলে নিষাদ যতটা খুশি হবে ততটা খুশি অন্য কোন উপহারে হবেনা। ওর হাতে ব্যাট বল তুলে দিতেই ও আনন্দিত হয়ে বলল “ ইয়াহু এবার ডাইরেক্ট ভাইঙ্গা দিমু” ওর বাবা-মা ব্যাপারটা না বুঝেই ওকে ধমক দিলো আর আমি তখন সামান্য দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইউটিউবে রুবেলের বিজ্ঞাপনটা দেখালাম। বিজ্ঞাপনটা শেষে স্যার আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, রুচিহীনতার কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছি আমরা?
আমি উত্তর দিয়েছিলাম, তলানিতে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on ““ভাই একটু থামেন অনেক কোপাইছেন” ও আমাদের শিশুরা

  1. টেলিভিশনে প্রদর্শিত বস্তুসমূহ
    টেলিভিশনে প্রদর্শিত বস্তুসমূহ থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যতটা সম্ভব সুরক্ষা করার জন্য ইউরোপ ও নর্থ আমেরিকাতে শো এর সময় বরাদ্দের জন্য নামওয়ালা টাইমস্লট আছে (প্রাইমটাইম, ম্যাটিনি, লেটনাইট)। যেসব অনুষ্ঠান কম জনপ্রিয় কিংবা অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য না, সেগুলো ভোর সকাল ও গভীর রাতের টাইমস্লটে ফেলা হয়। বাংলাদেশের সেন্সরবোর্ড এরকম কোনো সিস্টেম ব্যবহার করেনা, টিভি খুললে বোঝা যায়। (২০১১ সালে জানা)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − = 42