বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (শেষ পর্ব -১)


(ছবি: (বা দিক থেকে) স্যার রোনাল্ড ফিশার ( ১৮৯০-১৯৬২), ইংলিশ পরিসংখ্যানবিদ ও জীববিজ্ঞানী। যিনি গণিতের ব্যবহার করেছিলেন মেণ্ডেলিয় জিনতত্ত্ব আর ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটিকে সংশ্লেষণ করার জন্য , যা সাহায্য করেছিল বিবর্তনের ডারউইনবাদী সংশ্লেষণের, যা এখন পরিচিত modern evolutionary synthesis নামে; এছাড়া আধুনিক পরিসংখ্যাণ বিদ্যারও ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি। (২) জে বি এস হলডেন (১৮৯২-১৯৬৪), বৃটিশ জিনবিজ্ঞানী, পরিসংখ্যাবিদ পরে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। জীববিজ্ঞানে তার অসংখ্য অবদান আছে, ১৯১৫ সালে জেনেটিক লিংকেজ সংক্রান্ত একটি প্রবন্ধ ও অন্যান্য জিন গবেষণা ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল পপুলেশন জেনেটিক্স ও পরে modern evolutionary synthesis এর। (৩) সেওয়াল রাইট (১৮৮৯-১৯৮৮) আমেরিকার জিনতাত্ত্বিক, ফিশার ও হ্যালডেনের সাথে পপুলেশন জেনেটিক্স এর প্রতিষ্ঠাতা, যা ডারউইনীয় বিবর্তনকে মেণ্ডেলিয় জিনতত্ত্বের সাথে সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম | ষষ্ঠ| সপ্তম | অষ্টম)| নবম)

বিবর্তনের আধুনিক সংশ্লেষণ:

যখন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস বইটি লিখেছিলেন, ডারউইন সেই সময়ের জ্ঞানেই বন্দী ছিলেন। বলাবাহুল্য ১৮৫৯ সালে বইটি প্রকাশের সাথে সাথেই বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। আর ডারউইন তেমন প্রত্যাশাও করেছিলেন। তবে তিনি ধর্মীয় সমালোচনার নিয়ে তিনি খুব বেশী চিন্তিত ছিলেন না, তার ভাবনা মূলত ছিল তার প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হতে পারে এমন সব বৈজ্ঞানিক সমালোচনাগুলো নিয়ে, কারণ তিনি জানতেন ঠিক সেই মুহূর্তে যা তথ্য তার জানা আছে ( আর ডারউইন সেই সময়ে তার পক্ষে জানা যা কিছু সম্ভব তা জেনেছিলেন, প্রায় দুই দশক ধরে তিনি তার যুক্তিটি সাজিয়েছিলেন) আর তিনি যে প্রমাণগুলো জড়ো করেছেন, সেগুলো ছাড়াও তার প্রস্তাবিত তত্ত্বটির বৈজ্ঞানিকভাবে দুটি চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে, সেই সময় যার কোনো সঠিক উত্তর তার জানা ছিল না।

প্রথমটি ছিল পৃথিবীর বয়স। সেই সময়ের পদার্থবিদরা তেজষ্ক্রিয় ক্ষয় হবার প্রক্রিয়ায় পৃথিবী উষ্ণতা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্বন্ধে জানতেন না, সুতরাং তারা মনে করেছিলেন পৃথিবীর বয়স একশ মিলিয়ন বছর মাত্র, খুব বেশী সময় না ডারউইনের প্রস্তাবিত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মন্থর প্রক্রিয়ার জন্য। আর এমন বিরোধীতার উত্তরে তার সত্যিকারভাবে কিছু বলার উপায়ও ছিলনা। কিন্তু এখন আমরা জানি পৃথিবীর বয়স প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি বছর। দ্বিতীয় বড় সমস্যাটি ছিল বংশগতির প্রকৃতি, কিভাবে জীবরা তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রজন্মান্তরে হস্তান্তর করে। যদি প্রাকৃতিক নির্বাচন বা অন্য কোনো প্রক্রিয়াকে কাজ করতে হয় কোনো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জন্য, তাহলে সেই বৈশিষ্ট্যগুলোকে কোনো না কোনো উপায়ে সংরক্ষিত হতে হবে এবং প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হতে হবে। দূঃখজনকভাবে ডারউইনের কাছে এই বিষয়টি সম্বন্ধে ভালো কোনো ধারণা ছিলনা; সেই সময়ে বিদ্যমান প্রস্তাবনা ছিল ব্লেন্ডিং বা মিশ্রণের বা Blending inheritance; কিন্তু ধারণাটি আদৌ ব্যাখ্যা করতে পারেনি বংশগতির প্রকৃতিটি। ডারউইনের বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ ছিল, উপরন্তু এটি তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করতে পারতো না। তিনি তার খানিকটা ল্যামার্ক নির্ভর ধারণা প্যানজেনেসিস তত্ত্বটি প্রস্তাব করেন। এই তত্ত্বটির ইতিহাস সেই হিপোক্রাতিসের সময় অবধি বিস্তৃত। ডারউইনের এই প্রস্তাবনার মূলে ছিল gemmules এর ধারণাটি, অতি ক্ষুদ্র বংশগতির যে কণা (পার্টিকল) যা পিতামাতা থেকে তার সন্তানদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয় প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যগুলো বহন করে। তার এই ধারণাটিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল মেণ্ডেলের laws of inheritance, যখন বিজ্ঞানীরা নতুন করে মেণ্ডেলের গবেষণাটির পুনরাবৃত্তি করতে পেরেছিলেন।

/220px-August_Weismann.jpg” width=”500″ />
(ছবি: অগাস্ট ভাইসমান – August Friedrich Leopold Weismann (17 January 1834 – 5 November 1914)) জার্মান বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, যিনি জার্ম প্লাজম তত্ত্বটি প্রস্তাব করেছিলেন বহুকোষী জীবদের ক্ষেত্রে। উনবিংশ শতাব্দীতে ডারউইনের পর তাকেই সবচেয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিবর্তন তাত্ত্বিক মনে করা হয়।)

মেণ্ডেলীয় জেনেটিক্স এর সাথে ডারউইনীয় বিবর্তনের প্রথম সংশ্লেষণ ঘটে Neo-Darwinism এর ভাবনায়। ১৮৯৫ সালে কানাডীয়-ইংলিশ জীববিজ্ঞানী জর্জ রোমানেস নব্য ডারউইনবাদ নামটি প্রস্তাব করেন আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস আর অগাস্ট ভাইসমান (August Weismann) এর বিবর্তন সংক্রান্ত ধারণাটিকে চিহ্নিত করতে, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া বিবর্তনের ধারণার উপর নির্ভরশীল ছিল। ভাইসম্যান ও ওয়ালেস ল্যামার্কীয় ধারণাটি প্রত্যাখান করেছিলেন (inheritance of acquired characteristics), যার প্রতি ডারউইন ভুল ভাবে খানিকটা ঝুকে পড়েছিলেন। নব্য ডারউইনবাদ প্রস্তাব করেছিল যে, বিবর্তন ঘটছে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, কোনো অর্জিত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার বা কম ব্যবহার করার মাধ্যমে না। আর এই সম্পুর্ণ প্রত্যাখানের ভিত্তি ছিল ভাইসম্যানের জার্ম প্লাজম তত্ত্বটি। ভাইজম্যান অনুধাবন করেছিলেন যে কোষগুলো জার্ম প্লাজম বা গ্যামেট ( শুক্রাণু বা ডিম্বাণু) সেগুলো সোমাটিক ( যে কোষগুলো জীবের শরীর গঠন করে) কোষ থেকে আলাদা হয়ে যায় ভ্রুণ বিকাশ প্রক্রিয়ার শুরুতে। যেহেতু এই দুটি কোষের মধ্যে যোগাযোগের সুস্পষ্ট কোনো উপায় তিনি দেখেননি, তিনি প্রস্তাব করেন সেকারণে কোনো অর্জিত বৈশিষ্ট্যের প্রজন্মান্তরে হস্তান্তর অসম্ভব, যা পরিচিত ছিল ভাইজম্যান ব্যারিয়ার Weismann barrier হিসাবে।

