বিবি খাদিজা ও ইসলাম, জায়েদ ও মহানবীর উত্তরাধিকার বিষয়ে সুব্রত শুভ’র লগে আলাপ

(সম্প্রতি সুব্রত শুভর লগে ফেসবুক ম্যাসেজে ঘটা আলাপের নির্বাচিত অংশ)

সুব্রত শুভঃ একটা প্রশ্নের উত্তর দেন তো। খাদিজার প্রতি আমার এক ধরনের প্রেম আছে। মানে ইসলামের ইতিহাস পড়ার কারণে হয়েছে। ইসলাম সৃষ্টি হয়েছে আসলে খাদিজার কল্যানে। তার টাকা পয়সার সাপোর্টে। যাই হোক, খাদিজাকে মুসলিমরা বিবি খাদিজা কয়, কিন্তু আয়েশাকে হযরত আয়েশা বলে। কারণটা কী? আয়েশা থেকে সবচেয়ে বেশি সম্মানের দাবীদার তো খাদিজা।

পারভেজ আলমঃ এমনিতে ইসলাম সৃষ্টিতে কারো একার অবদান নাই, ইসলাম সৃষ্টি হওয়ার ইতিহাস প্রায় শ খানেক বছরের জটিল ইতিহাস। তবে শুধু টাকা পয়সা না, আমার ধারণা মুহাম্মদকে একত্ববাদ শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রেও খাদিজার ভুমিকা আছে। মক্কায় হানাফদের একটা গ্রুপ ছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ খ্রিস্টান আর কেউ শুধু হানাফ ছিল। খাদিজা হানাফ ছিল না খ্রিস্টান এই নিয়া বিতর্ক আছে, তবে আমি যতোটুকু আন্দাজ করি সে এবিয়নাইট খ্রিস্টান ছিল। এমনিতে হানাফদের সাথে এবিওনাইট খ্রিস্টানদের তেমন পার্থক্যও নাই। মুহাম্মদতো শুরুতে হানাফদের একজন ছিল মাত্র। আর ‘বিবি খাদিজা’ আমার মনে হয় একটা বাঙলা অভিধা, ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায়ও থাকতে পারে। কিন্তু খাদিজার নামের সাথেও হজরত শব্দের ব্যবহার হয়। অর্থাৎ আয়েশার ক্ষেত্রে হজরত কিন্তু খাদিজার ক্ষেত্রে না, তেমন না। আর আমার মনে হয়, ‘বিবি খাদিজা’ নামের মধ্যে আসলে একটা আলাদা ভক্তির ব্যপার আছে।

সুব্রত শুভঃ আসলে আমার প্রশ্নটা হল, হয়রত আয়েশার নাম এতো শুনি, কিন্তু হযরত খাদিজার নাম শুনি না কেন?

পারভেজ আলমঃ কারন আয়েশা সুন্নিদের হাদিসের অন্যতম একজন সোর্স হিসাবে ব্যবহৃত হন।

সুব্রত শুভঃ সেটাই বলছি, সুন্নিদের ফোকাস তাই আয়েশার দিকে।

পারভেজ আলমঃ তা কিছুটা বলা যায়। খাদিজারে নিয়া সিরিয়াস আলাপ করা তাদের জন্যে কঠিন। মুহাম্মদের লাইফ খাদিজা জীবিত থাকার সময় আর তার মৃত্যুর পরে দুই রকম। খাদিজার মৃত্যুর প্রভাব মুহাম্মদের উপর প্রবল। মূলত কুরাইশদের বয়কট, ক্যাম্পের জীবনে অসুস্থ্য হয়ে খাদিজার মৃত্যু, ইত্যাদি মুহাম্মদকে রাজনৈতিক জীবন বেছে নিতে বাধ্য করেছিল।

সুব্রত শুভঃ হা। মুহাম্মদ খাদিজার কবরে গিয়ে বেশ সময় কাটাতো।

পারভেজ আলমঃ শোন, মুহাম্মদের গুরু হচ্ছে খাদিজা। ফরহাদ মজহার হয়তো এই কারনেই খাদিজারে নিয়া কবিতাটা লিখছিল।

সুব্রত শুভঃ কবিতাটা ভাল হইছে, বেটারে যতো গালি দিই না কেন। হা, মুহাম্মদকে নবী হিসেবে ঘোষণাই তো করলো খাদিজা। মুহাম্মদ তো ভয়েই মরে যাবার অবস্থা। ‌আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারতো।

