পৃথিবীর বয়স, বিজ্ঞান এবং ইসলাম

একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন, পৃথিবীর বয়স কত? বিজ্ঞানীরা এর উত্তরে বলেছেন , সূর্য সৃষ্টির প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর পর কতগুলো সংঘর্ষের ফল আমাদের পৃথিবী । অর্থাৎ আজ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর জন্ম । পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভর যোগ্য পদ্ধতির নাম রেডিও একটিভ ডেটিং । বিজ্ঞানিরা এই পদ্ধতির মাধ্যমে পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করেন । এই লেখায় আমরা রেডিও অ্যাক্টিভ ডেটিং ও ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন রেফারেন্সের মাধ্যমে পৃথিবীর বয়স কত তা দেখব।

ডেটিং এর মাধ্যমে পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ঃ পৃথিবীর বয়স নির্ণয়ের মতো একটা অকল্পনীয় কাজকে বাস্তবায়ন করতে মূল ভূমিকা পালন করেছে ইউরেনিয়াম।ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক গঠণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–এটা একটা তেজস্ক্রিয় পদার্থ। এর পরমাণুর ভেতরে থাকা নিউক্লিয়াসগুলো ক্রমাগত রশ্মি বিকিরণ করে সীসাতে রূপান্তরিত হয়। সীসা হলো অতেজস্ক্রিয় স্থিতিশীল মৌলিক পদার্থ। প্রতি সেকেন্ডে রশ্মি বিকিরণের হার ব্যবহার করে একটা গাণিতিক সমীকরণের সাহায্যে ইউরেনিয়ামের অর্ধায়ু নির্ণয় করা হয়। শুধু ইউরেনিয়াম নয়, সকল তেজস্ক্রিয় মৌলের অর্ধায়ু নির্ণয় করা হয় এ প্রক্রিয়ায় । পরীক্ষা করে দেখা গেছে ইউরেনিয়ামের অর্ধায়ু ৪৫০ কোটি বছর। অর্থাৎ এক খণ্ড ইউরেনিয়ামের প্রাথমিক পর্যায়ে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম পরমাণু থাকে, ৪৫০ কোটি বছর পর ঐ খণ্ডতে তার অর্ধেক পরিমাণ ইউরেনিয়াম পরমাণু অবশিষ্ট থাকবে । বাকি অর্ধেক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সীসা’র পরমাণুতে রূপান্তরিত হবে। ধারণা করা হয় মহাবিস্ফোরণ দ্বারা সৌরজগত সৃষ্টির সময় এর সকল গ্রহ নক্ষত্রের সাথে আমাদের পৃথিবী জন্ম লাভ করে। প্রথমে এটা ছিল একটা জলন্ত অগ্নিগোলক। কালের বিবর্তনে তাপ বিকিরণ করতে করতে এক সময় এটা কঠিন রূপ লাভ করে। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে পুরোনো যেসব কঠিন শীলা খণ্ডগুলো পাওয়া গেছে, ধারণা করা হয় তা পৃথিবী সৃষ্টির শুরুর দিকের শিলাখণ্ড। সুতরাং এ সব শীলাখণ্ডগুলোর বয়স পৃথিবীর বয়সের কাছাকাছি। সুতরাং শীলাখণ্ডগুলোর বয়স নির্ণয় করতে পারার অর্থই হলো পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করা। ইউরেনিয়ামযুক্ত কতগুলো প্রাচীন শীলাখণ্ড নিয়ে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, এগুলোতে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম পরমাণু আছে ঠিক সেই পরিমাণ সীসার পরমাণুরও রয়েছে। যেহেতু ইউরেনিয়াম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অনবরত সীসায় পরিণত হয়।

সুতরাং আমরা বলতে পারি শীলাখণ্ডগুলো সৃষ্টির সময় তাতে শুধুমাত্র ইউরেনিয়াম পরমাণু ছিল, কোনো সীসার পরমাণু ছিল না। সময়ের হাত ধরে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বিকিরণ করতে করতে ইউরেনিয়াম পরমাণুগুলোর অর্ধেক সীসায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ শীলাখণ্ডগুলোতে থাকা ইউরেনিয়াম বর্তমানে তার অর্ধায়ুতে অবস্থান করছে। যেহেতু ইউরেনিয়ামের অর্ধায়ু ৪৫০ কোটি বছর। সুতরাং শীলাখণ্ডগুলোর বয়সও ৪৫০ কোটি বছর। আবার শীলাখণ্ডগুলোর বয়স পৃথিবীর বয়সের কাছাকাছি ধরলে পৃথিবীর বয়স ৪৫০ কোটি বছরের কিছু বেশি বলে ধরে নেয়া হয়। সেটা কেউ বলেছেন ৫০০ কোটি বছর কারো মতে ৬০০ কোটি। যেটাই হোক, তা ৪৫০ কোটির চেয়ে খুব বেশি ব্যবধানের তো নয়।

