তবে আর থাকলো কী?

তারাপদ রায়কে অনেকেই কবি হিসেবে চেনেন। আর আমি তাকে চিনলাম এই তো কিছুদিন আগে। অত্যন্ত লজ্জার ব্যাপার। তারাপদ বন্দোপাধ্যায়ের নাম জেনেছিলাম- তিনি বিভূতিভূষণের ছেলে বলে। এখানে একটা কথা বলে রাখি, বিভূতি ৪৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন খুব কম বয়সের একজন কচি মেয়েকে। তাকে তিনি ভালবেসে ডাকতেন কল্যানী নামে। আসল নামটা তার মনে পড়ছে না এখন। (নাকি কল্যানীই পিতৃদত্ত নাম 🙁 )

যাক গে, তারাপদ রায়ের বই রম্য ৩৬৫ তে অসাধারণ একটা রচনা পড়েছিলাম একদা। আমার নিউরন জাগতিক সব কুচিন্তা দিয়ে বোঝাই বলেই হোক বা নামটা খুব বেশি সাধারণ- মনে রাখার মত নয় বলেই হোক, ভুলে গিয়েছি। ….. তারাপদ রায় গিয়েছিলেন একবার এক ছবির প্রদর্শনীতে। তার নিজের বয়ান মতে, তিনি ছবির ছলাকলা বোঝেন না খুব একটা। তারোপর মর্ডান ছবি- এটা বোঝা তার মত অর্বাচীনের(!) কর্ম নয়। আচমকা একটা সমুদ্রের ছবি চোখে পড়ে তার। বিশাল সমুদ্র, আর আকাশে বিশালতর সুর্য গোলাকার একটা থলের মতো করে আঁকা। সুর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে পানিতে, রক্তের মতো হয়ে গেছে নোনতা পানিও। মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন তিনি। (বলাবাহুল্য এর আগে যতগুলো ছবি তিনি দেখেছেন- তার একটাও বোঝেননি। এটা সামান্য বুঝতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো বোঝার আনন্দে হয়েছিলেন মুগ্ধ!) কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন না, চিত্রকর আসলে সুর্যাস্তের ছবি এঁকেছেন না সুর্যোদয়ের। অনেকবার করে দেখে চোখ লাগিয়ে, মাথা খাটিয়েও বুঝতে পারছিলেন না ব্যাপারটা। সেই সময়েই তার পাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়ালেন এসে- ভদ্রলোক বেশ বাবু স্বভাবের- নিখুঁত সার্টপ্যান্টজুতো। তিনি ছবিটা দেখে বললেন- “খুব সুন্দর সুর্যাস্তের ছবি এঁকেছে”। কথাটা লুফে নিয়ে তারাপদ রায়, বললেন, “কীকরে বুঝলেন মশাই এটা সুর্যাস্তের ছবি?” ভদ্রলোক বললেন, তার দিকে তাকিয়ে, “এর আঁকিয়েকে চিনি আমি। সে কোনদিন ন’টার আগে ঘুম থেকেই ওঠেনি। ও সুর্যোদয়ের ছবি আঁকবে কীকরে? সে সুর্যাস্তই এঁকেছে।”

আরেকবার নাকি একলোক বলেছিলেন, তার বাড়িতে আসা অতীথিকে, “জানেন, আমার ছেলে প্যারিস থেকে ছবি আঁকা শিখে এসেছে। দেয়ালের ঐ ঘোড়াটা তারই আঁকা।”
অতীথি, ঘোড়াটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বলেছিলেন, “প্যারিস থেকে শিখে এসেছে? তাই বলুন, ওরকম ঘোড়া তো এদেশে দেখা যায় না!”
যা হোক, আমার দেশীবিদেশী কোন চিত্রপ্রদর্শনীতেই যাওয়ার দূর্ভাগ্য হয়নি এখনো। তাই বলতে পারছি না কিছু। তবে অনলাইনে, বইয়ের পৃষ্ঠায়, পত্রিকায় দেখে যতটুকু বুঝেছি, সেটা ঐ সুর্যাস্ত দেখার মতোই। আজই তো সকালে, ফেবুর হোমপেজে দেখলাম একটা হলুদ ক্যানভাস। কয়েকজন উলঙ্গ নারী বসে আছে বিভিন্ন পোজে। কেউ বা বসেছে মাটিতে, কেউবা ঝুলছে গাছের ডালে আর কেউবা করছে স্ব-মৈথুন। আমি ভাবার আগে নিচে ক্যাপসন দেখলাম। আটাম ইন দ্যা ১৯২০! অটাম যে এমন হয় বাপের জন্মে দেখিনি!

