ইসলামী যুদ্ধের প্রাণহানীর সত্য মিথ্যা

ইসলামী যুদ্ধগুলোতে মুসলিমদের হাতে কত সংখ্যক মানুষ মারা গেছে- এরকম প্রশ্নে জাকির নায়েকসহ অন্যান্য ইসলামিস্টরা সংখ্যাটা একশ বা পাঁচশ জনের বেশি নয় বলে দাবী করেন! তারা বলতে চান ইসলামী ‘যুদ্ধে’ মুসলিম বাহিনীর হাতে মোটে শ’পাচেঁক মানুষই মারা গিয়েছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে, লেলিন বা মাওদের বিপ্লবে, আমেরিকার যুদ্ধগুলোতে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ মারা গেছে…।

আলোচনার শুরুতে জানিয়ে রাখি নিরপেক্ষ কোন ইসলামের ইতিহাস নেই হাদিস ও সীরাত ব্যতিত। এগুলোও লিখেছেন মুসলিম ধর্মবেত্তারা যারা ইসলামের সমস্ত ভুল-ত্রুটিকে গোপন করে প্রসংশা ও গৌরব প্রকাশ করেছেন লাগামহীনভাবে। আমাদের লেখার সোর্স এইসব বন্দনামূলক হাদিস ও সীরাতগুলো। আরো একটি কথা বলে রাখা ভাল, ইসলামের সেই যুগে তরোয়াল-বল্লমই ছিল একমাত্র যদ্ধাস্ত্র। তারপরও সে যুগের যুদ্ধে মৃত মানুষদের সংখ্যা আজকের প্রযুক্তিগত যুদ্ধে হাতাহতদের সংখ্যাকে বিবেচনায় নিলেও ভয়াবহতায় গা শিউরে উঠে রীতিমত!

মুতার যুদ্ধের সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে এই যুদ্ধের পর মুহাম্মদ তাকে ‘সাইফুল্লাহ’ বা আল্লাহ’র কোষমুক্ত তরবারি উপাধি দেন। এতে অনুমান করা যায় ওয়ালিদের নেতৃত্বে কি পরিমাণ মানুষ কচু কাটা হয়েছিল। দ্বাদশ হিজরীতে খলিফা আবু বকর খালিদ বিন ওয়ালীদকে ইরাক অভিযানে প্রেরণ করেন। ইসলামিক সূত্র জানাচ্ছে ইরাকের সাওয়াদ অঞ্চলের অধিবাসীরা ওয়ালীদের হাত থেকে বাঁচতে এক হাজার দীনারের বিনিময়ে চুক্তিতে সাক্ষর করে। কিন্তু চুক্তির আগে মুসলমান বাহিনীর হাতে বিপুল সংখ্যাক (সংখ্যাটা উল্লেখ করা হয়নি) সাওয়াদবাসীকে মুসলমানরা হত্যা করে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির, ৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৫১৬)। এরপর ওয়ালীদ ইরাকের হীরায় যান এবং সেখানকার খ্রিস্টান শাসককে দুটি পথের একটিকে বেছে নিতে বলেন। হয় ইসলাম গ্রহণ করো নয়ত আমাদের জিজিয়া কর দিয়ে জীবন বাঁচাও। এর অন্যথা হলে মুসণমানদের তরোয়ালে প্রাণ দিতে হবে। হীরার শাসনকর্তা কুবায়সা বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা তোমাদের জিজিয়া কর দিয়ে নিজ ধর্ম নিয়ে বাঁচতে চাই। শেষে বার্ষিক ২ লক্ষ দিরহাম জিজিয়া করের বিনিময়ে রফা হয় মুসলমানদের সঙ্গে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৫১৭)। সেখান থেকে ওয়ালীদ কাজিমার নিকট স্থানে হুরমুয বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এরা ছিল পারস্যবাসী। সেই যুদ্ধে ২০ হাজার সৈন্য মুসলিম বাহিনীর হাতে মারা যায়। ‘মাযার’ নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর হাতে ৩০ হাজার মারা পড়ে (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৫২০)। বলে রাখা ভাল, এইসব পরাজিত অধিবাসীদের নারী ও শিশুদের ‘গণিমত’ হিসেবে মুসলিম বাহিনীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হয় ইসলামী নিয়ম অনুসারে। তবে কৃষকদের ফসলের অর্ধেক ভাগের শর্তে তাদের কাজে বহলা রাখা হয়। এরপর ওয়ালাজা আক্রমন করে একইভাবে মুসলিম বাহিনী তাদের নারীদের গণিমতের মাল হিসেবে বন্দি করে। তাদের পুরষদের হত্যা করে।… ইসলামের তথাকথিত এই ‘যুদ্ধগুলোর’ কোন কারণ ছিল না। আক্রান্ত জাতি বা অধিবাসীরা নিজেদের মত নিজেদেরে দেশে বসবাস করছিল। কিন্তু মক্কা-মদিনার ‘ইসলামী রাষ্ট্রের’ একমাত্র রাজস্ব উৎস ছিল গণিমত ও জিজিয়া কর। আর এসব সংগহ করতেই দিকে দিকে সৈন্য পাঠিয়ে দিতেন খলিফারা। মুসলিম বাহিনী গোটা আরব জুড়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। আশেপাশে খ্রিস্টান ও অন্যান্য অমুসলিম জনপদের হাজার হাজার পুরুষ হানাদার মুসলিম বাহিনীদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ হারায়। আর তাদের নারী ও শিশুরা গণিমতের মাল হিসেবে বন্দি হয়। তাদের সমস্ত সয়সম্পত্তি হয়ে যায় মুসলিমদের অধিকারভুক্ত।