প্রায় ১৯৩০ এর দশক অবধি এটাই ছিল প্যানসিলেকশনিষ্ট চিন্তার ধারা, যা দাবী করেছিল প্রাকৃতিক নির্বাচনই সব বিবর্তনের একমাত্র কারণ। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সালে বেশ কিছু অগ্রগতি সূচনা করে modern evolutionary synthesis ( যদিও বর্তমান বিবর্তন তত্ত্বকে নিও-ডারউইনিজম বলা হলেও সেটি ঠিক না বলে দাবি করেছিলেন বিখ্যাত বিবর্তন জীববিজ্ঞানী আর্নস্ট মায়ার, কারণ তিনি দাবী করেছিলেন শব্দটি রোমানেস ব্যবহার করেছিল শুধু ভাইসম্যানের তত্ত্বটিকে চিহ্নিত করতে), এটি এখন পরিচিত synthetic view of evolution বা শুধুমাত্র modern synthesis, (new synthesis, the modern synthesis, the evolutionary synthesis, millennium synthesis) , এটি বিংশ শতাব্দীর একটি সংশ্লেষণ, যা জীববিজ্ঞানের বেশ কিছু ক্ষেত্র থেকে আসা ধারণাকে সংশ্লেষণ করেছিল, বিবর্তনের যে ব্যাখ্যটি এখন ব্যপকভাবে স্বীকৃত। বিবর্তন জীববিজ্ঞানের এটি বর্তমান প্যারাডাইম।

চার্লস ডারউইন আর মেন্ডেলিয়ান জেনেটিক্স এর ধারণাগুলো সমন্বয় করেন বিখ্যাত গাণিতিক জীববিজ্ঞানী রোন্যাল্ড ফিশার, যিনি জে বি এস হলডেন, সেওয়াল রাইট এর পপুলেশন জেনেটিক্স এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯১৮ থেকে ১৯৩২ এর মধ্যে। পপুলেশন জেনেটিক্সই মূলত সূচনা করেছিল মডার্ণ সিনথেসিসের। আধুনিক সংশ্লেষণ বিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বের জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে তাদের বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে দূর্বল সংযোগ আর বোঝাপড়ার সমস্যাগুলোকে সমাধান করেছিল। প্রধাণ সমস্যাটি ছিল মেন্ডেলিয়ান জেনেটিক্সকে কি প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ধীর বিবর্তনের ধারণার সাথে সমন্বয় করা যায় কিনা, আর দ্বিতীয় সমস্যাটি ছিল ম্যাক্রোইভোল্যুলেশনের বড় পরিবর্তনগুলো কি ব্যাখ্যা করা যায় কোনো স্হানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাইক্রোইভোল্যুশনের মাধ্যমে। প্রমাণগুলো এসেছিল জেনেটিক্স এর প্রশিক্ষিত জীববিজ্ঞানীদের কাছ থেকে, যারা ল্যাবরেটরী ও মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করেছিলেন (যেমন রুশ-আমেরিকান বিজ্ঞানী থিওডোসিয়াস ডোবঝানস্কি, তার গবেষণা নিয়ে লেখা ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত বই Genetics and the Origin of Species পপুলেশন জেনেটিক্স আর ফিল্ড ন্যাচারালিষ্টদের মধ্যে সেতু বন্ধন রচনা করেচিল। আর্নস্ট মায়ারের অবদান ছিল Systematics and the Origin of Species নামের অসাধারণ একটি বই । জুলিয়ান হাক্সলী তার ১৯৪২ সালের বই Evolution: The Modern Synthesis এ প্রথম শব্দটি উদ্ভাবন করেছিলেন। আধুনিক সংশ্লেষণ বা modern synthesis এর প্রধাণ ব্যক্তিরা হলেন Theodosius Dobzhansky, E. B. Ford, Ernst Mayr, Bernhard Rensch, Sergei Chetverikov, George Gaylord Simpson, ও G. Ledyard Stebbins প্রমূখ বিজ্ঞানীরা।


