হরিদাসের ইসলাম গ্রহণ

সন্ধ্যা ছয়টা। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক।টেনশনে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে বাচ্চু মিয়ার। মনেমনে মানত করলো আল্লার রহমতে যদি সন্তান সুস্থ হয়,আল্লার রাস্তায় একে মাদ্রাসায় দিয়ে দিবো। আগের বার মৃত সন্তানের কথা মনে হলে গা শিওরে উঠছে।

ভিতর থেকে কান্নার শব্দ,আনন্দে লাফিয়ে উঠলো বাচ্চু মিয়ার মণ।
আনন্দ দীর্ঘ স্থায়ী হওয়ার আগেই দুঃসংবাদ,বংশ রক্ষার প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে অল্প বয়সী বউটা মারাই গেল শেষ পর্যন্ত।
সেই থেকে ছেলে সজল তার চোখের মণি। গ্রামে ভদ্র, অমায়িক, পড়াশোনায় এক নাম্বার ছেলেটি তারই।
মাদ্রাসা পড়ুয়া এই ছেলেটি এমন কাজ করবে!! গ্রামের সবার মত তার বাবাও ভাবতে পারেনি।

যে নিষিদ্ধ প্রেমের প্রতারণায় মনুষ্যকূল আজ বেহেস্ত থেকে বিতাড়িত সেই ভুলটি করলো সজল? তাও আবার একটি নিচু জাতের হিন্দু মেয়ে।

গ্রাম্য সালিশ। গণ্যমান্য সবাই উপস্থিত।

লাল শাড়িতে, বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় আরতির সুন্দরের স্ফুলিংগ ছড়িয়ে পড়লো চারদিক।13 বছর বয়সী আরতির মনে কোন সংশয় নেই। কল্পবিলাসী মন তার সজলের সংসার সাজানোয় ব্যাস্ত।

সালিশের রায় হবে । পরপর পাঁচ বারের মেম্বারের উপর আস্থা আছে সবার।
ধর্মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মেম্বারের রায় –
দুটি ছেলেমানুষি বালক বালিকা যেহেতু প্রেম করেই ফেলেছে, তাতে দুপক্ষের সম্পর্ক মেনে নিয়ে বিয়ে টা সেরে ফেলাই ভালো।

বাচ্চু মিয়ার এক্ষেত্রে আপত্তি নাই। ছেলে আমার আরতি কে বিয়ে করে মুসলমান বানালে বিনা হিসাবে বেহেস্ত। তাই এ সুযোগ হাতছাড়া করার চিন্তা বাচ্চু মিয়ার নাই।

কিন্তু বাধ সাজলো গোবিন্দ দাস। চলচল নয়নে লুটিয়ে পরলো মেম্বারের পায়ে।
মেম্বার সাব আমার এই ক্ষতি টা করবেন না। আমার চৌদ্দ পুরুষের ধর্মের গায়ে চুনকালি লেপ্টে দিতে পারবো না।

হুশ এলো আরতির। আমাকে কেন প্রেমের দায়ে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে? প্রেম কি আমি একা করেছি নাকি? শাস্তি কেন আমি একা পাবো। মেয়ে এমন প্রতিবাদে প্রাণ ফিরে পেল গোবিন্দ দাস।

সজল তখনও মাটির দিকে তাকিয়ে একটি বারের জন্য ও আরতির দিকে তাকানোর সাহস তার হলো না। অথচ আরতি একবারের জন্য ও সজল থেকে তার দৃষ্টি সরাই নি। সজলের একটু আগ্রহের দিকে তাকিয়ে ছিলো আরতি, যেন সজল একটু মুখ তুললেই সব প্রথা ভেঙে ছুড়ে চলে যাবে তারা।

হলো না কিছুই, মাঝখান থেকে গ্রাম ছাড়তে হলো গোবিন্দ দাসের। ভিটেমাটি সব বিক্রি করে আস্থানা গাড়লো বহুদূরের আরেক গ্রামে।

দিন মজুর গোবিন্দ দাসের সংসার ভালো কাটাতে লাগলো।
এর মাঝে আরতির জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসলো। পাত্র হরিদাস,আগের বউ মারা গেছে। কিন্তু গোত্র একই।গোত্রের জামেলায় এতদিন বিয়ে আটকে ছিল আরতির।
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে, কষ্ট গুলোর পান্ডুলিপি টা মনের ভিতর রেখে দিল আরতি।

ঋনে জর্জরিত হরিদাসের ছোট্ট ঘরটি পরিপাটি করে সাজিয়ে নিল নিজের মত করে।
আরতি এখন অনেক ব্যস্ত। সকাল সকাল হরিদাসের খাবার রেডি করে দিয়ে আবার অন্যের ঘরের কাজ করে দিতে হবে। না হলে পরের দিনের খাবার জুটবে না। চল্লিশোর্ধ রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে হরিদাস এখন আর নিয়মিত কাজে যেতে পারে না।
এদিকে NGO কাছ থেকে নেওয়া ঋনের সাপ্তাহিক কিস্তি ও দিতে হবে।
নিয়মিত কিস্তি দিতে না পারায় আগের ম্যানেজারের চাকরি চলে গেছে। নতুন ম্যানেজার অনেক কড়া।

রবিবার। আজ কিস্তির দিন। চার কিস্তির টাকা জমা হয়ে আছে। তাই স্বয়ং ম্যানেজার আসবে বলে গেছে মাঠকর্মী। কিন্তু ডাক্তারের পিছনে সব টাকা শেষ। হরিদাস ও কাজের নাম করে চলে গেছে।

আরতি খুঁজ করতে লাগলো কাজের কথা বলে অগ্রীম কিছু টাকা পাওয়া যায় কিনা।

ম্যানেজার বাড়িতে ঢুকেই, বাড়ির সাজসজ্জা দেখে অভিভূত। এতটুকু জায়গার মধ্যে কি নেই। জবা, সূর্যমুখী, পুইশাক, মরিচ,বেগুন সব গাছেই আছে এখানে। ম্যানেজারের বুঝতে বাকি নেই, হরিদাসে বউ খুব গুনবতী।

বিকেল হয়ে আসলো এখনো কারও খবর নেই, না হরিদাস না তার বউ।

হেমন্তের বিকেলে উল্টোদিকে মুখ করে বসে আছে ম্যানেজার।
মুখে ঘোমটা টেনে মৃদু স্বরে বললো আরতি – স্যার, অনেক চেষ্টা করেছি। টাকা জোগাড় করতে পারি নি। স্বামীর শরীর টা খারাপ তাই ওষুধ কিনে ফেলেছি। সামনের সাপ্তায় একসাথে দিয়ে দিবো।

ম্যানেজারের বুকটায় মৃদু কম্পন হলো। পিছনে ফিরে থাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল সব। পৃথিবীর ঘূর্ণন থেমে গেল। সূর্যের আলোটা আরও প্রখর হলো। যে আরতির মুখটা রোদের ঝলঝল করতো, সে মুখটা মলিন থেকে আরও মলিন হয়ে গেল।

এবার আরতি মাটির দিকে তাকিয়ে। একদম পরিপাটি, বিন্দু মাত্র ক্ষোভ নেই তার দৃষ্টিতে।
আর ম্যানেজার সজল নির্বাক দৃষ্টিতে। হৃদয় অশ্রুকে থামাবার কোন মন্ত্রই আজ কাজে আসছে না।

এরেই মাঝে খবর এলো ঋনের বোঝা বইতে না পেরে হরিদাস এক সন্তানের জননী কুলসুম কে বিয়ে করে মুসলমান হয়ে গেছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7