বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস: বানর আর ক্যাঙ্গারুর মাঝে রেখা অঙ্কন ( শেষ পর্ব)


(ছবি: রয়্যাল সোসাইটির ৩৫০ তম বার্ষির্কীতে প্রকাশিত একটি স্ট্যাম্পে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস)

বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে: আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস – প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব

রেখা অংকন

ওয়ালেস প্রায়ই এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাওয়া আসা করতেন। মালয় দ্বীপপুঞ্জে আট বছরে তিনি মোট ১৪,০০০ মাইল পাড়ি দিয়েছিলেন, এর মধ্যে কিছু কিছু দ্বীপে তিনি বেশ কয়েকবার অভিযান করেছিলেন। তার পথ কোনদিকে হবে তা নির্ধারন করতো নৌকা পাওয়া বা না পাওয়ার উপর। তিনি সিংগাপুর থেকে সুলাবেসী দ্বীপের মাকাস্বার যাবার বেশ কয়েকবার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ১৮৫৬ সালে মে মাসের একদিন একটি চীনা জাহাজে সিংঙ্গাপুর থেকে বালি যান, যেখানে যাওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই ‍ছিল না তার, কিন্তু তিনি আশা করেছিলেন সেখান থেকে সুলাবেসী দ্বীপে লোম্বোক, পরে মাকাস্বার যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন। আকস্মিক দুর্ঘটনার কারণে তার এই ভিন্ন পথে আসাটাই ওয়ালেসের অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের পথ করে দেয়।

বালিতে ওয়ালেস এমন কিছু পাখি খুঁজে পেলেন, যা তিনি পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে অভিযানের সময় দেখেছিলেন, যেমন, একটি উইভার, একটি কাঠ ঠোকরা, একটি থ্রাশ, একটি স্টারলিং – তেমন বিশেষ কোনো উত্তেজনার বিষয় না। কিন্তু ‘তারপর লোম্বোকে, বিশ মাইলেরও কম একটা প্রণালী যা একে বালি থেকে পৃথক করেছে, আমি স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিলাম একই ধরনের পাখিদের সাথে আবার দেখা হবে, কিস্তু সেখানে আমার তিন মাস অবস্থান করার সময়, আমি তাদের কোনোটিরই দেখা পেলাম না ’, বরং ওয়ালেস খূঁজে পেলেন ভিন্ন প্রজাতির পাখিদের: সাদা কাকাতুয়া, হানিসাকলের তিনটি প্রজাতি, একটা জোরে জোরে শব্দ করা পাখি, যাকে স্থানীয়রা ডাকে ‘কোয়াইচ-কোয়াইচ’ এবং একটা অদ্ভুত পাখি যার নাম মেগাপোড ( বিগ ফুট বা বড় পা), যে তার বড় পা ব্যবহার করে ডিমের জন্য বড় জায়গা তৈরীতে। এধরনের সমগোত্রীয় কোনো পাখি সুমাত্রা, বোর্নিও বা জাভার পশ্চিমের দ্বীপগুলোর কোথাও দেখা যায় না।

ওয়ালেসকে বিষয়টি বেশ ভাবনায় ফেলেছিল। ওয়ালেসের কাছে প্রশ্ন তখন একটাই, কি সেই প্রতিবন্ধকতা যা কিনা এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে এই প্রজাতিগুলোর বিস্তার ব্যাহত করেছে। নিশ্চয়ই পাখিদের কাছে মাত্র ২০ মাইলের একটা প্রণালী কোনো বাধা হবার কথা না। বন্ধু বেটস এর কাছে লেখা চিঠিতে ওয়ালেস এই রহস্যের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যেখানে এর সমাধানে তিনি প্রস্তাব করেন, ‘নিশ্চয়ই বালি আর লোম্বোকের মধ্যে কোনো অদৃশ্য ‘সীমারেখা’ আছে। ফ্লোরেস বা তিমোরের আরো পুর্বদিকে গেলে, যেমন আরু দ্বীপে আর নিউ গিনিতে, পাখি প্রজাতির এই পরিবর্তন আরো সুস্পষ্ট হয়। সুমাত্রা, জাভা বা বোর্নিওতে পাখিদের যে পরিবারগুলো দেখা যায়, তারা আরু, নিউ গিনি বা অষ্ট্রেলিয়ায় অনুপস্থিত, একইভাবে এর বীপরিতটাও তাই। একইভাবে পুর্ব আর পশ্চিমের দ্বীপগুলোর স্তন্যপায়ী প্রাণিদের মধ্যে পার্থক্যও লক্ষণীয়। পশ্চিমের বড় দ্বীপগুলোতে আছে বানর, বাঘ, গন্ডার। কিন্তু আরুতে কোনো প্রাইমেট কিংবা কোনো মাংসাশী প্রাণি নেই। স্থানীয় স্তন্যপায়ী প্রাণিদের সবাই মারসুপিয়ালস – যেমন, ক্যাঙ্গারু, কুসকুস ইত্যাদি।

বালি আর লোম্বোকের মধ্যে সীমারেখার অস্তিত্ব সম্বন্ধে ওয়ালেসের মনে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না বরং এর তার জন্য এর তাৎপর্য্য ছিল অনেক গভীর। ওয়ালেস যুক্তি দিয়েছিলেন যে, প্রজাতির বিশেষভাবে সৃষ্টির মতবাদ অনুযায়ী, একই ধরনের জলবায়ুর দেশগুলোতে একই ধরনের প্রাণি এবং ভিন্ন জলবায়ুর দেশগুলোতে ভিন্ন রকম প্রাণিদেরই উপস্থিতি লক্ষ্য করার কথা। কিন্তু এরকম কিছু কিন্তু তিনি আদৌ পর্যবেক্ষণ করেননি। পশ্চিমে বোর্নিও আর পূর্বে নিউ গিনি’র মধ্যে তুলনা করে তিনি লেখেন: ‘খুবই কঠিন হবে ব্যাখ্যা করা যেখানে দুটি দেশ জলবায়ু আর ভূতাত্ত্বিক প্রকৃতিতে সদৃশ্য, কিন্তু তাদের পাখিরা এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সম্ভার সম্পুর্ন আলাদা’।


