বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (অষ্টম পর্ব)


(ছবি: লণ্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে ডারউইন স্মারক ভাস্কর্য, ১৮৮৫ সালে ৯ জুন শিল্পী স্যার জোসেফ বোয়েম এর এই শিল্পকর্মটি উন্মোচন করা হয়েছিল।)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম | ষষ্ঠ| সপ্তম )


আবারো আত্মগোপন

তার গোপনীয়তার দুজন স্বাক্ষী সহ, ডারউইন ধীরে ধীরে যথেষ্ঠ পরিমান আত্মবিশ্বাস অর্জন করছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের ধারণাটি প্রকাশ করার জন্য; কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস পুরোটাই হারিয়ে গিয়েছিল এর একমাস পরে; এর কারণ ১৮৪৪ সালের অক্টোবর মাসে Vestiges of the Natural History of Creation নামের একটি বই ছাপাখানা থেকে হয়ে এসেছিল, যার লেখক একজন স্কটিশ সাংবাদিক, রবার্ট চেম্বারস, সেই মুহূর্তে যিনি অজ্ঞাত থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন, এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখার জন্য এতটাই চেষ্টা করেছিলেন, তার প্রকাশক কোথায় তাকে সন্মানী পাঠাবেন এমনকি সেই ঠিকানাটিও তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন, অবশ্য এত সতর্কতা অবলম্বন করে তিনি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন কোনো সন্দেহ নেই তাতে।


(ছবি: রবার্ট চেম্বারস (Robert Chambers, 1802 – 1871) স্কটিশ ভূতত্ত্ববিদ, প্রকাশক; চেম্বারস ১৮৪৪ সালে Vestiges of the Natural History of Creation বইটি প্রকাশ করেন; যদিও তিনি তার নামে এটি প্রকাশ করেননি, তার মৃত্যুর পরেই কেবল লেখকের মূল পরিচয় জানা গিয়েছিল। যদিও প্রস্তাবিত বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে চেম্বারস এর যুক্তির দুর্বলতা ছিল তা সত্ত্বেও বিতর্কিত বহুল পঠিত এই বইটি প্রথম বারের মত বিবর্তন বা ট্রান্সমিউটেশন আর সৃষ্টির সাথে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যোগসূত্রের ধারণাটি সাধারণ পাঠকদের কাছে পৌছে দিয়েছিল।)

Vestiges of the Natural History of Creation বইটি কোনো সমস্যা ছাড়াই তার যাত্রা শুরু করেছিল, সৌরজগত ও তার নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলো বর্ণনা করে ও কিভাবে একটি গ্যাসপূর্ণ ডিস্ক থেকে পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের সুত্র মোতাবেক পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলো সেগুলো পর্যালোচনা করার মাধ্যমে; সেই সময়ের আলোকে যতটুকু তথ্য জানা ছিল, সেই আলোকে তিনি ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড এবং ইতিহাসে পরিক্রমায় নানা ফসিলের উত্থানের কথা উল্লেখ করেন। সরল জীবাশ্মগুলো প্রথমে এবং পরে জটিলতর জীবাশ্মগুলোর আবির্ভাবে কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘সময়ের পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে জটিল ও উচ্চ ফর্মের জীবনের আবির্ভাব হয়েছিল যারা তাদের চিহ্ন রেখে গেছে জীবাশ্ম রেকর্ডে’; এরপর চেম্বারস একটি বিতর্কিত দাবী করে বসেন: ‘যদি মানুষ মেনে নেয় ঈশ্বর মহাজাগতিক সব বস্তুগুলোকে নিজ হাতে সাজিয়েছেন প্রাকৃতিক সূত্র মেনেই, তাহলে জৈব সকল সৃষ্টিও প্রাকৃতিক নিয়মেরই ফসল, যা ঠিক তার মনের ইচ্ছারই প্রতিফলন, এমনভাবে ভাবতে আমাদের আসলে বাধাটা কোথায়? প্রতিটি প্রজাতি আলাদা আলাদা ভাবে তার সৃষ্টি করতে হয়েছে এমন ভাবার চেয়ে এটাই বরং যুক্তিযুক্ত, নিশ্চয়ই এই ধারণাটি খুব বেশী হাস্যকর নয় অবশ্যই খানিকটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার জন্য।’

?oh=0cff349b67fbcf8d91c130eddb0c88dc&oe=589E7EE0″ width=”500″ />
(ছবি: Vestiges of the Natural History of Creation বইটি)

আর কিভাবে এই প্রাকৃতিক নিয়মগুলো কাজ করে সে বিষয়ে চেম্বারস একটি মিশ্র ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, রসায়ন আর ভ্রুণতত্ত্ববিদ্যা থেকে পরোক্ষ ‍উপায়ে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে তিনি প্রস্তাব করেন, হয়তো বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ কোনো নির্জীব পদার্থকে প্রথমে সরল অণুজীবে রুপান্তরিত করেছিল; এরপর জীবন বিবর্তিত হয়েছে এর ক্রমবিকাশকে পরিবর্তন করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; চেম্বারস এখানে নির্ভর করেছিলেন জার্মান জীববিজ্ঞানীদের পরিত্যক্ত পুরোনো কিছু ধারণাকে; তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, যে জন্মগত ক্রটির কারণ হচ্ছে ভ্রূণের ক্রমবিকাশের প্রতিটি পর্যায় বা ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়া; একটি শিশুর হয়তো জন্ম হতে পারে হৃৎপিন্ডে চারটির বদলে মাত্র দুটি প্রকোষ্ট নিয়ে, যেমন মাছের মত; ধারণা করা হতো যে এই ক্রটিগুলো হবার কারণ, ‘মায়ের শরীরের এই ভ্রূণের ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ায় কোনো ক্রটির জন্য, যা প্রভাবিত হতে পারে মায়ের দুর্বল স্বাস্থ্য বা অন্য কোন দুর্ভোগের কারণে।’ কিন্তু যদি এর বিপরীত ঘটনা ঘটে, কোন মা হয়তো এমন শিশু প্রসব করে যে কিনা ক্রমবিকাশের আরো একটি নতুন ধাপ অতিক্রম করতে পারে; কোন হাস হয়তো এমন কোন ছানা দিতে পারে যার শরীর ইদুরের মত,এভাবে হাসের ঠোট যুক্ত প্ল্যাটিপাসের সৃষ্টি হতে পারে’, এভাবে নতুন ফর্মের নতুন সৃষ্টি, যেমনটা দেখা গেছে ভুতাত্ত্বিক রেকর্ডের পাতায়, আসলেই কখনোই গর্ভাবস্থায় একটি নতুন ধাপের অগ্রগতি ছাড়া আর কিছু নয়।’

