মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই

একজন শ্রমজীবী মানুষ যখন দক্ষতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, কর্মকুশলতা ও নিষ্ঠার সমন্বয়ে তার কর্মে সুনিপণ হয়ে উঠে তখন তাকে বিবেচনা করা হয় মানবসম্পদ হিসেবে। শ্রমজীবীর শ্রমকে যখন জনচাহিদা পূরণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় তখনই তার ফলাফল হয়ে উঠে মূল্যবান, সমাজে তার অবদান হয়ে উঠে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার দক্ষতা যদি অব্যবহৃত থেকে যায়, যোগ্য স্থানে তার ঠাঁই না হয় কিংবা সঠিক পরিচর্যার অভাবে তার দক্ষতা নির্জীব হয়ে পড়ে, তবে সবই বৃথা হয়ে যায় – সম্ভাবনাময় মানবসম্পদও হয়ে পড়ে বোঝা। আবহমান কাল থেকেই ষোলো কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশের জনগণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে বিবেচিত হয়েছে মানব মূলধন হিসেবে। অতীতে এই মূলধনের কার্যকর ব্যবহারেই অর্জিত হয়েছে আর্থিক মুনাফা, জীবনধারণের ক্ষেত্র হয়েছে সম্প্রসারিত। তবে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য তাদের দক্ষতা উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে এবং এই বৃদ্ধি ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এখন দেশে পনের বছরের অধিক বয়সী শ্রমশক্তি রয়েছে ৫ কোটি ৮৭ লাখ। মানব মূলধন হিসেবে অর্থনীতিতে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে এদের কারিগরী দক্ষতায় অনেক ঘাটতি রয়েছে। কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ জনবলের অভাবেই দেশের শিল্প-কারখানা খাতে প্রতিবছর ছয় শ’ কোটি ডলার বা প্রায় সাতচল্লিশ হাজার কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এ সমস্যার মূলে রয়েছে কারিগরী বিষয়ের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগের স্বল্পতা। দেশের ষাট শতাংশের বেশি মানুষের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে হলেও কারিগরী দক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবে এদের শিল্পখাতে নিয়োগ করা যাচ্ছে না। এই কর্মীদের প্রায় চুয়াল্লিশ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে কৃষিতে আর প্রায় ৩৭ ভাগ সেবা খাতে। কিন্তু কৃষি আর সেবা খাতে জনসংখ্যার আধিক্য শিল্প খাতকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে সহায়ক নয়। এমনিতেই কারিগরী দক্ষতার ঘাটতির কারণে এ দেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা শিল্প-কারখানার চাহিদা উপযোগী নয়। এদেশের শ্রমশক্তির নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার দক্ষতাও অনেক কম। ফলে কারিগরী দক্ষতা সম্পন্ন প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের স্বল্পতায় দেশে ইতিবাচক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে শিল্পায়নের ধারাকে বেগবান করে এ খাতের সুফল কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তবে ভিশন-২১ এবং রূপকল্প-৪১ কে সামনে রেখে এখন শিল্প-কারখানায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ডিগ্রীধারী শিক্ষার্থীদের অনেকেই কর্মজীবনের জন্য দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠছে না। পাশাপাশি দেশে সাধারণ শিক্ষার যতটুকু প্রসার কারিগরী শিক্ষা খাত তত বেশি গুরুত্ব পায়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনায় বর্তমানে বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নয়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানা ও সরকার- এই ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ককে জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাঙ্গনের পাঠ্যক্রমও ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পাঠ্যক্রমে সৃজনশীলতা, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কর্মসংস্থানের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে শিল্পখাতের উপযোগী কর্মী বাহিনী সৃজন এখন সময়ের দাবি। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য অনতিবিলম্বে সরকার ও জন সংশ্লিষ্টতায় গৃহিত যৌথ উদ্যোগে মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প-কারখানার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক কারিগরী জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী তৈরির মাধ্যমে দেশের শিল্পায়নে নব গতির সঞ্চার হবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা। সকলকে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 18 = 21