সাদাকালো কিন্তু ৩৫ মি.মি. নয়, বিটিভি কথা…

সাদাকালো ১৪ ইঞ্চি টিভিতে কোনো কোনো শুক্রবার, ক্ষেত্র বিশেষে শনিবার কিংবা ইদের সময় ঘড়ি দেখে দেখে বেলা তিনটে কিংবা তিনটে পনেরোতেই টিভিটা অন করতাম আমরা। কিংবা তখনকার মাসিক ‘টেলিভিশন’ পত্রিকার সময়সূচি দেখে টিভি অন করতাম।এর একটাই প্রধান কারণ ছিলো আমরা ব্যাটারি দিয়ে টিভি চালাতাম। বিদ্যুৎ তখনো স্বপ্ন। রাতে অবস্থাপন্নরা জেনারেটর দিয়ে ঘর আলোকিত করতেন, টিভি চালাতেন। কেউ কেউ রঙিন টিভিও চালাতেন। কেউবা ভিডিও দেখতেন। অনেক সময়-ই ঘটা করে ঘোষণা দিয়ে গ্রামের সবাইকে নিয়ে একসাথে ভিডিও দেখাতেন। সে কি উত্তেজনা সেদিন, সে রাতে! হইহই কান্ড, রৈ রৈ ব্যাপার বটে! সে এক অন্য প্রসঙ্গ। যাই হোক, টিভির ঘোষকের ঘোষণার অপেক্ষায় থাকতাম আমরা।

‘দেখো দ্যাখোরে রোমানার বাহার…’ কিংবা ‘রানি রানি বৌরানি…’ এইসব বিজ্ঞাপন শেষ হয়েছে কি হয়নাই হঠাৎ-ই সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে একদম ‘আলিফ লায়লা’র জিনের মতো ‘সুপ্রিয় দর্শক, এখন দেখবেন পূর্ণদৈর্ঘ্য…’ বলে ঘোষক হাজির। পরিপাটি করা, সাজগোজ, শাড়িটা ‘ভি’ আকৃতির করে গলার দিকে টেনে নেওয়া, চমৎকার হাসি, আর মিটি মিটি চাহনি দিয়ে ঘোষক হাজির হতেন। স্যুট-টাই, ক্লিন শেভড, ব্যাকব্রাশ করা চুল তথা কেতাদুরস্ত ভাবের পুরুষ ঘোষকও মাঝেমধ্যে হাজির হতেন। তবে আমাদের নজর বা আকর্ষণ থাকতো মহিলা ঘোষকের দিকে। শুধু কি আমাদের? ছেলে-বুড়ো সবারই। সবাই কেমন সম্মোহিত হয়ে কান পেতে ঘোষণা শুনতাম। যতোটা না সিনেমার কথা ততোটা ঘোষকের! মা-চাচি-ভাবি ও বোনেদের ফিসফাস আলাপে বেশ আফসোসের সুরে শোনা যেতো। দেখেছো শাড়িটা কেমন কাজ করা কিংবা কানের দুলটা বা গলার নেকলেসটা? একদম নতুন। অথচ গতো দুই সপ্তাহ আগে কিংবা বৃহস্পতিবার রাতে ‘সাপ্তাহিক নাটকে’র আগে ঘোষণার সময়ও অদ্ভুত সুন্দর ম্যাচ করা শাড়ি গহনা পরেছিলো, না? সাদাকালো টিভিতে তাঁরা এতো কিছু কিভাবে দেখতেন বা ঠাহর করতেন সে এক রহস্য বটে!