ইসলাম অনুযায়ী প্রথম মানুষের আগমন কত বছর আগেঃ কুরআন অনুযায়ী প্রথম মানুষের নাম আদম (আঃ)। ঠিক কত বছর আগে আদম (আঃ) পৃথিবীতে এসেছিলেন কুরআন ও হাদিসে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই।তবে এক্ষেত্রে আমরা নবীর জীবনী নিয়ে লিখা সিরাতগুলোর সাহায্য নিব। সিরাত গ্রন্থগুলোয় নবির বংশধারা নিয়ে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। এখানে আমরা ৩ ধরনই উল্লেখ করব ।

প্রথম অংশ: ১.হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ২.ইবনু আব্দুল্লাহ, ৩.ইবনু আব্দুল মুত্তালিব, ৪.ইবনু হাশিম, ৫.ইবনু আবদি মান্নাফ, ৬.ইবনু কুসাই, ৭.ইবনু কিলাব, ৮.ইবনু মুররা, ৯.ইবনু কা’ব, ১০.ইবনু লোয়াই, ১১.ইবনু গালিব, ১২.ইবনু ফিহির, ১৩.ইবনু মালিক, ১৪.ইবনু নদর, ১৫.ইবনু কিনানাহ, ১৬.ইবনু খুজাইমাহ, ১৭.ইবনু মুদরিকাহ, ১৮.ইবনু ইলিয়াছ, ১৯.ইবনু মুদার, ২০.ইবনু নিজার, ২১.ইবনু মা’দ, ২২.ইবনু আদনান, আলাইহিমুস সালাম। মোট = ২২ জন। এ সংখ্যা সর্বসম্মত, এ সংখ্যাতে হাফিজ ইবনু কাসির ইজমা নকল করেছেন ।

দ্বিতীয় অংশ: ২৩.ইবনু উদ/উদদ, ২৪.ইবনু হামিসাআ’, ২৫.ইবনু সালমান ২৬.ইবনু আউস, ২৭.ইবনু বুয, ২৮.ইবনু ক্বামওয়াল, ২৯.ইবনু উবাই, ৩০.ইবনু আওয়াম/আবিল আওয়াম, ৩১.ইবনু নাশিদ/নাসিল, ৩২.ইবনু হিযা/হিররা, ৩৩.ইবনু বলদাস, ৩৪.ইবনু ইয়াদলাফ, ৩৫.ইবনু তাবিখ, ৩৬.ইবনু জাহিম, ৩৭.ইবনু নাহিশ, ৩৮.ইবনু মাহি, ৩৯.ইবনু আঈদ, ৪০.ইবনু আবক্বর, ৪১.ইবনু ওবাইদ, ৪২.ইবনু আদ-দিয়া’, ৪৩.ইবনু হামদান, ৪৪.ইবনু সানবার, ৪৫.ইবনু ইয়সরবি, ৪৬.ইবনু ইয়াহযান, ৪৭.ইবনু ইয়ালহান, ৪৮.ইবনু আরআওয়া, ৪৯.ইবনু আঈদ, ৫০.ইবনু জিশান/হাসান, ৫১.ইবনু আইসার/ঈসা, ৫২.ইবনু আফনান/আফতাদ, ৫৩.ইবনু ইহাম, ৫৪.ইবনু মুক্বসির/মুয়াসির, ৫৫.ইবনু নাহিস, ৫৬.ইবনু যারিহ, ৫৭.ইবনু সুমাঈ/সামঈ, ৫৮.ইবনু মাযি, ৫৯.ইবনু আওদাহ, ৬০.ইবনু ইরাম, ৬১.ইবনু ক্বাইজার/ক্বিদার, ৬২.ইবনু ইসমাঈল, ৬৩.ইবনু ইবরাহিম আলাইহিমুস সালাম। মোট = ৪১ জন।
বর্ণিত অংশে নবির পূর্বপুরুষের সংখ্যা নিয়ে সিরাত বিশারদগণ মতবিরোধ করেছেন, হাফিজ ইবনু কাসির বলেন, অধিকাংশের মত হল- এ অংশে ৪০ জন আছেন, আল্লামা সুহায়লি অনেক ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমানের মাধ্যমে তা প্রমান করেন। কারো মতে- ৭/৯/১৫ জনও আছে । কিন্তু আর-রাহিকুল মাখতুম গ্রন্থাকার ৪১ ও ‘নূরে নবী’ গ্রন্থাকার সাত জন বাড়িয়ে ৪৮ জনের নাম উল্লেখ করেছেন।

