অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০২

বিশেষজ্ঞ টিমের তৎপরতায় ডাকা হলো গণিতবিদদের। তারা ১৯৮৬’র মিশিগানের, আর ১৯৮৯’র কোলকাতার জল-মাটিকে একাকার করে শুরু করলো স্কান। কিন্তু যেহেতু অমৃতা ও মির্চার কোন ‘ডিএনএ’ স্যাম্পল রক্ষিত ছিলনা ৩০১৬’র ‘হিউমান প্রডাকশন ল্যাবে’। তাই কয়েক হাজার রোমানিয়ান ‘মির্চা এলিয়াদ’ ও কোলকাতার হাজারো ‘অমৃতা’ নামীয় ডিএনএ-তে ভরে গেল ল্যাবের রক্ষণাধারগুলো। হাজার হাজার সংগৃহীত ‘ডিএনএ’ থেকে নমুনা নিয়ে ‘স্টেমসেল’ তৈরি করলো ৩০১৬’র রোবটিক জিন বিজ্ঞানীরা অক্লান্তভাবে। এবং নমুনা হিসেবে ‘স্টেমসেল’গুলো থেকে পরবর্তীতে রূপান্তরিত মানুষের চেহারা পরিপূর্ণরূপে কেমন হবে তা আগাম বিশ্লেষণ করলো ‘ফিউচার সায়েন্স’ বিজ্ঞানীরা বিশেষ কম্পিউটারে। প্রায় ৫-৬ হাজার নির্বাচিত ফিউচার মানবের চেহারা থেকে কেবল ২০১৬-তে ‘নেটে’ দেখা মির্চা ও অমৃতার ছবির ধুসর স্মৃতি থেকে নির্বাচন করলাম আমি মির্চা আর অমৃতাকে। এবং চুড়ান্ত ‘স্টেমসেল’ চলে গেলো ল্যাবে ১৯৩০’র মির্চা এলিয়াদ ও অমৃতাকে বানাতে।

একটা নতুন সমস্যা দেখা দিলো। ২০১৬-পূর্ববর্তী পৃথিবীতে কোন মানুষ ককেসীয় আবার কেউ ছিল ঘুচঘুচে নিগ্রো; কেউ লম্বা সাড়ে ছ’ফুট, কেউবা ছিল বেটে ৩-ফুট; কেউ সুন্দরি ঐশ্বরিয়া – লেডি গাগার মত, আবার কেউ কুৎসিত আফ্রিকার জুলু নারীর মত বেঢপ; কারো নলেজ আইনস্টাইনের মত আবার কেউবা ছিল ধর্মান্ধ তেতুল মালানা শফির মতো; ওজনে কেউবা মোটা জাপানি কুস্তিগিরদের মত আবার কেউ ছিল শুকনো টেলি সামাদের মত; কেউ হাই-সেক্সের কেউবা সেক্স-হীন হিজড়া। ২০১৬ সাল পুর্ববর্তী পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরা যা মূলত হাস্যকরভাবে বিশেষ “গড” সৃষ্ট বলে মনে করতো ও মেনে নিতো নিজের ‘ভাগ্য’ বলে। কেবল দু’চারজনে যারা এ হাস্যকর ‘গডে’ অবিশ্বাস করতো, তাদেরকে তুচ্ছতরভাবে ঐ সময়ের অধিকাংশ গড-নির্ভর মানুষ “নাস্তিক” ইত্যাদি বলতো, যেন তারা কত জ্ঞানি!

এসব বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ আর গবেষণায় ৩০১৬ সনের মানুষেরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, ঐ সময়ের মানুষের উচ্চতা, মেধা, গায়ের রং, চেহারা, সেক্স ইত্যাদি সবার প্রায় একই থাকবে। সর্বোচ্চ ১০% এর বেশি পার্থক্য থাকবে না মানুষে মানুষে। যে কারণে রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয়, সামাজিক বিভাজনহীন ৩০১৬-র মানুষ এ নীতি গ্রহণ করে যে, প্রত্যেকটি পুরুষ ও নারীর ক্লোনকালীন বয়স হবে ২৫-বছর, উচ্চতা হবে ৬-ফিট, গায়ের রং সবার তামাটে ফর্সা, চুলের রং কালো, মেধা ৯৯-১০০ ইউনিট, প্রত্যেকটি মানুষ তৈরি হবে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসমুক্ত, ক্লোনের আগে প্রত্যেকটি মানুষ হবে স্কানকৃত রোগশোকের জিনমুক্ত, যাতে তারা কখনো বুড়িয়ে যাবেনা, ক্লান্তি অনুভব করবেনা কিংবা মৃত্যুবরণ করবেনা। ঐ সময়ের পৃথিবীর সকল নাগরিকই ছিল আসলে ২৫-বছরের তরুণ-তরুণির মত সবাই। কোন শিশু, বৃদ্ধ, অুসুস্থ্য, বিকলাঙ্গ, হিজড়া একজনও ছিলনা ৩০১৬-র পুরো পৃথিবীতে। প্রায় হাজার বছরের মানুষের ঐসব সমস্যাগুলো পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণে ৩০১৬-সনের পৃথিবীর একমাত্র ‘হিউমান প্রডাকশন ল্যাবটি’তে মানুষের ক্লোন-করণে কতগুলো নির্ধারিত নীতিমালার ‘ডিফল্ট সেটআপ’ ছিল।