অত:পর জসিম কিংবা সোহেল রানার নাম শুনলেই আমরা আনন্দে হইহুল্লোর শুরু করে দিতাম। ববিতা, শাবানা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ কিংবা চম্পা আর ভিলেন হিসেবে রাজীব, এটিএম শামসুজ্জামান কিংবা খলিল বা গোলাম মোস্তাফা কিংবা আদিল আর সাথে যদি কৌতুক অভিনেতা মতি, টেলি সামাদ কিংবা দিলদার হোন তাতেই কেল্লাফতে! সবাই বলাবলি করতাম আজ হবে ধুন্ধুমার কান্ড! সিনেমার সূচনা সংগীত দিয়েই আমরা অনেক কিছুই আন্দাজ করে নিতাম।

‘ডু-ডু-ডু-উ-উ-উ-উশ’ কিংবা ‘হো হো হো হো-উ-উ-উ…হু-উ-উ-উ-উশ’ জাতীয় নেপথ্যে সংগীত হলে চট করেই বুঝে নিতাম আজ খেলা জমে যাবে। অথবা ঘোড়ার হিস হিস হিস চিৎকার কিংবা মোটরবাইক বা কারের দৌড়ের দৃশ্য। পেছনে পেছনে তলোয়ার বা পিস্তল হাতে নায়ক তাড়া করছে। ভিলেন মরিয়া হয়ে পালাচ্ছে। উত্তেজনায় আমাদের সিনা টানটান হয়ে যেতো।
চেহারায় কেমন কাঠিন্য দেখা দিতো। পেশীতন্ত্র কেমন ব্রুসলি টাইপ হয়ে যেতো। আপনাতেই মুষ্টিবদ্ধ হাত হয়ে যেতো… অদ্ভুত এক মারকুটে শক্তি শরীরে ভর করতো আমাদের! আবার যেদিন রাজ্জাক-আলমগির কিংবা ফারুকের নাম ঘোষণা দিতো সেদিনও আমরা ‘আ-আ-আ-হ-হ-হ আ-হ-হ-আহ’ এই ধাঁচের করুণ নেপথ্যে সংগীত দিয়ে যদি সিনেমা শুরু হতো সেদিনও বুঝে যেতাম আজ করুণ-কাহিনির সিনেমা শুরু হবে। সদ্য কলেজ পড়ুয়ারা তখন কেউ কেউ বলতেন ট্র‍্যাজেডি হবে আজ। ঠেলা গাড়ি ঠ্যালা, ইট-পাথর ভাঙা, রিকশা চালনা কিংবা বাসা বাড়ির থালাবাসন ধোয়ার কাজ দিয়ে শুরু হতো এসব সিনেমা। আনোয়ারা, আনোয়ার হোসেন, শওকত, প্রবীর মিত্র, রওশন জামিল অধিকাংশ সিনেমায় এঁদের এইসব কাজের দৃশ্য দিয়েই শুরু হতো সিনেমা। কখনো শাবানা, আলমগির, জসীম এঁদের দিয়েও শুরু হতো।

চোখের পলকেই একের পর এক অবিশ্বাস্য কাণ্ডকারখানা চলছে। ভিলেন নায়কের বাবাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সমস্ত বিষয় সম্পত্তি দখল করে নিচ্ছে। মা অসহায় সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। ইট-পাথর ভাঙছেন। কিংবা বাসা বাড়িতে কাজ করছেন। নিজে না খাইয়ে সন্তানকে খাওয়াচ্ছেন। মানুষ করছেন। দর্শকের চোখের জল টলটল করে। মেয়েরা নাক ঝাড়েন। কেউবা কান্না লুকোতে আড়ালে চলে যান। মোদ্দাকথা সিনেমায় বুদ দর্শক। শ্বাস ফেলারও ফুসরত নেই। শ্বাস-প্রশ্বাস যা বেরোয় তা দীর্ঘশ্বাস। এমনি স্নায়ুবিকল সময়ে বিজ্ঞাপন বিরতি… এতে যেনো অনেকেই হাফ ছেড়ে বাঁচেন। দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করেন। কেউ কেউ পান-বিড়ি ফুঁকেন।