(ছবি: ওয়ালেস লাইন ও এর বর্ধিত কিছু সংস্করণ)

নিউ গিনি আর অষ্ট্রেলিয়াকে তুলনা করে তিনি লেখেন, এরকম পার্থক্য আমরা খুব কমই খুজে পাবো, এক দেশে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি আর আর্দ্রতা, আরেকটিকে তীব্র শুষ্কতার কমবেশী প্রকোপ, ওয়ালেস যুক্তি দেন, ‘‍যদি ক্যাঙ্গারুরা শুষ্ক সমতলে আর অষ্ট্রেলিয়ার বনে বিশেষভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তাহলে নিশ্চই কোনো কারণ আছে নিউ গিনির ঘন, আর্দ্র জঙ্গলে তাদের আবির্ভাবের। পশ্চিমের দ্বীপগুলোতে বানররা যে জায়গা দখল করেছে পূর্ব দিকের দ্বীপগুলোর ক্রান্তীয় বনভূমিতে সেই আবাসস্থল দখল করেছে গেছো ক্যাঙ্গারুরা।

ওয়ালেস আরো যুক্তি দেন যে, নিশ্চই প্রজাতির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে অন্য কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করছে। সেই নিয়মটাই, ওয়ালেসের প্রস্তাব অনুযায়ী ছিল, ‘সারাওয়াক সূত্র’, যা ‍তিনি এর দুবছর আগেই উত্থাপন করেছিলেন। আবারও ওয়ালেস তার পর্যবেক্ষণের স্বপক্ষে ভূ-তত্ত্ব আর ভূগোলের উপর নির্ভর করেছিলেন। তিনি অনুমান করেছিলেন যে, নিউ গিনি, অষ্ট্রেলিয়া, এবং আরু অবশ্যই অতীতে কোনো এক সময় সংযুক্ত ছিল আর সেকারণেই একই ধরনের পাখি আর স্তন্যপায়ী প্রাণি সেখানে পাওয়া যায়, একইভাবে ওয়ালেস ব্যাখ্যা করেন যে, পশ্চিমের দ্বীপগুলোও কোনো একসময় এশিয়ার অংশ ছিল, সেকারণেই ক্রান্তীয় এশিয়ার প্রাণিদের সেখানে পাওয়া যায় -যেমন, বানর, বাঘ ইত্যাদি।

ওয়ালেসের ধারণা ছিল সঠিক। বালি আর লোম্বকের মধ্যে দূরত্ব কম হলেও যে সাগর তাদের পৃথক করেছে, তা পরবর্তীতে দেখা গেছে অনেক গভীর। বালি যেমন কন্টিনেন্টাল শেলফের প্রান্তে অবস্থিত, লোম্বক ঠিক তার বাইরে অবস্থিত। বালি পশ্চিমের অন্য দ্বীপগুলোর সাথে অতীতে সংযুক্ত থাকলেও লম্বোকের সাথে কখনোই যুক্ত ছিলনা। সুতরাং ২০ কিমি প্রশস্ত কোনো প্রণালীকে অতিক্রম করার ব্যাপার নয়, অনেক মিলিয়ন বছর ধরে এই পার্থক্যটা অনেক বড় ছিল। এবং জীবজগত সেই দ্বীপগুলোতে পৃথক পৃথকভাবেই অভিযোজিত হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট দ্বীপের পরিবেশ অনুযায়ী। যদিও আজ দ্বীপগুলো পাশাপাশি, কিন্ত ভূ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা আসলে নতুন প্রতিবেশী।
ওয়ালেস সফল হয়েছিলেন, প্রজাতির উৎপত্তি এবং কিভাবে প্রজাতির বিস্তার হয়, এই দুটি প্রশ্নকে সংযুক্ত করতে এবং তিনি এশিয়া আর অষ্ট্রেলিয়ার প্রাণিজগতকে পৃথক করা সীমারেখাটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার এই আবিষ্কার চিরকালের জন্য ‘ওয়ালেস লাইন’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে আর ওয়ালেসকে প্রতিষ্ঠিত করে জৈবভূগোলের (Biogeography) জনক হিসাবে-যা উদ্ভিদ আর প্রাণিদের ভৌগলিক বিস্তার নিয়ে অধ্যয়ন করে।


(ছবি : গেছো ক্যাঙ্গারু, যাদের শুধুমাত্র ওয়ালেস রেখার পূর্বে পাশে দেখা যায়, রেখার পশ্চিমে বানররা যে জায়গা দখল করে আছে, পুর্বদিকে সেই জায়গাটি দখল করে আছে এরা।)

দুই মহান মনের সম্মিলন

অবশেষে ওয়ালেস লন্ডনের বিজ্ঞানী সমাজে সামান্য কিছুটা হলেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেন। তিনি চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ শুরু করলেন চার্লস ডারউইনের সাথে। যেখানে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন, তার সারাওয়াক ল তেমন কোনো নজর কাড়েনি, এমনকি কোনো ভিন্নমতের মুখোমুখিও হয়নি। ১৮৫৭ সালে মে মাসে ডারউইন তাকে উত্তর দেন: ‘আমি আপনার প্রবন্ধের প্রায় প্রতিটি শব্দের সাথেই একমত পোষন করছি। আমি মনে করি আপনিও আমার সাথে একমত হবেন, যে আসলে খুব কম সময়ই আমরা কোনো তাত্ত্বিক প্রবন্ধের সাথে এত বেশী মাত্রায় সমমত পোষণ করি’। চিঠিতে ডারউইন আরো উল্লেখ করেন যে প্রজাতির বৈচিত্রের প্রশ্ন নিয়ে তিনি তার গবেষণার ২০ তম বর্ষে আছেন, এবং এ বিষয়ে তিনি একটি বড় আকারের বই লেখায় বেশ অগ্রসরও হয়েছেন, যেটা তিনি আশা করছেন আগামী দুই বছরে শেষ হবে না। অনেকটা একজন সিনিয়র প্রকৃতি বিজ্ঞানীর নোটিসের মত ব্যাপারটা, যে তিনি ব্যাপারটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবছেন, এবং সময় হলে তার সম্পুর্ন মতামত প্রকাশ করবেন। কিন্তু আসলে নোটিসটা ডারউইনের জন্য প্রযোজ্য ছিল কারণ ওয়ালেস এই উত্তরের কাছাকাছি পৌছে যাচ্ছেন।