তৃতীয় অংশ: ইবরাহিম ৬৪.ইবনু তারিহ/ তারিখ, ৬৫.ইবনু নাহুর, ৬৬.ইবনু সারুউ/ সারুগ, ৬৭.ইবনু রাউ, ৬৮.ইবনু ফালাখ, ৬৯.ইবনু আইবার, ৭০.ইবনু শালিখ, ৭১.ইবনু আরফাখশাদ, ৭২.ইবনু সাম, ৭৩.ইবনু নূহ, ৭৪.ইবনু লামিক/লমক, ৭৫.ইবনু মাতুয়াশলাখা, ৭৬.ইবনু আখনুখ/ইদরিস, ৭৭.ইবনু ইয়ার্দ, ৭৮.ইবনু মাহলাঈল, ৭৯.ইবনু ক্বায়নান, ৮০.ইবনু আ’নুশ, ৮১.ইবনু শিছ, ৮২.ইবনু আদম আলাইহিমুস সালাম। মোট = ১৯ জন।
মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে এবং ইব্রাহিম ( আঃ) এর জন্ম খ্রিষ্টাব্দ পূর্ব ১৮০০ অব্দে । উল্লেখিত ধারা অনুসারে খ্রীষ্টপূর্ব ১৮০০ অব্দের পূর্বে মাত্র ১৯ নম্বর পূর্বপুরুষেরর বয়স গননা করলে আদম (আ) এর জন্মসাল জানা যাবে।আহমদিয়া মুসলীম স্কলারদের হিসেব মতে আদম (আ) এর জন্ম নবী মুহাম্মদের জন্মের ৪৫৯৮ বছর পর।অর্থাৎ আজ থেকে ১৪৪৬+৪৫৯৮= ৬০৪৪ বছর আগে হযরত আদম (আ) এর জন্ম।

পৃথিবী সৃষ্টিঃ “যারা কুফরী করে তারা কি ভেবে দেখে না যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলাম পানি হতে, তবুও কি তারা বিশ্বাস করবে না?- সুরা আল আম্বিয়া,৩০
“আমরা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে, আমাদেরকে “কোন ক্লান্তি স্পর্শ করে নাই।- সুরা কাফফ,৩৮
“তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেন, অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন। তিনি সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন।”- সুরা ইউনুস,৩

বিখ্যাত তাফসীরকারক ইবনে কাছির তার ” আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ” গ্রন্থে ১ম খন্ড সৃষ্টি অধ্যায়ে এ আয়াত নিয়ে আলোকপাত করেছেন।তার বর্ননা মতে, মুফাসসিরগন এই আয়াতের ব্যাপারে দুটি অভিমত দিয়েছেন।একটি হল এই দিনগুলো সাধারন দিনের ন্যায়।অপরটি হল প্রতিটি দিন হাজার বছরের সমান।তিনি উল্লেখ করেছেন, ইবনে আব্বাস,মুজাহিদ, কাব আহবার, ইবনে হাম্বল,ইবনে জারীর ১০০০ বছরের সমানকে মেনে নিয়েছেন।অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী এবং এদের মধ্যবর্তী সব কিছু তৈরিতে আল্লাহ ৬০০০ বছর সময় নিয়েছেন।এ ছয়টি দিবসের নাম আবজাদ,হাও,য়ায,হুত্তী কালমান,সাফাস,কারশাত।
সুতরাং সমগ্র সৃষ্টিতে ব্যয়কৃত সময় ৬০৪৪+ ৬০০০= ১২০৪৪ বছর।


ইয়াওম বিতর্কঃ
অনেক মুসলীম স্কলার ৬ দিনে সৃষ্টির ক্ষেত্রে উপরোক্ত বর্ননার বিপক্ষে যুক্তি হিসেবে “ইয়াওম ” শব্দের অর্থ কাল বা প্রিয়ড অফ টাইম করেছেন।এপ্রশ্নের উত্তর সূরা মা’আরিজের ৪ নং আয়াতে আছে।এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ” তা’রুজুল মালা ইকাতু ওয়ার্রূহু’ ইলাইহি ফী ইয়াওমিং কানা মিক’দা রুহূ খামছীনা আলফা ছানাহ। অর্থ্যাৎ ফিরিশ্তা এবং রূহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে,যাহার পরিমান পার্থিব ৫০ হাজার বছর।” সুতরাং ১ ইয়াওম = ৫০০০০ বছর এবং ৬ ইয়াওম = ৩ লক্ষ বছর।সুতরাং মোট সৃষ্টিতে ব্যয়কৃত সময় ৩ লক্ষ+ ৬০৪৪ = ৩ লক্ষ ৬ হাজার ৪৪ বছর।

“যারা কুফরি করে তারা কি ভেবে দেখে না যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে,অতপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম……. “। সুরা আম্বিয়া, ৩০ নং আয়াত।এ আয়াতে এটা স্পষ্ট যে সৃষ্টির সূচনার সময়ই পৃথিবী তৈরি করা হয়েছে।যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে গননাকৃত পৃথিবীর বয়সের চেয়ে অনেক অনেক কম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 8 =