ছবি: মডার্ন সিনথেসিসের স্থপতিরা। (বা দিক থেকে: রোনাল্ড ফিশার ও তার সহকর্মীরা ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটিকে মেণ্ডেলীয় জিনতত্ত্বের ভিত্তি দিয়েছিলেন গাণিতিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে।পরের প্রজন্মের জীববিজ্ঞানীদের জন্য তারা যে প্রশ্নটি রেখে গিয়েছিলেন, সেটি হলো জিনের ভাষাটি উদ্ভাবন করা, প্রজাতি কি এবং কিভাবে প্রজাতির সৃষ্টি হয় সেটি সমাধান করার জন্য। ১৯৩০ এর দশক থেকেই কেবল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসতে শুরু করেছিল।আর এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের একটি সিংহভাগ এসেছিল (১) থিওডসিয়াস ডোবঝানস্কির গবেষণা থেকে। সেই সময়ে বেশীর ভাগ বিজ্ঞানীরা মনে করতেন যে কোনো একটি প্রজাতির সব সদস্য হুবুহু একই ধরনের জিন বহন করে। কিন্তু তাদের এই ধারণার ভিত্তি ছিল ল্যাবরেটরী গবেষণা। কিন্তু ডোবঝানস্কি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছিলেন, তিনি দেখেছিলেন একই প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে হুবুহু এই ধরনের জিন থাকে না।ফ্রুট ফ্লাইয়ের (D. pseudoobscura) উপর গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন একই প্রজাতির দুটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই ক্রোমোজোমের ভিন্ন সংস্করণ থাকতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, যদি কোনো স্ট্যান্ডার্ড সেট জিন না থাকে যা দিয়ে আমরা কোনো প্রজাতি শনাক্ত করতে পারি, তাহলে প্রজাতিদের পৃথক রাখছে কোন বিষয়টি,ডোবঝানস্কি এর সঠিক উত্তরটি জানাতে পেরেছিলেন, যৌন প্রজনন।১৯৩৭ সালে তিনি তার এই গবেষণা প্রকাশ করেছিলেন Genetics and the Origin of Species, সেখানে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন কিভাবে প্রজাতির উদ্ভব হয়। জিনতত্ত্ব আর প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্যে সামঞ্জষ্য সৃষ্টি করার মাধ্যমে তিনি বহু জীববিজ্ঞানীকে উৎসাহিত করেছিলেন বিবর্তন কিভাবে হচ্ছে তার একটি একীভূত ব্যাখ্যা খোঁজার জন্য। তাদের সেই সম্মিলিত গবেষণাই পরিচিত The Modern Synthesis নামে। যে ব্যাখ্যা জীববিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রস্তাবনা করেছিলেন বিবর্তনের একটি শক্তিশালী ব্যাখ্যা, যা দেখিয়েছে কিভাবে মিউটেশন ও প্রাকৃতিক নির্বাচন বড় মাপের বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে। পরবর্তীতে এই ব্যাখ্যাটি বিবর্তন জীববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি রচনা করেছে। ডোবঝানস্কির Genetics and the Origin of Species বহু জীববিজ্ঞানীকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল, এমন জিনতত্ত্বে বাইরের ক্ষেত্রে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে, তাদের একজন (২) আর্নস্ট মায়ার, মূলত পাখি বিশেষজ্ঞ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এই বইটির দ্বারা।মায়ারের গবেষণার ক্ষেত্রে ছিল নতুন প্রজাতি শনাক্ত ও তাদের ভৌগলিক সীমনা নির্ধারণ। কিন্তু পাখিদের প্রজাতি হিসাবে ভাগ করা কঠিন একটি কাজ। কোন একটি বার্ড অব প্যারাডাইসকে হয়তো তাদের পালকের রঙ দেখে চিহ্নিত করা যায়, কিন্তু তাদের অন্য অনেক বৈশিষ্ট্যে নানা বিচিত্রতা লক্ষ্য করা যায়।মায়ার চিহ্নিত করেছিলেন কোনো প্রজাতির মধ্যে এই ভিন্নতা আসলে বিবর্তন প্রক্রিয়া যে কাজ করছে তারই প্রমাণ। প্রজাতির মধ্যে এই প্রকরণগুলোর উদ্ভব হয়, যা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি করে।আর কোনো একটি পাখির বা যেকোনো জীব জনগোষ্ঠীর প্রজাতি হিসাবে আবির্ভুত হতে পারে যদি প্রতিবেশী থেকে তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৪২ সালে তার Systematics and the Origin of Species মায়ার যুক্তি দেন, কোনো একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির করার একটি উপায় হচ্ছে ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা, যেমন কোনো হিমবাহ একটি উপত্যাকাকে ভাগ করতে পারে, আর এই দুই পাশে দুটি জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে বা কোনো উপদ্বীপ রুপান্তরিত হতে পারে একগুচ্ছ দ্বীপে, এই ধরনের বিচ্ছিন্নতা চিরকাল থাকার দরকার সেই, শুধু প্রতিবন্ধকতাটি সেই পরিমান সময় অবধি থাকলে হবে যখন তারা জিনগতভাবে অসামঞ্জষ্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, পরে তারা ভৌগলিকভাবে অবিচ্ছিন্ন কোনো পরিস্থিতিতে মিলিত হলেও আর প্রজনন করতে পারবে না। তারা পাশাপাশি থাকবে, তবে ভিন্ন প্রজাতি হিসাবে। এখন বিজ্ঞানীরা জিন বিশ্লেষণ করেই বলতে পারেন ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা নতুন প্রজাতি সৃষ্টিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি ছাড়াও প্রজাতি অন্যভাবে সৃষ্টি হতে পারে। মায়ার বায়োলজিকাল স্পেসিস কনসেপ্টটি গড়ে উঠতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন। (৩) ই বি ফোর্ড (১৯০১-১৯৮৮) বৃটিশ ইকোলজিকাল জিনতাত্ত্বিক। যিনি প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রমাণ খুজেছিলেন প্রথম, বিশেষ করে মথ ও প্রজাপতিদের মধ্যে। ecological genetics ক্ষেত্রেটি তার প্রতিষ্ঠা করা। (৪) বার্ণার্ড রেনশ (১৯০০-১৯৯০) জার্মান বিবর্তন জীববিজ্ঞানী ও পাখি বিশেষজ্ঞ। তিনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে পরিবেশের নানা নিয়ামক বিবর্তনকে প্রভাবিত করতে পারে ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী, প্রজাতির উপরের স্তরে। (৫) জুলিয়ান হাক্সলি (১৮৮৭-১৯৭৫) ছিলেন ডারউইনের বুল ডগ নামে খ্যাত টি এইচ হাক্সলির দৌহিত্র। অগাস্ট ভাইসম্যানের পর তিনি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জীববিজ্ঞানী বিবর্তনের প্রাথমিক কারণ হিসাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের সমর্থক ছিলেন। (৬) জন গেলর্ড সিম্পসন (১৯০২-১৯৮৪) মডার্ন সিনথেসিসে আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা সিম্পসন জীবাশ্ববিদ ছিলেন। তিনি প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেন জীবাশ্ম রেকর্ড ডারউেইনের প্রাকৃতিক ধারণাকে সমর্থন করে।জীবাশ্মবিদ্যায় গণিতের ব্যবহারে তিনি ছিলেন অগ্রদূত, তিনি বিশ্বাস করতে জীবাশ্মবিদ্যা পৃথিবীতে জীবনের দীর্ঘ ইতিহাস উন্মোচন করবে যার মাধ্যমে আমরা বিবর্তনের ইতিহাস অধ্যয়ন করতে পারি। (৭) জর্জ লেডইয়ার্ড স্টেবিন্স ( ১৯০৬-২০০০) যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও জিনতাত্ত্বিক জিনতত্ত্ব আর ডারউইনী প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাকে সমন্বয় করেছিলেন উদ্ভিদের প্রজাতিকরণ ব্যাখ্যা করার জন্য, তার বিখ্যাত বই Variation and Evolution in Plants; (৮) সের্গেই চেটভেরিকভ (১৮৮০-১৯৫৯), অসাধারণ এই রুশ বিজ্ঞানী প্রথম দিককার একজন জিন বিজ্ঞানী। তিনি ডোবঝানস্কিকে প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন প্রাকৃতিক পরিবেশে জনগোষ্ঠীর মধ্যে জিনতাত্ত্বিক বিষয়গুলো কিভাবে কাজ করে। স্তালিনের সময় সোভিয়েত বিজ্ঞানের কুখ্যাত চরিত্র লিসেঙ্কোর দ্বারা নিপীড়িত হয়েছিলেন।)

এই ধারণাটি আরো বিকশিত হয় পরের দশকে, W. D. Hamilton, George C. Williams, John Maynard Smith, Robert Trivers এর কাজ বিবর্তনের জিন কেন্দ্রীক দৃষ্টিভঙ্গিটি গড়ে তোলো ষাট ও সত্তরের দশকে। বর্তমান সংশ্লেষণটি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটিকে সম্প্রসারিত করে এর পরে আসা বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলোর সাথে সমন্বিত করা হয়েছে, যে ধারণাগুরো ডারউইনের জানার কোনো উপায় ছিল না, যেমন ডিএনএ ও জেনেটিক্স, এর ভিত্তি মজবুত করেছে kin selection, altruism, আর speciation এর ধারণাগুলোর গাণিতিক ব্যাখ্যা।


