বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয় (শেষ পর্ব -২)


(ছবি: চার্লস ডারউইনের জীবন বৃক্ষ (২০১৫), কাপড়ে শিল্পীর নিজের চুল দিয়ে সেলাই করা, আসমা সুলতানা।):

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: চার্লস ডারউইন – একটি ধারণার বিজয়:
(আগের পর্বগুলো: প্রথম | দ্বিতীয় | তৃতীয় | চতুর্থ | পঞ্চম | ষষ্ঠ| সপ্তম | অষ্টম| নবম| শেষ পর্ব – ১)


ডারউইনের লিগেসি

১৮৮২ সালের ডারউইন ১৯ এপ্রিল হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ডারউইন। স্ত্রী এমাকে বলা তার শেষ বাক্যটি ছিল, ‘আমি মৃত্যুকে একটুও ভয় করছিনা, মনে রেখো তুমি আমার আদর্শ সহধর্মিনী ছিলে, আমার ছেলে মেয়েদের বলো তারা সবসময় আমার সাথে ভালো ব্যবহার করেছে’। বাসার কাছে সেইন্ট মেরী চার্চের সমাধিক্ষেত্রে তার সমাহিত করার কথা ছিল, কিন্তু ডারউইনের সহকর্মী বিজ্ঞানীরা ও রয়্যাল সোসাইটির সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম স্পটিসউড এর উদ্যোগে ডারউইনকে সন্মানিত করা হয় ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবিতে সমাহিত করার মাধ্যমে। ২৬ এপ্রিল তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তাকে বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিলেন কয়েক হাজার শুভানুধ্যায়ী।

ডারউইন প্রায় সব বিজ্ঞানীকে তার বিবর্তনের ধারণাটি বোঝাতে পেরেছিলেন, আর আজ তাকে স্মরণ করা হয় আমাদের ধারণাকে বৈপ্লবিকভাবে বদলে দেয়া মহান একজন বিজ্ঞানী হিসাবে। ১৯০৯ সালে, ২২ থেকে ২৪ জুন ডারউইনের জন্মশত বার্ষিকী ও অন দি অরিজিন অব স্পিসিস বইটির প্রকাশনা পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে ১৬৭ দেশ থেকে কেমব্রিজে জড়ো হয়েছিলেন ৪০০ বিজ্ঞানী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কোনো একজন বিজ্ঞানীকে সন্মান করে আয়োজিত এত বড় অনুষ্ঠান এর আগে কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি পৃথিবীতে। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেছিলেন কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজ, যে কলেজে ডারউইন একদিন ধর্মতত্ত্ব পড়তে এসেছিলেন। এছাড়া ডারউইনের নানা বই, নোটবুক, চিঠি নিয়ে পুরোনো লাইব্রেরীতে একটি প্রদর্শনীও অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার ক্যাটালগে প্রদর্শিত স্মারকগুলোর তালিকাই ছিল ২৫৭ পৃষ্ঠা দীর্ঘ। মডার্ন সিনথেসিসের আগের পর্বটিকে জুলিয়ান হাক্সলী বলেছিলেন the eclipse of Darwinism, এই সময় বহু বিজ্ঞানী বিবর্তনের বহু বিকল্প প্রস্তাবও করেছিলেন, যার প্রত্যেকটি ব্যর্থ হয়েছিল বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে। কিন্তু গানিতিক জীববিজ্ঞানী রোনাল্ড ফিশার মেণ্ডেলিয় জিনতত্ত্ব ও প্রাকৃতিক নির্বাচনকে সমন্বয় করেছিলেন ১৯১৮ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে, যার অসাধারণ প্রেক্ষাপট আর বিবরণটি আমরা পাই তার যুগান্তকারী The Genetical Theory of Natural Selection বইটিতে। ফিশার, হলডেন আর রাইটের গবেষণা ডারউইনের ধারণাটি বিংশ শতাব্দীতে নিয়ে আসার পথটি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন, আজ অসংখ্য প্রমাণ আর অব্যহত গবেষণা বিবর্তনের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জীববিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় মূলনীতি হিসাবে।


(ছবি: রোনাল্ড ফিশারের কালজয়ী সেই বইটি)

ডারউইনের যুগান্তকারী ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশনার দেড়শ বছর (১৮৫৯-২০০৯) পূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে এখানে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানে গত কয়েক দশকের উল্লেখযোগ্য কিছু অগ্রগতির একটি তালিকার উল্লেখ করা হয়েছিল -অবশ্যই তালিকাটি কোনোভাবেই সম্পুর্ন নয় । এই অগ্রগতির তালিকায় শুধুমাত্র কোনো বিশেষ ধরনের প্রজাতির উদ্ভব সম্বন্ধে আমাদের বোঝার ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের কারণই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এই তালিকায় অর্ন্তভুক্ত আছে মূল বিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আমাদের অর্ন্তদৃষ্টির কিছু মৌলিক অগ্রগতি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এইসব অর্ন্তদৃষ্টিগুলো ডারউইনকেই বিস্ময়ের আনন্দময় ধাক্কা দিতে পারতো।

বিবর্তন প্রক্রিয়া যে কাজ করছে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ


(ছবি: বেঁচে থাকলে ডারউইন অবশ্যই অবাক হতেন, প্রত্যক্ষভাবে বিবর্তন প্রক্রিয়াকে কাজ করতে দেখা সহ বিবর্তন জীববিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কারগুলোর দ্রুততা আর তাদের ধরন দেখে, ১৮৮১ সালে তোলা একটি ফটোগ্রাফে। Charles Darwin photograph by Herbert Rose Barraud, 1881)

ডারউইন ভাবতেন ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এতই মন্হরগতিতে কাজ করে যে, এর প্রভাব মানুষের জীবদ্দশায় প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেই বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা মুষ্টিমেয় কিছু প্রজাতির মধ্যে ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শনাক্ত করতে শুরু করেন। গত দশকেই আরো অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবের। বিজ্ঞানীরাও বর্তমানে বুঝতে পেরেছেন যে, বিভিন্ন ধরনের প্রজাতিরা খুব দ্রুতই তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। আসলে, তারা প্রমাণ পেয়েছেন বর্তমানে আমরা মানুষরাই নিজেদের অজান্তে কিছু কিছু দ্রুত বিবর্তনের ঘটনা ঘটানোর জন্য দায়ী। যেমন, গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমান বৃদ্ধি যখন আমাদের গ্রহের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন এই পরিবর্তিত জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে কিছু কিছু প্রজাতি। ক্যালিফোর্নিয়ায়, টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী আর্থার ওয়েইস এবং তার সহকর্মীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, সাত বছরের অনাবৃষ্টি ফিল্ড মাষ্টার্ড বা সরিষা প্রজাতির উদ্ভিদের বিবর্তন ঘটিয়েছে। ২০০৭ সালে তারা তাদের গবেষণার তথ্যে প্রকাশ করেন যে, এই প্রজাতির উদ্ভিদটিতে এখন জিন পর্যায়ে পরিবর্তিত হয়েছে বসন্তে আটদিন আগেই ফুল ফোটার জন্য।