পারভেজ আলমঃ সেটাই। তবে ঐটা অবশ্য একরকম কল্পকথা। মানে অনেক পরে লেখা তো। তবে এই কাহিনির মধ্যেও কাহিনির পেছনকার সত্যিটা ধরা যায় যে মুহাম্মদকে নবী ঘোষনায় খাদিজার একটা বড় ভুমিকা ছিল, এবং তা মুহাম্মদের চাইতেও বেশি।

একটা জিনিস আমি প্রায়ই ভাবি, খাদিজার পরে মুহাম্মদ এতোগুলা বিয়া করছে। কিন্তু এক মারিয়া কিবতিয়া ছাড়া আর কারো ঘরে কোন সন্তান হইছে জানা যায় না।
বিষয়টা আমার কাছে কাকতালিয় মনে হয় না।

সুব্রত শুভঃ হা। বিষয়টা কিন্তু বেশ অদ্ভুত। এটা নিয়ে আপনার ধারণা কী?

পারভেজ আলমঃ ওয়েল, থিংক র‍্যাশনালি। তিনটা জিনিস হইতে পারে।
১। মুহাম্মদের সন্তান জন্ম দেয়ার আর কোন ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না। এইটা মুহাম্মদের বদনাম করা কতিপয় নাস্তিকের থিওরি অবশ্য। সেইক্ষেত্রে অবশ্য মারিয়া কিবতিয়ার সন্তান তার সন্তান হওয়ার কথা না। ঐসব নাস্তিকদের থিওরিও তাই। এইখানে সত্য জানা না, স্ক্যান্ডাল প্রচার করাই মূল উদ্দেশ্য। ফলে এই থিওরিটা অবজেক্টিভ না।

২। আবার হইতে পারে যে, মুহাম্মদ ইচ্ছা করেই খাদিজার পরে কোন বউয়ের ঘরে সন্তান জন্ম দিতে চান নাই। যাতে তার উত্তরাধিকারি হিসাবে খাদিজার সন্তানরাদের কম কমপিটিশন করতে হয়। সেইক্ষেত্রে মারিয়া কিবতিয়ার বিষয়টা এক্সিডেন্ট হইতে পারে। অথবা মারিয়া কিবতিয়ার ঘরে সন্তান হওয়ার বিষয়টা একেবারেই পরবর্তি সময়ের আবিস্কার করা কাহিনি, সত্য কাহিনি না। মিশর থেকে মুহাম্মদের কাছে মারিয়া কিবতিয়াকে পাঠানোর যে টাইমলাইন তা কিন্তু মুহাম্মদের একেবারে শেষ জীবনের। মারিয়া কিবতিয়ার সাথে তার আদৌ কি ধরণের সম্পর্ক ছিল নিশ্চিত করে বলা কঠিন। এনিওয়ে, এই থিওরি ঠিক হয়ে থাকলে পরবর্তি যুগের হাদিস লেখকরা মুহাম্মদকে যেমন সেক্সুয়াল সুপারহিউম্যান হিসাবে প্রচার করেছে তা সত্য হওয়ার কথা না, বরং খাদিজার পরে হয়তো তিনি সেক্সুয়ালি তেমন একটিভ ছিলেন না।

৩। মুহাম্মদের আরো কিছু সন্তান হইছিল। কিন্তু তাদেরকে মাইরা ফেলা হইছে। এইধরণের থিওরি শিয়াদের মধ্যে আছে। তবে শিয়ারা যারা এই থিওরি দেয় তাদের মতে বাকি সন্তানরাও খাদিজার সন্তানই ছিল, কিন্তু পুরুষ সন্তানদের মেরে ফেলা হইছে। যাতে তারা উত্তরাধিকারি না হইতে পারে।

দুই নম্বর থিওরিটাই সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। মুহাম্মদ পরের বিবিদের সন্তান দিতে খুব আগ্রহি ছিলেন বলে মনে হয় না। খাদিজার মৃত্যুর পরের মুহাম্মদ একজন পলেটিকাল লিডার এবং এইসময় তার প্রায় সব বিবাহই পলেটিকাল। শুধু উম্মে সালামারটা ছাড়া। তারে বিয়া করছিলেন ফাতিমার লালন পালনের জন্যে।