চেম্বারস আদৌ ভাবেননি, তার পাঠকদের কিছু মনে করা উচিৎ হবে যদি তারা মাছ থেকে ‘বিবর্তিত’ হয়েছে এমন কিছু তাদের বলা হয়; ঘটনার যে ধারাবাহিকতা তিনি প্রস্তাব করেছিলেন: ‘সবচেয়ে বড় মাপের বিস্ময়গুলো, তাদের প্রত্যেকটির মধ্যে আমরা একজন সর্বশক্তিমানের ইচ্ছার প্রতিচ্ছায়া দেখতে পাই, প্রতিটি প্রাণীর পরিবেশের সাথে সামঞ্জষ্য রেখেই তাদের তিনি নিখুতভাবেই সাজিয়েছেন’; Vestiges of the Natural History of Creation এর মধ্যবিত্ত বৃটিশ পাঠকরা তাদের জীবন আগের মতই কাটিয়ে যেতে পারেন সেই একই নৈতিকতার কম্পাস ব্যবহার করে, ‘এভাবে আমরা শ্রদ্ধাময় একটি অভ্যর্থনা জানাই যা কিছু প্রকৃতির মাধ্যমে উন্মোচিত হয়; এবং একই সাথে আমরা পুরোপুরি শ্রদ্ধাও বজায় রাখি যা কিছু আমরা পবিত্র হিসাবে মনে করে থাকি, যার কোনো কিছুই শেষ অবধি পরিবর্তন করারও কোন আবশ্যিকতা প্রশ্ন হয়েতো কখনোই উঠবে না।’

Vestiges of the Natural History of Creation খুবই ব্যবসা সফল একটি প্রকাশনা হয়েছিল, সেই সময় প্রায় দশ হাজারের বেশী কপি বিক্রী হয়েছিল বইটির। প্রথম বারের মত ইংল্যাণ্ডের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে বিবর্তনের ধারণার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বইটি। কিন্তু বইটি সম্বন্ধে সামনের সারির সব বৃটিশ বিজ্ঞানীদের মন্তব্য ছিল অত্যন্ত্য বিরুপ, তারা অনেকেই বইটিকে অত্যন্ত্য তিক্ত আর কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন, বিখ্যাত অ্যাডাম সেজউইক লেখেন, আমার মনে হয় এর লেখক একজন মহিলা, আংশিকভাবে এর কারণ হচ্ছে, বইটি মজবুত সব যুক্তিগুলো সম্বন্ধে যে পরিমান অজ্ঞতা প্রকাশ করছে সে জন্য। সেজউইক আরো সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন, কিভাবে জীবনের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী সব শ্লীলতা আর শোভনতাকে অবমুল্যায়ন করতে পারে; ‘যদি এই বইটা সত্যি হয়ে থাকে’, তিনি ঘোষণা করেন,‘তাহলে ধর্ম হচ্ছে মিথ্যা, মানুষের আইনকানুন পাগলামো আর মনের খেয়াল আর অত্যন্ত নিম্নমানের অবিচার, নৈতিকতা হচ্ছে পাগলের প্রলাপ।’

বইটির প্রতি বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিকদের হিংস্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে ডারউইন আবার নিজেকে গুটিয়ে নেন তার নিজস্ব বিজ্ঞানের জগতে; ‍তার আসলে ধারণাই ছিলনা যে, অ্যাডাম সেজউইক সহ তার অন্যান্য শিক্ষকরা বিবর্তন সম্বন্ধে এত দৃঢ় আর প্রবল একটি বিরুদ্ধ ধারণা পোষণ করেন; তবে নিজের গড়ে তোলা তত্ত্বটিকে তিনি পরিত্যাগ করেননি, বরং ডারউইনের তখন একটাই চিন্তা ছিল, চেম্বারের সাথে যা হয়েছে, সেই নিয়তিটাকে কিভাবে এড়ানো যায় যখন তিনি তার প্রস্তাবটিকে জনসমক্ষে আনবেন।

ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন যুক্তি প্রমানের দিক থেকে চেম্বারস এর বইটির ভুল এবং দূর্বলতাগুলো আসলে কোথায়; চেম্বারস শুধু অন্য বিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত ধারণাগুলো পড়েছেন এবং সেই সব ধারণাগুলো একসাথে মিশিয়ে একটি অস্পষ্ট আর দূর্বল যুক্তির উপর ভিত্তি করে তার প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন; ডারউইন বুঝতে পারলেন, খানিক ভিন্নভাবে তিনিও কিন্ত কিছুটা একই দোষে দোষী -তার ধারণার ভিত্তি বেশ কিছু বিজ্ঞানী আর অবিজ্ঞানীদের ধারণা যা তিনি তাদের কাছ থেকে শুনেছেন বা পড়েছেন – লাইয়েল, মালথাস এমনকি তার নাপিতও সেই তালিকায় আছেন; যদিও ভুত্ত্ত্ববিদ্যার একজন স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু ডারউইন ভাবছিলেন জীববিজ্ঞান বিষয়ে তার কোন প্রস্তাব প্রকাশ করলে তাকে একজন বহিরাগত আনাড়ী বিশেষজ্ঞ হিসাবে বিবেচনা করা হতে পারে; তাকে যেন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয় এমন একটি অবস্থা নিশ্চিৎ করতে হলে ‍তার নিজেকে প্রমান করতে হবে প্রথম সারির একজন প্রকৃতিবিদ হিসাবে, যার প্রকৃতির নানা জটিলতাকে সহজে সামাল দেবার যোগ্যতা আছে।

