হেমন্তের ভাতঘুম

সন্ধ্যা নামে। একটা নরবড়ে রেলিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় রঞ্জুদের ঘর। ছাদে যাবার সিঁড়ি নেই। বারান্দার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে, কার্ণিশ ধরে বেশ কসরত করে আমি আর রঞ্জু ছাদে উঠি। সিকদার বাড়ির সুপারী গাছের মাথায় তখন ঠান্ডা একটা গোল চাঁদ। চাঁদের আলোয় রঞ্জুর ছায়া তখন ভূতের মত ভেংচি কাটছে। রঞ্জু ইশারা করে হাত নেড়েচেড়ে। মাহি বারান্দায়! ছাদের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রঞ্জু লক্ষ্য করছিল কখন মাহি এসে দাঁড়াবে…।

কবুতরের খুপরির মত দুটো করে ঘর, এপাশে রঞ্জু আর ওপাশে মাহিদের। নিচতলায় একটা হোসিয়ারী ফ্যাক্টরি। বিকেলবেলা কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে নিচের সিড়িঘরটা অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে। আকাশে চাঁদ না থাকলে মাহির হাত আমি ছুঁয়ে দিতাম ওখানে! একতলার সিঁড়িঘরে একটা লুকানো জায়গায় আমরা চিঠি রাখতাম দুজনের জন্য। অন্ধকারে মাহি আমার বুকে ঠোকর খায়। সেই প্রথম জেনেছিলাম সপ্তাদর্শীদের গায়ে চন্দনের ঘ্রাণ হয়!

আকাশে সাতটা ঋষি বসে ধ্যান করে। ঐ যে, আঙ্গুল দিয়ে দেখাই রঞ্জুকে। রঞ্জুর আজ সপ্তর্ষিমন্ডলে কোন মন নেই। উত্তরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হিমালয় থেকে চুপিচুপি পায়ে হেঁটে শীত আসছে। বিকেলগুলো এখন বাদামী। ধূসর। সিকদার বাড়ির গাছ থেকে পাতা ঝরে। সারা বিকেল রঞ্জু আর আমি চুপচাপ পায়চারি করি। কবে থেকে যেন দুজন দুজনকে এড়াতে থাকি! আমার কেবলী মনে পড়ে, শীত এসে যাচ্ছে, রাত করে আর ছাদে থাকা যাবে না। রঞ্জু বলে, তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।… বলে থেমে যায়। আর কিছু বলে না। চুপ করে থাকি দুজনেই।

অন্নপূর্ণা ডাল মিলের ওপারে সূর্যটা ডুবে যায়। শালিকের ডানার মত সন্ধ্যের রঙ। উত্তরের একটা পারিযায়ী বাতাস বারান্দায় মাহির সখের ডালিয়ার পাতায় মৃদৃ কাঁপন জাগায়। মাহি আজ বিকেলে ঘর থেকে বের হয়নি। সারাটা বিকেল ও ঘুমিয়েছে। কোন কোন বিকেল মাহি এইরকম অচেনা, জটিল। ওকে বুঝতে পারি না।

রঞ্জু বলে, কাল সন্ধ্যেবেলা মাহি বাইরে গিয়েছিল।

-কার সাথে?

-একাই। ওর মা বকছিল খুব। একটা শাড়ি পরেছিল, কার বার্থডে নাকি…

-ও…

-আমি জানি কার বার্থডে…

-কার?

-সৈকত। ওদের কবিতা আবৃত্তির মাস্টার! সৈকতের সঙ্গে মাহি আশুলিয়া গিয়েছিল জানিস?

কোন উত্তর না করে চুপ করে থাকি। রঞ্জু একটু অপেক্ষা করে ফের বলে, তুই আসবি জেনেই ও আজকে ইচ্ছে করে ঘুমাচ্ছে…

-হু…

-এ বাসা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে।

-কেন?

-বাড়িওয়ালা এবাড়ি ভেঙ্গে ফেলবে। নতুন দালান উঠবে। মাহিরাও বাসা ছেড়ে দিচ্ছে…

রঞ্জু চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে দুহাতের উপর মাথার রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর উদাস বিষণ্নতা কি শুধু এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে? নাকি মাহিকে আর দেখতে পাবে না বলে? রঞ্জুর দিকে তাকাতেই রঞ্জু অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নেয়…।

অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে যেতে মনে হলো, এ সিঁড়ি ভেঙ্গে গেলে মাহিকে আর ছুঁতে পারব না! কিন্তু এ সিঁড়ি তো ভেঙ্গে যাবেই। আধুনিক ঝাঁ চকচকে সিঁড়ি হবে। সে সিঁড়ি বেয়ে কি ডালিয়ার পাতায় হেমন্তের বিষণ্ন হাওয়াকে দুলতে দেখা যাবে? কেউ কি বিষণ্ন মনে কোন কোন সন্ধ্যা এমনি নেমে যাবে? আসন্ন হাতুড়ি আর শাবালের আঘাতে ভেঙ্গে যাবে আমাদের গোপন আস্তানা…। নেমে যেতে গিয়ে থেমে পড়ি। অভ্যেস বশে হাত রাখি অন্ধকারে। আঙ্গুলে কাগজ স্পর্শ হয়! মাহি চিঠি রেখে গেছে কখন? দেশলাই জ্বেলে পড়ি, এটাই ছিল মাহির শেষ কথা- আপনি আর এবাড়িতে আসবেন না…।

সময় বড় নির্মম মাহি! সেই অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে সিঁড়িঘরের কথা জানি এ্ জীবনে তুমিও ভুলতে পারবে না। একটা নড়বড়ে রেলিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে একটা আস্ত বিকেলের আক্ষেপ, একটা নিষ্ঠুর ভাতঘুম আর কোনদিন এই পাল্টে যাওয়া আলো ঝলমলে নতুন শহরে আমরা দুজনের কেউ আর খুঁজে পাবো না!

কোনদিন না…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “হেমন্তের ভাতঘুম

  1. সেই অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে
    সেই অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে সিঁড়িঘরের কথা জানি এ্ জীবনে তুমিও ভুলতে পারবে না। একটা নড়বড়ে রেলিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে একটা আস্ত বিকেলের আক্ষেপ, একটা নিষ্ঠুর ভাতঘুম আর কোনদিন এই পাল্টে যাওয়া আলো ঝলমলে নতুন শহরে আমরা দুজনের কেউ আর খুঁজে পাবো না!
    ভালো লেগেছে অনেক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 2