আবুবকর কি আয়েশারে এমনি এমনি মুহাম্মদের কাছে বিয়া দিসে? অথবা উমর হাফসারে? তাদের তো ইচ্ছা ছিল সেই ঘরে সন্তান হউক। অর্থাৎ নিজের মেয়ের সন্তানদের থেকে ডাইনেস্টি তৈরির চেষ্টা। কিন্তু মুহাম্মদ সেইটা হইতে দেয় নাই। আর তা হয়ে থাকলে, আবু বকর আর উমর হয়তো মুহাম্মদের উপরে যথেষ্ট বিল্লা ছিল।

আরেকটা বিষয় আছে। মুহাম্মদের পালক পুত্র জায়েদের বউ জয়নবকে বিয়া করা ও জায়েদকে পালক পুত্র থেকে খারিজ করার যে কাহিনি পাওয়া যায় সেটাও খুবি প্রবলেমেটিক কাহিনি। মুহাম্মদ জীবিত থাকতে কিন্তু জায়েদ খুবি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সুব্রত শুভঃ এই বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন। খুব বিব্রতকর কাহিনী।

পারভেজ আলমঃ ওয়েল, আসল ঘটনা কি হইছিল তা জানি না। কিন্তু জায়েদ আর মুহাম্মদের পুত্র নাই এইটা প্রমান করাই ছিল মুহাম্মদ পরবর্তি খলিফাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। কারন জায়েদ কিন্তু মুহাম্মদের পুত্র থাইকা গেলে প্রধান উত্তরাধিকারি হইতে পারতো। মদিনা পিরিওডে জায়েদ কিন্তু নিয়মিত যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতো। মুতা যুদ্ধের নাম শুনছো তো?

সুব্রত শুভঃ হা। নেটে পেলাম মুতার যুদ্ধ. মুতা জর্দানের বালকা এলাকার নিকটবর্তী একটি জনপদ।

পারভেজ আলমঃ হুম। ঘটনা হচ্ছে যে, মুহাম্মদ না কি এই যুদ্ধের খবর শুইনা গেছেন। মানে যখন সে অসুস্থ্য, মৃত্যুর ঠিক আগে। কিন্তু পুরান রেকর্ডগুলা থেকে আসলে ডেট নিশ্চিত করা যায় না। অর্থাৎ এই যুদ্ধটা মুহাম্মদের মৃত্যুর পরও হইয়া থাকতে পারে। অথবা মুহাম্মদের মৃত্যু আর এই যুদ্ধ প্যারালালি ঘটছে। এনিওয়ে, ঘটনা হচ্ছে যে এই যুদ্ধে মুহাম্মদের প্রধান দুই সেনাপতি কিন্তু মারা গেছে। মুতা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি ছিল জায়েদ। তারপরে জাফর ইবনে আবু তালিব, আলীর বড় ভাই। তিন নম্বর সেনাপতি ছিল আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাহ। রাওয়াহাহ ছিল আনসারগো একজন নেতা, নবীর ঘনিষ্ট, মদিনায় মুহাম্মদকে প্রতিষ্ঠিত করতে সবচাইতে বেশি ভুমিকা রাখাদের একজন। এখন ঘটনা হইল যে এই তিনজনই কিন্তু মুতা যুদ্ধে নিহত হইছে।

সুব্রত শুভঃ হা।

পারভেজ আলমঃ তারপরে সেনাপতি হইছে কে জানো?

সুব্রত শুভঃ কে?

পারভেজ আলমঃ উমরের কাজিন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। তো মুহাম্মদের ঠিক করে দেয়া প্রধান তিন সেনাপতি যে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হইছে সেই কাহিনির সোর্স কিন্তু খালিদ নিজেই। কারন সে বাকি সেনাবাহিনী নিয়া সিরিয়া থেকে ফিরত এসে সেই দাবি করেছিল। কিন্তু মুহাম্মদের পালক পুত্র জায়েদ আর চাচাতো ভাই জাফরের মতো প্রধান দুই সেনাপতির মৃত্যু আর সেনাপতি হিসাবে খালিদের উত্থান কিন্তু পেরালালি ঘটছে। এইটা খেয়াল করার মতো ব্যাপার। খালিদ কিন্তু তখনো ছিল নও মুসলিম। উহুদ যুদ্ধে মক্কার কুরাইশরা যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জিতছিল তা কিন্তু মূলত খালিদের বীরত্বের কারনেই। মূলত মুহাম্মদের মৃত্যুর কাছাকাছি সময়েই খালিদের উত্থান, আর সেই কিন্তু ছিল আবু বকর আর উমরের প্রধান সেনাপতি। মুহাম্মদের মৃত্যুর পর মদিনায় ক্ষমতা সংহত করতে আর রিদ্দার যুদ্ধের বিদ্রোহী গোত্রগুলারে শায়েস্তা করতে কিন্তু আবু বকর মক্কার নও মুসলিম কুরাইশদের উপরই সবচাইতে বেশি নির্ভর করেছিলেন, বিশেষ করে খালিদের উপরে। মোট কথা, খালিদের উত্থান হইছে মুহাম্মদের প্রধান দুই সেনাপতির মৃত্যুর মধ্য দিয়া, এবং এই দুই সেনাপতি আবার তার অন্যতম দুই উত্তরাধিকারি। জাফরও কিন্তু খুবি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