এরপর তিনি বিগলের সমুদ্রযাত্রার সময় সংগ্রহ করা নানা নমুনা, যা তিনি নিজে পরীক্ষা করেননি গত ৮ বছরে তার ফিরে আসার পর, সেগুলোর দিকে নজর দিলেন; তার সংগ্রহের নমুনার একটি কাচের বোতলে ছিল একটি বার্নাকল এর নমুনা। যদিও বেশীর ভাগ মানুষ এটি মনে করেন জাহাজের হাল বা নীচের যে কাঠামোর উপর নৌকা ‍বা জাহাজ তৈরী হয়, সেগুলোর গায়ে লেগে থাকা এমন কিছু যা চেছে পরিষ্কার করার উপাদান ছাড়া বার্নাকল এর আর কোনো গুরুত্ব নেই; কিন্তু আসলই তারা সমুদ্রের সম্ভবত সবচেয়ে বিচিত্রতম একটি প্রাণী; প্রথম দিকে প্রাণীবিজ্ঞানীরা ভাবতেন বার্নাকল আসলে এক ধরনের মোলাস্ক, যেমন ক্ল্যাম বা ঝিনুক বা অয়েষ্টার, যাদের শক্ত খোলসটা আটকে থাকে কোন একটি পৃষ্ঠের উপর, কিন্ত আসলে এরা ক্রাষ্টাসিয়ান গোষ্ঠীভুক্ত, যেমন লবস্টার এবং চিংড়ী; ১৮৩০ সালেই বিজ্ঞানীরা কেবল তাদের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য খানিকটা আবিষ্কার করেছিলেন, বিশেষ করে যখন একজন বৃটিশ আর্মি সার্জন তাদের লার্ভা লক্ষ্য করে আবিষ্কার করেছিলেন তারা আসলে অল্পবয়সী চিংড়ীর মত; যখন বার্নাকল লার্ভাগুলোকে সমুদ্রের পানিতে ছেড়ে দেয়া হয়, তারা কোন একটি জায়গা খুজতে থাকে যেখানে তারা স্থির হতে পারবে, সেটা জাহাজের ‍হাল বা কোন ক্ল্যামের খোলশ যাই হোক না কেন; এবং পছন্দ মত কোন কিছুর উপরে তারা প্রথমে মাথা দিয়ে থিতু হয়; এরপরই তারা তাদের ক্রাষ্টাশিয়ান শারীরিক কাঠামোটি হারিয়ে ফেলে, তার বদলে চারপাশে তৈরী করে কোনাকৃতির একটি খোলস, তার ভিতর থেকে তারা তাদের পালকের মত পাগুলো বের করে রাখে খাদ্য ছাকাই করার জন্য।


(ছবি: রক বার্নাকল)

১৮৩৫ সালে চিলির উপকুলে ডারউইন আলপিনের মাথার সমান একটি বার্ণাকল প্রজাতি সংগ্রহ করেন যা একটি কঙ্খ বা সামুদ্রিক শামুকের (Conch) খোলসের ভিতরে আটকে ছিল; এখন তার অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে তা দেখে ডারউইন বুঝতে পারলেন যে প্রতিটি বার্নাকলে আছে দুটি বার্নাকল সদস্য – একটি আকারে বড় স্ত্রী বার্ণাকল সাথে খুবই ক্ষুদ্র পুরুষ, যে তার সাথে আটকে আছে; সেই সময় বিজ্ঞানীরা পরিচিত ছিলেন শুধু উভলিঙ্গ বার্ণাকলের সাথে যাদের স্ত্রী ও পুরুষ দুটি জননাঙ্গই থাকে; পিনহেড বার্নাকল এত অদ্ভুত যে ডারউইন নিশ্চিৎ ছিলেন এরা হয়তো ভিন্ন নতুন কোন জিনাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।


(ছবি: বার্নাকল লার্ভা)

বার্নাকলদের নিয়ে ডারউইন আরো একটি দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রা শুরু করলেন, প্রথমে তিনি শুধু একটি ছোট নিবন্ধ লিখতে চেয়েছিলেন তার আবিষ্কারের বর্ণনা দিয়ে, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে, তাকে আগে নির্ধারণ করতে হবে অনেকগুলো বার্ণাকল প্রজাতির মধ্যে এই পিন হেড বার্ণাকলের অবস্থানটা কোথায় হবে যদি এর শ্রেণীবিন্যাস করতে চান; তিনি ওয়েন এর কাছে অনুরোধ করেন তাকে যেন কিছু বার্ণাকলের নমুনা ধার দেয়া হয়, এবং কাজটা ভালোভাবে কিভাবে করা যায় এ বিষয়ে তাকে যেন তিনি কিছু উপদেশ দেন; ওয়েন ডারউইনকে জানান যে তার আবিষ্কৃত বার্ণাকলটিকে, সেটা যতই অদ্ভুত হোক না কেন, মুল ক্রাষ্টাসিয়ান আদিরুপ বা আর্কিটাইপের সাথে একটি সংযোগ খুজে বের করার চেষ্টা তাকে অবশ্যই করতে হবে; কারণ ১৮৪০ নাগাদ ওয়েন সিদ্ধান্ত নেন আর্কিটাইপ বা আদিরুপই হচ্ছে প্রাণীবিজ্ঞানের মূল চাবিকাঠি।

ওয়েন নিজেও মেরুদন্ডী প্রানীদের একটি আর্কিটাইপ তৈরী করা চেষ্টা করেছিলেন, যা তিনি কল্পনা করেছিলেন মেরুদন্ড, পাজর, মুখ সহ সামান্য কিছু বেশী; এই শারীরিক গঠনের কোন অস্তিত্ব প্রকৃতিতে নেই, ওয়েন দা্বী করেন, এটি শুধু মাত্র ঈশ্বরের মনে বিদ্যমান একটি নীল নকশা , যার উপরে নির্ভর করে তিনি আরো বিস্তারিত শারীরিক গঠন তৈরী করেছেন; কেউ যদি ভিন্ন ভিন্ন মেরুদন্ডী প্রানীদের তুলনা করেন তাহলে এই আর্কিটাইপের সাথে সম্পর্ক এবং সদৃশ্যতা স্পষ্ট হবে।

