বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস: বানর আর ক্যাঙ্গারুর মাঝে রেখা অঙ্কন ( দ্বিতীয় পর্ব)


(ছবি: মালয় দ্বীপপূঞ্জে ওয়ালেস, এই প্রতিকৃতিটি এখন ডাউন হাউসে ডারউইন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। ছবিতে ওয়ালেসকে দেখা যাচ্ছে Waigeo তে থাকার সময় ( বর্তমান যা রাজা আমপাত, পাপুয়া), তার টেবিলে বার্ড অব প্যারাডাইসের নমুনা। আর যে কুটিরে তিনি বাস করতেন (ছবির পেছনে দেখা যাচ্ছে) সেটি তার মূল অবস্থানে পুননির্মিত হয়েছে ওয়ালেসের স্মৃতির সন্মানে, ছবিটির শিল্পী: Evstafieff)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস – প্রথম পর্ব

মালয় দ্বীপপুঞ্জে:

আমাজন থেকে তার পাঠানো নমুনা বিক্রি করার এজেন্ট ছিলেন স্যামুয়েল স্টিভেন্স। প্রায় সব হারানো ওয়ালেসকে সাহায্য করেছিলেন স্যামুয়েল স্টিভেন্স। স্টিভেন্সই বুদ্ধি করে ২০০ পাউন্ড দিয়ে ওয়ালেসের সব সংগ্রহকে বীমা করে রেখেছিলেন। তার নমুনা বিক্রী করে ওয়ালেস যতটুকু আশা করেছিলেন, সে তুলনায় টাকাটা সামান্য, কিন্তু টাকাটা ছিল বলে ওয়ালেসকে অন্তত কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। ওয়ালেসকে সেই সময় যারা দেখেছেন তারা অন্তত বুঝেছিলেন আমাজন থেকে ফেরার সময়ের ক্ষতিটা তার পরবর্তী অভিযানে বাধা না হয়ে বরং আরো নতুন অভিযানে যেতে তাকে আরো বেশী দৃঢ়সংকল্প করে তুলেছে ।

নতুন কোনো জায়গায় অভিযান আর নমুনা সংগ্রহের তীব্র ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল ওয়ালেসের, এছাড়াও প্রজাতির উৎপত্তির কারণ অনুসন্ধানের প্রতি তার বাড়তি উৎসাহ তো ছিলই। ১৮৫২ সাল, সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক জগতের জানা মতে তখনও এই রহস্যের সমাধান হয়নি। যদিও ডারউইন কিন্তু তার উপসংহারে পৌছে গিয়েছিলেন অনেক বছর আগেই, কিন্তু তার সেই তত্ত্বের কথা শুধুমাত্র খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ছাড়া আর কারোরই জানা ছিল না, আর ‌এই ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে ওয়ালেস অবশ্যই ছিলেন না।

ওয়ালেস তার পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে ভাবা শুরু করলেন দেশে ফেরার পর পরই। তার কাছে বড় প্রশ্নটা ছিল কোথায় যাবেন? কারণ তাকে তার অভিযানের অর্থকারী দিক এবং বৈজ্ঞানিক দিক দুটোই ভাবতে হবে। তিনি শ্রমজীবি শ্রেণীর মানুষ, তার কাছে জীবিকা নির্বাহের ব্যাপারটা জরুরী। তাকে এমন সব প্রাণি বা নমুনা সংগ্রহ করতে হবে যা বিক্রি করলে মোটা অঙ্কের অর্থ লাভ হবে সেকারনে আমাজনে ফিরে যাবার চিন্তা বাদ দিলেন তিনি, যদিও সেখানে তার ব্ন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস ছিলেন। নতুন কোনো দিকে তাকে যেতে হবে। মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞ নিয়ে ভাবতে শুরু করলেন তিনি, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া আর অষ্ট্রেলিয়ার মাঝখানে অসংখ্য দ্বীপের সমাবেশ হল এই মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞ (ম্যাপ দ্রষ্টব্য), শুধু মাত্র জাভা ছাড়া, অন্য সব দ্বীপগুলোর উদ্ভিদ ও প্রাণি ছিল অজানা। সেখানকার ওলন্দাজদের বসতি থেকে আসা যথেষ্ট পরিমান তথ্য, ওয়ালেসকে মনস্থির করতে সাহায্য করে, যে সেখানে গেলে যেমন ভালো নমুনা সংগ্রহ করার সম্ভাবনা আছে, তেমনই পর্যাপ্ত সুবিধা আছে ভ্রমনকারীদের। মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞটির পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃতি ৪০০০ মাইল আর উত্তর দক্ষিনে প্রায় ১৩০০ মাইল, আকারে প্রায় পুরো দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মত বড় । ক্রান্তীয় বনভুমি দিয়ে ঢাকা দ্বীপগুলো দেখতে আপাতদৃষ্টিতে একই রকম লাগলেও, জীবজগতের বিচিত্রতায় তারা ভিন্ন পরন্পর থেকে। এই পার্থক্যগুলেই আবিষ্কার আর ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে ওয়ালেস আক্ষরিক অর্থেই বিশ্ব মানচিত্রে তার ‍নাম লেখেন। সুতরাং আগের অভিযানের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাগুলো দমিয়ে রাখতে পারেনি ওয়ালেসকে, ১৮৫৪ সাল তিনি ব্রিটেন ত্যাগ করেন মালয় দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে ( বর্তমানে যা সিঙ্গাপুর,মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমোর) নমুনা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এক সহযোগী চার্লস অ্যালেনকে নিয়ে তিনি প্রথম সিঙ্গাপুরে এসে পৌছান।