প্রজাতি যে বিবর্তিত হয় ওয়ালেসের কাছে সেটা আর তখন কোনো প্রশ্ন ছিল না, বরং কিভাবে হয়, সেটাই ছিল প্রশ্ন। ১৮৫৮ র ফেব্রুয়ারীতে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ হেলমাহেরায় ডোডিঙ্গা গ্রামের আদিবাসীদের কুটিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তীব্র জ্বরের প্রকোপে ( সম্ভব ম্যালেরিয়া), তখনই হঠাৎ করে তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি বিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসাবে তার চিন্তায় আসে। পর্যায়ক্রমে জ্বর বাড়া আর কমার মাঝে, ওয়ালেসের আর কিছু্ই করার ছিল না শুধুমাত্র, ‘ আমার পছন্দের বিশেষ কিছু বিষয় নিয়ে বার বার চিন্তা করা ছাড়া।’ ৮৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার দিনে কম্বল মুড়ি দিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে পড়া ইংলিশ অর্থনীতিবিদ থমাস ম্যালথাস এর জনসংখ্যার উপর একটা রচনার কথা ভাবছিলেন ওয়ালেস। তার মনে হলো যে, ম্যালথাস যেমন যুক্তি দিয়েছিলেন মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ মানব জনসংখ্যার লাগামহীন বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রন করে তা আসলে প্রাণিজগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তিনি ভেবে দেখলেন প্রাণিদের প্রজনন হার মানুষের চেয়ে অনেক বেশী দ্রুত আর যদি তা নিয়ন্ত্রনে না থাকতো, সারা পৃথিবীতে প্রাণিদের সংখ্যা মাত্রাহীনভাবে বেড়ে যেত। কিন্তু তার সমস্ত অভিজ্ঞতা তাকে জানাচ্ছে প্রাণিজগতের জনসংখ্যা সীমাবদ্ধ। ‘বন্য প্রাণির জীবন’ ওয়ালেসের পর্যবেক্ষনে ‘ হলো একটি অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম ( Struggle for existence)’ , ওয়ালেস আরো যোগ করলেন, ‘সকল ইন্দ্রিয়, শারীরিক এবং মানসিক শক্তি পূর্ন ব্যবহারের প্রয়োজন হয় তাদের নিজেদের অস্তিত্ব আর তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে প্রতিপালন করতে’, খাদ্যের সন্ধান, বিপদ থেকে নিজেকে বাচিয়ে চলা প্রাণি জীবনের প্রধানতম কাজ, আর দূর্বলেরা তাই টিকে থাকতে পারে না সেই সংগ্রামে দক্ষ নমুনা সংগ্রহকারী ওয়ালেস খুব ভালো করে জানতেন, একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে বৈচিত্র, “হয়তো এই সব বৈচিত্রগুলোর বা প্রকরণের…অবশ্যই প্রজাতির সদস্যদের আচরণ বা ক্ষমতার উপর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রভাব আছে, যতই তা ক্ষুদ্রতম হোক না কেন… এমন কোনো বৈচিত্র বা প্রকরণ যা কিনা কাউকে সামান্য শক্তিশালী করে, …অবশ্যই সংখ্যায় তারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে’।


ছবিঃ ইন্দোনেশিয়ার দূর্গম দ্বীপ টেরনাটে (দুরে), যেখানে ওয়ালেস ম্যালেরিয়ার সাথে যুদ্ধ করার সময় তার প্রাকৃতিক ‘নির্বাচন’ নিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে বড় তত্ত্ব নিয়ে ভাবেন


( ছবি: হেলমাহেরা দ্বীপে নতুন করে বানানো কুটির, রাসেল ওয়ালেস এখানে এ ধরনের কুটিরে শুয়ে ম্যালেরিয়ার জ্বরে ভোগার সময় ম্যালথাসে সূত্র ও বিবর্তনে চালিকা শক্তি হিসাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটির কথা ভেবেছিলেন)

জ্বর একটু কমলে যখনই তিনি কোনো মতে উঠে বসতে পেরেছিলেন, ওয়ালেস তার ধারণাগুলো মাত্র কয়েক রাতের মধ্যে সম্পুর্ন লিখে ফেলেছিলেন। তিনি তার সেই প্রবন্ধটির নাম দেন On the Tendency of Varieties to Depart indefintly from the Original বা মূল রুপ থেকে বৈচিত্রতার অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবর্তিত হবার প্রবণতা প্রসঙ্গে’, পরে তিনি তার ধারণাটিকে বলেছিলেন Survival of the fittest , যে বাক্যটি তিনি সমাজ বিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেন্সারের লেখা থেকে ধার করেছিলেন। ওয়ালেসের রচনা ‍ছিল শুধু একটা খসড়া রুপরেখা মাত্র, ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানের কেন্দ্র থেকে ১০,০০০ মাইল দুরে, ভুমিকম্পে বিধ্বস্ত একটি দ্বীপে আদিবাসীদের কুটিরে শুয়ে জ্বরের প্রকোপের মধ্যে পুরো চিন্তাটা অনুধাবন করে লেখা। ওয়ালেস সরাসরি লেখাটাকে জার্ণালে পাঠাতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন আগে তার রচনা কেউ পড়ুক। সুতরাং তিনি লেখাটি পাঠালেন একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীর কাছে, যার সাথে তিনি কেবল পত্র যোগাযোগ শুরু করেছিলেন, তিনি ছিলেন চার্লস ডারউইন।