শক্তিশালী আর অপেক্ষাকৃত সুলভ ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির কল্যাণে, বিজ্ঞানীরা বর্তমানে দ্রুত বিবর্তনের কারণ যে কোনো জিন পর্যায়ের পরিবর্তনকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। সান দিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ণার্ড প্যালসন ও তার সহকর্মীরা তাদের ল্যাবে ব্যাক্টেরিয়ার বিবর্তন দেখেছেন প্রত্যক্ষভাবে। তাদের ল্যাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহর মধ্যে ব্যাক্টেরিয়ারে কলোনী সম্পুর্ন একটি নতুন ধরনের খাদ্য (গ্লিসারল নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ) গ্রহনে প্রয়োজনীয় অভিযোজন করতে সফল হয়। বিজ্ঞানীরা আদি ব্যাকটেরিয়া এবং তার থেকে আগত সকল উত্তরসূরি ব্যাকটেরিয়ার জিন সিকোয়েন্স করে তাদের ‍ডিএনএ র মধ্যে পার্থক্য খুজেছেন। ব্যক্টেরিয়ার জিনের মধ্যে মধ্যে উদ্ভব হয়েছে এমন হাতে গোনা কিছু ‘মিউটেশন’ বা পরিবর্তন শনাক্ত করতে তারা সফল হন যা পরীক্ষাধীন সমস্ত ব্যাক্টেরিয়ার জনসংখ্যায় বিস্তার লাভ করেছে। যখন বিজ্ঞানীরা সেই ‘মিউটেশন’ গুলোকে পূর্বসূরি বা আদি ব্যাক্টেরিয়ার জিনে সন্নিবেশ করিয়েছেন, তারাও তখন তাদের উত্তরসূরিদের মত নতুন খাদ্য ব্যবহার করার ক্ষমতা অর্জন করে।

ক্রান্তিকালীন জীবাশ্ম


(ছবি: টিকটালিকের জীবাশ্মসহ নিল শুবিন)

ডারউইন যুক্তি দিয়েছিলেন, যদিও বর্তমানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য মনে হতে পারে খুবই বিশাল, কিন্ত তারা পরস্পর সংযুক্ত তাদের বংশগত উৎপত্তির দিক থেকে। তার এই তত্ত্ব পূর্বাভাস দিয়েছিল, এমন ধরনের কোনো প্রজাতির অস্তিত্বের ব্যাপারে, যা দুটি আপাতদৃষ্টিতে পৃথক প্রজাতি গোষ্ঠির মধ্যে বংশগত যোগসুত্রের বাহক। ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশের এক বছরের মাথায় ‘আর্কিওপটেরিক্স’ নামের একটা পাখির আবিষ্কার ডারউইনকে তৃপ্ত করেছিল, কারণ সেটি তার পূর্বাভাষ অনুযায়ী ঠিকই দুটি পৃথক প্রজাতির গোষ্ঠির মধ্যে বংশগত যোগসুত্রের বাহক। ‘আর্কিওপটেরিক্স’ এর পাখিদের মত যেমন পালক ছিল তেমনই মত কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল সরিসৃপের মত এবং কোনো কোনো জীবিত পাখি প্রজাতির মধ্যে যা দেখা যায় না, যেমন লম্বা লেজ আর এর ‘হাতের’ সুতীক্ষ্ম নোখ। দুর্ভাগ্য যে ডারউইন গত দশকগুলোতে বিভিন্ন ধরনের ক্রান্তিকালীন জীবাশ্মদের আবিষ্কারগুলো দেখে যেতে পারেননি, যাদের প্রত্যেকটাই আর্কিওপটেরিক্স এর চেয়ে বেশী না হলেও কোনো অংশেই কম বিস্ময়কর না।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: টিকটালিক (Tiktaalik), কার্ল বুয়েলের আঁকা ছবিতে, স্থলচর এবং জলজ প্রাণিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকালীন প্রাণি)

যেমন, ২০০৪ সালে আর্কটিক (উত্তর মেরু) অঞ্চলে খনন করার সময় বিজ্ঞানীরা মানুষসহ সকল স্থলচর মেরুদন্ডী প্রাণিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি মাছ জাতীয় প্রাণীর জীবাশ্ম অস্থি খুজে পান। যার নাম দেয়া হয় টিকটালিক (এর অর্থ ‘সুপেয় পানির বড় মাছ’, স্থানীয় এলেসমেয়ার দ্বীপের আদিবাসীদের ইনুকটিটাট ভাষার একটি শব্দ) । ৩৭৫ মিলিয়ন বছর প্রাচীন এই প্রাণিটির ছিল কনুই কব্জিসহ পুর্ণ হাত, নমনীয় ও স্বাধীনভাবে নড়াচড়া করা যায় এমন একটি ঘাড় , যেহেতু পানির নীচে ছিল এদের বসবাস, তখনও ফুলকা ব্যবহার করে নিঃশ্বাস নিতে হত তাদের।
ডারউইন বিশেষ আগ্রহী ছিলেন তিমি’র ব্যাপারে, কারণ তিমি ভেতরে স্পষ্টতই স্তন্যপায়ী অথচ বাইরে থেকে দেখতে মাছের মত। ১৯৯৪ সালে জীবাশ্মবিদরা প্রথম পা সহ একটি তিমি’র জীবাশ্ম খুজে পান, ঠিক ডারউইন যেমনটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এভাবে গত দশকে তারা আবিষ্কার করেছেন আরো নতুন কিছু জীবাশ্ম, যে জীবাশ্মগুলো বিজ্ঞানীদের অনেকটুকুই বুঝতে সাহায্য করেছে,কেমন করে ৫০ আর ৪০ মিলিয়ন বছর আগের মাঝামাঝি কোনো এক সময় তিমি স্থলচর প্রাণি থেকে সাগরের প্রাণিতে রুপান্তরিত হয়েছিল।

যেমন, ২০০১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিপ জিনজেরিখ তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মত তিমি‘র গোড়ালীর হাড়ের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। তিমির উৎপত্তি জানার জন্য এই হাড়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপুর্ণ, কারণ এর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগত আকৃতির সাথে মিল পাওয়া যায় শুধু মাত্র একটি গোত্রের স্তন্যপায়ী প্রাণিদের সাথে: ইভেন-টোড (Even-toed) খুর- যুক্ত পায়ের স্তন্যপায়ী প্রাণি যারা আর্টিওডাকটাইলস হিসাবে পরিচিত। তিমি‘র ডিএনএ নিয়েও গবেষণা যা শেষ হয়েছে গত দশকে, সেগুলোও বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে আর্টিওডাকটাইলস এর দিকে – বিশেষ করে হিপপো বা জলহস্তিদের সাথে- যারা স্থলে তিমি’র সবচেয়ে ঘনিষ্ট আত্মীয়।