ছবি: (বা দিক থেকে ) (১) জর্জ সি উইলিয়ামস (১৯২৬-২০১০) আমেরিকার বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, যিনি গ্রুপ সিলেকশন ধারণার বিরোধী ছিলেন। মেনার্ড স্মিথ ও বিল হ্যামিলটনের সাথে জিন কেন্দ্রীক বিবর্তনের ধারণাটির সূচনা করেন। (২)বিল হ্যামিলটন (১৯৩৬-২০০০) বৃটিশ বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, বিংশ শতাব্দী শ্রেষ্ঠতম তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী হিসাবে মনে করা হয়। তিনি সুপরিচিত ছিলেন altruism বা পরার্থবাদীতার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রস্তাবনা করার জন্য, যা গুরুত্বপূর্ণ ছিল gene-centric view of evolution, বিবর্তনের জিন কেন্দ্রীক ধারণাটিকে পরিচিত করে তুলতে, তিনি লিঙ্গ অনুপাত ও যৌন প্রজনন বিবর্তনের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। (৩) জন মেনার্ড স্মিথ (১৯২০-২০০৪) বৃটিশ তাত্ত্বিক জীববিজ্ঞানী ও জিনতাত্ত্বিক, তার বিখ্যাত অবদান বিবর্তনের ক্ষেত্রে গেম থিওরী প্রয়োগ, এছাড়াও যৌন প্রজননের বিবর্তন ও সিগনালিং থিওরীর তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করেছিলেন, যেখান evolutionarily stable strategy ধারণাটি এসেছে। (৪) রবার্ট টিভার্স (১৯৪৩-) আমেরিকার বিবর্তন জীববিজ্ঞানী, তিনি reciprocal altruism (1971), parental investment (1972), facultative sex ratio determination (1973), আর parent–offspring conflict (1974) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা করেছিলেন। এছাড়াও তিনি বিবর্তনীয় কৌশল হিসাবে self-deception ও intragenomic conflict ধারণাটিও ব্যাখ্যা করেছেন।


(ছবি: রিচার্ড ডকিন্স, ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত দ্য সেলফিশ জিনের প্রথম সংস্করণ, ৩০ তম বার্ষিকী ও সম্প্রতি ৪০ তম সংস্করণ)

১৯৭৬ সালে রিচার্ড ডকিন্স তার দ্য সেলফিশ জিন বইটিতে এইসব গানিতিক ব্যাখ্যাগুলোকে সমন্বিত করেছিলেন গাণিতিক কোনো ভাষা ব্যবহার করা ছাড়াই – সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, জিনই হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের একমাত্র একক, যার উপরেরই শুধুমাত্র কাজ করে প্রাকৃতিক নির্বাচন।

(* এ বিষয়ে আপাতত এটুকু থাক)

ডারউইনের কিছু অনুমান

সময়ের তুলনায় চার্লস ডারউইন অনেক এগিয়ে ছিলেন ভাবনায়, শুধুমাত্র এই কথাটা বললে তাঁর প্রতি খুব একটা সুবিচার করা হবে না। ডারউইন বেশ কিছু পূর্বধারণা করেছিলেন।বিবর্তনবাদের এই জনকের অনেক অনুমানই ১৮৮২ সালে তার মৃত্যুর অনেক বছর পর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্প্রতি, প্রমাণিতও হয়েছে, আর বিজ্ঞানীরা তাঁর ধারণাগুলোর স্বপক্ষে খুজে পেয়েছেন পর্যাপ্ত পরিমান সব স্বাক্ষ্যপ্রমাণ। বর্তমানে প্রাপ্ত সকল প্রমাণ – যা সুষ্পষ্টভাবে তার প্রস্তাবিত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়া এবং তাঁর আরো কিছু অনুমানকেই সমর্থন করে – এসেছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা থেকে, যেমন জীবাশ্মবিদ্যা,ভূতত্ত্ব, জৈবরসায়ন, জিনতত্ত্ব, অণুজীববিজ্ঞান এবং ইভোল্যুশনারী ডেভোলপমেন্টাল বায়োলজী বা ‘ইভো ডেভো’, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী কেনেথ মিলার’এর মতে ‘আমরা কোথা থেকে এসেছি এই প্রশ্নের একটি সাধারণ উত্তর দেবার জন্য এতোগুলো ক্ষেত্র থেকে আসা সব প্রমাণ যে একটি সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারছে, এই বিষয়টাই তো অত্যন্ত শক্তিশালী। একারনেই বিবর্তন তত্ত্বের স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমানের পরিমান অনেক বেশী।’

বিবর্তন ঘটছে

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ডারউইনের নোটবুকে জীবন বৃক্ষ স্কেচ 1837 First Notebook on Transmutation of Species by Charles Darwin থেকে)

ডারউইন কিন্তু সর্বপ্রথম বিবর্তন তত্ত্ব প্রস্তাব করেননি – অর্থাৎ পৃথিবীর সকল জীবিত প্রাণির উৎপত্তি হয়েছে আদি পূর্বসূরি রুপ থেকে আর তাদের মধ্যে শনাক্তযোগ্য সকল পার্থক্যগুলোর কারণ প্রজন্মান্তরে ঘটা পরিবর্তনগুলো। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তাঁর মত করে কেউই এত ভাবেননি কিংবা এর স্বপক্ষে এত প্রমাণও সংগ্রহ করেননি বা আমাদের সমষ্ঠিগত চেতনায় চার্লস ডারউইনের মত করে আর কেউই বিষয়টিকে একটি স্থায়ী জায়গা করে দিতে পারেননি। বর্তমানে গবেষকরা ইভো ডেভোর জিনতাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরনের জীবের বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছেন, ডারউইন তার আঁকা জীবন বৃক্ষে যাদের জায়গা করে দিয়েছিলেন (উপরের ছবিটি ১৮৩৭ সালের তার একটি নোটবুক থেকে নেয়া, তার হাতে আকা বিবর্তনের আলোকে এধরনের একটি প্রথম জীবন বৃক্ষ। নোটবই এর ৩৬ নং পাতায় বিবর্তনীয় জীবন বৃক্ষের উপরে তার লেখা ‘I think’ বাক্যটি লক্ষ্য করুন), জিনতাত্ত্বিক থিওডোসিয়াস ডোবঝানস্কি লিখেছিলেন,‘বিবর্তনের আলোকে ব্যাখ্যা ছাড়া জীববিজ্ঞানে কোনো কিছুরই অর্থ হয়না’।

বিবর্তন প্রক্রিয়া ঘটছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ফিন্চ (চার্লস ডারউইনের 1839 Journal of Researches Into the Natural History and Geology of the Countries Visited During the Voyage of HMS Beagle Round the World, Under the Command of Captn. FitzRoy, R.N. থেকে)