যেমন, উদহারণ সরুপ একটি বাদুড়, একটি ম্যানাতি এবং একটি পাখি তুলনা করেন, বাদুড়ের ডানা তৈরী হয়েছে তার দীর্ঘায়িত হওয়া আঙ্গুলগুলো যুক্ত করা একটি চামড়ার পর্দা দিয়ে, ম্যানাতির আছে একটি প্যাডেল এর মত অঙ্গ যা তাদের পানিতে সাতার কাটতে সহায়তা করে; পাখীদের আছে ডানা, কিন্তু সেটা তৈরী হাতের হাড়ের মধ্যে আটকে থাকা পালক সহ, যারা একীভুত হয়ে তৈরী করেছে একটি হিন্জ বা কবজার সহ দীর্ঘ একটি দন্ড; প্রত্যেকটি মেরুদন্ডী প্রানীর হাত পা আছে যারা তাদের জীবনের প্রয়োজনে খাপ খাইয়ে নিয়েছে গঠনে ও কাজে ; এবং তারা একের অপরের সাথে সমরুপী বিস্ময়করভাবেই, প্রতিটি অস্থির ক্ষেত্রে; তাদের সবার আঙ্গুল আছে মার্বেল সদৃশ একটি কব্জির হাড়ের সাথে যুক্ত হয়ে, যারা সংযুক্ত আবার দুটি লম্বা হাড়ের সাথে যার কনুইতে এসে একটি মাত্র লম্বা হাড়ের সাথে যুক্ত হচ্ছে; এই সদৃশ্যতাই ওয়েন এর একটি সাধারণ শারীরিক কাঠামোর পরিকল্পনার বিষয়টি প্রমাণ করে (বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন হোমোলগ বা সমরুপতা)।

ওয়েন ডারউইনকে তাড়া দেন বার্নাকল এবং অন্যান্য ক্রাষ্টাসিয়ানদের মধ্যে এমন কোনো হোমোলজি খুজে বের করতে; ব্যাক্তিগত ভাবে ডারউইন ওয়েন এর আর্কিটাইপের ধারণাটিকে অর্থহীনই মনে করতেন; তিনি ভাবতেন বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে সদৃশ্যতাগুলো একটি কমন বা সাধারণ পূর্বসূরি প্রাণীদের বংশধর হিসাবে তাদের বিবর্তনের মাধ্যমেই উদ্ভবেরই চিহ্ন; কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম অদ্ভুত ক্রাষ্টাশিয়ানদের থেকে বার্ণাকলদের বিবর্তন বুঝতে হলে ডারউইনকে অনেকগুলো আসলে বার্ণাকল নিয়ে গবেষণা করতে হবে ( প্রায় ১২০০ প্রজাতি আজ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে); তিনি অন্য প্রকৃতিবিদদের সংগ্রহ থেকে আরো বার্ণাকল জোগাড় করলেন, তিনি জীবাশ্ম বার্নাকল নিয়ে গবেষনা করেন এমনকি বৃটিশ মিউজিয়ামের পুরো সংগ্রহ তিনি কোনো না কোনোভাবে যোগাড় করেছিলেন তার গবেষণার জন্য; প্রায় ৮ বছর ধরে ডারউইন বার্নাকল নিয়ে গবেষণা করেন, এই পুরোটা সময় বিবর্তনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত তার তত্ত্বটি যা কোপার্নিকাসের সুর্য কেন্দ্রীক কসমোলজীর ধারণার মতই বৈপ্লবিক, তার বুক শেলফের তাকেই বসে ছিল সিল করা একটি খামে।

কেন এত দেরী করেছিলেন ডারউইন? ভয় হয়তো ডারউইনের দীর্ঘসূত্রিতার একটি কারণ হতে পারে, বিশেষ করে তার শিক্ষকদের সাথে সরাসরি দ্বন্দে যাবার সুস্পষ্ট সম্ভাবনা ছিল, যা তিনি এড়াতে চেয়েছিলেন; অন্য একটা কারণ হয়তো হতে পারে ডারউইন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন; পাঁচ বছরের একটি কষ্টকর সমুদ্র যাত্রা, এর পরে বই আর প্রবন্ধ লেখার ব্যস্ত হয়ে আটটি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডে আসার পর থেকে তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, প্রায়ই তিনি আক্রান্ত হতে্ন ক্রমাগত হতে থাকা বমির দ্বারা; কেবল মধ্য তিরিশে ডারউইন হয়তো কিছুটা শান্তি খুজছিলেন কোনো অস্থিরতা ছাড়া; এবং আরো একটি দীর্ঘসূত্রিতার কারণের অংশ তার শোক; তার প্রিয় মেয়ে অ্যানী, মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৮৫১ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তার এই নিষ্পাপ কন্যাটির মৃত্যু যন্ত্রণা তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন. তার ভেঙ্গে চুরে যাওয়া বিশ্বাস নিয়ে তিনি এমার সাথে কোনো কথা বলারও সুযোগ পাননি; বার্ণাকল নিয়ে কষ্টসাধ্য গবেষণা তার সেই তীব্র কষ্টকে ঢাকার একটি উপায় হিসাবে হয়তো বেছে নিয়েছিলেন।


(ছবি: অ্যানী , ডারউইন ও এমার দ্বিতীয় সন্তান এবং বড় মেয়ে (Anne Elizabeth “Annie” Darwin 1841 – 1851); দশ বছর বয়সে তিনি মারা যান স্কারলেট ফিভার এ; ডারউইনের খুবই আদরের মেয়ে ছিল অ্যানী; অ্যানীর কষ্টকর মৃত্যু ডারউইনকে বিধ্বস্ত করেছিল; তার ডায়রীতে ডারউইন লিখেছিলেন We have lost the joy of the household, and the solace of our old age…. Oh that she could now know how deeply, how tenderly we do still & and shall ever love her dear joyous face. ক্ষীণ হয়ে আসা তার ধর্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন ডারউইন অ্যানীর মৃত্যুর পর।)