জটিল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উৎপত্তি

ডিএনএ নিয়ে গবেষণা শুধুমাত্র বিজ্ঞানীদের সাহায্যই করেনি, কোনো একটি প্রজাতি সাথে অন্য একটি প্রজাতির সম্পর্ক কত কাছের বা দূরের তা খুজে বের করার জন্য। তারা আরো উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন কেমন করে জিনগুলো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নির্মাণ করে বিভিন্ন প্রজাতির শরীরে । এই তুলনামূলক আলোচনা, গত দশকে বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্ন্তর্দৃষ্টি দিয়েছে, যেমন কেমন করে এসব জটিল অঙ্গগুলো বিবর্তিত হয়েছে। জটিল চোখ বিবর্তিত হয়েছে বেশ কয়েকটি ভিন্ন ধরনের প্রাণির বংশানুক্রমে, যেমন, আমাদের মত মেরুদন্ডী প্রাণী, অক্টোপি আর অন্যান্য সেফালোপড এবং কীট পতঙ্গ। দীর্ঘ সময় ধরে, প্রাপ্ত সব প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে, জটিল চোখ এই প্রত্যেকটি প্রাণিদের গোত্রে বংশানুক্রমে বিবর্তিত হয়েছে স্বতন্ত্রভাবে। কিন্ত বর্তমানে বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করছেন অনেক বেশী একটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ইতিহাস।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: জটিল চোখের উৎপত্তি ঘটেছে বেশ কয়েকটি প্রাণীর বংশানুক্রমে, কিন্তু প্রত্যেক ধরনের চোখে আছে ক্রিস্টালিন, যা আগত আলোকরশ্মিকে জড়ো করে অপসিনের কাছে নিয়ে যায় ধরার জন্য।)

যেমন, ২০০৭ সালে, সান্তা বারবারায় ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টড ওকলে আর সহযোগীরা দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন ধরনে আলোক-সংবেদী কোষ বিবর্তিত হয়েছে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের দুরবর্তী পূর্বসূরি প্রাণিদের খুব সাধারণ সংকেত শনাক্ত করতে সক্ষম কয়েক ধরনের প্রোটিন অনু থেকে। প্রথম প্রাণিরা যখন বিবর্তিত হয়েছে, সেই সময়ে এই সংকেত শনাক্তক্ষম অনুগুলোও বিবর্তিত হয়েছে ‍দুটি ভিন্ন ধরনের আলোক সংবেদী কোষে বা রিসেপটরে। ঐসব আদিম প্রাণিগুলোর চোখ ছিল সম্ভবত খুব সাধারণ আলোক সংবেদী স্পট ছাড়া আর বেশী কিছু না। অনেক পরে জটিল চোখের আবির্ভাব ঘটে বিবর্তন প্রক্রিয়ায়, এবং দৃশ্যকে ধারণ করতে বিভিন্ন গোত্রের প্রজাতির প্রাণিরা বেছে নেয় পৃথক পৃথক আলোক সংবেদী কোষ বা রিসেপটর। ওকলের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, জটিল চোখ প্রকৃতপক্ষে পৃথক ভাবে বিবর্তিত হলেও, তারা একই রকম কতগুলো আদি জেনেটিক বা বংশতগতির টুলকে ব্যবহার করেছে তাদের বিবর্তনের লক্ষ্যে। পাখির পালক থেকে গুবরে পোকার শিং পর্যন্ত্য, গত দশকে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে এই প্যাটার্ণ বা কৌশলটা খুব বিস্ময়করভাবে একই রকম: বিবর্তন আসলেই খুবই দক্ষ পুনর্ব্যবহারকারী।

জিনোমের অরণ্যে

ডারউইন যেমন বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন হলো বিবর্তনের একটি গুরুত্বপুর্ণ শক্তি এবং গত শতাব্দীতে জিন নিয়ে গবেষণা করার সময় বিজ্ঞানীরা এই শক্তির অসংখ্য উদহারনও পেয়েছেন। যখন কোনো মিউটেশন প্রোটিন-কোডকারী কোনো জিন যেভাবে কাজ করে তা পরিবর্তন করে -প্রোটিনের গঠনও পরিবর্তিত হয়, উদহারণ সরুপ, যে সিগনাল বা সংকেত সুইচের মত জিনকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে দেয় -এধরনের মিউটেশন কোনো প্রাণির প্রজনন সাফল্যের উপর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উপকারী মিউটেশন তার পর বিস্তার লাভ করে আর ধীরে ধীরে সময় অতিক্রান্ত হলে তারা প্রজাতিকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ডিএনএ তে কিন্তু বেশ কয়েক ধরনের পরিবর্তন বা মিউটেশন হয় এখানে তার কয়েকটা দেখানো হল।)

কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন কিন্তু বিবর্তনের একমাত্র কাহিনী না। অনেক মিউটেশনই সমস্ত প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে বিস্তার লাভ করে তা কিন্তু শুধূ প্রাকৃতিক নির্বাচনের কল্যানেই না বরং অনেকটাই জেনেটিক জুয়ার গুটির ভাগ্যবান দানের মাধ্যমে। এই তথাকথিত নিরপেক্ষ বা `নিউট্রাল’ বিবর্তন বিশেষ করে গুরুত্বপুর্ণ আমাদের জেনোমের সেই অংশগুলোর বিন্যাসে যেখানে প্রোটিনের সংকেতবাহী কোনো জিন নেই। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন প্রোটিন সংকেত না করা অংশ নিশ্চই খুব তেমন বড় কোনো অংশ হওয়ার কথা না।ঠিক এর বীপরিতটাই কিন্তু সত্যি। আমাদের জিনোমের প্রায় শতকরা ৯৮.৮ ভাগই আসলে নন-কোডিং বা প্রোটিন-কোড না করা অংশ।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: প্রতিটা কোষের মধ্যে জিনের কিছু অংশ, এই ছবিতে যেমন লোহিত রক্ত কনিকা, কাজ করে একধরনের সুইচ হিসাবে, যা অন্যান্য জিনকে বলে কখনও সক্রিয় হতে আবার কখন নিষ্ক্রিয় হতে।

কেবল গত কয়েক বছর ধবে বিজ্ঞানীরা জিনের এই অজানা অংশ নিয়ে বিস্তারিত গবেষনা করছেন এবং বিবর্তনকেই তারা তাদের পথপ্রদর্শক হিসাবে গ্রহন করেছে, যেমন, আমাদের ডিএনএ তে প্রায় ১১,০০০ তথাকথিত ‘সিউডোজিন’ বা মিথ্যা জিন আছে -এরা ডিএনএ’র সেই অংশ যা কোনো এক সময় কোনো প্রোটিনকে কোড করতো, কিন্তু কোনো মিউটেশনের মাধ্যমে অক্ষম হয়ে যাবার কারনে এখন সেটা আর করে না । এইসব অক্ষম জিনগুলো কোনো এক সময় গুরুত্বপুর্ন কাজ করতো, যেমন, ভিটামিন তৈরী অথবা কোনো বিশেষ রাসায়নিক অণুর গন্ধ নেবার ক্ষমতা। বিজ্ঞানীরা জানেন এই সব সিউডোজিনরা কোনো একসময় পূর্ণাঙ্গ প্রোটিন কোড করা জিন ছিল, কারণ আমাদের প্রাইমেট আত্মীয়দের মধ্যে এদের সমতুল্য এবং কার্য্যক্ষম জিন পাওয়া গেছে।