সুব্রত শুভঃ হা।হাশেমী বংশের তো।


ছবিঃ ‘দা ম্যাসেজ’ সিনেমায় জায়েদের চিত্রায়ন।

পারভেজ আলমঃ সেটাই। তো, মুহাম্মদের সাথে জয়নবের বিয়া আর জায়েদরে পালক পুত্র থেকে খারিজ করার ঘটনাটাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে।

সুব্রত শুভঃ কিরকম?

পারভেজ আলমঃ হইতে পারে যে, মুহাম্মদের শেষ সময়ে তার তেমন কোন পাওয়ার ছিল না, সবকিছু কন্ট্রোল করতাছিল আবু বকর, উমর ও তাদের কুরাইশ এলাইরা। জায়েদকে তারা হয়তো মুহাম্মদের পুত্র থেকে খারিজ করতে চাইছে, মুহাম্মদের সাথে জয়নবের বিয়ে বা বিয়ের কাহিনিটা হয়তো তার সাথে সম্পর্কযুক্ত।

সুব্রত শুভঃ মানে জায়েদকে ক্ষমতা থেকে দৌড়ানোর উপায়?

পারভেজ আলমঃ হুম। একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এতো বড় বড় সাহাবি, কারো নামই কিন্তু কোরানে পাইবা না। মুহাম্মদের সাহাবিদের মধ্যে খালি জায়েদের নামটাই কোরানে আছে। ‘ডেভিড এস পাওয়ার্স’ নামে একজন স্কলারের গুরুত্বপূর্ণ একটা বই আছে “মুহাম্মদ ইজ নট দা ফাদার অফ এনি অফ ইউ ম্যান’ নামে। কোরানে সুরা আজহাবে জায়েদের পুত্রত্ব খারিজ বিষয়ক আয়াতগুলা নিয়া তিনি নতুন কিছু আলোচনা হাজির করেছেন। তার বিশ্লেষন ভাষাতাত্ত্বিক, এবং একিসাথে কোরান সংকলনের সময়কার কাটছাট বা পরিবর্তন করার যে ইতিহাস পাওয়া যায় তা গুরুত্ব দিয়েছেন। যেই ব্যাপারটা বুঝতে হবে, তা হলো সে কিন্তু ওয়েস্টার্ন স্কলার। সুতরাং, মুহাম্মদের পালক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা বিষয়ে কোন এপোলজি দাড় করানো তার উদ্দেশ্য না। এনিওয়ে, তার মতে সুরা আজহাবে জায়েদ সংক্রান্ত আয়াতগুলা অরিজিনালি ছিল বাপ ও ছেলে কেন্দ্র করা একটা সালভেশন তত্ত্ব। অর্থাৎ মুহাম্মদ আর জায়েদকে নিয়া একটা ধর্মিয় সালভেশন তত্ত্ব ছিল এইখানে। কোরান সংকলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাটছাট কইরা সেইটা পরে পরিবর্তন করা হইছে। আর তা হয়ে থাকলে মুহাম্মদ কোন ‘পুরুষ মানুষে’র পিতা না এই বক্তব্য প্রচারের উদ্দেশ্য হইতে পারে যে মুহাম্মদের কোন বায়োলজিকাল উত্তরাধিকারি নাই এই বিষয়টা জোর দেয়া। কারন ইব্রাহিমি ট্রাডিশনে কিন্তু নবীর পুত্রের নবী হওয়ার উদাহরণ আছে অনেক। ফলে মুহাম্মদ কোন পুরুষ লোকের পিতা না, এই বক্তব্যের তাৎপর্য গভির। এর উদ্দেশ্য হইতে পারে, যাতে জায়েদ বা তার বংশধররা কেউ মুহাম্মদের উত্তরাধিকারি হওয়ার দাবি না করতে পারে। বেসিকালি জায়েদের কিছু সন্তানাদির কথা জানা যায়। কিন্তু এর পরবর্তি বংশধরদের কথা ইতিহাসে নাই বললেই চলে। প্রায় সিন আউট।