(ছবিঃ ওয়ালেস লাইন (Wallace’s Line) হল ইন্দোনেশিয়ার মাঝ বরাবর একটি অদৃশ্য সীমারেখা, যা পৃথক করেছে সম্পুর্ণ আলাদা দুটি প্রাণিজগতকে। প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে তার এই আবিষ্কার মালয় দ্বীপপূঞ্জে থাকাকালীন প্রায় মধ্যবর্তী অবস্থায় ঘটেছিল, আরো চারবছর তিনি সেখানে ছিলেন। সেখানে ওয়ালেস বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন তার zoogeography গবেষণায়, তার আবিষ্কার ও ব্যাখ্যা কিভাবে একটি রেখা পাশাপাশি দুটি দ্বীপে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণিদের উপস্থিতি নিশ্চিৎ করেছে। সেই রেখাটির নাম Wallace Line; বালি লম্বক বোর্নিও আর সুলাবেসী দ্বীপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা এই রেখা পূর্বে এশীয় প্রাণিদের পূর্বতম সীমা ও পশ্চিমে বহু অস্ট্রেলেশিয়ান প্রজাতির পশ্চিমতম সীমা নির্ধারণ করেছে।)

ব্রাজিলের তুলনায় দূর প্রাচ্যের এই দ্বীপপুন্জ্ঞে যাওয়ার পথ অনেক দীর্ঘ। এক সহযোগী চার্লস অ্যালেনকে নিয়ে তিনি ১৮৫৪ সালে এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুর এসে পৌছান, সেখান থেকে শুরু করেন তার অভিযান। এখানে তাকে মুখোমুখি হতে হয় আমাজন থেকে সর্ম্পুন ভিন্ন এক প্রকৃতির আর বিপদের। সিংগাপুর পোকামাকড় সংগ্রহের জন্য খুবই ভালো একটা জায়গা, কিন্তু কিছু সমস্যাও ছিল, যেমন: ‘যেখানে সেখানে বাঘের জন্য গর্ত, ডালপালা দিয়ে সেগুলো এমনভাবে ঢাকা থাকে, বেশ কয়েকবার আমি তার মধ্যে পড়তে গিয়ে বেঁচে গেছি, প্রায় ১৫ বা ২০ ফুট গর্ত, এর মধ্যে একবার পড়লে কোনো সাহায্য ছাড়া একা একা ওঠা অসম্ভব একটা ব্যাপার’।