জীবরা যে বিবর্তিত হয় শুধু সে কথা বলেই ডারউইন সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি লিখেছিলেন, ‘বিবর্তন তত্ত্বের দৃঢ় ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও এটি সন্তোষজনক হবে না, যদি না তা দেখাতে পারে, ‘কিভাবে’ পৃথিবীতে বসবাসকারী অসংখ্য প্রজাতির জীব পরিবর্তিত হয় এমনভাবে যেন তারা তাদের আকার ও আকৃতিতে আর সহঅভিযোজনের সর্বোত্তম রুপ অর্জন করে, যা খুব সঙ্গত কারণে আমাদের প্রশংসার দাবী রাখে।’, যাকে বলা হয় ‘পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি ধারণা’ – সেখানে ডারউইন এই পরিবর্তনগুলোর কারণ হিসাবে প্রস্তাব করেছিলেন একটি প্রক্রিয়াকে, যার নামকরণ করেন প্রাকৃতিক নির্বাচন। যার মুল বক্তব্য হচ্ছে, কোনো প্রজাতির মধ্যে যে সদস্যরা তাদের পরিবেশের সাথে বেশী সফলতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে তারা, প্রজাতির অপেক্ষাকৃত কম সফল সদস্যদের তুলনায় বেশী দিন বাঁচবে এবং প্রজননের সুযোগও পাবে বেশী এবং এভাবে তারা তাদের উপযোগী সব বৈশিষ্ট্য এবং জিনগত গুণাবলী তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বিস্তারে অপেক্ষাকৃতভাবে সফল হবে। ডারউইন এই তত্ত্ব প্রস্তাবের সময় থেকে আজ, এই মধ্যবর্তী সময়ের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে জীবাশ্মবিদ নীল এল্ডরেজ লিখেছেন, ‘এই অর্ন্তবর্তীকালীন ১৭৫ বছরে আমরা এমন নতুন কিছুই শিখিনি, যা কিনা প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে কাজ করে সে বিষয়ে ডারউইনের এর মুল বিবরনের সাথে অসঙ্গতিপুর্ন’।

যথোচিতভাবে, প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে কাজ করছে তার সবচেয়ে সেরা ও আকর্ষণীয় উদহারণগুলোর একটি : গালাপাগোসের ফিঞ্চ পাখীরা, যারা একসময় ডারউইনকে দিয়েছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতি। ১৯৭৩ সাল থেকে, জীববিজ্ঞানী পিটার এবং রোজমেরী গ্রান্ট গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ্ঞের ছোট একটা দ্বীপ ডাফনে মেজরে কাজ করছেন। তারা একটি স্থানীয় ফিঞ্চ, Geospiza fortis নিয়ে গবেষেণা করে আসছিলেন। (উপরের ছবিটি, ১৮৩৯ সালে ডারউইনের বিগল সমুদ্রযাত্রার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত একটি বইয়ে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল)। ১৯৭৭ সালের একটি অনাবৃষ্টিতে ছোট বীজ তৈরী করে এমন অনেক উদ্ভিদ ধ্বংস হয়েছিল এই দ্বীপে, ফলে খাদ্য হিসাবে এর উপর নির্ভরশীল ১২০০ জিওস্পিজা ফর্টিস ফিন্চের ১০০০ ই মরে যায় সেখানে । গ্রান্ট যুগল আবিষ্কার করেন যে, অপেক্ষাকৃত বড় আকারের জিওস্পিজা ফর্টিস, যারা বড় বীজ ভেঙ্গে খেতে সক্ষম তারা আকারে ছোট জিওস্পিজা ফর্টিস, অপেক্ষা সংখ্যায় বেশী ‍বেঁচে যায়। ১৯৭৮ এ যারা বেঁচে ছিল তাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রজনন হয়। এবং এদের প্রজন্মের মধ্যে দেখা যায় তাদের ঠোট পূর্ববর্তী প্রজন্ম অপেক্ষা শতকরা ৪ ভাগ বড়। ২০০৩ আরো একটি অনাবৃষ্টিতে দেখা যায় ছোট ঠোটের জিওস্পিজা ফর্টিস ফিন্চরাই ‍বড় ঠোটের ফিন্চদের চেয়ে সংখ্যায় বেশী বেঁচে ছিল। আংশিকভাবে এর কারণ ঐ দ্বীপে বসবাস স্থাপনকারী আরেকটি বড় আকারের ফিন্চ প্রজাতি জিওস্পিজা ম্যাগনিরসট্রিসের (G. magnirostris) সাথে খাদ্য হিসাবে বড় বীজের জন্য বড় ঠোটের জিওস্পিজা ফর্টিস ফিঞ্চদের কঠিন প্রতিযোগিতা। ২০০৩ থেকে ২০০৫, গ্রান্টস যুগল আবার আবিষ্কার করলেন, জিওস্পিজা ফর্টিস এর ঠোটের আকার শতকরা ৫ ভাগ কমে গেছে।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের অবশ্যই কোনো প্রক্রিয়া আছে:

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ফ্রান্সিস ক্রিকের হাতে আকা ডিএনএ ডাবল হেলিক্সের প্রথম ডায়াগ্রাম।)

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে যে বিবর্তন হচ্ছে ডারউইন তা খুব ভালো করে জানতেন, যে প্রশ্নটার উত্তর তাঁর জানা ছিল না তা হল, কেমন করে সেই প্রক্রিয়াটি কাজ করছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি এর ব্যাখা হিসাবে প্রস্তাব করেছিলেন বংশগতি বা হেরেডিটির একটা পদ্ধতিকে, যার নাম দিয়েছিলেন প্যানজেনেসিস। ভূল প্রমাণিত হয়েছিল তার এই প্যানজেনেসিসের ধারণাটি। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটা হলো, বংশগতির আসল প্রক্রিয়াটি -জিনতত্ত্ব বা জেনেটিক্স -কিন্তু ডারউইনের জীবদ্দশায় আবিষ্কৃত হয়েছিল, যদিও তিনি তা জেনে যেতে পারেননি। ১৮৬৫ সালে মটরশুটি গাছ নিয়ে গবেষনা করে অষ্ট্রিয়ীয় পাদ্রী গ্রেগর মেন্ডেল কিন্তু জিনতত্ত্বের মৌলিক নিয়মগুলো আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু মেন্ডেলের গবেষণা ১৯০০ সাল পর্যন্ত্য অবহেলিত হয়েছে, তার কাজ প্রকৃত মূল্য পেয়েছে ১৯৪০ এর দশকে যখন বিজ্ঞানীরা জিনের আসল উপাদান ‍ডিএনএ’কে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ( ছবিতে ফ্রান্সিস ক্রিকের আকা ডিএনএ ডাবল হেলিক্স এর প্রথম স্কেচ); বর্তমানে জীবিত প্রাণির জিনোমই হলো জিনতত্ত্ব, ‍চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই জিনতত্ত্বের বৈপ্লবিক সব গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া যাই হোক না কেন, তা অবশ্যই প্রাকৃতিক, কোনো ভাবেই অতিপ্রাকৃত না:

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ওক গাছের চারা)