ডারউেইনের কাছে তিনি পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়েছিলেন, যদি সেটি পড়ে ডারউইন ভালো কিছু মনে করেন তিনি যেন সেটি চার্লস লাইয়েলের কাছে পাঠিয়ে দেন। লাইয়েলের সাথে ওয়ালেসের কোনো পত্রযোগাযোগ ছিল না, কিন্ত সেই সময়ে তিনি একজন শ্রদ্ধেয় বিজ্ঞানী ছিলেন, ওয়ালেস হয়তো ভেবেছিলেন তিনি তার তত্ত্বটি পড়তে আগ্রহী হতে পারেন কারণ এটি সেই সূত্র করে ব্যাখ্যা করে যা তিনি তার সারাওয়াল ল পেপারে উল্লেখ করেছিলেন। ডারউইনই ওয়ালেসকে বলেছিলেন, লাইয়েল তার ১৮৫৫ সালের পেপারটিকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। আরেকটি কারণ হতে পারে লাইয়েল বই Principles of Geologyর বিবর্তন বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির বীপরিতে ওয়ালেস তার প্রবন্ধে কিছু যুক্তি প্রস্তাব করেছিলেন। ওয়ালেসের জানা ছিল না যে, ডারউইন বহুদিন আগেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি আবিষ্কার করেছেন (১৮৩৮);

১৮৫৮ সালেন জুন মাসের কোনো সময় ডারউইন ওয়ালেসের রচনাসহ চিঠিটি হাতে পান। রচনাটি পড়ে, তিনি হতভম্ব হয়ে যান। এতটা অবাক হতেন না তিনি যদি ওয়ালেসের পাঠানো সব বার্তাগুলোর দিকে তিনি আরেকটু মনোযোগ দিতেন। যাই হোক ওয়ালেসের পাণ্ডুলিপিটি পড়ে ডারউইন প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে তার ধারণার প্রথম খসড়া রচনার ১৬ বছর পর যা ভাবলেন তা হলো: ‘আমি শঙ্কিত যে, আমার তত্ত্বের মৌলিকতা, যতটুকু তা হোক না কেন, সবই ধ্বংস হয়ে যাবে’।

ডারউইন বিস্মিত হয়েছিলেন তার সেই প্রবন্ধটি পড়ে। ওয়ালেসের প্রবন্ধটি শুরু হয় ম্যালথাসের পপুলেশন প্রিন্সিপলটি পুনব্যাখ্যা করে: ‘বণ্য প্রাণিদের জীবন হচ্ছে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’, তিনি লেখেন, ‘কারণ প্রতিটি প্রজাতিতে যতজন বাঁচতে পারে তারচেয়ে অনেক বেশী সংখ্যক সদস্যের জন্ম হয়। আর তাদের প্রত্যেকে পরস্পর থেকে ভিন্ন। কোনো একটি প্রাণির একক অস্তিত্ব টিকে থাকাটি নির্ভর করে তার নিজের উপর, এবং যারা মারা যায় তারা অবশ্যই হচ্ছে সবচেয়ে দূর্বলতম’। এমন একটি অনুচ্ছেদ ওয়ালেস লিখেছিলেন, যেন মনে হয় তিনি তার নিজের কঠোর জীবন থেকে উদহারণ টানছেন, ‘এবং যারা তাদের অস্তিত্ব দীর্ঘায়িত করতে পারে তারা শুধু হতে পারে যারা স্বাস্হ্য আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর। কোনো উপকারী প্রকরণই যোগান দিতে সেই প্রয়োজনীয় সুবিধাটির যা বেঁচে থাকতে সহায়তা করে এবং সেই প্রকরণটি তার সন্তানদের মধ্যে হস্তান্তরিত হয়’।

তিনি লামার্কীয় বিবর্তনের সেরা উদহারণটি ব্যবহার করেন এটি ভ্রান্ত প্রমাণ করার জন্য, ব্যাখ্যা করেন জিরাফ তাদের লম্বা ঘাঢ় পায়নি সারাক্ষণ এটি লম্বা করে টানার জন্য, কারণ যে কোনো প্রকরণ, এর পূর্বসূরির মধ্যে ছিল, যেমন যাদের লম্বা ঘাঢ় ছিল, তারা সুবিধা পেয়েছিল তাদের ছোট ঘাঢ় সহ সদস্যদের চেয়ে কারণ তারা বেশী খাদ্য খুঁজে পেয়েছিলো, যখন আরো উচু গাছের ডালে তারা তাদের খাদ্য পেয়েছে। আর এই পার্থক্যগুলো পুঞ্জিভূত হেয়ে সময় অতিক্রান্ত হয়ে একসময় নতুন রুপের সৃষ্টি করে। এখানেই আমরা একটি সাধারণ নিয়মে কিভাবে প্রজাতি বিকাশ ও দ্বিবিভাজিত হয়, যা প্রকৃতিতে ঘটে তার একটি ধারণা পাই –