সিঙ্গাপুরে তখন বাঘ ঘুরে বেড়াত। গড়ে প্রতিদিন একজন করে বাসিন্দার মৃত্যুর কারণ ছিল বাঘের আক্রমন। মাঝে মাঝে ওয়ালেসও তাদের গর্জন শুনতে পেতেন, তবে বৃটিশদের স্বভাবসুলভ ভাবে সমস্যাকে হালকা করে তিনি মন্তব্য করেন .. ‘পোকামাকড় খোজার কাজটা একটু চিন্তার বিষয় বলতে হবে..যখন এরকম একটা হিংস্র প্রাণি আসে পাশেই কোথাও লুকিয়ে থাকে… ’, এছাড়া স্হানীয়দের হিংস্রতাও সম্বন্ধে নানা কথা প্রচলিত ছিল। ওয়ালেশ বাঁশের ঘরের মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমাতেন তা দেখে তার এক বন্ধু শোয়া যায় এমন একটা সোফা তাকে ধার দেন, কারণ এভাবে মেঝেতে শোয়া ছিল বিপজ্জনক, ‘ যেহেতু চারপাশে খারাপ মানুষের দল, যারা রাতের বেলা বর্শার ফলা দিয়ে মেঝের নীচ থেকে আমাকে এফোড় ওফোড় করে দিতে পারে, সেজন্য আমাকে দয়া করে একটা সোফা ধার দেয়া হয়েছে, যার উপর আমি শুতে পারি,অবশ্য সেটা আমি ব্যবহার করিনি, কারণ এ দেশে খুবই গরম’।


(ছবি: ১৮৬২ সালে সিংগাপুরে তোলা একটি ছবিতে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস)

ওয়ালেস এই এলাকায় তার জীবনের পরবর্তী আট বছর কাটিয়েছিলেন, ষাট থেকে সত্তরটি অভিযানের মাধ্যমে তিনি ১৪০০০ মাইল অতিক্রম করেছিলেন। তার সংগ্রহের পরিমানও ছিল বিস্ময়কর – প্রায় ১১০,০০০ কীটপতঙ্গ, ৭৫০০ ঝিনুক,৮০৫০ পাখির চামড়া, ৪১০ স্তন্যপায়ী ও সরিসৃপ প্রজাতি, এদের মধ্যে ৫০০০ টি ছিল সেই সময়ে বিজ্ঞানের জন্য নতুন। বাকান দ্বীপে তার সবচেয়ে পরিচিত আবিষ্কার ছিল Golden Birdwing Butterfly(Ornithoptera croesus) আর Standard-Wing Bird of Paradise (Semioptera wallacei), এবং বোর্ণিও থেকে Birdwing Butterfly (Trogonoptera brookiana)। এখানে তার সেই ভ্রমণকাহীনির বিবরণ The Malay Archipelago অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল পাঠক সমাজে, উনবিংশ শতাব্দীর সেরা বৈজ্ঞানিক ভ্রমণকাহিনীর একটি ছিল সেটি।


ছবি: আলি, সারারক্ষণই তিনি ওয়ালেসের সাথে ছিলেন, মালয় দ্বোভাষী আর স্থানীয় গাইড ও রাধুনী হিসাবে, ওয়ালেস তার আত্মজীবনী My Life এ আলির কথা বিস্তারিত লিখেছিলেন।)

অঙ্কুরিত ধারণাগুলো

এ ধরনের সমস্যায় আদৌ বিচলিত না হয়ে ওয়ালেস প্রতিদিন রুটিন মাফিক তার কাজ করে যেতেন। ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে ঠাণ্ডা পানিতে গোছল আর কফি দিয়ে দিন শুরু হতো তার। প্রথমে আগের দিনে যা কিছু সংগ্রহ করেছিলেন তা ঠিকমত সাজাতেন, তারপর তার সংগ্রহ করার সব জিনিসপত্র নিয়ে আবার বের হয়ে যেতেন জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। তার হাতে থাকতো পোকা মাকড় ধরার জাল, কাধে ঝোলানো বড় বাক্স, মৌমাছি, ভ্রমর ধরার জন্য সাড়াশি, ছোট আর বড় পোকামাকড়ের নমুনা রাখার জন্য ঘাড়ে প্যাচানো সুতোয় বাধা কর্কের ছিপি লাগানো দুই মাপের দুটো কাচের বোতল, আর কোনো কোনোদিন হাতে থাকত রাইফেল।


(ছবি: অ্যান্হনী স্মিথের ভাস্কর্য, নমুনার খোজে ওয়ালেস)