আমি এবং বিশেষজ্ঞ টিমের সবাই চাইছিলাম ‘অমৃতা’ আর ‘মির্চা’ সৃষ্টি হোক একদম ১৯৩০-সনের চেহারা আর চিন্তনে। কারণ ৩০১৬-সনের মানুষের মত নতুন সেটআপে তাদের ক্লোন করা হলে, পূর্বপ্রেম তারা ভুলেও যেতে পারে কিংবা অন্য কোন নাটকীয়তা ঘটতে পারে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, একদম ১৯৩০’র আবহে ক্লোন হবে মির্চা আর অমৃতার। রোবটিক জিন বিজ্ঞানীর নির্দেশনামত তড়িৎ ‘চেঞ্জ’ করলো তাদের ল্যাবের প্রাক-সেটিংগুলো।

বিশেষজ্ঞ কমিটির ‘ট’কে বললাম – “অমৃতা-মির্চার নাটকীয় মিলন দৃশ্যটি আরো অনুপম হবে, যদি ঐ সময় অমৃতার সাথে উপস্থিত থাকে তার ছোটবোন ‘সাবি’। কারণ অমৃতা-মির্চার নিষিদ্ধ প্রেম কাহিনি মানসিক অসুস্থ্য ‘সাবি’ই বলে দিয়েছিল তার মা-বাবাকে, এর পরিণতি না বুঝেই”। এবং এ বিয়োগান্তক ঘটনার কদিন পরই শোক, দুখ আর অনুশোচনায় মারা গিয়েছিল ‘সাবি’। মরার আগে অমৃতা যখন সাবিকে বলেছিল – “কি করলি সাবি, এ কি করলি”? কিশোরি এই মেয়েটি তখন কেঁদে কেঁদে বলছিল – “বুঝতে পারিনি ইউক্লিডদা! বুঝতে পারিনি তোমার এতো কষ্ট হবে, দিদির এত কষ্ট হবে”! এবং সিদ্ধান্ত হলো ‘সাবি’র ক্লোনও তৈরি করা হবে ওদের সাথে। স্থাপিত হবে ঐ নাট্য-সন্ধিক্ষণে!

ভূ-বিজ্ঞানীদের ডেকে বলা হলো, ঐ সময়ের কোলকাতার ভবানিপুরের ড. সেনের বাড়িটার সঠিক ‘অক্ষাংশ-দ্রাঘিমা’ বের করতে। সাথে হিমালয় সন্নিহিত ব্র্রহ্মপুরী অরণ্য, ঋষিকেশের পাশের ‘স্বর্গাশ্রমের’ পাহাড়ি গুহা। অত্যাধুনিক ‘এক্সরে স্যাটেলাইট’ দিয়ে স্কান করে বর্ণিত দুটো স্থানের নিখুঁত ‘স্পট’ বের করলো সয়েল ইঞ্জিনিয়ারগণ। আবার দেখা দিলো নতুন সমস্যা। দুটো স্পটেই তখন ৩০১৬ সনের মানুষের অত্যাধুনিক ‘কাপল-হাউস’ বানানো। বহুতল ভবনে মানুষের নানাবিধ সমস্যার কারণে ৩০১৬ সালের মানুষেরা ছোট ছোট ‘ট্রান্সপারেন্ট বাড়ি’ বানিয়েছিল পুরো বিশ্বময়। একই ধাচের যার প্রতিটিতে দুজন অমর নারী-পুরুষ বসবাস করার জন্যে। কিন্তু দেখা গেলো ঐ “কাপল-হাউস” বানাতে গিয়ে অমৃতাদের পুরণো ভবানীপুরের দ্বিতল বাড়ি ও ‘স্বর্গাশ্রমের’ পাহাড়ি গুহা সবই এক হয়ে গেছে। মানে দুটো এলাকাই এখন সমতল এবং প্রতি ২০০-মিটার পর-পর একটা করে ছোট ‘কাপল-হাউজ’ বানানো, যার চারদিকে ফুলবাগান আর সবুজ বনানি। যেন ২০১৬ সাল পূর্ববর্তী ধর্মীয় চেতনায় বিশ্বাসি মানুষ যেমন ‘স্বর্গ’ কল্পনা করতো, তার চেয়েও মানুষ নির্মিত এ পৃথিবী এক ডিগ্রি ওপরে! সব ঘটনা জানার পর প্রাক্তন ভবানীপুর ও স্বর্গাশ্রম এলাকার কাপল-হাউসগুলো সাময়িক সময়ের জন্যে “হাইড” করা হলো। মাত্র একদিনের মধ্যে আর্কিওলজিস্টরা নির্মাণ করলো ১৯৩০-সনের ভবানীপুর এলাকা ও সেখানে ড. সেনের ইট-সুরকির সেই পুরনো দ্বিতল বাড়ি। ৩০-এর দশকের গ্যাস-ল্যাম্পগুলো দেখে বোঝার উপায় রইলোনা এ বাড়ি ৩০১৬-সনের বাস্তকারগণ এইমাত্র বানিয়েছেন। বাড়িতে মেয়েদের পোশাক, দার্জিলিং থেকে আনা মির্চার ‘কিউরিও’-গুলোর একটা অনুমানভিত্তিক মোটামুটি নিখুঁত বর্ণনার প্রেক্ষিতে রোবটেরা তৈরি করলো সব। যেমনটা ত্রিশোত্তর কলকাতায় সিনেমা-নাটকের ‘সেট’ হিসেবে ব্যবহারের জন্যে বানানো হতো স্টুডিওগুলোতে। অপর রোবটেরা হিমালয়ের পাদদেশে ব্র্রহ্মপুরী অরণ্যে, ঋষিকেশের পাশেই ‘স্বর্গাশ্রম’ তৈরি করলো ঠিক ১৯৩০-৩১ সনের প্রেক্ষাপটে।