আর ডারউইন ওয়ালেসের শব্দগুলোকে তার তত্ত্বটির নিখুত একটি সংক্ষিপ্ত রুপ হিসাবে পাঠ করেন। হতাশ ডারউইন পাণ্ডুলিপিটি পাঠান ওয়ালেসের অনুরোধ মতই লাইয়েলের কাছে পাঠান, সাথে তার একটি চিঠিতে লেখেন, ‘আপনার কথাই সত্য হলো’, প্রাকৃতিন নির্বাচনের তত্ত্বটি যখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি লাইয়েলকে জানিয়েছিলেন, লাইয়েল বলেছিলেন আপনি যদি এটি প্রকাশ না করলে অন্য কেউ সেটি করবে, ডারউইন তাকে বলেছিলেন ‘আমার ১৮৪২ এর পাণ্ডুলিপিটি হাতে পেলেও এর চেয়ে ভালো সংক্ষিপ্ত রুপটি দিতে পারতো না ওয়ালেস। আমার যা মৌলিকত্ব ছিল তার সবটাই গেছে’। তবে ডারউইন তার প্রাথমিক হতাশায় খোনিকটা অতিরঞ্জিত করেই কথাটি বলেছিলেন, কারণ তার খুব বিস্তারিতভাবে ভাবা তত্ত্বটির সাথে ওয়ালেসের একটি অন্তর্দৃষ্টি নির্ভর ভাবনা কিছূ পার্থক্য ছিল। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ডারউেইন একক সদস্যদের মধ্যে প্রতিযোগিতার উপর জোর দিয়েছিলেন বেশী, আর ওয়ালেস প্রকরণের উপর পরিবেশগত নিয়ামকগুলোর চাপকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তার ব্যাখ্যায়। আর লাইয়েল ‍দুজনের অবদানকে শনাক্ত করেছিলেন, হুকারকে সাথে নিয়ে তিনি লিনিয়ান সোসাইটিতে একটি সেমিনারের আয়োজন করেন এবং সেখানে ওয়ালেসের প্রবন্ধটি ডারউইনের এর আগে দুটো প্রবন্ধের সাথে পাঠ করা হয়। ওয়ালেস কিছুই জানতেন না এ বিষয়ে, কিন্তু পরে তিনি সন্তষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। ডারউইন দ্রুত তার তত্ত্বটি বিস্তারিতভাবে লিখতে বসেন।

ওয়ালেসের প্রবন্ধটিকে ( না তাকে জানানো হয়নি) ডারউইনের অপ্রকাশিত প্রবন্ধের সাথে একইসাথে ১৮৫৮ সালে ১ জুলাই Linnean Society of London এর সভায় পাঠ করার সিদ্ধান্ত নেন। সমিতির জার্নালে ২০ আগষ্ট এটি প্রকাশিত হয়েছিল On the Tendency of Species to Form Varieties; And On the Perpetuation of Varieties and Species by Natural Means of Selection”, ডারউইনের অবদানকে ওয়ালেসের প্রবন্ধের আগে রাখা হয় তার অগ্রাধিকার দিয়ে। ওয়ালেস মন্তব্য করেছিলেন তাকে না জানিয়ে কোনো প্রুফ সংশোধন ছাড়াই লেখাটি প্রকাশ করা হয়েছে, যা লাইয়েল আর হুকারের সূচনা মন্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।

এছাড়া হতভম্ব হবার কারণটা আরো স্পষ্ট হয়, যদি ডারউইনের পরিকল্পিত বড় আকারের একটা বইটির সম্প্রতি সমাপ্ত খসড়া দুটি অধ্যায়, আমরা ওয়ালেসের রচনার ভাষার সাথে তুলনা করি। ফেব্রুয়ারী, ১৮৫৭ সালে, ডারউইন তার বইয়ের ৫ম অধ্যায়েলেখেন এবং নাম দেন ‘প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাবে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম’ , এর পরের মাসেই তিনি ৬ ষ্ঠ অধ্যায় শেষ করেন যেখানে ব্যাখ্যা করেন যে: সমস্ত প্রকৃতি, যুদ্ধরত.. এই সংগ্রামে প্রায়শই বর্তায় ডিম বা বীজের উপর, অথবা চারাগাছে … যে কোনো বৈচিত্র বা প্রকরণ, তা যে যতই ক্ষুদ্রতম হোক না কেন, যদি তা জীবনের যে কোনো অংশে যদি সামান্যতমভাবে জীবের উপকার করে, সেই বৈচিত্রগুলো পরবর্তী প্রজন্মে সুরক্ষিত হয় বা নির্বাচিত হয়’। দু্ই লেখকের কেউই একে অপরের চিন্তা বা রচনা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন না। তাহলে আমরা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো ভাষার এই লক্ষনীয় সদৃশ্যতা -অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম এবং ক্ষুদ্রতম বৈচিত্র?

মহান মনিষীরা একই ভাবে চিন্তা করেন।

ডারউইন এবং ওয়ালেস দুজনই প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং বুঝেছেন এটা আসলে একটা যুদ্ধক্ষেত্র। দুজনেই একই প্রজাতিরই অনেক নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন যে, বুঝতে পেরেছিলেন প্রজাতির মধ্যে বৈচিত্রতা । দুজনেই দেখেছিলেন সামান্য ভিন্ন প্রজাতিরা নির্দিষ্ট দ্বীপে সীমাবদ্ধ এবং অনুধাবন করেছিলেন প্রজাতি পরিবর্তিত হয়। দুজনেই ম্যালথাসের রচনাটি পড়েছিলেন,বুঝতে পেরেছিলেন জনসংখ্যার উপর এর গুরুত্ব। একই ধরনের স্বাক্ষ্যপ্রমাণ তাদের প্রায় একই ধরনের উপসংহারে নিয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও ডারউইন, প্রজাতির উদ্ভব সম্বন্ধে তার প্রথম অনুধাবনের ২০ বছর পরও শঙ্কিত হয়েছিলেন যে,‘আমার সব মৌলিকতা, যতটুকুই থাকুক না কেন, সব তুচ্ছ হয়ে যাবে।’