তার সংগ্রহ করা নমুনাগুলো সংরক্ষন করার জন্য তিনি স্হানীয়ভাবে তৈরী আররাক নামের একধরনের অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় ব্যবহার করতেন। বিভিন্ন ধরনের ফল,শস্যদানা,আখ এবং নারিকেল দুধকে ফার্মেন্টেশনের মাধ্যমে এই পানীয় তৈরী হতো। যেহেতু পানীয়টি বেশ জনপ্রিয় ছিল, ওয়ালেসের তাই তার নমুনা সংরক্ষণের জন্য এই পানীয়ের সরবরাহে টান পড়েনি কখনও।স্হানীয় আদিবাসীদের এটা বিশেষ পছন্দ হবার কারণে প্রায়ই তারা ওয়ালেসের ক্যাম্প খেকে অ্যাররাক চুরি করে নিয়ে যেত। এসব ঠেকাতে এর মধ্যে ওয়ালেস প্রায়েই মরা সাপ বা টিকটিকি ডুবিয়ে রাখতেন। কিন্তু আদিবাসীদের তা আদৌ বিচলিত করতো না। এছাড়া স্থানীয় আদিবাসীরা এমনি তে বুঝতে পারতো না কেন এই মানুষটা এত ভালো পানীয় নষ্ট করছে এসব জীব জন্তু, গাছ ইত্যাদি যত্ন করে সংরক্ষণ করে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে ওয়ালেস বলতেন, আমাদের দেশে অনেক মানুষ এগুলো দেখবে সেজন্য এগুলো যত্ন করে সংরক্ষন করা হচ্ছে।

স্হানীয় ওয়ানুমবাই আদিবাসীরা যারা ইংল্যান্ডকে উং লাং বলেতেন তারা এ কথায় আরো আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করতেন, নিশ্চয়ই এসব দেখার চেয়ে উং লাং এ আরো অনেককিছু দেখার আছে। ওয়ালেস জানতেন এদেরও নিজস্ব কিছু সংগ্রহের প্রথা আছে, যেমন ডায়াক আদিবাসীরা তাদের শত্রুদের মাথা সংগ্রহ করতেন। স্থানীয় অধিবাসীদের হিংস্রতার কুখ্যাতি থাকা সত্ত্বে দ্বীপপুন্জ্ঞে কিছু কিছু অংশে আদিবাসীরা জঙ্গল সম্বন্ধে তাদের অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান ওয়ালেসের সাথে ভাগ করে নিয়েছিল এবং তাকে সাহায্য করেছিল তিনি যা চাইছেন তা খুজতে। দ্বীপের সবচেয়ে সুন্দর আর মুল্যবান প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য্য তিনি সংগ্রহ করেছিলেন – ওরাং উটান, বানর, অসাধারণ সুন্দর বার্ডস অব প্যারাডাইস, বিশাল আকারের উজ্জ্বল রঙের প্রজাপতি।

ওয়ালেসের এসব দেখে লিখেছিলেন: ‘প্রকৃতি মনে হয় খুবই সযত্নে আর সাবধানে ঠিক করেছে ,সহজলভ্যতার জন্য তার সবচেয়ে সেরা ঐশ্বর্য্য রাশির মূল্য যেন কমে না যায়, প্রথমেই আমরা দেখি, উন্মুক্ত পোতাশ্রয়বিহীন, অবান্ধব সমুদ্র উপকুল,যা প্রশান্ত মহাসাগরের প্রচন্ড ঢেউ এর সম্মুখে উম্মোচিত; ‍তারপরেই জঙ্গলে ঢাকা পার্বত্য দেশ, জলাভুমি, খাড়া পর্বতমালার ধারালো কিনার, প্রায় অসম্ভব অনতিক্রান্ত এক প্রতিবন্ধকতা, এবং সবশেষে বন্য আর হিংস্র একটা জাতি.. ’,

যত বছরই তিনি জঙ্গলে কাটান না কেন, নতুন কিছু সংগ্রহের উত্তেজনা তার এতটুকু কমেনি।

ওয়ালেসের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল, তার সংগ্রহ করা বিভিন্ন প্রজাতির নমুনাগুলোর অসাধারণ বিচিত্রতা, প্রজাতির প্রত্যেকটি সদস্যর মধ্যকার ভিন্নতা এবং কোথায় তাদের তিনি খুজে পেয়েছিলেন তার প্রতি। এগুলো একজন পেশাদার সংগ্রাহকের ব্যবহারিক চিন্তার বিষয় হতে পারে, কিন্তু তার বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছিল।