সুব্রত শুভঃ হু, দেখা যাচ্ছে বিষয়গুলো আসলে মহাভারতের মতন রাজনীতিতে ভর্তি।

পারভেজ আলমঃ আর এমন কিছু হাদিস কিন্তু আছে যাতে দাবি করা হইছে যে জায়েদ বাঁইচা থাকলে মুহাম্মদের পরে সেই খলিফা হইতো। জায়েদের কোন বংশধর যেহেতু পলেটিকাল ফিগার ছিল না, বা ক্ষমতার দাবিদারও ছিল না ফলে এই হাদিসগুলা কারো ইনভেন্ট করার সম্ভাবনাও কম। কারন জায়েদের পলেটিকাল অথরিটি শুরুর দিকের সুন্নি বা শিয়া কারোই পছন্দ হওয়ার কথা না।

সুব্রত শুভঃ আমার একটা কথা প্রায় সময় মনে আসে। বর্তমানে হজ্ব নামে যা চলে তার জন্যে তো মুহাম্মদ ফাইট করে নাই। হজ্জ প্রথা ইসলামের সাথে যায় কি? কারণ মুহাম্মদের যুদ্ধই তো ছিল মূর্তির বিরুদ্ধে। আর এখন তো মক্কাতেই সবচেয়ে বড় মূর্তি পূজাটা হয়। ভারতবর্ষ এখানে ফেইল। শিয়ারা কিন্তু এই হজ্ব সিস্টেমের ব্যাপক সমালোচনা করে।

পারভেজ আলমঃ মুহাম্মদের যুদ্ধ কতোটা মুর্তির বিরুদ্ধে ছিল সেটাও সন্দেহজনক।
হয়তো প্যাগান দেবতাদের মুর্তির বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু মুহাম্মদ কতোটা আইডিওলজিকালি আইকোনক্লাস্ট ছিলেন সেইটা আমি শিওর না। সম্প্রতি পড়লাম যে আল মাসুদির কিছু টেক্সটে না কি আছে যে মুহাম্মদ কাবার ভিতরে ইব্রাহিমের মুর্তি রাইখা দিসিলেন। আইকোনক্লাজম, মানে মুর্তি বিরোধী মুভমেন্ট কিন্তু একটা পিরিওডের ব্যাপার, এবং তা শুধু মুসলিম দুনিয়ার মুভমেন্ট ছিল না। মোটামুটি ৭ শতকের শেষভাগ থেইকা ১০/১১ শতক পর্যন্ত মুর্তি বিরোধী এই মুভমেন্ট মুসলিম খেলাফত আর বাইজেন্টাইন খ্রিস্টানদের এলাকাতে চলছে।