সামান্য একটু গর্বিত

ওয়ালেসের পাণ্ডুলিপি ডারউইনের হাতে আসার পর আসলে কি ঘটেছিল তা এখনও বিতর্কের বিষয় কিছু কিছু পন্ডিতদের মধ্যে। মূল সত্যটা হলো যে, ওয়ালেস ডারউইনকে তার রচনার পাণ্ডুলিপি ভূ-তত্ত্ববিদ স্যার চার্লস লাইয়েল বরাবর পাঠাতে অনুরোধ করেছিলেন, যা ডারউইন করেছিলেন। স্যার লাইয়েল এবং প্রখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী জে ডি হুকার, যারা দুজনেই ঘনিষ্ট ছিলেন ডারউইনের, যাদের কাছে আগেই ডারউইন তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব এবং এর স্বপক্ষে মৌলিক সব যুক্তিগুলো ব্যাক্তিগতভাবে প্রকাশ করেছিলেন। লাইয়েল এবং হুকার উদ্যোগ নেন ওয়ালেসের প্রবন্ধটি এবং সাথে ডারউইনের রচনার একটি সংক্ষিপ্ত রুপ আসন্ন লিনিয়ান সোসাইটির সভায় যৌথভাবে পাঠ এবং প্রকাশ করার জন্য ( ১ জুলাই, ১৮৫৮)।


(ছবি: ১৮৫৮ সালের আগষ্টে প্রকাশিত চার্লস লায়েল এবং জে ডি হুকারের প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ। যেখানে যৌথভাবে দুটি পেপার পড়ার কথা উল্লেখিত হয়েছে)

আবিষ্কার করার একক গৌরব কি ওয়ালেসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল? যৌথ প্রকাশনার ব্যপারটা কি সঠিক ছিল? (যৌথ প্রকাশের আগে বিষয়টা কিন্তু ওয়ালেসকে জানানোই হয়নি ), অপরদিকে ডারউইনই কিন্তু প্রথম ‘প্রাকৃতিক নির্বচন’ বা ন্যাচারাল সিলেকশন শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং তিনি তার ১৮৪২ সালের ধারণাগুলোর প্রাথমিক রুপরেখা, অন্ততপক্ষে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক ভাবে, অন্য বিজ্ঞানীদের সামনে প্রকাশও করেছিলেন।
তবে এটা সত্যি কথা, আজ ডারউইনের নাম আর তার কর্ম ওয়ালেসের তুলনায় অনেক বেশীই পরিচিত। কিন্তু একবার ভেবে দেখুনতো এ বিষয়ে ওয়ালেসের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হতে পারে। তিনি সবসময় এর কৃতিত্বটা ডারউইনকেই দিয়েছেন। মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞে থাকাকালীন সময়ে, ডারউইনের কাছ থেকে ‘অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটার একটি কপি তিনি হাতে পান। বার বার বইটা তিনি পড়েন। তারপর তার প্রতিক্রিয়া বন্ধু বেটসকে ব্যক্তিগত একটা চিঠিতে প্রকাশ করেন:

‘আমি জানিনা কিভাবে এবং কার কাছে আমি ডারউইনের এই বইটার প্রতি আমার প্রশংসাটা সম্পুর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারব … আমি সততার সাথে বিশ্বাস করি, যতই ধৈর্য্য নিয়ে আমি বিষয়টা নিয়ে কাজ এবং গবেষণা করি না কেন, আমি কখনোই এই বইয়ের মতো বিষয়টির সম্পুর্ণতার কাছে পৌছাতেই পারবো না, – এর সুদৃঢ় যুক্তি, অপুর্ব ভাষা আর প্রাণশক্তি … ডারউইন একটা নতুন বিজ্ঞান এবং একটা নতুন দর্শনের সৃষ্টি করেছেন, আর আমি ‍বিশ্বাস করি, মানুষের জ্ঞানের কোনো শাখাতেই এমন পুর্ণতার আর কোনো নজির নেই, যা কিনা কেবল একজন ব্যাক্তির পরিশ্রম আর গবেষণার ফসল।’

এই চিঠিতে যেমন না, তার বাকী দীর্ঘ জীবনে কোনোদিনও (৯০ বছর পর্যন্ত্য বেঁচে ছিলেন তিনি) ওয়ালেস একটিও অনুশোচনা, বিদ্বেষ বা ক্ষোভের শব্দ উচ্চারণ করেননি। তিনি সবসময় একে ডারউইনীয় তত্ত্ব বলেই উল্লেখ করেছেন। ১৮৬৯ সালে তার ভ্রমন নিয়ে লেখা সবচে বড় বইটা The Malay Archipelago তিনি উৎসর্গ করেন এভাবে: ‘চার্লস ডারউইনকে, The Origin of Species এর লেখক, শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত শ্রদ্ধা বা বন্ধুত্বতার চিহ্ন হিসাবে নয়, তার কর্ম আর প্রতিভার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে’। ১৯০৫ সালে তার নিজের আত্মজীবনী My Life এর একটি পুরো অধ্যায় তিনি ডারউইনের সাথে তার ব্যাক্তিগত বন্ধুত্বের বিবরন দিয়েছেন, যেখানে একটি শব্দও ছিলনা অনুশোচনার, ঈর্ষার বা কোনো অসন্তোষের।

হয়তো ওয়ালেসের কাছে মুল ব্যাপারটাই ছিল বিজ্ঞানী সমাজে তার স্বীকৃতি আর গ্রহনযোগ্যতা পাওয়া নিয়ে। ১৮৫৮ সালের আগ পর্যন্ত তিনি যারা চিন্তার জগতে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এমন সব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের -আসরে ছিলেন একজন বহিরাগত। যখন তিনি জানতে পারেন যে লাইয়েল এবং হুকার তার প্রবন্ধ সম্বন্ধে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন, তিনি তার পুরাতন বন্ধু আর স্কুলের সহপাঠীকে লেখেন যে, ‘আমি সামান্য গর্ববোধ করছি..’, ওয়ালেস ঐ চক্রের কেন্দ্রে থাকতে চাননি. শুধুমাত্র তিনি বিজ্ঞানীদের চক্রের ভেতরে ঢোকার সুযোগ চেয়েছিলেন। আর সেটা, এবং আরো অনেককিছু -তিনি নিঃসন্দেহে অর্জন করেছিলেন।


