‘রামপালে অবশ্যই অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ রয়েছে, যে শক্তিকে সামাল দিতে পারছে না সরকার’-সুলতানা কামাল

বিচারহীনতার কারণে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের যখন কোনো প্রতিকার হয় না, তখন সমাজের সর্বত্রই পচন ধরে। অন্যায় করলে পার পাওয়া যায় এবং রাজনীতি, সমাজ সবলের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন এই অধঃপতন আর থামানো যায় না। অর্থাৎ অধীনস্তদের ওপর জুলুম করা যায়, এটি মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার ফলে দুর্বৃত্তরা তাদের দাপট দেখিয়ে যায়।
সম্প্রতি যে কয়জন শিশু ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা কেউই কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্ত ঘরের নয়। প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শিশুরাই এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনকারী জানেন যে, এই নির্যাতন করে তাকে কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে না।
দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন- এই নীতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি নাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমনভাবেই গেড়ে বসেছে যে, অন্যায়কারী ভেবেই নেয় তাকে এই কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। চেয়ারম্যান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। দায়িত্ব পালন করছেন, সুন্দরবন রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে।
সমাজ, রাজনীতি নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হই ‘সাপ্তাহিক’-এর পক্ষ থেকে। বলেন নানা সূচকে রাষ্ট্র, সমাজের অগ্রগতি হলেও মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়ার কারণেই নারী-শিশুর ওপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থাকার কারণেই বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব যাচ্ছে না বলে মত দেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গে বলেন, সরকার বিশেষ শক্তির কাছে মাথানত করেই এই প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সরকার রামপাল থেকে সরে আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। সাপ্তাহিকের পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলাম। সময়ের গুরুত্ব বিবেচনায় ইস্টিশনের পাঠকদের জন্য এখানেও প্রকাশ করা হল।

সায়েম সাবু: সামাজিক অস্থিরতা সর্বত্রই। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণেই এমন অনিশ্চয়তা বলে অনেকে মনে করছেন। আপনার মতামত জানতে চাইব?
সুলতানা কামাল : আজকের যে অস্থিরতা, তার একটি ধারাবাহিক রূপ আছে। ’৭৫ পরবর্তী সুবিধাভোগী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নানাভাবে সেই অস্থিরতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের পর থেকে রাষ্ট্র যে পথে হেঁটেছে, তা অস্থিরতার পথই ছিল সুস্পষ্টভাবে। ওই সময়ের পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামিকরণেরও চেষ্টা হয়।
এই ইসলামিকরণের চেষ্টার অন্যতম কারণ ছিল, যারা ক্ষমতা দখল করেছিল তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে গভীরভাবে ধারণ করার কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিল না। পাকিস্তানের আদলে একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তোলার মধ্যে কোনো তফাৎ দেখেনি। এই শাসকেরা তো মানুষকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের কথাই ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে। গণহত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করেছে। ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত ছিল এবং এর মধ্য দিয়ে জাতির মননে বড় ধস নেমে গেছে, যা থেকে এখনও মানুষ বের হতে পারছে না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব পরিচয় নিয়ে সমান অধিকার ও মর্যাদায় এদেশে বাস করবে। সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হলো রাষ্ট্রের চোখে প্রতিটি মানুষ সমান হবে। কোনো রকম বৈষম্য থাকবে না। যে সমস্ত আইন বা বিধান মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, তা সংবিধান প্রণয়নের পরপরই বাতিল বলে গণ্য হবে বলে সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু আমরা তা এখনও করতে পারিনি।
অন্যদিকে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশের দিকনির্দেশনাই একেবারে বদলে গেল। বদলে যাওয়াই না, একেবারে যেন উল্টে গেল।
সায়েম সাবু : সমালোচকরা বলেন, ’৭৫-এর আগেও বৈষম্য ছিল।
সুলতানা কামাল : ছিল তো অবশ্যই। পাকিস্তান আমলের বৈষম্য দূর করার জন্যই তো বৈষম্যহীন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। এর একটি কাঠামো তৈরির জন্য সংবিধান রচনা করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গেই তা বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়ার মতো জাদু কারও জানা ছিল না।