‘ওল্লায়সের যুদ্ধের’ সময় খালিদ বিন ওয়ালিদ আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ তুমি আমাদের সহায়তা কর যাতে এদের একজনকেও জীবিত না রাখি। ওদের রক্তে যেন এখানকার নদীগুলো সব লাল হয়ে উঠে…। ওয়ালিদ তার কথা রেখেছিল। তিনদিন পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ওয়ালিদ ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। মানুষের রক্ত জমাট হয়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। স্থানীয় ঐ নদীকে এরপর থেকে ‘নাহরুদ-দাম’ বা ‘রক্তনদী’ নামে ডাকা হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৫২২)। আম্বার নামক স্থানে ওয়ালীদের নিদের্শে তার বাহিনী এক হাজার প্রতিরোধকারী স্থানীয়দের তীর দিয়ে তাদের চোখ উপড়ে ফেলে। ফলে বাধ্য হয় তারা সন্ধি করতে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে। এরপর মুসলিম বাহিনী ‘আয়নুত তামার’ দুর্গ অপরোধ করে দুর্গের সমস্ত অধিবাসীদের হত্যা করে। একটা গির্জায় লুকিয়ে থাকা ৪০টি বালকের সন্ধান পাওয়া যায় যারা সেখানে বাইবেল শিক্ষা লাভ করত। মুসলিম বাহিনীদের মধ্যে সেই ৪০জন খ্রিস্টান বালককে ‘খুমুস’ (গেলমেন?) হিসেবে বন্টন করা হয়। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ খন্ড, পৃষ্ঠা-৫২৮)। এরপর একে একে দুমাতুন জানদাল, হাদীস, মুযাহা, ছানি ও জুমায়েল অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানগুলোতে সমস্ত আরব ও অনারব মুশরিক-কাফেরকে হত্যা করা হয়- স্পষ্টভাবে হাদিসগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে- একজনও মুশরিক বেঁচে থাকার সুযোগ পায়নি। কি পরিমাণ মানুষ এই সব আক্রমনে মারা গিয়েছিল এ থেকে অনুমান করলেই গা শিরশির করে উঠে!

সিরিয়া ও ইরাকের সীমান্ত এলাকা ফারাদ আক্রমন করে মুসলিম বাহিনী এক লক্ষ রোমানকে হত্যা করে। মানুষের রক্তে নদীর পানি লাল হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষের মৃত দেহে ভাসতে থাকে ফুরাত নদীতে। ইসলাম নাকি তরোয়ালের জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়নি! নিশ্চয় আজকে আবু বকর, ওসমান, ওমর, আলী বেঁচে থাকলে ক্ষুব্ধ হতেন একথা শুনে। ওয়ালীদ হয়ত আত্মহত্যাই করতেন! কারণ এতে তাদের এত শ্রম ও ‘বীরত্বকে’ গোপন করা হয়।। ইসলামী উপনিবেশ গড়তে ওয়ালীদের তরোয়াল এতখানিই অবদান রেখেছিল যে, ইসলাম প্রসারের স্বয়ং মুহাম্মদের এতখানি অবদান ছিল না। তবু তার নাম খুব একটা বেশি আলোচনা হয় না সম্ভবত তাকে নিয়ে আলোচনা করলে রক্তাক্ত ইসলামের ইতিহাস বেরিয়ে পড়বে। আবু বকর, ওসমান, ওমরের যুগে গণিমত আর জিজিয়ার জন্য আরর থেকে বেরিয়ে এশিয়া-আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের রক্তলোলুপ মুসলিম বাহিনী। (আল-কামেল ফিত তারীখ, ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪৬, মাতবাআতুত তিবআতীল মুনীরিয়্যাহ, মিসর ১৩৪৮ হিজরী)। এছাড়া হযরত আলী সময় আত্মঘাতি ‘সিফফিনের যুদ্ধ’ ১ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। আর অমুসলিম জনপদের মানুষকে মেরেকেটে, তাদের নরীদের গণিমতের মালে পরিণত করে, তাদের ধনসম্পদ বোঝাই করে উটের পর উট এসে ভিড়তে থাকে ‘আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের’ খলিফাদের দরবারে।
তাহলে ইসলামের যুদ্ধে বা মুসলিম বাহিনীদের হাতে একশ জনের বেশি মারা যায়নি- এমন দাবীর উৎসটা কি? সেই চালাকিটা একটু বলেই লেখাটা শেষ করছি।