ওদের ৩-জনের ক্লোন মানব বের করার আগেই এ নিখুঁত ‘সেট-ব্যবস্থাপনা’ দেখে পুরো আলোড়িত হলো ৩০১৬’র পৃথিবী। এমন কোন মানুষ রইলো না, যারা জানতো না এ ঘটনা। সবাই সরাসরি এ দৃশ্য নিজ চোখে দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। কারণ ঐ সময়ে মানুষের দৃষ্টির প্রখরতা এমন চমকপ্রদভাবে উন্নীত হয়েছিল যে, ‘বিশেষ চশমা’র সাহায্যে তারা পৃথিবীর যে কোন অংশ থেকে পৃথিবীর যে কোন ঘটনা বা দৃশ্য সরাসরি দেখতে পেতো। এমনকি তারা দিনে ও রাতে, সামনে ও পেছনে, ওপরে ও নিচে, দূরে ও নৈকট্যে সমভাবে দেখতে পেতো। শরীরের অভ্যন্তরাংশ দেখতে সেকেলে ‘এক্সরে’ বা ‘আলট্রাসনো’ ব্যবহার করতে হতেনা ২০১৬-পূর্ববর্তী মানুষের মতো। সাধারণ চোখেই প্রত্যেক মানুষের দৃষ্টি ঢুকতে পারতো যে কোন কিছুর অভ্যন্তরে। অবশ্য সবার তা ‘হাইড’ করার ক্ষমতাও ছিল, যদি কেউ চাইতো গোপন রাখতে। ২০১৬’র মত টিভিতে রেকর্ড করা পুরণো ঘটনা দেখতে হতোনা তাদের সারাক্ষণ!

১৮ সেপ্টেম্বর ৩০১৬-তে অমৃতা-মির্চার নাটকীয় সৃষ্টি পৃথিবীর সব মানুষ দেখার জন্যে উদগ্রীব হয়ে রইলো। কারণ ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ ছিল তাদের শেষ বিদায়ের দিনক্ষণ! এবং পরিকল্পনা অনুসারে স্থাপন করা হবে ১৯৩০’র হিন্দুস্থানী ১৬-বছরের তরুণির পোশাকে অমৃতাকে তার ভবানিপুরের শোয়ার ঘরের বারান্দায়, একইভাবে ‘স্বর্গাশ্রমে’র পাহাড়ি গুহায় ছাইমাখা জটাধারী কমণ্ডলুক সন্ন্যাসীরূপী ‘মির্চা’কে। পুরো দৃশ্যটি আরো জীবন্ত ও বাস্তবভিত্তিক করার জন্যে ভবানিপুরের বাড়িতে বাবা ড. সেন, মা মাধুরী রায়সহ অন্যান্য জীবন্ত চরিত্রগুলোর রোবটিক অবয়ব স্থাপন করা হলো, যাতে অমৃতা আর মির্চা সেই ১৯৩০ সনের পরিপূর্ণ জীবনে ফিরে যেতে পারে। সকল কবি ও অকবিরা জীবনের এক প্রণব প্রতিধ্বনির গান এবং সুরের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকলো পরবর্তী মির্চা অমৃতা নাটক দেখতে!

অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০৩

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০২

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 6