ডারউউন তার বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছেন প্রায় ২০ বছর, যতক্ষণ না পর্যন্ত আরেকজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, সম্পুর্ন স্বতন্ত্রভাবে প্রজাতির বিবর্তন সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় ঠিক একই ধারণায় উপনীত হন। তার দেরী করার অন্তত একটা কারণ ছিল, তিনি জানতেন ধর্মপরায়ন খ্রিস্টানদের বিশ্বাসের উপর তার তত্ত্ব কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। আর এদের মধ্যে একজন ছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী এমা, যিনি বিশ্বাস করতেন যে, পৃথিবীর সমস্ত জীবিত জীবকে সম্পুর্ন রুপে আর পরস্পরের থেকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর। বলাবাহুল্য ডারউইনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো ভিন্ন। বন্ধু টি. এইচ. হাক্সলী ছিলেন একই মতের, ‘একই ধরনের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় যেভাবে বীজ থেকে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে, বা ডিম থেকে জন্ম নেয় মুরগী,’ হাক্সলী লিখেছিলেন, ‘বিবর্তন প্রক্রিয়া বিশেষ সৃষ্টিসহ সব ধরনের অতিপ্রাকৃত হস্তক্ষেপের ধারণাকে পরিত্যাগ করে।’ অবশ্যই সারা পৃথিবী বহু মানুষ আজো বিশ্বাস করেন সৃষ্টির পেছনে রয়েছে স্বর্গীয় হস্তক্ষেপ।

ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যা বা এমব্রায়োলজী হচ্ছে ‘আকৃতির পরিবর্তনের স্বপক্ষে এককভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রেণীর তথ্যসম্ভার’:

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: মানব ভ্রূণ)

ডারউইনের মতে নিষিক্ত একটি ডিম্বাণু যে পক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বহু সহস্র কোটি কোষের একটি পুর্ণবয়স্ক প্রাণিতে পরিণত হয়ে এ বিষয়টি, বিবর্তনের সময়ে কিভাবে প্রাণী এবং উদ্ভিদের মূল অঙ্গ কিভাবে পরিবর্তিত হয়, তা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানের নতুন শাখা ইভোল্যুশনারী ডেভেলপমেন্ট বায়োলজী বা সংক্ষেপে যা ‘ইভো ডেভো’ নামে পরিচিত, আজ ডারউইনের এই ধারণার পিছনে সত্যকে দ্রুততার সাথে উন্মোচন করে চলেছে। অতি সম্প্রতিকাল পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা কেবল বলতে পারতো আকারের পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু কিভাবে হচ্ছে, সেটি তাদের সঠিক জানা ছিল না। তবে এখন তারা সেটা জানেন, বিস্ময়কর একটা ব্যাপার যদিও, পৃথিবীর সকল জীব, অণুজীব থেকে মানুষ (ছবিতে মানুষের ভ্রূণ) সবাই একই ধরনের ‘টুল-কিট’ বা মাষ্টার জিন ব্যবহার করে, যা নিয়ন্ত্রন করে শরীর এবং অন্যান্য অঙ্গ কিভাবে তৈরী হবে এবং ভ্রুণাবস্থায় কখন কোনো জিনটা সক্রিয় /নিষ্ক্রিয় বা সুইচ অন/অফ হবে বা কেমন করে তৈরী হবে প্রাণীর শরীর।

যৌন নির্বাচনও বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি চালিকা শক্তি

?w=660″ width=”500″ />
( ছবি: পেখম সহ পুরুষ ময়ুর)

ডারউইনের কাছে ময়ূর ছিল একটা ধাঁধার মত। কেমন করে অতিআড়ম্বর সম্পন্ন এমন পেখমের উৎপত্তি হলো। কেমন করে এই পেখম প্রজাতির সবচেয়ে সুযোগ্য সদস্যদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে (survival of the fittest বাক্যটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সার) অবদান রাখতে পারে। ডারউইন এই পশ্নের উত্তর প্রস্তাব করেছিলেন তার The Descent of Man বইটিতে, যেখানে তিনি একটি নতুন ধারণার প্রস্তাবনা করেন: যৌন নির্বাচন, যা ব্যাখ্যা করে প্রাণিদের নানা বৈশিষ্ট্যের বিবর্তনে প্রজাতির বীপরিত লিঙ্গের সদস্যরা কিধরনের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন যে আসলে কোনো ছেলে ময়ূরের পেখম সবচেয়ে সুন্দর, এ বিষয়ে মেয়ে ময়ূরের পছন্দ বা অপছন্দই সম্ভবত ছেলে ময়ূরদের এমন জমকালো পেখমের কারণ। ১৯৯০ এর দশকে নিউক্যাসল-আপন-টাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী মারিওন পেট্রি প্রমাণ করেন যে, আসলেই ডারউইনের অনুমান সঠিক। গড়পড়তায় ছেলে ময়ুরের পেখমে প্রায় ১৫০ টা মত চোখ থাকে, সেখান থেকে কিছু চোখ সরিয়ে ফেললেই ঐ পুরুষ ময়ুরের প্রজনন সুযোগ অনেকাংশে কমে যায়। ১৩০ টা চোখের নীচের পুরুষ কমই পারে প্রজনন সঙ্গী হিসাবে মেয়ে ময়ুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সফল হতে। পেট্রির যুক্তি হলো, যতই একটা পুরুষ ময়ুর স্বাস্থ্যবান হবে ততই সে পেখমের চোখ তৈরীর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় শক্তি বিনিয়োগ করতে পারবে – যে বিষয়টা মেয়ে ময়ুররা নিজেরাই ভালো বুঝতে পারে।

মানুষ সহ প্রত্যেকটি জীব একটি সাধারণ পূর্বসূরির বংশধর

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: অমর জিন ( ছবি: Sean B. Carroll এর The Making of the Fittest: DNA and the Ultimate Forensic Record of Evolution (Norton)থেকে পুনঃঅঙ্কিত)

ডারউইন জানতেন, মানুষ একটি প্রাণি মাত্র, তাঁর এমন বক্তব্যে তৎকালীন ভিক্টোরিয় সমাজে ‍‍‍ তেমন কোনো গ্রহনযোগ্যতা না পাবার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু তাঁর Origin of species এ তিনি কিন্তু এই বক্তব্যটাকে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে লিখেছিলেন যে, ‘আমি সাদৃশ্য থেকে অনুমান করতে পারি যে, সম্ভবত পৃথিবীর সকল জীব, যারা এই পৃথিবীতে কোনোদিনও বেঁচে ছিল, তারা প্রত্যেকে আদিম কোনো জীব থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে, যেখানে জীবনের প্রথম শুরু হয়েছিল।’ তখন থেকেই তার এই ধারণার পক্ষে অনেক স্বাক্ষ্য প্রমাণ সংগৃহীত হয়েছে আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ এসেছে ইভো ডেভো থেকে। জীবনের তিনটি ডোমেন – আরকীয়া, ব্যাকটেরিয়া এবং ইউক্যারিওট ( প্রাণি,উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং প্রোটিষ্টরা)- দের জিনোম তুলনামূলক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, মোটামুটি ৫০০ জিন জীবিত সকল প্রাণিদের মধ্যে পাওয়া যায়, সৃষ্টির শুরু থেকে সেই অমর জিনগুলো টিকে গেছে অপরিবর্তিত রুপে প্রায় ২ বিলিয়ন বছর ( ছবিতে সেরকমই বিভিন্ন জীবের মধ্যে বিদ্যমান একটা প্রোটিন অনুক্রমের অংশ বিশেষ দেখানো হয়েছে, একই অ্যামাইনো এসিডগুলোকে হাইলাইট করা হয়েছে)। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন মিলারের ভাষায় ‘অসাধারণ জীববৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও, প্রত্যেকটা জীবিত প্রাণিদের মধ্যে প্রায় একই ধরনের অত্যাবশ্যকীয় জিনগুলো বিদ্যমান, যা সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে তাদের উৎপত্তি হয়েছে বিবর্তনের মাধ্যমে একটি সাধারণ পূর্বসূরি প্রাণি থেকে।’

