আইনের বিরোধিতা না শান্ত পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে অশান্ত করার চেষ্টা !

ছবিঃ খাগড়াছড়ি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের কার্যালয় ঘেরাও চিত্র।

একটি গণতান্ত্রিক দেশে অধিকার আদায়ে আন্দোলন করা সেই গণতন্ত্রের অধিবাসী প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার। কিন্তু সেই অধিকারের নামে যদি গণতন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জ্বালাও-পোড়াও, সাম্প্রদায়িক শ্লোগানে রাজপথে অবস্থান করা কোনভাবেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন হতে পারেনা। আর রাজপথে যখন কোন দল বা গোষ্ঠী আন্দোলন করে তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও জনগণের জান, মাল রক্ষার জন্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রিত বাহিনী আন্দোলনকারিদের সম্মুখে অবস্থান করবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আমরা তাই দেখি। এটি চিরাচরিত সত্য হলেও পার্বত্য অঞ্চলে এর চিত্র দেখা যায় ভিন্ন। এবং ভিন্নতার কারণও সাম্প্রদায়িক ও জাতপ্রেমের।

প্রথমত আসি আন্দোলনকে নিয়ে, আজ ১৩ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রামে সমতল হতে পুনর্বাসিত পাঁচ বাঙালি সংগঠনের হরতাল কর্মসূচি পালিত হয়েছে এবং আগামী ১৬ অক্টোবরও এই হরতালের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি রয়েছে। প্রত্যেক আন্দোলনের কারন অধিকার আদায় করা। অধিকারের দাবিতেই একেকটি আন্দোলন সৃষ্ট হয়। তাহলে এই বাঙালি সংগঠনগুলোর আন্দোলনের নেপথ্যে কি ? তাদের এই আন্দোলনের দাবি “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাসের প্রতিবাদে ও বান্দরবানের গ্রেপ্তার হওয়া বাঙালি নেতা আতিকুর রহমানের মুক্তির দাবিতে” এই হরতাল ডাকা হয়েছে। তাদের এই দাবি যে কোন গঠনমূলক নয় এবং অনৈতিক তা আবার প্রমাণিত। বাঙালি নাম ব্যবহার করে সমতল হতে পুনর্বাসিত এই সেটেলাররা যে পাহাড়ে দাঙ্গা, হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক অবস্থান জিইয়ে রাখতে চায় তা এই কর্মসূচিতেই স্পষ্ট। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন যে পার্বত্যবাসীর জন্য নতুন তা কিন্তু নয়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে কয়েক দশকের সংঘাতের অবসান ঘটে। এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমি সংক্রান্ত কতিপয় বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান প্রণয়নকল্পে এই আইন প্রণীত হয় যা সংবিধানে ২০০১ সনের ৫৩ নং আইন হিসেবে উল্লেখিত এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ হিসেবে অভিহিত। এবং সংবিধানে এই আইনের ধারাসমূহে (১) সংজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ আছে-

যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রাম অনগ্রসর উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা বিধেয়; এবং

যেহেতু এই অঞ্চলের উপজাতীয় অধিবাসীগণসহ সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন; এবং

যেহেতু উপরিউক্ত লক্ষ্যসহ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য জেলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতি বিগত ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪০৪ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ২রা ডিসেম্বর, ১৯৯৭ খৃস্টাব্দ তারিখে একটি চুক্তি সম্পাদন করিয়াছে; এবং

যেহেতু উক্ত চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জায়গাজমি সংক্রান্ত কতিপয় বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিশন গঠন ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;

অর্থাৎ চুক্তির আলোকে এই আইন গঠন করা হয়েছে এবং পার্বত্য আদিবাসীদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই আইন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এবং এই আইনে কিছু ত্রুটি থাকার কারনে গত ১ আগষ্ট ২০১৬ তারিখে আঞ্চলিক পরিষদের সুপারিশগুলোর আলোকে আইনটি সংশোধনের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মন্ত্রীসভায় গৃহীত হয় এবং গত ৮ আগষ্ট ২০১৬ রাস্ট্রপতি কতৃক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ পাশ করেন এবং তারপর দিন ৯ আগষ্ট তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত গেজেটের যে সংশোধনী উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে এই বাঙালি সংঘটনগুলোর মূল বিরোধিতার কারন ৬(১) এর উল্লেখিত সংশোধনী-

৬৷ (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা:-

(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা;

(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী, বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের, স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনবর্হাল;

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভূতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

এই সংশোধনীর উল্লেখিত ধারা উপধারা বিরোধিতায় এটাই পরিলক্ষিত কারন তারা পার্বত্য এলাকায় অবৈধভাবে জায়গা জমি দখল করেছে এবং প্রভাব খাতিয়ে বাহুর জোরে আইন বহির্ভূতভাবে পাহাড়ে আদিবাসীদের জায়গা বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছে। যার ফলে এই সংশোধিত এই আইনে তাদের অবৈধ দখলকৃত ভূমি হারানোর শঙ্কায় সংশোধিত আইন বাতিলের দাবিতে আজ অধিকারের নামে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। আইনগতভাবে যদি তাদের নামে ভূমি থেকে থাকে তাহলে এই সংশোধনী নিয়ে আতংকিত হওয়ার কথা না বরং আনন্দিত হওয়ার কথা তাদের জায়গা জমিও যদি অন্যকারো দ্বারা দখল হয়ে থাকে তাহলে এই আইনের মাধ্যমে সে পুনঃমালিকানা ফিরে পাবে। তাহলে এই বিরোধিতার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। বরং এই বিরোধিতার মাধ্যমে এই বাঙালি সংগঠনগুলো পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার মাধ্যমে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

দ্বিতীয়ত তাদের এই আন্দোলনের আরেকটি কারন, পার্বত্য গণপরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমান কে মুক্তির দাবি। গণপরিষদের যে নেতার মুক্তির দাবিতে এই বাঙালি সংগঠনগুলো আন্দোলনের ঢেকুর তুলছে, পুলিশের দাবি অনুযায়ী গত ১৮ সেপ্টেম্বর বান্দরবন জেলা শহরের কাসেমপাড়ায় জামায়াত নেতা আতিকুর রহমানের বসতবাড়িতে কয়েকজন নাশকতার পরিকল্পনার জন্য বৈঠকে বসেছিলেন। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে বরখাস্তকৃত উপজেলা চেয়ারম্যান তোফাইল আহমদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগঠন পার্বত্য গণপরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমানকে আটক করা হয়। তখন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আরো ১২-১৫ জন পালিয়ে যায়।

বৈঠকের স্থান থেকে দুটি ধারালো দা, তিনটি স্ক্রু ড্রাইভার, একটি প্লাস, দুটি কার্টারসহ কিছু ইলেকট্রিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় সদর থানায় গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপপরিদর্শক শেখ লিয়াকত আলী বাদী হয়ে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। যেহেতু মামলাটি বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন সেহেতু আমি কোন মন্তব্য করতে চাইনা। শুধু এইটুকুই বলবো বাঙালি নাম ব্যবহার করে সমতল হতে পুনর্বাসিত যারা পার্বত্য এলাকায় আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে, গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে যারা সাম্প্রদায়িক সংঘাত তৈরি করতে চাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কারন এরা পাহাড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির অবসান হলে সমতলে আপনাদের জায়গা-জমি, ঘর-বাড়ি দখল করবেনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারন সমাজে এরা সেই প্রকৃতির যারা ভোগবাদী মানসিকতায় কলুষিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4