কিন্তু ভয়, ক্লান্তি আর শোক বাদ দিয়েও, বার্নাকল ডারউইনকে পুরোপুরি মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল; পরবর্তীতে দেখা গেল কিভাবে বিবর্তন কাজ করে সেটা বোঝার জন্য এই গ্রুপের প্রানীরা আসলেই উপযোগী; ডারউইন যেমন দেখতে পেলেন, কিভাবে তার চিলিতে আবিষ্কৃত বার্নাকলরা উদ্ভব হয়েছে তাদের উভলিঙ্গ পূর্বসূরিদের থেকে; তারা বিবর্তিত হয়েছিল অন্তর্বতীকালীন কিছু ফর্মের মধ্য দিয়ে, যতক্ষন পর্যন্ত তারা স্ত্রী এবং পুরুষ লিঙ্গের আলাদা বার্নাকল সৃষ্টি না করে; প্রতিটি প্রজাতির বার্নাকলদের মধ্যে প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশনও ডারউইনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বার্নাকল অ্যানাটোমির কোন অংশই সুষম নয়, এখানে ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার জন্য প্রচুর কাঁচা মাল আছে; প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোন একটি নির্দিষ্ট সময়েই কেবল প্রজাতির উপর কাজ করে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াটি, যেমন যখন কোন দ্বীপের উত্থান বা মহাদেশ পানিতে ডুবে যেতে শুরু করে, যেমন; কিন্তু এত ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ থাকার কারণে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন আসলেই কাজ করতে পারে সবসময়ই।

?1486609658211″ width=”500″ />
(ছবি: The Quantum Leap, an abstract sculpture erected in 2009 in Darwin’s birthplace, Shrewsbury, for the bi-centennial of his birth.)

কিন্তু এসব কোনো ধারণাই ডারউইন তার বার্ণাকল বিষয়ক কোনো লেখায় সরাসরি নিয়ে আসেননি, তিনি প্রায় ১০০০ পাতার বিশাল একটি একটি বিশাল বই (A monograph on the sub-class Cirripedia, with figures of all the species 1854) লেখেন, যার জন্য তিনি প্রশংসা, পুরষ্কার এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে যে শ্রদ্ধা তিনি আশা করেছিলেন সেটা পেয়েছিলেন;

১৮৫৪ সলে, ডারউইন আবার প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে তার চিন্তায় ফিরে যান।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মোড়ক ‍উন্মোচন

জোসেফ হুকার এর উত্থাপিত কিছু সন্দেহ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন ডারউইন; ডারউইনের একটি দাবী ছিল, উদ্ভিদ এবং প্রাণী যারা কোনো দ্বীপে বসবাস করে, তারা সেখানেই সৃষ্ট হয়নি, তারা হচ্ছে আদিতে এখানে বসতি স্থাপনকারীদের পরিবর্তিত বংশধর; যদি তাই সত্যি হয়, তাহলে সেই দ্বীপে তাদের পৌছানোর জন্য একটি উপায়ের প্রয়োজন আছে; হুকার একজন অভিজ্ঞ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, তিনি জানেন বীজ বাতাসে বা পানিতে ভেসে বহু মাইল অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু ডারউইন যে পরিমান দূরত্বের কথা বলেছেন, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন। হুকারের সন্দেহ মোকাবেলা করতে ডারউইন একটি চৌবাচ্চা ভর্তি লবন পানিতে বীজ ছড়িয়ে দেন, এবং পরে পরীক্ষা করে দেখেন যে চার মাস পরও বীজগুলো সক্রিয় থাকে এবং মাটিতে রোপন করলে তাদের অঙ্কুরোদগমও হয়; তিনি আবিষ্কার করেন পাখিরা তাদের পায়ের সাথে বীজ বহন করতে পারে এবং পেচাদের অন্ত্রনালীতে খাওয়া ও তাদের মলের সাথে বেরিয়ে আসা বীজও সক্রিয় থাকে।


(ছবি: জোসেফ ডাল্টন হুকার (Sir Joseph Dalton Hooker 1817 – 1911), বৃটেনের অন্যতম সেরা উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যিনি ভৌগলিক উদ্ভিদবিদ্যার জনক ছিলেন; প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি প্রথম ডারউইন এমা এবং জোসেফ হুকারকে জানিয়েছিলেন; ডারউইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হুকার কিউ রয়্যাল বোটানিক্যালগার্ডেনের পরিচালক ছিলেন দীর্ঘ সময়কাল।)

ডারউইনের তত্ত্ব একটি হাইপোথিসিস সৃষ্টি করেছিল এবং পরীক্ষার মাধ্যমেই হাইপোথিসিসটি সত্য প্রমাণিত হয়; ডারউইন আবারো তার ব্রীডিং বা কৃত্রিম প্রজননের গবেষণাও শুরু করেন; তার কিছু বন্ধু ছিলো যাদের সাথে তিনি জিন খেতেন মাঝে মাঝে, তাদের কেউ কেউ কবুতরের প্রজননের সাথে জড়িত ছিলেন, তারাই তাকে জানিয়েছিল কিভাবে ছোট ছোট প্রকরণ বা ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টাবলী ব্যবহার করে একেবারে নতুন জাতের কবুতর প্রজনন করা সম্ভব; ডারউইন নিজেই কবুতর পালতে শুরু করেন তাদের কৃত্রিম প্রজননের পরীক্ষার জন্য এবং তাদের গঠন দেখতে তাদের মেরে গরমপানিতে সিদ্ধ করে কংকালটি আলাদা করে পরীক্ষা করে দেখেন কি পরিমান ভিন্নতা আছে ভিন্ন ভিন্ন এই জাতগুলোর মধ্যে; তিনি দেখেন যে প্রতিটি কৃত্রিম প্রজননেনর মাধ্যমে সৃষ্ট ব্রীড এত বেশী ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টসুচক, যদি তারা বন্য হতো তাহলে তাদের আলাদা আলাদা প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত করা হতো; কবুতরের অ্যানাটোমির প্রতিটি অংশই অন্য ভ্যারাইটি বা প্রকরণের থেকে আলাদা, তাদের নাকের ছিদ্র থেকে তাদের বুকের পাজর, ডিমের আকৃতি; কিন্তু সবার জানা প্রতিটি কবুতরের জাত হচ্ছে একটি প্রজাতির রক ডোভের বংশধর।

