অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০৩

নির্বিঘ্নে ক্লোন ল্যাবের প্রাক ২০১৬-সনীয় মাতৃজঠরের অনুরূপ ‘womb’ থেকে ষোড়শী ‘অমৃতা’, কুড়ি বছরের ‘মির্চা’ আর এগারো বছরের ‘সাবি’কে বের করা হলো একদম ত্রিশ শতকের অবয়বে। উপন্যাসের বর্ণনা মতো তাদের জন্য ভারতীয় ঐ সময়ের পোশাক তৈরি করা হলো বিশেষ ব্যবস্থাপনায়। জটাধারী মির্চার জন্যে ছাই ধুপ-ধুনোমাখা জলপাত্রের মৃন্ময় ‘কমণ্ডলু’ তৈরি শেষে চুলকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় জটে রূপান্তর করতে সমল লাগলো না বেশিক্ষণ টেকনিশিয়ানদের। কিন্তু পুরো নাটকীয়তা দেখার জন্যে, ক্লোন প্রক্রিয়ায় ওদের ‘ব্রেন’কে নিষ্ক্রিয় রাখা হলো। বিশেষজ্ঞ টিম ঠিক করলো যথাযথ প্রতিস্থাপনের সকল প্রক্রিয়া পুরো সম্পন্নের পরই, ক্রমান্বয়ে তাদের ব্রেনের ‘মেমব্রেনগুলো’ সচল করা হবে। এবং পরিকল্পনা মতো ভবানিপুরের বাড়ির দ্বিতল বারান্দায় অমৃতাকে, তার অদুরে ছোটবোন সাবিকে, লাইব্রেরিসহ ঘরের অন্যত্র মা, বাবা, খোকা, আরাধনা, শান্তি, লীলার সচল রোবটগুলোকে প্রতিস্থাপনের কাজ শেষ হলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। মির্চার বইরের বর্ণনা দেখে নিখুঁত দক্ষতায় তৈরি করা হলো ড. সেনের বেঢপ মেদভুড়ীবহুল পেটওয়ালা, থ্যাবড়ানো নাক, কালচে চেহারার রোবট, আর মিসেস সেনের সিঁদুর কপালে ভারতীয় পৌরাণিক নারীর জীবন্ত চেহারা। বোঝার উপায় রইলো না যে, এটা ৩০১৬-সনের কোনো এলাকা। সবাই একবাক্যে বললো, “হ্যা একদমই বিশ শতকীয় মধ্যযুগ বা প্রাগৈতিহাসিক সময়ের মতই সেট নির্মিত হয়েছে”।

বিশেষজ্ঞ টিম দুভাগ হয়ে এক গ্রুপ রইলো ভবানিপুরে অমৃতার বাড়িতে, অন্যদল গেলো ফতেপুর সিক্রির মৃত্যুপুরির কাছে হিমালয়ের আলমোড়া অঞ্চলে চেস্টনাট আর ঘন পাইনের বনে। যেখানে সন্ন্যাস জীবনে জঙ্গলের পরিত্যক্ত গুহাতে প্রতিস্থাপিত হবে নতুন ক্লোনকৃত মির্চা। দু’টিমের কাজ মূলত প্রায় একই। দেহ প্রতিস্থাপনের পর ক্রমান্বয়ে তাদের ব্রেনগুলো সচল করা হবে, যাতে একদম ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩০ এর আবহে ফিরে যেতে পারে তারা ক্রমান্বয়ে জীবন গভীরতায়। সব নিঁখুতভাবে সম্পন্ন হলো। পুরো পৃথিবীর মানুষের চোখ তখন কোলকাতার ভবানিপুর, আর ব্র্রহ্মপুরী অরণ্যের ঋষিকেশের স্বর্গাশ্রমের দিকে। কলকাতা থেকে পৃথিবীর অপরপিঠের মানে আমেরিকা মহাদেশ, বাহামা, ক্যারিবিয়ান, হাওয়াই, গ্রিনল্যান্ড, ওসেনিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের মানুষেরা রাতের এ দৃশ্য দেখার জন্যে তাদের চোখেের ‘নাইট-ভিউ’ লেন্সগুলো পুরো সচল করলো। বলতে গেছে পৃথিবীর সব মানুষের দৃষ্টিই তখন কোলকাতা তথা ভারতের দিকে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে সব কাজকাম ফেলে।

