কেন আমি সৈয়দ শামসুল হক কখনও পড়ি নি?

আমি কখনই শামসুল হকের কোন লেখা পড়ি নি। এমনিই পড়া হয়ে উঠে নি- ব্যাপারটা তেমন না। কখনও ইচ্ছা হয় নি পড়ার।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বর্ষের ছাত্র- সঠিক মনে নেই, সালটা ২০০৬ বা ০৭ হবে। ঐ সময় আমি একটা নাটক দেখেছিলাম। নাটকটির নাম মনে নেই, তবে এতটুকু মনে করতে পারি- এটা একটা কাব্য নাটক ছিল এবং নাটকটির রচয়িতা ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। নাটকটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়টির টি এস সি অডিটরিয়ামে মঞ্চস্থ হয়েছিল। নাটকটিতে চরিত্র সংখ্যা ছিল তিনটি। দুইটা পুরুষ চরিত্র এবং একটা নারী চরিত্র। একটি পুরুষ চরিত্র চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং অপর পুরুষ চরিত্র ও নারী চরিত্র ঐ ইনস্টিউটের শিক্ষার্থী। যাহোক, অনেক আগে সেই নাটকটি দেখেছিলাম বলে এবং নাটকটি আমার ভালো লাগেনি বলেই হয়ত নাটকটির ব্যাপারে খুব বেশী কিছু এখন আর মনে করতে পারি না। ফলে নাটকটির ঐ সময়ের মঞ্চায়ন বা অন্যান্য কিছু যতটুকু মনে করতে পারি তার পুরোটুকুই এখানে বলার চেষ্টা করব। যাতে করে কেউ এই নাটকটির ব্যাপারে উৎসাহী হলে সহজেই নাটকটি খুঁজে বের করতে পারেন।

নাটকটির পুরুষ শিক্ষার্থী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নাট্যকলা বিভাগের একজন তরুন শিক্ষক এবং শিক্ষক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ঐ বিভাগের একজন ছাত্র আর নারী শিক্ষার্থী চরিত্রে ঐ বিভাগেরই একজন নারী শিক্ষার্থী। যাহোক, একটা বাদে নাটকটির আর কোন সংলাপই আমি এখন আর মনে করতে পারি না। তবে ঘটনাক্রম ছিল মোটামুটি এরকমেরঃ নারী শিক্ষার্থী এবং পুরুষ শিক্ষার্থী- এই দুজনের মধ্যে একটি প্রেমের সম্পর্ক থাকে। নাটকটির প্রথমেই সম্ভবত তাদের বিয়ে হয়ে যায়। মেয়েটি সেই রাত্রেই তার শিক্ষকের সাথে দেখা করতে আসে। শিক্ষকটি মেয়েটির প্রতি প্রেমাসক্ত থাকে। তবে শিক্ষকের প্রতি মেয়েটির কোন ধরনের প্রেমাবেগ থাকে কিনা এমন কোন কিছু স্পষ্ট করা হয় নি বা করে থাকলেও আমার মনে নেই। তো ছেলেটি মেয়েটিকে খুঁজতে খুঁজতে শিক্ষকের বাসায় চলে আসে। এসে এদের দুইজনকে আলাপরত অবস্থায় দেখতে পায়। নাটকটির নাটকীয়তা তখন থেকেই শুরু হয়। যাহোক, নাটকটির যে একমাত্র সংলাপটি আমার মনে আছে তা এখনই উল্লেখ করতে চাই। কারন এই সংলাপটি হচ্ছে নাটকটির থিম সংলাপ। এবং এটা সম্ভবত শেষ সংলাপ। সংলাপটি ছিল এরকমঃ ছাত্র তার শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে মেয়েটিকে দেখিয়ে বলছে- আজ থেকে শিল্প আমার আর এ নারী আপনার। নাটকটির শুধু এই সংলাপটি আমার মনে থাকার কারন হল, সেদিন এই সংলাপটি আমাকে ভয়ানকভাবে আঘাত করেছিল, আমি মর্মাহত হয়েছিলাম।