যদিও আমাদের কিছু ননকোডিং ডিএনএ নিজস্ব জিন হিসাবে যাত্রা শরু করেছিল, কিন্তু বেশীর ভাগই শুরু হয়েছিল আগ্রাসী ভাইরাস হিসাবে। কিছু কিছু ভাইরাস তাদের ডিএনএ কে পোষক কোষের ডিএনএর সাথে এমনভাবে সন্নিবেশ করাতে পারে যে, পোষকের এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে সেটি বিস্তার করতে পারে। এবং ধীরে ধীরে এই আমাদের ভিতরের এই ভাইরাসে এতই মিউটেশন হয় যে তারা আর নতুন কোনো পোষককে সংক্রমন করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু অপরিবর্তিত থাকে তাদের নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধির ক্ষমতা, যা পুরাতন পোষকের জেনোমে যুক্ত হতে থাকে।মানুষের জেনোমের প্রায় ৪০ শতাংশ এধরনের ভাইরাস উদ্ভুত ডিএনএ দিয়ে তৈরী। বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাস ডিএনএ’র উৎপত্তি ইতিহাস আবিষ্কার করেছেন আমাদের আর প্রাইমেটদের জেনোমে তাদের অবশিষ্টাংশর তুলনামুলক গবেষণা করে।

এইসব ভাইরাল ডিএনএ বর্তমানে এতটাই পরিবর্তিত হয়েছে যে, জিনোমের মধ্যে প্যাডিং ছাড়া তা খুব বেশী কিছু না, তাসত্ত্বেও এই সব নিষ্ক্রিয় ধ্বংশাবশেষের মধ্যে তাদের অতীত সুপ্ত আছে। সব মানুষই তাদের জেনোমে প্রাচীন একটি ভাইরাসের বিভিন্ন সংস্করন বহন করে, যার নাম এইচইআরভি-কে (HERV-K) বা হিউম্যান এন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস -কে। সংস্করণগুলোর মধ্যে পার্থক্যগুলো বিবর্তিত হয়েছে মুল ভাইরাসটি প্রথম একজন মানুষকে সংক্রমন করার পর এবং পরবর্তীতে বংশানুক্রমে সেই মানুষটির পরবর্তী প্রজন্মে বিস্তৃত হয়েছে । ফরাসী বিজ্ঞানীরা এই ‘এইচইআরভি-কে’ এর বিভিন্ন সংস্করণগুলো তুলনা করে খুজে বের করেছেন সংস্করণ প্রতি সর্বমোট মিউটেশনের সংখ্যা। এইসব নতুন মিউটেশনগুলোর উপরে ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিৎ হয়েছেন যে, এই ভাইরাসটি প্রথম মানুষের পূর্বসূরিকে সংক্রমন করেছে কয়েক মিলিয়ন বছর আগে।

এটি যে আসলে কোনো এক সময় একটি পূর্নাঙ্গ ভাইরাস ছিল তা প্রমাণ করতে বিজ্ঞানীরা এর ডিএনএর বিভিন্ন সংস্করণ করে, এর মূল জিনের ক্রমবিন্যাস কি রকম ছিল এমন একটি আনুমানিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। তারা ঠিক সেই ডিএনএটিকে সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরী করে মানব কোষের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেন। এই সংশ্লেষিত ডিএনএটি ভাইরাসের মত কোষের দখল নিয়ে কোষটি রুপান্তরিত করে ফেলে অনুরুপ ভাইরাস তৈরীর কারখানায়। অন্য ভাবে বলতে গেলে, মৃত ভাইরাসকে জীবন্ত করে তুললেন বিজ্ঞানীরা।

মৃত ভাইরাসের ডিএনএ এবং নিষ্ক্রিয় সিউডোজিন এর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিছু গুরুত্বপুর্ণ ননকোডিং ডিএনএ’র কিছু অংশ। এর কোনো কোনো অংশ কাজ করে, ‘সুইচ’ ‍হিসাবে, যেখানে নির্দিষ্ট প্রোটিন সংযুক্ত হয়ে নিকটে অবস্থিত জিনকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার কাজটি করে। আমাদের জেনোমে ডিএনএ’র কিছু অংশ আছে আরএনএ অনু তৈরী করতে সক্ষম। এই আরএনএ অনু আমাদের দেহে তাদের নিজেদের কিছু গুরুত্বপুর্ণ কাজ করে, যেমন, সংকেত শনাক্তকারী এবং জিন নিয়ন্ত্রনে।

বিজ্ঞানীরা কিন্তু বিবর্তনের উপর নির্ভর করে এই বিষয়গুলো আবিষ্কার করেছেন। যদি জিনোমে ননকোডিং ডিএনএ’ অংশের কোনো গুরুত্বপুর্ণ কাজ না থাকতো, সেক্ষেত্রে এর মিউটেশন, বহনকারী জীবের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে সামান্যই প্রভাব ফেলতো। কিন্তু যদি এটির অপরিহার্য কোনো কাজ থাকে, যে কোনো ধরনের মিউটেশন অনায়াসেই ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে। ফলাফলে, এধরনের ক্ষতিকর মিউটেশন বহনকারী প্রাণী অনেক কম পরিমান পরবর্তী প্রজন্ম উৎপাদন করবে, সুতরাং খুব সহজে এই ডিএনএ’র পরিবর্তন হয় না। বিভিন্ন ধরনের প্রজাতির মধ্যে তুলনামুলক গবেষনা এবং তাদের ননকোডিং ডিএনএ’র যে অংশগুলো বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে অস্বাভাবিক রকম সদৃশ, সেগুলো খোজার মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা এই সব কার্য্যকরী অংশগুলো খুজে বের করেছেন। এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রমাণ করে দেখাতে পেরেছেন, এই অংশগুলো আসলে জীবের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। বিবর্তন এভাবে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করেছে জেনোমের খড়ের গাদায় সূঁচ খুজে বের করতে।

যৌন নির্বাচনের শক্তি

ডারউইন নিজেই শনাক্ত করেছিলেন, যৌন নির্বাচন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতই বিবর্তনের আরেকটি শক্তি। কোনো প্রাণীদের যদি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য থাকে, যা বীপরিত লিঙ্গের প্রাণিদের কাছে মনে হয় আকর্ষণীয়, সেটা তাদের মাথার শিং হোক না কেন আর পালক বা উজ্জ্বল নীল রঙের পেখম হোক না কেন – এই সব বৈশিষ্ট্যগুলো বংশানুক্রমে পরবর্তী প্রজন্মের আরো অধিক পরিমানে দৃশ্যমান হয়।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ডারউইন যৌন নির্বাচনের তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন পুরুষ ময়ুরের পেখম সহ বিভিন্ন প্রাণিদের মধ্যে দেখা যায় অতি আড়ম্বরপূর্ণ কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে।)