এইপ’দের (Ape) মত পূর্বপুরুষদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে মানুষ

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত Evidence as to Man’s Place in Nature (Thomas Henry Huxley) থেকে মানুষ, গরিলা, শিম্পাঞ্জি, ওরাং উটান ও গিবনের কংকাল)

ডারউইনের মনে আশঙ্কা ছিল, যদি তিনি প্রস্তাব করে মানুষ এবং এইপ’দের আদি পূর্বপুরুষ ছিল এক, তাহলে তার সমকালীন সমাজে অনেকেই গভীরভাবে মর্মাহত হতে পারে। স্বভাবতই ডারউইন তার ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত Origin of species এ মানব বিবর্তনের বিষয়টিকে বলতে গেলে প্রায় এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু ১৮৭১ এ Descent of Man এ তিনি এ বিষয়ে তার ধারণাগুলো স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন। কোনো রাখ ঢাক না করে লিখেছিলেন, ‘লোমশ, চতুর্পদী,লে জযুক্ত, স্বভাবে সম্ভবত বৃক্ষচারী কোনো প্রাণির বংশধর হলো মানুষ।’; তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মনের সাথে শিম্পান্জ্ঞি বা গরিলার মনের পার্থক্য প্রকারে না বরং প্রকৃতিতে’; তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার যা মনে হয় তা হলো, আমাদের অবশ্যই স্বীকার করা উচিৎ, সকল মহান গুণে গুণান্বিত মানুষ, তার শারীরিক কাঠামোতে খুব সাধারণ উৎপত্তির অমোচনীয় চিহ্ন বহন করে বেড়ায়’। আজ অনেক স্কুলের ছেলে মেয়েরাই সেই পরিসংখ্যানটি বলতে পারবে, ‍‍যেটি উল্লেখ করা হয় এই মতবাদের স্বপক্ষে জোরালো একটি যুক্তি হিসাবে- বিবর্তনের ধারায় আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী জীবিত প্রাণি শিম্পাঞ্জির ডিএনএ‘র সাথে আমাদের ডিএনএ’র প্রায় শতকরা ৯৯ ভাগই মিল (উপরের ছবিটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল টি এইচ হাক্সলি’র ১৮৬৩ সালে প্রকাশিত Man’s Place in Nature এ ছবিটিকে সর্ববামে গিবন ছাড়া সব প্রাণিদের কাঠামো আনুপাতিক আকারে আঁকা, গিবনের ছবিটি তার তার আকারের দ্বিগুন অনুপাতে আকা হয়েছে)

আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয়েছে আফ্রিকায়

?w=660″ width=”500″ />
ছবি: বিবর্তন বৃক্ষ ( ছবি: Pascal Gagneux et al. 1999. “Mitochondrial Sequences Show Diverse Evolutionary Histories of African Hominoids.” Proc. Natl. Acad. Sci. USA ,Vol. 96, pp. 5077-5082, 27 April থেকে পুনঅঙ্কিত)

ডারউইন জীবিত থাকাকালীন সময়ে আদি মানুষের তেমন কোনো জীবাশ্ম খুজে পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল ১৮৫৬ সালে জার্মানীর নিয়ানডার উপত্যকায় খুজে পাওয়া নিয়ানডার্থাল মানুষের জীবাশ্ম । এছাড়াও তখন কেউই সুনিশ্চিৎভাবে সেগুলো কত বছরের পুরোনো তা পরিমাপ করতে পারেনি। কিন্তু শিম্পান্জ্ঞি বা গরিলাদের সাথে আমাদের শারীরিক গঠনের সাদৃশ্য লক্ষ্য করে তিনি অনুমান করেছিলেন যে, Homo spaiens রা বিবর্তিত হয়েছে আফ্রিকায়। তার স্বভাবসুলভ সর্তকতার সাথে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের পু্র্বপুরুষদের উৎপত্তি, অন্য কোনো স্থান থেকে আফ্রিকা মহাদেশেই হবার সম্ভাবনাই বেশী’; বর্তমানে সুপরিচিত লুসি শুধুমাত্র, মানুষ বা মানুষের মত প্রজাতিদের অসংখ্য আবিষ্কৃত জীবাশ্মদের একটি মাত্র, যাদের বেঁচে থাকার সময়কাল এবং বৈশিষ্ট্য তার ধারণাকে প্রমাণ করেছে, মানুষের প্রথম আবির্ভাব হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশে। (উপরের ছবিতে ১৯৯৯ সালের ডিএনএ সাদৃশ্যর উপর ভিত্তি করে আঁকা একটি বিবর্তন বৃক্ষ যা প্রমাণ করেছে আমরা মানুষসহ পাচটি গ্রেট এইপ পরিবার একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভব হয়েছিল। ডায়াগ্রামে শাখার দৈর্ঘ্য নির্দেশ করে প্রত্যেকটি প্রাণিদের জনগোষ্ঠী তাদের নিকটবর্তী স্বজনদের থেকে কতটুকু আলাদা হয়েছে তাদের মাইটোকাইন্ড্রয়াল জিনের অনুক্রমে)।

পৃথিবীর বয়স কম করে হলেও কয়েকশ মিলিয়ন বছর

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: পৃথিবী)

১৬৫৮ সালে আইরিশ পাদ্রী জেমস আশার, বাইবেল এবং তার পঠিত ঐতিহাসিক রেকর্ডের উপর ভিত্তি করে ঘোষনা দেন, খৃষ্টপূর্ব ৪০০৪ এর অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। ডারউইনের সমসাময়িক ভুতত্ত্ববিদরা এর তীব্র বিরোধীতা করে বললেন, প্রমাণ সহ যুক্তি দিলেন যে পৃথিবীর বয়স আরো অনেক বেশী। ডারউইন, বিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মাত্র ছয় হাজার বছরের চেয়ে আরো অনেক বেশী পরিমানএকটা যে সময় দরকার, এই বিষয়টি জানতেন, এবং ভুতত্ত্ববিদদের সাথে বিষয়টি সম্বন্ধে এক মত পোষন করেন। Origin of Species এর প্রথম সংস্করণে তিনি আমাদের গ্রহটি বয়স কমপক্ষে কয়েকশ মিলিয়ন বছর হবে বলে দাবী করেছিলেন। আসলে, এখন আমরা সবাই জানি পৃথিবী আরো বেশী প্রাচীন। ১৯০০’র দশকে, মারি এবং পিয়ের কুরী তেজক্রিয়তা আবিষ্কার করার পর, পদার্থবিদরা ইউরনিয়ামের হাফ লাইফ এবং আরো কয়েকটি তেজষ্ক্রিয় মৌল উপাদান ব্যবহার করে পাথরের বয়স নির্ণয়ের কৌশলও উদ্ভাবন করেন। পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীনতম খনিজ পদার্থের বয়স প্রায় ৪.১ থেকে ৪.২ বিলিয়ন বছর, যা প্রমাণ করে পৃথিবীর বয়স এর চেয়ে কম হতে পারে না। কিন্তু উল্কাপিন্ড, বিজ্ঞানীরা যাদের মনে করেন পৃথিবী সৃষ্টির সমসাময়িক সময়ে সৃষ্ট হয়েছিল, কিন্তু ভুতাত্ত্বিকভাবে যারা নিষ্ক্রিয়, ফলে তারা তাদের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার প্রমাণ এখনও বিদ্যমান, সেই উল্কাপিন্ডের উপরে বয়স পরিমাপের বিভিন্ন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করে বার বার বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মোটামুটি একই বয়স পরিমাপ করেছেন – তা হলো প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর। বর্তমানে এটাই পৃথিবীর বয়স হিসাবে বেশী স্বীকৃত।