১৮৫৬ সাল নাগাদ ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের স্বপক্ষে এত বেশী প্রমাণ জড়ো করেছিলেন, যে তিনি আবারো তার সীল গালা করা ১৮৪৪ সালের সেই প্রবন্ধটির খাম খোলেন এবং নতুন করে লেখা শুরু করেন, খুব দ্রুতই ছোট সেই রচনাটি বিশাল আকারের লক্ষাধিক শব্দ সম্বলিত একটি পুর্ণাঙ্গ গবেষনা গ্রন্থে রুপান্তরিত হয়; এতগুলো বছরের তার সমস্ত অভিজ্ঞতা- তার সমুদ্রযাত্রা, তার পড়াশুনা, বিভিন্ন জনের সাথে তার আলোচনা, বার্ণাকল আর বীজ নিয়ে তার গবেষণা সবকিছু তিনি বিস্তারিতভাবে সাজালেন তার তত্ত্বটির স্বপক্ষে; তিনি দৃঢ়সঙ্কল্প ছিলেন তার তত্ত্বের বিরুদ্ধবাদীতাকে তিনি অসংখ্য বাস্তব স্বাক্ষ্য প্রমানের বন্যায় ভাসিয়ে দেবেন। ১৮৪৪ সানে এমাকে যখন চার্লস তার পাণ্ডুলিপিটি পড়তে দিয়েছিলেন, তারপর থেকে তিনি তার তত্ত্ব বিষয়ে খুব সামান্যই কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী আরো কিছু মানুষের কাছে বিষয়টি উন্মোচন করতে, বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের কিছু বিজ্ঞানী, যারা নতুন কোনো সম্ভাবনার প্রতি অনেক বেশী মুক্তমনা ও সংস্কারমুক্ত; এরকম একজন ছিলেন তার সাম্প্রতিক বন্ধু .. যার নাম থমাস হাক্সলী।


(ছবি: থমাস হেনরী হাক্সলী; (Thomas Henry Huxley 1825 – 29 June 1895), বৃটিশ জীববিজ্ঞানী , ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের প্রতি তার জোরালো সমর্থনের জন্য তাকে বলা হতো ডারউইনের বুল ডগ; ১৮৬০ সালে স্যামুয়েল উলবারফোর্সের সাথে অক্সফোর্ডে তার বিতর্কটি বিবর্তন তত্ত্বের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত ছিল।)

ডারউইনের মত সম্ভ্রান্ত সচ্ছল পরিবারের বিজ্ঞান চর্চা হাক্সলীর ভাগ্যে জোটেনি; কসাইখানার উপরের ছোট একটি ঘরে তার জন্ম হয়েছিল, তার বাবা, একজন ব্যর্থ স্কুলের টিচার এবং তারপর একটি ব্যর্থ ব্যাঙ্কের পরিচালক; হাক্সলীকে পড়ানোর মত তেমন কোন অর্থ তার ছিল না; ১৩ বছর বয়সে একজন ডাক্তারের সহকারী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি, তিন বছর পর সেই ডাক্তারের সাথে লন্ডনে আসেন হাক্সলী, যেখানে তার সুযোগ হয় সার্জন হিসাবে একটি প্রশিক্ষণ নেবার, শ্বশুর বাড়ী থেকে কিছু ধার, সামান্য বৃত্তির টাকা নিয়ে কষ্টে সৃষ্ঠে তাকে তার প্রশিক্ষণ শেষ করতে হয়; তার ধার করা টাকা শোধ দেবার তখন একটাই উপায় ছিল, তাহলো নিউ গিনি অভিমূখে সমুদ্র যাত্রা করা এইচ এম এস র‌্যাটলস্নেক নামের একটি জাহাজে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসাবে যোগ দেয়া; হাক্সলী সেই সময় প্রাণিবিজ্ঞান সম্বন্ধে খানিক আগ্রহী হতে শুরু করেছিলেন, এই সুযোগটা তাকে তার মনের মত যত খুশী বিচিত্র নমুনা সংগ্রহ করার সুযোগ করে দিয়েছিল।

১৮৫০ সালে প্রায় ৪ বছর পর হাক্সলী দেশে ফিরে আসেন এবং ডারউইনের মত এই সমূদ্র যাত্রা তাকেও একজন বিজ্ঞানীতে রুপান্তরিত করেছিল; এবং ডারউইনের মতই, তার সুনামও দেশে ফেরার আগেই ইংল্যান্ডে পৌছে যায়, বিশেষ করে পর্তুগীজ মান ও য়ার (Portuguese man o’ war) নামের একটি অদ্ভুত সামুদ্রিক প্রাণি সম্বন্ধে তার প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের কারণে, যে প্রাণিটি আসলে অনেকগুলো একক প্রাণির একটি কলোনী; হাস্কলী রয়্যাল নেভীর সাথে একটি বিশেষ সমঝোতায় আসেন, যারা তাকে বেতন সহ তিন বছরের ছুটি দেয়, তার গবেষণা অব্যাহত রাখার জন্য। কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী না থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি রয়্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন।

এর মধ্যে অবশ্য নেভী থেকে আরো তিন বার সমুদ্র অভিযানে ডাকা হয়, তিনবার প্রত্যাখ্যান করার পর নেভীর চাকরীটি তিনি হারান, লন্ডনে অন্য কাজ খোজার জন্য তার কঠিন সংগ্রাম শুরু হয় এই সময়, একটি স্কুল অব মাইনস এ খন্ডকালীন চাকরী জোটে তার; পাশাপাশি পত্রিকায় নিবন্ধ আর রিভিউ লেখার কাজ শুরু করেন; সংসার চালানো তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে যেত; হাক্সলী যারা বিজ্ঞানের নানা শাখায় আধিপাত্য বিস্তার করতেন শুধুমাত্র তাদের সম্পদ থাকার কারনে, তাদের প্রতি খানিকটা তিক্ততার অনুভূতি পোষণ করতেন; তারপরও তার সীমিত সামর্থের মধ্যে নিজের জন্য কিছু সুনাম প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সাহসী হাক্সলী তখন ইংরেজ জীববিজ্ঞানীদের পুরোধা রিচার্ড ওয়েনকে আক্রমন করতে দ্বিধা বোধ করতেন না।

