ধর্ষক তৈরির কারখানা বন্ধ করতে হবে

আপনি ধর্ষকের বিচার চাইছেন, কারণ আপনি মনে করেন “কঠিন বিচার হলে ভবিষ্যতে আর কেউ ধর্ষক হতে সাহস করবেনা”। আপনার এই মনেকরা এবং একমাত্র এটিই প্রচার করা যে ধর্ষণ একটি “আইনি” সমস্যা, ধর্ষণকে অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে। আপনার এই খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচার আসলে ধর্ষণের মত অপরাধের মুল ও বহুমুখী কারণ আড়াল করছে। ধর্ষণের জন্য আপনিও দায়ী।

যে পিতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থা, যে পৌরুষবোধ, যে ক্ষমতাকাঠামো এবং যে মনস্তত্ব ধর্ষক তৈরি করছে, আপনি সেই ধর্ষক তৈরির কারখানা সম্পর্কে নীরব কেন?

আপনার ছেলে, আপনার ভাই, আপনার চাচা-মামা-খালু, আপনার গ্রামের চেনা ছেলেটিকে আপনি হঠাত আবিষ্কার করছেন ধর্ষক হিসেবে। আপনি চীৎকার করছেন কঠিন বিচারের, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। আপনি কেন ধর্ষক তৈরির কারখানাটা নিয়ে কথা বলেন না? এই কারখানা কেন বন্ধ করতে চাননা?

ধর্ষক তৈরির কারখানা প্রথমে আপনার ঘর, আপনার স্কুল, আপনার ধর্মের মৌলবাদী সংস্কৃতি, আপনার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো, আপনার শ্রেণী অবস্থান, এক কথায় আপনার সমাজের “পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকায়ন”। হ্যাঁ, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকায়ন।

বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকায়ন প্রতিটি পুরুষকে ধর্ষক হতে উৎসাহিত করে। নারীকে হীন, দুর্বল, ভোগ্যবস্তু ও যৌনবস্তু হিসেবে শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে। আমাদের ভাগ্য ভালো যে অনেক সুস্থ্য পুরুষলোক আছে। এই ব্যাবস্থায় সুস্থ্য পুরুষ হওয়া বেশ কঠিন।

সম্পত্তিতে নারীর পুরুষের চেয়ে অর্ধেক অধিকার। এই অসম অধিকার নিয়ে কিন্তু আপনি কথা বলছেন না। ওআজ মাহফিল থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীকে যৌন ও ভোগ্যবস্তু হিসেবে উপস্থাপিত করছে, আপনি কিন্তু নিশ্চুপ। বড়লোকের ছেলে, দলের কর্মী, আপনার পুরুষ আত্মীয়ের বিরুদ্ধে কোন মেয়ে অভিযোগ করলে আপনি এই পুরুষের পক্ষ নেন। আপনি স্কুলে কিশোরদের যৌন শিক্ষার বিরুদ্ধে। আপনি হিজাব আর বোরখার পক্ষ নেন, এই পোশাকের যৌনবাদী বার্তা জেনেও।

আপনি নারীকে হীন ভাবার, অসম্মান করার ও নিপীড়ন করার এই ব্যাবস্থার পক্ষের একজন। এই ব্যাবস্থা থাকলে ধর্ষণ হবেই।

ধর্ষক উৎপাদন বন্ধ হলে ধর্ষণ বন্ধ হবে। ধর্ষক উৎপাদন বন্ধ করতে হলে, প্রথমেই প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক সামাজিকায়ন বদলাতে হবে। আইন লাগবে নারী-পুরুষ সমতার, নারী নীতি লাগবে, স্কুলে কলেজে ছেলে মেয়েদের যৌন শিক্ষা লাগবে, ভালোবাসা শিক্ষাও লাগবে। রাষ্ট্র কখন এটি করবে, সেজন্য অপেক্ষা না করে নিজ নিজ ঘরেই এটি চালু করা সম্ভব।

আসুন, আমরা ধর্ষক উৎপাদন ব্যাবস্থাটা বদলানোর জন্য কি কি নিজেরা করতে পারি, রাষ্ট্র কি করতে পারে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ভাবে কথা বলি। নারী নীতি চাই, আইন চাই, শিক্ষা সংস্কার চাই। ধর্ষক তৈরির পক্ষের লোকেরা আপনার এই চাওয়ার বিরোধিতা করছে ও করবে, ধর্মের নামে, ঐতিহ্যের নামে। তাদের নিয়েও ভাবতে হবে।

ধর্ষণের বিচার চান, ভালো কথা, কিন্তু আপনি যদি ধর্ষক তৈরির কারখানা বন্ধ করতে না চান, চূড়ান্ত বিচারে আপনিও ধর্ষকের পক্ষের লোক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3