ছবিঃ খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের মুদ্রা।

সুব্রত শুভঃ হা। খ্রিস্টানরা তো এক সময় প্রবলভাবে ছবি আঁকারও বিরোধী ছিল

পারভেজ আলমঃ সবসময় না। এইটার একটা পিরিওড ছিল আর এতে খ্রিস্টান এবং মুসলমান উভয়েরই অংশিদারিত্ব ছিল। সবচাইতে পুরাতন পূর্ণাঙ্গ ইসলামি মুদ্রা যেইটা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান প্রচলন করছিলেন, তাতে কিন্তু খলিফার ছবি খোদাই করা ছিল। এনিওয়ে, এতো কথা বলার অর্থ হচ্ছে যে মুহাম্মদ কি করেছেন বা কি করেন নাই তা দিয়া আসলে ইসলাম বুঝা যাবে না। ইসলামের বিভিন্ন চর্চা গড়ে ওঠার শত শত বছরের ইতিহাস আছে। আর হজ্জ নিয়া আলাপ করতে গেলে গত একশ বছরে এর ডেভেলপমেন্টে নজর দেয়াই এনাফ।হজ্জ অতীতে এতো বড় ব্যবসা ছিল না, এখন যেমন হইছে। আর হজ্জের মধ্যে পৌত্তলিকতা আছে কি না, সেই প্রশ্নের জবাবও সহজ নয়। কারন পৌত্তলিকতা একত্ববাদ কিংবা নাস্তিকতা সবকিছুর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে। মানুষের চিন্তায় হাজার বছরে অনেক পরিবর্তন আসছে সত্য, কিন্তু রিচুয়াল থেইকা একটিভিজম, এই সবকিছুর মধ্যে পৌত্তলিক স্ট্রাকচার পাওয়া যাবে, অতিক্রম করতে চাইলেই পারা যাবে এমন না। একত্ববাদ থেইকা পৌত্তলিকতা বাদ দিতে গেলে হয়তো রিচুয়াল জিনিসটাই বাদ দিয়া দিতে হবে। আর একত্ববাদেরও অনেক রূপ আছে। মুহাম্মদের একত্ববাদ ছিল একরকম, আর উমাইয়া এবং আব্বাসিদের একত্ববাদ আরেক রকম। খেলাফতি যুগের মুসলমানরা ‘তাওহিদ’বলতে যা হাজির করছে তা মুহাম্মদের আর্লি একত্ববাদের চাইতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের তাওহিদের সাথেই মিলে বেশি, যা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের নামে একটা ইউনিভার্সাল সাম্রাজ্যের দাবি করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “বিবি খাদিজা ও ইসলাম, জায়েদ ও মহানবীর উত্তরাধিকার বিষয়ে সুব্রত শুভ’র লগে আলাপ

  1. মক্কায় ইসলাম প্রচারের প্রথম
    মক্কায় ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে ১৩ বছর নবী মুহাম্মদ একজন ধর্মপ্রচারক হিসাবে ছিলেন, এর পরের সময়টা ছিল রাজনৈতিক। দুই পর্বের মুহাম্মদের মধ্যে ছিল অনেক পার্থক্য। ধর্মপ্রচারক নবী মুহাম্মদ ও রাজনৈতিক নবী মুহাম্মদকে নিয়ে একটা তুলনামূলক বিশ্লেষন আপনাদের থেকে আশা করছি।

    খাদিজাকে নিয়ে আপনাদের আলোচনা বেশ ভাল লেগেছে। তবে মুহাম্মদের জীবনে খাদিজা পর্ব নিয়ে আরো ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন আছে। এই কথোপকথন দিয়ে খাদিজাকে নিয়ে বিশ্লেষন শুরু হয়েছে বলে ধরে নিলাম।

    আপনার ব্লগটি পড়ে মনে হচ্ছে পুরানো ব্লগ আমলে ফিরে গেলাম।

    1. পুরানো ব্লগ আমলটি কত সালে
      পুরানো ব্লগ আমলটি কত সালে ছিলো আপনার জন্য? তখন কি নিকে চলতেন? নিক না থাকলে নিকবিহীন ভিজিটর।

  2. অনেক গুলো পসিবিলিটির জানা গেল
    অনেক গুলো পসিবিলিটির জানা গেল। তার চেয়েও বড় যে ব্যাপারটা উঠে এসেছে তা হলো ইসলামকে তৈরি করার পেছনে মুহাম্মাদের সমান বার তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ন কিছু মানুষ ছিল। ইসলামের সব দোষের জন্য মুহাম্মদকে নন্দ ঘোষ বানানো হয়। হয়তো অনেক ক্ষেত্রে তা অতি সরলীকরণ করা হয়ে যায়।

  3. আমার মনে হয় ইসলাম সৃষ্টি
    আমার মনে হয় ইসলাম সৃষ্টি হয়েছে পুরোপুরি খাদিজার বিজনেস কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে। মুহাম্মাদকে নবী বানানোর পরিকল্পনা ও তার নিঃসন্দেহে। কেউ যদি মুহাম্মাদ এর জন্মের আগের আরব ইতিহাস পড়ে এবং জন্মের পরের ইতিহাস পড়ে তাহলে খুব সহজেই এই রহস্য বুঝা সম্ভব। মুসলিম রা যদি বিশ্বাস আর অনুভুতির ব্লাকমেইল খেলা না খেলত তবে কবেই মানুষ এই বানোয়াট কল্পকাহিনী রুপকথার ক্যাটাগরিতে ফেলত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 57 = 61