গত দশকের গবেষণা প্রমাণ করেছে যৌন নির্বাচন আসলেই বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম কার্য্যকরী একটি শক্তি। কিন্ত এর শক্তি প্রদর্শনের উপায়টা কিন্তু ডারউইন পক্ষে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না সে সময়। গত কয়েক বছরের গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রজাতির অন্যান্য সক্ষম পুরুষ সদস্যদের চেয়ে, কোনো নির্দিষ্ট ধরনের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন পুরুষ সদস্যেদেরকে প্রজাতির স্ত্রী সদস্যদের যৌন সঙ্গী হিসাবে পাবার ইচ্ছা বা অভিরুচি যথেষ্ট শক্তিশালী, কোনো একটি প্রজাতি থেকে কয়েকটি নতুন প্রজাতির উৎপত্তির জন্য। উদহারণ সরুপ, পূর্ব আফ্রিকার হ্রদগুলোতে, যৌন নির্বাচন সম্ভব করেছে পাশাপাশি বসবাস ও বংশবিস্তাররত মাছ থেকে শত শত নতুন প্রজাতির মাছের উৎপত্তি ।

যৌন নির্বাচন কিন্তু কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন প্রাণিদের উপকার ছাড়াও আরো অতিরিক্ত অনেক কিছু করছে। যে কোনো অভিযোজন, যা কিনা প্রজাতির কোনো লিঙ্গের সদস্যকে সাহায্য করে সমলিঙ্গ অন্য কোনো সদস্যদের তুলনায় বেশী পরিমান সন্তান উৎপাদন করতে, সেই সব ধরনের অভিযোজন, বিশেষ অগ্রাধিকার পায় যৌন নির্বাচনের ক্ষেত্রে । যেমন: পুরুষ মাছি মিলনের সময় তাদের শুক্রাণুর সাথে আরেকটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরন করে স্ত্রী মাছির শরীরে, যা তাদেরকে অন্য কোনো পুরুষ মাছির সাথে মিলনে অনুৎসাহিত করে। দুভার্গ্যজনকভাবে এই পদার্থটি স্ত্রী মাছির জন্য বিষাক্ত। এর প্রত্যুত্তরে স্ত্রী মাছিরা এই রাসায়নিক পদার্থের বিরুদ্ধে বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আর আবার পুরুষ মাছিরাও পরবর্তীতে বিবর্তিত হয়েছে সেই প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করতে। গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানীরা এমন অনেক তথাকথিত যৌন দ্বন্দ বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং কত দ্রুত বিভিন্ন জিন পরিবর্তিত হয় তা পরিমাপ করে তারা এর সুষ্পষ্ট মিলিয়ন বছরের বিবর্তন প্রক্রিয়ায়। দ্রুত বিবর্তিত জিনগুলোর মধ্যে কয়েকটি অনেক প্রজাতিরই (মানুষ সহ) শুক্ররসের প্রোটিন তৈরী করে।

তালা ও চাবির সহবিবর্তন

ডারউইন তার সবচেয়ে সাহসী ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, যখন তিনি মাদাগাস্কারের অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী (কমেট / মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড) নামের একটা অদ্ভুত অর্কিডের কথা শোনেন। এই অর্কিডটি তার ফুলের পেছনে একটা লম্বা স্পার বা মধুথলি তৈরী করে যার দৈর্ঘ্য এক ফুটেরও বেশী (২০-৩৫ সেমি) (ল্যাটিন ভাষায় সেসকিপেডাল মানে দেড় ফুট), এই স্পারের একেবারে তলদেশে এটি নেক্টার বা ফুলের মধু তৈরী করে। ডারউইন বিশ্বাস করতেন যে ফুলের অতিআড়ম্বরপুর্ণ রং কিংবা আকার বিবর্তিত হয়েছে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য না বরং পরাগায়নের জন্য পতঙ্গদের আকর্ষণ এবং তাদের নিজেদের সফল বংশবিস্তারের কৌশল হিসাবে। একটি পরিচিত কৌশল যা ডারউইন শনাক্ত করেছিলেন, তা হলো ফুলের মধু খাওয়ার সময় পতঙ্গের পায়ে ফুলের আঠালো রেণু লাগিয়ে দেয়া। সুতরাং ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন, মাদাগাস্কারের জঙ্গলে কোথাও না কোথাও কোনো এমন কোনো পতঙ্গ বাস করে যার জিহবা যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী’ এর লুকোনো মধু পান করার জন্য। যখনই এই রহস্যময় পতঙ্গটি তার দীর্ঘ জিহবা প্রবেশ করে ফুলের গায়ে চেপে বসে মধু পান করে, ফুলের রেণু তখন তার শরীরে মেখে যায়, যা ফুলটি পরাগায়নে সহায়তা করে। তার মৃত্যুর একুশ বছর পর তার ভবিষ্যদ্বানী সফল হয়, যখন মাদাকাস্কারের জঙ্গলে বিজ্ঞানীরা খুজে পান দীর্ঘ জিহবার সেই পতঙ্গ, জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা নামের একটি মথকে (ছবি), একমাত্র এই মথটি পারে এই অর্কিডের পরাগায়ন করতে।

তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা প্রকৃতিতে এরকম অনেক চুড়ান্ত মানানসই সহবিবর্তনের নজির আবিষ্কার করেছেন। যদি তাদের অনেকগুলোই অর্কিড আর তার দীর্ঘ জিহবার পরাগায়নকারীর মত সৌহার্দ্যপূর্ন না। পশ্চিম উত্তর আমেরিকার রাফ স্কিন্ড বা অমসৃন চামড়ার নিউট তাদের চামড়ায় এমন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরী করে যা একদল মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। বিষাক্ত পদার্থটি কাজ করে স্নায়ু কোষের একটি নির্দিষ্ট রিসেপটরে সংযুক্ত হয়ে কোষটিকে নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে। নিউটদের এই অতি বিষাক্ততার কারণ তার শত্রু, ‘গার্টার সাপ’, এর প্রত্যুত্তরে গার্টার সাপ আবার এর বিরুদ্ধে তৈরী করেছে এক ভিন্ন ধরনের রিসেপটর, যেখানে বিষাক্ত পদার্থটি সংযুক্ত হতে পারে না, ফলাফলে নির্বিচারে রাফ স্কিন্ড নিউট খেতে গার্টার সাপের কোনো সমস্যাই হয়না।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: রাফ স্কিন্ড নিউট, গার্টার সাপের সাথে একটা দীর্ঘমেয়াদী বিবর্তনীয় অস্ত্রযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ফলাফলে তাদের চামড়া হয়ে গেছে ভয়ানক বিষাক্ত)