মা-আ-আ-আ-আহ চিৎকার! কী হলো? নায়ক ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে মেট্রিক পাশ করেছে। সেই খুশি দর্শক মনকেও ছুঁয়ে যায়। খানিক রক্তাভ আভা গালে পড়ে দর্শকমহলে। এই দেখে দর্শকদের মধ্যে কেউবা আসন্ন মেট্রিক পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় কিভাবে পাশ করা যায় সেই চিন্তায় মগ্ন…! কিংবা নায়ক চাকুরি পেয়েছে। চিৎকার, আনন্দে মিষ্টিমুখ চলছে বা বেখেয়ালে নায়িকার সাথে ধাক্কা লেগে নায়িকার বইপত্তর হাত থেকে পড়ে গেছে অথবা দু’জনেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে অপলক তাকিয়ে আছেন এমতাবস্থায়… সংবাদ! খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা বিদেশি কারও সাথে সহাস্যে করমর্দন করছেন। সাদাকালো টিভিতেও স্পষ্ট দেখতাম মুহুর্মুহু ফ্ল্যাশ হচ্ছে। উনারা হাসছেন। পরিপাটি ইস্ত্রি করা শাড়ি চেপে রাখা হাসি… অপেক্ষাকৃত বয়সী দর্শকেরা কৌতুহল নিয়ে খবর দেখতেন। দেখার জন্য আবদার করতেন। কেউ কেউ হু.মু. এরশাদের খবর কেনো দেখায় না বলে আফসোস করতেন। কেউবা বলতেন এরশাদ জেলে বসে, জেলের এক পাশেই নাকি বরইগাছ পুঁতেছেন। দু’টা। একটা বেগম জিয়ার নামে, অন্যটা শেখ হাসিনার নামে। আমরা খবর না বুঝারা পিটপিট করে তাকাতাম এসব শোনে!

বিশ্বসংবাদে দেখতাম ফিলিস্তিনি মুসলিমদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র। ইজরায়েল নামক ইহুদি রাষ্ট্র কিভাবে মুসলমানদের পাখির মতো গুলি করে, সামনাসামনি পিটিয়ে হত্যা করে মেরে ফেলতেছে। তা দেখে এই খবর না বুঝা আমরা কিভাবে জানি স্বধর্মের ভাইয়েদের করুণ কাহিনি বুঝে ফেলতাম। কিংবা বড়োদের বলাবলি দেখে বুঝে নিতাম। আমরা ঘৃনায় থু থু জমিয়ে কোঁৎ করে গিলেও ফেলতাম। অদৃশ্য অক্ষম রাগে গা আমাদের রি রি করতো। ইহুদি না দেখেই আমরা ইহুদি কেমন হবে কল্পনা করে নিতাম। আমরা আমাদের আশেপাশে অনুসন্ধানী চোখে ইহুদি খোঁজে ফিরতাম। শুক্রবারের বয়ানে হুজুর যখন ফতোয়া দিতেন পৃথিবীতে মুসলমান বাদে বাদবাকি সবাই-ই ইহুদি-খ্রিস্টান তখন আমরা আমাদের আশেপাশের মালু-হিন্দুদের ইহুদি ভেবে মনে মনে কিংবা প্রকাশ্যে রাগ-ক্ষোভ ও ঘৃনা প্রকাশ করতাম। কেউ কেউ অকারণে কিংবা কারণে কিংবা খেলাচ্ছলে হিন্দুদের মারপিট করতাম।আর ভাবতাম এই করেই আমরা ফিলিস্তিনের মুসলমানদের পাশেই আছি….হে আল্লা ফিলিস্তিনি মুমিন মুসলমানদের তুমি হেফাজত করো… রক্ষা করো! তুমিই গাফুরুর রাহিম, তুমিই শফিউল জব্বার!

‘তুমি আমার কতো চেনা…’ কিংবা ‘তু-উ-উ-মাকে চাই আরো গভীর করে…’ টাইপ আকুলিবিকুলি করা গান শুরু হলে পরে আমরা ততক্ষণে জঙ্গি-জিহাদি চেতনা ভুল মেরে গেছি। আমাদের ইন্দ্রিয় ততক্ষণে উষ্ণ… কেমন যেনো মাথা নিচু করে ফেলতাম। চোখেমুখ কেমন লজ্জাবনত হয়ে যেতো। মায়েরা-মেয়েরা আড়ালে চলে যেতেন। বেহায়া টাইপ কেউ কেউ খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠতেন কেউবা মুখ টিপে হাসতেন। এই ধাপ শেষ হলে পরে আমরা কেমন যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচতাম। আবার নানান টানাপোড়নে আসর-মাগরিব বাদ মাগরিব অবধি বুদ হয়ে থাকতাম সিনেমায়। সিনেমা শেষ হলে পরে কেমন জানি উদাস হয়ে যেতাম আমরা। শূণ্যতা অনুভব করতাম!