ওয়েন সে সময় একটি স্বর্গীয় বিবর্তনের ধারণা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিলেন, তার প্রস্তাব ছিল, সময়ের প্ররিক্রমায় ঈশ্বর নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করেন, তবে সবসময়ই তার মুল পরিকল্পনার আদিরুপ বা একটি আর্কিটাইপের উপর ভিত্তি করে, ওয়েন জীবনকে দেখতেন ধাপে ধাপে সুন্দর একটি স্বর্গীয় পরিকল্পনার ক্রমশ উন্মোচন হিসাবে, যা সাধারণ থেকে ধীরে ধীরে বিশেষায়িত আর জটিলতর সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হতে থাকে: একটি ‘ঐশ্বরিক নির্দেশায়িত নিরন্তন পরিবর্তন (ordained continuous becoming) ; ওয়েন তার অর্থবান পৃষ্ঠপোষকদের শান্ত করার জন্য, যারা এখনও স্বাচ্ছন্দবোধ করে প্রজাতির জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্মতত্ত্বের আশ্রয় নিতে, আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, ”জীববিজ্ঞান এখনও সর্ব্বোচ্চ নৈতিক ধারণাগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত।’

নানা বক্তৃতা আর পত্রিকার কলামে হাক্সলী ওয়েনকে উপহাস করেন ঈশ্বরকে একজন ড্রাফটসম্যান বা নকশা কারিগরে রুপান্তর এবং জীবাশ্ম রেকর্ডকে ঈশ্বরের বার বার পুণরাবৃত্তি বা রিভিশন হিসাবে দেখানো এই প্রচেষ্ঠাকে; হাক্সলী কোন ধরনের বিবর্তনের তত্ত্ব ব্যাখ্যা মেনে নেননি, তা স্বর্গীয় হোক বা সাধারণ প্রাকৃতিকই হোক না কেন; তিনি পৃথিবীর বা জীবনের ইতিহাসের কোন অগ্রগতি দেখেননি তখন পর্যন্ত, তবে তার ধারণাটি বদলে যায় ১৮৫৬ সালে এক সপ্তাহন্তে, যখণ ডারউইন হাক্সলীকে তার ডাউন হাউসে নিমন্ত্রন জানান।

ডারউইন তাকে বিবর্তন সংক্রান্ত তার নিজস্ব সংস্করণটি বর্ণনা করেন, যা প্রকৃতির নানা প্যাটার্ণকে ব্যাখ্যা করেতে পারে ঐশ্বরিক বা বিশেষ কোন সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই; তিনি হাক্সলীকে তার কবুতর আর বীজ দেখান, এবং বেশ তাড়াতাড়ি হাক্সলী ডারউইনের ব্যাখ্যা বুঝতে পারেন, এবং পরবর্তীতে তিনিই ছিলেন ডারউইনের সবচেয়ে কাছের এবং শক্তিশালী একজন মিত্র।

ডারউইনের এই ধীরে ধীরে সতর্কতার সাথে তার তত্ত্বকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগিয়ে চলছিল, একটি চিঠি আসার আগ পর্যন্ত, জুন ১৮,১৮৫৮ সালে ডাউন হাউসে সএকটি চিঠি এসে পৌছায়, ডারউইন চিঠিটা পান পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে সুদুর মালয় দ্বীপপুন্জ থেকে একজন ভ্রমণরত প্রকৃতি বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এর কাছ থেকে; ওয়ালেস তখন দক্ষিন পুর্ব এশিয়ায়, নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে পাঠাতেন তার খরচ চালানেরা জন্য এবং প্রজাতির বিবর্তনের ব্যাখ্যা খুজতেন তার কাজের ফাকে; তার ২১ বছর বয়সে তিনি রবার্ট চেম্বারস এর Vestiges of the Natural History of Creation বইটি পড়েছিলেন, এবং সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃতির পরিবর্তনের এবং ক্রমান্বয়ে উর্ধমুখী সরল থেকে জটিলতর সৃষ্টির ধারণাটি তাকে মুগ্ধ করেছিল; ডারউইনের বীগল ভ্রমনের কাহিনী পড়ে তিনিও সিদ্ধান্ত নেন, তাকেও যেভাবে হোক এমন সমুদ্র যাত্রায় যেতে হবে।

১৮৪৮ সালে তার প্রথম যাত্রা ছিল আমাজন জঙ্গল অভিমুখে; এরপর তিনি যান ডাচ উপনিবেশ বাটাভিয়ায়, যা এখন ইন্দোনেশিয়া নামে পরিচিত; তার উদ্দেশ্য ওরাঙ উটান সম্বন্ধে জানা, ও সেই সাথে মানুষের বংশধারা সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান অর্জন করা; সাধারণ পরিবারের ছেলে ওয়ালেস তার এই যাত্রার ব্যয়ভার মেটাতেন নানা ধরনের প্রানী বা উদ্ভিদ নমুনা সংগ্রহ করে লন্ডনে তার নানা খদ্দের এবং দোকানে পাঠানোর মাধ্যমে; তার নমুনার এরকম একজন খদ্দের ছিলেন ডারউইন, ডারউইন তার কাছ থেকে পাখি সংগ্রহ করতেন, এভাবে দুই প্রকৃতিবিদের সাথে চিঠি আদান প্রদান শুরু হয়।

?oh=7ace9ac9a182f1c8ec459b746f682895&oe=58A5DD16″ width=”500″ />
(ছবি: অালফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, (ছবিতে তার জীবনের শেষে). ১৮৫৮ সালে ডারউইনকে তার রচনাটা পাঠানোর জন্য কোনদিনও মনস্তাপে ভুগেছিলেন কিনা, তা কখনো প্রকাশ করেননি।)

ডারউইন ওয়ালেসকে আরো ব্যাপকভাবে এবং তাত্ত্বিকভাবে বিবর্তন সম্বন্ধে ভাবতে পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং তাকে জানান কিভাবে প্রজাতির সৃষ্টি হয় সে বিষয়ে তার নিজেরও একটি তত্ত্ব আছে; পরে প্রজাতির বিবর্তন সম্বন্ধে স্বতন্ত্রভাবে প্রায় একই ধারণায় উপনীত হওয়া ওয়ালেস সিদ্ধান্ত নেন ডারউইনকে ‍তিনি তার নিজের তত্ত্ব জানিয়ে একটি চিঠি লেখার; আর যখন ডারউইন চিঠি পড়লেন তিনি হতবাক হয়ে গেলেন; ওয়ালেস মালথাস ভালো করে পড়েছেন, এবং তার মত ওয়ালেসও প্রকৃতির উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভাব কি হতে পারে সেটা ভেবেছিলেন; এবং ডারউইনের মত তিনিও উপসংহার টানেন এটিও সময়ের পরিক্রমায় প্রজাতিকে পরিবর্তন করে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারে।