(ছবি: Wallace’s golden birdwing butterfly)


ছবি: বিভিন্ন দ্বীপে বার্ড উইং প্রজাতির প্রজাপতিদের বিভিন্নতা পর্যবেক্ষণ ওয়ালেসকে বুঝতে সাহায্য করেছিল কেমন করে প্রজাতির পরিবর্তন হয়। ছবিটি কেয়ার্ন বার্ডউইং এর, অষ্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় স্থানীয় প্রজাপতি)

যেমন, সুন্দর বার্ড উইঙ্গ প্রজাপতি,যাদের বড় ডানা আর উজ্জ্বল রং এর জন্য সংগ্রাহকদের মধ্যে বিশেষ চাহিদা ছিল, খুজতে গিয়ে ওয়ালেস লক্ষ্য করেছিলেন যে, বিভিন্ন ধরনের বার্ড উইঙ্গ এর বসবাস দ্বীপপুন্জ্ঞের সুনির্দিষ্ট দ্বীপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ্ঞর পাখিরা ডারউইনকে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল,এই প্রজাপতিগুলো তাকে ঠিক সেই একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিল – যে প্রজাতিও পরিবর্তিত হয়। ওয়ালেস বুঝতে পেরেছিলেন বিশেষ সৃষ্টিবাদ এই বিচিত্রতার ব্যাখ্যা দিতে পারেনা।

যখন ডারউইন নীরব ছিলেন তার বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে ওয়ালেস তখন ভাবছিলেন সশব্দে, তিনি তার চিন্তা লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছিলেন নোটবুকে, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে পাঠানো একের পর এক তার লেখায়।এদের মধ্যে কোনোটা সংক্ষিপ্ত মাঠপর্যায়ের নোট; কোনোটাতে সুস্পষ্ট প্রকাশ পায় তার সুবিশাল ধারণাগুলো। কিন্তু ডারউইনের ক্ষেত্রে নীরব থাকার যে সব কারণ ছিল, ওয়ালেসের তা ছিল না । তার হারাবার কিছুই ছিল না বরং তাকে সুনাম অর্জন করতে হবে, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তার জায়গা করে নিতে হবে, এটাই ছিল তার উদ্দেশ্য।

প্রকৃতির একটি নিয়ম

১৮৫৫ সালে বোর্নিওর সারাওয়াকে বর্ষার মওসুমে অপেক্ষা করার সময়, ওয়ালেস ভূতত্ত্ব আর প্রাকৃতিক ইতিহাসের নানা সূত্র সংযোগ করে একটা নতুন সূত্র বা নিয়মের প্রস্তাব করেন: Every species has come into existence coincident both in space and time with pre-existing closely allied species অর্থাৎ প্রত্যেকটি প্রজাতির উৎপত্তি হয় সমসাময়িক স্হানে ও সময়ে ইতিপূর্বেই বিদ্যমান নিকট বা প্রায় সমগোত্রীয় প্রজাতিদের থেকে । On the Law which has Regulated the Introduction of New Species নামের তার সেই প্রবন্ধটি প্রকাশ হয় ১৮৫৫ সালের Annals and Magazine of Natural History পত্রিকায়। এই পেপারে তিনি আলোচনা করেছিলেন, জীবন্ত আর জীবাশ্ম প্রজাতিদের ভৌগলিক ও ভূতাত্ত্বিক বিস্তার নিয়ে, যা পরিচিত হয়েছিল biogeography নামে। তার সূত্রটি পরিচিতি পায় Sarawak Law হিসাবে। তবে এখানে তিনি বিষয়টি কেন এমন হয় সেটির কোনো ব্যাখ্যা প্রস্তাব করতে পারেননি। কিন্তু এটাই পূর্বাভাস দিয়েছিল তার পরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটির।