অনেক সময় বিটিভির ফ্রিকোয়েন্সি-সিগন্যাল ঠিকঠাক পাওয়া যেতো না। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে মিলতোই না। কারও কারও টিভির চ্যানেল লাইন অটো হয়ে যেতো। শুধু ঝিক ঝিক ঝিক…. এই হ্যাপা ছিল নিত্য। আমরা ফ্রিকোয়েন্সি-সিগন্যাল বাড়ানোর জন্য এন্টেনায় এলুমিনিয়ামের হাড়ির ঢাকনা ব্যবহার করতাম। ছবি একদম পরিষ্কার না হলেও বেশ দেখাতো। তখন আমরা শখে সাদাকালো টিভির গ্লাসে এক্সট্রা রঙিন গ্লাস লাগিয়ে রঙিন টিভি দেখার কসরত করতাম। ছবি রঙিন দেখাতো কি না জোর সন্দেহ তবে তা যে বেশ কিম্ভূতকিমাকার এক রুপ ধারণ করতো এখন বুঝি।

আবার আমরা পরের বৃহষ্পতিবার আসতে না আসতেই আবার ব্যাটারির চার্জ পরীক্ষা করতাম। রাতে আগামীকালের সূচি দেখে ঘুমাতাম। আসন্ন আগামীকালের ভোর হতে না হতেই তিনটের অপেক্ষায় থাকতাম। দলবদ্ধ বা এলোমেলো, এদিক-সেদিক ঘুরতাম। আমরা জানতাম স্টেশন ও কেন্দ্র একটাই। আবহাওয়াগত কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁশের এন্টেনা আমরা ক্রমাগত ঘুরাতাম। ঘর থেকে সমস্বরে চিৎকার দিয়ে বলতো… ‘ছবি আইছে, ভালা অউ দেখা যার, আর ঘুরাইছ না!’

সময় সময়ের নিয়মে বদলেছে। ছবি ডিজিটাল হয়ে এইচডিতে রুপ নিয়েছে। বিনোদন কেন্দ্রিক মজমাও বদলেছে কিন্তু বদলে যাওয়া কাল ঘূর্ণির কবলে সব ইচ্ছে, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বাধীনতা আস্তে আস্তে জব্দ হতে হতে জঙ ধরে গেছে। স্তব্দ, রা-কাড়া সময়ে খাবি খেতে খেতে এখন আমরা কেন্দ্র বা স্টেশন ঠিক কোথায় তা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারি না কিংবা হোচট বা খাবি খেয়ে খেয়ে রা-হীন হয়ে গেছি। কিংবা আমরা চেষ্টা করিনি অথবা আমাদের করতে দেওয়া হয়নি। তিতা সত্যে হলো চোখ রাঙানি, হয়রানি, ভয়ভীতি, হামলা, মামলা, কুপিয়ে হত্যা, গুম-হত্যা, জোর-জবরদস্তি করে কুক্ষিগত করে রেখে দেওয়া হয়েছে। আর এই ফাঁকেই ক্রমশ বাজারনিবন্ধিত ভাড়াটে চ্যানেলেই আমাদের অনিশ্চিত কেন্দ্র নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। যারা আগুন লাগায়, তাঁরাই আজ বর্তমান-ভবিতব্যের ধুরন্ধর গ্যাঁড়াকলে আটকে ফ্যাৎ ফ্যাৎ, সাঁই সাঁই হয়ে যাচ্ছেন বা ইতিমধ্যে গ্যাছেন!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সাদাকালো কিন্তু ৩৫ মি.মি. নয়, বিটিভি কথা…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

48 − = 42