যখন তিনি ওয়ালেসের চিঠি পেয়েছিলেন, তখনও তারা নিজের লেখাটি আরো কয়েক বছর পর তার তত্ত্বটি প্রকাশের কথা ভাবছিলেন; কিন্তু তার এখন চোখের সামনেই আরেকজন বিজ্ঞানীর হাতে লেখা তার নিজের আবিষ্কৃত তত্ত্বের অনেকটুকু, যদিও হুবুহু নয় : ওয়ালেস একই প্রজাতির সদস্যদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি, তিনি শুধু প্রস্তাব করেছিলেন, অযোগ্য বা আনফিট সদস্যদের বাছাই করে বাদ দিয়ে দেয় পরিবেশ; কিন্তু ডারউইন ওয়ালেস এর প্রাপ্য স্বীকৃতি কেড়ে নেননি, ওয়ালেস এখন স্বীকৃত প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি সহ-উদ্ভাবক হিসাবে; তার ভদ্রতা আর সন্মানবোধ অনেক গভীর, তিনি তার নিজের বই পুড়িয়ে ফেলবেন তবে এমন কিছু করবেন না যেন কেউ তার দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে পারে, তিনি ওয়ালেস এর সাথে প্রতারণা করেছেন; সুতরাং ডারউইন লাইয়েল সাথে আলোচনা করে লীনিয়ান সোসাইটিতে দুটো গবেষনাপত্রই পাঠ করে শোনানো উদ্যোগ নেন।


(ছবি: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (বায়ে) বিবর্তন কেমন করে কাজ করছে সে বিষয়েই শুধুমাত্র ডারউইনের মত একই উপসংহারেই পৌছাননি,এমনকি তিনি একই বাক্য ব্যবহার করেছিলেন তার তত্ত্বাটকে ব্যাখা করতে..)

১৮৫৮ সালে জুন ৩০, সোসাইটির সদস্যরা প্রথম বারের মত ডারউইনের ১৮৪৪ সালে লেখা প্রবন্ধটির সার সংক্ষেপ, এবং ১৮৫৭ সালে তার তত্ত্বের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে হুকারকে লেখা একটি চিঠির কিছু অংশ এবং ডারউইনকে পাঠানো ওয়ালেস এর প্রবন্ধটি শোনেন; তার বিশ বছরের সতর্ক গবেষনা আর এটি প্রকাশ করার বিষয়ে তার ইতস্ততার ইতি হয় হঠাৎ করে; এখন সারা পৃথিবী বিচার করার পালা। কিন্তু তেমন কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া শুরুতে আসেনি; ডারউইন এবং ওয়ালেস এর পেপারটি পড়া হয়েছিল লীনিয়ান সোসিইটির দীর্ঘ একটি অধিবেশনে প্রায় তাড়াহুড়ো করেই..এবং নীরবতাই পেপার দুটির ভাগ্যে জুটেছিল সেই মুহুর্তে; হয়তো সেগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত, বা সদস্যরা যথেষ্ট নম্র ছিল যে তারা অনুধাবন করতে পারেননি সেমুহুর্তে ডারউইন এবং ওয়ালেস আসলে কি প্রস্তাব করেছেন তাদের যুগান্তকারী দুটি প্রবন্ধে।


(ছবি: লিনিয়ান সোসাইটিতে ডারউইন রাসেল যৌথ পেপার পড়ার শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মারক প্লেক)

এর পর ডারউইন সিদ্ধান্ত নিলেন একটি বৈজ্ঞানিক জার্ণালে এ বিষয়ে তার মূল যুক্তিগুলো তুলে ধরবেন বিস্তারিতভাবে; এর পরের মাসে ডারউইন অনেক চেষ্টা করলেন তার সুবিশাল প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটিকে ছোট একটি সারসংক্ষেপ আকারে নিয়ে আসার, যেন তিনি তা জার্ণালে প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু যতই দিন যেতে লাগলো তার সেই সার সংক্ষেপই আবারো আকার নিতে শুরু করলো একটি পুর্ণাঙ্গ বইয়ের; কিছু করার ছিল না তার, ডারউইনের কাছে অনেক বেশী যুক্তি তর্ক প্রস্তাব এবং প্রমান ছিল যা যে কোন সম্ভাব্য প্রতি আক্রমন যা তিনি জানতেন অবশ্যই আসবে, তাদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারে; তিনি জন মারে র সাথে যোগাযোগ করেন, তার আগের বইটির লন্ডন ভিত্তিক প্রকাশক, এবং জিজ্ঞাসা করেন তিনি তার আরেকটি নতুন বই প্রকাশ করতে আগ্রহী কিনা ;তার Journal of Researches বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, সুতরাং মারে ডারউইনের নতুন বই প্রকাশে রাজী হলেন সাথে সাথেই; এই বইটি নামই On the Origin of Species by Means of Natural Selection;


(ছবি: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাডক্লিফ সায়েন্স লাইব্রেরীতে দ্য অরিজিন অব স্পিসিস এর প্রথম সংস্করণের সাথে প্রাণিবিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স)

বইটি লেখার সময়ই ডারউইন বেশ গুরুতর অসুস্থ্ হয়ে পড়েছিলেন তবে, রাজকীয় সবুজ রঙের কাপড়ে বাধাই প্রথম কপিটি তার হাতে এসে পৌছায়, ১৮৫৯ সালের নভেম্বর মাসে; ইয়র্কশায়ারের একটি বিশ্রামাগারে তিনি আরোগ্য লাভ করছিলেন, এর পরপরই তার জন্য সৌজন্য কপিগুলো আসে, ডারউইন সবার প্রথমেই ওয়ালেসকে একটি কপি তার ইন্দোনেশিয়ার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন; এবং বইটির সাথে ছোট একটি চিরকুট লিখে দিয়েছিলেন, ‘ঈশ্বরই জানেন, মানুষ কি ভাববে’।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − 60 =