ওয়ালেস ধারণা করেন, প্রজাতিরা পরস্পারিক সম্পর্কযুক্ত a branching tree বা গাছের শাখাপ্রশাখার মত; তিনি প্রস্তাব করেছিলেন নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয় পুরাতন প্রজাতি থেকে, যেমন করে গাছে নতুন শাখার জন্ম হয় পুরাতন শাখা থেকে। এই বিপদজনক না হলেও নি:সন্দেহে সাহসী ছিল, এটার সরাসরি লক্ষ্য ছিল প্রজাতি সৃষ্টি সম্বন্ধে বিশেষ একটি প্রচলিত মতবাদ। ওয়ালেসের এই প্রস্তাব সরাসরি সেই ‘‍বিশেষ সৃষ্টির’ প্রচলিত মতবাদকে প্রত্যাখান করে, যার মুল ধারণাই ছিল প্রত্যেকটি প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে বিশেষভাবে, একই সাথে, যে ভৌগলিক অবস্থানে তাদের বসবাস তার উপযোগী করে। ‍ ‍উপরন্তু, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ওয়ালেস তার প্রাকৃতিক নিয়মের স্বপক্ষে সেই একই যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, যা ডারউইন দুই দশক ধরে তীব্র মানসিক যন্ত্রনাসহ একা একা নিজের মধ্যে রেখেছিলেন কিন্তু কোথাও প্রকাশ করেননি। ওয়ালেস ক্রমশ পরিবর্তনশীল পৃথিবীর ভুতত্ত্ব এবং জীবাশ্ম রেকর্ডে প্রাপ্ত জীবনের সুস্পষ্ট পরিবর্তন সংক্রান্ত নানা ধারণার সন্নিবেশ করেছিলেন তার প্রস্তাবনায়। তিনি দাবী করেছিলেন যা অতীতে হয়েছে তা বর্তমানে কেন হবে না – ‘বর্তমানে পৃথিবীতে জীবনের ভৌগলিক বিস্তার ও বিতরন অবশ্যই এর পৃষ্ঠের এবং এর অধিবাসীদের অতীতের সকল পরিবর্তনেরই ফলাফল’, সংক্ষেপে পৃথিবী এবং জীবন একই সাথে বিবর্তিত হয়েছে। সেই সময়ের সমাজ কেবল পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ধারণার সাথে পরিচিত হতে শিখেছে, প্রাণিদের পরিবর্তন হয়েছে এমন ধারণা মোটেও জনপ্রিয় ছিল না।

ওয়ালেস তার ‘সারাওয়াক সূত্র’ সমর্থনে ব্যাখ্যা করেন বিশেষ করে দ্বীপগুলোতে প্রজাতির বিস্তার সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণগুলো। যেমন, ‘গালাপাগোসে’, তিনি লেখেন, ‘যেখানে অল্পসংখ্যক স্বকীয় উদ্ভিদ আর প্রাণিগগোষ্ঠীসমূহ বিদ্যমান, কিন্তু বেশীর ভাগই দক্ষিণ আমেরিকার মুল ভূখণ্ডে উদ্ভিদ ও প্রাণির সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত – বিষয়টি এযাবৎ কোনো ধরনের, এমনকি কোনো আনুমানিক ব্যাখ্যাও পায়নি।’ ওয়ালেস ডারউইনের পর্যবেক্ষনের প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, যার এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। তিনি এর সাথে আরো যোগ করেন, ‘অন্য নতুন সৃষ্টি হওয়া দ্বীপগুলোর মতো এই দ্বীপগুলোতেও বাতাস আর স্রোতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে অবশ্যই প্রথমে বসতি স্হাপন করেছিল প্রাণি এবং উদ্ভিদ, এবং একটা বিশাল সময়ের ব্যপ্তিতে সেখানে আদি প্রাণি আর উদ্ভিদরা একসময় শেষ হয়ে যায় তার জায়গায় থেকে যায় শুধু এদের পরিবর্তিত প্রোটোটাইপ’, এর মানে হল, দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে গালাপাগোসের মত একই রকম ফিন্চ প্রজাতি না, কিন্তু তাদের সাথে পারস্পরিক মিল এত বেশী যে, দক্ষিণ আমেরিকার ফিন্চ প্রজাতির পাখিরা নিশ্চয়ই গালাপাগোস দীপগুলোতে বসতি স্হাপন করেছিল।

