রুপ ও বৈচিত্র্যে মুখরিত আমাদের সুন্দরবন

বাংলায় “সুন্দরবন”-এর আক্ষরিক অর্থ “সুন্দর জঙ্গল” বা “সুন্দর বনভূমি”। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে “সমুদ্র বন”(প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে।দুই প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশটি ( ৬২%) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বে বালেশ্বর নদী আর উত্তরে বেশি চাষ ঘনত্বের জমি বরাবর সীমানা। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বনের উপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এর মোট ভূমির আয়তন ৪,১৪৩ বর্গ কি.মি. এবং নদী ও খালসহ বাকি জলধারার আয়তন ১,৮৭৪ বর্গ কি.মি. । সুন্দরবনের নদীগুলো নোনা পানি ও মিঠা পানি মিলন স্থান। সুতরাং গঙ্গা থেকে আসা নদীর মিঠা পানির, বঙ্গপোসাগরের নোনা পানি হয়ে ওঠার মধ্যবর্তী স্থান হলো এ এলাকাটি। এটি সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী অঞ্চল জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশে। দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদচারণে মুখরিত হয়ে উঠে সুন্দরবন। দূরত্বের দিক দিয়ে মোংলা থেকে নদীপথে সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে সুন্দরবনের করমজল পর্যটনকেন্দ্র। সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পটের মধ্যে করমজলই সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিত দর্শনার্থীদের কাছে। এখানে রয়েছে হরিণ ও বানরের বিচরণস্থল, সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার, কুমির ও কচ্ছপের প্রজননকেন্দ্র, ডলফিন এবং অন্যান্য বন্য প্রাণীর প্রতিকৃতিসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থাপনা। করমজল ছাড়াও হারবাড়িয়া, হিরণ পয়েন্ট, কটকা, কচিখালী ও দুবলার চরে ভ্রমণে যাচ্ছেন পর্যটকরা। সুন্দরবনে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নদীতে পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বাঘ, কুমির, বানর, বিষধর সাপ, হিংস্র প্রাণীর দর্শনলাভের প্রত্যাশায় সুন্দরবনে ভ্রমণে আসেন অসংখ্য পর্যটক। সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এই বনভূমি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র মোহনায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০০০০ বর্গ কি.মি। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশের আয়তন প্রায় ৬,০১৭ বর্গ কি.মি। বনভূমিটি, বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। এছাড়া এই বনভূমিতে বিখ্যাত সুন্দরী ও গোলপাতা গাছও পাওয়া যায়। এই বনের মৌমাছিদের তৈরি মৌচাক থেকে প্রচুর মধু সংগ্রহ করা হয় । পুরো পৃথিবীতেই আমাদের এই বনের চর্চা রয়েছে, প্রতি বছর সুন্দরবন দেখতে বাইরের দেশ থেকে হাজার হাজার লোক আসে, আর আমরা কিনা আমাদের এই অমূল্য সম্পদটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে রাখতে পারছি না। বিশেষ করে আমাদের দেশের সরকারের উচিত যে বনজ সম্পদ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন আরও জোরদার ও কঠোর করা। আর আমরা যারা সুন্দরবনে ঘুরতে যাই তাদেরও সতর্ক থাকা উচিত যে আমরা যেন মজার ছলে বা হেলা-ফেলা করে এর বনজ সম্পদ ও বন্য প্রাণীর জীবনের কোনো ক্ষতি না করি; অন্যদেরকেও এই বিষয়ে সতর্ক করতে পারি কারণ প্রতি বছর এই কারণেই অনেক পশু-পাখি মারা যায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2