জীবাশ্ম রেকর্ডের ফাকা জায়গাগুলো পুরণ করবে গুরুত্বপুর্ণ ট্রান্জিশনাল (অন্তর্বর্তীকালীন) জীবাশ্মগুলো

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: আর্কিওপটেরিক্স)

তার নোটবুকে, সেই সময়ে জীবাশ্ম রেকর্ডের মধ্যে বিদ্যমান ফাকা জায়গাগুলো নিয়ে ডারউইন চিন্তার কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘যেন কোনো বই থেকে পাতা ছিড়ে ফেলা হয়েছে’; সম্ভবত সবচেয়ে বড় ফাকা জায়গাটা ছিলো ক্যামব্রিয়ান পিরিওডের (৫৪৪-৫১৪ মিলিয়ন বছর আগে) আগে কোনো জীবাশ্ম খুজে না পাওয়ার ব্যাপারটা, ‘কেন আমরা ক্যামব্রিয়ান সিস্টেমেরও আরো আগের পিরিওডের জীবাশ্ম সমৃদ্ধ ডিপোসিট খুজে পাচ্ছিনা, এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর আমার জানা নেই’ তিনি লিখেছিলেন; যদি তার তত্ত্ব সঠিক হয়,তিনি জানতেন এই সব ফাকা জায়গাগুলো ভবিষ্যতে কোনো এক সময় পুর্ণ হয়ে যাবে। গত অর্ধ শতাব্দীতে কেবল মাত্র জীবাশ্মবিদরা প্রি-ক্যামব্রিয়ান পর্বেও জীবাশ্ম খুজে পেতে শুরু করেছেন এবং এই জীবাশ্ম’র পরিমান বিশাল এবং ক্রমাগতই তা বাড়ছে। বর্তমানে সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্মর বয়স প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর। এছাড়াও জীবাশ্মবিদরা একের পর এক খুজে বের করছেন গুরুত্বপুর্ন সেই সব ট্রান্জিশনাল ফসিল গুলো যা গুরুত্বপুর্ন বিবর্তনের নানা পর্বগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরী করেছে এবং ডারউইনের সময়ে যাদের অনুপস্থিতি তাকে চিন্তিত করেছিল (যেমন: ছবিতে এখানে একটি আর্কিওপটেরিক্স এর জীবাশ্ম)।

এক ফুট লম্বা কোনো পতঙ্গ নিশ্চয়ই আছে এই অর্কিডের পরাগায়ন করার জন্য

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী (Angraecum sesquipedale, মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড)

ডারউইনের ধারণাগুলোর মধ্যে সবগুলোই যে বড় পরিসরের বা পৃথিবী কাপানো, তা কিন্তু না, কিছু কিছু ছিল খুব সাধারণ ভবিষ্যদ্বাণী। মাদাগাস্কারের অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী (Angraecum sesquipedale) নামের অর্কিড প্রজাতির কথাই ধরুন ( যা মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড নামেও পরিচিত)। ১৮৬২ সালে তিনি যখন এই অর্কিডটি প্রথম দেখেন, আর সবার মত এর স্পারটির দৈর্ঘ্য দেখে অবাক হয়ে যান (ছবিতে পেছনে সরু সবুজ নালীটিকে দেখুন); এই অর্কিডটি তার ফুলের পেছনে একটা লম্বা স্পার বা মধুথলি তৈরী করে যার দৈর্ঘ্য এক ফুটেরও বেশী (২০-৩৫ সেমি) (ল্যাটিন ভাষায় সেসকিপেডাল মানে দেড় ফুট) এবং এই স্পারের একেবারে তলদেশে এটি নেক্টার বা ফুলের মধু তৈরী করে। ‘আশ্চর্য্য’, তিনি লিখেছিলেন, ‘কোন পতঙ্গ এই মধুথলীর মধু পান করতে পারে?’ মন্তব্য করেন, ‘এখনো আবিষ্কার হয়নি এমন কোনো পতঙ্গ নিশ্চই আছে যার এক ফুট দীর্ঘ জিহবা আছে, যা দিয়ে এই লম্বা মধুথলীর মধু খেতে পারে’। তার সমসাময়িক কীটপতঙ্গবিদরা সন্দিহান ছিলেন বিষয়টি নিয়ে, কারণ ‍সেরকম কোনো পতঙ্গতো পাওয়া যায়নি। ডারউইন বিশ্বাস করতেন যে ফুলের অতিআড়ম্বরপুর্ণ রং কিংবা আকার বিবর্তিত হয়েছে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য না বরং পরাগায়নের জন্য পতঙ্গদের আকর্ষণ এবং তাদের নিজেদের সফল বংশবিস্তারের কৌশল হিসাবে। যে পরিচিত কৌশল ডারউইন শনাক্ত করেছিলেন, তা হলো ফুলের মধু খাওয়ার সময় ফুল পতঙ্গের পায়ে ফুলের আঠালো রেণু লাগিয়ে দেয়া। সুতরাং ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন, মাদাগাস্কারের জঙ্গলে কোথাও না কোথাও কোনো এমন কোনো পতঙ্গ বাস করে যার জিহবা যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ,অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী’ এর লুকোনো মধু পান করার জন্য। যখনই এই রহস্যময় পতঙ্গটি তার দীর্ঘ জিহবা প্রবেশ করে ফুলের গায়ে চেপে বসে মধু পান করে, ফুলের রেণু তখন তার শরীরে মেখে যায়, যা ফুলটি পরাগায়নে সহায়তা করে। তার মৃত্যুর একুশ বছর পর তার ভবিষ্যদ্বানী সফল হয়, যখন মাদাকাস্কারের জঙ্গলে বিজ্ঞানীরা খুজে পান দীর্ঘ জিহবার সেই পতঙ্গ, ডারউইনের ভবিষ্যদ্বানীকে সন্মান করে এটির নামকরন করা হয় জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা (ছবি ), একমাত্র এই মথটি পারে এই অর্কিডের পরাগায়ন করতে। আরো একবার তার কথা সঠিক প্রমাণিত হলো।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা মথ,অর্কিডটির পরাগায়নের জন্য একমাত্র এই প্রাণীটি সক্ষম।)

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 4