ওয়ালেস যুক্তি দেন যে, প্রজাপতির পরিবার, পাখি আর নানা ধরনের উদ্ভিদ একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগলিক এলাকায় সীমাবদ্ধ। আমাজনে থাকাকালীন সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির বানর নদীর একপাশেই সীমাবদ্ধ। ‘এরকম হওয়ার কথা না’ তিনি লিখেছিলেন ‘যদি না তাদের সৃষ্টি আর বিস্তারের উপর প্রকৃতির কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম যদি কাজ না করে থাকে।’ ‘ বিস্তার’ শব্দটি দিয়ে ওয়ালেস যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হল, একটি প্রজাতির কতটুকু বিস্তার লাভ করতে পারে কোনো এলাকায়,যা ভৌগলিক বিশেষত্ব – যেমন নদী, পর্বতশ্রেণী ইত্যাদি দ্বারা সীমাবদ্ধ।

যখন এই রচনা প্রথম প্রকাশিত হয়, প্রায় কে‌উই তা পড়েনি বা লক্ষ্যই করেননি। ওয়ালেস তার প্রস্তাবিত প্রাকৃতিক সুত্র সম্বন্ধে লন্ডন থেকে কোনো প্রতিক্রিয়াই শুনতে পেলেন না শুধুমাত্র কিছু অসন্তোষ ছাড়া, যে তার উচিৎ নমুনা সংগ্রহে মনোযোগী হওয়া, তত্ত্ব তৈরী করা না। কিন্তু তিনি পুরোনো বন্ধু হেনরী ওয়াল্টার বেটস এর কাছ থেকে ঠিকই একটি চিঠি পান, যদিও আমাজনের গভীরে তিনি ছিলেন তখন, তারপরও জার্ণালের একটা কপি তিনি যোগাড় করেছিলেন, তিনি ওয়ালেসকে প্রাণখুলে প্রশংসা করেন তার এই প্রস্তাবের জন্য, যিনি তা মনে করেছিলেন , ‘সত্যের মত, এতই সহজ এবং স্পষ্ট যে যারাই এটা পড়েছে আর বুঝেছে তারা এর সহজবোধ্যতা দেখে আশ্চর্য হবেন’।

১৮৫৫ সালে বোর্নিওর সারাওয়াকে থাকার সময় তিনি তার বিবর্তন সংক্রান্ত তার প্রথম বিখ্যাত লেখাটি লিখেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি আবিষ্কারের আগে। সেটি মূলত সারাওয়াল সূত্র বিষয়ক (Sarawak Law) On the Law Which Has Regulated the Introduction of New Species; পেপারটি কিন্তু আরো একজন পড়েছিলেন মন দিয়ে। চার্লস লাইয়েলকে মুগ্ধ করেছিল সেটি, তিনিও বিবর্তন সম্বন্ধে ভাবতে শুরু করেন ( তিনি বিবর্তন ধারণার বিরোধী ছিলেন সেই সময়)। ১৮৫৬ সালে এপ্রিল লাইয়েল ডারউইনের বাসায় বেড়াতে এলে ডারউইন প্রথমবারের মত লাইয়েলকে তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেছিলেন, ২০ বছর ধরে গোপনে ডারউইন যে তত্ত্বটি নিয়ে কাজ করছিলেন। লণ্ডনে ফেরার কয়েকদিন পরই লাইয়েল ডারউইনকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন দ্রুত যেন তিনি তার তত্ত্বটি প্রকাশ করেন, কারণ কেউ না কেউ হয়তো তাকে সেই দৌড়ে হারিয়ে দিতে পারে (লাইয়েলের মনে মনে সম্ভবত তখন ওয়ালেসের কথাই ভাবছিলেন।) সুতরাং ১৮৫৬ সালে মে মাসে ডারউইন তার একটি খসড়া রুপরেখা লিখতে শুরু করেন, তিনি অবশ্য সেটি শেষ না করে বিবর্তন সংক্রান্ত একটি বই লেখা শুরু করেছিলেন।

?w=660″ width=”400″ />
ছবিঃ মেগাপোড, ছবিটি ১৮৪৮ সালে ইংলিশ পাখিবিশেষজ্ঞ জন গুল্ড এর আকা, ইন্দোনেশিয়ায় এই পাখিটি শুধুমাত্র ওয়ালেস রেখার পূর্বে পাওয়া যায়।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 − 70 =