গত দশকে এধরনের সামনে আগানো আর পেছনে ফেরার বিবর্তন যা সহবিবর্তন নামে পরিচিত বিজ্ঞানীদের বিশেষ নজর কেড়েছে। যেমন বিজ্ঞানীরা অনেকদিন থেকেই একটা ধাঁধার মধ্যে ছিলেন ঠিক কেমন করে দুটি পৃথক প্রজাতির মধ্যে একটি ঘনিষ্ট মিথোজীবি সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেমন ডারউইনের মথ আর অর্কিড। ২০০৫ সালে সান্টা ক্রজের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন থমসন এর উৎপত্তির কারণ হিসাবে একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, তিনি এর নাম দেন সহবিবর্তনের জিওগ্রাফিক মোজাইক মডেল। থমসন প্রস্তাব করেন যে, কোনো কোনো জায়গায়, দুটি প্রজাতি একে অপরের বিবর্তনকে প্রভাবিত করে চরম অভিযোজনের লক্ষ্যে, আবার কোনো কোনো জায়গায় তাদের বিবর্তনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রভাব নগন্য বা একেবারে নাই বললেই চলে। আবার একই সঙ্গে, এক জনগোষ্ঠী থেকে অন্য জনগোষ্ঠীতে তাদের সহবিবর্তিত জিন নিয়ে সরে যায় প্রজাতির সদস্যরা। শুধুমাত্র একে অন্যের অনুগামী হয়ে বিবর্তিত না হয়ে বরং সহবিবর্তনের সঙ্গী প্রজাতিগুলো আসলে আরো জটিল পদ্ধতির মাধ্যমে বিবর্তিত হয়, যাকে থমসন বলছেন জিওগ্রাফিক মোজাইক।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপারটা হলো থমসনের এই মডেলটিকে পরীক্ষা এবং এর স্বপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহের করার জন্য বিজ্ঞানীদের খুব একটা বেশী সময় লাগেনি। তাদের কেউ এই মডেল পর্যবেক্ষণ করলেন পাইন গাছ আর পাখিদের মধ্যে, যারা তার বীজ বিস্তারে সহায়তা করে, অন্যরা, ব্যাক্টেরিয়া আর তাদের সংক্রমনকারী ভাইরাসদের মধ্যে, আবার কেউ অমসৃন-চামড়ার নিউট এবং তাদের শিকারী গার্টার সাপের মধ্যে গবেষণা করে। এবং তারা আবিষ্কার করলেন সহবিবর্তনের হটস্পট আর কোল্ডস্পটের একটা জটিল দৃশ্য। বিবর্তনের ক্ষেত্রে এধরনের অর্ন্তদৃষ্টি খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিশেষ করে আমাদের মানবজাতির কল্যানের জন্য। আমাদের অনেক উপকারী কাজের জন্য আমরা সুনির্দিষ্ট পরিবেশের উপর নির্ভরশীল এবং অনেকক্ষেত্রে প্রকৃতি থেকে নেয়া সেই সব উপযোগী সেবাগুলো সম্ভবপর হয় সহবিবর্তনের কল্যাণে। যেমন আমরা নির্ভর করি এমন অনেক উদ্ভিদ যারা আমাদের খাদ্য বা নির্মাণ সামগ্রীর যোগান দেয়, তারা সহবিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ছত্রাকের সাথে, যারা তাদের সাহায্য করে মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করতে। উপরন্তু তারা প্রজননের জন্য তারা নির্ভর করে পরাগায়নকারী নানা প্রজাতির প্রাণীর উপর। আমরা নিজেরাও সহবিবর্তিত হয়েছি অসংখ্য উপকারী আর অপকারী অনুজীবদের সঙ্গে (বিবর্তনীয় চিকিৎসা দ্রষ্টব্য)।

মহাবিলুপ্তির পদচিহ্ন

দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত দশকে এটা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য যে মাত্রায় বিপদাপন্ন তা গত মিলিয়ন বছরেও দেখা যায়নি। বনভূমি হয়েছে শূন্য, সাগরের পানিতে বৃদ্ধি পেয়েছে অম্লতার পরিমান, বিস্তার পাচ্ছে নানা রোগব্যাধি, তাপমাত্রা বাড়ছে বায়ুমণ্ডলের, আর এসব কিছুই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে অনেক প্রজাতির অস্তিত্ত্ব। যদিও এই বিলুপ্তিটির প্রাদুর্ভাব নতুন, কিন্ত পৃথিবী জীবনের উৎপত্তির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত্য অনেকগুলো মহাবিলুপ্তির ঘটনার স্বাক্ষ্য বহন করে আসছে, যার প্রতিটি ঘটনায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে অগনিত প্রজাতি। মহাবিলুপ্তির ঘটনা নিয়ে করা গবেষনায় প্রমাণ হয়েছে, প্রজাতির বিবর্তন প্রক্রিয়ার উপর এসব মহাবিলুপ্তির ঘটনার প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী। বিলুপ্তি ঘটনা সমস্ত প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে নতুন করে সংগঠিত করে, সুযোগ করে দেয় জীবিত প্রজাতিদের বিলুপ্ত প্রজাতির শূন্যস্থান দখল করে নিতে।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: আনুমানিক তিন বিলিয়ন বছর আগে জীবনের উৎপত্তি থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত্ আমাদের পৃথিবীতে এ পর্যন্ত্ ৫টি মহাবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছে। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন বর্তমানে ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তি চলছে, যার কারণ আমরা মানুষরা।)

বিশেষ করে আগ্নেয়গিরি, এসব বিপর্যয়ের অন্যতম একটি কারণ, পৃথিবীকে উষ্ণ করে তুলেছে তাপমাত্রা শোষনকারী গ্যাস নির্গমনের মাধ্যমে, এছাড়া সমদ্রের রাসায়নিক বৈশিষ্টে নাটকীয় পরিবর্তনের কারণ আগ্নেয় গিরির অগ্ন্যুৎপাত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এধরনের ঘটনা সূচনা করে পরিবেশ বিপর্যয়।

মহাবিলুপ্তির মত কোনো বিপর্যয় সামলে উঠতে পৃথিবীর লেগে যায় অনেক মিলিয়ন বছর এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়না। অনেক ধরনের প্রজাতি যারা পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল সম্পুর্ন বিলুপ্ত হয়ে গেছে এধরনের মহাবিপর্যয়ে। পৃথিবীর পরিবেশ বা ইকোসিস্টেমে ইতিমধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা -বিশেষকরে সমুদ্রে -যা ইঙ্গিত করে আমরা বর্তমানে আরেকটি পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। যেভাবে ‘প্রবাল রীফ’ ধ্বংশ হয়ে যাচ্ছে আর সমুদ্র থেকে জোর করে তোলা হচ্ছে মাছ, ফলাফলে, কম পরিচিত প্রজাতি যেমন জেলী ফিস অথবা এমনকি সালফার নিঃসরণ করা ব্যাকটেরিয়া সমুদ্রে প্রাধান্য বিস্তার করার সম্ভাবনা আছে।