ইসলামের ইতিহাসে যে কটা প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধ ছিল তার সবটাই ঘটেছিল মুহাম্মদের জ্ঞাতিগোষ্ঠি কুরাইশদের সঙ্গে। ইহুদীসহ অননারব কেউ মুহাম্মদের বিরুদ্ধে কখনো অস্ত্র ধারণ করেনি বা স্বপ্রণোদিত হয়ে তারা কেউ যুদ্ধে জড়ায়নি। আর ইহুদীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মুসলমানদের হাতে অতর্কিত হামলার শিকার হয়েছিল। ইহুদীদের বেশিরভাগই ছিল কৃষক শ্রেণী। যুদ্ধ বিদ্যা তাদের জানা ছিল না। ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে বা ইহুদিরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তার একটা প্রমাণ দুনিয়ার কোন ইসলামিস্ট দেখাতে পারবে না। কুরাইশদের সঙ্গেও মুহাম্মদ পায়ে পা দিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয। বদর যুদ্ধ ছিল প্রথম যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসে যেটা বাধিয়েছিল মুহাম্মদ নিজে। কুরাইশদের বাণিজ্য কাঢেলায় একের পর এক আক্রমন করে লুট করার পর, সিরিয়া থেকে মদিনা হয়ে যে বাণিজ্যপথ মক্কায় পৌঁছাত তাকে নিরাপদ রাখতে কুরাইশদের প্রতিরোধ যুদ্ধ করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আজকের সোমালিয়ান জলদস্যুদের মত মদিনায় অন্ধকার পথে ওঁত পেতে কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলায় আক্রমন করত মদিনায় হিযরত করা নবদীক্ষিত মুসলিমরা। বদর যুদ্ধ ছিল তার একটা ফয়সারা। যাই হোক, বদর যুদ্ধে কুরাইশরা পরাজিত হয়। কিন্তু তারা সকলে মুহাম্মদের স্বজন-জ্ঞাতি হওয়াতে তাদের হত্যার বদলে বন্দি করে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়। (পড়ুন ইবনে কাফিরের তাফসির সুরা তাওবা ও আনফাল)। কিন্তু বণু কুরাইজা ইহুদীদের একরাতেই ৭০০ জন পুরুষকে হত্যা করে গর্তে চাপা দিয়ে রাখা হয়। তাদের নারীদের যৌনদাসীতে পরিণত করা হয়। বনু নাযির ইহুদীদের তাদের দেশ ছেড়ে, তাদের সম্পত্তি ত্যাগ করে চলে যাবার শর্তে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ইসলামের নবীর কাছে আরব ও অনারব ছিল ভিন্ন রকম বিচার্যের। ইহুদীসহ অন্যান্য অনারব অমুসলিমদের প্রতি তিনি যতটা কঠরতা দেখিয়েছিলেন তেমনটা নিজ স্বজন মুশরিকদের প্রতি দেখাননি। তাই আজকে সেই একপেশে কুরাইশদের প্রতি দয়াদক্ষিণাকে আপনার সামনে হাজির করা হচ্ছে দেখাতে যে- ইসলামের হামলায় শ’খানেকের বেশি মানুষ মারাই যায়নি! কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস তো উপরেই বর্ণনা করা হলো ইসলামী সোর্স থেকেই। বলাই বাহুল্য অতি সামান্য তথ্যই এখানে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে লেখার পরিসরের সীমাবদ্ধতার কারণে। এবার আপনারাই বিবেচনা করুন…।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৭ thoughts on “ইসলামী যুদ্ধের প্রাণহানীর সত্য মিথ্যা

  1. ইসলাম ধর্ম, ইসলামী রাজনীতি ও
    ইসলাম ধর্ম, ইসলামী রাজনীতি ও ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় অকল্পনীয় গণহত্যা করা হয়েছিল। এসব গণহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে আরো বেশি বেশি লেখা উচিত। বরাবরের মত অসাধারণ তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।

  2. সমস্যাটা হলো, আপনার এই লেখা
    সমস্যাটা হলো, আপনার এই লেখা মুসলিমেরা পড়বে না।
    আমার একটা কথা প্রায়ই মনে হয়, এমনসব লেখা – যেগুলোয় খুলে দেয়া হয়েছে ইসলামের ভালত্বের মুখোশ- সেগুলো সংগ্রহ করে (অবশ্যই ব্লগে বা ফেসবুকে পূর্ব প্রকাশিত নয়) পুস্তিকাকারে ছেপে বিক্রি করলে (বেনামে-জীবনের ভয় আছে) বেশি মানুষের নিকট পৌঁছত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

82 − = 76