তবে সবাই যে এমন উল্টা প্লাল্টা আঁকেন তার কোন মানে নেই। জয়নুল আবেদীন একদিন প্যারিসে গিয়েছিলেন শুনেছিলাম। ( এটাও আমার খেয়াল নেই। তিনি বন, হেগ, মাদ্রিদ যেকোন জায়গায় যেতে পারেন। তবে কে যেন বলেছিল, অথবা কোথাও আমি শুনেছি বা পড়েছি, প্যারিস শিল্পীদের তীর্থ- মক্কাই ধরুন বা মানস সরোবর। তাই ধরে নেই, তিনি গিয়েছিলেন প্যারিসেই!) ফরাসীরা ভাষার ব্যাপারে খুব কঞ্জার্বেটিভ, এটা হয়তো অনেকেই জানেন। তারা দরকার হলে সমাসবদ্ধ, সন্ধিসাধিত পঞ্চঅক্ষরের পারিভাষিক শব্দ উচ্চারণ করবে, কিন্তু অধিকতর সোজা ইংরেজি বা জার্মান কিংবা অন্যকোন ভাষা বলবে না জীবন গেলেও। এদিকে জয়নুল আবেদীন পড়ে গেলেন গাড্ডায়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন- ইংরেজি জানতেন, কিন্তু ফরাসীটা তার আসে না। এদিকে ক্ষুধাও লেগেছে। রেস্তোরায় গিয়ে ওয়েটারকে বোঝালেন ইংরেজিতে যে তিনি ক্ষুধার্থ কিন্তু ওয়াটার কিছুতেই বোঝে না। হাল ছাড়লেন না, মাইম অভিনেতাদের মতো হা পা মুখোভঙ্গি করে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, তাও বিফলে গেল। অবশেষে ছুড়লেন শেষবাণ। এঁকে বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগলেন। তিনি আঁকতে লাগলেন একের পর এক খাবারের ছবি, যা দেখে ওয়েটার তাকে খাবার এনে দিতে লাগল। খাবার অর্ডারের সেই অভিনব পন্থা দেখে সেদিন ভিড় জমে গিয়েছিল রেস্তোরায়- সেই ভিড় থেকে অবশ্য একজন বাঙালি এগিয়ে এসেছিলেন তাকে সাহায্যের জন্য, যিনি ফরাসী জানতেন।

যা হোক, জিজ্ঞেস করতে পারেন, “চিত্রকলা নিয়ে এতো কিছু বলছেন কেন যদি নাই বোঝেন?” হক কথা। উত্তরে এটুকু জানিয়ে রাখি, কম দুঃখে বলছি না মোটেও। চিত্রকলা বুঝি না এ নিয়ে নেই খেদ, সে বড়লোকদের ব্যাপার। বড়লোকেরা লাখ লাখ টাকা দিয়ে ফিদা হুসেন বা পিকাসোর শিল্পকর্ম কিনে দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রেখে নিজের শিল্পি মনের পরিচয় ঝুলিয়ে রাখবেন, সেটা তাদের ব্যাপার- আমার মতো তিন টাকার ডার্বিফোকা বান্দার সেদিকে নজর না দিলেও চলবে। কিন্তু মনে অনেক গর্ব ছিল, প্রচ্ছন্ন অহংবোধ ছিল, এটা ভেবে যে চিত্রকলা না বুঝলেও কবিতা ক্ষাণিকটা বুঝি। এমনকি মাঝেমাঝে মন খুব ভাল থাকলে, কিংবা প্রেমিকা হঠাত আঘাত করলে মনের দুঃখে লিখে ফেলি তিনচার লাইন, অন্তঃ এবং আন্তঃ- মিল দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এখন কেন জানি মনে হচ্ছে, সে অহংবোধটা বোধহয় আর থাকছে না, রাখতে পারছি না। কারণ গত কয়েকদিনে পড়া বেশিরভাগ কবিতাই গেছে আমার মাথার উপর দিয়ে। চিত্রকলার মতোই অবোধ্য লাগছে শব্দগুলো। তারাপদ রায় যেমন চিত্রকর্ম দেখে বলেছিলেন, এটা কীসের ছবি, সুর্যোদয়ের না সুর্যাস্তের, আমাকেও তেমন কবিতা পড়ে মনে মনে নিজেকেই একবার জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে, লজ্জিত কন্ঠে, “কী নিয়ে কবিতা পড়লাম, মানবীপ্রেম নিয়ে না দেশপ্রেম নিয়ে!”

“যুদ্ধ শেষ হলেই মানুষ যুদ্ধকে ঘৃণা করতে শুরু করে
সঙ্গম শেষে নারীর স্তনকে মনে হয় মৃত জুঁইফুল
সুতরাং মনোযোগ রাখুন গতকালের সংবাদপত্রে
শেষ পাতায় সতেরো কলামে লেখা আছে আপনার ভবিষ্যৎ”
আমার খুব প্রিয় এক কবির এই লাইনগুলো পড়লাম সকালে। পড়ে কেন জানি মনে হলো, নাহ সত্য়িই আমি বুঝি না একদম কবিতা। সৃষ্টিকর্তা বলে থাকলে কেউ, তার কাছে প্রার্থনা করতাম এই বলে যে,”খোদা, বালিকার মন বোঝার তৌফিক দাওনি, মেনে নিয়েছি। তাই বলে কবিতা বোঝার ক্ষমতাও নিয়ে নিলে?”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 13 = 14