শিশু রাসেল ও অন্যান্য

এই ছেলে, রাস্তাঘাটে মেয়েদের সাথে দুষ্টুমি করো, ঘরে কি মা বোন নাই? ইভটিজার কিংবা যৌন নিপীড়কদের শায়েস্তা করতে অথবা শিক্ষা দিতে এই ডায়লগটা খুব শোনা যায়। অর্থাৎ, ব্যক্তি আক্রমনের মধ্য দিয়ে একটা মানুষকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার একটা চেষ্টা করা হয়। ব্যপারটা কি এরকম যে ঘরে মা-বোন থাকলে ইভটিজারটি যেন ঘরে গিয়ে তাঁর মা-বোনের সাথে যেন ইতরামী করে সেটা বলে দেয়া? না কি মান-বোনের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাস্তার মেয়েটিকে সম্মান করা। নিশ্চয় মা-বোনের কথা স্মরণ করে রাস্তার মেয়েটির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথাই বলা হয়। তাহলে, যার মা-বোন আদতেই নাই, সে কি রাস্তার মা-বোনদের সম্মান করবে না? আসল কথা হলো, ব্যক্তি আক্রমণ নয় মানুষকে মানবিকতা সবক দিতে গেলে প্রয়োজন প্রকৃত শিক্ষা, দরকার মানবতা বোধের বিকাশ।

আমার ৫ ও ৭ বছরের দুটি ছেলে আছে। শুধু দুটি ছেলে আছে বলেই আমাকে অন্যান্য বাচ্চাদের প্রতি সদয় হতে হবে! যদি না থাকত তবে কী আমার দ্বারা অন্যের বাচ্চার প্রতি নির্দয়, নিষ্ঠুর আচরন জায়েজ হয়ে যেতো? মানবতাবোধ কী বলে? আজকে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ রাসেলের জন্মদিন ছিল। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে তাকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আট দশটা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মত তাঁর এই মৃত্যুও কোনভাবেই সমর্থন কিংবা উপহাস যোগ্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে কোন স্বাভাবিক মৃত্যু আমাকে নাড়া দেয় না। হ্যাঁ এতটুকু নিষ্ঠুর আমি। যার সময় হয়েছে সে চলে যাবে, এই নিয়মকে আমি খুব সহজেই মেনে নিতে পারি। তাই বলে যে কোন অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কিভাবে সমর্থন করা যায়, হোক সেটা দশ বছরের শেখ রাসেল কিংবা ষাটোর্ধ বার্ট্রান্ড রাসেল! অকাল কিংবা অস্বাভাবিক মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়।

এমনকি আমি সাজা হিসেবেও মানুষের মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে। একটা মানুষের ভেতরে কখন তাঁর কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার জন্ম হবে, সেটা আমি আপনি জানি না, জানার কথা না। যৌবনে কৃতকর্মের জন্য যদি একটা মানুষ বার্ধক্যে অনুশোচনায় ভোগে, প্রায়শ্চিত্য করতে চায় আমরা তাকে সে সুযোগ না দিয়ে আগেই মৃত্যুদন্ড দিয়ে মেড়ে ফেলব কেন? আর যার পরিবর্তন হবে না তার জন্য তো জেলখানা আছেই। থাক না তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই। জ্বী না, পয়েন্ট টুকবেন না। যুদ্ধাপরাধীরা মানুষ নয়, ওরা স্রেফ জানোয়ার, ঠাণ্ডামাথার খুনি। ওদের জন্য এই মানবতাবোধ নয়। নিদেনপক্ষে ওরা যদি একটিবারের জন্য হলেও কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতো, তবে চিন্তা করা যেত।

যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে আসি। আজকে শেখ রাসেলের জন্মদিনে ফেসবুক ওয়ালে লিখেছিলাম, “শেখ রাসেল। দেশের একমাত্র শিশু যাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর, দেশের আর কোন শিশু অপঘাতে অবহেলায় মাড়া যায়নি, কিংবা খুন হয়নি” । এই স্ট্যাটাসে দলান্ধ, পাচাটা, লোভী এবং সুযোগ সন্ধানী লীগাররা ক্ষিপ্ত হবে, খুব স্বাভাবিক। বরং এই স্ট্যাটাসের কারণে, তারা চাটা চাটি চালিয়ে নেবার জন্য কিছুটা লালা পেয়ে গেল। গালি দিয়ে, কমেন্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাদের প্রভুদের কাছে কিছুটা হলেও নিজেকে জাহির করতে পারছে। কিন্তু, যারা দলান্ধ নন, যারা মানবতাবোধে দীপ্ত, তারাও আজকে আমাকে নসিহত করতে ছাড়েননি। তবে, আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না এই স্ট্যটাসটা কিভাবে ট্রল হলো। এই স্ট্যাটাসে শিশু রাসেলকে কিভাবে হেয় করা হল। এই স্ট্যাটাস কি রাসেলকে খাটো করার জন্য? না কি, যারা রাসেলকে পুঁজি করে তাদের ব্যবসা চালিয়ে নিতে চায় তাদের প্রতি এটি একটি তীক্ষ্ণ বান! আর যদি খাটো হয়েই থাকে, তাহলে কতটুকু? নির্যাতিত শিশুদের কাতারেই তো, এতে তো বরং শিশু রাসেলকে মহিমান্বিতই লাগছে। না কি শেখ পরিবারের ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা রাজন, পায়ুপথে বাতাস দিয়ে হত্যা করা সাগর, অয়নদের সাথে তুলনা করাটা পাপ হয়ে গেছে, অন্যায় হয়ে গেছে!

যারা বলছেন, দশ বছরের শিশুর মৃত্যু নিয়ে ট্রল (যদিও ট্রল কিভাবে হলো ক্লিয়ার না) করাটা ঠিক হয়নি, তাদের প্রতি পালটা প্রশ্ন, বয়োবৃদ্ধের অস্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা পরিণত বয়সের কারও খুন নিয়ে ট্রল কি করা যায়? আমি আগেও বলেছি, স্বাভাবিক মৃত্যু আমাকে নাড়া দেয় না, কিন্তু অস্বাভাবিক মৃত্যু সেটা ষাটোর্ধের হোক কিংবা ছয় বছরের কোন শিশুরই হোক, মেনে নিতে পারি না। এটাই আমার মানবতাবোধের শিক্ষা। হ্যাঁ, এখনও যদি আপনার ঘোর না কাটে তাহলে, আরেকটু ক্লিয়ার করে বলি, শেখ রাসেল যেমন নৃশংসতার শিকার, তেমনি হাজারও শিশু এই স্বাধীন বঙ্গে হাজারবার নৃশংসতার শিকার হয়েছে, হচ্ছে। কতজনের কথা আপনি বলেছেন কিংবা মনে রেখেছেন? শেখ রাসেল বঙ্গবন্ধুর ছেলে বলেই তাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে? না ততটুকু সজনপ্রীতি আমি দেখাতে পারছি না বলে দুঃখিত। আমার কাছে নিজ পরিবারের কেউও আলাদাভাবে মূল্যায়ন পায় না, স্রেফ সমাজের মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করি। আমার বাচ্চাদের আমি লালন-পালন করি আমার পিতৃত্বের দায়িত্ব থেকে। শুধুই আমার বাচ্চা হিসেবে নয়, আমি মনে করি আগামী দিনের সমাজের জন্য একজন সুনাগরিক হিসেবে তাদেরকে গড়ে তোলা আমার একটা দায়িত্ব, এর বেশি কিছু নয়।

যারা শেখ হাসিনার পক্ষ হয়ে বলছেন ভাই হারানো কিংবা সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কি সেটা যারা হারিয়েছে তারাই বুঝতে পারবে, আমার দ্বারা বুঝা সম্ভব নয়। ঠিকই বলেছেন, আমার দ্বারা আসলেই বুঝা সম্ভব নয়। আমি শুধু জানি, শেখ রাসেল যেমন শেখ হাসিনার ভাই ছিল, তেমনি নীলয় নীলেরও একটা বোন আছে, বোন আছে নৃশংসভাবে খুন হওয়া ওয়াশিকুর বাবুরও। জানি না, অভিজিৎ রায়, অনন্ত কিংবা নাজিম উদ্দিন সামাদের বোনেরা ভাই হারানোর কষ্টটা রাসেল হারানোর কষ্ট আপনারা যেভাবে অনুভব করেন সেভাবে করে কী না! শেখ রাসেলের বোন এইসব হত্যাকাণ্ডের সময়ে ভাই হারানোর বেদনা অনুভব কিভাবে করেছিলেন, সেটাও আমার অজানা!

বাদ দেন, নাস্তিকদের কথা। সত্যি সত্যি এই বছরে কতগুলো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে মাড়া গেছে সে পরিসংখ্যানটা কি আপনাদের জানা আছে? জানা আছে সেইসব শিশুদের কোন ভাই কিংবা বোন ছিল কি না? সেইসব শিশুদের কোন অভাগি মা ছিল কি না? সেইসব শিশুদের জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য আপনাদের মত একদল কর্মী আছে কি না? না জানা থাকলে এই পোস্ট আপনাদের জন্য না।

শেষ একটা প্রশ্ন। যারা আজকে আমাকে ধুয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কতটুকু রাসেলকে ভালবেসে ধুয়েছেন? আর কতটুকু লোক দেখানো (নেতাকে দেখানো) এর জন্য ধুয়েছেন? তর্কের খাতিরে উত্তর দেবার দরকার নেই, নিজের বুকে হাত দিয়ে নিজেকেই উত্তর দিন।

[ আরও অনেক কিছু বলার ছিল, তোলা থাকল।]

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “শিশু রাসেল ও অন্যান্য

  1. এখন রাসেল অনুভুতি রক্ষার জন্য
    এখন রাসেল অনুভুতি রক্ষার জন্য আইন করার দাবী করবে দলকানা বলদের দল। দুঃশাসনের ক্ষোভের প্রকাশ যারা বুঝতে পারেনা এরা সবাই দলকানা। এইরকম দলকানারা মুজিব হত্যার পর সব লেজ তুলে পালিয়েছিল। জানাজায় পর্যন্ত মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

    রাসেল স্মৃতি সংসদের নামে দেশব্যাপী চাঁদাবাজির উৎসব করার পর রাসেলকে কেউ পূঁজা করবেনা। ঘৃনাই করবে। রাজাকারের পোলারা যদি ঘৃণার পাত্র হয় চেতনাবাজদের কাছে। তাহলে স্বৈরশাসকের আত্মীয়-স্বজন কেন সমালোচনার পাত্র হবেনা? রাসেলের মৃত্যু অবশ্যই ঘৃনাজনক। কিন্তু রাসেলকে প্রতিদিন বাজারে বিক্রি করে যেসব চেতনাবাজ ধান্ধাবাজি করে তাদের মুখে রাসেল প্রীতি হাস্যকর। রাসেলকে তারাই অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে। রাসেল রাজপরিবারের জন্ম নিয়েছে বলেই তার পুঁজা করা হয়। এই রকম শতশত রাসেল প্রতিদিন নির্যাতিত হচ্ছে। এই রাসেলপ্রেমীরা লাত্থি দিয়ে পেটের রাসেল বের করার সময় রাজপুত রাসেলের চেহারাটা কি তাদের চোখে ভেসে উঠেনা?

  2. চেতনাবাজি করা এক ধরনের ধান্ধা
    চেতনাবাজি করা এক ধরনের ধান্ধা। রাসেলের নামে চান্দাবাজি করে একটু যদি রাসেলপ্রীতি না দেখায় কেমনে হয়। চক্ষু লজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে না?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − 49 =