কিন্তু ’৭৫-এ সেই কাঠামোটা একেবারে ভেঙে দেয়া হলো। আজকের যে অস্থিরতা, তা ওই সময়েরই ধারাবাহিক রূপ।
অনেকেই মনে করেন, ২০১২ সালের পর থেকে যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে সমাজে অস্থিরতা বেড়ে যায়। আমি তা মনে করি না। আগেই বলেছি এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপট বহু আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটের কথা ভুলে গেলে চলবে না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ১৯৭২ সাল থেকেই সক্রিয় ছিল।
এই শক্তি ভিতরে ভিতরে শক্তিমান হয়ে ওঠে। আমরা সেটা লক্ষ্য করতে পারিনি। যে কারণে দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জিয়াউর রহমান শাহ আজিজুর রহমানের মতো ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। কুখ্যাত রাজাকার আব্দুল আলীমকে মন্ত্রী বানিয়েছেন।
তার মানে এই শক্তি সংঘবদ্ধ হতে থাকলেও তা আমাদের দৃষ্টির মধ্যে ছিল না। আমি যখন সরকারের উপদেষ্টা ছিলাম, তখন দেখেছি জামায়াতে ইসলামীর কী প্রভাব। শিক্ষাব্যবস্থা, আমলা, আইন-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্যে সর্বত্রই তাদের ভয়ঙ্কর অনুপ্রবেশ ছিল।
ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্রই তাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সেটা কত গভীরে ঘটেছে, তা মানুষ উপলব্ধিও করতে পারে না।
সায়েম সাবু : কিন্তু ’৭৫-এর পর যারা ক্ষমতায় আসেন, তারাও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
সুলতানা কামাল : হ্যাঁ জিয়াউর রহমানসহ অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেনও বটেই। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন আছে এবং নতুন প্রজন্মকে তা জানানো দরকার। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যদি বাঙালি সেনাবাহিনীকে এমন নিশ্চয়তা দিত যে, তাদের ওপর কোনো আক্রমণ হবে না, তাহলে বাঙালি সেনাবাহিনী দিয়েই বাঙালি নিধন করতে পারত বলেই আমার ধারণা।
সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানার পরেই তারা পাকসেনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে এদের যে কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না সেটা ঐতিহাসিক সত্য। তবে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করি যে, এদের মধ্যে সম্মানিত ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিলেন। তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
সায়েম সাবু : তার মানে সেনাবাহিনীর মধ্যে দেশপ্রেম ছিল না?
সুলতানা কামাল : আমি তা বলছি না। কিন্তু তারা ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচনের কি খবর রেখেছেন?
সায়েম সাবু : কোন চেতনা থেকে আপনার এমন ধারণা?
সুলতানা কামাল : আমি যখন হলিক্রস কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। আমাদের সঙ্গে উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা, আমলাদের মেয়েরাও পড়ত। ১৯৬৫-১৯৬৭ সালের কথা। আমার অধিকাংশ সহপাঠীরাই তখন বলতেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানকে ভাঙতে চাচ্ছেন। বলতেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানের শত্রু। এই আলোচনা তারা কোথা থেকে পেত? অবশ্যই তাদের বাবা-মায়ের মধ্যকার আলোচনা থেকে জেনেছেন। তার মানে তাদের মতে শেখ মুজিব ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং যুদ্ধটা করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে, এমন ধারণা বাঙালি সেনাকর্মকর্তাদের মধ্যেও প্রবল ছিল। আদর্শগত কারণে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সেনাদের অংশ নেয়ার কোনো ঐতিহাসিক কারণ ছিল না। আবেগের কথা নয়, এটি যুক্তির কথা। মনে করিয়ে দিতে চাই, আমি সেই সময়কার সেনাবাহিনীর কথা বলছি। এদের সঙ্গে বর্তমান সেনাবাহিনীর মনমানসিকতার অনেক পার্থক্য আছে বলেই আমি বিশ্বাস করি।
অধিকাংশ সেনা সদস্যের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল শুধু ২৫ শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই সময় মুক্তিযুদ্ধের মহত্তম সময় , তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আসলেই কি মুক্তিযুদ্ধ শুধু এই সময়টুকুই? সেনাবাহিনীর ধারণা ছিল, মুক্তিযুদ্ধে তারাই নেতৃত্ব দিয়েছে। এই সময়ে বঙ্গবন্ধু দেশে ছিলেন না। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দও দেশছাড়া। এতে করে তারা মনে করেছেন মুক্তিযুদ্ধ শুধু তারাই করেছেন। অতএব মুক্তিযুদ্ধের ফসল তো তারাই পাবেন এবং এটিই ছিল তাদের বদ্ধমূল ধারণা।
সায়েম সাবু : কিন্তু যুদ্ধের পরে তো নেতৃত্ব আওয়ামী লীগের কাছেই আসল?
সুলতানা কামাল : মুক্তিযুদ্ধের পর ইস্কাটনে বর্তমান লেডিস ক্লাবে সেক্টর কমান্ডররা বসতেন। সেখান থেকেই তারা অফিস করতেন। পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তখনও তাদের হাতে। প্রশাসন চালাচ্ছেন সেনা নেতৃত্ব। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তারাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পরেই ক্ষমতায় তাদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকল না এবং এটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তারা কোনোভাবেই তা মানতে পারলেন না। তারা ভাবলেন, আমরা দেশ স্বাধীন করলাম, মানুষ আমাদের স্যালুট দেয়। এখন বঙ্গবন্ধুকে আমাদের স্যালুট দিতে হচ্ছে কেন? এই প্রতিক্রিয়া আমি অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করেছি।
সুতরাং ’৭২ থেকেই কিন্তু দ্বন্দ্বের শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর মধ্যে ধারণা এমন হতে থাকল, আওয়ামী লীগ তাদের সঠিক জায়গাটা দিচ্ছে না।
সায়েম সাবু : তাহলে কি এখনও মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে এড্রেস করা হয়নি?
সুলতানা কামাল : এই বিতর্ক জিইয়ে রেখে মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে রাখারই চেষ্টা হয়েছে মাত্র। ধরলাম, বঙ্গবন্ধু দেশ ঠিকমতো চালাতে পারছিলেন না। তাকে হত্যা করে যারা ক্ষমতায় এলেন, তারা কী করলেন! তারা তো রাষ্ট্রের কাঠামোই বদলে দিলেন। তারাও তো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তো তাদের দেশ পরিচালনা করার কথা ছিল। তা করলেন না কেন? সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে একটা সাম্প্রদায়িক চরিত্র আরোপ করে দেশকে আজকের যে জঙ্গিবাদ তার একটা সুবিধাজনক ক্ষেত্র তৈরি করা হলো।
তার মানে এখান থেকেই প্রমাণ হয়ে যায় তারা মুক্তিযোদ্ধা হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তারা তেমনভাবে ধারণ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন জনগণ দেখেছে, তা তাদের মনের মধ্যে ছিল না।
ধারণ না করার আরও একটি কারণ হচ্ছে, এই সেনাবাহিনীর সদস্যরা তো পাকিস্তানের একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েই সামরিক অফিসার হয়েছিলেন। যাদের মনোজগতে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে, ভারতই তোমাদের একমাত্র শত্রু এবং পাকিস্তানকে রক্ষা করাই হচ্ছে তোমাদের একমাত্র কাজ। সাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা এদের মনের গভীরে গেঁথে দেয়া ছিল।
রাষ্ট্র, সমাজ নিয়ে কথা বলতে হলে গোড়ায় যেতে হবে। আর এ কারণেই এত আলাপ করা।
সায়েম সাবু : সমাজের এখনকার চিত্র কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? কোথায় যাচ্ছি আমরা?
সুলতানা কামাল : এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় মেলানো যাবে না।
একদিক থেকে আমরা বেশ ভালো করছি। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নানা কারণেই বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভালো অবস্থান করে নিচ্ছে। বিভিন্নক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেতৃত্ব গোটা বিশ্ব থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে।
উন্নয়নের সূচক নিয়েও অনেকে আশাবাদী। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বারবার বলছেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নানা সূচকেই এগিয়ে। বিশেষ করে ভারতের চেয়েও বাংলাদেশ বেশকিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে।
তবে একই সঙ্গে নানা সূচকে বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্নও আছে। যেমন নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ায় আমাদের অনবরত জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে। সময় গড়াচ্ছে, নির্যাতনের মাত্রাও বাড়ছে। মানবাধিকারের প্রশ্নেও বিব্রতকর পরিস্থিতি অস্বীকার করা যাচ্ছে না। নাগরিক অধিকার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে চলেছে।
সায়েম সাবু : রাষ্ট্র, সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে। এরপরেও নারীর প্রতি এমন সহিংসতার কী কারণ বলে মনে করেন?
সুলতানা কামাল : নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নে সরকার এবং বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কাজ হচ্ছে। বর্তমান সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নারীর উন্নয়নে মৌলিক অঙ্গীকার রয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় তিনি যথেষ্ট আন্তরিক।
তার আন্তরিকতার কারণেই নারীর অধিকার রক্ষায় বেশ কয়েকটি আইন তৈরি হয়েছে। নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে। রাজনীতি, পেশাগত ক্ষেত্রে বড় বড় জায়গায় নারীরা স্বমহিমায় অবস্থান করছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এত কিছুর পরেও কেন নারীর ওপর সহিংসতা হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে পরিবার, সমাজ অথবা রাষ্ট্র চিন্তায় এখনও পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব ভয়ঙ্করভাবে রয়ে গেছে। এই চিন্তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে কাজ হয়নি। তাই ব্যক্তিবিশেষের আন্তরিকতা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমরা শক্তভাবে কিছু করছি বলে দাবি করতে পারছি না।
নারীর অধিকার এবং সচেতনার জন্য নানা সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু একটি পরিবার নারীকে সেই পরিবর্তিত জায়গায় দেখতে তো অভ্যস্ত হয়ে ওঠার প্রমাণ রাখছে না। নারীকে তারা অধস্তন, সমর্পিত ভূমিকায় দেখতেই অভ্যস্ত।
এর ফলে একজন নারী যখন বলছেন, আমি এইভাবে জীবনকে দেখতে চাই না। এইভাবে আমার জীবনকে নিয়ে চিন্তা করছি। আমার জীবন আমি স্বাধীনভাবে যাপন করতে চাই। আমার জীবন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করবে না। তখন পরিবারে অন্য সদস্যরা সেটি মানতে পারছে না। নারী এখন প্রতিবাদ করতে শিখছে। তখন পুরুষতান্ত্রিক পরিবার ও সমাজ নারীর প্রতি সহিংস হয়ে উঠছে। নারীকে থামানোর জন্যই এই সহিংস হয়ে ওঠা।
নারী এগিয়ে আসলেই বলা হয়, নারীরা অনেক বেড়ে গেছে। এ কাজ করছে, ও কাজ করছে। নারী বাইরে যাচ্ছে। অমুকের সঙ্গে কথা বলছে, সময় কাটাচ্ছে নিজের ইচ্ছামতো। ইত্যাদি কথা এখনও নারীকে শুনতে হয়। তার পোশাক, তার চলাফেরা, তার মেলামেশা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে অন্য কেউ।
নির্যাতনের মধ্য দিয়ে নারীকে সাবধান করে দেয়া যে, তাদের মত মেনে চললে সহিংসতার শিকার হবে না। নারীও ক্রমশ নিজেকে সংকুচিত করে নিচ্ছে। নিজেরাই বলছে সেই মতে চললে অফিসে ভালো থাকি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো থাকি। কেউ বিরক্ত করে না। এ কথা তো আমাদের বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে নিজের পছন্দমতো চললেই সহিংসতার শিকার হতে হবে।
সায়েম সাবু : আপনারা কাজ করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। তবুও নারী প্রশ্নে সমাজের কেন এই অধঃপতন?
সুলতানা কামাল : শত বাধা দিয়েও নারীকে যখন ঘরে আটকানো যাচ্ছে না, নারী যখন ক্ষমতা চাইছে, তার অধিকার নিয়ে যখন কথা বলছে, ঠিক তখনই তাকে বেশি করে সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে। নারী তার মত প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেই তাকে হয় এসিড মারছে, নির্যাতন করছে, কোপাচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে।
সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজার মতামত ছাত্রলীগকর্মী গ্রহণ করতে পারল না বলেই এমন নির্যাতন হলো। নারী না বলবে! এটি কখনো হতে পারে না। নারী সব কাজে শুধুই হ্যাঁ বলে যাবে। তার না বলার কোনো অধিকার নেই।
সমাজে নারীর জীবনের চাইতে পুরুষের অহং অনেক বড়। খাদিজা না বলায় বদরুল তার বন্ধু বা পরিচিতদের কাছে ছোট হতে পারে- এই শঙ্কায় তাকে এমনভাবে কুপিয়ে যখম করল। হত্যার চেষ্টা চালাল।
সায়েম সাবু : এর শেষ কোথায়?
সুলতানা কামাল : সমাজের এই চিত্র দ্রুত পাল্টাবে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। বেগম রোকেয়া, আমার মা সুফিয়া কামাল, লীলা নাগ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ইলা মিত্র, হেনা দাস, দৌলতুন্নেছা খাতুন, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ, নূর জাহান বেগমরা বহুকাল ধরে সমাজের এই চিত্র বদলানোর কথা বলে গেছেন। সেজন্য যার যার অবস্থান থেকে অনন্য অবদানও রেখেছেন।
তারা বারবার বলে গেছেন, নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান এবং অধিকারটুকু দেয়া হোক। বেগম রোকেয়া বলে গেছেন, ‘ভগিনীগণ বুক ঠুকিয়ে বল, আমরাও মানুষ’। সুফিয়া কামাল বলেছেন, ‘মানবাধিকারে যদি নারীর অধিকার না দেয়া হয়, তাহলে সেই মানবাধিকার পূর্ণতা পাবে না।’ ১৯৮৯ সাল থেকে সুফিয়া কামাল এই বিষয়টি বলে এসেছেন। আর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার নারীর অধিকার এই কথার স্বীকৃতি দিয়েছে। নারী নিজে তার অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন হয়েছে। অধিকার দাবি করছে, ভোগ করতে চাইছে। অধিকার লঙ্ঘন হলে প্রতিবাদী হয়েছে। তাদের মন মানসিকতা, চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান নারী আন্দোলন বা মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মীরাও প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে।
কিন্তু সমষ্টিগতভাবে সমাজ এই চিন্তা ধারণ করতে পারেনি। দেশ যেমন বৈষম্যহীন আকাক্সক্ষার পথে চলেনি, তেমনি আইনগতভাবে নারীকে অধিকারহীন করে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে নারী নিয়ন্ত্রিত হয় ধর্মাশ্রয়ী পারিবারিক আইন দ্বারা। আর প্রতিটি ধর্মেই নারীর প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। এই বিষয়গুলোতে রাষ্ট্র, সমাজ কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আনতে পারেনি।
সাপ্তাহিক : নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপনার পরামর্শ কী?
সুলতানা কামাল : এটি আসলে পরামর্শের বিষয় নয়। এটি বোধের বিষয়। যেমন ব্যক্তি-মানসে, পরিবারে, সমাজে তেমনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই বোধ থাকতে হবে।
আগে ভাবতে হবে কেন আমাদের নারীর সমধিকারের আইনটি প্রণয়ন করতে পারা যাচ্ছে না বা করা হচ্ছে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এরপরেও কেন তিনি পারছেন না?
ধর্ম আশ্রিত পুরুষতান্ত্রিক শক্তির কারণেই সম্ভব হচ্ছে না। ইসলাম ধর্মের পুরুষেরা মনে করছেন, নারীকে সমান অধিকার দেয়া যাবে না। হিন্দু ধর্মে তো নারীর কোনো অধিকারই নেই। হিন্দুদের বিয়ে নিবন্ধনটাই বাধ্যতামূলক করতে পারা গেল না। এতে করে হিন্দু নারীরা স্বামীর কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না। বিয়ে নিবন্ধন না থাকার কারণে তারা এসব ক্ষেত্রে আদালতের আশ্রয় নিয়েও স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে পারছেন না।
সায়েম সাবু : কিন্তু রাজনীতিতে তো নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে?
সুলতানা কামাল : শীর্ষ পদে দুই-একজন নারীকে দেখলেই আপনি সমাজের সার্বিক চিত্র মূল্যায়ন করতে পারবেন না। সরকারের নীতিনির্ধারকরা তো মূলত পুরুষ। তাদের মানসিকতা পুরুষতান্ত্রিকতায় ঘেরা। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নারীরাও সবাই যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতামুক্ত তাও তো নয়। তারা মনে করে, আমি যা করছি সেটাই ঠিক। তার মানে এত কিছুর পরেও আমরা সামগ্রিকভাবে মানসিক দিক থেকে বদলাতে পারি নাই।
সায়েম সাবু : নারীর মতো শিশুরাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে ভয়ঙ্কর চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।
সুলতানা কামাল : বিচারহীনতার কারণে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের যখন কোনো প্রতিকার হয় না, তখন সমাজের সর্বত্রই পচন ধরে। অন্যায় করলে পার পাওয়া যায় এবং রাজনীতি, সমাজ সবলের পক্ষে অবস্থান নেয়, তখন এই অধঃপতন আর থামানো যায় না। অর্থাৎ অধীনস্তদের ওপর জুলুম করা যায়, এটি মানসিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তার ফলে দুর্বৃত্তরা তাদের দাপট দেখিয়ে যায়।
সম্প্রতি যে কয়জন শিশু ভয়ঙ্কর নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা কেউই কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্ত ঘরের নয়। প্রান্তিক অবস্থানে থাকা শিশুরাই এসব নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনকারী জানেন যে, এই নির্যাতন করে তাকে কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে না।
দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন- এই নীতি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি নাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এমনভাবেই গেড়ে বসেছে যে, অন্যায়কারী ভেবেই নেয় তাকে এই কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না।
সায়েম সাবু : বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য রাজনীতিকে কতটুকু দায়ী করবেন?
সুলতানা কামাল : অবশ্যই রাজনীতিই প্রধানত দায়ী। রাজনীতির যে আবহ রয়েছে, তা অন্যায়কে আরও উসকে দেয়।
এমন রাজনীতি তাদের দেখতে হচ্ছে যে, নারায়ণগঞ্জে সেই নির্যাতিত শিক্ষক বলতে বাধ্য হচ্ছেন তার ওপর কোনো নির্যাতনই হয়নি। সেখানে সাত খুন, ত্বকি হত্যার কোনো বিচার এগোয় না।
মিতু হত্যা, তনু হত্যার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি যে কয়টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তার কয়টির বিচার হয়েছে? নির্যাতনকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সায়েম সাবু : তার মানে রাজনীতি জনদায় থেকে সরে যাওয়ার কারণেই এমনটি হচ্ছে?
সুলতানা কামাল : রাজনীতি তো আর মানুষের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে না। রাজনীতি এখন ব্যক্তি, দল বা পরিবারের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো একটি পরিবার বা ব্যক্তিকে রক্ষা করাই এখনকার রাজনীতি।
জনগণের প্রতি রাজনীতিকদের আর দায় কাজ করে না বরং রাজনীতিকদের বাঁচানোই জনগণের দায় হয়ে গেছে। এ কারণেই মানুষ রাষ্ট্র, রাজনীতির ওপর আর ভরসা পাচ্ছে না।
সায়েম সাবু : এরও তো একটি পরিসমাপ্তি আছে?
সুলতানা কামাল : ব্যক্তি বা পরিবার বিশেষ নয়, রাজনীতি জনগণের হাতে গেলেই মুক্তি মিলবে।
সায়েম সাবু : হত্যা, গুমের প্রতিবাদে সরব আপনারাও। তবুও থামছেই না…
সুলতানা কামাল : বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেললে মানুষ তড়িৎগতিতে সমাধান খোঁজে। রাষ্ট্রই এই ‘শর্টকাট’ শিখিয়ে দিচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্র বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে জনগণও পিটিয়ে মারছে।
রাষ্ট্র মনে করছে, এই অপরাধীকে ছেড়ে দিলে সে আরও বড় অন্যায় করতে পারে। আবার জনগণ মনে করছে, অপরাধীকে ছেড়ে দিলে সে আইনের ফাঁক এবং ক্ষমতার জোরে বেরিয়ে এসে দ্বিগুণ অত্যাচার করতে পারে। উভয়েই নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্র নিজেই আস্থা হারিয়ে ফেলার বার্তা দিচ্ছে। জনগণও হারিয়ে ফেলেছে।
সাপ্তাহিক : রামপাল প্রসঙ্গ। আপনি সুন্দরবন রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিচ্ছে সরকার। কী বলবেন এখন?
সুলতানা কামাল : আপনাকে একটি উদ্ধৃতি দিই। ‘ আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটি করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে যে সুন্দরবনটা রয়েছে, এটি হলো বেরিয়ার। এটি যদি রক্ষা করা না হয়, তাহলে একদিন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ এ পর্যন্ত সমস্ত এরিয়া সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং হাতিয়া, সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার যদি সুন্দরবন শেষ হয়ে যায়, তো সমুদ্র যে ভাঙন সৃষ্টি করবে, সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় আর নাই।’
১৯৭২ সালে ১৬ জুলাই বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে এ কথা বলেছিলেন। এরপর তো আর নতুন কথা থাকতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর যে চেতনা ছিল, তা মনে হয় আমরা হারিয়ে ফেলেছি।
উন্নয়নের নামে সুন্দবনের সর্বনাশ করতে যাচ্ছি। আমরা উন্নয়নবিরোধী নই। আমরাও বিদ্যুৎ চাই। তাই বলে সুন্দরবনকে ধ্বংস করে আমরা বিদ্যুৎ চাইতে পারি না। সুন্দরবনকে রক্ষা করতেই হবে। বিদ্যুৎ যে কোনো উপায়ে উৎপাদন করা যেতেই পারে। কিন্তু যে কোনো উপায়ে সুন্দরবন তৈরি করা যাবে না। লক্ষ লক্ষ বৃক্ষরোপণ করেও না।
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির বক্তব্য একটাই, তা হচ্ছে আমরা কোনোভাবেই সুন্দরবনের ক্ষতি করতে দিতে পারি না। আমরা আশা করি শেষ পর্যন্ত হলেও সরকারের বোধোদয় হবে এবং রামপাল প্রকল্প বাতিল করবে।
সায়েম সাবু : সরকার তো বলছে, সুন্দরবন ঠিক রেখেই এ প্রকল্প হচ্ছে?
সুলতানা কামাল : না। সরকারের পক্ষ থেকে কিন্তু একবারও বলা হয়নি যে সুন্দবনের কোনো ক্ষতি হবে না। সরকার বলছে, যে ক্ষতি হবে তা সর্বোচ্চ কমিয়ে এ প্রকল্প করা হবে।
বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে সম্প্রতি একই পরিবারের পাঁচ জন মারা গেলেন। খবরে প্রকাশ বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে চালের ওপর পড়ে এই দুর্ঘটনার সূত্রপাত। তার যে ছিঁড়ে আছে তা দেখার কেউ নেই। এটা কারও দায়িত্ব নয়। একটি রাষ্ট্রের এই যদি হয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা সেখানে সুন্দবনের ক্ষতি কীভাবে ঠেকানো হবে তা সহজেই অনুমেয়।
যেখানে আমরা বিদ্যুতের তার-ই ঠিকমতো রক্ষা করতে পারি না, সেখানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন সালফার, কার্বন, মার্কারির মতো পদার্থের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুন্দরবন এর বায়ু, পানি, গাছপালা, জীবজন্তুকে রক্ষা করা হবে আমাদের সেটা বিশ্বাস করতে হচ্ছে!
রাজধানীর বুকে হাতিরঝিল। ঝিলের পাড় দিয়ে নাকে কাপড় না দিয়ে যাওয়া যায় না দুর্গন্ধের কারণে। এই ঝিলের পানি পর্যন্ত সরকার শোধন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে পারি নাই। ট্যানারি এখনও সরাতে পারি নাই। এর মধ্যে কী করে বিশ্বাস করি সরকার সুন্দরবন রক্ষা করবে?
সরকার যে প্রযুক্তির কথাই বলুক না কেন, সুন্দরবন রক্ষা করার মতো ব্যবস্থাপনা এখনও গড়ে উঠেনি। তাদের টেন্ডার আমরা অধ্যয়ন করেছি। সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য যে সমস্ত ব্যবস্থার আয়োজন করা একান্ত প্রয়োজন সরকারের টেন্ডারে সে সমস্ত যন্ত্রপাতি, উপায়ের কোনো উল্লেখ নেই। সুন্দরবন ধ্বংস হলেও সরকার বলবে, আমরা চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। যেমনটি বলা হয়, বুড়িগঙ্গা বা হাতিরঝিলের ব্যাপারে অথবা ট্যানারি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে।
আমরা তা হতে দিতে পারি না। যে কোনো মূল্যে আমরা সুন্দরবন রক্ষা করার চেষ্টা করে যাব।
সায়েম সাবু : সুন্দরবন নিয়ে তো সরকারের মধ্যেও এমন ভাবনা কাজ করার কথা?
সুলতানা কামাল : এটিই আমাদের অবাক করে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যখন সুন্দরবন রক্ষা করার ব্যাপারে এত প্রত্যয়ী বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে ২০১৬ সালে এসে তারই কন্যা কী করে এমন প্রকল্প হাতে নিতে পারেন, যা একেবারে তার বিপরীতে চলে যায়। প্রধানমন্ত্রীর তো স্পষ্ট জানার কথা, তার বাবা সুন্দরবনকে কী মূল্য দিয়ে গেছেন। কত অমূল্য মনে করেছেন। সুন্দরবন তার ভাষায়, ‘পয়দা’ করা হয়নিÑ গাছ লাগিয়ে সুন্দরবন তৈরি করা যায় না। এটা নিশ্চয়ই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর না বোঝার কথা না।
ক্ষতি তো অনেক হয়েই গেছে। শেষটুকু রক্ষারও কি চেষ্টা হতে পারে না। আমরা তাই করছি। এর মধ্যে সরকারবিরোধিতার বা সরকারি ভাষায় যে ‘ষড়যন্ত্র’র কথা বলা হচ্ছে তা অবান্তর।
সাপ্তাহিক : এত প্রতিবাদের পরেও সরকার যখন এই প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে, তখন অন্য কোনো শক্তির হিসাব-নিকাশ কাজ করছে কিনা?
সুলতানা কামাল : রামপালে অবশ্যই অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ রয়েছে, যে শক্তিকে সামাল দিতে পারছে না সরকার। আমাদের এ কথা মনে না করার কোনো কারণ নেই, এখানে বিশেষ কোনো পক্ষের স্বার্থ কাজ করছে না, যে শক্তিকে মোকাবিলা করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে।
কারণ, আমাদের দাবি সরকারের না বোঝার কথা নয়। এখানেই বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে হবে কেন? অন্য কোথাও করলে কী সমস্যা, কার স্বার্থ রক্ষা করতে এটি করা, তা নিয়েই আমাদের প্রশ্ন।
সায়েম সাবু : সুন্দরবন রক্ষার এই আন্দোলন নিয়ে শেষ পর্যন্ত কতটুকু আশাবাদী?
সুলতানা কামাল : আমরা যারা জনস্বার্থ নিয়ে আন্দোলন করি, তাদের শেষ পর্যন্ত আশা নিয়েই এগুতে হয়। আশা ছেড়ে দিলে তো আর আন্দোলন হয় না। আমরা যে কোনো মূল্যে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। সরকার এটি বুঝতে পারলেই ভালো। তাহলে ক্ষতি কমানো সম্ভব।
সায়েম সাবু : প্রশ্ন উঠছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও?
সুলতানা কামাল : আমরা আগে জেনেছি, রাশিয়া রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য নিয়ে শোধন করে, তা ফেরত পাঠাবে। এখন শুনছি, রাশিয়া বর্জ্য নেবে না।
যদি রাশিয়া বর্জ্য নিতে না চায়, তাহলে বাংলাদেশ সরকার সে চুক্তি করতে রাজি হলো কেন? আর যদি রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করে তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারের শক্ত অবস্থানে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশের স্পষ্ট বলে দেয়া উচিত যে, আমরা এই প্রকল্প করব না। কারণ এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ শতভাগ ব্যর্থ হবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
সায়েম সাবু : রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আরেক নেতা অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
সুলতানা কামাল : এই হুমকিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে আশ্চর্য হইনি। আমরা যারা এই ধরনের আন্দোলন করে আসছি, তাদের এমন হুমকি মোকাবিলা করতেই হয়।
হুমকি অবশ্যই উদ্বেগের কারণ, তবে এর মধ্য দিয়ে আন্দোলন দমানো যাবে না।
সায়েম সাবু : হুমকির পেছনের শক্তির ব্যাপারে কোনো সন্দেহ হয়?
সুলতানা কামাল : আন্দোলন দমাতেই এমন কিছু হতে পারে বলে মনে করি। তবে সরকারের উচিত দ্রুত এর তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করা। এখন প্রযুক্তির যুগ। সরকার চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই হুমকিদাতাকে বের করতে পারে।
সরকারের উচিত দ্রুত হুমকিদাতাকে খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করা। প্রতিটি নাগরিককে সুরক্ষা দেয়া। দুঃখের বিষয় সুরক্ষা পাওয়া না পাওয়া এখন আর রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার পরিচয় রাখতে পারছে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “‘রামপালে অবশ্যই অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ রয়েছে, যে শক্তিকে সামাল দিতে পারছে না সরকার’-সুলতানা কামাল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 + = 37