নাটকটির পুরুষ দুই চরিত্রকেই এখানে ডেডিকেটেড চিত্রশিল্পী হিসেবে দেখানো হয়েছে। নাটকের যে সংলাপটি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে আমরা দেখতে পাই- নারীকে দাঁড় করানো হয়েছে শিল্পের পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে। অনেকে বলতে পারেন, নাটকের চরিত্রগুলোর প্রত্যেকটা সংলাপ নাট্যকারের চিন্তার প্রতিফলন নয়- এটা আমিও মনে-প্রাণে স্বীকার করি। তবে কোন কোন সংলাপ যে নাট্যকারের চিন্তার বা দর্শনের প্রতিফলন তা বলা যায়। এই সংলাপটা হচ্ছে এরকমই একটা সংলাপ। প্রথম কারনঃ নাটকটি দেখলেই বোঝা যায়- প্রথম থেকেই নাট্যকার এই বিশেষ চরিত্রটির উপর ভর করেছেন। শিক্ষকের সাথে, মেয়েটির সাথে তর্কে এই চরিত্রটিকে বরাবরই জিতিয়ে দিচ্ছেন। নাটকের প্রোটাগনিস্ট হচ্ছে এই পুরুষ শিক্ষার্থী চরিত্রটি। দ্বিতীয় কারনঃ এই সংলাপের মধ্যে যে পুরুষতান্ত্রিক ব্যাপারটাকে- যা হলঃ শিল্প হচ্ছে পুরুষের একমাত্র এখতিয়ার এবং পুরুষের শিল্প-চর্চার পথে নারী বাঁধা। যে নারী পাবে সে শিল্প থেকে বঞ্চিত হবে, যেমনঃ এই নাটকের শিক্ষক চরিত্র। আর যে পুরুষ নারীকে ত্যাগ করবে সে শিল্প চর্চার অধিকারী হবে, যেমনঃ এই নাটকের পুরুষ শিক্ষার্থী চরিত্র- সূত্রায়ন করেছেন তা নাটকের পুরো অবয়ব জুড়ে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে রেখেছেন নাট্যকার। কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে, কাব্যরসে ভরিয়ে, ছন্দে মাতিয়ে; শব্দের সুষমা, লিপিকুশলতা এবং নানাবিধ অলংকারে সাজিয়ে।নাটকটির উপরিভাগ আমার কাছে অপরূপই লেগেছিল তবে ভেতরটা যা হচ্ছে নাটকটির থিম বা চিন্তা আমাকে ভয়ানক বেদনা আক্রান্ত করেছিল। এর পর কখনও সৈয়দ শামসুল হকের লেখা পড়ে দেখার ইচ্ছা আমার হয় নি। যদি তিনি এই নাটকটির মঞ্চায়ন এবং প্রকাশ বন্ধ করে দিতেন তাহলে হয়ত উনাকে পড়া ইচ্ছা হলেও হতে পারতে।

যাহোক, এই নাটকটি লেখার এবং বেঁচে থাকাকালীন কখন কোন দিন এর প্রচার এবং মঞ্চায়ন বন্ধের নির্দেশ না দেওয়ার কারনে আমার কাছে তিনি প্রগতিবিমুখ এবং পুরুষতান্ত্রিক দার্ঢ্যে ভরপর একজন লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যিনি এই সময়ে বাস করেও পুরুষতান্ত্রিক দাপটে “শিল্প হচ্ছে পুরুষের চর্চার ব্যপার এবং নারী সেখানে শিল্প চর্চার বাঁধা বৈ কিছু নয়” এই ব্যাপারটাকে খুব সহজেই সূত্রায়ন করে ফেলেন। শিল্পের প্রতি অনেক বেশী পরিমানে নিবেদিত ছাত্র চরিত্রটি তার প্রেমিকাকে তার শিক্ষককে দিয়ে দেন এবং বলে আসেন যে নারীর কারনে শিক্ষকের নিকট থেকে শিল্প চলে যাবে এবং নারী-হীনতার কারনেই শিল্প তার নিজের হয়ে উঠবে। আরেকটি ব্যপার হল নারীটি কোন দিকে যাবে সেই সিদ্ধান্তটিও নেয় পুরুষ, এখানে নারীর কথা বলার কোন সুযোগ থাকে না। এবং নাটকটি এমন একটা আবহে শেষ করেন যে সকল দর্শক বা পাঠকের সহানুভূতিও যেন শিল্পের খাতিরে নারীকে ত্যাগকারী ঐ ছাত্রটির দিকে ধাবিত হয়।

বিঃ দ্রঃ উইকিপিডিয়া সার্চ করে নাটকটির নাম মনে পড়ল। নাটকটির নাম হচ্ছে “ঈর্ষা”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কেন আমি সৈয়দ শামসুল হক কখনও পড়ি নি?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + = 9