জীবন বৃক্ষ এবং জাল

বর্তমানে আমরা বাস করছি জেনোমের যুগে। বিজ্ঞানীর অভূতপূর্ব সুযোগ পেয়েছেন পর্যবেক্ষণ করার, কেমন করে সাধারণ আদি পূর্বপুরুষ থেকে প্রজাতির উৎপত্তি হয়েছে। এর কারণ সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে তাদের আবির্ভাব লিপিবদ্ধ আছে তাদের ডিএনএ তে। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিস্তারিত হয়। সুপার-কম্পিউটার এবং উন্নত পরিসংখ্যানীয় মডেল ব্যবহারের মাধ্যমে ডিএনএ বিশ্লেষন করার ফলে বিজ্ঞানীরা প্রজাতিদের মধ্যে আন্তসম্পর্কের স্বরুপ সংক্রান্ত পুরোনো হাইপোথেসিসগুলো পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়েছেন। ইতিমধ্যেই তারা সক্ষম হয়েছেন কিছু পুরোনো প্রশ্নের সমাধানে যা আমাদের আগের প্রজন্মের পক্ষে কাছে সমাধান করা ছিল প্রায় অসম্ভব । প্রত্নতত্ত্ববিদরা বহুদিন ধরেই বিতর্ক করছেন, যেমন, বিবর্তনের দিক থেকে আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী সম্পর্কযুক্ত জীবিত জলজ প্রাণী হলো লাংফিস আর সিলোকান্থ, যে উপসংহারটি সত্যতা জিনতত্ত্ববিদরা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন ডিএনএ প্রযুক্তির মাধ্যমে। আমাদের প্রাইমেট জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শিম্পান্জ্ঞী আর বনোবোসকে শনাক্ত করা হয়েছে আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী জীবিত আত্মীয় হিসাবে।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: জীবন বৃক্ষ যা আঁকা হয়েছে ‍ডিএনএ গবেষণা মাধ্যমে, যার দৈর্ঘ্য ইঙ্গিত করছে মিউটেশনের সংখ্যা। লক্ষ্য করুন প্রাণিরা কত ক্ষুদ্র অংশ দখল করে আছে পৃথিবীর সকল জীবের জিন বৈচিত্রের।)

যদিও ডিএনএ কোনো যাদুর কাঠি না যা মুহুর্তের মধ্যে আমাদের সব প্রশ্নের সমাধান দেবে। জীবনের বিবর্তনের কোনো একটা পর্যায়ে, অনেকগুলো বংশধারা বিবর্তিত হয়েছে অপেক্ষাকৃতভাবে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে। অনেক প্রধান প্রধান গোত্রের প্রাণি যা বর্তমানে জীবিত আছে তারা মোটামুটি ৫৫০ মিলিয়ন বছর আগে, প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে। পৃথিবীতে জীবনে’র ইতিহাসে এই সময়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া বেশ কঠিন, যেমন টেলিস্কোপ দিয়ে দুর দ্বীপে দাড়ানো কোনো মানুষের চেহারা সহজে বোঝা যায়না।

একই সঙ্গে ডিএনএ জীবনের ইতিহাসে নতুন রুপ উন্মোচন করছে। ডারউইনই প্রথম ভেবেছিলেন বিবর্তন একটা গাছের মতন, নতুন প্রজাতির জন্ম হয় যেমন গাছের নতুন শাখার জন্ম হয় পুরাতন শাখা থেকে। বর্তমানেও এই রুপক অনেক কিছু ব্যাখ্যা করতে এখনও শক্তিশালী। প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে শিম্পান্জ্ঞী আর বনোবো, এই দুটি শাখা তাদের মুলে সংযুক্ত ছিল একটি আদি সাধারণ বা কমন পূর্বপুরুষের মাধ্যমে। এদের বংশধারা থেকে আমাদের শাখা বিছিন্ন হয়েছিল আরো আগে, প্রায় ৭ মিলিয়ন বছর আগে। আরো বৃহৎ ক্ষেত্রে উদ্ভিদের সাথে প্রাণি কিংবা ছত্রাক যে সম্পর্ক রাখে তা অপেক্ষা তারা নিজেরাই আরো বেশী সম্পর্কযুক্ত।

কিন্তু জিন সবসময়ই প্রজাতির সীমানা গ্রাহ্য করে না। এটি বেশী প্রযোজ্য ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অনুজীবের ক্ষেত্রে, যেখানে জিন এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে অনায়াসে যাতায়াত করে। এককোষী প্রাণীদের বিবর্তন বোঝার জন্য, বিজ্ঞানীরা কোনো একটি নির্দিষ্ট জীনের প্রতি বেশী করে নজর দিচ্ছেন, সময়ের সাথে এবং প্রজাতিদের মধ্যে এসব জীনের যাত্রাকে অনুসরন করার উদ্দেশ্যে। তাদের যাত্রাপথ অনেকটাই জালের মত। আর যেহেতু সকল জীবনের গঠন, তার উৎপত্তির প্রথম ২ বিলিয়ন বছর ইতিহাসে প্রায় সম্পুর্নটাই এককোষী ছিলো, আমরা অবশ্যই আমাদের জীববিজ্ঞানীয় ইতিহাসের শুরুর অধ্যায় গাছের মতন না দেখে, বরং দেখতে হবে একটা ট্যাপেষ্ট্রী হিসাবে।

মানুষের রেসিপি

গত দশকে বিজ্ঞানীরা শুধু মানুষের জিনোমের অনুক্রমই সমাপ্ত করেনি, সম্পন্ন করা হয়েছে বা শিম্পান্জ্ঞি, বানর সহ অনেক প্রাণি ও উদ্ভিদের জিনোমের অনুক্রম। সুতরাং বিজ্ঞানীরা এখন জিনের এই আর্কাইভে চীরুনী অনুসন্ধান করতে সক্ষম, এবং তারা ইতিমধ্যে শুরু করেছেন কেমন করে আমাদের পূর্বপুরুষদের জিনোম পরিবর্তিত হয়েছে, যখন তারা প্রাইমেট থেকে ভিন্ন বংশধারায় বিবর্তিত হতে শুরু করেছিল। কাজটা শুরু হয়েছে প্রথমত ক্যাটালগের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা গণনা করেছেন সেই সব জিনগুলো যা দুর্ঘটনাবশত অনুরুপ সদৃশ প্রতিলিপি হিসাবে মানুষের বংশধারায় বিস্তার করেছে, অর্থাৎ প্রাইমেটদের জিনোমের তুলনায় আমাদের জিনোমে যে জিনগুলোর বর্তমানে একাধিক অনুলিপি বিদ্যমান। তারা আরো শনাক্ত করেছেন সেইসব জিনগুলোকে যা পরিবর্তিত হয়েছে ‘সিউডোজিনে’ এবং মানুষের কিছু জিন যার শুরু প্রাইমেটদের জেনোমে ননকোডিং অংশ হিসাবে। সম্প্রতি ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের স্মারফিট জেনেটিক ইন্সস্টিটিউটে আওয়াফ ম্যাকলিসট এবং তার সহযোগী ডেভিড নোলস খুজে পেয়েছেন তিনটি প্রোটিন যা মানুষ তৈরী করে কিন্তু আমাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী আত্মীয় শিম্পান্জ্ঞীর মধ্যে যা অনুপস্থিত। ম্যাকলিসট এর পর এই তিনটি প্রোটিনকে কোড করা জিনকে খুজে বের করেন যা প্রায় হুবুহু শিম্পান্জ্ঞীর জেনোমের ননকোডিং ডিএনএ অনুক্রমের কিছু অংশের সাথে মিলে যায়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কোনো মিউটেশনই এই ননকোডিং ডিএনএ অংশকে প্রোটিন তৈরীতে সক্ষম সক্রিয় জিনে রুপান্তরিত করেছে।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: মানুষের ফাইলোজেনি)