অবশেষে ‘কাউন্ট-ডাউন’ শেষে সে ‘মাহিদ্রক্ষণ’টি এসে গেলো। ভবানীপুরের টিম ক্রমান্বয়ে সচল করতে থাকলো অমৃতার স্মৃতিগুলো। এতোক্ষণ পাষাণ অহল্যারূপী অমৃতা ক্রমে ভবানিপুরের নিজ বাড়িতে মার ডাকা ‘রু’তে স্নাত হতে থাকলো ওর বোধগুলো। ধীর লয়ে তাকাতে থাকলো সে চারদিকে। সাবির দিকে চোখ পড়তেই একটু বিব্রত হলো ‘রু’। লাইব্রেরি বারান্দায় দাঁড়ানো মায়ের রোবটটি প্রথমেই একদম মায়ের স্বরে ‘রু’ বলে ডেকে উঠলো, যেন সে জানতে চাইছে অমৃতা কি করছে ঠিক এ মূহূর্তে? ড. সেনের প্রক্সি রোবট জানতে চাইলো কিছুটা গলার স্বর উঁচু করে অমৃতার কাছে, “মির্চা কি ঘরে না কোথায় গেছে দেখতো মা একটু”! অন্য রোবটগুলো ১৯৩০’র শব্দগুলো উচ্চারণ করে যথাযথ আবহে পরিপূর্ণ করতে চাইলো পুরো দৃশ্যপট। এসব শব্দ আবহে ক্রমান্বয়ে বাস্তবতায় ফিরতে ক’মিনিট লাগলো মাত্র অমৃতার। সাবির দিকে চেয়ে প্রথম কথা কইলো সে – “সাবি! মার কি মনে নেই যে, একটু আগে সে বাবার নির্দেশ জানিয়ে দিয়েছিল মির্চা আর আমাকে? মির্চা কি এখনো আছে নিচে! সে কি চলে যায়নি”?
সাবিও মনে করতে পারছিলো কিছু সদ্য ফিরে পাওয়া অবোধ শিশুর বোধের মত সুপ্ত চিন্তনে। অষ্পষ্ট স্বরে কইলো, “আমার কিছু মনে পড়ছে না দিদি। সম্ভবত ইউক্লিডদা তার ঘরে এখনো আছে”। ডাকবাক্সের পাশ দিয়ে অমৃতা উঠে গেলো মির্চার ঘরে। কিন্তু মির্চার সখের ‘কিউরিও’গুলো ছাড়া কিছু দেখলো না সে ওখানে। স্বর যথাসম্ভব উচুঁ করে ডাক দিলো সে মির্চাকে। বিস্ময়করভাবে ঐ ডাক পৌছেঁ গেল তখন মির্চার ঋষিকেশের স্বর্গাশ্রমে।