(ছবি: ওয়ালেস, (ছবিতে তার জীবনের শেষে). ১৮৫৮ সালে ডারউইনকে তার রচনাটা পাঠানোর জন্য কোনোদিনও মনস্তাপে ভুগেছিলেন কিনা, তা কখনো প্রকাশ করেননি)

?itok=5ruML4q-” width=”400″ />
( ছবি: ওয়ালেস, তার স্ত্রী অ্যানি ও মেয়ে ভায়োলেট। ওয়ালেস মারিওন লেসলীকে ভালোবেসেছিলেন একসময়, এমনকি তাদের বিয়ের সব আয়োজনও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মারিওন সেই বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ওয়ালেস তার আত্মজীবনীতে তার সম্ভাব্য কারণ হিসাবে বলেছিলেন, তার অর্থ উপার্জন করার অনিশ্চয়তা, বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। তবে তিনি খুব মর্মাহত হয়েছিলেন, ডারউইনের কাছে একটি চিঠিতে লেখেন, আপনি হয়তো কল্পনা করতে পারবেন আমি কতটা দূঃখ পেয়েছি, যখন আপনাকে আমি বলবো, আমার জীবনে এর আগে আমি কোনো নারীর দেখা পাইনি যাকে আমি ভালোবাসতে পারি আর এই ক্ষেত্রে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমি সত্যিকারের কারো কাছে বিনিময়ে ভালোবাসাও পাচ্ছি’। তিনি বিষয়টি খুব বেশী কাউকে জানাননি। ডারউইনকে তার ব্যক্তিগত কথা বলার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছিলেন। তার এই হৃদয় ভাঙ্গার যন্ত্রণা তিনি ভুলতে পেরেছিলেন যখন তার সাথে অ্যানি মিটেন এর দেখা হয়েছিল। বিখ্যাত প্রকৃতি বিজ্ঞানী উইলিয়াম মিটেন এর কন্যা অ্যানিকে তিনি বিয়ে করেছিলেন ১৮৬৬ সালে। বাকী জীবন তারা এক সাথেই ছিলেন।)

ওয়ালেস তার বাকী জীবন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করে গেছেন, এছাড়া নানা বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। প্রায় ১০০০ প্রবন্ধ আর ২২ টি বই তিনি লিখেছিলেন ( যেমন The Malay Archipelago, The Geographical Distribution of Animals, Island Life , Darwinism), বহু সন্মানে তিনি ভূষিত হয়েছেন। ১৯১৩ সালের ৭ নভেম্বর তিনি ঘুমের মধ্যেই মারা যান।। তার মৃত্যুর খবর নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সম্বন্ধে লেখে “the last of the giants belonging to that wonderful group of intellectuals that included, among others, Darwin, Huxley, Spencer, Lyell, and Owen, whose daring investigations revolutionised and evolutionised the thought of the century.” ওয়ালেসের কয়েকজন বন্ধু প্রস্তাব করেছিলেন তার সমাধি ওয়েস্টমিনিষ্টার অ্যাবিতে দেয়া হোক, কিন্তু ওয়ালেসের স্ত্রী তার স্বামীর অনুরোধ অনুযায়ী তাকে সমাধিস্থ করা হয় ডরসেটের ব্রডস্টোনে ব্রডস্টোন সিমেট্রিতে। ১৯১৫ সালে তার একটি নামের একটি মেডালিয়ন ওয়েষ্ট মিনিস্টার অ্যাবিতে ডারউইনের মেমোরিয়োলের পাশে স্থাপন করা হয়।


ছবি: ব্রডস্টোন সমাধিক্ষেত্রে ওয়ালেস এর সমাধি। ২০০০ সালে এটিকে জীর্ণদশা থেকে সংস্কার করে A. R. Wallace Memorial Fund, ১৯১৩ সালেই পোর্টল্যান্ডে পাওয়া একটি জীবাশ্ম গাছের ৭ ফুট দীর্ঘ কান্ড Purbeck লাইমস্টোন এর বেদীতে স্হাপনা করা হয়। ২০০০ সালে একটি সন্মানসুচক প্লেকও স্হাপন করা হয় মার্বেল পাথরের ভিত্তিতে)

?w=660″ width=”400″ />
(ছবি:ওয়ালেসের সমাধিতে স্হাপিত নতুন প্লেক)


(ছবি: লিনিয়ান সোসাইটিতে যৌথ পেপার পড়ার শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মারক প্লেক)

প্যাট্রিক ম্যাথিউ, প্রাকৃতিক নির্বাচন ধারণাটি আবিষ্কারের আরেকজন দাবীদার

প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারণাটি ডারউইন কিংবা ওয়ালেস দুজনেই আরেকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন বলে কখনো দাবী করা হয়। ঘটনাটির সূচনা হয়েছিল ১৮৬০ সালে অন দি অরিজিন অব স্পিসিস বইটির পর্যালোচনা করে টি এইচ হাক্সলির লেখা একটি প্রবন্ধ Gardeners’ Chronicle তাদের ৩ মার্চ সংখ্যা যখন পুনপ্রকাশ করেছিল। প্যাট্রিক ম্যাথিউ সেটি পরে পরের মাসেই একটি চিঠি পাঠান এই পত্রিকাতে, যেখানে তিনি দাবী করেন, এটাই তিনি বর্ণনা করেছেন ও ফরেস্ট্রিতে এর প্রয়োগ নিয়ে তিনি আলোচনা করেছিলেন ১৮৩১ সালে তার On Naval Timber and Arboriculture নামের বইটিতে। তিনি বইটির অ্যাপেনডিক্স থেকে একটি সংক্ষিপ্ত অংশের উদ্ধৃতি দেন। তবে তিনি বিষয়টি বিস্তারিতভাবে কোনো যুক্তি বা গবেষণা লদ্ধ কোনো ব্যাখ্যা এর স্বপক্ষে যুক্ত করেননি এছাড়াও ধারণাটি নিয়ে তিনি কোনো কাজও করেননি এরপর।


