বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (নবম পর্ব)

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: চিহুয়াহুয়া (Chihuahua) এবং গ্রেট ডেন (Great Dane): দুজনেই চামড়ার নীচে আসলে নেকড়ে।মাত্র কয়েক শতাব্দীর কৃত্রিম নির্বাচন বা সিলেকটিভ ব্রিডিং এর ফলে সৃষ্ট এই দুই জাতের কুকুরের ব্যাহ্যিক চেহারা দেখে তা কি অনুমান করা সম্ভব? গ্রে উলফ (Canis lupus) এর একটি উপপ্রাজাতি মানুষের প্রিয় প্রাণি সহচর কুকুর ( Canis lupus familiaris); বর্তমান সব জাতের কুকুরের বংশধারা ধারণা করা হয় ১৫,০০০ বছর আগে গ্রে উলফ প্রজাতিকে গৃহপালিত করন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সূচনা হয়েছিল। যদিও ৩৩,০০০ হাজার বছর আগেও গৃহপালিত কুকুরের চিহ্ন মিলেছে, তবে আগের লিনিয়েজগুলো টেকেনি।)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম | ষষ্ঠ| সপ্তম | অষ্টম)


এভাবে দেখা জীবনকে দেখার মধ্যে আছে আরো বেশী আসাধারণত্ব আর মাহাত্ম্য

Origin of Species বইটির মুল যে যুক্তি তর্কটি এসেছে, সেটি বিবর্তিত হয়েছিলো ১৮৪৪ সালের ডারউইনের সেই আগের লেখাটির আদিরুপ থেকেই, তবে এখন এটির ব্যপ্তি আরো বর্ধিত হয়েছে, যা পৃথিবীর সব জীবনের একটি সর্বব্যাপী ব্যাখ্যা। বহুদূরের সেই গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ কিংবা প্রবাল প্রাচীরে ঘেরা সমুদ্রের সেই বিষন্ন গভীরতা থেকে কিন্তু ডারউইন তার প্রস্তাবিত তত্ত্বের পক্ষের যুক্তিগুলো শুরু করেননি; তার যুক্তিগুলোর সূচনা ভিত্তি ছিল খুব সাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা, স্বাচ্ছন্দ্যময় ইংলিশ জীবনযাত্রায়। তিনি অসংখ্য আকার আকৃতির প্রাণি এবং উদ্ভিদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন, যাদের বৈশিষ্ট্যসুচক সেই বহু বিচিত্র রুপ গড়ে উঠেছে মানুষ ‍খামারী বা ব্রীডারদের হাতের ছোঁয়ায় ; যারা কবুতরের প্রজনন করান, তারাই ফ্যানটেইল জাতের কবুতরে লেজে সাধারণত যতটুকু পালক থাকে তা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বহুগুনে, কিংবা জাকোবিন জাতের কবুতরে গলার পালককে রুপান্তরিত করেছিলেন একটি বেশ বড় একটি আচ্ছাদনী বা হুডে; এই সব বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকৃতিতে যথেষ্ঠ হবে কোনো পাখিকে একটি একক প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য, অথচ ব্রীডাররা তাদের সৃষ্টি করেছেন মাত্র কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে ও তারা একই প্রজাতি।


(ছবি: ইংলিশ ফ্যানটেইল পিজিওন)


(ছবি: jacobin pigeon)

ডারউইন তার সময়ের বিদ্যমান তথ্যে বন্দী ছিলেন, তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, আসলে কেউ বুঝতে পারেননি কিভাবে বংশগতি এই ব্রীডারদের এই অত্যাশ্চর্য বিচিত্র রুপের সৃষ্টি করতে অনুমতি দিচ্ছে। ব্রীডাররা তাদের অভিজ্ঞতায় শুধু বুঝতে পারতেন এবং জানতেন কোন কোন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রবণতা আছে একই সাথে বা একগুচ্ছ হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হবার ; নীল চোখের বিড়াল, যেমন অবশ্যই কানে শোনে না বা বধির হয়।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ছবি: কয়েকটি ব্রীডের কুকুর (উপরে বা দিক থেকে): বুলডগ, বক্সার, ডাখশুন্ড;( মধ্যে বা দিক থেকে): ব্যাসেট হাউন্ড, বরজোয়, ল্যাব্রাডর রিট্রিভার,(নীচে: বা দিক থেকে): পুডল, ল্যাবরাডুডল, স্কটি)

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: কয়েকটি ব্রীডের কুকুর (উপরে বা দিক থেকে: পেকিনেস, ডালমেশিয়ান,পোমেরানিয়ান, নীচে বা দিক থেকে: হুইপেট, স্প্যানিয়েল, সেন্ট বার্ণাড)

যদিও বংশগতি তখনও রহস্যময়, তারপরও এটা সবার কাছে স্পষ্ট ছিলো, পিতা মাতা এমন সন্তানের জন্ম দেন, তারা সাধারণত তাদের মতই হবার প্রবণতা থাকে, যদি প্রতিটি প্রজন্মই তার নিজস্ব কিছু না কিছু প্রকরন বা ভ্যারিয়েশন নিয়েই জন্ম গ্রহন করে; আপনার যদি প্রকৃতিতে বা কোন বনে ফ্যানটেইল বা জাকোবিন জাতের কবুতর নজরে পড়ে, আপনি ভাবতেই পারেন যে তারা হয়তো ভিন্ন দুটি প্রজাতি, কিন্তু বিস্ময়করভাবে তারা একে অপরের সাথে প্রজননক্ষম এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে; আসলেই ডারউইনই দেখিয়েছিলেন, প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রজাতি এবং নানা প্রকারের মধ্যে পার্থক্য করা খুবই কঠিন; যেমন জীববিজ্ঞানীরা তর্ক করেন বেশ কিছু ধরনের ওক গাছ কি আসলে আদৌ একই প্রজাতির সদস্য কিনা।

ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন যে এই ভ্যারাইটি বা প্রকরণগুলো নিয়ে উদ্ভুত সংশয়ের কারণ হচ্ছে প্রজাতি হিসাবে এই সব বিভিন্ন প্রকারের প্রকরণের মধ্যে কিছু মৌলিক সদৃশ্যতা বিদ্যমান; এবং এর কারণ হচ্ছে এই ভ্যারাইটি বা নানা প্রকারের সদস্যরা নিজেই ভবিষ্যত প্রজাতির শুরুর প্রাথমিক একটি অবস্থা যারা এখনও বৈশিষ্ট্য সূচক ভিন্ন প্রজাতিতে পুরোপুরি বিবর্তিত হয়নি ; তাহলে কিভাবে একটি এখনও পুরোপুরি হয়নি এমন কোনো প্রজাতি, একটি বৈশিষ্ট্যসূচক পূর্ণ প্রজাতিতে রুপান্তরিত হয়?

এখানে ডারউইন মালথাসকে তার যুক্তিতে নিয়ে আসেন; এমনকি খুব ধীরে প্রজনন করা প্রজাতি যেমন মানুষ কিংবা কনডরাও( পাখি) তাদের সংখ্যা দ্বিগুন করে ফেলতে পারে ২০ বা ৩০ বছরের ব্যবধানে; এবং কয়েক হাজার বছরে সারা পৃথিবী তারা পুর্ণ করতে পারে তাদের সদস্য দিয়ে। কিন্তু বৃক্ষ আর প্রাণিরা নিয়মিত ভাবে মারা যাচ্ছে অকল্পনীয় বিশাল বড় একটি সংখ্যায়, ডারউইন তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানতেন কিভাবে এক বছরেই ডাউন হাউসের চারপাশে একবার তীব্র শীতে পাখির সংখ্যা কমে গিয়েছিল প্রায় ৮০ শতাংশ; আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে প্রকৃতির শান্ত প্রতিচ্ছবির পেছনের লুকানো আছে বিশাল নিরন্তর ভাবে ঘটতে থাকা হত্যাযজ্ঞ; প্রজাতির কিছু সদস্য বেঁচে থাকে নানা চ্যালেন্জ মোকাবেলা করে, তার কিছু কারণ হচ্ছে ভাগ্য, আর অন্যরা, যাদের কিছু বৈশিষ্ট্যই হয়তো থাকে যা তাদের মৃত্যুর উচ্চ প্রবণতার কারণ হয়ে দাড়ায়; যারা বেঁচে থাকে তারাই প্রজননক্ষম হবার সময় আর প্রজনন করার সুযোগ পায়, অন্যদিকে যারা ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না, তারা মারা যায়, তাদের প্রজননক্ষম হয়ে উঠে প্রজনন করার সম্ভাবনাও থাকে খুব কম।

প্রকৃতি, অন্যভাবে যদি বলা হয়, আসলে নিজেই একজন ব্রীডার বা প্রজনন নিয়ন্ত্রনকারী এবং মানব কোনো ব্রীডারের চেয়ে অবশ্যই যার ক্ষমতা আর দক্ষতা অনেক বেশী; একজন মানুষ ব্রীডার হয়তো কোন বিশেষ জাতের কবুতর ব্রীড করে শুধু একটি বা গুটিকয়েক বৈশিষ্ট্যের জন্য, যেমন তার লেজের বেশী সংখ্যক পালকে, কিন্তু প্রকৃতি ব্রীড করে অসংখ্য বৈশিষ্ট্য, শুধু রক্ত মাংশ শরীরের বৈশিষ্ট্যই না, তাদের অন্তর্গত প্রবৃত্তিও: ‘প্রকৃতি আভ্যন্তরীণ সকল অঙ্গ, গঠনগত বৈশিষ্ট্যের যে কোনো পার্থক্য, পুরো জীবনের যন্ত্রের উপর কাজ করে।’ ডারউইন লিখেছিলেন,‘মানুষ নির্বাচন করে শুধু তার নিজের স্বার্থে, আর প্রকৃতি কাজটি করে যে জীবনকে সে লালন করছে শুধু তার স্বার্থেই;’ আর মানুষ ব্রীডাররা কাজ করেন বছর বা দশকের সময়কালে, প্রকৃতির হাতে আছে অকল্পনীয় আর অপরিসীম সময়: ‘বলা যেতে পারে প্রাকৃতিক নির্বাচন সারা বিশ্ব জুড়ে প্রত্যহ , প্রতিটি ঘন্টায় বাছাই করে প্রতিটি প্রকরণকে, এমনকি সামান্যতম।’ ডারউইন লিখেছিলেন; ‘আমরা এই ধীর পরিবর্তনের গতি কিছুই দেখতে পাইনা, যতক্ষণ পর্যন্ত সময়ে ঘড়ির কাটা বহু যুগের সময় অতিক্রম না করে; যদি প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনো একটি প্রকরণের উপর কাজ করে যথেষ্ঠ পরিমান সময়ব্যাপী, এটি ‌একে রুপান্তরিত করতে পারে একটি নতুন প্রজাতিতে; প্রায় এক হাজার প্রজন্মান্তরে একটি একক প্রজাতির পাখি দুটি ভিন্ন প্রকারের বৈশিষ্ট্য নিয়ে রুপান্তরিত হতে পারে দুটি স্বতন্ত্র প্রজাতিতে; যেমন করে কোনো একটি প্রজাতির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দীতা করে টিকে থাকার জন্য, তারা অন্য প্রজাতিদের সাথেও সংগ্রাম করে একই কারণে; এবং দুটি সমতুল্য প্রজাতির মধ্যে সংগ্রামটি আরো বেশী তীব্র; ধীরে ধীরে এদের একটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়, এটাই ডারউইন যুক্তি দেন সেই সকল জীবাশ্ম প্রাণীদের অনুপস্থিতির কারণ যাদের অস্তিত্ব ‍আর এই পৃথিবীতে পাওয়া যায় না; তারা শুধু অদৃশ্যই হয়নি, তারা অন্য প্রাণিদের দ্বারা নিশ্চিহ্ন হয়েছিল।

?w=637&h=397″ width=”500″ />
(ছবি: আপনি কি জানেন, Brassica oleracea বা ওয়াইল্ড ক্যাবেজ বা ওয়াইল্ড মাষ্টার্ড নামে পরিচিত এই উদ্ভিদটি আমাদের পরিচিত প্রিয় অনেক সব্জীর পূর্বসূরি। হাজার বছর ধরে কৃষকরা এর উপর তাদের আর্টিফিসিয়াল বা কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছে আমাদের পরিচিত বাধাকপি, ফুলকপি আর ব্রকলী। (নীচের ছবি দেখুন) কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি বুনো প্রজাতি থেকে পেয়েছি একগুচ্ছ সব্জী)

?w=637&h=508″ width=”500″ />
(ছবি: কৃষকরা এই সব্জীর বৈচিত্র সৃষ্টি করেছেন কয়েক হাজার বছল ধরে, এবার ভাবুন কয়েকশ মিলিয়ন বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচন কেন পারবেনা জীবজগতের এত বৈচিত্রময়তার জন্ম দিতে।

?w=828&h=255″ width=”500″ />
(ছবি: বুনো সূর্যমুখী থেকে শস্য সূর্যমুখী (Helianthus annus); খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগে মধ্য আমেরিকার (মেক্সিকো) আদিবাসীরা এই ফুলটি প্রথম গৃহপালিতকরণ করেছিল।)

তার পাঠকদের সেই প্রক্রিয়াটি বোঝাতে ডারউইন একটি রেখাচিত্র একেছিলেন যা তার বইতে জায়গা পেয়েছিল, সবচেয়ে নীচে অল্প কিছু মুল প্রজাতি, যা কোন গাছের মূল কাণ্ডের মত উঠে এসেছে, এবং সময়ের পরিক্রমায় এটি বিভক্ত হয়েছে নতুন শাখা প্রশাখায়, এই শাখা প্রশাখার অনেকগুলোই সামান্য একটি ডাল মাত্র, যারা প্রতিনিধিত্ব করছে সেই নানা প্রজাতি বা প্রকরনের বা ভ্যারাইটির যারা বিলুপ্ত হয়েছে; কিন্তু তাদের কিছু পৃষ্ঠার উপর পর্যন্ত অতিক্রম করেছে নানা শাখায় বিভক্ত হয়ে; জীবন কোন বিশাল জীবিত প্রানীর ক্রমান্বয়ে সাজানো শৃঙ্খল বা চেইন না, ডারউইন বললেন, জীবন একটি একটি অসংখ্য ডালপালা ছড়ানো ঝোপের মত একটি গাছ।

Origin of Species অত্যন্ত গভীর একটি তত্ত্বকে সমর্থন করে লেখা মূলত আত্মরক্ষামূলক একটি বই, যা লিখেছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি বহুদিন ধরেই অন্য বিজ্ঞানীদের বিবর্তন সম্বন্ধে তীর্যক মন্তব্য শুনে এসেছেন, তার প্রতি সেই একই মন্তব্য হবে সেটা যেন তিনি আগে থেকে কল্পনা করেই নিয়েছিলেন ; তিন এক একটি করে তাদের সম্ভাব্য সব প্রতিযুক্তি খণ্ডন করেন; যদি পুরোনো প্রজাতি পরিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে, তাহলে কেন প্রাণিরা একে অপরের চেয়ে এত বেশী আলাদা দেখতে হবে: ‘এর উত্তর হচ্ছে দুটি পরস্পর সদৃশ প্রাণিদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দীতা তাদের যে কোনো একটিকে বিলুপ্ত করে’, সুতরাং এই মুহুর্তে জীবিত সকল প্রাণি আসলে সকল প্রজাতি যারা একসময় বেঁচে ছিল তাদের একটি নির্বাচিত বিচ্ছিন্ন ছড়ানো ছিটানো সংগ্রহ মাত্র।

কিন্তু তাহলে আমাদের কি জীবাশ্ম হিসাবে অন্তবর্তী বা মাঝামাঝি ফর্মগুলো দেখা উচিৎ না? ডারউইন তার পাঠকদের মনে করিয়ে দেন যে, জীবাশ্ম এর প্রকৃতি অনুযায়ী জীবনের ইতিহাসের অল্প কিছু অংশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে শুধু; কারণ জীবাশ্মতে রুপান্তরিত হতে হলে, কোন প্রানীর মৃতদেহ পাললিক শিলা বা পলির নীচে সঠিকভাবে সমাহিত হতে হবে, যা রুপান্তরিত হবে পাথরে এবং যা ধ্বংস হবে না ভুমিকম্পে বা অগ্ন্যুৎপাতে কিংবা ক্ষয়ীভবনের মাধ্যমে; এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত বেশী মাত্রায় ধীর,এবং প্রজাতিও তাই, যে প্রজাতির একসময় লক্ষ লক্ষ একক প্রাণি সদস্য ছিল, তাদের আমরা জানতে পারি শুধু মাত্র একটি বা গুটিকয়েক জীবাশ্ম থেকে; জীবাশ্ম রেকর্ডে তাই শূন্যস্থান থাকা আদৌ কোনো বিস্ময়কর কিছু মনে করা উচিৎ না, সেটাই বরং নিয়ম হওয়া উচিৎ: ‘ভূপৃষ্ঠ হচ্ছে বিশাল একটি মিউজিয়াম’, ডারউইন লিখেছিলেন, ‘কিন্তু প্রাকৃতিক সংগ্রহগুলো সেখানে তৈরী হয় শুধুমাত্র অকল্পনীয় সময়ের ব্যবধানে।’

কেমন করে প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন জটিল অঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে কিংবা সমস্ত শরীর, যার অসংখ্য স্বতন্ত্র অংশ বিদ্যমান? কেমন করে, যেমন এটি একটি বাদুড় বা কোন চোখের মত একটি অঙ্গ তৈরী করে? পুরো কাহিনী জীবাশ্ম বলবে এমন আশা করা ঠিক না, বরং ডারউইন জীবন্ত প্রানীদের উদহারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, নিদেনপক্ষে এমন কোন রুপান্তর আদৌ যে অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়; বাদুড়ের ক্ষেত্রে, তিনি কাঠবিড়ালীর উদহারণ দেন, অনেক গাছবাসী কাঠবিড়ালী চারটি সাধারণ পা এবং একটি পাতলা লেজ আছে, কিন্তু এমন প্রজাতিও আছে যাদের সরু লেজ ও পাতলা চামড়াও আছে, আবার এমনও কাঠবিড়ালী আছে তাদের লেজ আর পায়ের মাঝে চওড়া চামড়ার পর্দাও আছে; এবং তারা পারাস্যুটের মত তাদের ব্যবহার করে গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে ভেসে যেতে; এর পর ডারউইন আরো এমন বাতাসে গ্লাইড করা স্তন্যপায়ীদের কথা বলেন, যেমন ফ্লাইং লেমুর, যাদের শরীরের দুইপাশে বেশ চওড়া চামড়ার উপাঙ্গ আছে, যা চোয়াল থেকে শুরু হয় লেজ অবধি; চার পেয়ে স্তন্যপায়ীর এটি একটি হালকা ধাপে ধাপে নানা স্তরের বৈশিষ্ট্যর একটি উদহারন যার এক প্রান্তে আছে বাদুড়ের মত অ্যানাটোমি সহ প্রানী; সম্ভব হতে পারে যে বাদুড়দের পূর্বসূরি প্রাণিরাও বিবর্তনের এমন ধারাবাহিক ধাপগুলো অতিক্রম করেছিল এবং আরো কিছু ধাপ অতিক্রম করেছিল যেখানে তাদের সত্যিকারের ওড়ার জন্য তাদের মাংশপেশীর বিবর্তন হয়েছিল।

একই ভাবে কোনো প্রাণির মাথায় একবারে হঠাৎ করেই চোখের উদয় হবার কোনো প্রয়োজন নেই; অমেরুদণ্ডী যেমন, ফ্ল্যাট ওয়ার্ম দের আলোক সংবেদী পিগমেন্ট দিয়ে স্নায়ুর শেষ প্রান্ত আচ্ছাদন করে রাখা স্তর ছাড়া আর কিছু নেই, কিছু ক্রাষ্টাশিয়ানদের চোখ আছে, যা শুধুমাত্র একটি আলোক সংবেদী পিগমেন্ট স্তর যার উপর একটি পর্দা আছে; সময়ের সাথে সাথে এই পর্দাই পিগমেন্ট স্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্থুল গঠনের লেন্স হিসাবে কাজ করতে শুরু করে; ছোট ছোট পরিবর্তনের দ্বারা, এমন একটি চোখ রুপান্তরিত হতে পারে জটিল একটি সূক্ষ্ম টেলিস্কোপের মতো চোখে যা পাখি এবং স্তন্যপায়ীদের ব্যবহার করে; কারণ সামান্য দৃষ্টি শক্তি কোনো দৃষ্টিশক্তি না থাকার চেয়ে উত্তম; এবং এই উত্তরণের প্রতিটি নতুন ধাপকে টিকিয়ে রেখে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরের সুযোগ করে দিয়ে পুরষ্কৃত করে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিষয়টি আবিষ্কারের পর, ডার‌উইন অন্য বিজ্ঞানীদের ধারণার দিকে নজর ফেরান এবং প্রমাণ করে দেখান তাদের প্রস্তাবগুলো তার নিজের তত্ত্বের কাঠামোতে ব্যাখ্যা করলে কত অর্থবহ হয়ে ওঠে; তারুণ্যে ডারউইন উইলিয়াম প্যালির ভক্ত ছিলেন, কিন্তু এখন তিনি দেখালেন কিভাবে প্রাকৃতিক ডিজাইন কোনো স্বর্গীয় ডিজাইনার এর নিয়ন্ত্রন, প্রভাব আর উপস্থিতি ছাড়াই সৃষ্টি হতে পারে; কার্ল ভন বায়ের দেখিয়েছিলেন কিভাবে বিভিন্ন প্রাণীদের ভ্রুণ পরস্পর সদৃশ্যতা বহন করে একেবারে সূচনা লগ্নে এবং ধীরে ধীরে যারা ক্রমবিকশিত হয় বৈশিষ্ট্যসূচক ভিন্ন প্রাণির আকারে আরো নির্দিষ্ট হয়ে; ডারউইনের জন্য এটি সকল জীবের একটি সাধারণ বা কমন বংশ ঐতিহ্যের চিহ্ন; এবং ক্রমবিকাশের পর্যায়ে তাদের এই পার্থক্য আবির্ভূত হয়েছে তাদের সাধারণ পূর্বসূরি প্রাণি থেকে তাদের বিভাজনের পরে।


(ছবি: মলিক্যুলার বায়োলজির অগ্রগতি..ডারউইনের সেই কমন বংশধারার ব্যাপারটি বহু আগেই প্রমাণিত করেছিল। বর্তমানে জীবন বৃক্ষ দেখতে এরকম; এটি তৈরী করেছে ২০০৬ সালে ইউরোপীয় মলিকিউলার বায়োলজী ল্যাব… এখানে মানুষকে খুজে বের করুন।)

ডারউইন এমনকি ওয়েন এর আর্কিটাইপ বা আদিরুপের ধারণাটিও তার ব্যাখ্যায় আত্মীকরণ করতে সক্ষম হলেন; ‘আমি ওয়েন এর আদিরুপ বা আর্কিটাইপদের দেখি আদর্শের চেয়ে আরো বেশী কিছু , সবচেয়ে নিবেদিত শক্তি আর সবচেয়ে ব্যাপ্তিময় সাধারণীকরনের যত দুর সম্ভব তত বাস্তব একটি প্রতিফলন, যা প্রতিনিধিত্ব করে সকল মেরুদন্ডী প্রাণিদের পিতামাতাকে।’ এভাবে তিনি একবার তার এক সহকর্মীকে লিখেছিলেন; ওয়েন এর কাছে, বাদুড়ের ডানা এবং ম্যানাতির প্যাডেল এর সমরুপতা বা হোমোলজী প্রমাণ করে কিভাবে ঈশ্বরের মন কাজ করে, কিন্তু ডারউইনের কাছে এই সমরুপতা একটি কমন বংশধারার ঐতিহ্যের চিহ্ন; ডারউইন খুব সতকর্তার সাথে তার তত্ত্ব মানব জাতির ইতিহাস সম্বন্ধে কি বলে সে বিষয়টি নিয়ে বেশী কোনো বক্তব্যকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন; ‘আমি দূর ভবিষ্যতে দেখতে পাচ্ছি আরো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়েছে। মনোবিজ্ঞান একটি নতুন ভিত্তির উপর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে যা হলো ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি মানসিক শক্তি আর ক্ষমতা অর্জন করার উপর; এবং সেই সাথে মানুষের উৎপত্তি এবং তার ইতিহাসের বিষয়ে আমরা জানতে পারবো’।

রবার্ট চেম্বারস তার ভেস্টিজ বইটিতে যে ভুল করেছিলেন, ডারউইন সেই ভুল করবেন না সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; তার যুক্তি ছিল জোরালো, এবং সেখানে তিনি আবেগের কোনো জায়গা রাখেন নি; কিন্তু ডারউইন চেষ্টা করেছিলেন তার বই পড়ে কারো মনে জেগে ওঠা কিছু সম্ভাব্য হতাশাকে দুর করতে, তার বইয়ের শেষ পংক্তিগুলোতে তিনি তার অসাধারণ লেখণীতে লেখেন:

‘এইভাবে, প্রকৃতির যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর মৃত্যু থেকেই আমাদের পক্ষে ভাবা সম্ভব এমন সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন বস্তু, যেমন উন্নত প্রাণির সৃষ্টি, সরাসরি জড়িত। জীবনকে এইভাবে দেখার মধ্যে আছে একধরনের বিশালতা, ‍(জীবন) তার বহুমূখী ক্ষমতা দিয়ে সে সূচনা করেছিল এক কিংবা কয়েকটি আকার নিয়ে; খুব সাধারণ সেই সূচনা থেকে সেটাই, এই গ্রহটি যখন মাধ্যাকর্ষণের ধরাবাধা নিয়ম মেনে মহাকাশে চক্রাকারে ঘুরে চলেছে, বিবর্তিত হয়েছে যা কিছু ছিল আর বর্তমানে আছে এমন অগনিত সুন্দর আর বিস্ময়কর নানা আকার আর প্রকৃতির জীবনে’।


নরবানর বনাম বিশপ এবং একটি ধারণার বিজয়

সেবার শীতে বেশ প্রবল তুষার ঝড়ে ইংল্যান্ড যখন গৃহ বন্দী, অন্তত হাজার খানেক মানুষ ডারউইনের বইয়েই উষ্ণতা খুজে পেলেন, বইটির প্রথম সংস্করণের ১২৫০ কপি একদিনে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, জানুয়ারী ৩ তারিখে, আরো ৩০০০ কপি ছাপা হলো, হাক্সলী ডারউইনকে চিঠি লিখলেন প্রশংসা করে এবং সেই সাথে তাকে সতর্ক করে দিলেন, আসন্ন যুদ্ধেরও, ‘আমি আমার নোখ আর ঠোট শানাচ্ছি প্রস্তুতিতে..’, তিনি প্রতিজ্ঞা করেন। বইটি আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সংবাদপত্র কেবল সংক্ষিপ্ত একটি প্রবন্ধ ছাপিয়েছিল বইটির বিষয়ে কিন্তু রিভিউ বা পর্যালোচনা, যার মাধ্যমে উনবিংশ শতাব্দীতে নানা বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতো বিজ্ঞানী এবং সাহিত্যিক সমাজে, সেখানে ডারউইনের বইটি নিয়ে আরেকটু গভীরে আলোচনা করা হয়; হাক্সলী এবং অন্য মিত্ররা ডারউইনকে সমর্থন করেন প্রশংসা করে, কিন্তু অনেক রিভিউ এটিকে ব্লাসফেমী বা ধর্মদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করে; দ্য কোয়ার্টালী রিভিউ দাবী করে ডারউইনের তত্ত্ব ‘সৃষ্টির সাথে সৃষ্টিকর্তার সম্পর্ক যা উন্মোচিত হয়েছে ধর্মগ্রন্থে’ সেই বিষয়কে চ্যালেন্জ করেছে এবং বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করেছে এবং এটি তার ”মহান মহিমার সাথে অসামন্জষ্যপূর্ণ।’


(ছবি: বিবর্তন তত্ত্বের সেই শুরুর দিকে যে মানুষটি একে প্রতিষ্ঠা করার জন্য লড়েছিলেন তিনি হাক্সলী; ডারউইন কখনোই সরাসরি কারো সাথে বিতর্ক বা দ্বন্দে যাননি, তার হয়ে সেই কাজটি করেছিল তার বন্ধুরা, বিশেষ করে হাক্সলী; লন্ডনের ন্যাচারল হিস্টি মিউজিয়ামে হাক্সলীর ভাস্কর্য।)

কিন্তু যে রিভিউটি ডারউইনকে সবচেয়ে ক্ষুদ্ধ করেছিল সেটি প্রকাশ করেছিল দি এডিনবরা রিভিউ, ১৮৬০ সালের এপ্রিল মাসে, সেখানে কোন নাম ছিল লেখকের, কিন্তু যারা ইংল্যান্ডের জীববিজ্ঞানের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রিচার্ড ওয়েন এর লেখনূীর সাথে পরিচিত ছিলেন তারা বুঝতে পেরেছিলেন, আসলে বেনামে এই লেখাটি তিনি লিখেছেন, লেখাটির মধ্যে শক্রতাপূর্ণ মনোভাব ছিল চমকে দেবার মত; ওয়েন ডারউইনের বইটিকে বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের একটি চুড়ান্ত অপব্যবহার’, তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডারউইন ও তার শিষ্যরা এমন একটা ভান করছেন যেন প্রাকৃতিক নির্বাচনই হচ্ছে একমাত্র সম্ভাব্য প্রাকৃতিক সৃষ্টির আইন’। ওয়েন নিজে কিন্তু আসলে বিবর্তনের বিরুদ্ধে ছিলেন না কখনোই, তিনি শুধু যা পছন্দ করেননি তা হলো ডারউইনের প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার, যা তার কাছে মনে হয়েছে অন্ধ বস্তুবাদিতা; কিন্তু তারপরও ডারউইন যা করতে পেরেছিলেন,ওয়েন সেটা পারেননি, ওয়েন চেষ্টা করেছিলে জীববিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারকে সংশ্লেষণ করতে, কিন্তু তার ফলাফল হয়েছিল অস্পষ্ট ঘোলাটে আদিরুপ এবং ঈশ্বরের নিরন্তর সৃষ্টি ধারণাটি; কিন্তু অন্যদিকে ডারউইন সফল হয়েছিলেন প্রজাতিদের মধ্যে সদৃশ্যতাকে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে যা কাজ করে যাচ্ছে প্রতিটি জীবিত প্রজন্মে; ওয়েন আসলেই ক্রোধান্বিত হয়ে লিখেছিলেন তার রিভিউটি, তার রাগ ছিল ডারউইন এবং হাক্সলী, দুজনের উপরেই।

?oh=2c0b66752ddd96d123bd7a150f8f639f&oe=58A83631″ width=”500″ />
(ছবি: ওয়েন ডারউইনের বইটিকে বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের একটি চুড়ান্ত অপব্যবহার’; তিনি অভিযোগ করেন, ‘ডারউইন ও তার শিষ্যরা এমন একটা ভান করছেন যেন প্রাকৃতিক নির্বাচনই হচ্ছে একমাত্র সম্ভাব্য প্রাকৃতিক সৃষ্টির আইন;’ ওয়েন নিজে কিন্ত আসলে বিবর্তনের বিরুদ্ধে ছিলেন না কখনোই, তিনি শুধু যা পছন্দ করেননি তা হলো ডারউইনের প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ার, যা তার কাছে মনে হয়েছে অন্ধ বস্তুবাদিতা; কিন্তু তারপরও ডারউইন যা করতে পেরেছিলেন,ওয়েন সেটা পারেননি, ওয়েন চেষ্টা করেছিলে জীববিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারকে সংশ্লেষণ করতে, কিন্তু তার ফলাফল হয়েছিল অস্পষ্ট ঘোলাটে আদিরুপ এবং ঈশ্বরের নিরন্তর সৃষ্টি ধারনাটি; কিন্তু অন্যদিকে ডারউইন সফল হয়েছিলেন প্রজাতিদের মধ্যে সদৃশ্যতাকে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সফলভাবে ব্যাখ্যা করতে যা কাজ করে যাচ্ছে প্রতিটি জীবিত প্রজন্মে; ওয়েন আসলেই ক্রোধান্বিত হয়ে লিখেছিলেন তার রিভিউটি, তার রাগ ছিল ডারউইন এবং হাক্সলী, দুজনের উপরেই।)

হাক্সলী ওয়েনকে তার উন্মুক্ত বক্তৃতার সময় এমন তীব্রভাবে আক্রমন করতেন যে তিনি হতবাক হয়ে যেতেন; হাক্সলী ওয়েনকে তীব্র অপছন্দ করতেন, বিশেষ করে অভিজাত বিত্তবান শ্রেণীর একজন প্রতিনিধি হিসাবে সমাজের সেই শ্রেণীর মধ্যে ওয়েন যেভাবে তার নানা কাজের জন্য বিশেষ অনুগ্রহ আর পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন মুলত তার জন্য। হাক্সলী একে রদ্দি মার্কা বিজ্ঞান বলতেন; তিনি ওয়েন এর নিরন্তর সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে অবাস্তব গালগপ্প বলে ঠাট্টা করতেন, ওয়েন এত বেশী রেগে গিয়েছিলেন তার ঠাট্টায় যে একবার একটি পাবলিক বক্তৃতা চলাকালীন সময় তিনি ক্রদ্ধ হয়ে হাক্সলীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যে ব্যক্তি কিনা জীবাশ্ম রেকর্ডে ধারাবাহিক ভাবে স্বর্গীয় বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ দেখতে পারেন না, তার অবশ্যই কোনকিছু , হয়তো জন্মগত, সমস্যা আছে তার মানসিক ক্ষমতায়।’

সবচেয়ে হিংস্র দ্বন্দ্বটি ঘটে Origin of Species প্রকাশের ঠিক এক ব্ছর আগে, যখন ওয়েন প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন মানুষরা অন্য প্রাণিদের থেকে বিশেষভাবে আলাদা, ১৮৫০ এর দশকেই ওরাঙ উটান, শিম্পান্জি,গরিলা ইত্যাদি প্রাণিদের বিজ্ঞানীদের গবেষণা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল এবং ওয়েন তাদের শরীর ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন, তাদের কংকাল নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, বেশ পরিশ্রম করেছিলেন সেই সব চিহ্ন খুজে বের করতে যা মানুষ থেকে তাদেরকে আলাদা করতে পারে; যদি আমরা নরবানর বা এইপদের একটি ভ্যারিয়েশন হয়ে থাকি তাহলে নৈতিকতার ধারণাটির পরিণতি কি হবে?

অন্য প্রাণীদের থেকে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী মানুষকে আলাদা করে, ওয়েন মনে করেন সেটি আমাদের মানসিক দক্ষতা, আমাদের কথা বলা এবং যুক্তি প্রদান করার ক্ষমতা; সেকারণে ওয়েন ‌এইপদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন দুটি মস্তিষ্কের গঠনগত কি মৌলিক পার্থক্য আছে; ১৮৫৭ সালে তিনি দাবী করেন তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য খুজে পেয়েছেন: এইপদের মস্তিষ্কের ব্যতিক্রম মানুষের ব্রেনে তার উপরের সেরিব্রাল হেমস্ফেয়ারটি পেছনদিনে বেশ খানিকটা সম্প্রসারিত হয়ে তৃতীয় একটি লোব তৈরী করে, যার নাম ওয়েন দিয়েছিলেন হিপপোকাম্পাস মাইনর; ওয়েন দাবী করেন এই বৈশিষ্ট্যর অনন্যতাই মানুষের জন্য্ একটি আলাদা উপশ্রেণী সৃষ্টি করার দাবী রাখে; আমাদের মস্তিষ্ক শিম্পান্জি থেকে আলাদা, যেমনটা শিম্পান্জির মস্তিষ্ক আলাদা প্লাটিপাস থেকে;
হাক্সলে সন্দেহ করেছিলেন যে ওয়েন তার এই ধারণায় পৌছেছেন খারাপভাবে সংরক্ষণ করা কোনো মস্তিষ্কের নমুনা নিয়ে গবেষণা করার কারণে; তার এই বিস্তারিত শ্রেনীবিন্যাস গড়ে উঠেছে একটি মৌলিক ভ্রান্তির উপর নির্ভর করে (হাক্সলীর ভাষায় তারা দৃষ্টিকটু, যেমন গোবরের মধ্যে করিন্থিয়ান পোর্টিকো যেন দাড়িয়ে আছে); আসলেই, হাক্সলী যুক্তি দেন যে, গরিলার মস্তিষ্ক বেবুনের মস্তিষ্কের তুলনায় যতটুকু ভিন্ন, মানুষের মস্তিষ্কের তুলনায় গরিলার মস্তিষ্ক তার চেয়ে বেশী ভিন্ন নয়, ‘না আমি না, যে কিনা ‍মানুষের অবস্থানকে মর্যাদাকে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের উপর স্থাপন করার চেষ্ট‍া করছে বা বলতে চাইছেন যে আমাদের কোনো ‍গতি নেই যদি কোনো এইপদের একটি হিপপোকাম্পাস মাইনর থাকে’, হাক্সলী লিখেছিলেন, ‘বরং আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি মিথ্যা অহংকারকে বিদায় করতে।’

ডারউইনের বইটি নিয়ে ওয়েন এর হিংসাত্মক রিভিউটি হাক্সলীর সাথে তার চলমান দ্বন্দটাকে আরো উসকে দিয়েছিল এবং অবশেষে এর কয়েকমাস পর, ১৮৬০ এর জুন মাসে এই দ্বন্দ চুড়ান্ত রুপ ধারণ করে; সেবছর British Association for the Advancement of Science অক্সফোর্ডে তাদের বার্ষিক সভার আয়োজন করেছিল,যেখানে জমায়েত হন কয়েক হাজার মানুষ; এই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হবার সুবাদে ওয়েন, জুনের ২৮ তারিখ একটি বক্তৃতা দেবার সিদ্ধান্ত নেন এবং উদ্দেশ্য সেখানে আবারো ব্যাখ্যা করবেন কিভাবে মানুষের ব্রেইন এইপদের থেকে আলাদা; এখানে একটি আকস্মিক প্রতি আক্রমনের পরিকল্পনা আটেন হাক্সলী; ওয়েন এর বক্তৃতা শেষ পর্যায়ে তিনি উঠে দাড়িয়ে ঘোষনা করেন যে, তিনি সম্প্রতি স্কটিশ একজন অ্যানাটোমী বিশেষজ্ঞর কাছ থেকে চিঠি পেয়েছেন, যিনি শিম্পান্জির ব্রেইন ব্যবচ্ছেদ করেছেন, এবং সেই অ্যানাটোমি বিশেষজ্ঞ দেখেছেন, সেটি দেখতে বিস্ময়করভাবে মানুষের ব্রেইনের মত, যেখানে হিপপোকাম্পাস মাইনরও আছে; ঘর ভর্তি দর্শকসহ মানুষের সামনে ওয়েন এর আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলার উপায় ছিল না, তাকে সবার সামনে অপমান করার জন্য হাক্সলী এর চেয়ে কোনো জায়গা আর কোথাও খুজে পেতেন না।

সেই ব্রেইন এর যুদ্ধে জয় লাভ করার পর হাক্সলী পরের দিন অক্সফোর্ড মিটিং ছেড়ে লন্ডনে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেন; কিন্তু তখনই তার সাথে দেখা হয় রবার্ট চেম্বারস এর সাথে, তখনও তিনি ভেস্টিজের বেনামী লেখক; হাক্সলীর মিটিং ছেড়ে চলে যাবার কথা শুনে চেম্বারস রীতিমত শঙ্কিত হলেন, কারণ তার ধারণা নেই আগামীকাল ওয়েন কি করে বসেন; গুজব ছিল অক্সফোর্ড বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স ডারউইনকে আক্রমন করবেন; বহু বছর ধরেই উইলবারফোর্স বিবর্তনের বিরুদ্ধে ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে উচ্চ কণ্ঠ ছিলেন; ১৮৪৪ সালে তিনি চেম্বারস এর লেখা ভেস্টিজ বইটিকেও ক্রমন করেছিলেন, এখন বিশপের চোখে ডারউইনের এই নতুন বইটি তার ব্যতিক্রম কিছু নয়; পরের দিন একজন আমেরিকার বিজ্ঞানীর, জন উইলিয়াম ড্রেপার এর বক্তৃতা দেবার কথা, তার বিষয় ছিল, ডারউইনবাদ ও সমাজে তার সম্ভাব্য প্রভাব; উইলবারফোর্স এই সুযোগটাই নিতে চাইলেন জনস্বমক্ষে ডারউইনকে আক্রমন করার জন্য, ব্রিটেন এর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বৈজ্ঞানিক সভায়; আর ওয়েনও অতিথি হিসাবে উঠেছিলেন এই উইলবারফোর্সের বাসায়, এবং কোনো সন্দেহ নেই তিনি বিশপকে কোচিং দিচ্ছেন কিভাবে আক্রমন করতে হবে; চেম্বারস সহজেই হাক্সলীকে রাজী করালেন ড্র্যাপারের ভাষনের পর পর্যন্ত থাকতে এবং ডারউইনের বিরুদ্ধে আক্রমন প্রতিরোধ করার জন্য।

পরের দিন সভার সূচনা করেন ওয়েন, পুরো অডিটোরিয়াম ভর্তি মানুষ, তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি ঘোষণা দেন: ‘আসুন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজে আমরা আমাদের সঠিকভাবে নিবেদন করি, এভাবে আমরা যতই অনুশীলন করতে পারবো ততই আমরা নিশ্চিৎ হতে পারবো, এবং এই অনুশীলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তার উৎকর্ষ করতে পারবো, এবং আমরা এভাবে যত বেশী যোগ্য হয়ে উঠতে পারবো, আমরা তত বেশী উপযুক্ত হবো আমাদের ঈশ্বরের কাছাকাছি আসার’। ড্রেপারের বক্তৃতার শিরোনাম ছিল, On the Intel ectual Development of Europe, Considered with Reference to the Views of Mr. Darwin and Others, That the Progression of Organisms Is Determined by Law; যে বক্তৃতাটি যথেষ্ট নিরস, দীর্ঘ আর ভালো যুক্তি সম্পন্নও ছিল না; দর্শকের আসনে সেদিন জোসেফ হুকারও ছিলেন, যিনি ড্রেপারের ভাষণটিকে বর্ণনা করেছিলেন, মজাদার স্টু হিসাবে; ভাষণটি মিলনায়তনের দর্শকদের খানিকটা উষ্ণ আর তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তুলেছিল ঠিকই, তা সত্ত্বে কেউই হল ছেড়ে বের হননি; তারা বিশপের ভাষণ শুনতে চান।

ড্র্যাপার শেষ করলে, উইলবারফোর্স উঠে দাড়িয়ে তার বক্তব্য শুরু করেন; তিনি সম্প্রতি ডারউইনের বই নিয়ে একটি রিভিউ লিখেছিলেন, এই ভাষণটা সেই লেখাটাকে গড়ে পিটে তৈরী করে নেয়া হয়েছে বক্তৃতা হিসাবে ব্যবহার করার জন্য; তিনি কোনো ভনিতা করলেন না এই বলে যে, বাইবেলকে বিজ্ঞানের কোন কিছুর মানদণ্ড হিসাবে নেয়া উচিৎ, কিন্তু রিভিউতে তিনি লিখেছিলেন, ‘তার মানে এই না যে, বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ভুলগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা কোনো অংশেই কম গুরুত্বপুর্ণ , যখন সেই ভুলগুলো সৃষ্টিতে ঈশ্বরের মহিমাকে খর্ব করে; ডারউইন এমন কিছু ভুলই করেছেন, বেশ কিছু লাগামহীন কল্পনা আর ধারণার উপর ভিত্তি করেই তার বইটি বর্নিত; তার সমস্ত যুক্তির ভারসাম্যটি নির্ভর করে আছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের নতুন ধারণাটির উপর’। এবং তাসত্ত্বেও উইলবারফোর্স লেখেন, ‘এমন কোনো উদহারণ কি কখনো পাওয়া গেছে? আমরা নির্ভয়ে বলতে পারি, একটিও না।’ বরং উলবারফোর্স প্যালি এবং ওয়েন একটি হালকা মিশ্রণ প্রস্তাব করেন, সব সৃষ্টি হচ্ছে সবচেয়ে শ্রেষ্ট এবং সর্বোচ্চ মহান ঈশ্বরের মনের চিরন্তন বিদ্যমান ধারণারই অনুলিপি –এবং যার সুশৃঙ্খল বিন্যাসে প্রতীয়মান এর নিখুঁততা যা তার সব সৃষ্টিতেও দৃশ্যমান, কারণ এটির অস্তিত্ব সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠ এবং সব কিছুর প্রভুকে কেন্দ্র করেই’। যখন উইলবারফোর্স তার ভাষণ শেষ করেন, তিনি হাক্সলীর দিকে তাকান, খানিকটা উপহাস করে, তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তার পিতামহ নাকি পিতামহী, কোন দিকে, তিনি এইপদের বংশধারায় জন্ম নিয়েছেন’।

?oh=90b7ae0e1eba56f7990f3120131bb83f&oe=586637CD” width=”500″ />
(ছবি:অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাচারাল হিস্ট্রী মিউজিয়ামে হাক্সলি এবং উইলবারফোর্সের এই বিতর্কটির স্মারক স্তম্ভ, বিতর্কটি ডারউইনের তত্ত্বের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সেই সময়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রেখেছিল।)

পরে হাক্সলী ডারউইন ও অন্যদের বলেছিলেন, সেই মুহুর্তে তিনি তার পাশে বসা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে তার হাটুর উপর হালকা আঘাত করে বললেন, ‘প্রভু অবশেষে আমার হাতে তাকে তুলে দিয়েছেন’। তিনি উঠে দাড়িয়ে, উইলবারফোর্সকে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন, তিনি বলেন, ‘এই বিশপ এমন কিছু বলেননি যা আদৌ নতুন কিছু, শুধুমাত্র হাক্সলীর বংশপরিচয়ের বিষয়ে তার প্রশ্নটি ছাড়া’; এমনকি তাসত্ত্বেও, আমি বলেছিলাম, ‘যদি আমাকে এই প্রশ্ন করা হয় যে, আমি কি কোনো হতভাগ্য নরবানর বা এইপকে আমার পিতামহ হিসাবে বেছে নেবো, নাকি এমন কোনো মানুষকে, যাকে প্রকৃতি নানা ক্ষমতায় বিশেষায়িত করেছে, তার অনেক কিছু করার এবং প্রভাবিত করার ক্ষমতা আছে কিন্তু তারপরও সে তার সেই যোগ্যতাগুলো ব্যবহার এবং প্রভাবিত করে কোনো গুরুত্বপুর্ণ বৈজ্ঞানিক আলোচনায় শুধুমাত্র কাউকে পরিহাস করতে, আমি কোনো ইতস্ততাই ছাড়াই আমার পিতামহ হিসাবে বেছে নেবো সেই নরবানকে’। উপস্থিত সবাই হাক্সলীর ‍উত্তরে হেসে উঠেন, হাসি দীর্ঘায়িত হয়, যতক্ষণ ‍না পর্যন্ত্ একজন ব্যক্তি, যাকে হুকার বর্ণনা করেছিলেন, ধুসর চুলের রোমানদের মতো নাক বিশিষ্ট এক বয়স্ক ভদ্রলোক, দর্শকের সারিতে উঠে দাড়ালেন ক্রোধে কাপতে কাপতে, মানুষটি ডারউইনের বীগলের সহযাত্রী সেই ক্যাপ্টেন ফিটজরয়।

দেশে ফেরার পর থেকে ক্যাপ্টেন ফিটজরয়ের সাথে ডারউইনের সম্পর্ক ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে; ক্যাপ্টেন ভাবতেন বিগলের সমুদ্রযাত্রার যে বইটি ডারউইন লিখেছিলেন সেটা বেশী আত্মকেন্দ্রীক, ডারউইন তাকে কিংবা জাহাজের নাবিকদের যারা তাকে বেশ সাহায্য করেছিল,তাদের যথেষ্ট পরিমান স্বীকৃতি দেননি, যদি ফিটজরয় লাইয়েল এর ancient geology খানিকটা হালকা ভাবে পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি পরে কঠোরভাবে বাইবেলে ফিরে গিয়েছিলেন, সমুদ্রযাত্রা সম্বন্ধে তার নিজের বইয়ে তিনি ডারউইন ও তার, নোয়ার সেই মহাপ্লাবনের চিহ্ন দেখার কথা বর্ণনা করার চেষ্টা করেন; কিন্তু তিনি খুবই বিতৃষ্ণার সাথে দেখেছিলেন কিভাবে ডারউইন আরো বেশী বৈধর্মের বা হেরেসির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, শুধু প্লাবনের চিহ্নই না এমনকি ঈশ্বরের কাজ থেকেও।

ক্যাপ্টেন অক্সফোর্ডে এসেছিলেন, ঝড় নিয়ে একটি বক্তৃতা দেবার জন্য ( তিনি আবহাওয়বিদ্যা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবদান রেখেছিলেন); কিন্তু তিনি ড্র্যাপারের ভাষণের কথাটি জানতে পারেন কোনোভাবে; হাক্সলী কথা শেষ করার পর ফিটজরয় উঠে দাড়িয়ে বলতে শুরু করেন, কিভাবে তিনি অত্যন্ত বিস্মিত এবং অসন্তুষ্ট হয়েছেন যে ডারউইন বাইবেল বিরোধী চিন্তাধারা পোষণ করেছেন তার বইতে ; তিনি বলেন অরিজিন অব স্পিসিস পড়তে গিয়ে তার তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হয়েছে, তিনি মাথার উপর বাইবেল আকড়ে ধরা দুই হাত তুলে উপস্থিত সবাইকে অনুরোধ করেন ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে, মানুষকে না; এটা বলার পর সবাই তাকে চিৎকার করে থামিয়ে দেয় সেখানে।

পরিশেষে জোসেফ হুকারের পালা আসে, তিনি মঞ্চে উঠে উইলবারফোর্সকে আক্রমন করেন; পরে তিনি ডারউইনকে লিখেছিলেন তার ভাষণটির বিষয়ে, ‘আমি এমন ভাবে অগ্রসর হলাম যেন সবাইকে দেখাতে পারি, ১) তিনি আপনার লেখা বইটি কখনোই পড়েননি ২) তিনি উদ্ভিদবিদ্যার সামান্যতম কোন বিষয়ে কোন জ্ঞান রাখেন না; এরপর সভার পরিসমাপ্তি হয়, এই ক্ষেত্রে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার মাধ্যমে।’

?oh=af9ab751124c52531ab33432a2c174bd&oe=58A60CE3″ width=”500″ />
(ছবি: পরিশেষে জোসেফ হুকারের পালা আসে, তিনি মঞ্চে উঠে উইলবারফোর্সকে আক্রমন করেন; পরে তিনি ডারউইনকে লিখেছিলেন তার ভাষনটির বিষয়ে, ‘আমি এমন ভাবে অগ্রসর হলাম যেন সবাইকে দেখাতে পারি, ১) তিনি আপনার লেখা বইটি কখনোই পড়েননি ২) তিনি উদ্ভিদবিদ্যার সামান্যতম কোন বিষয়ে কোন জ্ঞান রাখেন না; এরপর সভার পরিসমাপ্তি হয়, এই ক্ষেত্রে আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার মাধ্যমে’।)

যদি ডারউইন সেই দিন বিজয়ী হয়ে থাকেন, তবে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত বিজয়ী; ৫০ বছর বয়সে নিজেকে সব কিছু থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি, অক্সফোর্ড মিটিং থেকেও দুরে ছিলেন, যখন তার পক্ষে লড়েছিলেন, হাক্সলী এবং হুকার; তিনি তখন কয়েক সপ্তাহের জন্য রিচমন্ডে, তার দুরারোগ্য পেটের ব্যাধির জন্য তার সেখানে চিকিৎসা চলছিল, সেখানেই তিনি তার বন্ধুদের চিঠি পান বিস্তারিত বিবরণসহ, তাদের বক্তৃতা এবং তর্ক বিতর্কের কথা; অসুস্থ ডারউইন বিস্ময় প্রকাশ করে হুকারকে জানান, ‘এরকম কোন সভায় বিশপ এর প্রত্যুত্তর করার চেষ্টায় আমি হয়তো দ্রুত মরেই যেতাম’।

?oh=4eb11c8734129ee057f37d3e406e24ed&oe=58A841CD” width=”500″ />
(ছবি: John Collier’s 1883 portrait of Darwin (National Portrait Gallery, London)

অক্সফোর্ড এর সেই সভাটি খু্ব দ্রুতই কিংবদন্তীতে রুপান্তরিত হয়; সেখানে কি আসলে ঘটেছিল, তা সবই অতিকথনের কুয়াশার দেয়ালের পিছনে দ্রুত হারিয়েও যায়; এই নাটকের প্রতিটি পাত্র তাদের নিজেদের মত করে এর কাহিনী রচনা করেন, যেখান সবাই তাদের নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করেছিল; উইলবারফোর্স দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি বিতর্কে জিতেছেন, অন্যদিকে হাক্সলী এবং হুকার প্রত্যেকের ভেবেছেন বিশপকে চুড়ান্ত আঘাত তিনিই দিয়েছিলেন; আজও অবধি, স্পষ্ট না আসলে কি ঘটেছিল সেদিন; এবং ডারউইনের নিজেরও বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছে বুঝতে যে কি হয়েছে জুন মাসের সেই দিনটিতে; তবে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তার মনে, তার বিশ বছরের এই লুকিয়ে থাকার অবসান ঘটেছে চিরতরে; ডারউইনের নিজের জীবদ্দশায়, তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন; ১৮৭০ এর দশকে বৃটেনের প্রায় সকল গুরুত্বপুর্ণ বিজ্ঞানী বিবর্তনকে গ্রহন করে নিয়েছিলেন তাদের বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডে ও চিন্তায়, যদিও হয়তো কিভাবে এটি ঘটছে তা নিয়ে ডারউইনের সাথে দ্বিমত থাকতে পারে; লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্টরী মিউজিয়ামে মুল হল ঘরে উচু সিড়ির বেদীর তার একটি ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে, আর নিউটনের কবরের কাছে, ওয়েষ্ট মিনিষ্টার অ্যাবীতে তাকে সমাহিত করা হয়।

?oh=e3aeecf2e98c5632c3012d775bcb1c35&oe=58A65724″ width=”500″ />
(ছবি: ওয়েষ্ট মিনিষ্টার অ্যাবেতে ডারউইনের সমাধি। ১৮৮২ সালে ১৯ এপ্রিল ৭৩ বছর বয়সে ডারউইন মারা গিয়েছিলেন।)

কিন্তু Origin of Species এর ক্ষেত্রে অদৃষ্টের সবচেয়ে বড় পরিহাস হচ্ছে শুধুমাত্র বিংশ শতাব্দীতে এসেই কেবল বিজ্ঞানীরা ডার‌উইনের যুগান্তকারী ধারণাগুলোর প্রকৃত ক্ষমতাটিকে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, আর তখনই কেবল জীবাশ্মবিদ এবং ভূতত্ত্ববিদরা সাজাতে পেরেছেন পৃথিবীতে জীবনের সময়পন্জীর ধারাবাহিক বিন্যাসটিকে; শুধুমাত্র তখনই জীববিজ্ঞানীরা উদঘাটন করতে পেরেছিলেন সেই অণুকে, যা বংশগতি আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভিত্তি, এবং শুধুমাত্র তারপরই বিজ্ঞানীরা সত্যিকারভাবে বুঝতে শুরু করেছিলেন, সাধারণ একটি সর্দি জ্বরের ভাইরাস থেকে অকল্পনীয় জটিল মানুষের মস্তিষ্ক, কিভাবে পৃথিবীর সবকিছুকে প্রভাবিত করে তাদের রুপ দেয় শক্তিশালী এই বিবর্তন প্রক্রিয়াটি।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 3