ঋষিকেশের গুহাতে যে টিমটি কাজ করছিল তারা তাদের নিজের চোখেই স্পষ্ট দেখছিল ভবানীপুরের বাড়ির পুরো চিত্রটি। যেমন নজরে ছিল ভবানীপুরের টিমটির ঋষিকেশের মির্চার প্রতি। মির্চা গুহা অভ্যন্তরে আকস্মিক ধ্যানমগ্নতার ভেতরে অমৃতার ডাক শুনলো সুষ্পষ্টরূপে। দুই টিমের বিশেষজ্ঞরা তাদের বোধ, আর দেখার চোখটি ত্রিশ শতকের মত রাখলেও, শোনার ব্যাপার কিছুটা সময়ের জন্যে উন্নীত করে দিলো ৩০১৬-সালের মানুষের মতই।
– “কই তুমি অমৃতা! তুমি কি স্বর্গাশ্রমে এসেছো”?
– “কই তুমি মির্চা! তুমি কি আমাদের বাড়ি ছেড়ে সত্যি চলে গেছো”?
– “হ্যা, তাতো কবেই! তোমার কি একদিনও মনে পড়েনি অমৃতা আমার কথা”?
– “প্রতিক্ষণে! প্রতি মূহূর্তে তোমারই ধ্যান করেছি আমার এ কষ্টবাতাসের সন্ন্যাস জীবনে। কিন্তু তোমার বাবা তো প্রতিজ্ঞা করিয়েছেন আমায়, আর যেন দেখা না করি তোমার সাথে এ জীবনে কখনো”।
“অমৃতা! অমৃর্তা! অমৃতা! তা কি মনে নেই তোমার”?
আকস্মিক রোবটিক বাবার জোরালো কণ্ঠ শুনতে পেলো মির্চা-অমৃতা দুজনেই। – “তোমার প্রতিজ্ঞা আমি তুলে নিলাম মির্চা। তুমি সন্ন্যাস জীবন ছেড়ে চলে এসো বাড়িতে”!
কিছুৃ বুঝতে পারেনা অমৃতা কি হচ্ছে। মায়ের কাছে দৌঁড়ে যেতে চায় সে। ডেকেও খুঁজে পায়না মাকে কোথাও। ডাকে – “মা! মাগো কই তুমি”? বাবা কি সত্যি বলছে এসব! বাবা! কই তুমি” !
পাশের ঘর থেকে মায়ের শব্দ ভাসে, “হ্যা। ডেকে আন মির্চাকে কিংবা চলে যা তার কাছে তুই”!
সব শুনে খিলখিলিয়ে হাসে সাবি। একমুঠো ভাললাগা সুখবাতাসের উড়ে চলা দুরন্ত মেঘডাকের মত সে ডাকতে থাকে তার ‘ইউক্লিডদা’কে। বলে
– “ক্ষমা করে দাও আমায় ইউক্লিডদা, ক্ষমা করো রু-দি! ফিরে এসো তুমি দিদির কাছে ইউক্লিড”! আর কখনো বলবো না তোমাদের প্রেমের কথা কাউকে আমি”!

এক শুক্লা-পক্ষের রাতের চাঁদের ক্ষীণ আলোতে মির্চা হাওড়া থেকে সোজা বেলুড়-মঠ ছেড়ে হেঁটে-হেঁটে অনেক মাঠ পেরিয়ে পৌঁছেছিল এ অজানা গন্তব্যে। অমৃতার অস্তিত্বের অনুভবে অনেক গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে নৈনিতাল, কথ বনবিথী, বর্ধমানের নৈকট্যের হল্ট স্টেশন ছেড়ে বনের টিলায় উঠে শুভ্র নির্ঝর ঝর্ণার শব্দে ডাক দিয়েছিল অমৃতার নাম ধরে অনেকদিন, অনেকবার! এক অবোধ্য ঘোরের মধ্যে মির্চা সুষ্পষ্ট শোনে অমৃতা, সাবি, ড. সেন ও মায়ের কণ্ঠ। এক সময় গুহা থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। এবং হাঁটতে শুরু করে ভবানিপুরের দিকে। যেখানে অপেক্ষা করছে তার অমৃতা। সাবি আকস্মিক বলে ওঠে অমৃতাকে, “দিদি আমরা কি গঙ্গার ধারে যাবো? সেখানে অবশ্যই পাবো ইউক্লিডদাকে। আমি জানি কোথায় গঙ্গাতীরে পা ডুবিয়ে বসে থাকে সে”।

হ্যাঁ একবার মির্চা বলেছিল – “একদিন আসবে। সেখানে গঙ্গার তীরে, আমার সত্যরূপ তোমাকে দেখাবো I will show you my real self on the shores of the Ganges.”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অমৃতা-মির্চা এলিয়াদের প্রেম ও পরবর্তী কথামালা মৈত্রেয়ী দেবীর ‘ন হন্যতে’র শেষের পরের শেষ লেখা : পর্ব-০৩

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − 65 =