(ছবি: প্যাট্রিক ম্যাথিউ (১৭৯০-১৮৭৪)

ডারউইন এর উত্তর দিয়েছিলেন দূঃখ প্রকাশ করে যে তার এই বইটির এই সংক্ষিপ্ত বাক্যটি তিনি পড়েননি। ডারউইন অবশ্য তার বইটির পরবর্তী সংস্করণে যুক্ত করেছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মূল নীতিটি প্যাট্রিক ম্যাথিউর ১৮৩১ সালে বইটির অ্যাপেনডিক্সে সংক্ষিপ্ত বাক্যটিতে করা হয়েছিল। সুতরাং ডারউইন ও ওয়ালেসের পর প্রজাতি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভূমিকা থাকতে পারে এটি স্বতন্ত্রভাবে ভেবেছিলেন আরো একজন। তবে তিন জনের মধ্যে একমাত্র ডারউইন দীর্ঘ দুই দশক ধরে ধারণাটি নিয়ে ব্যপকভাবে ভেবেছিলেন ও বিকশিত করেছিলেন অসংখ্য স্বাক্ষ্য প্রমাণ সহ। এর আগেও কয়েকজন ধারণাটিকে চিহ্নিত করেছিলেন কোনো একটি প্রজাতির মধ্যে নানা ধরনের প্রকরণ সৃষ্টি করার প্রক্রিয়া হিসাবে, (যেমন ১৭৯৪ সালে জেমস হাটন, ১৮১৩ সালে উইলিয়াম চার্লস ওয়েলস, পরে ১৮৩৫ সালে এডওয়ার্ড ব্লাইথ)। এই বিতর্কটিকে সম্প্রতি ২০১৪ সালে বিতর্কে ফিরিয়ে আনেন অপরাধ বিজ্ঞানী মাইক সাটন, বিষয়টিকে নলেজ কন্টামিনেশন হিসাবে।

তিনি দাবী করেন ডারউইন ও ওয়ালেস দুজনেই প্যাট্রিক ম্যাথিউর ধারণাটি দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন সম্ভবত পরোক্ষভাবে, বিশেষ করে রবার্ট চেম্বার্স এর জনপ্রিয় বই Vestiges of the Natural History of Creation বইটি দ্বারা, কারণ চেম্বার্স নিজেই প্রভাবিত হয়েছিল। অবশ্যই জটিল ও পরোক্ষ একটি দাবী, বিষয়টি নিয়ে তিনি কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিতে পারেননি। এছাড়াও ডারউইনকে যখন ম্যাথিউর চিঠিটি পড়েছিলেন, তিনি তার পরের সব সংস্করণে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলে বিষয়টি নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ধারণাটি প্রকাশ করার জন্য। আর ডারউইনের এই ভদ্রতাটি উৎসাহিত করেছিল ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকদের।

বিবর্তন তত্ত্বটি ইতিহাস নিয়ে কাজ করা ঐতিহাসিকরা একমত যে এ ধরনের প্রচেষ্টা আসলে ডারউইনের অবদানকে অবমূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা এবং যা বিজ্ঞানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সম্বন্ধে অজ্ঞতা প্রকাশ করে: নির্বাচনের মৌলিক ধারণাটি ম্যাথিউ তার সংক্ষিপ্ত বাক্যে ঠিকই প্রকাশ করেছিলেন, তবে তিনি সেটি যুক্ত করেছিলেন জাহাজ বানানোর জন্য কিভাবে ভালো গাছের চাষ করা যায় সেই সংক্রান্ত একটি বইয়ের অ্যাপেনডিক্সে। কেউ তাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহন করেননি, ডারউইনবাদের ক্রমবিকাশে যার কোনো অবদানই ছিল না। শুধুমাত্র কেউ কিছু সবার আগে ভেবেছে এমন দাবী তাকে বিজ্ঞানের ইতিহাসে জায়গা করে দেয়না। তাকে সেই ধারণাটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে আর অন্যদের কাছে সেটি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে কোনো ক্ষেত্রে সত্যিকারের অবদান রাখার জন্য। ডারউইনের খুব সতর্ক নোটবুকের কোথাও ( ডারউইন খুবই সতর্ক ছিলেন তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে) বিষয়টি উল্লেখ নেই। জীববিজ্ঞানী ও দার্শনিক আর্নস্ট মায়ার আরো স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে প্যাট্রিক ম্যাথিউ সঠিক ধারণাটি করেছিলেন, ঠিক যেমন ডারউইন করেছিলেন ১৮৩৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, কিন্তু তিনি ডারউইনের মত তার জীবনের পরবর্তী বিশ বছর নিবেদন করেননি এটিকে বিবর্তনের একটি দৃঢ় তত্ত্বে রুপান্তর করার জন্য, আর সেকারণে তার কোনো প্রভাব নেই। সাটনের ব্যাখ্যার প্রেক্ষিতে ডারউইনের জীবনীকার জেমস মুর বলেছিলেন, উনবিংশ শতাব্দীতে অনেকেই এমন ধারণার সংশয়ে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু একমাত্র ডারউইন বিষয়টি সত্যিকারভাবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, প্যাট্রিক ম্যাথিউ নিয়ে বিতর্কটি আসলে কোনো সমস্যা নয়। বহু মানুষই প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিষয়টি বুঝেছিলেন, কিন্তু একমাত্র ডারউইনই জীবনের একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে এই গ্রহের সব কিছুর উপর ধারণাটি প্রয়োগ করেছিলেন। আর এটাই তার লিগেসী।

( সমাপ্ত)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

47 − = 42