আমাদের জিনোম আরো অন্যভাবেও অনেক স্বতন্ত্র, যদিও খুব সূক্ষ্ম, তাসত্ত্বেও এই স্বতন্ত্রতা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমাদের প্রোটিন তৈরীর প্রায় সকল জিন আর শিম্পান্জ্ঞীদের অনুরুপ জিনের কোনো পার্থক্য নেই (আমাদের পুরো জিনোমের সাথে শিম্পান্জ্ঞীদের জিনোমের পার্থক্য মাত্র আনুমানিক শতকরা ১.৩ ভাগের কাছাকাছি), কিছু ক্ষেত্রে তাদের মূল ডিএনএ বেসের অনুক্রমের মথ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। অনেক ক্ষেত্রেই এই পার্থক্য জৈববৈজ্ঞানিক দিক থেকে অর্থহীন। জিনের দুটি সংস্করণকে সংকেত করা প্রোটিন সমানভাবেই কার্য্যকরী দুই প্রজাতির ক্ষেত্রে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নির্বাচন তার কাজ করে যায়। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে জোগাড় করে ফেলেছেন জিনের একটা লম্বা তালিকা যেখানে তারা সুষ্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোনো মিউটেশনগুলো তাদের প্রজনন সাফল্যকে তরান্বিত করেছে। প্রাইমেট থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন থেকে পৃথক শাখায় বিবর্তিত হতে শুরু করেছিল তখন থেকে প্রাকৃতিক নির্বাচন তার চিহ্ন রেখে গেছে ননকোডিং ডিএনএ অংশেও।

অবশ্যই আমরা কোনো স্বতন্ত্র জিন উপাদানের কোনো ক্যাটালগের চেয়ে বেশী, বিজ্ঞানীরা ইদানীং কেবল খুজে শুরু করেছেন আমাদের প্রজাতির জন্য অনন্য ডিএনএর অংশগুলোর অর্থ বুঝতে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অনন্য অংশগুলো বিবর্তিত হয়েছে বিশেষ ধরনের ভাইরাস বা রোগজীবানু যা আমাদের মুখোমুখি হয়েছে। এই সব পার্থক্যগুলোই প্রকাশিত হয় যখন আমরা বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করি মানব প্রজাতির সফলতার গোপন সুত্র: আমাদের প্রতিদ্বন্দীহীন মানসিক বহুমুখিতা। বিজ্ঞানীরা ভাষা এবং মানুষের অনন্য কিছু আচার, যা গত কয়েক মিলিয়ন বছরে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে সেই সব জিনগুলো শনাক্ত করতে শুরু করেছেন। আজ অরিজিন অব স্পেসিস প্রকাশের প্রায় ১৫০ বছর পর আমরা আমাদের নিজেদের বিবর্তনকে কেবল বুঝতে শুরু করেছি।

বিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞান

১৯৯৬ সালে, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ‍র‌্যানডোলফ নেসে এবং বিবর্তন জীববিজ্ঞানী জর্জ উইলিয়ামস, ‘হোয়াই উই গেট সিক’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তারা যুক্তি দেন স্বাস্থ্য আর অসুস্থ্যতাকে সামগ্রিক অর্থে বুঝতে হলে, বিজ্ঞানীদের অবশ্যই আমাদের বিবর্তনীয় ঐতিহ্যটাকে বুঝতে হবে। তাদের এই বইটি বেশ কিছু চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করেছে একটি নতুন অনুসন্ধানী ক্ষেত্রের সূচনা করতে, যার নাম বিবর্তন চিকিৎসাবিজ্ঞান।

এক অর্থে বলতে গেলে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে অনেকদিন ধরেই গবেষণা করে আসছেন। যেমন, ১৯৫০ এর শেষের দিকে জর্জ উইলিয়ামস প্রথম ভাবতে শুরু করেছিলেন, কেন আমরা বা অন্য প্রাণীরা বৃদ্ধ হই। তিনি যুক্তি দেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন জীবনের শুরুর দিকে প্রজনন ও বংশবিস্তার সংক্রান্ত অভিযোজনগুলোকে নির্বাচন করে, যদিও পরবর্তীতে এই অভিযোজনগুলোর প্রভাব অনেক সময়ই ক্ষতিকর । সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরা জোট বেধেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের সাথে এই সব ধারণাগুলোর ব্যপক বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে। বয়োবৃদ্ধির এবং বার্ধক্যে নিয়ে উপর আণবিক জীববিজ্ঞানের অনেক সাম্প্রতিক গবেষণাই উইলিয়ামসের মৌলিক ধারণার সত্যতা প্রমাণ করেছে। বয়োবৃদ্ধি এবং বার্ধক্য যে উচ্ছল এবং প্রাণচঞ্চল তারুণ্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সেটা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা বর্তমানে গবেষকদের সাহায্য করছে নতুন কোনো পথ খুজে বের করান জন্য যা বার্ধক্যের মূল প্রক্রিয়াকে মন্থর করবে।

?w=660″ width=”500″ />
(ছবি: ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস তার নিরন্তর বিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের বাধ্য করে প্রতি বছর নতুন ধরনের ফ্লু-ভাইরাস স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক তৈরী করতে। ছবিতে এইচ১এন১ (H1N1) সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস যা ২০০৯ এর প্যানডেমিকের কারণ।)

বিবর্তন প্রক্রিয়া ভাইরাস এবং অন্যান্য রোগজীবানুকে আরো বেশী শক্তিশালী করে তোলে, যা আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এমনকি এমন একটা যুগেও, যখন তাদের জেনোমের ডিএনএ’র অনুক্রম আমাদের নোখদর্পনে । এর কারণ আসলে তাদের ডিএনএ একধরনের চলমান নিশানা, স্বতত পরিবর্তনশীল এবং কিভাবে আমাদেরকে তাদের পোষক আর রোগব্যাধির প্রজনন ক্ষেত্রে রুপান্তরিত করবে, সেই অতি পুরোনো প্রশ্নের সমাধান খুজে বের করার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্ত আমাদের আণুবীক্ষণীক শত্রুদের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা কিন্তু তাদের দূর্বলতাগুলোকেও উন্মোচিত করে -সেই সব পথগুলোকে আমরা জানতে পারি কিভাবে এবং কখন তারা সঠিকভাবে বিবর্তিত হয়না। এই দুর্বল জায়গাগুলোই ক্রমান্বয়ে প্রতিরোধ আর চিকিৎসার নতুন নিশানা হয়ে উঠছে। আমরা তাদের বিবর্তনকে থামাতে হয়তো পারবো না, কিন্ত অন্ততপক্ষে আমরা শিখতে পারবো, কেমন করে তা আমাদের পক্ষে কাজে লাগানো যায়।

(ডারউইনকে নিয়ে লেখা এই ধারাবাহিকটা এখানেই সমাপ্ত। যারা পড়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =