বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস: বানর আর ক্যাঙ্গারুর মাঝে রেখা অঙ্কন ( প্রথম পর্ব)


(ছবি: লণ্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রাঙ্গনে উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা প্রকৃতি বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস স্মারক ভাস্কর্য। সাত ফুট লম্বা এই ব্রোন্জ ভাষ্কর্যটির শিল্পী অ্যান্হনী স্মিথ। ২০১৩ সালে ৭ নভেম্বর ডেভিড অ্যাটেনবরো এটি উন্মোচন করেছিলেন)

‘All truth is easy to understand once they are discovered; the point is to discover them.’ Galileo Galilei

(ভূমিকা: মূলত শন বি ক্যারল এর Great Minds Think Alike: How Alfred Wallace came to share Darwin’s revolutionary insights অবলম্বনে এটি লেখা । লেখাটির একটি সম্পাদিত সংস্করণ,২০১১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী মুক্তমনা ব্লগে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংস্করণটি আরেকটু পরিবর্ধিত করা হয়েছে শন বি ক্যারল এর Remarkable Creatures: Epic Adventures In The Search For The Origins of Species এর তৃতীয় অধ্যায় Drawing the lines between Monkeys and Kangaroos, এডওয়ার্ড লারসনের Evolution: The Remarkable History of a Scientific Theory ও মাইকেল শেরমারের In Darwin’s Shadow) বইগুলো থেকে তথ্য নিয়ে)

সমান্তরাল পথে:

গত দুই শত বছরে প্রজাতির উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধান অনুপ্রাণিত করেছিল বহু অসাধারণ বৈজ্ঞানিক অভিযান। পুরো ২০০৯ সাল জুড়ে চার্লস ডারউইনের দুইশততম জন্মবার্ষিকীতে সারা পৃথিবী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছিল পৃথিবীর অন্যতম সেরা প্রকৃতিবিজ্ঞানী আর সুদূরপ্রসারী এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের নেতা ডারউইনের অবদান। ডারউইনের বিখ্যাত সমুদ্রযাত্রা আর তার গবেষণা অতি সুপরিচিত, আর তা অত্যন্ত সঙ্গত কারণে, পরিচিত হওয়াটাই উচিৎ। কিন্তু বিবর্তন তত্ত্বের সূচনা, শুরুর দিকে এর ক্রমবিকাশ আর গ্রহনযোগ্যতার জন্য আমরা কিন্তু আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এর কাছেও অনেকাংশে ঋণী। আরো অনেকবেশী কঠিন ‍অবস্থার মধ্য দিয়ে ওয়ালেস দুটি সূদীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন এবং স্বতন্ত্রভাবে তিনিও প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে ডারউইনের মত একই ধরনের ‍উপসংহারে পৌছে ছিলেন। এই পর্বটি আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে নিয়ে।


(ছবিঃ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (বায়ে)বিবর্তন কেমন করে কাজ করছে সে বিষয়েই শুধুমাত্র ডারউইনের মত একই উপসংহারেই পৌছাননি,এমনকি তিনি একই বাক্য ব্যবহার করেছিলেন তার তত্ত্বাটকে ব্যাখ্যা করতে।)

ওয়ালেসের নাটকীয় কাহিনী আর বৈজ্ঞানিক অবদানগুলোর পরিচিতি সাধারণত অনেক কম। লেখক সি ডব্লিউ সেরাম তার অভিযানকে ব্যাখা করেছিলেন ‘কর্ম আর প্রাণশক্তির একটা ‍মিশ্রন’ হিসাবে, আর আলফ্রেড ওয়ালেসের অভিযান ছাড়া আর কোনো প্রকৃতিবিজ্ঞানীরই অভিজ্ঞতাকে এটি সঠিক সংজ্ঞায়িত করতে পারবে না। তাঁর কিছু উল্লেখযোগ্য অভিযান ‍আর আবিষ্কারের কথা, যেমন কিভাবে তিনি সম্পুর্ন স্বাধীনভাবে ডারউইনের মত একই সিদ্ধান্তে পৌছান আর এছাড়াও কেমন করে এই দুই মহান প্রকৃতিবিজ্ঞানীর মধ্যে উষ্ণ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, নীচের কয়েকটি পরিচ্ছদ হলো সেই অসাধারণ কাহিনীরই বিবরণ।

ওয়ালেস ও ডারউইন, দুজনই খুব ভিন্ন ছিলেন সামাজিক অবস্থানে, পারিবারিক পরিচিতি আর তাদের মানসিকতায়। কিন্তু তাদের মধ্যে মিলগুলোও ছিল বিস্ময়কর। গ্রামের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহন করেছিলেন ওয়ালেস, নিজেই নিজেকে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, আর অন্যদিকে সেই সময়ে পয়সা দিয়ে কেনা সম্ভব সেরা সব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই ডারউইন পেয়েছিলেন। দুজনেই প্রকৃতি বিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ঠ হয়েছিলেন অল্প বয়সেই, শখ হিসাবে শুরু করা এই আগ্রহটি দুজনেই রুপান্তর করেছিলেন তাদের পেশায়। দুজনেই চেয়েছিলেন ইংল্যাণ্ড থেকে বের হতে আর ক্রান্তীয় অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে নানা প্রজাতির প্রাণি ও উদ্ভিদ সংগ্রহ করে বিখ্যাত হতে। দুজনেই সেটা করেছিলেন তাদের তরুন বয়সে, ডারউইন যখন এইচ এম এস বিগলে ওঠেন তখন তার বয়স ছিল ২২ বছর এবং ওয়ালেস প্রথম ইংল্যান্ড ছেড়ে বের হন তখন তার ২৫ বছর, সর্বোপরি দুজনের সবচেয়ে বড় মিল ছিল, তারা দুজনই ছিলেন বিপুল পরিমানে প্রজাতির নমুনা সংগ্রহে ছিলেন দক্ষ এবং এই নমুনা সংগ্রহ করার মাধ্যমেই তাঁরা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন প্রত্যেকটি প্রজাতিই কত বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্রময় আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হতে পারে। আর কষ্টার্জিত এই জ্ঞানের মাধ্যমেই তারা নমুনা সংগ্রাহক থেকে হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী, তারা শুধুমাত্র জানতে চাননি, কোনো একটা নির্দিষ্ট স্থানে কত ধরনের প্রাণি প্রজাতি বসবাস করে বরং তারা জানতে চেয়েছিলেন ‍কিভাবে তাদের সৃষ্টি হলো সেই নির্দিষ্ট জায়গায় । আর এই প্রশ্নগুলোই তাদের দুজনকই পৃথকভাবে নিয়ে যায় ‍অনন্য এবং যৌথ এক বৈপ্লবিক আবিষ্কারের পথে।

সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক স্বচ্ছলতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে পুজি করে ডারউইন নির্বাচিত হয়েছিলেন বিগল অভিযানের জন্য ও পরে স্বাধীন বিজ্ঞানী হিসাবে স্বচ্ছল জীবনে স্থিতিশীল হয়েছিলেন। তাকে কখনোই জীবিকা অর্জন করতে কাজ করতে হয়নি। ১৮৪৮ থেকে ১৮৬২ ওয়ালেস দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বেসিনে নমুনা সংগ্রহের অভিযানে গিয়েছিলেন প্রকৃতি বিজ্ঞানী বন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর সাথে, তারপর তিনি পাড়ি জমান মালয় দীপপুঞ্জে; সমুদ্র যাত্রার জন্য তার নিজেকেই অর্থের যোগান করতে হয়েছিল, পশুর চামড়া, কীটপতঙ্গ আর উদ্ভিদের নমুন বৃটিশ সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। সমুদ্রযাত্রার জন্য তাকে ব্যবহার করতে হয়েছিল বাণিজ্যিক জাহাজগুলো, এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে তিনি যে জাহাজ পেয়েছিলেন সেটাই ধরেছিলেন। স্হানীয় গাইডদের ব্যবহার করে তিনি এমন সব এলাকায় অভিযান করেছিলেন যেখানে ইউরোপীয়রা এর আগে কখনো যায়নি। ডারউইনের ব্যতিক্রম ওয়ালেস খুব সহজে আদিবাসীদের সাথে মিশে যেতে পেরেছিলেন, তিনি বরং ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের সঙ্গ এড়িয়ে চলতেন। দুজনেই বৈজ্ঞানিক সমাজের নজর কেড়েছিলেন তাদের সংগ্রহ করা নমুনা ইংল্যাণ্ডে পাঠিয়ে, নিজেদের খ্যাতিকে সংহত করেছিলেন তাদের অভিযানের ভ্রমন কাহিনী লিখে। প্রজাতিরা বিবর্তিত হচ্ছে এমন একটি ধারণা সম্বলিত ট্রান্সমিউটেশন হাইপোথিসিস তখন ইউরোপে বিতর্কের ঝড় তুলেছিল, বৈপ্লবিক এই ধারণাটি উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে খুব বিজ্ঞানী গ্রহন করতে পেরেছিলেন। কারণ এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল রাজনীতি, ধর্ম ও বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক ধারণাগুলোকে আলিঙ্গন করা। সহজাতভাবে ওয়ালেস সবকিছু বিবর্তিত হয় এই ধারণাটিকে গ্রহন করে নিয়েছিলেন, তিনি তার নমুন সংগ্রহ করার এলাকার পরিধি বাড়িয়েছিলেন আংশিকভাবে সেই হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করার জন্য, বিবর্তনীয় ভৌগলিক বিস্তারে একই রকম বা কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিরা পাশাপাশি এলাকায় বসবাস করবে, তিনি ভেবেছিলেন বিবর্তনের স্বপক্ষে সেটি বেশ শক্তিশালী প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।

চিন্তায় তার চেয়ে অনেক বেশী রক্ষণশীল ডারউইন ঘটনাচক্রে প্রজাতিদের ঠিক সেকরমই একটি প্যাটার্ণ লক্ষ্য করেন ১৮৩৫ সালে গালাপাগোসে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি উপসংহারে পৌছান এই সব প্রজাতিগুলো বিবর্তিত হয়েছে কোনো একক পূর্বসূরি প্রজাতি থেকে। একবার যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এমন কিছু ঘটছে, তিনি ওয়ালেসের চেয়ে বেশী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন এর মূল প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য এবং তিনি দুই দশক ধরে নানা ভাবে তার তত্ত্বটিকে পরীক্ষা করে দেখার প্রচেষ্টা করেন। প্রজাতিদের ভৌগলিক বিস্তার নিয়ে দুজনের একই রকম আগ্রহ থেকে ওয়ালেসের সাথে ডারউইনের পত্র যোগাযোগ শুরু হয় ১৮৫৫ সালে, কিন্তু বিবর্তনকে চালিত করার শক্তিটি কি জানার জন্য তাদের তীব্র আগ্রহের কথা শুরুর দিকে তারা একে অপরকে বলেননি। আর তারা দুজনেই তাদের উত্তর খুজে পান ম্যালথাসের রচনায়। ডারউইনের ভাবনায় সেটি এসেছিল ডাউন হাউসে স্বাচ্ছন্দময় বৈঠকখানায় আর ওয়ালেসকে ধারণাটি স্পর্শ করেছিল, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার হালমাহেরা দ্বীপের দোদিঙ্গা নামের একটি গ্রামে আদিবাসীদের কুটিরে শুয়ে ম্যালেরিয়ার তীব্র জ্বরে ভোগার সময়। ম্যালথাসে পপুলেশন লিমিটের ধারণাটিকে উদ্ভিদ ও প্রাণিদের উপর প্রয়োগ করে তারা দুজনেই স্বতন্ত্রভাবে অনুধাবন করেছিলেন যএই প্রক্রিয়াটি পূর্ববর্তী কোনো প্রজাতি থেকে নতুন প্রজাতির জন্ম দিতে পারে উপকারী প্রকরণসহ সদস্যদের বাঁচার ও প্রজনন করার সুযোগ দিয়ে।

কঠোর শৈশব:

ওয়ালেস জন্মগ্রহন করেছিলেন মনমুথশায়ারের উস্ক এর কাছে কেনসিংটন কটেজে ( বতর্মানে এটি ওয়েলস এর অংশ) ১৮২৩ সালে ৮ জানুয়ারী। এর কয়েক বছর আগেই বাবা থমাস ও মা ম্যারি আন ওয়ালেস ক্রমশ দৈন্যতায় আক্রান্ত তাদের মধ্যবিত্ত পরিবারটি নিয়ে লণ্ডন থেকে কেনসিংটন কটেজে এসে বসতি গড়েন খরচ কমানোর আশায়। তাদের নয়টি সন্তানের মধ্যে ওয়ালেস ছিলেন অষ্টম। পরিবারটি আবার হার্টফোর্ডে এসে বসতি গড়ে যখন ওয়ালেসের বয়স পাঁচ, এখানকার হেল’স গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৩৫ সালে পরিবারটি তাদের শেষ সম্পদ হারিয়ে ফেলে প্রতারকের খপ্পরে পড়ে, ১৮৩৭ সালে তিনি স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। ১৪ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে তিনি লণ্ডনে আসেন তার ভাই জনের সাথে থাকার জন্য, জন তখন কাঠ মিস্ত্রী হিসাবে কাজ করছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি বেশী দিন থাকতে পারেননি, লণ্ডন ছেড়ে তিনি তার সবচেয়ে বড় ভাই উইলিয়ামের কাছে আসেন বেডফোর্ডশায়ারে।

উইলিয়াম ভূমি জরিপের কাজ করতেন। পরের সাড়ে ছয় বছর ওয়ালেস ভূমি জরিপের কাজের জন্য দক্ষিণ ইংল্যাণ্ড আর ওয়েলস এর নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। ১৮৪১ সালের হেমন্তে ওয়েলসের নিয়াথে আসার পর প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্বন্ধে তার সত্যিকারের একটি আগ্রহের জন্ম হয়। কারণ ভূমি জরিপের সময় তিনি যে উদ্ভিদ প্রজাতিগুলো দেখতে তাদের শনাক্ত করতে চাইতেন। এভাবেই তিনি প্রথম উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৩ সাল নাগাদ ভূমি জরিপের কাজের বেশ মন্দা থাকায় তাকে সেই চাকরীও ছাড়তে হয়। পরে লিস্টারের একটি স্কুলে তিনি অংক, জরিপের শিক্ষক হিসাবে চাকরী পান । লিস্টারে খুব ভালো একটি লাইব্রেরী ছিল, সেখানেই প্রকৃতি বিজ্ঞানের নানা বইগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এই লাইব্রেরীতে প্রকৃতি বিজ্ঞানী হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর সাথেও তার দেখা হয়েছিল ( পরে সহযোগী বন্ধু ছিলেন তিনি আজীবন), যিনি প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করার ব্যপারে ওয়ালেসের উৎসাহের আগুনটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ওয়ালেস বিস্মিত হয়েছিলেন শহরের দশ কিলোমিটারের মধ্যে এক হাজারেরও বেশী বীটল প্রজাতি দেখে।


(ছবি: হেনরী ওয়াল্টার বেট (১৮২৫-১৮৯২) ইংরেজ প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী তিনি প্রথম প্রাণিদের মধ্যে mimicry ( বা অনুকরণ, যেখানে একটি প্রজাতির প্রাণি অন্য একটি প্রজাতির প্রাণির মত রুপ নেয় প্রাকৃতিক নির্বাচনের সুবিধা নেবার জন্য) । তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন ওয়ালেস এর সাথে আমাজন অভিযানের জন্য। ১৮৫২ সালে ফেরার পথে ওয়ালেস সব নমুনা হারালেও বেটস এর ভাগ্য ছিল। তিনি ফিরেছিলেন ১১ বছর পর, প্রায় পনেরো হাজার প্রজাতি তিনি লণ্ডনে পাঠিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৮০০০ ছিল বিজ্ঞানের জন্য নতুন। The Naturalist on the River Amazons নামের একটি জনপ্রিয় বইও লিখেছিলেন।)

১৮৪৫ এ তিনি প্রথম রবার্ট চেম্বার্স এর Vestiges of the Natural History of Creation বইটি পড়েন, তিনি বিবর্তনের ধারণায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন ( সেই সময় ধারণাটি পরিচিত ছিল ট্রান্সমিউটেশন নামে); A Voyage Up the River Amazon নামের একটি বই তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল বন্ধু বেটসকে ব্রাজিল অভিযানে যাওয়ার প্রস্তাব করার জন্য। উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও বিক্রয়ের জন্য তারা নানা প্রাণি ও উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করবেন। ওয়ালেসের জন্য আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিবর্তনের পক্ষে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করবেন, চেষ্টা করবেন বুঝতে প্রক্রিয়াটি কি। ১৮৪৮ সালে ২৫ বছরের ওয়ালেস আর ২৩ বছরের বেটস লিভারপুল থেকে পারা (এখন বেলেম) অভিমূখে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে একসাথে কাজ শুরু করলে, মতানৈক্যের কারণে দুজন দুদিকে যাত্রা শুরু করেন। ওয়ালেস মূলত ছিলেন মধ্য আমাজন ও রিও নেগরো এলাকায়, যেখানে তিনি তার ভূমি জরিপের কৌশল ব্যবহার করে একটি ম্যাপও তৈরি করেন। কয়েক বছর পর এই ম্যাপটি প্রকাশ করেছিল Royal Geographical Society, বহু বছর ধরে এই এলাকার এটাই ছিল সবচেয়ে নিঁখুত ম্যাপ।


ছবি: ওয়ালেসের আঁকা রিও নেগরো নদীর ম্যাপ, ১৮৫৩ সালে এটি প্রকাশিত হয়েছিল)

গভীর আমাজনে:

১৮৪৭ সালে ওয়ালেস তার বন্ধু এবং নমুনা সংগ্রাহক হেনরী ওয়াল্টার বেটসকে প্রস্তাব দেন আমাজনে অভিযানের জন্য। তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতি বিজ্ঞানের তার একটি নিজস্ব সংগ্রহশালা গড়ে তোলা। কিন্তু সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক আলোচনার বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধেও ওয়ালেসের ভালো ধারণা ছিল। ডারউইন যেমন তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন কোনো মহান ধারণার বা তত্ত্বের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমান সংগ্রহ করার কোনো প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য ছাড়াই, ওয়ালেস কিন্তু তা করেননি, তিনি বন্ধু বেটসকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এই অভিযানের সময় তারা ‘ প্রজাতির উৎপত্তির সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন’, সমস্যাটি ১৮৪৭ সালের সমসাময়িক সময়ে একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছিল: প্রজাতিরা কি অপরিবর্তনশীল এবং বিশেষভাবে ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট নাকি পরিবর্তনশীল এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট ?


(ছবি: ১৮৪৮ সালে তরুণ ওয়ালেস , ব্রাজিলের উদ্দেশ্যে যাত্রার করার সমসাময়িক সময়ে )

ওয়ালেস এবং বেটস দুজনেই ছিলেন স্বশিক্ষিত সৌখিন প্রকৃতিবিজ্ঞানী, যাদের ডারউইনের মত না ছিল কোনো পারিবারিক অর্থসম্পদ, না ‍ছিল বিজ্ঞানীদের কোনো সমিতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো যোগাযোগ কিংবা ব্রিটিশ নৌ-বাহিনীর জাহাজে সংরক্ষিত কোনো জায়গা। আমাজনের দিকে সমুদ্রযাত্রার জন্য তাদের জায়গা নিতে হয় বানিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজে আর তাদের যাতায়াতের খরচ মেটান দুষ্প্রাপ্য বা চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নমুনা বিক্রির জন্য ইংল্যান্ডে পাঠানোর মাধ্যমে।


(ছবি: ১৮৪৭ সালে বেটসকে লেখা তরুণ ওয়ালেসের এর চিঠি, এখানে বিবর্তন সম্বন্ধে তার আগ্রহটির আভাস আমরা পাই। প্রজাতির উৎপত্তি জানার জন্য তার আগ্রহের প্রকাশ। তখন তার বয়স মাত্র ২৪)

১৮৪৮ এর মে মাসে ব্রাজিলের উত্তরপূর্ব ‍উপকুলে পারা’তে এসে পৌছান তারা । কিছুদিন একসাথে (দেড় বছর) বেটস এর সাথে কাজ করার পর আলাদা আলাদা পথে যাত্রা শুরু করেন দুইজন, ওয়ালেস এগিয়ে যান আমাজনের মূল শাখা ধরে, পরে রিও নেগ্রো এবং এর সবচেয়ে বড় শাখা রিও দোস উয়াউপেস ধরে। চার বছরের কষ্টকর আর বিপদসঙ্কুল যাত্রা আর সংগ্রহ শেষে ১৮৫২ সাল নাগাদ আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ২০০০ মাইল ভিতরে নদীর পৌছে যান, এতটা দুরে কোনো ‍ইউরোপীয় এর আগে আসেননি। এই চার বছরের শেষ আড়াই বছর ওয়ালেস কাজ করেছেন একা একা। সাড়ে তিন মাস ইয়োলো ফিভার এ আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে তখন তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। শারীরিক পরিশ্রম, পুষ্টিকর খাবারের অভাব, ক্রাস্তীয় অঞ্চলের অসুখ তাকে এমনটাই কাবু করে ফেলে যে, তিনি শঙ্কিত হয়ে পড়েন, ফিরে না গেলে হয়তো জঙ্গলেই তার মৃত্যু হতে পারে। নদীপথের বিভিন্ন স্থানে তার সংরক্ষিত নমুনা ছাড়াও ওয়ালেসের সাথে ছিল অনেক ধরনের বিচিত্র জীবন্ত প্রাণির একটি বড় ধরনের সংগ্রহ – বানর, ম্যাকাও, প্যারট এবং একটি টোকান, তার আশা ছিল এসব তিনি লন্ডন চিড়িয়াখানায় নিয়ে যেতে পারবেন। এদের দেখাশোনা করতে গিয়ে তার অবশিষ্ট সামান্য শক্তিও প্রায় শেষ প্রান্তে পৌছে যায়। ব্রাজিলে তার সাথে ছোট ভাই হার্বার্টও এসেছিল, রিও নেগরো পর্যন্ত দুই ভাই একসাথেই ছিলেন। কিন্তু এর পরে ওয়ালেস একাই মহাদেশের আরো ভেতরে ঢুকে পড়েন। ১৮৫২ সালে যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনও তিনি জানেন না তার ভাই ইংল্যান্ডগামী জাহাজে ওঠার আগেই মারা গেছেন ইয়েলো ফিভারে আক্রান্ত হয়ে। ওয়ালেস পারার দিকে ফেরার জন্য নদীর মুখের দিকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি লন্ডন অভিমূখী একটি হেলেন নামের একটি জাহাজ খুজে পান । এই জাহাজে ৩৪ টা জীবন্ত প্রানী, আর অনেকগুলো বাক্স ভরা নমুনা আর মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষন আর গবেষণার কাগজপত্র নিয়ে তিনি দেশে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করেন।


(ছবিঃ আমাজনে তার চার বছর থাকাকালীন ওয়ালেস জোগাড় করেন টোকান সহ বিপুল পরিমান জীবন্ত প্রাণি। দুঃখজনকভাবে ইংল্যান্ডে ফেরার পথে তাকে হারাতে হয় সবকিছু )

সমুদ্রে বিপর্যয়

যাত্রা শুরুর প্রায় ৩ সপ্তাহ পর একদিন সকালে খাবার পরপরই বারমুডার প্রায় ৭০০ মাইল পূর্বে, জাহাজের ক্যাপ্টেন ওয়ালেসের কেবিনে এসে তাকে জানান, ‘আমি দুঃখিত, আমার কিছু করার উপায় নেই, জাহাজে আগুন ধরে গেছে, দেখুন আপনি কি করতে পারেন’, ক্যাপ্টেনের সাথে ওয়ালেস মালপত্র রাখার জায়গায় এসে দেখতে পান আগুন ছড়িয়ে পড়েছে অনেকখানি, কুণ্ডলী পাকিয়ে বের হচ্ছে ধোয়া। জাহাজের নাবিকরা ব্যর্থ হয় সেই প্রচণ্ড আগুন নেভাতে, অবশেষে লাইফবোট পানিতে নামানোর নির্দেশ দেন ক্যাপ্টেন, ওয়ালেস তার গরম আর ধোয়া ভরা কেবিনে ঢুকে উদ্ধার করেন একটা ছোট টিনের বাক্স, যার ভেতরে ছিল কিছু কাগজপত্র, কিছু আঁকা ছবি আর একটি ডায়েরী । লাইফবোটে দড়ি ধরে নামার সময় পিছল খেয়ে দড়িতে কেটে যায় তার হাত, সমুদ্রের লোনা পানির ঝাপটা সেই ক্ষতের যন্ত্রণাকে বহুগুন বাড়িয়ে দেয়। লাইফবোটে ওঠার পর টের পান, কোথাও কোনো ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকছে লাইফবোটে। ওয়ালেস চোখের সামনে হেলেনকে পুড়তে আর সেই সাথে তার এত কষ্ট করে সংগ্রহ করা প্রানীদের আর নমুনাগুলো ধ্বংশ হয়ে যেতে দেখেন। (সৌভাগ্যক্রমে ওয়ালেসের এজেন্ট তার সব নমুনার জন্য বীমা করে রেখেছিলেন, কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বীমার পরিমান ছিল খুব কম)।


(ছবি: ১৮৮৬ তার লেখা বইয়ের একটি অলঙ্করণ, হেলেন জাহাজটিতে আগুন জ্বলছে)

মধ্য আটলান্টিকের প্রায় ছিদ্র হওয়া লাইফবোটে শুয়ে খোলা আকাশের নীচে একটার পর একটা অনিশ্চিৎ দিন অতিক্রান্ত হয় ওয়ালেসের।। তৃষ্ণার্ত, সমুদ্রের পানিতে ভেজা, প্রায় সারাক্ষণই লাইফবোটে জমে উঠতে থাকা পানি ক্রমাগত সেঁচায় ভীষণভাবে ক্লান্ত আর তীব্র ক্ষুধার্ত ওয়ালেসের গায়ে সূর্যের প্রখর আলোয় ফোসকা পড়ে যায় । অবশেষে ১০ দিনের মাথায় তাদের উদ্ধার করে জর্ডেসন নামের আরেকটি জাহাজ। উদ্ধারকারী এ‌ই জাহাজে বসে ওয়ালেস, ব্রাজিলে তার এক বন্ধুকে এই দুর্ঘটনা আর ক্ষতির পরিমান ব্যাখ্যা করে একাট চিঠি লেখা শুরু করেন:

‘এখন যখন বিপদ কেটে গেছে, আমিও বুঝতে পেরেছি আমার ক্ষতির পরিমানটা। কতগুলো কষ্টের দিন আর সপ্তাহ আমি পার করেছি শুধু একটাই সখের আশা নিয়ে যে, ‍এই সব জঙ্গল থেকে নতুন ধরনের আর সুন্দর সব প্রাণিদের দেশে নিয়ে যাবো; অনেক স্মৃতি বিজড়িত এরা অনেক আপন হত আমার,যা প্রমান করতো, আমি আমার সুযোগের সদ্বব্যবহার করেছিলাম, যারা ভবিষ্যতে আমাকে একটা পেশা দিতে পারতো, স্বাচ্ছন্দ দিতে পারতো । এখন সব শেষ, আমার কাছে একটা নমুনাও বেঁচে নেই যা প্রমাণ করবে ঐসব অচেনা দেশে আমি একদিন ঘুরে বেড়িয়েছি….’;

আসলে ওয়ালেসের বিপদ কিন্তু তখনও কাটেনি। দুটো বড় আকারের ঝড়ের মুখে পড়ে জর্ডেসন। ওয়ালেস তার বন্ধুকে লিখেছিলেন, দেশে ফেরার পথে তিনি ‘৫০ বার’ শপথ কেটেছেন ‘ যদি একবার ইংল্যান্ডে পৌছাতে পারি, কখনোই আর সমুদ্রপথ পা বাড়াবো না’, তিনি যদি তার সেই প্রতিজ্ঞায় অটল থাকতেন, সেখানেই, তার কাহিনী শেষ হয়ে যেত আর খুব অল্পকিছু মানুষই আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেসকে চিনতেন। কিন্তু তার বন্ধুকে তিনি যেভাবে লিখেছিলেন ‘অনেক কঠিন প্রতিজ্ঞাও দ্রুত ম্লান হয়ে যায়’, ওয়ালেসও সিদ্ধান্ত নেন যে, অপূরনীয় ক্ষতি আর প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা সত্ত্বেও আবার সমুদ্রযাত্রায় বের হবেন।


(ছবি: ওয়ালেসের আঁকা একটি মাছের ছবি silver arowana )

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 − = 14